ব্যাপক মানবিক সংকটের মধ্যে ভঙ্গুর শান্তির আভাস
কম্বোডিয়া ও থাইল্যান্ডের সেনাদের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার চার দিন পরও পাঁচ লাখের বেশি বেসামরিক মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে বাস্তুচ্যুত রয়েছেন। সীমান্তে স্থিতিশীলতা বাড়লেও চলমান বিশাল মানবিক চ্যালেঞ্জের চিত্র এতে স্পষ্ট হয়েছে। ৩১ ডিসেম্বর সন্ধ্যা ৬টা থেকে ১ জানুয়ারি দুপুর ১টা পর্যন্ত কার্যকর হওয়া এই যুদ্ধবিরতি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় কিছুটা শান্তি এনেছে এবং কিছু পরিবারকে বাড়ি ফেরার সুযোগ করে দিয়েছে। তবে সার্বিক পরিস্থিতি এখনো নাজুক।
সূচিপত্র
- ব্যাপক মানবিক সংকটের মধ্যে ভঙ্গুর শান্তির আভাস
- সীমান্ত সংঘাতের মানবিক মূল্য
- শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা অচল
- আধুনিক সংঘাতের ঐতিহাসিক শিকড়
- সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ
- কষ্টার্জিত যুদ্ধবিরতি
- ফেরা ও পুনর্গঠনের পথে বাধা
- সংঘাতপূর্ণ এলাকার মানুষের কণ্ঠ
- সংঘাতের আড়ালের দিকগুলো
- সামনের পথ ও পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা
- মূল বিষয়গুলো
কম্বোডিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, নিরাপত্তা-উদ্বেগ, ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো এবং সংঘাতপূর্ণ এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অবিস্ফোরিত গোলাবারুদের ঝুঁকির কারণে ৫১২,২৬৩ জন এখনো নিজেদের গ্রামে ফিরতে পারছেন না। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে বড় মানবিক সংকটগুলোর একটি এই বাস্তুচ্যুতির ঘটনা। এতে দুই দেশের সম্পদের ওপর চাপ পড়ছে এবং আঞ্চলিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা পরীক্ষার মুখে পড়ছে।
জুলাইয়ে আগের সংঘর্ষের পর ডিসেম্বরের শুরুতে শুরু হওয়া লড়াইয়ে কয়েক ডজন বেসামরিক মানুষ ও সেনা নিহত হয়েছেন। সীমান্তের দুই পাশে প্রায় ১০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। ঔপনিবেশিক আমলের সীমান্ত নির্ধারণ এবং সীমান্তজুড়ে অবস্থিত প্রাচীন মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ নিয়ে দীর্ঘদিনের ভূখণ্ডগত বিরোধকে কেন্দ্র করে এই সংঘাত।
সীমান্ত সংঘাতের মানবিক মূল্য
এই সংঘাতের মানবিক মূল্য ভয়াবহ। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৪ জুলাই থেকে শুরু হওয়া সহিংস সীমান্ত সংঘাতে অন্তত ৪৩ জন নিহত এবং ৩ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। ডিসেম্বরে সংঘর্ষ তীব্র আকার ধারণ করলে লড়াই চরমে পৌঁছায়; মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে লাখো মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন।
শিশুসহ বেসামরিক মানুষই সহিংসতার সবচেয়ে বড় শিকার হয়েছেন। জুলাইয়ে বড় আকারের লড়াইয়ের প্রথম দিন কম্বোডিয়ার রকেট ও কামানের গোলা একটি হাসপাতাল, একটি মুদি দোকান ও আবাসিক বাড়িতে আঘাত হানে। থাই পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, এতে ৮ থেকে ১৫ বছর বয়সী শিশুসহ ১৪ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হন। পরে থাইল্যান্ডের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় হতাহতের হিসাব সংশোধন করে জানায়, কয়েক ডজন মানুষ আহত এবং ১২ জন নিহত হয়েছেন; নিহতদের বেশির ভাগই বেসামরিক।
কম্বোডিয়ায় ওয়ার্ল্ড ভিশন ইন্টারন্যাশনাল ২০২৫ সালের জুন থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত প্রেহ ভিহিয়ার, বানতে মিয়ানচে, সিয়েম রিয়াপ ও ওদ্দার মিয়ানচে প্রদেশের ৫৬টি বাস্তুচ্যুতি কেন্দ্রে ১ লাখ ৯ হাজারের বেশি মানুষকে মানবিক সহায়তা দিয়েছে। তাদের সহায়তার মধ্যে ছিল ৭৫,৫৪৪ জনের জন্য জরুরি খাদ্যসামগ্রী, ৬০,১২৭ জনের জন্য পানি ও স্যানিটেশন সহায়তা এবং ১,০৯,১৩৪ জনের জন্য আশ্রয় উপকরণ।
ইউনিসেফের পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের পরিচালক জুন কুনুগি সংঘাতে আটকে পড়া শিশুদের বিশেষ ঝুঁকির কথা তুলে ধরেছেন। ব্যাংকক থেকে তিনি দুই দেশকেই শিশুদের এবং তাদের নির্ভরশীল গুরুত্বপূর্ণ সেবাগুলো সুরক্ষিত রাখার আহ্বান জানান।
"শিশুদের সব সময় সুরক্ষিত রাখতে হবে এবং তাদের নিরাপত্তা ও কল্যাণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। স্কুলগুলোকে অবশ্যই শেখার নিরাপদ স্থান হিসেবে থাকতে হবে," তিনি বলেন।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা অচল
সংঘাতে জরুরি সেবাগুলো মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে; শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা বিশেষভাবে চাপের মুখে পড়েছে। শুধু বানতে মিয়ানচে প্রদেশেই ৩২১টি স্কুল এবং সাতটি হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্র বন্ধ রয়েছে। সরকারি সেবা সীমিত পরিসরে আবার চালু হয়েছে। প্রেহ ভিহিয়ারের পরিস্থিতিও একই রকম গুরুতর; সেখানে ৬১টি স্কুল ও ১৪টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র এখনো চালু হয়নি।
ওদ্দার মিয়ানচেতে বিঘ্নের মাত্রা সবচেয়ে বেশি। চলমান নিরাপত্তা-উদ্বেগের কারণে ২০০টির বেশি স্কুল এবং কয়েক ডজন স্থানীয় প্রশাসনিক কার্যালয় বন্ধ রয়েছে। সীমান্তের থাই অংশেও নিরাপত্তার কারণে ৮৫২টি স্কুল ও সাতটি হাসপাতাল বন্ধ রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে থাই কর্তৃপক্ষ।
সহিংসতায় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত শিশুদের শিক্ষার ধারাবাহিকতা ও মনোসামাজিক সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা হিসেবে ওয়ার্ল্ড ভিশন ৫৬টি শিশুবান্ধব কেন্দ্র স্থাপন করেছে, যেগুলো থেকে ১,১৫১ জন শিশু উপকৃত হয়েছে। তবে সীমান্ত অঞ্চলের বিশাল অংশে বন্ধ থাকা আনুষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থার বিকল্প হতে পারে না এসব জরুরি উদ্যোগ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জনস্বাস্থ্যের ওপর সংঘাতের প্রভাব নথিভুক্ত করেছে। সংস্থাটি জানায়, ৬ থেকে ১৪ আগস্টের মধ্যে কম্বোডিয়ায় অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ৭৫% কমেছে। তবে স্বাস্থ্য অবকাঠামো এখনো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বলে সতর্ক করেছে তারা। পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু করার আগে অনেক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পানি সরবরাহ ব্যবস্থা ও অন্যান্য মৌলিক অবকাঠামো মেরামত করা জরুরি।
আধুনিক সংঘাতের ঐতিহাসিক শিকড়
থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার মধ্যে কয়েক দশক ধরে চলা সীমান্ত বিরোধের সর্বশেষ বিস্ফোরণ এই সংঘাত। দুই দেশের প্রায় ৮০০ কিলোমিটার স্থলসীমান্ত ঔপনিবেশিক আমলে কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছিল এবং সীমান্তজুড়ে অবস্থিত কয়েকটি প্রাচীন মন্দিরের ধ্বংসাবশেষের অবস্থান কোথায়, তা নিয়ে মতবিরোধ থেকেই বিরোধের সূত্রপাত।
বিরোধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র একাদশ শতকের প্রেহ ভিহিয়ার মন্দির, যা ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যস্থল এবং সীমান্তের কম্বোডিয়া অংশে অবস্থিত। ১৯৬২ সালে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত রায় দেয়, মন্দিরটি কম্বোডিয়ার। তবে এর আশপাশের ভূখণ্ড নিয়ে বিরোধ রয়ে গেছে। দুই দেশের মধ্যে সর্বশেষ বড় সংঘাত হয় ২০১১ সালে; মন্দিরের কাছে কয়েক দিনের সীমান্ত লড়াইয়ে উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন হতাহত হন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উত্তেজনা কিছুটা কমলেও দুই মাস আগে দুই দেশের সেনাদের মধ্যে ছোটখাটো সংঘর্ষের পর তা আবার বেড়ে যায়। বিরোধপূর্ণ এলাকাগুলোর মধ্যে ছিল থাইল্যান্ডের সুরিন প্রদেশের তা মুন থম ও তা কোয়াই মন্দির এবং উত্তর কম্বোডিয়ার প্রেহ ভিহিয়ার ও ওদ্দার মিয়ানচে প্রদেশ।
জুলাইয়ে স্থলমাইনের দুটি বিস্ফোরণে থাই সেনারা আহত হওয়ার পর পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য অবনতি ঘটে। উসকানি দেওয়ার পাল্টাপাল্টি অভিযোগের জেরে সংঘর্ষ বাড়তে থাকে এবং ৮ ডিসেম্বর বড় ধরনের সামরিক সংঘাতে রূপ নেয়। স্থানীয় পর্যায়ের লড়াই দ্রুত সীমান্তের প্রায় প্রতিটি প্রদেশে ছড়িয়ে পড়ে; সংঘাতের ব্যাপ্তি ও তীব্রতা ছিল নজিরবিহীন।
সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ
ডিসেম্বরের লড়াইয়ে দুই পক্ষই এমনভাবে ভারী অস্ত্র ব্যবহার করেছে, যা কয়েক দশকের সীমান্ত উত্তেজনার মধ্যে দেখা যায়নি। তুলনামূলক আধুনিক সামরিক বাহিনীর অধিকারী থাইল্যান্ড উসকানির জবাবে এফ-১৬ যুদ্ধবিমান দিয়ে বিমান হামলা চালায়। পাল্টা জবাবে কম্বোডিয়া রকেট ছোড়ে, যাতে থাই বাড়িঘরে আগুন ধরে যায়।
থাইল্যান্ডের বিমানবাহিনী কম্বোডিয়ার বানতে মিয়ানচে প্রদেশের কমপং স্বে জেলায় বোমা ফেলে। থাই সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়, বিমান হামলার লক্ষ্য ছিল অস্ত্রের গুদাম। থাইল্যান্ডের ক্লাস্টার যুদ্ধাস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে মানবাধিকার সংস্থাগুলো বিশেষভাবে নিন্দা জানিয়েছে। বসতিপূর্ণ এলাকায় এসব অস্ত্রের ব্যবহার আন্তর্জাতিক রীতিনীতির লঙ্ঘন, যদিও থাইল্যান্ড ক্লাস্টার যুদ্ধাস্ত্রবিষয়ক কনভেনশনের স্বাক্ষরকারী নয়।
সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় দ্রুত উদ্যোগ নেয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর উত্তেজনা বলে কর্মকর্তারা যে পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়েছেন, তা নিয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ জরুরি রুদ্ধদ্বার বৈঠক করে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন প্রায় একই সময়ে মধ্যস্থতার কূটনৈতিক প্রচেষ্টা শুরু করে।
নিজেকে বৈশ্বিক শান্তি প্রতিষ্ঠাকারী হিসেবে তুলে ধরা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধবিরতিতে মধ্যস্থতার কৃতিত্ব দাবি করেন। নিজের ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে এক পোস্টে তিনি লেখেন: "যুক্তরাষ্ট্র সব সময়ের মতো সহায়তা করতে পেরে গর্বিত! গত এগারো মাসে আমি যত যুদ্ধ ও সংঘাত মিটিয়েছি এবং থামিয়েছি—আটটি—তাতে হয়তো যুক্তরাষ্ট্রই প্রকৃত জাতিসংঘ হয়ে উঠেছে।"
চীনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ইউননান প্রদেশে থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিহাসাক ফুয়াংকেতকেও ও কম্বোডিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রাক সোখনের মধ্যে দুই দিনের আলোচনার আয়োজন করে দেশটি। আলোচনা শেষ হওয়ার সময় চীন থেকে জরুরি মানবিক সহায়তার প্রথম চালান—তাঁবু, কম্বল ও খাবারসহ—নম পেনের তেখো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়।
কষ্টার্জিত যুদ্ধবিরতি
দুই দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের মধ্যে উত্তেজনাপূর্ণ আলোচনার পর বর্তমান যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়। দুই দিনের কঠিন আলোচনার পর আকস্মিকভাবে এ ঘোষণা আসে। লড়াই থামাতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের চাপও তখন বাড়ছিল।
থাইল্যান্ডের প্রতিরক্ষামন্ত্রী নাত্তাফন নার্কফানিত ৭২ ঘণ্টার প্রাথমিক যুদ্ধবিরতিকে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা যাচাইয়ের পরীক্ষামূলক সময় হিসেবে বর্ণনা করেন। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, "যুদ্ধবিরতি বাস্তব ও অব্যাহত আছে কি না, তা নিশ্চিত করতে ৭২ ঘণ্টা ধরে এর ওপর নজর রাখা হবে এবং তা পর্যবেক্ষণ করা হবে। পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে বেসামরিক মানুষ নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারবেন।"
চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ছিল জুলাইয়ের সংঘর্ষের পর থেকে থাইল্যান্ডে আটক থাকা ১৮ জন কম্বোডীয় সেনার মুক্তি। তাদের আটক থাকার ঘটনা কম্বোডিয়ায় জাতীয়তাবাদী মনোভাব উসকে দিয়েছিল এবং যুদ্ধবিরতি আলোচনায় তাদের প্রত্যাবর্তন ছিল অন্যতম প্রধান দাবি। যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে থাইল্যান্ডের উদ্বেগে হস্তান্তর এক দিন পিছিয়ে যায়, তবে চীনের অব্যাহত কূটনৈতিক চাপের পর তা শেষ পর্যন্ত সম্পন্ন হয়।
থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সেনাদের মুক্তিকে "সদিচ্ছার প্রকাশ" বলে উল্লেখ করে এবং আশা প্রকাশ করে যে কম্বোডিয়া "সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের মাধ্যমে এই সদিচ্ছার প্রতিদান দেবে"। কম্বোডিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, এই মুক্তি "পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাস" গড়ে তুলতে সহায়ক হবে বলে তারা "আশাবাদী"।
চুক্তি হওয়ার পরও দুই পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে। থাইল্যান্ডের দাবি, কম্বোডিয়া ২৫০টির বেশি চালকবিহীন আকাশযান থাই ভূখণ্ডে পাঠিয়েছে। তবে যুদ্ধবিরতি কার্যকর আছে বলেই মনে হচ্ছে; এতে মানবিক কার্যক্রম বাড়ানো এবং কিছু বাস্তুচ্যুত বেসামরিক মানুষের বাড়ি ফেরার কথা বিবেচনা করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ফেরা ও পুনর্গঠনের পথে বাধা
যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও বাস্তুচ্যুত মানুষের নিরাপদে ফেরার পথে বড় বাধা রয়ে গেছে। কম্বোডিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ৮৪টি গ্রামে এখনো পৌঁছানো যাচ্ছে না। বাসিন্দারা ফিরতে পারার আগে আরও এলাকা পরিষ্কার করা ও পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা দরকার।
অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ ফিরে যাওয়া মানুষের জন্য বিশেষ বিপজ্জনক। পুনর্বাসনের পথে স্থলমাইন ও অন্যান্য বিস্ফোরকের অবশিষ্টাংশকে বড় বাধা হিসেবে উল্লেখ করেছে কর্তৃপক্ষ। সাম্প্রতিক সংঘর্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা স্থলমাইন যৌথ সীমান্ত থেকে সরানোর অঙ্গীকার করেছে দুই দেশ। তবে এ প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ ও বিপজ্জনক হবে।
বেসামরিক অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। প্রাথমিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, অন্তত ১১৭টি বেসামরিক বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতি হয়েছে স্কুল, সরকারি কার্যালয় ও ধর্মীয় স্থাপনায়ও। ব্যক্তিগত বাড়ি, হোটেল, গ্যাস স্টেশন, ধানের গোলা, সেতু, সড়ক ও বিদ্যুৎ স্থাপনায়ও অতিরিক্ত ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে।
ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গোলাবর্ষণে ইউনেসকোর তালিকাভুক্ত প্রেহ ভিহিয়ার মন্দির এবং একটি বৌদ্ধ প্যাগোডার ক্ষতি হয়েছে। সশস্ত্র সংঘাতে ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা সুরক্ষিত রাখা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। থাইল্যান্ডভিত্তিক সংবাদ ওয়েবসাইট খাওসদ ইংলিশ এ পরিস্থিতির করুণ বিদ্রূপের দিকটি তুলে ধরেছে।
"এই পবিত্র স্থানগুলোর বর্তমান সামরিকীকরণ গভীর এক বিদ্রূপের জন্ম দিয়েছে: একসময় আধ্যাত্মিক সম্প্রীতি ও আন্তঃসাংস্কৃতিক বিনিময়ের জন্য নির্ধারিত স্থানগুলো এখন জাতীয়তাবাদী উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। সেখানে জ্ঞান ও আলোর সন্ধানে আসা তীর্থযাত্রীদের বদলে রয়েছে কাঁটাতারের বেড়া ও সামরিক স্থাপনা," প্রকাশনাটি উল্লেখ করেছে।
সংঘাতপূর্ণ এলাকার মানুষের কণ্ঠ
সীমান্তের কাছে বসবাসকারীরাই এই সংঘাতে সবচেয়ে বেশি মূল্য দিয়েছেন। থাইল্যান্ডে পড়াশোনা করা কম্বোডীয় শিক্ষার্থী ইউক মেংলং দুই সেনাবাহিনীর মাঝে আটকে পড়া বাসিন্দাদের দুর্দশার কথা তুলে ধরেছেন।
"সীমান্তের কাছে বসবাসকারী আমরা সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগের শিকার। ব্যাংকক বা নম পেনে নিরাপদ দূরত্বে বসে যারা যুদ্ধকে সমর্থন করছেন, আমরা তাদের মতো নই। আমাদের জীবনই তছনছ হয়ে যাচ্ছে," মেংলং বলেন। "এই মুহূর্তে দুই পাশের পরিবারগুলো কষ্ট পাচ্ছে। তাই এই অর্থহীন যুদ্ধকে সমর্থন করতে ছুটে যাওয়ার আগে প্রতিবন্ধী, বয়স্ক, অসুস্থ এবং বিশেষ করে শিশুদের কথা ভাবুন। শিশুরা এখন পড়তে শেখার আগেই ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের শব্দ আলাদা করে চিনতে শিখছে।"
সহিংসতা থেকে পালিয়ে আসা বেসামরিক মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বর্ণনায় উঠে এসেছে ভয়াবহ চিত্র। প্রেহ ভিহিয়ার মন্দিরের প্রহরী সেন সোখা বোমা হামলার সময় কীভাবে পালিয়েছিলেন, তা কম্বোডিয়ার সংবাদমাধ্যম কিরিপোস্টকে জানান।
"চারপাশে বোমা পড়ছিল, তাই আমাদের একটি মন্দিরে আশ্রয় নিতে হয়েছিল। [পাহাড়ের] অর্ধেক পথও নামতে পারিনি, এমন সময় তারা হঠাৎ আমাদের আশ্রয়স্থলটি ধ্বংস করে দেয়। সৌভাগ্যক্রমে আমরা পালাতে পেরেছিলাম। তারা গোলা ছুড়লে বিস্ফোরণের শব্দ এড়াতে আমরা সবাই লুকিয়ে পড়তাম; কখনো হোঁচট খেয়ে নালায় পড়ে যেতাম," সোখা স্মৃতিচারণ করেন।
২৮ জুলাই ওদ্দার মিয়ানচে প্রদেশের সামরং শহরের কোন ক্রিয়েল গ্রামে থাই সামরিক বাহিনীর ড্রোন হামলা থেকে বেঁচে যান সোমবাত সোচেয়াতা। গোলাগুলির মধ্যে পরিবারের সঙ্গে পালানোর চেষ্টা করার ভয়াবহ অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন তিনি।
"সকাল সাড়ে ৮টার দিকে আমি এলাকা ছাড়তে শুরু করি। জোরে বিস্ফোরণের শব্দ শুনে সঙ্গে সঙ্গে গাড়ির দিকে দৌড় দিই। গাড়ির কাছে পৌঁছানোর আগেই কাছেই একটি বড় বোমা পড়ে। আমরা ভয় পেয়ে আগে থেকে খুঁড়ে রাখা আশ্রয়কেন্দ্রের দিকে দৌড়ে যাই। দুপুর ১২টা পর্যন্ত অপেক্ষা করি, যখন বিস্ফোরণের শব্দ থেমে যায়। আবার গাড়ির দিকে দৌড় দিই, কিন্তু ফের কাছেই বোমা পড়ে। তখন আবার আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটে যাই এবং দুপুর ২টা পর্যন্ত অপেক্ষা করি। এরপর সেখান থেকে বের হতে পারি," সোচেয়াতা বলেন।
সংঘাতের আড়ালের দিকগুলো
ভূখণ্ডগত বিরোধের বাইরেও বিশ্লেষকেরা থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার উত্তেজনার পেছনে অন্য কিছু কারণ চিহ্নিত করেছেন। যুদ্ধের সঙ্গে মানবপাচার ও সাইবার অপরাধের একটি কথিত যোগসূত্র রয়েছে। কম্বোডিয়ায় অবস্থিত সাইবার প্রতারণার আস্তানাগুলোর বিরুদ্ধে থাইল্যান্ডের অভিযানও উত্তেজনা বাড়িয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
মানবপাচারের সঙ্গে যুক্ত এবং অপরাধী চক্রের সহায়তায় পরিচালিত এসব আস্তানা কম্বোডিয়ার ১২.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের প্রতারণা শিল্পের অংশ বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। কারও কারও মতে, এসব অবৈধ মুনাফা পরোক্ষভাবে সরকারের কিছু অংশকে অর্থায়ন করতে পারে, যা দুই দেশের মধ্যে অবিশ্বাস আরও বাড়ায়।
কম্বোডিয়ায় জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করার পরিকল্পনাও করছে থাইল্যান্ড। কম্বোডিয়ার সশস্ত্র বাহিনীকে সহায়তার জন্য পেট্রল, এমনকি অস্ত্র বহন করতে পারে—এমন থাই-নিবন্ধিত জাহাজ নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব সামুদ্রিক আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষকে দেওয়া হয়েছে। সংঘাতের এই অর্থনৈতিক দিক কূটনৈতিকভাবে সমাধানের প্রচেষ্টাকে আরও জটিল করেছে।
অভিবাসী শ্রমিকেরাও গোলাগুলির মাঝে পড়েছেন। থাইল্যান্ডে কম্বোডীয়, এমনকি মিয়ানমারের শ্রমিকদের লক্ষ্য করে হামলার খবর রয়েছে। মিয়ানমারের স্বাধীন সংবাদমাধ্যম মিজিমা উল্লেখ করেছে, "এই ঘটনা মনে করিয়ে দেয় যে জনমত ও রাস্তাঘাটের বাস্তবতা ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত, আর অভিবাসীরা প্রায়ই এমন সংঘাতের শিকার হন, যা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা তাদের নেই।"
সামনের পথ ও পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা
কম্বোডিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ি মেরামত, জনসেবা পুনরুদ্ধার এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ পুনর্বাসন কার্যক্রম ত্বরান্বিত করতে তারা জাতীয় ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করছে। ১৭২টি গ্রামে পুনর্বাসনের প্রস্তুতি শেষ হয়েছে, তবে অনেক পরিবার এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।
ওয়ার্ল্ড ভিশন ইন্টারন্যাশনাল আগামী কয়েক মাসের জন্য তিন দফা পরিকল্পনা নিয়েছে: স্বাস্থ্য, সুরক্ষা ও শিক্ষায় গুরুত্ব দিয়ে বাস্তুচ্যুতি কেন্দ্রগুলোতে জীবনরক্ষাকারী সহায়তা অব্যাহত রাখা; নগদ অর্থ সহায়তা, জীবিকার সুযোগ এবং জরুরি সেবায় প্রবেশাধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে বাড়ি ফেরা পরিবারগুলোর প্রাথমিক পুনরুদ্ধারে সহায়তা করা; এবং দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা পরিকল্পনা তৈরির জন্য থাইল্যান্ড থেকে ফিরে আসা অভিবাসীদের যৌথ মূল্যায়ন করা।
কম্বোডিয়া সরকার আবারও বলেছে, যুদ্ধবিরতির কারণে দেশটির সার্বভৌমত্ব বা ভূখণ্ডগত অখণ্ডতার সঙ্গে কোনো আপস হচ্ছে না। বিদ্যমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার মাধ্যমে সীমান্ত-সংক্রান্ত বিষয়গুলোর সমাধান অব্যাহত থাকবে বলেও জোর দিয়েছে সরকার। আটক কম্বোডীয় সেনাদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনতে অবদান রেখেছে বলে কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রী হুন মানেতের "নীরব, তবে নিশ্চুপ নয়" নীতির প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
দুই দেশের নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলো নিজ নিজ সরকারের প্রতি স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং মানবিক সংকট মোকাবিলার আহ্বান জানিয়ে বিবৃতিতে সই করেছে। মানবাধিকার সংগঠন ফোরাম এশিয়ার বক্তব্য, "সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী বেসামরিক মানুষকে ভয়ের মধ্যে জীবন কাটাতে হওয়া উচিত নয়।"
উত্তেজনা আরও বাড়াতে এবং মানুষের জীবন বিপন্ন করতে পারে, এমন কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে সব পক্ষকে। বৃহত্তর মানবিক সংকট ঠেকাতে এবং সীমান্তের দুই পাশের জনগোষ্ঠীর স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে উত্তেজনা কমানো জরুরি।
অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে এখনো অপেক্ষায় থাকা হাজারো পরিবারের জন্য যুদ্ধবিরতি কেবল সীমান্তে কয়েক সপ্তাহের অস্থিরতার পর জীবন নতুন করে গড়ার প্রথম ধাপ। স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে আনতে সময়, সম্পদ এবং দুই দেশ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ধারাবাহিক কূটনৈতিক অঙ্গীকার প্রয়োজন হবে।
মূল বিষয়গুলো
- কম্বোডিয়া ও থাইল্যান্ডের মধ্যে ৩১ ডিসেম্বর থেকে ১ জানুয়ারি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়; তবে কম্বোডীয় কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ৫১২,২৬৩ জন বাস্তুচ্যুত রয়েছেন
- জুলাই থেকে অন্তত ৪৩ জন নিহত এবং প্রায় ১০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন; শিশুদেরসহ বেসামরিক মানুষই সহিংসতার সবচেয়ে বেশি শিকার
- ঔপনিবেশিক আমলের সীমান্ত নির্ধারণ নিয়ে কয়েক দশকের পুরোনো ভূখণ্ডগত বিরোধ থেকে সংঘাতের সূত্রপাত; প্রেহ ভিহিয়ারের মতো প্রাচীন মন্দিরকে ঘিরে বিরোধ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ
- শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে; সীমান্তবর্তী প্রদেশগুলোতে শত শত স্কুল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র বন্ধ
- যুদ্ধবিরতি চুক্তির অংশ হিসেবে জুলাই থেকে আটক থাকা ১৮ জন কম্বোডীয় সেনাকে মুক্তি দিয়েছে থাইল্যান্ড
- অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ ও ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো বাস্তুচ্যুত মানুষের নিরাপদে ফেরার পথে বড় বাধা
- যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক পক্ষগুলো মধ্যস্থতার প্রচেষ্টায় যুক্ত হয়েছে
- ওয়ার্ল্ড ভিশনের মতো মানবিক সংস্থাগুলো এক লাখের বেশি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে সহায়তা দিয়েছে
- সাইবার অপরাধী চক্র ও মানবপাচারসহ অন্তর্নিহিত কিছু কারণ উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলতে পারে






