অগ্রগতি ও অবক্ষয়ের বৈপরীত্য
ভারতের শহরগুলোতে এক বিস্ময়কর বৈপরীত্য দেখা যায়। একদিকে, দেশটি জাতীয় অবকাঠামোর আমূল পরিবর্তনে শত শত কোটি ডলার ব্যয় করেছে; নির্মাণ করেছে ঝকঝকে বিমানবন্দর, বহু লেনের জাতীয় মহাসড়ক এবং বড় বড় নগরকেন্দ্রে মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক। অন্যদিকে, একই শহরগুলো বৈশ্বিক বসবাসযোগ্যতা সূচকে তলানির দিকে রয়েছে—যানজটে অবরুদ্ধ, দুর্গন্ধময় বাতাসে আচ্ছন্ন এবং অপসারণ না করা আবর্জনার স্তূপে ভরা। অবকাঠামোতে বিপুল ব্যয় আর জীবনযাত্রার মানের অবনতির এই ফারাক সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চরমে পৌঁছেছে। বেঙ্গালুরু, মুম্বাই ও দিল্লির মতো শহরে অবনতিশীল পরিস্থিতির প্রতিবাদে নাগরিকেরা বিরল বিক্ষোভ ও প্রকাশ্য ক্ষোভ দেখিয়েছেন। প্রশ্নটি ক্রমেই জরুরি হয়ে উঠছে: ভারতের দ্রুত জিডিপি প্রবৃদ্ধি কেন তার জরাজীর্ণ শহরগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারছে না?
সূচিপত্র
- অগ্রগতি ও অবক্ষয়ের বৈপরীত্য
- সংকটের মূলে শাসনব্যবস্থার ঘাটতি
- বড় শহরগুলোতে নগর অবক্ষয়
- মুম্বাইয়ে গর্তের প্রতিবাদ
- জলবায়ু সংকটে নগর ব্যর্থতা আরও তীব্র
- কোটিপতিদের দেশত্যাগ গভীরতর সংকটের ইঙ্গিত
- স্মার্ট সিটিজ মিশন: সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা
- ভারতের নগর সংকটের ব্যাপ্তি
- অবকাঠামো ও সেবা প্রদানে ব্যর্থতা
- নগর সংকটের স্থায়িত্ব
- নগর রূপান্তরের সম্ভাব্য পথ
- উপলব্ধির চক্র
- মূল কথা
সংকটের মূলে শাসনব্যবস্থার ঘাটতি
ভারতের নগর সংকটের মূল কারণ একটি মৌলিক ঐতিহাসিক অবহেলা। ভারতীয় সংবিধান প্রণয়নের সময় কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের কথা বলা হলেও, শহরগুলো এত বিশাল হয়ে উঠবে যে তাদের জন্য পৃথক শাসন কাঠামোর প্রয়োজন হবে—এটি বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন থিংক ট্যাংকের বিশিষ্ট ফেলো রামনাথ ঝা ব্যাখ্যা করেন, অন্য দেশগুলোর তুলনায় ভারতের নগর শাসনব্যবস্থা এখনো খণ্ডিত ও অকার্যকর।
“ভারতের শহর পরিচালনাকারী মেয়র ও স্থানীয় পরিষদগুলো রাষ্ট্রের সবচেয়ে দুর্বল অঙ্গ; তারা নাগরিকদের সবচেয়ে কাছের, অথচ সমাধানের জন্য সবচেয়ে কঠিন সমস্যাগুলোর দায়িত্ব তাদেরই দেওয়া হয়,” বলেন ভারতের পয়োনিষ্কাশন সমস্যার ইতিহাস নিয়ে লেখা Wasted বইয়ের লেখক অঙ্কুর বিসেন।
চীনের পরিস্থিতি এর সম্পূর্ণ বিপরীত। সেখানে নগর পরিকল্পনা, অবকাঠামো ও বিনিয়োগ অনুমোদনের ওপর নিয়ন্ত্রণসহ শহরের মেয়রদের উল্লেখযোগ্য নির্বাহী ক্ষমতা রয়েছে। চীন অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত পরিকল্পনা মডেল অনুসরণ করে, যেখানে জাতীয় পর্যায়ে শক্তিশালী নির্দেশনা থাকলেও স্থানীয় সরকারগুলো বাস্তবায়নে স্বাধীনতা পায় এবং কাজের ফলাফলের ভিত্তিতে পুরস্কার ও শাস্তির মুখোমুখি হয়। বড় শহরগুলোর চীনা মেয়রদের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষ কমিটিতে প্রভাবশালী পৃষ্ঠপোষক থাকেন। ফলে এসব পদে থাকা পরবর্তী পদোন্নতির গুরুত্বপূর্ণ সোপান। বিপরীতে, ভারতে বড় শহরগুলোর মেয়রদের নামও বলতে পারেন—এমন নাগরিকের সংখ্যা খুব কম।
১৯৯২ সালে সংবিধানের ৭৪তম সংশোধনীর মাধ্যমে “অবশেষে শহরগুলোকে নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সুযোগ” দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। স্থানীয় সংস্থাগুলোকে সাংবিধানিক মর্যাদা দেওয়া হয় এবং নগর শাসন বিকেন্দ্রীকরণ করা হয়। তবে অনেক বিধানই কখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। আমলাতন্ত্র ও সরকারের উচ্চপর্যায়ের স্বার্থসংশ্লিষ্ট মহল ক্ষমতা হস্তান্তর এবং স্থানীয় সংস্থাগুলোকে ক্ষমতায়নের পথে বাধা দেয়। এর বদলে, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরা কার্যত সুপার মেয়রের মতো আচরণ করেন এবং সব সিদ্ধান্ত নিজেরাই নেন।
বড় শহরগুলোতে নগর অবক্ষয়
শাসনব্যবস্থার এই ব্যর্থতার চিত্র ভারতের নগরজুড়েই স্পষ্ট। জয়পুরে শতাব্দীপ্রাচীন স্থাপত্য তামাকের দাগে বিকৃত হচ্ছে, পাশাপাশি জায়গা ভাগাভাগি করছে গাড়ি মেরামতের ওয়ার্কশপের সঙ্গে। শহরটির অবক্ষয় নগর পরিস্থিতি নিয়ে এক ধরনের নিরুপায় হতাশার প্রতিফলন, যা শুধু জয়পুর নয়, ভারতের বহু শহরকেই ভোগাচ্ছে।
বহু আইটি কোম্পানি ও স্টার্টআপের সদর দপ্তর থাকায় ভারতের সিলিকন ভ্যালি নামে পরিচিত বেঙ্গালুরুর বসবাসযোগ্যতার মান নাটকীয়ভাবে কমেছে। ১৯৫১ সালে শহরটির জনসংখ্যা ছিল ১০ লাখের কম। ২০২১ সালে তা বেড়ে ১ কোটি ২৭ লাখ ৬০ হাজারে দাঁড়ায় এবং বর্তমানে আনুমানিক ১ কোটি ৪০ লাখ। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে মানুষের ঘনত্ব ও নির্মিত স্থাপনার ঘনত্বও বেড়েছে, যা তাপমাত্রা বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে। ২০২৪ সালে কর্ণাটক রাজ্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র জানায়, শহরের তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে ২০২৪ সালের ৩০ এপ্রিল ৪১ দশমিক ৮ ডিগ্রিতে পৌঁছেছিল।
বেঙ্গালুরুতে এখন পানীয় জলের তীব্র সংকট। গত গ্রীষ্মে কর্ণাটকের মুখ্যমন্ত্রী জানান, শহরে দৈনিক ৫০ কোটি লিটার পানির ঘাটতি রয়েছে, যা মোট চাহিদার এক-পঞ্চমাংশ। নাগরিকদের একাংশকে ব্যয়বহুল পানির ট্যাংকারের ওপর নির্ভর করতে হয়। জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে পানির চাহিদাও বাড়ে, ফলে ভূগর্ভস্থ পানি আরও বেশি তোলা হয়, পানির স্তর নেমে যায় এবং কুয়াগুলো শুকিয়ে যায়।
বেঙ্গালুরুর যানজট এখন কুখ্যাত। টমটমের ২০২৩ সালের বৈশ্বিক যানজট সূচকে বেঙ্গালুরু ভারতের সবচেয়ে যানজটপূর্ণ এবং বিশ্বে ষষ্ঠ যানজটপূর্ণ শহর হিসেবে স্থান পায়। ঘণ্টায় গড়ে ১৮ কিলোমিটার গতিতে ১০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে সময় লাগে ২৮ মিনিট ৩০ সেকেন্ড। ২০২২ সালের তুলনায় এটি এক মিনিট বেশি, যা পরিস্থিতির অবনতির ইঙ্গিত দেয়।
মুম্বাইয়ে গর্তের প্রতিবাদ
আর্থিক রাজধানী মুম্বাইয়ে সড়কের গর্তের অবনতিশীল সমস্যা নিয়ে নাগরিকেরা বিক্ষোভ করেছেন। দীর্ঘায়িত বর্ষায় বন্ধ নর্দমা থেকে আবর্জনা উপচে প্লাবিত সড়কে জমেছে। ১৯৯০-এর দশকে প্রকাশ্যে আরেকটি সাংহাই হয়ে ওঠার স্বপ্ন দেখা শহরটি এখনো সেই উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারেনি। এর কারণ জমির আকাশচুম্বী দাম, সাশ্রয়ী আবাসনের অভাব, অসহনীয় জনঘনত্ব এবং জীবনযাত্রার মানের অবনতি।
নগর প্লাবনে অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ বছরে আনুমানিক ৪০০ কোটি ডলার। দিল্লিতে দূষণজনিত ক্ষতি জিডিপির ৬ শতাংশ পর্যন্ত। ভারতের বড় শহরগুলোতে প্রায় ৭ শতাংশ মৃত্যুর কারণ বায়ুদূষণ। যানজট, খারাপ বায়ুর মান এবং দূষিত পানি ও বাতাসের মাধ্যমে ছড়ানো রোগের কারণে কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ায় এই বোঝা আরও বাড়ে।
জলবায়ু সংকটে নগর ব্যর্থতা আরও তীব্র
জলবায়ু পরিবর্তন ভারতের নগর সমস্যাগুলোকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। নথিভুক্ত ইতিহাসে দেশের ১৫টি উষ্ণতম বছরের মধ্যে ১০টিই ঘটেছে গত দেড় দশকে। ২০২৪ সালে নয়াদিল্লিতে টানা পুরো এক মাস দিনের তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে ছিল। আর্দ্রতা থাকলে অনুভূত তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি পর্যন্ত বেশি হতে পারে। এই তাপমাত্রা রেল ও বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে, ব্যাহত করতে পারে রপ্তানি এবং বন্ধ করে দিতে পারে কারখানা।
গবেষকেরা যাকে “তাপজনিত চাপ” বলেন, ভারতে তার প্রভাব দ্রুত বাড়ছে। কর্মশক্তির প্রায় তিন-চতুর্থাংশ বাইরে অথবা শীতলীকরণের সামান্য বা কোনো ব্যবস্থাই নেই—এমন ঘরের ভেতরে কাজ করেন। তাঁদের অনেকেই অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। হিটস্ট্রোক বা পানিশূন্যতায় তাঁরা অসুস্থ হয়ে পড়লে বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় আয় হারান এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও অবদান রাখতে পারেন না। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, দশকের শেষ নাগাদ তাপজনিত চাপ ভারতের বার্ষিক উৎপাদনশীলতা ৩ কোটি ৪০ লাখ পূর্ণকালীন চাকরির সমপরিমাণ কমিয়ে দেবে।
তাপ শরীরের কোনো অঙ্গকেই রেহাই দেয় না,” বলেন অনুগ্রহ নারায়ণ মগধ মেডিকেল কলেজের তাপ-প্রতিক্রিয়া বিভাগের পরিচালক কমলেশ কুমার। “কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র থেকে শুরু করে হৃদ্যন্ত্র, পেশি, কিডনি ও যকৃৎ—সবকিছুই ঝুঁকিতে থাকে।
ধুলোময় সড়ক এবং প্রায় অনুপস্থিত সবুজ পরিসরসহ দ্রুত বেড়ে ওঠা প্রাদেশিক শহরগুলোতে ঝুঁকি বিশেষভাবে গুরুতর। শিশু ও বয়স্করা প্রথমে ভোগেন, এরপর সুস্থ প্রাপ্তবয়স্করাও আক্রান্ত হন। শুধু বিহারেই ২০১৯ সালের তাপপ্রবাহে অন্তত ২১৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল। গত বছরের জাতীয় নির্বাচনের সময় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১০ জন ভোটকর্মী স্পষ্টতই হিটস্ট্রোকে মারা যান। এসব সংখ্যা প্রায় নিশ্চিতভাবেই প্রকৃত চিত্রের চেয়ে অনেক কম, কারণ তাপ প্রায়ই আগে থেকেই থাকা রোগের অবনতি ঘটায়, অথচ পরে মৃত্যুর কারণ হিসেবে সেই রোগের নামই নথিভুক্ত হয়।
কোটিপতিদের দেশত্যাগ গভীরতর সংকটের ইঙ্গিত
নগর বসবাসযোগ্যতার সংকট এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সম্পদ দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে ভারত থেকে কোটিপতিদের অভিবাসন উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। ২০২৩ সালে ৩০ লাখ ডলারের বেশি সম্পদের মালিক ২ লাখ ৮৩ হাজার ভারতীয় দেশ ছেড়েছেন। ২০২৮ সালের মধ্যে ৪ হাজার কোটি ডলারের বেশি মোট সম্পদের মালিক ৪ লাখ ৩০ হাজার ব্যক্তি দেশ ছেড়ে যেতে পারেন। কোটাক প্রাইভেট ও আর্নস্ট অ্যান্ড ইয়ংয়ের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ভারতের অতি-ধনীদের ২২ শতাংশ দেশ ছাড়ার কথা ভাবছিলেন।
এই অভিবাসনের পেছনে একাধিক কারণ থাকলেও নিম্নমানের নগর জীবনযাত্রা অন্যতম প্রধান কারণ। উন্নত সড়ক, স্বল্পতর দৈনিক যাতায়াত, পরিচ্ছন্ন বাতাস, বেশি পরিচ্ছন্নতা, আরও নির্ভরযোগ্য পৌরসেবা এবং উন্নত নিরাপত্তাসহ বিদেশে ভালো জীবনযাপনের সুযোগ ধনী ভারতীয়দের দেশ ছাড়তে আকৃষ্ট করছে।
ভারতের শীর্ষ শহরগুলোতে এর প্রভাব স্পষ্ট। মুম্বাই, দিল্লি, কলকাতা, বেঙ্গালুরু, চেন্নাই, হায়দরাবাদ, পুনে, আহমেদাবাদ, সুরাট, বিশাখাপত্তনম, জয়পুর ও লক্ষ্ণৌতে ভারতের অধিকাংশ অতি-ধনী মানুষের বাস; জাতীয় জিডিপিতে এসব শহরের অবদানও সবচেয়ে বেশি। এগুলোই দেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল শহর হলেও জীবনযাত্রার ব্যয় অভিবাসনের মূল কারণ নয়। বরং এসব শহরে জীবনযাত্রার মান কমছে। অতি-ধনীরা নিজেদের বাড়ি থেকে বেরোলেই তাঁদের আশপাশের বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়—অসমান ও গর্তে ভরা সড়ক, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, দীর্ঘ যাতায়াত সময়, যানজট এবং নিম্নমানের বায়ু।
স্মার্ট সিটিজ মিশন: সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা
২০১৫ সালে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নিয়ে স্মার্ট সিটিজ মিশন চালু করে ভারত। ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত ১ লাখ ৫৩ হাজার কোটি রুপি বিনিয়োগে ৭ হাজার ৬৩৬টি প্রকল্প সম্পন্ন হয়েছে। ১৮টি শহরে স্মার্ট সিটির সব প্রকল্প পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়েছে এবং এই কর্মসূচির আওতায় রয়েছে ১০০টি শহর। পুনে, সুরাট, ভাদোদরা, কোয়েম্বাটুর ও উদয়পুরের মতো শহরে স্মার্ট ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, আইওটি-সক্ষম বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সমন্বিত কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র, স্মার্ট গতিশীলতা সমাধান, ডিজিটাল শাসন প্ল্যাটফর্ম এবং স্মার্ট পানি ব্যবস্থাপনাসহ নানা উদ্ভাবন বাস্তবায়িত হয়েছে।
তবে এই চিত্তাকর্ষক পরিসংখ্যানের আড়ালে রয়েছে উদ্বেগজনক বাস্তবতা। স্মার্ট সিটিজ মিশন ভারতের নগরায়ণের সমস্যার সামান্য অংশই মোকাবিলা করে। আওতাভুক্ত ১০০টি শহরে ভারতের নগর জনসংখ্যার মাত্র প্রায় ৩০ শতাংশ বাস করে। বাকি ৭০ শতাংশ নগরবাসী এই কর্মসূচির বাইরে থাকা শহর ও মফস্বলে থাকেন।
এই মিশনে কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থায়ন, প্রায়ই অপর্যাপ্ত রাজ্য ও পৌরসভার অর্থায়ন, জটিল সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব এবং বাণিজ্যিক ঋণের সমন্বিত মডেল রয়েছে। আর্থিকভাবে দুর্বল পৌরসভাগুলোর ওপর এসব ঋণ দেনার বোঝা তৈরি করে। অর্থায়নের এই খণ্ডিত কাঠামোর কারণে প্রকল্পে বিলম্ব হয়েছে এবং অনেক প্রকল্প অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। এ ছাড়া, সম্পন্ন প্রকল্পগুলোর রক্ষণাবেক্ষণে পর্যাপ্ত অর্থায়ন নেই। স্মার্ট ব্যবস্থার উন্নয়ন, কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং পরিচালন ব্যয়ের জন্য ধারাবাহিক বিনিয়োগ প্রয়োজন।
সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভারতের দরিদ্রতম নগরবাসীর জীবনযাত্রার মৌলিক প্রশ্নটির সমাধানে স্মার্ট সিটিজ মিশন ব্যর্থ হয়েছে। নগরবাসীর প্রায় ২৫ শতাংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করেন এবং ১৭ শতাংশ নগর পরিবার বস্তিতে থাকে। নগর এলাকাকে অভিজাত করে তোলা, সম্পত্তির দাম বাড়ানো এবং অনিচ্ছাকৃতভাবে নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীকে উচ্ছেদের জন্য এই মিশন সমালোচিত হয়েছে। স্মার্ট সিটি প্রকল্পগুলোতে প্রায়ই উচ্চপ্রযুক্তির নজরদারি ব্যবস্থা, মধ্যবিত্তদের ব্যবহারের জন্য পরিকল্পিত উন্নত গণপরিসর, বাণিজ্যিক এলাকা এবং প্রযুক্তি পার্ককে প্রাধান্য দেওয়া হয়। অথচ বস্তিবাসীদের তাৎক্ষণিক প্রয়োজন—যেমন পর্যাপ্ত পয়োনিষ্কাশন, পানীয় জল, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও সাশ্রয়ী আবাসনের—সমাধান হয় না।
ভারতের নগর সংকটের ব্যাপ্তি
বিশ্বে খুব কম ক্ষেত্রেই দেখা গেছে—এমন গতিতে নগরায়িত হচ্ছে ভারত। ২০৩০ সালের মধ্যে ৬০ কোটির বেশি ভারতীয় নগর এলাকায় বাস করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। জাতিসংঘের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে নগর এলাকায় ৯৫ কোটি ১০ লাখ ভারতীয়ের বাস হবে, যা মানব ইতিহাসের বৃহত্তম নগরায়ণ ঢেউ। একই সময়ে, ভারতের জিডিপিতে নগর এলাকার অবদান ইতিমধ্যে ৬৩ শতাংশ, যা ২০৩০ সালের মধ্যে ৭৫ শতাংশে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জনসংখ্যার এই পরিবর্তন সামাল দিতে ১৪ কোটি ৪০ লাখ নতুন বাড়ি, হাজার হাজার কিলোমিটার সড়ক, বর্ধিত জনসংখ্যার জন্য পানি ব্যবস্থা এবং বর্জ্য অপসারণের অবকাঠামো দরকার। বর্তমানে ভারতের অবকাঠামো বিনিয়োগ প্রয়োজনীয় পরিমাণের মাত্র অর্ধেক। এই অর্থায়ন ঘাটতি ভারতের নগর ভবিষ্যতের প্রস্তুতিতে একটি গুরুতর দুর্বলতা।
ভারতের নগরায়ণের প্রকৃত চিত্র ছোট শহরগুলোতে ফুটে ওঠে। ভারতের নগর জনসংখ্যার ৭০ শতাংশের বেশি বাস করেন ১০ লাখের কম জনসংখ্যার জনবসতিতে। ১ লাখ থেকে ৫ লাখ জনসংখ্যার ছোট ও মাঝারি শহরগুলোতে বিস্ফোরণধর্মী প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, কিন্তু পর্যাপ্ত নগর পরিকল্পনা কাঠামো, অবকাঠামো উন্নয়নের আর্থিক সম্পদ এবং পৌর প্রশাসনের কারিগরি দক্ষতার অভাব রয়েছে।
অবকাঠামো ও সেবা প্রদানে ব্যর্থতা
আরও বেশি মানুষ আসার সঙ্গে সঙ্গে ভারতের নগর অবকাঠামোর ঘাটতি প্রতি বছর বাড়ছে। ভারতের নগর জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশ পানির সংকটে ভুগছে। চেন্নাইয়ের মতো শহরে তীব্র পানির সংকট দেখা দিয়েছে, ফলে বাসিন্দাদের ব্যয়বহুল বেসরকারি পানির ট্যাংকারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। সমস্যাটি শুধু সরবরাহের নয়; এর সঙ্গে বণ্টন, গুণমান ও দক্ষ ব্যবহারের বিষয়ও জড়িত। পাইপের ফুটো ও দুর্বল অবকাঠামোর কারণে অনেক শহরে সরবরাহ করা পানির ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ নষ্ট হয়।
পরিবহন ব্যবস্থার অচলাবস্থায় উৎপাদনশীলতা ও জ্বালানি খরচ বাবদ ভারতীয় শহরগুলোর বছরে কোটি কোটি রুপি ক্ষতি হয়। দুর্বল গণপরিবহন ব্যবস্থার কারণে মানুষ ব্যক্তিগত যানবাহনের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হয়, ফলে যানজট ও দূষণ বাড়ে। যানজটে উৎপাদনশীলতা হারিয়ে ভারতে বছরে ২ হাজার ২০০ কোটি ডলার ক্ষতি হয়। পরিবহন ব্যবস্থার অদক্ষতায় শহরগুলো বছরে উৎপাদনশীলতার ৪ থেকে ৮ শতাংশ হারায়। ভারতের মহানগর এলাকাগুলোতে অনেক ক্ষেত্রে দৈনিক গড় যাতায়াত সময় ৯০ মিনিটের বেশি।
আবাসন আরেকটি গুরুতর সমস্যা। প্রায় ৬ কোটি ৫০ লাখ ভারতীয় বস্তিতে বাস করেন, যেখানে প্রায়ই বিশুদ্ধ পানি, পয়োনিষ্কাশন বা স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক সুবিধা নেই। বিশ্বের সবচেয়ে গুরুতর আবাসন সংকটগুলোর একটি রয়েছে ভারতে, বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য। ভারতীয় শহরগুলোর বস্তিতে প্রায় ১২ কোটি মানুষ চরম অতিরিক্ত জনঘনত্বের মধ্যে থাকেন। সেখানে প্রতি এক হাজার বর্গমিটারে গড়ে ৪০ বা তার বেশি মানুষের বাস, যেখানে প্রচলিত মানদণ্ডে এই সংখ্যা ৮ থেকে ১০ হওয়ার কথা।
নগরায়ণ সত্ত্বেও নগর ভারতের পানি ও পয়োনিষ্কাশন সংকট অব্যাহত। নগর ভারতের প্রায় ৫০ শতাংশ এলাকায় ২৪ ঘণ্টার নির্ভরযোগ্য পানির সরবরাহ নেই। অনেক মহানগর এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর মারাত্মকভাবে কমে যাচ্ছে। পানির গুণমানও খারাপ; পাইপের পানিতে জীবাণুর দূষণ সাধারণ ঘটনা। নগর পরিবারের প্রায় ৪০ শতাংশের যথাযথ নর্দমা সংযোগ নেই। অধিকাংশ শহরে সেপটেজ ব্যবস্থাপনা কার্যত অনুপস্থিত এবং অপরিশোধিত পয়োবর্জ্য ভূগর্ভস্থ ও ভূপৃষ্ঠের পানি দূষিত করছে।
নগর সংকটের স্থায়িত্ব
গবেষকেরা ভারতের নগর সংকট অব্যাহত থাকার পেছনে ছয়টি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন। প্রথমত, চেন্নাই, বেঙ্গালুরু, গুরুগ্রাম ও মুম্বাইয়ের মতো শহরে প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহকে সাধারণত উপেক্ষা করা হয়। দ্বিতীয়ত, সড়ক ও নিষ্কাশন ব্যবস্থার জন্য শহরগুলোতে আলাদা ও সমন্বিত পরিকল্পনা নেই; প্রায়ই এগুলোকে পৃথক অবকাঠামোগত বিষয় হিসেবে দেখা হয়। তৃতীয়ত, নগর স্থানীয় সংস্থাগুলোর আর্থিক ও কারিগরি সক্ষমতা দুর্বল। বড় রাজ্যগুলোতে গড়ে ৩৭ শতাংশ পদ শূন্য রয়েছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে একজন প্রকৌশলীকে একাধিক শহরের দায়িত্ব সামলাতে হয়।
চতুর্থত, সড়ক ও নিষ্কাশন ব্যবস্থা পরিচালনায় একাধিক সংস্থা থাকায় কাজের পুনরাবৃত্তি ও বিভ্রান্তি তৈরি হয়। দিল্লিতে এমন নয়টি সংস্থা রয়েছে, কিন্তু কারও ওপর সমন্বিত জবাবদিহি নেই। পঞ্চমত, সমন্বিত আঞ্চলিক পরিকল্পনার অভাবে নিষ্কাশন ব্যবস্থাগুলোকে নির্বিঘ্নে যুক্ত করা যায় না এবং শহরাঞ্চলজুড়ে যান চলাচল ব্যবস্থাপনাও বাধাগ্রস্ত হয়। সবশেষে, নাগরিকদের অংশগ্রহণের অভাবে সংশোধনমূলক ও প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ ধীর হয়েছে, যদিও এসব উদ্যোগ স্থানীয় পর্যায়ে সহনশীলতা গড়ে তুলতে পারত।
এসব কাঠামোগত সমস্যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তথ্যের গুরুতর ঘাটতি। ১৫ বছরেরও বেশি আগে অনুষ্ঠিত ভারতের সর্বশেষ আদমশুমারিতে নগর জনসংখ্যা ছিল ৩০ শতাংশ। অনানুষ্ঠানিক হিসাব অনুযায়ী, এখন দেশের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী নগর বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন এলাকায় বাস করে বলে মনে করা হয়, আর পরবর্তী আদমশুমারি পিছিয়ে ২০২৬ সালে নির্ধারিত হয়েছে। অঙ্কুর বিসেনের প্রশ্ন, “নগরায়ণের ব্যাপ্তি ও ধরন সম্পর্কে তথ্যই না থাকলে সমস্যা সমাধানের কাজ শুরু করবেন কীভাবে?”
নগর রূপান্তরের সম্ভাব্য পথ
ভয়াবহ এসব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও বিশেষজ্ঞ ও নীতিনির্ধারকেরা এগিয়ে যাওয়ার কয়েকটি পথ প্রস্তাব করেছেন। সহনশীল শহরের জন্য একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনায় নগর স্থানীয় সংস্থা ও আঞ্চলিক—উভয় পর্যায়ে সড়ক এবং সংশ্লিষ্ট পরিষেবার জন্য পৃথক ও সমন্বিত পরিকল্পনা প্রণয়ন অন্তর্ভুক্ত। উদ্ভাবনী ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা চালু করলে যানজট ও যাতায়াতের সময় কমানো যেতে পারে। সময়সীমা বেঁধে জলাশয় সংরক্ষণ এবং বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। নিচু এলাকার বর্জ্য ফেলার স্থান পুনরুদ্ধার করে নতুন জলাশয় তৈরি এবং বাইরের দিক থেকে পানির প্রবাহ ঠেকাতে জলরিং রোড গড়ে তোলাও অন্য কৌশল।
সমন্বিত কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের মাধ্যমে আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা গড়ে তোলা, সড়ক ও ঝড়ের পানি নিষ্কাশন নালার নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা এবং অবকাঠামোর নিরাপত্তা ও কাঠামোগত নিরীক্ষা নিয়মিত করাও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। শূন্য পদ পূরণ করে এবং আউটসোর্সিংয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে জনবল সংকট মোকাবিলাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ প্রাতিষ্ঠানিক করতে হবে এবং ফুটপাত রক্ষা, জলাশয় সংরক্ষণ, বৃষ্টির পানি ধরে রাখার নিয়ম মানা ও নিষ্কাশন ব্যবস্থা রক্ষণাবেক্ষণে নাগরিকদের অংশগ্রহণ উৎসাহিত করতে হবে।
আর্থিক সংস্কারও অত্যন্ত জরুরি। অনেক নগর স্থানীয় সংস্থা আর্থিক স্থায়িত্ব বজায় রাখতে হিমশিম খায়; তারা রাজ্য সরকারের অনুদানের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল এবং নিজস্ব রাজস্ব আয়ের সক্ষমতা সীমিত। সংস্কারের মধ্যে রয়েছে ন্যায্য ও কার্যকর সম্পত্তি কর ব্যবস্থা চালু করা, নগরসেবার ব্যবহার ফি যৌক্তিক করা এবং অবকাঠামো প্রকল্পের অর্থ সংগ্রহে পৌর বন্ড ইস্যু করা। সরকারি তদারকি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে বেসরকারি খাতের দক্ষতা ও সম্পদ কাজে লাগানো যেতে পারে।
কিছু বিশেষজ্ঞ আরও আমূল সমাধানের প্রস্তাব দিয়েছেন, যার মধ্যে নির্দিষ্ট আইন ও নীতির অধীনে পরিচালিত বেসরকারি শহর গড়ে তোলা রয়েছে, যাতে জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের লক্ষ্য পূরণ করা যায়। এসব শহর ভারতীয় সংবিধানের সীমানার মধ্যেই কাজ করবে, তবে সেখানকার পৌর আইন অন্য এলাকার আইন থেকে আলাদা হবে। পৌরসভার চেয়ে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মতো করে পরিচালিত হবে এগুলো; নিজেদের কার্যক্রম, রাজস্ব সংগ্রহ ও ব্যয় নির্ধারণের ক্ষমতাও থাকবে।
উপলব্ধির চক্র
তথ্যের ঘাটতি এবং সংবিধানের ৭৪তম সংশোধনীতে নির্ধারিত কাঠামো বাস্তবায়ন না হওয়া ভারতের তৃণমূল গণতন্ত্রের দুর্বলতাকে প্রতিফলিত করে। কয়েক বছর আগে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনসাধারণের প্রতিক্রিয়ার মতো শহরগুলো নিয়ে কোনো প্রতিবাদ নেই—এটি বিশেষজ্ঞদের কাছে বিস্ময়কর। নগর পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতির আগে ভারতকে সম্ভবত স্বাভাবিক “উপলব্ধির চক্রের” মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
অঙ্কুর বিসেন উদাহরণ হিসেবে ১৮৫৮ সালে লন্ডনের ‘গ্রেট স্টিঙ্ক’-এর কথা বলেন। ওই দুর্গন্ধের ঘটনার পর সরকার শহরটির জন্য নতুন পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা নির্মাণ করে এবং বড় আকারের কলেরা প্রাদুর্ভাবের অবসান ঘটে। বিসেন বলেন, “সাধারণত এমন ঘটনা—যখন পরিস্থিতি চরমে পৌঁছে যায়—তখনই বিষয়গুলো রাজনৈতিক গুরুত্ব পায়।”
বড় শহরগুলোর নাগরিকদের হতাশা বলছে, সেই চরম মুহূর্ত হয়তো এগিয়ে আসছে। বেঙ্গালুরুতে যানজট ও আবর্জনার স্তূপে অতিষ্ঠ নাগরিক এবং ধনকুবের উদ্যোক্তাদেরও প্রকাশ্য ক্ষোভ দেখা গেছে। মুম্বাইয়ে সড়কের গর্তের অবনতিশীল সমস্যা নিয়ে নাগরিকেরা বিরল বিক্ষোভ করেছেন। দিল্লিতে শীতকালের বার্ষিক দুর্ভোগে বিষাক্ত ধোঁয়াশায় শিশু ও বয়স্করা শ্বাস নিতে হিমশিম খেয়েছে; চিকিৎসকেরা কাউকে কাউকে শহর ছেড়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। এমনকি ফুটবলার লিওনেল মেসির সফরও রাজধানীর খারাপ বায়ুর মানের বিরুদ্ধে সমর্থকদের স্লোগানে ঢাকা পড়ে যায়।
সৎ মূল্যায়ন হলো, ভারত ভবিষ্যতের জন্য আংশিকভাবে প্রস্তুত, কিন্তু বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিপজ্জনকভাবে অপ্রস্তুত। ভারতের রয়েছে দূরদৃষ্টি, ব্যাপ্তি ও উদ্ভাবনের সক্ষমতা। যা নেই তা হলো সমন্বিত নগর পরিকল্পনা, অন্তর্ভুক্তি ও দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা। বসবাসযোগ্যতা ছাড়া স্মার্ট শহর ভারতের জনমিতিক ও অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা টিকিয়ে রাখতে পারবে না। ভারতের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে শুধু কতগুলো শহর “স্মার্ট” হলো তা দিয়ে নয়, বরং কতগুলো শহর বসবাসযোগ্য, ন্যায্য ও সহনশীল হলো—তা দিয়ে।
মূল কথা
- ২০৫০ সালের মধ্যে ভারতের নগর জনসংখ্যা ৮১ কোটি ৪০ লাখে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা অবকাঠামোর ওপর বিশাল চাপ তৈরি করবে
- নগর সংকটের মূল কারণ শাসনব্যবস্থার ঘাটতি; চীনা শহরের মেয়রদের তুলনায় ক্ষমতাহীন দুর্বল স্থানীয় সংস্থাগুলো
- ১৯৫১ সালে বেঙ্গালুরুর জনসংখ্যা ছিল ৭ লাখ ৯০ হাজার ৩০৮; এখন তা ১ কোটি ৪০ লাখ, শহরটি তীব্র পানির সংকট ও ভারতের সবচেয়ে খারাপ যানজটে ভুগছে
- জীবনযাত্রার মানের অবনতির কারণে ২০২৩ সালে উচ্চ সম্পদশালী ২ লাখ ৮৩ হাজার ভারতীয় দেশ ছেড়েছেন; ২০২৮ সালের মধ্যে আরও ৪ লাখ ৩০ হাজারের দেশ ছাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে
- স্মার্ট সিটিজ মিশনের আওতায় রয়েছে মাত্র ১০০টি শহর, যেখানে নগর জনসংখ্যার ৩০ শতাংশ বাস করে
- দিল্লিতে দূষণজনিত ক্ষতি জিডিপির ৬ শতাংশ; বড় শহরগুলোতে ৭ শতাংশ মৃত্যুর কারণ বায়ুদূষণ
- নগর জনসংখ্যার ৪০ শতাংশ পানির সংকটে ভুগছে; পাইপের ফুটোর কারণে অনেক শহরে সরবরাহের ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পানি নষ্ট হয়
- ১২ কোটি মানুষ বস্তিতে বাস করেন, যেখানে প্রতি এক হাজার বর্গমিটারে গড়ে ৪০ জনের বেশি মানুষ থাকে
- যানজটে উৎপাদনশীলতা হারিয়ে ভারতে বছরে ২ হাজার ২০০ কোটি ডলার ক্ষতি হয়
- দশকের শেষ নাগাদ তাপজনিত চাপ ভারতের উৎপাদনশীলতা ৩ কোটি ৪০ লাখ পূর্ণকালীন চাকরির সমপরিমাণ কমিয়ে দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে






