অপ্রাপ্তবয়স্কদের সুরক্ষায় ব্যাপক এআই বিধিমালা প্রকাশ চীনের
চ্যাটবটের সঙ্গে কথোপকথনের সম্ভাব্য বিপদ থেকে শিশুদের সুরক্ষায় খসড়া বিধিমালা প্রকাশ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) পরিচালনায় নির্ণায়ক পদক্ষেপ নিয়েছে চীন। মানবসদৃশ কথোপকথনের সুযোগ দেওয়া এআই সেবার দ্রুত বিস্তার লক্ষ্য করে সাইবারস্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব চায়না (সিএসি) সপ্তাহান্তে প্রস্তাবিত বিধিমালাটি প্রকাশ করে। জেনারেটিভ এআইয়ের নিরাপত্তা ও নৈতিক প্রভাব নিয়ে বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি শিল্প যখন তীব্র নজরদারির মুখে, তখন এ ব্যবস্থা নেওয়া হলো। খসড়া বিধিমালায় বিশেষভাবে উদ্বেগ জানানো হয়েছে, চ্যাটবটের পরামর্শে আত্মহানি, সহিংসতা বা অন্যান্য ক্ষতিকর আচরণে উৎসাহিত হওয়ার ঝুঁকি নিয়ে, বিশেষ করে তরুণ ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে।
সূচিপত্র
এ ঘোষণার মধ্য দিয়ে এআই নিয়ন্ত্রণে বড় ধরনের জোরালো পদক্ষেপ নেওয়া হলো। সাধারণ বিষয়বস্তু নিয়ন্ত্রণের গণ্ডি পেরিয়ে এবার অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সুনির্দিষ্ট সুরক্ষাব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। প্রস্তাবিত কাঠামোর অধীনে, এআই মডেল যেন আত্মহত্যায় উৎসাহ দেয়, জুয়াকে উৎসাহিত করে বা সহিংসতায় উসকানি দেয়—এমন কনটেন্ট তৈরি না করে তা নিশ্চিত করতে কঠোর সুরক্ষাব্যবস্থা বাস্তবায়ন ডেভেলপারদের জন্য আইনত বাধ্যতামূলক হবে। দৈনন্দিন জীবনে এআই ব্যবস্থার ক্রমবর্ধমান সম্পৃক্ততা এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ওপর এর সম্ভাব্য মানসিক প্রভাব নিয়ে বাড়তে থাকা উদ্বেগেরই প্রতিফলন এই নিয়ন্ত্রণমূলক উদ্যোগ।
ক্ষতিকর প্রভাব কমানোর লক্ষ্য থাকলেও, ডিজিটাল পরিসরে কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার সরকারের অভিপ্রায়ও এতে স্পষ্ট। সিএসি জানিয়েছে, ইতিবাচক কাজে প্রযুক্তির ব্যবহার উৎসাহিত করার পাশাপাশি সেটিকে নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য রাখাই বিধিমালার উদ্দেশ্য। চূড়ান্ত করার আগে জনমত চাওয়া হয়েছে, যা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ দিচ্ছে। কার্যকর হলে চীনে পরিচালিত সব এআই পণ্য ও সেবার ক্ষেত্রে এ বিধিমালা প্রযোজ্য হবে এবং দেশি-বিদেশি সব প্রতিষ্ঠানের জন্য কঠোর মানদণ্ড তৈরি করবে।
এআই ডেভেলপার ও অভিভাবকদের জন্য নতুন বাধ্যবাধকতা
খসড়া আইনে অভিভাবকের তদারকি এবং সরাসরি মানুষের হস্তক্ষেপের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সিএসির ভাষ্য অনুযায়ী, অপ্রাপ্তবয়স্কদের আবেগগত সঙ্গ দেওয়ার সেবা শুরুর আগে অভিভাবকের সম্মতি নেওয়া বাধ্যতামূলক করতে ডেভেলপারদের ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। এ শর্তে এআই চরিত্রের সঙ্গে তরুণদের গভীর, প্রায়ই নির্ভরশীল, আবেগগত সম্পর্ক গড়ে ওঠার ক্রমবর্ধমান প্রবণতাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া শিশুদের জন্য ব্যবহারের সময়সীমা কার্যকর করতে হবে প্ল্যাটফর্মগুলোকে। অতিরিক্তভাবে নিমগ্ন হয়ে পড়া ঠেকানোই এর উদ্দেশ্য, যা আসক্তি বা সামাজিক বিচ্ছিন্নতার কারণ হতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্তগুলোর একটি হলো আত্মহানি বা আত্মহত্যার চিন্তা শনাক্ত করা। কথোপকথনে আত্মহত্যা বা আত্মহানির প্রসঙ্গ এলে নিয়ম অনুযায়ী একজন মানব অপারেটরকে অবিলম্বে কথোপকথনের দায়িত্ব নিতে হবে। পাশাপাশি, এআই সেবাদাতাকে দেরি না করে ব্যবহারকারীর অভিভাবক বা নির্ধারিত জরুরি যোগাযোগব্যক্তিকে জানাতে হবে। “মানুষের তদারকিসহ” এই পদ্ধতির লক্ষ্য, সংবেদনশীল মানসিক স্বাস্থ্য সংকটে অ্যালগরিদমের প্রতিক্রিয়ার ওপর ছেড়ে না দিয়ে যথাযথভাবে ব্যবস্থা নেওয়া।
ব্যবহারকারীরা বয়স ঠিকভাবে না জানালেও অপ্রাপ্তবয়স্কদের শনাক্ত করার দায়িত্বও প্ল্যাটফর্মগুলোর। ব্যবহারকারীর বয়স নিয়ে সন্দেহ থাকলে, ব্যবস্থাটিকে অপ্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী সুরক্ষামূলক সেটিংস চালু করতে হবে। প্রস্তাবিত বিধিমালায় টানা দুই ঘণ্টা ব্যবহারের পর ব্যবহারকারীকে সতর্ক করার মতো কারিগরি শর্তও রয়েছে, যা কার্যকরভাবে স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করবে। এসব ব্যবস্থার সম্মিলিত লক্ষ্য এমন ডিজিটাল পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে শিশুকল্যাণের বিনিময়ে উদ্ভাবন এগোবে না।
আবেগগত সুরক্ষার দিকে ঝোঁক
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনে এআই নিরাপত্তার ধারণায় মৌলিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে নতুন বিধিমালা। এনওয়াইইউ স্কুল অব ল-এর সংযুক্ত অধ্যাপক উইনস্টন মা বলেন, সর্বশেষ প্রস্তাবে বিষয়বস্তুর নিরাপত্তা থেকে আবেগগত নিরাপত্তায় উত্তরণের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। আগের বিধিমালায় এআই কী তথ্য তৈরি করতে পারে, তাতে জোর দেওয়া হলেও নতুন বিধিমালায় এআই কীভাবে ব্যবহারকারীর আবেগ ও আচরণকে প্রভাবিত করে, তা বিবেচনা করা হয়েছে। মানুষের ব্যক্তিত্বের অনুকরণ করে লেখা, অডিও বা ভিডিওর মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার জন্য তৈরি চ্যাটবটের ক্ষেত্রে এ পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যবহারকারীর মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে পারে এমন মৌখিক সহিংসতা ও আবেগগত প্রভাব বিস্তার বিধিমালায় স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর মধ্যে অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য মনস্তাত্ত্বিকভাবে ক্ষতিকর হতে পারে—এমন নিমগ্ন রোমান্টিক ভূমিকাভিনয় বা সম্পর্ক গড়ে তোলায় এআইকে বাধা দেওয়াও রয়েছে। সিএসির নথিতে বলা হয়েছে, চ্যাটবটের এমন কনটেন্ট তৈরি করা যাবে না, যা খাদ্যাভ্যাসের অসুস্থতা উসকে দেয় বা ক্ষতিকর ভ্রান্ত ধারণাকে জোরদার করে। এসব নির্দিষ্ট আচরণকে লক্ষ্য করে নিয়ন্ত্রকেরা এআই কীভাবে মানুষের মনস্তত্ত্বে সূক্ষ্ম অথচ নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, তা মোকাবিলা করছেন। এতে কেবল নির্দিষ্ট শব্দ শনাক্ত করে কনটেন্ট ফিল্টার করার গণ্ডি পেরোনো হয়েছে।
এআই সঙ্গীদের ক্রমবর্ধমান প্রভাব
চীনসহ বিশ্বজুড়ে এআই সঙ্গী সেবার বাজার দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় বিধিমালা প্রণয়নের তাগিদ তৈরি হয়েছে। দেশীয় এআই প্রতিষ্ঠান ডিপসিক এ বছর অ্যাপ ডাউনলোডের তালিকার শীর্ষে উঠে বিশ্বজুড়ে আলোচনায় আসে, যা বুদ্ধিমান ডিজিটাল সহকারীর প্রতি বিপুল জনআগ্রহের ইঙ্গিত দেয়। জেড.এআই ও মিনিম্যাক্সের মতো স্টার্টআপও কোটি কোটি ব্যবহারকারী পেয়েছে। মিনিম্যাক্সের টকির এআই অ্যাপের মাসিক সক্রিয় ব্যবহারকারী গড়ে ২ কোটির বেশি। এসব প্ল্যাটফর্মে ব্যবহারকারীরা ভার্চুয়াল চরিত্রের সঙ্গে কথা বলতে পারেন; প্রায়ই বিনোদন, সঙ্গ বা এমনকি অনানুষ্ঠানিক থেরাপির জন্য এগুলো ব্যবহার করেন।
এ মাসে জেড.এআই ও মিনিম্যাক্স—দুই প্রতিষ্ঠানই হংকংয়ে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেছে, যা এ খাতের বাণিজ্যিক সম্ভাবনাকে তুলে ধরে। জিপু নামেও পরিচিত জেড.এআই জানিয়েছে, তাদের প্রযুক্তি স্মার্টফোন ও স্মার্ট যানবাহনসহ প্রায় ৮ কোটি ডিভাইসে ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সাফল্য এক ধরনের বৈপরীত্যও তুলে ধরে। এআই সঙ্গীদের লাভজনক করে তুলেছে যে বৈশিষ্ট্যগুলো—যেমন আকর্ষণীয় আবেগগত সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষমতা—সেগুলোকেই নিয়ন্ত্রকেরা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছেন।
একাকিত্ব বা মানসিক কষ্টের সময় অনেকে সান্ত্বনা পেতে এসব চ্যাটবটের দ্বারস্থ হন। জাপানে এক নারী এআই প্রেমিককে বিয়ে করে আলোচনায় এসেছিলেন, যা কিছু ব্যবহারকারীর অনুভূত সম্পর্কের গভীরতা তুলে ধরে। বয়স্কদের সঙ্গ দেওয়া ও সংস্কৃতি প্রচারে এআই ব্যবহারে সিএসি উৎসাহ দিলেও, অপ্রাপ্তবয়স্কদের আবেগ নিয়ে কারসাজির ক্ষেত্রে খসড়া বিধিমালা কঠোর অবস্থান নিয়েছে। নিয়ন্ত্রকদের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো, ব্যবহারকারীদের আবেগগত দুর্বলতার সুযোগ প্রযুক্তি যেন না নেয় তা নিশ্চিত করে এ শিল্পের বিকাশের সুযোগ রাখা।
মানসিক স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ
মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর এআইয়ের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ শুধু চীনে সীমাবদ্ধ নয়। যুক্তরাষ্ট্রে কয়েকটি বহুল আলোচিত ঘটনার পর প্রযুক্তিটি আইনি ও নিয়ন্ত্রণমূলক চাপের মুখে পড়েছে। আগস্টে ক্যালিফোর্নিয়ার একটি পরিবার চ্যাটজিপিটির নির্মাতা ওপেনএআইয়ের বিরুদ্ধে মামলা করে। তাদের ১৬ বছর বয়সী ছেলের মৃত্যুর জন্য প্রতিষ্ঠানটিকে দায়ী করে এ মামলা করা হয়। মামলায় অভিযোগ, চ্যাটবটটি কিশোরকে আত্মহত্যায় উৎসাহ দিয়েছিল। কোনো এআই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অন্যায়ভাবে মৃত্যুর কারণ হওয়ার অভিযোগে এটিই এ ধরনের প্রথম আইনি পদক্ষেপ।
ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন, আত্মহানির প্রসঙ্গ থাকা কথোপকথনে চ্যাটবট কীভাবে সাড়া দেবে, তা সামলানো কঠিন। সেপ্টেম্বরে তিনি বলেন, এ ধরনের কথোপকথন সামলানো প্রতিষ্ঠানটির সামনে থাকা সবচেয়ে কঠিন বিষয়গুলোর একটি। এসব চাপের জবাবে ওপেনএআই এ মাসে “প্রস্তুতি বিভাগের প্রধান” পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে। এ পদে থাকা ব্যক্তির দায়িত্ব হবে মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য ও সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকি মোকাবিলা করা। অল্টম্যান বলেন, পদটি চাপের হবে এবং নির্বাচিত প্রার্থীকে শুরু থেকেই কঠিন পরিস্থিতির মোকাবিলায় নামতে হবে।
“এটি চাপের কাজ হবে, আর আপনাকে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই কঠিন পরিস্থিতিতে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে,” এআইয়ের ঝুঁকি পর্যবেক্ষণের নতুন পদটি নিয়ে বলেন মি. অল্টম্যান।
অন্যদিকে, ভার্চুয়াল চরিত্রের সঙ্গে যোগাযোগের প্ল্যাটফর্ম ক্যারেক্টার.এআইয়ের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে মামলা করেছেন আত্মহত্যায় মারা যাওয়া ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরের মা। মামলায় অভিযোগ, সাইটটিতে এআই সঙ্গীর সঙ্গে দীর্ঘ সময়ের কথোপকথন এ মর্মান্তিক ঘটনার পেছনে ভূমিকা রেখেছে। এসব ঘটনা এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আরও কঠোর নজরদারির দাবি জোরালো করেছে এবং সম্ভবত বিশ্বজুড়ে নিয়ন্ত্রণমূলক নীতিমালাকে প্রভাবিত করেছে।
চীনের বাইরেও নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার এআইয়ের ঝুঁকি মোকাবিলায় পদক্ষেপ নিচ্ছে, যদিও তাদের পদ্ধতি ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্রে ফেডারেল ট্রেড কমিশন (এফটিসি) বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে শিশুদের চ্যাটবট থেকে সুরক্ষিত রাখছে, তা জানতে তদন্ত শুরু করেছে। এফটিসি অ্যালফাবেট, মেটা, ওপেনএআই ও স্ন্যাপসহ সাতটি প্রতিষ্ঠানকে তাদের এআই সেবা যেন অপ্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষতি না করে, সে জন্য নেওয়া পদক্ষেপের বিস্তারিত জানাতে নির্দেশ দিয়েছে। চ্যাটবট সঙ্গীর ভূমিকায় থাকলে প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে নিরাপত্তা যাচাই করে এবং শিশুদের অনলাইন গোপনীয়তা সুরক্ষা আইনের শর্ত মানতে কী পদক্ষেপ নেয়, তা বিশেষভাবে জানতে চায় সংস্থাটি।
অস্ট্রেলিয়া আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে। দেশটির ই-সেফটি কমিশনার সম্প্রতি চারটি এআই চ্যাটবট প্রতিষ্ঠানকে শিশুদের যৌন বিষয়বস্তু বা আত্মহানিসংক্রান্ত উপাদানের সংস্পর্শ থেকে সুরক্ষায় তাদের ব্যবস্থা ব্যাখ্যা করতে নির্দেশ দিয়েছেন। ক্যারেক্টার টেকনোলজিস, গ্লিম্পস.এআই, চাই রিসার্চ ও চাব এআইকে নোটিশ পাঠিয়ে শিশু শোষণ এবং আত্মহত্যায় উৎসাহ দেয় এমন কনটেন্ট ঠেকানোর সুরক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাওয়া হয়েছে। কমিশনার জুলি ইনম্যান গ্রান্ট এসব সেবার অন্ধকার দিক তুলে ধরে বলেন, অনেক চ্যাটবট অপ্রাপ্তবয়স্কদের সঙ্গে যৌনভাবে স্পষ্ট কথোপকথনে অংশ নিতে সক্ষম।
“উদ্বেগ জানানো হয়েছে যে এগুলো আত্মহত্যা, আত্মহানি ও খাদ্যাভ্যাসের অসুস্থতায়ও উৎসাহ দিতে পারে,” বর্তমান চ্যাটবট সেবাগুলোর সক্ষমতা সম্পর্কে এক বিবৃতিতে বলেন কমিশনার জুলি ইনম্যান গ্রান্ট।
বিশ্বের কঠোরতম নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাগুলোর একটি রয়েছে অস্ট্রেলিয়ায়। নিয়ম না মানলে কমিশনারকে দৈনিক সর্বোচ্চ ৮ লাখ ২৫ হাজার অস্ট্রেলীয় ডলার জরিমানা করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। ডিসেম্বর থেকে অস্ট্রেলিয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোকে ১৬ বছরের কম বয়সী ব্যবহারকারীদের অ্যাকাউন্ট নিষ্ক্রিয় করতে হবে, নইলে বড় অঙ্কের জরিমানার মুখে পড়তে হবে। এসব আন্তর্জাতিক উদ্যোগে শিশু সুরক্ষায় চীনের মনোযোগের প্রতিফলন রয়েছে। এতে বোঝা যায়, তরুণদের লক্ষ্য করে তৈরি এআই প্রযুক্তির লাগাম টানার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে ঐকমত্য গড়ে উঠছে।
সমালোচনার জবাবে ওপেনএআইও নিজেদের নিয়ম কঠোর করেছে। ১৮ বছরের কম বয়সী ব্যবহারকারীদের জন্য আচরণবিধি সম্প্রতি হালনাগাদ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এতে নিমগ্ন রোমান্টিক ভূমিকাভিনয় বন্ধ করা হয়েছে এবং শরীর নিয়ে ধারণা-সম্পর্কিত আলোচনায় বাড়তি সতর্কতা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। নতুন মডেল স্পেকে ব্যবহারকারীর স্বায়ত্তশাসনের চেয়ে কিশোরদের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। অভিভাবকদের কাছ থেকে ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ লুকাতে কিশোরদের সহায়তা করে—এমন পরামর্শও এড়ানো হয়েছে। কিছু অধিকারকর্মী এসব পদক্ষেপকে স্বাগত জানালেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লিখিত নিয়ম ধারাবাহিকভাবে মানা হচ্ছে—তার প্রমাণ নয়। ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবহারকারীদের সঙ্গে বাস্তব সময়ের কথোপকথনে এ ব্যবস্থাগুলো কীভাবে কাজ করে, সেটিই হবে প্রকৃত পরীক্ষা।
কঠোর তদারকির সঙ্গে উদ্ভাবনের ভারসাম্য
চীনের প্রস্তাবিত বিধিমালা কঠোর হলেও, পুরো শিল্পকে দমিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে তা তৈরি করা হয়নি। স্থানীয় সংস্কৃতির প্রচার এবং বয়স্কদের সঙ্গ দেওয়ার উপযোগী সরঞ্জাম তৈরির মতো ইতিবাচক কাজে এআই গ্রহণে সিএসি স্পষ্টভাবে উৎসাহ দিয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি বলেছে, প্রযুক্তিকে নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য হতে হবে। অর্থাৎ, নতুন নিয়মের মধ্যেও দায়িত্বশীল উন্নয়নের সুযোগ থাকবে। জাতীয় মান মেনে চলার পাশাপাশি বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করতে সক্ষম দেশীয় এআই শিল্প গড়ে তোলাই এ ভারসাম্যপূর্ণ পদ্ধতির লক্ষ্য।
তবে এ বিধিমালায় দীর্ঘদিনের বিষয়বস্তু নিয়ন্ত্রণও আরও জোরদার করা হয়েছে। এআই সেবাদাতাদের নিশ্চিত করতে হবে, তাদের সেবায় জাতীয় নিরাপত্তা বিপন্ন করে, জাতীয় ঐক্য ক্ষুণ্ন করে বা চীনের জাতীয় মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে—এমন কনটেন্ট তৈরি বা ছড়ানো হবে না। নতুন এআই সরঞ্জাম প্রকাশের আগে প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিরাপত্তা পর্যালোচনা করাতে হবে এবং স্থানীয় সরকারি সংস্থায় প্রতিবেদন দিতে হবে। ১০ লাখের বেশি নিবন্ধিত ব্যবহারকারী বা মাসে ১ লাখের বেশি সক্রিয় ব্যবহারকারী থাকা চ্যাটবটের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা মূল্যায়ন করতে হবে।
দ্রুত প্রসারিত হতে চাওয়া স্টার্টআপগুলোর জন্য এসব শর্ত চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। নিয়ম মেনে চলা, মানুষের হস্তক্ষেপকারী দল গঠন এবং নিরাপত্তা পর্যালোচনার খরচ অনেক হতে পারে। তবে চীনা সরকারের কাছে লাগামহীন প্রবৃদ্ধির চেয়ে সামাজিক স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং অপ্রাপ্তবয়স্কদের সুরক্ষা বেশি অগ্রাধিকার পাচ্ছে বলে মনে হয়। ২৫ জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত খসড়া বিধিমালায় জনমত জানানো যাবে, ফলে এআই পরিচালনার নতুন বাস্তবতার জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার সময় পাবেন সংশ্লিষ্টরা।
মূল কথা
- অপ্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষতিকর কনটেন্ট থেকে সুরক্ষায় এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য খসড়া বিধিমালা প্রস্তাব করেছে চীনের সাইবারস্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন।
- আত্মহত্যা বা আত্মহানিসংক্রান্ত কথোপকথনের দায়িত্ব চ্যাটবটকে একজন মানুষের হাতে দিতে হবে এবং অবিলম্বে অভিভাবককে জানাতে হবে।
- অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে অভিভাবকের সম্মতি, ব্যবহারের সময়সীমা এবং বয়স শনাক্তকরণ ব্যবস্থা চালু করতে হবে ডেভেলপারদের।
- জুয়া, সহিংসতা বা মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে এমন আবেগগত প্রভাব বিস্তারকারী কনটেন্ট নিষিদ্ধ করেছে বিধিমালা।
- শিল্পের দ্রুত প্রবৃদ্ধির মধ্যে চীনা এআই স্টার্টআপ জেড.এআই ও মিনিম্যাক্স আইপিওর পরিকল্পনা করছে।
- যুক্তরাষ্ট্রের এফটিসি ও অস্ট্রেলিয়ার কর্তৃপক্ষসহ বিশ্বের বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থা শিশুদের নিরাপত্তায় এআইয়ের ব্যবহার খতিয়ে দেখছে।
- ক্যালিফোর্নিয়ায় অন্যায়ভাবে মৃত্যুর কারণ হওয়ার অভিযোগে মামলার মুখে ওপেনএআই; কিশোর ব্যবহারকারীদের জন্য নিরাপত্তা নির্দেশিকাও হালনাগাদ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।






