ঐতিহ্য, সার্বভৌমত্ব ও দক্ষিণ চীন সাগরে নতুন এক রণাঙ্গন
প্যারাসেল দ্বীপপুঞ্জের উডি দ্বীপে, চীনা ভাষায় যার নাম ইয়ংশিং, ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণের মধ্য দিয়ে দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে চীন। হাইনান প্রাদেশিক সাংস্কৃতিক নিদর্শন ও প্রত্নতত্ত্ব ইনস্টিটিউটের একটি দল সম্প্রতি ১৯৪৬ সালের একটি ক্ষয়িষ্ণু স্মৃতিস্তম্ভ মেরামত করেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্যারাসেল দ্বীপপুঞ্জের ওপর চীনের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার স্মারক হিসেবে এটি নির্মিত হয়েছিল। সংরক্ষণবিজ্ঞানের সঙ্গে রাষ্ট্রকৌশলকে যুক্ত করা বৃহত্তর অভিযানের অংশ এই কাজ। এতে স্মৃতিস্তম্ভ, প্রত্নবস্তু ও পানির নিচের নিদর্শনকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, যেগুলোকে বেইজিং এই জলসীমায় চীনের দীর্ঘদিনের কর্মকাণ্ডের প্রমাণ বলে দাবি করে।
সূচিপত্র
- ঐতিহ্য, সার্বভৌমত্ব ও দক্ষিণ চীন সাগরে নতুন এক রণাঙ্গন
- উডি দ্বীপে কী সংরক্ষণ করা হচ্ছে
- বেইজিংয়ের কৌশলে প্রত্নতত্ত্বের ভূমিকা
- ইতিহাস ও সমুদ্র নিয়ে আইনে কী বলা আছে
- একই ইতিহাসকে অন্য দাবিদাররা যেভাবে দেখে
- প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ, নগর গঠন ও বার্তা প্রচার
- প্রবাল ও সংস্কৃতিকে ঘিরে সংরক্ষণ ও প্রভাব বিস্তার
- ঝুঁকি, সুনাম ও সহযোগিতার সুযোগ
- এক নজরে
এই উদ্যোগ কেবল বাহ্যিক সৌন্দর্য বাড়ানোর বিষয় নয়। মানচিত্র, নথিপত্র, প্রত্নতত্ত্ব ও প্রশাসনকে কাজে লাগিয়ে দাবি জোরদার করার বৃহত্তর কৌশলের অংশ এটি। প্রতিবেশী দেশগুলো এই দাবির বিরোধিতা করেছে, আর ২০১৬ সালের এক আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের রায়েও তা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইনের মতো বেইজিংয়ের বিরোধীরা একই ইতিহাসকে ভিন্নভাবে দেখে এবং অনুসন্ধান ও নিয়ন্ত্রণের নিজস্ব নথিপত্রের কথা তুলে ধরে। ফলে বিরোধটি শুধু প্রবালপ্রাচীর ও সামুদ্রিক অঞ্চল নিয়ে নয়; সমুদ্রের কোন কাহিনি স্থলভাগে সবচেয়ে দৃশ্যমান হবে, তা নিয়েও।
উডি দ্বীপের গুরুত্ব বিশেষ। দক্ষিণ চীন সাগরে বিস্তৃত দাবি পরিচালনার জন্য ২০১২ সালে সেখানে সানশা শহর প্রতিষ্ঠা করে চীন। এরপর দ্বীপটিতে বেসামরিক ও সামরিক অবকাঠামো সম্প্রসারণ করেছে। নতুন সংরক্ষণ উদ্যোগ সানশাকে সাংস্কৃতিক দায়িত্বও দিচ্ছে। এতে রাজনীতি ও ঐতিহ্যকে একসঙ্গে উপস্থাপন করা হচ্ছে এবং বৈজ্ঞানিক সংরক্ষণ দলকে উপকূলরক্ষী বাহিনীর জাহাজ ও প্রশাসনিক আদেশের পাশাপাশি অবস্থান করানো হচ্ছে।
উডি দ্বীপে কী সংরক্ষণ করা হচ্ছে
১৯৪৬ সালের স্মৃতিস্তম্ভটি জাপানের আত্মসমর্পণের পর কুওমিনতাং সরকার নির্মাণ করেছিল। প্যারাসেল ও স্প্র্যাটলি দ্বীপপুঞ্জের ওপর দাবি প্রতিষ্ঠায় চীনা নৌবাহিনীর অভিযানের আগমনকে এটি স্মরণ করিয়ে দেয়। সে সময়কার নৌবাহিনীর একটি যুদ্ধজাহাজের নামে দ্বীপটির নাম রাখা হয় ইয়ংশিং। কয়েক দশকের লবণাক্ত ও আর্দ্র বাতাসে পাথরটি ক্ষয়ে গিয়েছিল। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, বিশেষজ্ঞরা ছয় দিনের অভিযানে স্মৃতিস্তম্ভটি স্থিতিশীল করতে বিশেষভাবে তৈরি সরঞ্জাম ব্যবহার করেন এবং এর পৃষ্ঠ পরিষ্কার করেন।
সংরক্ষণকর্মীরা বলছেন, এই কাজ একবারেই শেষ হবে না। অভিযানের নেতৃত্ব দেওয়া হাইনান প্রাদেশিক সাংস্কৃতিক নিদর্শন ও প্রত্নতত্ত্ব ইনস্টিটিউটের ঝাও ইউ বলেন, দ্বীপের কঠোর জলবায়ুর প্রভাব মোকাবিলায় দলটি আবার সেখানে যাবে। ঝাও বলেন, সমুদ্রের বাতাসের ক্ষয়কারী প্রভাব কমাতে এবং স্থাপনাটির স্থায়িত্ব বাড়াতে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে।
সানশা শহর সরকার পুনরুদ্ধারের কাজটিকে স্পষ্ট রাজনৈতিক ভাষায় উপস্থাপন করেছে। তাদের বর্ণনায়, যুদ্ধকালীন দখলদারত্বের পর ফিরে পাওয়া সার্বভৌমত্বের প্রতীক এই স্মৃতিস্তম্ভ। কর্মকর্তারা একে দ্বীপগুলোতে চীনের উপস্থিতির ধারাবাহিকতার প্রতীক বলেছেন এবং জানান, আগামী কয়েক মাসে দ্বীপের অন্যান্য ঐতিহাসিক স্থাপনাও জরিপ করে স্থিতিশীল করা হবে। শহর কর্তৃপক্ষের ভাষায়:
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানের অবৈধ দখলদারত্বের পর দক্ষিণ চীন সাগরের দ্বীপগুলোর ওপর চীনের সার্বভৌমত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার শক্তিশালী সাক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়ে আছে শিশা পুনরুদ্ধার স্মৃতিস্তম্ভ।
উডি দ্বীপ এই কাহিনির একটি অংশমাত্র। প্যারাসেল দ্বীপপুঞ্জে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে বিভিন্ন স্মারকচিহ্ন, সমাধিস্থল এবং মাছ ধরা ও সামুদ্রিক বাণিজ্যের নিদর্শন। ক্ষয়, ঝড় ও অনিয়ন্ত্রিত যাতায়াতে এর অনেকগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমান অভিযানের লক্ষ্য এসব স্থানের তালিকা তৈরি, সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং সাইনবোর্ড, প্রদর্শনী ও স্কুলের পাঠ্যক্রমের মাধ্যমে সানশার জনসমক্ষে তুলে ধরা ইতিহাসের সঙ্গে এগুলোকে যুক্ত করা।
বেইজিংয়ের কৌশলে প্রত্নতত্ত্বের ভূমিকা
স্থলভাগে সংরক্ষণ উদ্যোগের পাশাপাশি পানির নিচেও বিনিয়োগ করছে চীন। দক্ষিণ চীন সাগরে চীনা গবেষণা জাহাজ ও দূরনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার জরিপ কার্যক্রম জোরদার হয়েছে। ২০২২ সালে চীনা দলগুলো জানায়, গভীর সমুদ্রে তিনটি প্রাচীন বাণিজ্যিক জাহাজের ধ্বংসাবশেষ শনাক্ত করে ৬০টির বেশি নিদর্শন উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ছিল মৃৎপাত্র, চীনামাটির বাসন ও তামার মুদ্রা; এগুলো পাওয়া গেছে ৩ হাজার মিটার পর্যন্ত গভীরতায়। চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো এসব আবিষ্কারকে চীনের দীর্ঘদিনের নৌচলাচল ও বাণিজ্যের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরে এবং এগুলো এখন ক্রমবর্ধমান এক তালিকার অংশ।
২০২৩ সালে হাইনানে একটি বিশেষায়িত প্রত্নতত্ত্ব কেন্দ্র চালু করা হয়। এর কাজ এ অঞ্চলের পানির নিচে পাওয়া নিদর্শন সংরক্ষণ ও কারিগরি দলকে প্রশিক্ষণ দেওয়া। কেন্দ্রটির দায়িত্ব সংরক্ষণমূলক এবং রাজনৈতিকও। এটি ভঙ্গুর নিদর্শন সংরক্ষণ করে, পাশাপাশি প্রদর্শনী, চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তু ও গবেষণাকাজেও উপকরণ জোগায়, যা ইতিহাস ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে রাষ্ট্রের বক্তব্যকে জোরদার করে।
চীনা সাংস্কৃতিক কর্তৃপক্ষ এই কাজকে প্রযুক্তিনির্ভর সংরক্ষণের বৃহত্তর কর্মসূচির অংশ বলে বর্ণনা করে। জাতীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য প্রশাসন নিদর্শন সুরক্ষা ও সেগুলোর প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণে স্যাটেলাইট রিমোট সেন্সিং, ড্রোন টহল এবং বিশেষায়িত গবেষণাগার বিশ্লেষণের মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করে এমন গবেষণাকেন্দ্র সম্প্রসারণ করেছে। এই কর্মসূচি জাতীয় পর্যায়ের, তবে দক্ষিণ চীন সাগরে এটি ভূরাজনীতির সঙ্গে মিলেছে। হাইনানে কেন্দ্রটি চালুর সময় তৎকালীন জাতীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য প্রশাসনের পরিচালক লি ছুন এ উদ্যোগকে জাতীয় নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরেন। লি বলেন, কেন্দ্রটি মূল রাষ্ট্রীয় স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে:
চীনের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি এগিয়ে নেওয়া এবং জাতীয় সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও সামুদ্রিক অধিকার ও স্বার্থ রক্ষায় কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
ঐতিহ্য সংরক্ষণ জনমত ও প্রভাব বিস্তারেও সহায়তা করে। জাহাজডুবির নিদর্শন ও সামুদ্রিক পথ তুলে ধরা প্রদর্শনী ও প্রামাণ্যচিত্র ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা এবং বৈজ্ঞানিক সক্ষমতার ভাবমূর্তি প্রচার করে। দেশের ভেতরে বৈধতা অর্জনে এবং বিদেশে দায়িত্বশীলতা ও উপস্থিতি দেখাতে এই বার্তা প্রচার করা হয়।
ইতিহাস ও সমুদ্র নিয়ে আইনে কী বলা আছে
ঐতিহাসিক কর্মকাণ্ড সমুদ্রে আধুনিক অধিকার দেয় কি না, এ প্রশ্নই এই বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে। জাতিসংঘের সমুদ্র আইনবিষয়ক কনভেনশন (আনক্লস) এ ক্ষেত্রে প্রধান আইনি কাঠামো। এটি উপকূলীয় রাষ্ট্রকে নিজ উপকূল বা যোগ্য দ্বীপ থেকে ১২ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত আঞ্চলিক সমুদ্রসীমা এবং ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইইজেড) দেয়। অন্য রাষ্ট্রের ইইজেডের মধ্যে থাকা সম্পদের ওপর বিস্তৃত “ঐতিহাসিক অধিকার” আনক্লস দেয় না। ফিলিপাইনের করা এক মামলায় ২০১৬ সালের সিদ্ধান্তে এই নীতির প্রতিফলন ঘটে। আনক্লসের সপ্তম সংযোজনীর অধীনে গঠিত একটি সালিশি ট্রাইব্যুনাল ফিলিপাইনের সামুদ্রিক অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত এলাকায় বিস্তৃত ঐতিহাসিক অধিকার দাবি বাতিল করে।
অনেক সংবাদশিরোনামে ২০১৬ সালের সিদ্ধান্তটি ভুলভাবে স্থায়ী সালিশি আদালতের নামে চালানো হয়। স্থায়ী সালিশি আদালত মামলার নিবন্ধক হিসেবে কাজ করেছে এবং প্রশাসনিক সহায়তা দিয়েছে, তবে রায়টি দিয়েছিল ওই মামলার জন্য বিশেষভাবে গঠিত একটি আনক্লস সালিশি ট্রাইব্যুনাল। ট্রাইব্যুনালের রায়ে কোনো দ্বীপ বা প্রবালপ্রাচীরের সার্বভৌমত্ব নির্ধারণ করা হয়নি। এতে সামুদ্রিক অধিকার নিয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয় এবং বলা হয়, স্প্র্যাটলি দ্বীপপুঞ্জের কোনো ভূখণ্ডই পূর্ণাঙ্গ ইইজেডের অধিকার দেয় না; সম্ভাব্য অঞ্চল সীমিত থাকবে আঞ্চলিক সমুদ্রসীমা বা পাথুরে ভূখণ্ডের চারপাশের ছোট অঞ্চলে।
চীন এই রায় প্রত্যাখ্যান করেছে এবং বিরোধ সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে মেটানোর ওপর জোর দেয়। ফিলিপাইন-সংক্রান্ত বিরোধ নিয়ে আনুষ্ঠানিক অবস্থানপত্রে চীন যুক্তি দেয়, কয়েক শতাব্দীর আবিষ্কার, নামকরণ, অনুসন্ধান ও প্রশাসনের মাধ্যমে দক্ষিণ চীন সাগরের দ্বীপগুলোর ওপর চীনের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দ্বীপগুলোকে দংশা, শিশা, ঝংশা ও নানশা নামে একত্রে উল্লেখ করা হয়। অবস্থানপত্রে ভূখণ্ডের ওপর চীনের সহজাত অধিকার নিয়ে একটি সুনির্দিষ্ট বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষায়:
ঐতিহাসিক আবিষ্কার, নামকরণ, অনুসন্ধান এবং সার্বভৌমত্বের ধারাবাহিক প্রয়োগের ভিত্তিতে দংশা, শিশা, ঝংশা ও নানশা দ্বীপপুঞ্জসহ দক্ষিণ চীন সাগরের দ্বীপগুলো চীনের সহজাত ভূখণ্ড।
পানির নিচের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ আইন বিষয়টিতে আরেকটি মাত্রা যোগ করেছে। আনক্লস ও পানির নিচের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যবিষয়ক ইউনেস্কো কাঠামো জাহাজডুবির স্থান ও নিদর্শন লুটপাট থেকে রক্ষার উপায় দেয়। তবে মালিকানার দাবি প্রায়ই নির্ভর করে দেশীয় আইন এবং কোনো স্থান স্বীকৃত সামুদ্রিক অঞ্চলের তুলনায় কোথায় অবস্থিত, তার ওপর। দাবিগুলো পরস্পরের ওপর পড়লে এই খণ্ডিত আইনি কাঠামো ধূসর এলাকা তৈরি করে। সহযোগিতা না থাকলে উদ্ধারকাজ ও ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি বাস্তব হয়ে ওঠে। আইনি বিশেষজ্ঞরা দাবি করা দেশগুলোকে যৌথ নথিভুক্তকরণ ও সংরক্ষণের কথা বিবেচনা করতে বলেছেন, যাতে সার্বভৌমত্ব নিয়ে বিরোধ থাকলেও নিদর্শনগুলো রক্ষা করা যায়।
একই ইতিহাসকে অন্য দাবিদাররা যেভাবে দেখে
নিজেদের ঐতিহাসিক নথি ও আধুনিক প্রশাসনের কথা তুলে ধরে চীনের বয়ানের বিরোধিতা করে ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইন। ভিয়েতনাম প্যারাসেল ও স্প্র্যাটলি, দুই দ্বীপপুঞ্জেরই দাবি করে; দেশটি দক্ষিণ চীন সাগরকে পূর্ব সাগর বলে। ভিয়েতনামের রাজবংশীয় ইতিহাসে ১৭ ও ১৮ শতক পর্যন্ত দ্বীপপুঞ্জের ভূপ্রকৃতি মাপা, মানচিত্র তৈরি ও সীমানা চিহ্নিত করার অভিযানের বর্ণনা রয়েছে। হ্যানয় ইউরোপে তৈরি এমন মানচিত্রের কথা তুলে ধরে, যেখানে প্যারাসেলকে ভিয়েতনামের বলে চিহ্নিত করা হয়েছে; পাশাপাশি দূরবর্তী ছোট দ্বীপে জেলেদের কাছ থেকে কর আদায়ের নথিও উল্লেখ করে। ১৯৭৪ সালে প্যারাসেল দ্বীপপুঞ্জের যুদ্ধ এবং ১৯৮৮ সালে জনসন রিফে সংঘর্ষের মতো প্রাণঘাতী সংঘাতও আধুনিক স্মৃতিকে প্রভাবিত করেছে।
ফিলিপাইন তার প্রধান দ্বীপগুলো থেকে উদ্ভূত আনক্লসের অধিকার এবং ২০১৬ সালের সালিশি রায়ের ওপর নির্ভর করে। সেকেন্ড থমাস শোলসহ বিভিন্ন স্থানের কাছে চীনা উপকূলরক্ষী ও সামুদ্রিক মিলিশিয়া জাহাজের সঙ্গে মুখোমুখি হওয়ার ঘটনা প্রকাশ করে টহল জোরদার করেছে ম্যানিলা। ফিলিপাইনের কর্মকর্তাদের যুক্তি, ঐতিহাসিক নৌচলাচল ও মাছ ধরা উপকূলীয় রাষ্ট্রের ইইজেডের অধিকারকে অগ্রাহ্য করতে পারে না। আনক্লসের অধীনে ফিলিপাইনের জন্য নির্ধারিত অঞ্চল থেকে ঐতিহাসিক অধিকার দাবি বাদ দিয়ে সালিশি রায় এই অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে।
এই পরস্পরবিরোধী বয়ানগুলোর একটি বাস্তব ফল রয়েছে। প্রতিটি রাষ্ট্র বর্তমান সময়ে চৌকি শক্তিশালী ও টহল বাড়ানোর পাশাপাশি অতীতের নিজস্ব বয়ান সাজায় এবং প্রচার করে। একই প্রবালপ্রাচীর বা উপহ্রদকে ঘিরে এসব বয়ান সামনে এলে উত্তেজনা বাড়ে।
প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ, নগর গঠন ও বার্তা প্রচার
বেইজিং ঐতিহ্যের সঙ্গে প্রশাসনকে যুক্ত করছে। সমুদ্রের বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে থাকা ভূখণ্ড ও জলসীমা তদারকির জন্য ২০১২ সালে সানশা গঠন করে, যার কেন্দ্র উডি দ্বীপ। ২০২০ সালে দুটি নতুন অধীনস্থ জেলা প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয় চীন। শিশা জেলার আওতায় রয়েছে প্যারাসেল ও ম্যাকলসফিল্ড ব্যাংক; নানশা জেলার আওতায় স্প্র্যাটলি দ্বীপপুঞ্জ, যেখানে ফায়ারি ক্রস রিফে একটি কার্যালয় রয়েছে। এই পুনর্গঠনের মাধ্যমে বিতর্কিত এলাকায় বেসামরিক কর্মকর্তা, বাজেট ও পুলিশি ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়েছে। পরিবর্তনের নিন্দা জানিয়ে নিজেদের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছে ভিয়েতনাম।
সমুদ্রে চীনের উপকূলরক্ষী বাহিনী ও সামুদ্রিক মিলিশিয়া এসব ভূখণ্ডের আশপাশে সক্রিয়; অন্য দাবিদারদের জাহাজও সেখানে রয়েছে। ধাক্কা দেওয়া, রসদ সরবরাহে বাধা এবং মাছ ধরার নৌকা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা ঘটছে। প্রশাসনিক সম্প্রসারণ বেইজিংকে স্থায়ী উপস্থিতি বজায় রাখার আরও উপায় দিয়েছে। একই সঙ্গে স্মৃতিস্তম্ভ পুনরুদ্ধার ও জাদুঘরের কাজের মতো সামরিক নয় এমন পদক্ষেপকে নিয়মিত স্থানীয় প্রশাসনের অংশ হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগও তৈরি হয়েছে।
এই কাঠামোতে ঐতিহ্য প্রশাসনের দৃশ্যমান ও কম ঝুঁকিপূর্ণ চিহ্ন হিসেবে কাজ করে। পুনরুদ্ধার করা স্মৃতিস্তম্ভ, সংরক্ষিত জাহাজডুবির স্থান এবং সানশার জাদুঘরে নতুন প্রদর্শনী সামুদ্রিক কোনো সংঘাত বা আইনি পদক্ষেপের আগেই প্রতিদিন দাবির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
প্রবাল ও সংস্কৃতিকে ঘিরে সংরক্ষণ ও প্রভাব বিস্তার
চীনা সংস্থাগুলো পরিবেশ রক্ষার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রকৃতি সংরক্ষণাগার ঘোষণা, অবৈধ মাছ ধরার বিরুদ্ধে টহল এবং প্রবাল পুনরুদ্ধার প্রকল্প বৈজ্ঞানিক লক্ষ্য পূরণের পাশাপাশি রাজনৈতিক বার্তাও বহন করে। আন্তর্জাতিকভাবে স্কারবরো শোল নামে পরিচিত হুয়াংইয়ান দ্বীপকে প্রবাল সুরক্ষার জন্য গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরা হয়েছে। জরিপে এলাকাটিতে শতাধিক প্রবাল প্রজাতি শনাক্ত হয়েছে। দাবি করা হয়েছে, এগুলোর তাপসহনশীলতা সমুদ্রের তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে আঞ্চলিক প্রবালপ্রাচীরের স্থিতিস্থাপকতা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। চীনের বিবৃতিতে এই কাজকে জাতীয় পরিবেশনীতি ও বৈশ্বিক পরিবেশগত অগ্রাধিকারের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
স্থলভাগে সামুদ্রিক পরিচয়ের সঙ্গে পর্যটন ও বিজ্ঞানকে যুক্ত করে এমন সাংস্কৃতিক অবকাঠামোয় বিনিয়োগ করছে চীন। একটি বড় স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান পরিকল্পিত সানিয়া সাংস্কৃতিক এলাকা হাইনানের দক্ষিণ উপকূলে, দক্ষিণ চীন সাগরের দিকে মুখ করে স্থানীয় বাসিন্দা ও লাখ লাখ দর্শনার্থীর সেবায় গড়ে তোলার কথা রয়েছে। সারা দেশে গবেষণাকেন্দ্রগুলো নিদর্শন সংরক্ষণে উন্নত উপকরণবিজ্ঞান, চিত্রায়ন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কাজে লাগাচ্ছে। দক্ষিণ চীন সাগর থেকে পাওয়া নিদর্শন সংরক্ষণকারী প্রতিষ্ঠানসহ উপকূলীয় জাদুঘর ও সংরক্ষণাগারে থাকা ভঙ্গুর নিদর্শন রক্ষায় এসব সক্ষমতা ব্যবহার করা যেতে পারে।
সংরক্ষণ প্রকল্প স্বভাবতই সংঘাতমূলক নয়। সমুদ্রে বিরোধ থাকা রাষ্ট্রগুলোর মধ্যেও এগুলো বৈজ্ঞানিক বিনিময় ও যৌথ পর্যবেক্ষণের সুযোগ তৈরি করতে পারে। সামুদ্রিক শান্তি উদ্যানের ধারণা কয়েক দশক ধরেই আলোচিত। স্প্র্যাটলি দ্বীপপুঞ্জে একাধিক পক্ষের যৌথ ব্যবস্থাপনায় একটি সংরক্ষিত এলাকা, যেখানে গবেষণা ভাগাভাগি করা হবে এবং উদ্ধার ও মাছ ধরার বিষয়ে কঠোর নিয়ম থাকবে, তা বাস্তুতন্ত্র রক্ষা ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান অক্ষত রাখতে পারে; সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন থাকবে আলাদা। রাজনৈতিক আস্থা কম, তবু সামুদ্রিক বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সীমিত সহযোগিতার বাস্তব ক্ষেত্র হতে পারে।
ঝুঁকি, সুনাম ও সহযোগিতার সুযোগ
ঐতিহ্যকে গুরুত্ব দেওয়ার এই প্রবণতায় সুনাম অর্জনের সুযোগ যেমন আছে, ঝুঁকিও রয়েছে। সংরক্ষণ যদি আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা অনুসরণ করে, দায়িত্বশীল সহযোগিতার সুযোগ দেয় এবং স্থানগুলোকে লুটপাট থেকে রক্ষা করে, তাহলে তা দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে পারে। প্রতিবেশীদের বাদ দিয়ে এর সঙ্গে সামুদ্রিক চাপ প্রয়োগ যুক্ত হলে, একে চাপ সৃষ্টির আরেকটি হাতিয়ার হিসেবে দেখা হবে। পুনরুদ্ধার করা স্মৃতিস্তম্ভ ও খনন করা জাহাজডুবির নিদর্শনের পেছনের উদ্দেশ্য অন্যরা কীভাবে দেখবে, তা এই ভারসাম্যের ওপর নির্ভর করবে।
আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য পরিচিত পদক্ষেপগুলো এখনো জরুরি। দাবিদার দেশগুলো তাদের আইন ও দাবিকে আনক্লসের সঙ্গে আরও সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে পারে। ঘটনা ঠেকাতে উপকূলরক্ষী বাহিনীর মধ্যে হটলাইন ও অভিন্ন নিয়ম দরকার। মৎস্য ও পরিবেশবিষয়ক সংস্থাগুলো প্রবালের স্বাস্থ্য ও অবৈধ মাছ ধরাসহ বিভিন্ন তথ্য ভাগাভাগি করতে পারে। পানির নিচের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠানগুলো বিতর্কিত জলসীমার স্থানগুলো যৌথভাবে নথিভুক্ত করার প্রটোকল তৈরি করতে পারে; এতে মালিকানা হস্তান্তরের স্পষ্ট ধারাবাহিকতা এবং খননের সম্মত সীমা থাকবে। এসব পদক্ষেপ সার্বভৌমত্বের বিরোধ মেটাবে না। তবে কূটনীতি চলার সময় ঝুঁকি কমাতে ও সম্পদ রক্ষা করতে পারে।
এক নজরে
- প্যারাসেল দ্বীপপুঞ্জের উডি দ্বীপে ১৯৪৬ সালের একটি সার্বভৌমত্বের স্মৃতিস্তম্ভ মেরামত করেছে চীন; সানশার প্রশাসনিক এলাকার অন্য স্থানেও সংরক্ষণকাজ চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
- স্থানীয় কর্তৃপক্ষ স্মৃতিস্তম্ভটিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের দখলদারত্বের পর পুনঃপ্রতিষ্ঠিত সার্বভৌমত্বের প্রতীক বলে বর্ণনা করেছে।
- পানির নিচে প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান বেড়েছে; গভীর সমুদ্রের জাহাজডুবির স্থান থেকে কয়েক ডজন নিদর্শন উদ্ধার করে হাইনানের নতুন কেন্দ্রে সংরক্ষণ করা হয়েছে।
- বেইজিং ঐতিহ্য সংরক্ষণকে জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত করে; কর্মকর্তাদের ভাষ্য, এ কাজ সংস্কৃতি, সার্বভৌমত্ব এবং সামুদ্রিক অধিকারকে সমর্থন করে।
- ২০১৬ সালের আনক্লস সালিশি রায় অন্য রাষ্ট্রের ইইজেডের ভেতরে বিস্তৃত ঐতিহাসিক অধিকার দাবি নাকচ করে; চীন এই রায় প্রত্যাখ্যান করেছে।
- ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইন নিজেদের ঐতিহাসিক দাবি ও আইনি অবস্থান তুলে ধরছে; এতে পরস্পরবিরোধী বয়ান ও সমুদ্রে ঘনঘন মুখোমুখি হওয়ার ঘটনা বাড়ছে।
- ২০২০ সালে সানশার অধীনে দক্ষিণ চীন সাগরে নতুন প্রশাসনিক জেলা গঠন করে চীন; ভিয়েতনাম একে অবৈধ বলে প্রতিবাদ জানায়।
- হুয়াংইয়ান দ্বীপে প্রবাল সুরক্ষাসহ পরিবেশ রক্ষার বিষয়টি সাংস্কৃতিক প্রকল্পের পাশাপাশি চীনের বার্তা প্রচারে স্থান পাচ্ছে।
- সার্বভৌমত্বের বিরোধ চললেও বিজ্ঞান, মৎস্যসম্পদ ও পানির নিচের ঐতিহ্য নিয়ে বাস্তব সহযোগিতা ঝুঁকি কমাতে পারে।






