কাজাখস্তান ও চীনের মধ্যে বাণিজ্যপথ পুনরুজ্জীবন
কাজাখস্তানের কুনায়েভ শহরের কাছে কাপচাগাই জলাধারের তীরে ইলি নদীকে চীনের সঙ্গে আবার যুক্ত করতে এবং পানির শান্ত একটি অংশকে আন্তসীমান্ত বাণিজ্য করিডরে রূপ দিতে একটি অভ্যন্তরীণ বন্দর তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছে দেশটি। পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে আলমাতির প্রায় ৯০ কিলোমিটার উত্তরে একটি নতুন সরবরাহ ও পণ্য টার্মিনাল। চীনের ইনি শহর থেকে আসা বার্জ ও নদীপথের নৌযান সেখানে পণ্য খালাস করবে, পরে সড়ক ও রেলপথে সেগুলো মধ্য এশিয়াজুড়ে পাঠানো হবে। কর্মকর্তারা ও প্রকল্পের অংশীদাররা ২০২৭ সালে প্রাথমিক কার্যক্রম শুরুর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন। তাদের আশা, পণ্য রাখার ইয়ার্ড, ক্রেন, গুদাম, শুল্কসুবিধা ও সেবা ডিপো নিয়ে গড়ে ওঠা এই অবকাঠামো একসময় দেশের বৃহত্তম অভ্যন্তরীণ সরবরাহকেন্দ্রগুলোর একটি হবে।
সূচিপত্র
তিয়েন শান পর্বতমালা থেকে উৎপত্তি হয়ে পশ্চিমে কাজাখস্তানে প্রবাহিত ইলি নদী একসময় পণ্য পরিবহনের কার্যকর পথ ছিল। সোভিয়েত যুগের অবসানের পর পানির স্তর কমে যাওয়া এবং সড়ক ও রেলপথের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় নদীপথে নৌচলাচল কমে যায়। বর্তমানে স্থলপথের করিডরগুলোতে যানজট বেড়ে যাওয়ায় কম খরচের বিকল্প হিসেবে নদীপথে আগ্রহ ফিরেছে। নৌপথে ভারী বা অতিরিক্ত বড় পণ্য পরিবহন করা যায়, যেগুলো রেল ও সড়কপথে পরিবহন কঠিন বা অসম্ভব; প্রতি টন পণ্য পরিবহনে জ্বালানিও কম লাগে, আর নতুন শিল্পাঞ্চলকে রপ্তানি রুটের সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হয়। ইউরেশীয় বাণিজ্যের সেতু হিসেবে খ্যাতি গড়ে তুলেছে কাজাখস্তান; চীন ও ইউরোপের মধ্যে রেলপথে পরিবাহিত পণ্যের বড় অংশই দেশটির ভেতর দিয়ে যায়। নদীপথে পরিবহন এসব রেললাইনকে প্রতিস্থাপন করবে না, তবে সেগুলোর ওপর চাপ কমাতে এবং ভারী পণ্য ও প্রকল্পের মালামাল পরিবহনে নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।
বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী, কাপচাগাইয়ের তীরে প্রায় ১০০ হেক্টর জমি বন্দর ও বহুমাধ্যম পরিবহনকেন্দ্রের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে। কাজাখ কোম্পানি ইলি রিভার পোর্ট এলএলপি প্রকল্পটির নেতৃত্ব দিচ্ছে। চীনা অংশীদাররা ইনি থেকে কাজাখ সীমান্ত পর্যন্ত উজানের অংশটির উন্নয়ন করছে। প্রকল্পের নথিতে প্রায় ৪৫০ কিলোমিটার নৌচলাচলযোগ্য পথের কথা বলা হয়েছে। শুরুতে বছরে প্রায় ১০ লাখ টন পণ্য পরিবহনের লক্ষ্য রয়েছে; নদীপথ উন্নত করা ও বহর বাড়ানোর মাধ্যমে তা ৩০ লাখ টনে উন্নীত করার সুযোগও রাখা হয়েছে। বার্জে নির্মাণসামগ্রী, কৃষিপণ্য ও যন্ত্রপাতি পরিবহন করা যেতে পারে। এর মধ্যে আলমাতি ও বালখাশ অঞ্চলের জ্বালানি ও শিল্প প্রকল্পের অতিরিক্ত বড় যন্ত্রাংশও থাকবে। ট্রান্স-কাস্পিয়ান রুট ও মধ্য এশিয়ার অন্যান্য বাজারে পাঠানো পণ্য একত্র করার কেন্দ্র হিসেবেও বন্দরটি কাজ করবে।
পানিসংকটই বড় সীমাবদ্ধতা
ব্যবসায়িক সম্ভাবনা নির্ভর করছে এমন একটি সম্পদের ওপর, যা ক্রমেই চাপে পড়ছে। ইলি একটি আন্তসীমান্ত নদী। এর পানির বেশির ভাগই চীন থেকে আসে; কাজাখস্তানে প্রবেশের পর নদীটি বালখাশ হ্রদে পানি জোগায়। সীমান্তের বাইরের উৎস থেকে আসা পানির ওপর কাজাখস্তান ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। চীনের শিনজিয়াং অঞ্চলে উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে উজানে পানির ব্যবহারও বেড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনে হিমবাহ সংকুচিত হচ্ছে এবং ঋতুভিত্তিক পানিপ্রবাহের ধরন বদলাচ্ছে, যা চাপ আরও বাড়াচ্ছে। এসব কারণে নৌচলাচলের সুযোগ কমছে এবং কৃষিকাজ, মৎস্য আহরণ ও পানীয় জলের জন্য নদীর ওপর নির্ভরশীল ভাটির জনপদগুলোর ঝুঁকি বাড়ছে।
মার্কিন কংগ্রেসে জমা দেওয়া এক প্রতিবেদনে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর কাজাখস্তানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অভিন্ন নদীগুলোতে উজানের পানি প্রত্যাহারের প্রভাব তুলে ধরেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,
শিনজিয়াংয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে চীন কাজাখস্তানের সঙ্গে অভিন্ন ইর্তিশ ও ইলি নদী থেকে পানি সরিয়ে নিচ্ছে।
ইলি উপত্যকায় চীনে সেচের পরিধি বৃদ্ধি, তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া এবং অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের কারণে ইতিমধ্যে কোনো কোনো সময় পানিপ্রবাহ কমেছে বলে ইলি-বালখাশ অববাহিকা নিয়ে একাডেমিক মূল্যায়নে জানানো হয়েছে। মডেলিং গবেষণায় দেখা গেছে, ঐতিহাসিকভাবে এই অববাহিকা পরিবেশগত পানিসংকটের ঝুঁকিতে রয়েছে এবং উজানে পানির ব্যবহার আরও বাড়লে ভাটিতে সংকট তীব্র হয়। জলবায়ুর কিছু পরিস্থিতিতে স্বস্তি মিলতে পারে, তবে নদীর পানিপ্রবাহের নির্ভরযোগ্যতা বজায় রাখার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হিসেবে পরিকল্পনাবিদরা পানি সাশ্রয়ের ব্যবস্থা, সেচের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সমন্বিতভাবে পানি ছাড়ার ওপর জোর দিচ্ছেন।
ঝুঁকিতে বালখাশ হ্রদ
বালখাশ একটি অন্তর্বাহিক হ্রদ, অর্থাৎ এটি এমন একটি বদ্ধ অববাহিকায় অবস্থিত, যার সমুদ্রে কোনো বহির্গমনপথ নেই। হ্রদে আসা পানির বেশির ভাগই ইলি নদী থেকে আসে। পানিপ্রবাহ কমে গেলে হ্রদের পানির স্তর নেমে যায়, লবণাক্ততা বাড়তে পারে এবং বদ্বীপের আকৃতি ও পরিবেশগত অবস্থা পাল্টে যায়। ইলি বদ্বীপে জলাভূমি, পাখির আবাসস্থল ও মৎস্যসম্পদ রয়েছে, যেগুলোর দক্ষিণ-পূর্ব কাজাখস্তানে সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব আছে। পানিপ্রবাহ কমলে চ্যানেলের গভীরতাও কমে যায়, ছোট নৌযান আটকে পড়ে এবং পলি জমে নৌচলাচলে বাধা সৃষ্টি করে। এ অঞ্চলের বিশেষজ্ঞরা প্রায়ই সতর্কতামূলক দৃষ্টান্ত হিসেবে আরাল সাগরের বিপর্যয়ের কথা বলেন। বদ্ধ অববাহিকা অব্যবস্থাপনার পরিবেশগত ও সামাজিক মূল্য বিপুল হতে পারে। বালখাশ হ্রদের আশপাশে শিল্প সম্প্রসারণসহ যেকোনো উন্নয়ন পানির ভারসাম্য নিশ্চিত না করে এগোলে সেই ক্ষতি আরও বেড়ে যাবে।
অগভীর নদীকে পণ্য পরিবহন করিডরে রূপ দেওয়া
ইলি নদীকে নির্ভরযোগ্য নৌপথে রূপ দিতে শুধু ঘাট ও গুদাম নির্মাণ যথেষ্ট হবে না। প্রকৌশলীরা নদী খনন, তীর স্থিতিশীল করা এবং স্রোতকে নির্দিষ্ট পথে প্রবাহিত করার জন্য চ্যানেল নিয়ন্ত্রণের কাজের পরিকল্পনা করছেন। নদীটি আঁকাবাঁকা পথে বয়ে যায় এবং বালুচর তৈরি করে, তাই খনন একবার করলেই চলবে না। পলির পরিমাণ ও মৌসুমি পানির সর্বোচ্চ প্রবাহের ওপর নির্ভর করে এটি নিয়মিত ব্যয়ের বিষয় হবে। সরু পথ পেরিয়ে চলাচলে নৌযানের চালকদের সহায়তার জন্য নৌচলাচলের বয়া, বাতি ও ডিজিটাল মানচিত্র দরকার হবে। যেকোনো নির্মাণকাজে সংবেদনশীল জলাভূমি ও মাছের প্রজননক্ষেত্রের ক্ষতি এড়ানো হচ্ছে কি না, তা নিরাপত্তা ও পরিবেশগত মূল্যায়নে নিশ্চিত করতে হবে।
কার্যকর নৌচলাচলের মৌসুম কেমন হতে পারে
ইলি নদী ও কাপচাগাই জলাধারে শীতের তীব্রতা নৌপরিবহন সীমিত করে। বরফ জমা ও নিম্ন তাপমাত্রার কারণে কয়েক মাস নদীপথ বন্ধ থাকতে পারে। তুষার গলার ফলে সাধারণত বসন্তের শেষভাগ ও গ্রীষ্মের শুরুতে পানির উচ্চতা বাড়ে; তখন বার্জবহরের জন্য নদীর গভীরতা বেশি অনুকূল থাকে। উজানে সেচের জন্য অতিরিক্ত পানি তোলা হলে গ্রীষ্মের শেষভাগ ও শরতের শুরুতে প্রবাহ কমে যেতে পারে। পরিচালকেরা সম্ভবত পানির স্তর বেশি থাকার সময় ভারী ও বাল্ক পণ্য পরিবহনে মনোযোগ দেবেন; গভীরতা কমলে হালকা পণ্য পরিবহন করবেন। নদীতে চলাচলের জন্য অগভীর তলদেশের বার্জকে টাগবোট দিয়ে ঠেলে নেওয়া যেতে পারে, তবে পানির স্তর ও চ্যানেলের অবস্থা অনুযায়ী পণ্য বোঝাই করতে হবে। উন্নয়নের পরও কোনো কোনো সপ্তাহ বা মাসে কম গভীরতার কারণে ধারণক্ষমতা কমবে কিংবা চলাচল বন্ধ রাখতে হবে। রেলপথের সঙ্গে নদীপথের তুলনা করার সময় পণ্য পরিবহনকারীরা এই ঝুঁকিও বিবেচনা করবেন।
বন্দর পরিচালনার জন্য কাজাখস্তানে এখনো পর্যাপ্ত নয় এমন নৌবহর ও দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে হবে। দেশটির অভ্যন্তরীণ নৌবহরের বড় অংশই পুরোনো, খুচরা যন্ত্রাংশের সংকট রয়েছে এবং মেরামতের ইয়ার্ডও সীমিত। প্রকল্প দল রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা, সংরক্ষণ ইয়ার্ড ও যাত্রীসেবাসহ পূর্ণাঙ্গ সরবরাহকেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেছে। নৌযানের চালক, ডেককর্মী ও বন্দরকর্মীদের প্রশিক্ষণ জরুরি হবে। নৌচলাচলে সহায়ক আধুনিক সরঞ্জাম ও পণ্য পরিবহনের ব্যবস্থাপনা পদ্ধতিও লাগবে, যাতে পণ্যের মালিকেরা পানির স্তর, যাত্রার সময় ও ঘাটের প্রাপ্যতা সম্পর্কে তাৎক্ষণিক তথ্য পান। এসব ভিত্তি তৈরি না হলে নদী প্রস্তুত হওয়ার আগেই বন্দর প্রস্তুত হয়ে যেতে পারে।
নদীপথ নৌচলাচলযোগ্য থাকবে কি না, তা নির্ধারণ করবে কূটনীতি
অভিন্ন নদীগুলো নিয়ে কাজাখস্তান ও চীনের মধ্যে সহযোগিতার কাঠামো আগে থেকেই রয়েছে। পানিপ্রবাহ, পানির গুণমান ও নতুন প্রকল্প নিয়ে আলোচনার জন্য দেশ দুটি একটি দ্বিপক্ষীয় কমিশন পরিচালনা করে। তবে ইলি নদীর পানি বণ্টনে বাধ্যতামূলক কোনো চুক্তি বা সারা বছর সীমান্তে নির্দিষ্ট পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করার মতো পরিচালনানীতি তাদের নেই। নৌপরিবহন কার্যকর করতে হলে উভয় পক্ষকে মৌসুমি লক্ষ্যমাত্রা, উজানের পানি পরিমাপক কেন্দ্রের তথ্যের স্বচ্ছ বিনিময়, খরা ও বন্যার সময় তাৎক্ষণিক সতর্কতা এবং পরিবেশ, কৃষিকাজ, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও নৌপরিবহনের জন্য পানির ভারসাম্য রক্ষার পদ্ধতি নিয়ে একমত হতে হবে। চীনের ইলি উপত্যকায় ড্রিপ সেচ, খালে আস্তরণ দেওয়া এবং ফসলের ধরন বদলানোর মতো পানি সাশ্রয়ী উন্নয়ন চাপ কমাতে পারে। কাজাখস্তানে পানি, জ্বালানি, পরিবেশ ও পরিবহন সংস্থাগুলোর মধ্যে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় থাকলে কাপচাগাই জলাধারের পরিচালনা পরিবেশগত চাহিদা ও পণ্য পরিবহনের সময়সূচির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা সহজ হবে।
একই মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রতিবেদনে পানিসংকটাপন্ন অববাহিকায় ঝুঁকি কমাতে নীতিগত পদক্ষেপের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,
চীনে পানিসংকটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঝুঁকি কমাতে টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা, দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অপরিহার্য।
চীনের বৃহত্তর পানিসংকট ইলি নদী নিয়ে সুস্পষ্ট নিয়মের প্রয়োজনীয়তা আরও জোরালো করে। দেশটির জনসংখ্যা বিশ্বের ২০ শতাংশ, কিন্তু মিঠাপানির অংশ এর তুলনায় অনেক কম। উত্তরের অঞ্চলগুলো বেশি শুষ্ক এবং সেখানে কৃষিকাজও বেশি; তাই দক্ষিণ থেকে উত্তরে পানি সরিয়ে নিতে বড় বড় প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাপপ্রবাহ ও খরা এ ব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। একই সঙ্গে জলাধার ও সেচব্যবস্থা ভাটির পানির চাহিদার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নেমেছে। দেশের অভ্যন্তরীণ এই বাস্তবতায় উজানে পানি ছাড়ার বিষয়ে ছাড় দেওয়া কঠিন। তবে এতে বোঝা যায়, তথ্যের নির্ভরযোগ্য প্রবাহ ও বাস্তবসম্মত মৌসুমি লক্ষ্য নিশ্চিত করবে—এমন একটি ইলি চুক্তি দুই অর্থনীতির জন্যই কতটা মূল্যবান হতে পারে। বাণিজ্য ও অবকাঠামো উন্নয়নে কাজাখস্তান ও চীনের সহযোগিতার ভালো নজির রয়েছে। নৌপরিবহনের সময়সূচি মেনে চলার মতো পূর্বানুমানযোগ্য পানিপ্রবাহ সেই সহযোগিতাকে নদীতে প্রতিদিনের বাস্তবতায় রূপ দেবে।
অনিশ্চয়তার মুখে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা
ইলি প্রকল্পের সমর্থকেরা নদীপথে প্রতি একক পণ্য পরিবহনের কম খরচ, রেলপথে পরিবহন কঠিন এমন ভারী পণ্য নেওয়ার সক্ষমতা এবং মধ্য এশিয়ার সড়ক ও রেলপথের সঙ্গে নতুন বন্দর যুক্ত হলে তৈরি হওয়া নেটওয়ার্ক সুবিধার কথা বলছেন। শুরুতে বছরে ১০ লাখ টন এবং উন্নয়নের পর সর্বোচ্চ ৩০ লাখ টন পণ্য পরিবহনের লক্ষ্য চীন ও কাজাখস্তানের মধ্যে রেলপথে বছরে কয়েক কোটি টন পণ্য পরিবহনের তুলনায় কম। আর এটাই উদ্দেশ্য। ইলি করিডর বিদ্যমান অধিকাংশ বাণিজ্য পরিবহনের রেলপথকে প্রতিস্থাপন নয়, বরং পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে। আলমাতি ও বালখাশ হ্রদের আশপাশের বড় প্রকল্পের জন্য বাল্ক পণ্য, নির্মাণসামগ্রী ও অতিরিক্ত বড় পণ্য পরিবহনে এটি বিশেষ সুযোগ তৈরি করতে পারে। আকতাউ হয়ে ট্রান্স-কাস্পিয়ান রুটে পণ্য পাঠানোর পাশাপাশি শি'আন থেকে কাস্পিয়ান অঞ্চল পর্যন্ত কাজাখস্তান ও তার অংশীদারদের নির্মাণাধীন ডিপোগুলোর সঙ্গেও যুক্ত হতে পারে।
বিনিয়োগকারীরা নির্ভরযোগ্যতা ও ব্যয়ের ওপর গুরুত্ব দেবেন। তারা চ্যানেলের ন্যূনতম গভীরতার নিশ্চয়তা, নৌচলাচলের নির্ধারিত মৌসুম এবং নিয়মিত নদী খননের জন্য অর্থায়ন চাইবেন। ইলি বদ্বীপ ও বালখাশ হ্রদের পরিবেশগত পানিপ্রবাহ সুরক্ষার স্বচ্ছ নিয়মও তাদের দরকার হবে। পানির পরিস্থিতির পাশাপাশি শুল্কব্যবস্থার সমন্বয়, বন্দরে পণ্য ওঠানো-নামানোর পূর্বানুমানযোগ্য সময় এবং সময়সূচি বজায় রাখার মতো পর্যাপ্ত অগভীর তলদেশের নৌযান ও কর্মীও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বড় পণ্য পরিবহনকারীদের কাছ থেকে আগাম পণ্য পরিবহনের অঙ্গীকার পেলে আয়ের ঝুঁকি কমবে। পাশাপাশি, অভ্যন্তরীণ পরিবহনের বিকল্প বাড়াতে কাজাখস্তান ইর্তিশ ও উরাল-কাস্পিয়ান অববাহিকায় অন্যান্য নদী প্রকল্পও এগিয়ে নিচ্ছে। বিভিন্ন পথের সমন্বয়ে বহর গড়লে ভিন্ন ভিন্ন পানিপ্রবাহ ও অংশীদারের মধ্যে ঝুঁকি ছড়িয়ে দেওয়া যায়। সেই বহরে ইলি নদীকে স্থান করে দিতে হলে প্রথম শর্ত হলো নির্ভরযোগ্য পানিপ্রবাহ।
মূল কথা
- চীনের ইনি থেকে দক্ষিণ-পূর্ব কাজাখস্তান পর্যন্ত ইলি নদীতে নৌপরিবহন পুনরুজ্জীবিত করতে কুনায়েভের কাপচাগাই জলাধারে নতুন অভ্যন্তরীণ বন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা করছে কাজাখস্তান।
- প্রকল্পে রয়েছে ১০০ হেক্টরের সরবরাহকেন্দ্র, শুরুতে বছরে প্রায় ১০ লাখ টন পণ্য পরিবহনের লক্ষ্য এবং নদীপথ ও নৌবহরের উন্নয়নের পর তা ৩০ লাখে উন্নীত করার সম্ভাবনা।
- ইলি একটি আন্তসীমান্ত নদী; এর পানির বেশির ভাগই চীন থেকে আসে। উজানে পানির ব্যবহার, জলবায়ু পরিবর্তন ও হিমবাহ সংকুচিত হওয়ায় পানিসংকট বাড়ছে।
- বালখাশ হ্রদে আসা পানির বেশির ভাগই ইলি থেকে আসে। তাই যেকোনো নৌচলাচল পরিকল্পনায় পরিবেশগত পানিপ্রবাহ ও বদ্বীপের সুস্থতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
- প্রকৌশলগত কাজের মধ্যে থাকবে নদী খনন, চ্যানেল নিয়ন্ত্রণ ও আধুনিক নৌচলাচল সহায়ক ব্যবস্থা; পাশাপাশি দরকার হবে নতুন নৌবহর ও প্রশিক্ষিত কর্মী।
- কার্যকর নৌচলাচলের মৌসুমে পানির স্তর বেশি থাকা মাসগুলোতে ভারী পণ্য পরিবহন কেন্দ্রীভূত হবে; পানির স্তর কমলে পণ্যের পরিমাণ সীমিত করা বা চলাচল বন্ধ রাখতে হতে পারে।
- কূটনীতিই নির্ধারক। মৌসুমি পানিপ্রবাহের লক্ষ্য, স্বচ্ছ তথ্য বিনিময় ও উজানে পানি সাশ্রয়ের ব্যবস্থা নির্ভরযোগ্য নৌচলাচলের ভিত্তি তৈরি করবে।
- অর্থনৈতিকভাবে এ রুট রেলপথের পরিপূরক একটি বিশেষায়িত বিকল্প, যা বাল্ক ও অতিরিক্ত বড় পণ্যের জন্য উপযোগী। তবে বিনিয়োগকারীরা পানিপ্রবাহের স্পষ্ট নিশ্চয়তা ও নির্ভরযোগ্য পরিচালনা চাইবেন।






