দক্ষিণ কোরিয়ার সংশোধিত নেটওয়ার্ক আইন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ
দক্ষিণ কোরিয়ার তথ্য ও যোগাযোগ নেটওয়ার্ক আইনের সাম্প্রতিক সংশোধন নিয়ে সমালোচনা আরও জোরালো করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। তাদের সতর্কবার্তা, মিথ্যা ও কারসাজি করে তৈরি তথ্যকে লক্ষ্য করে প্রণীত আইনটি মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ক্ষতি করতে পারে এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে খর্ব করতে পারে। ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই মিত্রের মধ্যে উত্তেজনার আরেকটি কারণ হয়ে উঠেছে এই বিরোধ। ওয়াশিংটন কোরিয়ার এ পদক্ষেপকে ডিজিটাল পরিষেবায় শুল্কবহির্ভূত বাধা হিসেবে দেখছে।
মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে সংশোধনীটি নিয়ে কড়া সতর্কবার্তা দেন যুক্তরাষ্ট্রের আন্ডার সেক্রেটারি অব স্টেট ফর পাবলিক ডিপ্লোম্যাসি সারাহ রজার্স। তিনি বলেন, ডিপফেক ও মানহানিকর বিষয়বস্তু নিয়ে উদ্বেগ দূর করার লক্ষ্য থাকলেও আইনটির পরিধি সেই বৈধ উদ্দেশ্যের অনেক বাইরে চলে গেছে।
রজার্স লেখেন, “দক্ষিণ কোরিয়ার নেটওয়ার্ক আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনীটি আপাতদৃষ্টিতে মানহানিকর ডিপফেকের প্রতিকারকে লক্ষ্য করলেও এর পরিধি অনেক বিস্তৃত, যা প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতাকে বিপন্ন করছে। ডিপফেক নিয়ে উদ্বেগ থাকা স্বাভাবিক, তবে দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে সেন্সরশিপ চালানোর জন্য নিয়ন্ত্রকদের ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়ার চেয়ে ভুক্তভোগীদের দেওয়ানি প্রতিকারের সুযোগ দেওয়াই ভালো।”
গত মাসে ক্ষমতাসীন ডেমোক্রেটিক পার্টি অব কোরিয়ার নেতৃত্বাধীন জাতীয় পরিষদে সংশোধিত বিলটি পাস হয় এবং মন্ত্রিসভার বৈঠকে অনুমোদন পায়। জুলাইয়ে এটি কার্যকর হওয়ার কথা।
সংশোধিত আইনে টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্কে অবৈধ বিষয়বস্তুর বিস্তার—এর মধ্যে কারসাজি করা বা মিথ্যা তথ্যও রয়েছে—রোধের চেষ্টা করা হয়েছে। পাশাপাশি আইন লঙ্ঘনের জন্য কঠোরতর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। আইন অনুযায়ী, বড় প্ল্যাটফর্ম পরিচালকদের মিথ্যা তথ্য ঠেকাতে নিজস্ব বিধিমালা প্রণয়ন করতে হবে এবং এ ধরনের বিষয়বস্তু সরিয়ে ফেলা ও তা পোস্ট করা ব্যবহারকারীদের অ্যাকাউন্ট স্থগিত করার মতো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
কেউ জেনেশুনে ও ইচ্ছাকৃতভাবে অবৈধ বা মিথ্যা, কারসাজি করা তথ্য ছড়ালে প্রমাণিত ক্ষতির সর্বোচ্চ পাঁচ গুণ পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ দিতে আদালত নির্দেশ দিতে পারবে। বড় প্ল্যাটফর্ম পরিচালকেরাও স্বেচ্ছায় বিষয়বস্তু সরানো, প্রবেশাধিকার সীমিত করা, অ্যাকাউন্ট স্থগিত করা, অর্থ উপার্জনের সুযোগ বন্ধ করা এবং পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়াসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা নিতে পারবেন।
আইনে মিথ্যা তথ্যকে এমন বিষয়বস্তু হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, যা “সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে অসত্য”; আর কারসাজি করা তথ্য হলো এমন বিষয়বস্তু, যা “এমনভাবে পরিবর্তন করা হয়েছে, যাতে দর্শকেরা সেটিকে সত্য বলে বিশ্বাস করে বিভ্রান্ত হতে পারেন”।
রজার্সের বক্তব্যের এক দিন পর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত কোরীয় সাংবাদিকদের লিখিত বিবৃতি দেন। এতে বলা হয়, আইনটির সংশোধন নিয়ে ওয়াশিংটনের “গুরুতর উদ্বেগ” রয়েছে। মুখপাত্রের ভাষ্য, আইনটি “যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোর ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ন করে”।
মুখপাত্র আরও বলেন, কোরিয়ার “ডিজিটাল পরিষেবায় অপ্রয়োজনীয় বাধা” আরোপ করা এড়ানো উচিত। তিনি জোর দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সেন্সরশিপের বিরোধী এবং অবাধ ও উন্মুক্ত ডিজিটাল পরিবেশ গড়ে তুলতে কোরিয়ার সঙ্গে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
সমালোচকদের যুক্তি, এসব সংজ্ঞা স্পষ্ট নয়। ফলে কোনটি সত্য, তা নির্ধারণের দায়িত্ব কার্যত সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হাতে চলে যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের “দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে সেন্সরশিপ চালানোর জন্য নিয়ন্ত্রকদের ব্যাপক ক্ষমতা” দেওয়ার প্রসঙ্গেও একই উদ্বেগ প্রতিফলিত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া থেকে মনে হচ্ছে, আইনে “মিথ্যা বা কারসাজি করা তথ্যের” সংজ্ঞা অতিরিক্ত বিস্তৃত, অথবা তা খেয়ালখুশিমতো প্রয়োগ করা হতে পারে—এমন উদ্বেগ রয়েছে ওয়াশিংটনের। ঘনিষ্ঠ মিত্রের পাস করা অভ্যন্তরীণ আইনের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের তাৎক্ষণিক প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া বিরল। কোরিয়ার ক্ষেত্রে দেশটির অভ্যন্তরীণ আইন নিয়ে মার্কিন সরকারের মন্তব্যের এটিই প্রথম ঘটনা।
ওয়াশিংটনের এসব বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, সিউল এমন ডিজিটাল বিধি প্রণয়ন করছে, যা মেটা ও গুগলের মতো মার্কিন প্রযুক্তি ও প্ল্যাটফর্ম কোম্পানির প্রতি বৈষম্যমূলক। গুগল ও নেটফ্লিক্সের মতো মার্কিন কনটেন্ট সরবরাহকারীদের কাছ থেকে নেটওয়ার্ক ব্যবহারের ফি আদায়ের কোরীয় উদ্যোগ এবং ছোট ব্যবসায়ীদের প্রতি অন্যায্য আচরণ ঠেকাতে একচেটিয়া অনলাইন প্ল্যাটফর্ম নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপ নিয়েও যুক্তরাষ্ট্র আপত্তি জানিয়েছে।
এ ছাড়া, গুগলসহ বিদেশি কোম্পানির কাছে উচ্চ-নির্ভুলতার মানচিত্রের তথ্য রপ্তানি করতে কোরিয়ার অনীহারও সমালোচনা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এসব পদক্ষেপকে দেশটি “শুল্কবহির্ভূত বাধা” বলেছে—অর্থাৎ এমন নিয়মকানুন, যা প্রচলিত শুল্ক ছাড়াই বাণিজ্যিক বিধিনিষেধের মতো কাজ করে।
গত নভেম্বরে প্রকাশিত দুই দেশের বাণিজ্য আলোচনা নিয়ে যৌথ তথ্যপত্রে বলা হয়, দুই দেশ “ডিজিটাল পরিষেবা-সংক্রান্ত আইন ও নীতিমালার ক্ষেত্রে, নেটওয়ার্ক ব্যবহারের ফি ও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম নিয়ন্ত্রণসহ, মার্কিন কোম্পানিগুলোর প্রতি বৈষম্য না করা এবং তাদের ওপর অপ্রয়োজনীয় বাধা না দেওয়া নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ”।
গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ইউরোপীয় ইউনিয়নের ডিজিটাল সার্ভিসেস অ্যাক্ট (ডিএসএ) প্রণয়নে যুক্ত পাঁচ কর্মকর্তার ওপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা দেয়। তাদের বিরুদ্ধে “আমেরিকান প্ল্যাটফর্মগুলোকে তাদের বিরোধী মার্কিন দৃষ্টিভঙ্গি সেন্সর, অর্থ উপার্জনের সুযোগ বন্ধ এবং দমন করতে বাধ্য করার সুসংগঠিত প্রচেষ্টায়” জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়।
কোরীয় আইনের ধারাগুলো ইইউর ডিএসএর আদলে তৈরি। ওই আইনে ইউরোপে কার্যক্রম চালানো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলো অবৈধ বিষয়বস্তু ও মিথ্যা তথ্য নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে বড় অঙ্কের জরিমানার বিধান রয়েছে। মূল বিলে ডিএসএকে আদর্শ হিসেবে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল। এতে বলা হয়, “অবৈধ ও মিথ্যা তথ্যের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে বড় প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর আইনি বাধ্যবাধকতা আরোপ” করাই এর লক্ষ্য।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপ ওয়াশিংটনের সাম্প্রতিক নীতিগত অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপ করতে পারে, এমন বিদেশি বিধির বিরুদ্ধে জোরালো অবস্থান নিচ্ছে ওয়াশিংটন। ইউটিউব, এক্স বা গুগলের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোকে আইনের আওতায় কোরিয়ায় বিষয়বস্তু সীমিত করার চাপ দেওয়া হলে তা কার্যত মার্কিন কোম্পানিগুলোর কার্যক্রমে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে সতর্ক করেছেন সমালোচকেরা।
কোরিয়ার নেটওয়ার্ক আইন নিয়ে বিতর্ক এমন সময়ে হচ্ছে, যখন মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে কথিত “শুল্কবহির্ভূত আক্রমণ” নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ বাড়ছে। ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড ইনোভেশন ফাউন্ডেশনের মতে, এগুলো হলো এমন বৈষম্যমূলক পরিচালনাগত বিধিনিষেধ ও রাজস্ব আদায়ের কৌশল, যা নির্দিষ্টভাবে শীর্ষস্থানীয় মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে লক্ষ্য করে।
বিদেশি সরকারগুলো শীর্ষস্থানীয় মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে এসব নতুন বাণিজ্যিক অস্ত্র প্রয়োগ করছে। বৈধ কর ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা না হয়ে, এগুলো এমন বৈষম্যমূলক পরিচালনাগত বিধিনিষেধ হিসেবে কাজ করে, যা সম্পদ আদায় করে, প্রযুক্তি হস্তান্তরে বাধ্য করে এবং প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা ক্ষুণ্ন করে; অথচ তা থেকে রক্ষার মতো কার্যকর দেশীয় বিকল্প থাকে না।
ডিজিটাল নীতিতে বাক্স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনা এবং সেন্সরশিপ বন্ধের চেষ্টা করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। ইইউ ও কোরিয়ার বিধি নিয়ে সাম্প্রতিক সমালোচনা এই বৃহত্তর কৌশলগত পরিবর্তনেরই প্রতিফলন।
এখন নজর, কোরিয়ার সংশোধিত আইনটি নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন একই ধরনের আপত্তি তুলবে কি না। ডিজিটাল পরিষেবা-সংক্রান্ত নিয়মকানুন নিয়ে প্রশাসনের কর্মকর্তারা ইতিমধ্যেই খুব সংবেদনশীল প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। মার্কিন স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর বলে বিবেচিত ডিজিটাল বিধি প্রণয়নে যুক্ত বিদেশি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ইচ্ছাও যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে দেখিয়েছে।
কোরীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এবং সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের কোরিয়া চেয়ার ভিক্টর চা জুংআং ইলবোকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও কোরিয়ার সাম্প্রতিক যৌথ তথ্যপত্রের উদ্দেশ্য হলো, আইন ও নিয়ন্ত্রণকে বাজার সুরক্ষাবাদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার ঠেকানো—যে বিষয়টিতে ট্রাম্প প্রশাসন স্পষ্টতই গুরুত্ব দিচ্ছে।
চায়ের বক্তব্য থেকে ইঙ্গিত মেলে, কোরীয় আইনটি দুই দেশের ওই চুক্তির মূল চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
সংশোধনীতে কোরিয়া মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিকেশনস কমিশনের অধীনে একটি “স্বচ্ছতা কেন্দ্র” প্রতিষ্ঠার বিধানও রয়েছে। তথ্য যাচাইয়ের উদ্যোগে সহায়তা করাই এর কাজ। বিরোধী দলগুলো একে “সরকারঘনিষ্ঠ নজরদারি সংস্থা” বলে সমালোচনা করেছে।
কোরিয়া ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড অ্যাসোসিয়েশনের বাণিজ্য প্রবণতা বিশ্লেষণ বিভাগের প্রধান জাং সাং-সিক সতর্ক করে বলেছেন, বিলটি নিয়ে নীতিনির্ধারকদের উচিত বৈশ্বিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্পষ্ট ও পূর্বানুমানযোগ্য বিধি নির্ধারণ করা।
তিনি বলেন, “মিথ্যা বা কারসাজি করা তথ্যের কারণে ভোক্তাদের ক্ষতি কমানোর উদ্দেশ্যের সঙ্গে আমি একমত। তবে কোরিয়ায় কার্যক্রম চালানো বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মগুলোর ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য হবে। তাই অস্পষ্ট সংজ্ঞা বা আইন প্রয়োগের মানদণ্ড বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে অতিরিক্তভাবে স্ব-সেন্সরশিপ করতে বা ডিজিটাল সহযোগিতা কমাতে প্ররোচিত করতে পারে। সে কারণে প্রক্রিয়াগত স্বচ্ছতা ও আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্পষ্ট সংজ্ঞার অভাবে সম্ভাব্য শাস্তি এড়াতে প্ল্যাটফর্মগুলো সতর্কতার অতিরিক্ত প্রান্তে গিয়ে বৈধ বিষয়বস্তুও সরিয়ে ফেলতে পারে। এ ধরনের অতিরিক্ত স্ব-সেন্সরশিপ বৈধ মতপ্রকাশ ও উদ্ভাবনকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। একই সঙ্গে বিতর্কিত বিষয় পুরোপুরি এড়িয়ে চলতে প্ল্যাটফর্মগুলোকে উৎসাহিত করতে পারে।
কোরিয়ার ভেতর থেকেও সমালোচনার মুখে পড়েছে আইনটি। ক্ষমতাসীন ডেমোক্রেটিক পার্টি জাতীয় পরিষদে দক্ষিণ কোরিয়ার তথ্য ও যোগাযোগ নেটওয়ার্ক আইনের বিতর্কিত সংশোধনীটি পাস করিয়ে নিলেও, শুধু রক্ষণশীলদের নয়, বৃহত্তর প্রগতিশীল শিবিরের মধ্য থেকেও বিরোধিতা বাড়ছে।
প্রগতিশীল মিত্রদের ছোট দল—প্রগ্রেসিভ পার্টি, বেসিক ইনকাম পার্টি ও সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি—হয় বিলটির বিরোধিতা করেছে, নয়তো ভোটদানে বিরত থেকেছে। তাদের সতর্কবার্তা, এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সাংবিধানিক সুরক্ষা লঙ্ঘন করতে পারে।
প্রগ্রেসিভ পার্টির জ্যেষ্ঠ মুখপাত্র সন সল এক বিবৃতিতে বলেন, “জনস্বার্থের ক্ষতি বলতে কী বোঝায়, তা নির্ধারণের মানদণ্ড স্পষ্ট নয়। ক্ষমতাসীনদের সমালোচনামূলক বক্তব্য খেয়ালখুশিমতো দমন করার হাতিয়ার হিসেবে আইনটির অপব্যবহারের গুরুতর ঝুঁকি রয়েছে।”
আইনটি নিয়ে কোরীয় নাগরিক গোষ্ঠীগুলোর জমা দেওয়া একটি আবেদন জাতিসংঘও পর্যালোচনা করছে। আইনজীবী ও অধিকারকর্মীদের একটি ওয়ার্কিং গ্রুপ মতপ্রকাশ ও বাক্স্বাধীনতাবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদককে কোরীয় সরকারের কাছে জরুরি আবেদন জানানোর অনুরোধ করেছে।
জাতিসংঘের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা বিষয়টি সম্পর্কে অবগত এবং যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বিবেচনা করছেন। বিশেষ প্রতিবেদকেরা উদ্বেগগুলোকে যথার্থ বলে মনে করলে সিউলের কাছে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠাতে পারেন।
২০২১ সালে কোরিয়ার গণমাধ্যম সালিশি আইনের সংশোধন নিয়ে বিতর্কের সময় জাতিসংঘের এক প্রতিবেদক একই ধরনের হস্তক্ষেপ করেছিলেন। ওই সংশোধনীতে মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর সংবাদ প্রকাশকারী গণমাধ্যমের শাস্তি পাঁচ গুণ বাড়ানোর প্রস্তাব ছিল। অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে ডেমোক্রেটিক পার্টির বিলটি প্রত্যাহারে সেই হস্তক্ষেপ ভূমিকা রেখেছিল।
প্রধান বিরোধী দল পিপল পাওয়ার পার্টি বলেছে, তারা সাংবিধানিক আদালতে এখতিয়ার-সংক্রান্ত বিরোধ দায়ের করাসহ আইনি প্রতিকার চাইবে। দলটির ভাষায়, আইনটি “উদার গণতন্ত্রকে শ্বাসরোধ করা একটি অসাংবিধানিক বাক্রোধী আদেশ”।
জুলাইয়ে আইনটি কার্যকর হওয়ার কথা। এর বাস্তবায়নকে প্রভাবিত করতে পারে এমন কয়েকটি ঘটনা সামনে আসতে পারে। জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক এমন পর্যবেক্ষণ জানাতে পারেন, যা কোরীয় সরকারকে আইনটি পুনর্বিবেচনা বা সংশোধনে চাপ দেবে। দেশীয় আইনি চ্যালেঞ্জ সাংবিধানিক আদালত পর্যন্ত গড়াতে পারে। আর কোরিয়া ডিজিটাল বাণিজ্য বাধা নিয়ে দেওয়া প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন করছে বলে ট্রাম্প প্রশাসন মনে করলে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক চাপ আরও বাড়তে পারে।
আইনের সমর্থকদের যুক্তি, মুনাফার উদ্দেশ্যে পরিচালিত ভুয়া খবরের কার্যক্রম ভেঙে দেওয়া এবং ক্ষতিকর ভুল তথ্য থেকে জনগণকে রক্ষার জন্য এসব ব্যবস্থা প্রয়োজন। ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতা জং ছং-রে বলেন, “বিশৃঙ্খলা উসকে দেয় এবং বিদ্বেষমূলক উসকানি থেকে মুনাফা করে—এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন স্বাধীনতাকে লাগামহীনভাবে চলতে দেওয়া যায় না।”
তবে দেশি-বিদেশি সমালোচনা বাড়তে থাকায় আইনটি বাস্তবায়নে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। নিরাপত্তা ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও কোরিয়ার সম্পর্ক শক্তিশালী থাকলেও, ডিজিটাল বাণিজ্যবিরোধ মিত্র দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনার নতুন কারণ হয়ে উঠেছে।
২০২২ সালে প্রণীত ইইউর ডিজিটাল সার্ভিসেস অ্যাক্টেরও দীর্ঘদিন ধরে সমালোচনা করে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। অবৈধ বিষয়বস্তু, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও ভুল তথ্য ঠেকাতে ব্যর্থ হলে কর্তৃপক্ষকে প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর জরিমানা আরোপের ক্ষমতা দেয় এই আইন। নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়া কর্মকর্তাদের প্রচেষ্টার সমালোচনা করে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, তারা “আমেরিকান প্ল্যাটফর্মগুলোকে তাদের বিরোধী মার্কিন দৃষ্টিভঙ্গি সেন্সর, অর্থ উপার্জনের সুযোগ বন্ধ এবং দমন করতে বাধ্য” করতে চেয়েছেন।
কোরিয়ার নেটওয়ার্ক আইন নিয়ে বিরোধের সময় যুক্তরাষ্ট্র এমন এক নীতিগত দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলছে, যাকে বিশ্লেষকেরা “প্রযুক্তি-জাতীয়তাবাদী” বলে অভিহিত করেন। এ প্রবণতায় নির্দিষ্ট কিছু দেশের সঙ্গে প্রযুক্তিগত পারস্পরিক নির্ভরশীলতাকে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা, সমৃদ্ধি ও মূল্যবোধের জন্য হুমকি হিসেবে দেখা হয়। এর মধ্যে গুপ্তচরবৃত্তি, অপতথ্য, নজরদারি ও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় সম্ভাব্য সুবিধা পাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
বিশ্বের শীর্ষ তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি কেন্দ্রগুলোর একটি হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছে দক্ষিণ কোরিয়া। বিশ্বের দ্রুততম ইন্টারনেট গতি এবং প্রযুক্তি-সচেতন গ্রাহকদের সমন্বয়ে দেশটির অত্যাধুনিক আইসিটি অবকাঠামো রয়েছে। স্যামসাং ইলেকট্রনিকস, এসকে হাইনিক্স, এলজি ইলেকট্রনিকস ও নাভারের মতো বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ইলেকট্রনিকস ও আইটি কোম্পানিরও আবাস এই দেশ।
তবে ডিজিটাল উদ্ভাবন ও নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষায় দেশটি চ্যালেঞ্জের মুখে। জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় দৈনিক গড়ে ১২ লাখ হ্যাকিংয়ের চেষ্টা চালানো হয়েছিল। নেটওয়ার্কের উচ্চ সংযুক্তির মাত্রা এবং বিপুল মেধাস্বত্বের কারণে দেশটি সাইবার হামলার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠেছে।
সাইবার নিরাপত্তা ও তথ্য সুরক্ষা যেকোনো সরকারের জন্যই বৈধ উদ্বেগের বিষয়। কোরিয়ার নেটওয়ার্ক আইনের সমালোচকেরা প্রশ্ন তুলছেন, এসব উদ্বেগ মোকাবিলার পাশাপাশি মৌলিক স্বাধীনতা ও উন্মুক্ত ডিজিটাল বাজার অক্ষুণ্ন রাখতে আইনটি কি যথাযথ ভারসাম্য রক্ষা করছে?
মূল বিষয়গুলো
- দক্ষিণ কোরিয়ার সংশোধিত তথ্য ও যোগাযোগ নেটওয়ার্ক আইনের সমালোচনা করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। তাদের সতর্কবার্তা, আইনটি মার্কিন প্রযুক্তি জায়ান্টদের ক্ষতি করে এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে খর্ব করে
- যুক্তরাষ্ট্রের আন্ডার সেক্রেটারি অব স্টেট সারাহ রজার্স বলেছেন, আইনটি নিয়ন্ত্রকদের “দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে সেন্সরশিপ চালানোর জন্য ব্যাপক ক্ষমতা” দেয়
- কোরীয় আইনটি মিথ্যা ও কারসাজি করা তথ্যকে লক্ষ্য করে। এতে ক্ষতির সর্বোচ্চ পাঁচ গুণ পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ আরোপের সুযোগ রয়েছে এবং প্ল্যাটফর্ম পরিচালকেরা বিষয়বস্তু সরানো ও অ্যাকাউন্ট স্থগিত করতে পারেন
- সমালোচকদের মতে, “মিথ্যা” ও “কারসাজি করা” তথ্যের সংজ্ঞা অতিরিক্ত বিস্তৃত এবং আইনটি খেয়ালখুশিমতো প্রয়োগের সুযোগ তৈরি করতে পারে
- আইনটি ইইউর ডিজিটাল সার্ভিসেস অ্যাক্টের আদলে তৈরি, যে আইনেরও সমালোচনা করেছে যুক্তরাষ্ট্র
- গত মাসে ডিএসএ প্রণয়নে যুক্ত পাঁচ ইইউ কর্মকর্তার ওপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্র
- নেটওয়ার্ক ব্যবহারের ফি ও তথ্য রপ্তানিতে বিধিনিষেধসহ ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও কোরিয়ার বৃহত্তর উত্তেজনার মধ্যে এই বিরোধ দেখা দিয়েছে
- গত নভেম্বরের যৌথ তথ্যপত্রে ডিজিটাল পরিষেবার ক্ষেত্রে মার্কিন কোম্পানিগুলোর ওপর “কোনো অপ্রয়োজনীয় বাধা” না দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দুই দেশ
- কোরিয়ার অভ্যন্তরেও আইনটির বিরোধিতা রয়েছে। প্রগতিশীল দলগুলো সতর্ক করেছে, রাজনৈতিক বক্তব্য দমনে এর অপব্যবহার হতে পারে
- কোরীয় নাগরিক গোষ্ঠীগুলোর আইন-সংক্রান্ত আবেদন পর্যালোচনা করছে জাতিসংঘ
- জুলাইয়ে আইনটি কার্যকর হওয়ার কথা। তার আগে সংশোধন, আইনি চ্যালেঞ্জ বা কূটনৈতিক আলোচনার সুযোগ রয়েছে






