সেনাপ্রধানকে ক্ষমতাবান করে সংবিধানের পুনর্বিন্যাস
পাকিস্তানের বেসামরিক ও সামরিক শক্তির ভারসাম্যে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। ‘সাতাশতম’ নামে পরিচিত ব্যাপক সাংবিধানিক সংশোধনীতে ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরকে তিন বাহিনীরই কমান্ড দেওয়া হয়েছে, ফৌজদারি মামলায় বিচার থেকে আজীবন দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে এবং বিচার বিভাগের শীর্ষ স্তরে বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। সরকারপক্ষের সমর্থকেরা কঠিন প্রতিবেশী অঞ্চলে অবস্থিত দেশের জন্য এই পরিবর্তনকে আধুনিকায়ন হিসেবে তুলে ধরছেন। তাঁদের মতে, দ্রুত সামরিক সমন্বয় ও সুবিন্যস্ত আদালতব্যবস্থা অত্যাবশ্যক। রাজনৈতিক পরিসরের বিভিন্ন পক্ষ ও আইনজীবী মহলের সমালোচকেরা বলছেন, নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষতি করে এই পদক্ষেপ সামরিক আধিপত্য পাকাপোক্ত করছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কর্মকর্তারাও উদ্বেগ জানিয়েছেন; তাঁদের সতর্কবার্তা, জবাবদিহি ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ঝুঁকিতে রয়েছে।
সূচিপত্র
- সেনাপ্রধানকে ক্ষমতাবান করে সংবিধানের পুনর্বিন্যাস
- সাতাশতম সংশোধনীতে সামরিক কমান্ড কাঠামোর পরিবর্তন
- পারমাণবিক তদারকিতে কেন এর গুরুত্ব রয়েছে
- বিচার বিভাগের পুনর্গঠন ও নতুন সাংবিধানিক আদালত
- সংসদে দ্রুত পাস হলো কীভাবে
- সমর্থকদের চোখে আধুনিকায়ন, সমালোচকদের কাছে গণতন্ত্রের মৃত্যু
- মে মাসের সংঘাত থেকে পাঁচ তারকা পদমর্যাদা: মুনিরের উত্থান
- বিরোধীদের ওপর চাপ ও বৃহত্তর দমন-পীড়ন
- আঞ্চলিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব
- কী ধরনের ক্ষমতার ভারসাম্য ও নিয়ন্ত্রণ অবশিষ্ট আছে
- মূল বিষয়গুলো
এর কেন্দ্রে রয়েছে নতুন একটি পদ—প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান—যা দায়িত্বে থাকা সেনাপ্রধানের হাতে থাকবে। এতে মুনির সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর ওপর আনুষ্ঠানিক কর্তৃত্ব পাবেন। এই পদটি প্রচলিত ব্যবস্থার বদলে এসেছে, যেখানে সেনা, বিমান ও নৌবাহিনীর প্রধানদের মোটামুটি সমান মর্যাদা ছিল এবং যৌথ বাহিনীর পৃথক একজন চেয়ারম্যান সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করতেন। সংশোধনীতে পাঁচ তারকা পদমর্যাদায় উন্নীত কর্মকর্তাদের আজীবন পদমর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধাও দেওয়া হয়েছে; এখন এই শ্রেণিতে মুনিরও রয়েছেন। নতুন পদের মাধ্যমে তাঁর মেয়াদ নতুন করে নির্ধারণ করা হয়েছে এবং এমন সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে, যাতে বেসামরিক নেতাদের তুলনায় তাঁকে অপসারণ করা অনেক কঠিন।
বিচার বিভাগে মৌলিক পুনর্বিন্যাস ঘটছে। সাংবিধানিক বিষয়ে বিচার করার ক্ষমতা, যা দীর্ঘদিন সুপ্রিম কোর্টের হাতে ছিল, এখন নেবে ফেডারেল সাংবিধানিক আদালত। নতুন আদালতের বিচারকদের নিয়োগ দেবেন রাষ্ট্রপতি। শুরুতে তিনি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে নিয়োগ দেবেন; পরে নির্বাহী ও আইন বিভাগের শক্তিশালী প্রভাব রয়েছে—এমন একটি কমিশন বড় ভূমিকা নেবে। কয়েকজন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি প্রতিবাদে পদত্যাগ করেছেন। তাঁদের যুক্তি, এই পদক্ষেপ নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতার ওপর অবশিষ্ট একমাত্র নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকে দুর্বল করে। আইনজীবীরা বলছেন, বিচারকদের সম্মতি ছাড়া বদলির নতুন বিধান তাঁদের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে চাপ তৈরি করতে পারে।
সাতাশতম সংশোধনীতে সামরিক কমান্ড কাঠামোর পরিবর্তন
এই সংশোধনীতে প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধানের অধীনে একীভূত কমান্ড তৈরি করা হয়েছে। এর ফলে বিমান ও নৌবাহিনীর কমান্ড সেনাপ্রধানের অধীনে কেন্দ্রীভূত হবে। যৌথ বাহিনীর চেয়ারম্যানের পদ বিলুপ্ত করা হয়েছে। পাঁচ তারকা কর্মকর্তারা আজীবন পদমর্যাদা, ইউনিফর্ম ও সুযোগ-সুবিধা বজায় রাখবেন এবং সক্রিয় চাকরি ছাড়ার পরও ফৌজদারি মামলা থেকে ব্যাপক দায়মুক্তি পাবেন। মে মাসে ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের স্বল্পস্থায়ী সশস্ত্র সংঘর্ষের পর ইতিমধ্যে ফিল্ড মার্শাল পদে উন্নীত মুনিরই এর তাৎক্ষণিক সুবিধাভোগী। নতুন ব্যবস্থায় ২০৩০ সাল পর্যন্ত নতুন পাঁচ বছরের মেয়াদ শুরু হতে পারে, যা তাঁকে পরবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত জাতীয় নীতি প্রভাবিত করার অবস্থানে রাখবে।
পারমাণবিক তদারকিতে কেন এর গুরুত্ব রয়েছে
পাকিস্তানের পারমাণবিক কমান্ড কাঠামোতেও পরিবর্তন আসছে। সংশোধনীতে ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজিক কমান্ডের একজন কমান্ডারের কথা বলা হয়েছে, যিনি পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার ও কৌশলগত বাহিনীর দায়িত্বে থাকবেন। সেনাবাহিনী থেকে এই কমান্ডার নিয়োগ দেওয়া হবে, যা পারমাণবিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সেনাপ্রধানের প্রাধান্য আরও জোরদার করবে। সমর্থকদের যুক্তি, আধুনিক যুদ্ধে স্থল, নৌ, আকাশ ও কৌশলগত সম্পদের সমন্বয়ে একীভূত কমান্ড প্রয়োজন। সমালোচকদের আশঙ্কা, এক কার্যালয়ে নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীভূত হলে বাহিনীগুলোর মধ্যে এবং বেসামরিক তদারককারীদের সঙ্গে আগে যে অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য ছিল, তা কমে যাবে।
বিচার বিভাগের পুনর্গঠন ও নতুন সাংবিধানিক আদালত
সাংবিধানিক প্রশ্ন ও আন্তসরকারি বিরোধের ক্ষেত্রে নতুন ফেডারেল সাংবিধানিক আদালত সুপ্রিম কোর্টের ওপরের স্তরে থাকবে। সুপ্রিম কোর্ট মূলত ফৌজদারি ও দেওয়ানি মামলার শুনানি করবে এবং আপিল আদালত হিসেবে কাজ করবে। সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, কাজের এই বিভাজনে মামলার জট কমবে এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত হবে। আইনজীবী ও বিচারপতিরা পাল্টা বলছেন, বিচারকদের নিয়োগ ও বদলির ক্ষমতা কার হাতে থাকবে তা বদলালে নির্বাচনসংক্রান্ত বিরোধ থেকে সামরিক বাহিনীর জবাবদিহি—সংবেদনশীল সব মামলায় নির্বাহী বিভাগের প্রভাবের ঝুঁকি তৈরি হয়। সংশোধনীতে স্বাক্ষরের পর বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য হুমকির কথা উল্লেখ করে সুপ্রিম কোর্টের দুই বিচারপতি পদত্যাগ করেন। আইনজীবী সংগঠনগুলোর বক্তব্য, এখন বিচারকদের সম্মতি ছাড়াই বদলি করা যাবে, যা চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।
শীর্ষস্থানীয় সাংবিধানিক আইনজীবী সালাহউদ্দিন আহমেদ সতর্ক করে বলেছেন, রাজনৈতিকভাবে নিয়োগ করা আদালতকে সুপ্রিম কোর্টের ওপরে বসালে বহু চেষ্টায় অর্জিত সুরক্ষাব্যবস্থাটি কার্যত ধ্বংস হয়ে যাবে।
এটি পাকিস্তানের বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ধারণাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে এবং দেশকে আজীবন একনায়কত্বের পথে নিয়ে যায়।
আদালতের এখতিয়ার নিয়ে বিতর্কের সঙ্গে দায়মুক্তির পরিধির প্রশ্নও জড়িয়ে আছে। আইনে পাঁচ তারকা কর্মকর্তাদের আজীবনের জন্য ফৌজদারি কার্যক্রম থেকে সম্পূর্ণ দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি রাষ্ট্রপতির সুরক্ষার চেয়েও বিস্তৃত বলে মনে হচ্ছে এবং একসময় অসাংবিধানিক পদক্ষেপ ঠেকাতে সহায়ক বিধানগুলোকে নিষ্ক্রিয় করে দিতে পারে।
সংসদে দ্রুত পাস হলো কীভাবে
মন্ত্রিসভার অনুমোদন থেকে রাষ্ট্রপতির সম্মতি—পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল অস্বাভাবিক দ্রুত। নভেম্বরের শুরুতে মন্ত্রিসভা বিলটি অনুমোদন করে। এক সপ্তাহান্তে সিনেটে উত্থাপনের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিলটি পাস হয়; এ সময় অধিকাংশ বিরোধী আইনপ্রণেতা অধিবেশন ছেড়ে চলে যান। দুই দিন পর জাতীয় পরিষদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় বিলটি অনুমোদিত হয়, যা সংবিধান সংশোধনের জন্য প্রয়োজনীয়। মাত্র কয়েকজন সদস্য এর বিপক্ষে ভোট দেন। এরপর শিগগিরই রাষ্ট্রপতি স্বাক্ষর করলে প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়। কারাবন্দী সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল এবং পাকিস্তানের বৃহত্তম বিরোধী শক্তি পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ ভোট বর্জন করে। দ্রুত পাস, সীমিত বিতর্ক এবং আইনজীবী সমাজের সঙ্গে ব্যাপক পরামর্শের অভাব—এসব কারণে জনপর্যালোচনাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার অভিযোগ আরও জোরালো হয়েছে।
অনেক বিশ্লেষকের মতে, তাড়াহুড়োর পেছনে ছিল সামরিক সমর্থনের ওপর ক্ষমতাসীন জোটের নির্ভরতা। নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলো বিলটিকে সাংবিধানিক অভ্যুত্থান বলে অভিহিত করেছে। সরকারপক্ষের মিত্ররা বলেছে, জাতীয় নিরাপত্তার প্রয়োজনে সংসদ বিষয়টি নিষ্পত্তি করেছে এবং নতুন আদালতের নিয়োগ ও কার্যপ্রণালি নির্ধারণে সহায়ক পরবর্তী আইন প্রণয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
সমর্থকদের চোখে আধুনিকায়ন, সমালোচকদের কাছে গণতন্ত্রের মৃত্যু
কর্মকর্তারা পরিবর্তনগুলোকে দীর্ঘদিনের প্রয়োজনীয় সংস্কার হিসেবে তুলে ধরছেন। মে মাসে ভারতের সঙ্গে সংঘর্ষ থেকে শিক্ষা নিয়ে তাঁরা বলছেন, একীভূত কমান্ড বাহিনীগুলোর মধ্যে কাজের পুনরাবৃত্তি ঠেকাবে এবং দ্রুত সাড়া দিতে সহায়তা করবে। তাঁদের আরও বক্তব্য, সাংবিধানিক মামলাগুলো সুপ্রিম কোর্টের কার্যতালিকা একচেটিয়াভাবে দখল করে রেখেছে, ফলে নাগরিক ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সাধারণ বিচার বিলম্বিত হচ্ছে। তথ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, সুশাসন উন্নত করা, কেন্দ্রীয় সরকার ও প্রদেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা এবং প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোই সংশোধনীগুলোর উদ্দেশ্য।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান ভলকার তুর্কের সতর্কবার্তা প্রত্যাখ্যান করেছে পাকিস্তান সরকার। তুর্ক বলেছিলেন, সংশোধনীটি তড়িঘড়ি করে পাস করা হয়েছে এবং এটি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করছে। আনুষ্ঠানিক জবাবে ইসলামাবাদ বিতর্কটিকে দেশের অভ্যন্তরীণ আইন প্রণয়নের বিষয় হিসেবে তুলে ধরে।
সব আইন ও সাংবিধানিক সংশোধনী পাকিস্তানের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের একান্ত এখতিয়ার।
একজন অনির্বাচিত ব্যক্তির হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়া নিয়ে শিক্ষাবিদ ও আইনজীবীরা আরও তীব্র উদ্বেগ জানিয়েছেন। জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাডজাঙ্কট সহযোগী অধ্যাপক এবং পাকিস্তানে সামরিক রাজনীতি নিয়ে গবেষণার লেখক আকিল শাহ বলেছেন, এই প্যাকেজ সাংবিধানিক ব্যবস্থার মধ্যেই সেনাপ্রধানের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করছে।
দায়মুক্তি দিয়ে তাঁকে সব ধরনের জবাবদিহির ঊর্ধ্বে রেখে বেসামরিক কর্তৃত্বের সর্বোচ্চতার নীতিকে উপহাস করা হয়েছে। এটি নির্বাহী ক্ষমতার ওপর অবশিষ্ট একমাত্র নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকে উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল করে।
মানবাধিকারকর্মীরা আরও বলছেন, ফিল্ড মার্শালকে আজীবন দায়মুক্তি দেওয়া এবং বিচারক নিয়োগে নির্বাহী বিভাগের কর্তৃত্ব বাড়ানো—দুটিই এমন দৃষ্টান্ত তৈরি করছে, যা শুধু সামরিক বাহিনী নয়, গোটা রাষ্ট্রের জবাবদিহি দুর্বল করে।
মে মাসের সংঘাত থেকে পাঁচ তারকা পদমর্যাদা: মুনিরের উত্থান
২০২২ সালের শেষ দিকে সেনাপ্রধান হওয়ার পর থেকে আসিম মুনিরের অবস্থান ক্রমেই শক্তিশালী হয়েছে। মে মাসে ভারতের সঙ্গে সীমান্ত সংঘর্ষের পর জনসমর্থন বেড়ে যায়; তখন পাকিস্তানের নিরাপত্তা কাঠামোর কর্তাব্যক্তিরা কৌশলগত বিজয়ের দাবি করেছিলেন। এর কিছুদিন পর মুনির পঞ্চম তারকা পান। পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বিপুল প্রভাববাহী এই পদমর্যাদা আবার চালু করা হয়। নতুন সংশোধনীতে সম্মানসূচক পদমর্যাদাটি আজীবন সুযোগ-সুবিধাসহ সাংবিধানিক পদে রূপান্তরিত হয়েছে, যা রাষ্ট্রের কমান্ড কাঠামোর কেন্দ্রে তাঁর অবস্থান পাকাপোক্ত করে।
মুনির আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নিজের পরিচিতি গড়ে তুলেছেন। তিনি হোয়াইট হাউসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দুইবার সাক্ষাৎ করেছেন, যা দায়িত্বে থাকা কোনো সামরিক প্রধানের জন্য অস্বাভাবিক মাত্রার সুযোগ। সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি সম্পন্ন করতে তিনি সহায়তা করেছেন বলে সরকারের দাবি। এর ফলে কূটনৈতিক শীতলতার অবসান হয়েছে এবং সামরিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার পথ খুলেছে। তিনি নিজেকে জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রবক্তা ও অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলার রক্ষক হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাঁর সমর্থকদের মতে, এই মর্যাদা অস্থির অঞ্চলে পাকিস্তানের সমর্থন পেতে সহায়তা করে। সমালোচকদের উদ্বেগ, এতে নির্বাচিত নেতৃত্বের রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড ও সামরিক নেতৃত্বের মধ্যকার সীমারেখা ঝাপসা হয়ে যায়।
বিরোধীদের ওপর চাপ ও বৃহত্তর দমন-পীড়ন
বিরোধীদের ওপর ধারাবাহিক চাপের মধ্যে এই সংশোধনী এসেছে। ইমরান খান দুই বছরের বেশি সময় ধরে কারাগারে রয়েছেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। তাঁর দলের অনেক জ্যেষ্ঠ নেতা এখনো আটক। রাজনীতিতে জড়িত বলে মনে করা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা সংস্থাগুলো মামলা করেছে। বিরল এক পদক্ষেপে সামরিক আদালত সাবেক গোয়েন্দাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল ফয়েজ হামিদকে দুর্নীতি, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের দায়ে ১৪ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে। এই রায় অভ্যন্তরীণ পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিত দিয়েছে: মুনিরের অধীনে কমান্ড আরও কেন্দ্রীভূত হয়েছে এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
নতুন সাংবিধানিক আদালত চালু হলে এবং সাংবিধানিক ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের প্রচলিত ভূমিকা কমে গেলে রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল মামলাগুলো সম্ভবত নির্বাহী বিভাগের কাছাকাছি কোনো ফোরামে শুনানি হবে। বিরোধী নেতারা বলছেন, এতে নির্বাচনী প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র একদিকে ঝুঁকে পড়বে এবং আটক বা নিষেধাজ্ঞাকে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ সীমিত হবে।
আঞ্চলিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব
আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীরা এই পরিবর্তনকে কাজে লাগিয়েছে। জাতিসংঘে ভারতের প্রতিনিধি মুনিরকে আজীবন দায়মুক্তি দেওয়া এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে কারাগারে রাখার সমালোচনা করেছেন; এ সুযোগে কাশ্মীর নিয়ে ভারতের বক্তব্যও জোরালো করেছেন। সীমান্তের ওপারে পাকিস্তানি তালেবান নেতাদের উপস্থিতি নিয়ে আফগানিস্তানের সঙ্গেও উত্তেজনা বেড়েছে। বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদীরা সক্রিয় রয়েছে এবং খাইবার পাখতুনখোয়ায় সহিংসতা বেড়েছে। মুনির প্রকাশ্যে আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছেন; বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে সতর্ক করেছেন এবং নির্ণায়ক জবাব এড়াতে কাবুলকে পদক্ষেপ নিতে বলেছেন। পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনী ও পারমাণবিক কমান্ডের ওপর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ বাড়ায়, ভবিষ্যতের সংকটে সিদ্ধান্ত গ্রহণে বেসামরিকদের ভূমিকা না বাড়লে কঠোর নিরাপত্তা পদক্ষেপের দিকে ঝোঁক তৈরি হতে পারে।
অর্থনৈতিকভাবে পাকিস্তান এখনো নিম্ন প্রবৃদ্ধি, বৈদেশিক অর্থায়নের সংকট এবং বারবার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কর্মসূচির চাপে রয়েছে। বিনিয়োগকারীরা নীতির পূর্বানুমানযোগ্যতা ও আইনের শাসনকে গুরুত্ব দেন। কেউ কেউ অধিক কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রে স্বল্পমেয়াদি স্থিতিশীলতা দেখছেন। অন্যদের আশঙ্কা, প্রতিষ্ঠান দুর্বল করা এবং বিচারিক পর্যালোচনা সীমিত করায় সুশাসনের ঝুঁকি বাড়বে, যা বিনিয়োগে নিরুৎসাহ তৈরি করতে পারে। পাকিস্তানে সামরিক শাসকেরা কখনো কখনো স্বল্পমেয়াদি শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করলেও অর্থনৈতিক চাপ তীব্র হলে তা সামলাতে হিমশিম খেয়েছেন। ইতিহাস ইঙ্গিত দেয়, জীবনযাত্রার মান না বাড়লে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষমতা কেন্দ্রীকরণ রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়।
কী ধরনের ক্ষমতার ভারসাম্য ও নিয়ন্ত্রণ অবশিষ্ট আছে
পাকিস্তানের ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে বেসামরিক মন্ত্রিসভার সঙ্গে শক্তিশালী নিরাপত্তা কাঠামোর মিশ্রণ রয়েছে, যাকে প্রায়ই ‘হাইব্রিড শাসন’ বলা হয়। এই সংশোধনী সেই ভারসাম্যকে আরও একদিকে সরিয়ে দিয়েছে। প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান অন্য বাহিনীগুলোর প্রধানদের চেয়ে উচ্চ পদমর্যাদার অধিকারী; পাঁচ তারকা কর্মকর্তা হিসেবে তাঁর দায়মুক্তি আদালতের মাধ্যমে জবাবদিহির সুযোগ অসম্ভব করে তোলে। তাঁকে অপসারণের একমাত্র পথ রাজনৈতিক। প্রধানমন্ত্রীকে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় অপসারণ করা গেলেও তাঁকে সরাতে সংসদে উচ্চসংখ্যাগরিষ্ঠতা লাগবে। এই অসমতা সেনাপ্রধানকে নির্বাচিত নেতাদের চেয়ে বেশি দিন ক্ষমতায় থাকার সুযোগ দেয়।
এই পরিবর্তনে বাহিনীগুলোর পারস্পরিক সম্পর্কও প্রভাবিত হতে পারে। সেনাবাহিনীর তুলনায় নৌ ও বিমানবাহিনীর কর্মকর্তাদের মর্যাদা কমে যাওয়ায় পদোন্নতি ও সরঞ্জাম কেনার সিদ্ধান্ত আরও সেনাকেন্দ্রিক হলে অসন্তোষ তৈরি হতে পারে। নতুন আদালত কাঠামো ভিন্নমতাবলম্বী কর্মকর্তা বা বেসামরিক নাগরিকদের সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করার আইনি পথও সীমিত করতে পারে। ব্যাপক রাজনৈতিক ঐকমত্য ছাড়া এই পরিবর্তন উল্টে দেওয়া কঠিন; সেই ঐকমত্য এখন নেই। আপাতত এই সংশোধনী অনেক পাকিস্তানির দীর্ঘদিনের বিশ্বাসকে আনুষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে: চূড়ান্ত কর্তৃত্ব নির্বাচিত রাজনীতিকদের নয়, সামরিক নেতৃত্বের হাতে।
মূল বিষয়গুলো
- সাতাশতম সংশোধনীতে আসিম মুনিরকে প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান করা হয়েছে; এতে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর কমান্ড তাঁর হাতে যাবে।
- মুনিরসহ পাঁচ তারকা কর্মকর্তারা ফৌজদারি মামলা থেকে আজীবন দায়মুক্তি পাবেন এবং আজীবন পদমর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা বজায় রাখবেন।
- সাংবিধানিক প্রশ্নের নিষ্পত্তিতে নতুন ফেডারেল সাংবিধানিক আদালত গঠন করা হয়েছে; এতে সুপ্রিম কোর্টের ভূমিকা কমেছে এবং বিচারপতি ও আইনজীবীদের প্রতিবাদ দেখা দিয়েছে।
- বিরোধী আইনপ্রণেতারা অধিবেশন বর্জন করার পর দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় বিলটি দ্রুত সংসদে পাস হয়।
- সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, পরিবর্তনে কমান্ড কাঠামোর আধুনিকায়ন হবে এবং আদালতের মামলার জট কমবে; সমালোচকদের সতর্কবার্তা, দেশ স্বৈরাচারের দিকে এগোচ্ছে।
- ভারতের সঙ্গে সংঘর্ষ ও ফিল্ড মার্শাল পদে উন্নীত হওয়ার পর মুনিরের প্রভাব বেড়েছে; পাশাপাশি ওয়াশিংটন ও রিয়াদে তাঁর উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগও রয়েছে।
- ইমরান খানসহ বিরোধী নেতারা কারাগারে রয়েছেন এবং সাবেক এক গোয়েন্দাপ্রধান সামরিক আদালতে বিরল দণ্ড পেয়েছেন।
- ভারত ও আফগানিস্তানের সঙ্গে আঞ্চলিক উত্তেজনা রয়েছে, বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো সক্রিয় এবং অর্থনৈতিক চাপ কেন্দ্রীভূত নিয়ন্ত্রণের স্থায়িত্বের পরীক্ষা নিতে পারে।






