দক্ষিণ এশিয়ায় চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে পানির ব্যবহার নিয়ে আপত্তি
প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি দোহায় এক বৈশ্বিক ফোরামে সতর্ক করে বলেছেন, এপ্রিলে কাশ্মীরে হামলার পর ভারতের সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিতের সিদ্ধান্ত টিকবে না। তিনি পানিকে সর্বজনীন মানবাধিকার হিসেবে অভিহিত করেন এবং নদীকে চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার বানানোর বিরুদ্ধে সতর্ক করেন। নয়াদিল্লি বলছে, পাকিস্তান আন্তঃসীমান্ত জঙ্গি তৎপরতা নিয়ন্ত্রণ না করা পর্যন্ত চুক্তিটি স্থগিত থাকবে। ইসলামাবাদের পাল্টা বক্তব্য, চুক্তিতে একতরফা স্থগিতের কোনো ধারা নেই; পানিপ্রবাহে পাকিস্তানের অংশ কমানোর যেকোনো চেষ্টাকে যুদ্ধের পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। চুক্তির অধীনে গঠিত হেগভিত্তিক একটি ট্রাইব্যুনাল বলেছে, ভারতের অবস্থান সত্ত্বেও কার্যক্রম ও বাধ্যবাধকতা অব্যাহত রয়েছে। তবে ভারত ট্রাইব্যুনালের কর্তৃত্ব প্রত্যাখ্যান করেছে।
সূচিপত্র
- দক্ষিণ এশিয়ায় চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে পানির ব্যবহার নিয়ে আপত্তি
- সিন্ধু পানি চুক্তিতে কী বলা আছে
- নদীগুলোর বণ্টন যেভাবে
- বিরোধ নিষ্পত্তি যেভাবে
- ভারতের অবস্থান ও অভ্যন্তরীণ প্রেক্ষাপট
- হেগে আইনি লড়াই
- ভারত কি সত্যিই পাকিস্তানে পানিপ্রবাহ বন্ধ করতে পারে
- প্রবাহভিত্তিক জলবিদ্যুতের সীমা ও প্রকৌশলগত বাস্তবতা
- পানিপ্রবাহের তথ্য ও সময়
- জলবায়ু পরিবর্তন ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি
- খাদ্য, জ্বালানি ও রোগব্যাধি
- কাশ্মীর প্রসঙ্গ ও উত্তেজনা বৃদ্ধির ঝুঁকি
- উত্তেজনা কমাতে কী করা যেতে পারে
- মূল কথা
এর ঝুঁকি অনেক বড়। প্রায় ২৪ কোটি জনসংখ্যার পাকিস্তান খাদ্য, কর্মসংস্থান ও বিদ্যুতের জন্য সিন্ধু অববাহিকার ওপর নির্ভরশীল। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দেশের শুষ্ক কৃষিজমির অধিকাংশে এই অববাহিকার পানি দিয়ে সেচ দেওয়া হয়। এ ব্যবস্থা থেকে উৎপাদিত জলবিদ্যুৎ দেশের বিদ্যুতের বড় একটি অংশ জোগায়। যেকোনো বিঘ্নের প্রভাব পড়বে কৃষি, শহরের পানির সরবরাহ ও শিল্পে। বিরোধটি পারমাণবিক অস্ত্রধারী দুই প্রতিবেশীর দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন আরও বাড়িয়েছে। এমন এক সময়ে এর সূত্রপাত, যখন হিমালয়ের হিমবাহ ও অনিয়মিত মৌসুমি বৃষ্টিতে পুষ্ট নদীগুলোর ওপর জলবায়ুর চাপ বাড়ছে।
দোহায় সামাজিক উন্নয়নবিষয়ক দ্বিতীয় বিশ্ব সম্মেলনে বক্তব্য দিতে গিয়ে জারদারি বিষয়টিকে নৈতিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরেন এবং সতর্ক করেন যে পাকিস্তান চুক্তির অধিকার রক্ষা করবে। তিনি পানির ওপর চাপের সঙ্গে জলবায়ুজনিত ঝুঁকি ও দারিদ্র্য হ্রাসের সম্পর্ক তুলে ধরেন।
প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি বলেছেন, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পানিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার সফল হবে না; পানি কোনো দেশকে বাধ্য করার হাতিয়ার নয়, বরং সর্বজনীন মানবাধিকার হিসেবেই থাকতে হবে।
সিন্ধু পানি চুক্তিতে কী বলা আছে
বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় কয়েক বছরের আলোচনার পর ১৯৬০ সালে স্বাক্ষরিত সিন্ধু পানি চুক্তিতে সিন্ধু নদীব্যবস্থার ছয়টি নদীর নিয়ন্ত্রণ ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ভাগ করা হয়। চুক্তিটি ব্যতিক্রমী, কারণ এতে সব সময় সমান ভাগে পানি বণ্টনের বদলে পুরো নদীগুলো বরাদ্দ করা হয়েছে। যুদ্ধ ও ঘনঘন সংকটের মধ্যেও এই কাঠামো টিকে আছে। চুক্তিতে একটি স্থায়ী কমিশন, জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নকশা-সংক্রান্ত কারিগরি বিধি এবং বিরোধ নিষ্পত্তির এমন ধাপও রয়েছে, যা আন্তর্জাতিক সালিশি পর্যন্ত গড়াতে পারে।
নদীগুলোর বণ্টন যেভাবে
চুক্তি অনুযায়ী, পূর্বাঞ্চলের তিন নদী রাভি, বিয়াস ও শতদ্রুর পানি পায় ভারত। পশ্চিমাঞ্চলের তিন নদী—সিন্ধুর মূলধারা, ঝিলম ও চেনাব—পায় পাকিস্তান। পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলো ভারত ভোগমূলক নয় এমন কাজে, যেমন প্রবাহভিত্তিক জলবিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার করতে পারে, তবে প্রকল্পগুলোকে এমন কঠোর নকশা বিধি মানতে হবে, যা পানি মজুত সীমিত রাখে এবং পাকিস্তানে প্রবাহে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটায় না। অন্যদিকে, পূর্বাঞ্চলের নদীগুলো ব্যবহারে ভারতকে বাধা দিতে পারে না পাকিস্তান।
বিরোধ নিষ্পত্তি যেভাবে
চুক্তিতে স্থায়ী সিন্ধু কমিশন গঠন করা হয়েছে, যেখানে দুই পক্ষ তথ্য বিনিময় করে এবং উদ্বেগ নিয়ে আলোচনায় বসে। কারিগরি মতবিরোধ নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠানো যেতে পারে। আইনি মতবিরোধ হেগের স্থায়ী সালিশি আদালতের অধীনে গঠিত সালিশি আদালতে যেতে পারে। ঝিলম ও চেনাব নদীর ওপর কিষানগঙ্গা ও রাতলে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে পাকিস্তানের আপত্তি বর্তমানে এই আদালতে বিবেচনাধীন। মামলার তথ্য ও এখতিয়ার এবং ব্যাখ্যা-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত স্থায়ী সালিশি আদালতের ট্রাইব্যুনাল রেজিস্ট্রি প্রকাশ করে। মামলার পৃষ্ঠা এখানে পাওয়া যাবে।
চুক্তিতে নির্ধারিত মধ্যস্থতাকারী বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা চুক্তিটির অবস্থান স্পষ্ট ভাষায় ব্যাখ্যা করেছেন।
অজয় বাঙ্গা বলেছেন, চুক্তিতে কোনো পক্ষের একতরফাভাবে এটি স্থগিত করার বিধান নেই; যেকোনো পরিবর্তনে দুই দেশের সম্মতি প্রয়োজন।
ভারতের অবস্থান ও অভ্যন্তরীণ প্রেক্ষাপট
ভারতের যুক্তি, চুক্তিটি পাকিস্তানের পক্ষে হেলে আছে এবং বর্তমান বাস্তবতা প্রতিফলিত করে না। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, পানির ওপর বাড়তে থাকা চাপ এবং জলবায়ুজনিত সংকটকে বাধ্যবাধকতা পুনর্বিবেচনার কারণ হিসেবে তুলে ধরে নয়াদিল্লি। তারা চুক্তি সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে এবং প্রকল্পের নকশা চুক্তির বিধি মেনে চলছে দাবি করে পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলোতে জলবিদ্যুৎ উন্নয়নের কাজ এগিয়ে নিয়েছে। এপ্রিলে পহেলগামের কাছে পর্যটকদের ওপর হামলার পর সরকার বলেছে, পাকিস্তান ভারতের ভাষায় আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসবাদে সমর্থন বন্ধ না করা পর্যন্ত চুক্তি স্থগিত থাকবে।
জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে পাকিস্তানের আপত্তি শুনছে যে সালিশি সংস্থা, তার কর্তৃত্বও ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রত্যাখ্যান করেছে। মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য, এই ফোরাম চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে মন্ত্রণালয় সালিশি রায়গুলো খারিজ করে আদালত গঠনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, সালিশি আদালতের কোনো আইনি বৈধতা নেই এবং এর রায় অকার্যকর। মন্ত্রণালয় আরও বলেছে, ভারত এই সালিশি সংস্থাকে কখনো স্বীকৃতি দেয়নি।
ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রকাশ্যে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে চুক্তি পুনর্বহাল করা হবে না বলে তিনি অঙ্গীকার করেছেন এবং পানিতে পাকিস্তানের অধিকারকে অন্যায্য বলে বর্ণনা করেছেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছেন, সিন্ধু পানি চুক্তি কখনো পুনর্বহাল করা হবে না এবং অন্যায্যভাবে যে পানি পাকিস্তান পেয়ে আসছে, তা থেকে দেশটিকে বঞ্চিত করা হবে।
হেগে আইনি লড়াই
পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলোতে ভারতের জলবিদ্যুৎ পরিকল্পনা নিয়ে পাকিস্তান ২০১৬ সালে সালিশি কার্যক্রম শুরু করে এবং মামলাটি এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সালিশি আদালত প্রক্রিয়া ও এখতিয়ার নিয়ে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত দিয়েছে। এর মধ্যে ২০২৫ সালের একটি রায়ে আদালত নিশ্চিত করেছে যে কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার এখতিয়ার তার রয়েছে। ফোরামটি চুক্তির অধীনে বৈধ নয় এবং এর বদলে নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞের পথ ব্যবহার করা উচিত—এ যুক্তিতে ভারত অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ট্রাইব্যুনাল কাজ চালিয়ে যাচ্ছে; এর মধ্যে রয়েছে প্রকল্পের বিভিন্ন দিক চুক্তির কঠোর নকশা-সীমা মানছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে সরেজমিন পরিদর্শন ও শুনানি। প্রকাশিত নথিতে এ বিষয়টির ওপর গুরুত্ব দেওয়ার ইঙ্গিত রয়েছে।
সালিশি আদালতের প্রশাসনিক দায়িত্বে রয়েছে স্থায়ী সালিশি আদালত, যা রেজিস্ট্রি হিসেবে কাজ করে এবং লজিস্টিক সহায়তা দেয়। ট্রাইব্যুনালে আন্তর্জাতিক আইনবিদ ও কারিগরি বিশেষজ্ঞরা রয়েছেন। ভারত প্রক্রিয়াটি প্রত্যাখ্যান করলেও চুক্তির ভাষ্য অনুযায়ী, আইনি প্রশ্নে দুই পক্ষের মতবিরোধ হলে এর বিধান ব্যাখ্যা করা আদালতের কাজ। পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলোতে জলবিদ্যুৎ উন্নয়নের ফলে যেন পাকিস্তানের ওই পানি ব্যবহারে বাধা না পড়ে, তা নিশ্চিত করাও এর দায়িত্ব।
কূটনৈতিক পরিসরেও চাপ বাড়িয়েছে পাকিস্তান। জলবায়ু ও নিরাপত্তাবিষয়ক জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের এক অধিবেশনে বক্তব্য দিতে গিয়ে পাকিস্তানের স্থায়ী প্রতিনিধি অভিন্ন নদীকে ইচ্ছাকৃতভাবে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের সমালোচনা করেন এবং চুক্তি মেনে চলার আহ্বান জানান।
রাষ্ট্রদূত আসিম ইফতিখার বলেছেন, কোনো দেশকে এককভাবে বাধ্যবাধকতা স্থগিত করার অনুমতি দেয় এমন ধারা চুক্তিতে নেই। তিনি সতর্ক করে বলেন, সিন্ধু কাঠামো দুর্বল হলে খাদ্য ও জ্বালানির জন্য নদীর অনুমানযোগ্য প্রবাহের ওপর নির্ভরশীল লাখো মানুষের জীবন ঝুঁকিতে পড়বে।
ভারত কি সত্যিই পাকিস্তানে পানিপ্রবাহ বন্ধ করতে পারে
রাজনৈতিক হুমকির মতোই গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি সীমাবদ্ধতাও। দ্রুত সময়ের মধ্যে পাকিস্তানে যাওয়া অধিকাংশ পানিপ্রবাহ থামানো বা ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো বড় জলাধার পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলোতে ভারতের নেই। চুক্তির বিধি কয়েক দশক ধরে নতুন করে পানি মজুতের সুযোগ সীমিত করেছে; নতুন বড় প্রকল্প নির্মাণেও বহু বছর লাগবে। ভারত প্রবাহভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ব্যবহার করতে পারে, যেখান থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পর অধিকাংশ পানি ভাটিতে ছেড়ে দেওয়া হয়। পলি অপসারণের জন্য পানি ছাড়া, রক্ষণাবেক্ষণের সময় নির্ধারণ বা পানি অন্যদিকে সরিয়ে স্বল্প সময়ের প্রবাহে প্রভাবও ফেলতে পারে। এসব পদক্ষেপে বিশেষত শীতকালে পাকিস্তান সামান্য হলেও বিঘ্নের মুখে পড়তে পারে; তবে এতে উজানের ভারতীয় কৃষক ও বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। সবচেয়ে তাৎক্ষণিক চাপের হাতিয়ার হলো তথ্য বিনিময় ও সমন্বয়, যা ভারত স্থগিত করেছে।
প্রবাহভিত্তিক জলবিদ্যুতের সীমা ও প্রকৌশলগত বাস্তবতা
প্রবাহভিত্তিক জলবিদ্যুৎ বড় জলাধারে পানি ধরে রাখার বদলে প্রাকৃতিক প্রবাহের ওপর নির্ভর করে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিচালকেরা সুড়ঙ্গ দিয়ে পানি ঘুরিয়ে টারবাইন চালান, পরে তা নদীতে ফিরিয়ে দেন। পানি মজুতের ব্যবস্থা থাকলেও তা সীমিত এবং মূলত দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদার সর্বোচ্চ সময় সামাল দিতে ব্যবহৃত হয়। ফলে চুক্তির সীমার বাইরে নতুন অবকাঠামো নির্মাণ ছাড়া দীর্ঘ সময়ের জন্য ভাটির প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো কঠিন। নতুন কোনো জলাধার চালু করার আগেই হিমালয়ের পাদদেশে প্রকৌশল দলগুলোকে অনুমোদন, অর্থায়ন ও ভূ-প্রযুক্তিগত বড় বাধা মোকাবিলা করতে হবে।
পানিপ্রবাহের তথ্য ও সময়
চুক্তিতে নিয়মিত জলবিদ্যাগত তথ্য বিনিময় ও পরামর্শের কথা রয়েছে। এর ফলে দুই দেশ বন্যার প্রস্তুতি নিতে, শুষ্ক মাসগুলোতে সীমিত পানি বণ্টন করতে এবং জলাধার পরিচালনা করতে পারে। অভিন্ন তথ্য না থাকলে উজানের পরিস্থিতি সম্পর্কে পাকিস্তানের পরিকল্পনাকারীদের অনুমান করতে হয়। এতে বন্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে, বীজ বপনের মৌসুম পিছিয়ে যেতে পারে এবং বিদ্যুৎ সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা কমতে পারে। পাকিস্তানের সীমিত পানি সংরক্ষণক্ষমতা ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দেয়। বিশ্লেষকদের অনুমান, নবায়নযোগ্য পানির সিংহভাগের জন্য দেশটি সিন্ধু ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল; জলাধারে পলি জমে শুষ্ক সময় পার করার প্রয়োজনীয় সুরক্ষাও কমে গেছে।
জলবায়ু পরিবর্তন ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি
উচ্চ হিমালয়ে উষ্ণতা বাড়ায় সিন্ধুর পানিপ্রবাহের ছন্দ বদলে যাচ্ছে। হিমবাহ সরে যাচ্ছে, বরফ আগেভাগে গলছে এবং মৌসুমি বৃষ্টিপাত আরও অনিয়মিত হচ্ছে। শহর সম্প্রসারণ ও কৃষি আরও নিবিড় হওয়ায় ভারত ও পাকিস্তান—দুই দেশেই পানির চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। শুষ্ক বছরগুলোতে একসময় সুরক্ষা দিত এমন ভূগর্ভস্থ পানির মজুত কমে যাচ্ছে। জলবায়ুর চাপ আন্তঃসীমান্ত নদী নিয়ে অনিশ্চয়তার খরচ বাড়ায়। সমন্বয় ভেঙে পড়লে চরম পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়; এমন সময় এক দিন আগাম সতর্কতা পেলেও ফসল বাঁচানো বা শহরের পানি উত্তোলন কেন্দ্র রক্ষা করা সম্ভব হতে পারে।
খাদ্য, জ্বালানি ও রোগব্যাধি
সিন্ধু ও এর খালগুলো থেকে নির্ভরযোগ্য সেচের পানির ওপর পাকিস্তানের কৃষি অর্থনীতি নির্ভরশীল। পানিপ্রবাহে বিঘ্ন বা অসময়ে পানি ছাড়লে ফলন ব্যাপকভাবে কমতে পারে, নিম্ন অববাহিকায় লবণাক্ততা বাড়তে পারে এবং খাদ্যের দাম বাড়তে পারে। জলবিদ্যুৎ ঘাটতিতে বিদ্যুতের খরচ বাড়ে এবং ব্যয়বহুল জ্বালানির ওপর নির্ভরতা বাড়ে। জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি গুরুতর। পানীয় জলের সংখ্যালঘু অংশকেই নিরাপদ বলে বিবেচনা করা হয়; আর পানিবাহিত রোগ ইতিমধ্যেই অসুস্থতার বড় একটি অংশের জন্য দায়ী। পানির প্রবাহ কমে গেলে এবং দূষণ বাড়লে রোগজীবাণুর সংস্পর্শ বাড়বে, শিশুদের শারীরিক বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং হাসপাতালের ওপর চাপ পড়বে। বর্জ্যপানি পাতলা করতে সিন্ধুর ওপর নির্ভরশীল শহরগুলো শুষ্ক মাসে পানির মানের আরও তীব্র ওঠানামার মুখে পড়বে।
কাশ্মীর প্রসঙ্গ ও উত্তেজনা বৃদ্ধির ঝুঁকি
জম্মু ও কাশ্মীরের ভেতরে ও আশপাশের সংঘাত থেকে সিন্ধু চুক্তির সংকটকে আলাদা করে দেখা যায় না। এপ্রিলে পহেলগামের কাছে পর্যটকদের প্রাণঘাতী হামলার পর ভারত পাকিস্তানভিত্তিক গোষ্ঠীগুলোকে দায়ী করে এবং পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে চুক্তি স্থগিতের ঘোষণা দেয়। এরপর আন্তঃসীমান্ত হামলা হয়। পরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঠেকাতে সাহায্য করে। দুই পক্ষের রাজনৈতিক নেতারা জাতীয় স্বার্থ রক্ষার অঙ্গীকার এবং নদীর প্রবাহে হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে সতর্ক করায় বাগ্যুদ্ধ তীব্রই রয়েছে।
পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলোর প্রবাহ কমানোর যেকোনো প্রচেষ্টা প্রতিহত করার অঙ্গীকার করেছে পাকিস্তানের নির্বাচিত নেতৃত্ব। প্রধানমন্ত্রী স্পষ্টভাবে একটি চূড়ান্ত সীমারেখার কথা বলেছেন।
প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ বলেছেন, পাকিস্তানের প্রাপ্য এক ফোঁটা পানিও ভারতকে নিতে দেবে না পাকিস্তান।
দুই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলতে পারে। জাতীয় গর্ব, পানির সংকট এবং কাশ্মীর-সংশ্লিষ্ট বিরোধ নীতিনির্ধারকদের কঠোর অবস্থান নিতে প্ররোচিত করতে পারে। সাধারণত প্রকৌশলী ও সরকারি কর্মকর্তারা নিয়মিত সহযোগিতার মাধ্যমে পানিব্যবস্থাপনা করেন। তবে আনুষ্ঠানিক আলোচনা বন্ধ থাকায় সেই স্থিতিশীলতা দুর্বল হয়েছে।
উত্তেজনা কমাতে কী করা যেতে পারে
সম্পর্কে টানাপোড়েন থাকলেও বাস্তবসম্মত কিছু পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব। দুই পক্ষ স্থায়ী সিন্ধু কমিশনের নিয়মিত বৈঠক আবার শুরু করতে পারে এবং নদীর প্রবাহ ও বাঁধ পরিচালনার তথ্য বিনিময় নীরবে পুনরায় চালু করতে পারে। প্রচার ছাড়াই কারিগরি পর্যায়ে যোগাযোগ করা সম্ভব, যা বন্যার মৌসুমে জীবন বাঁচাতে পারে। পলি অপসারণের জন্য পানি ছাড়া, জলাধারের পানি নামানোর হার এবং রক্ষণাবেক্ষণজনিত বন্ধের সময়সূচি নিয়ে সীমিত পরিচালনাগত সমঝোতা ভাটির দেশের জন্য অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি কমাবে। নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ ও বিশ্বব্যাংকের নির্ধারিত ভূমিকা বড় রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়াই নির্দিষ্ট কারিগরি মতবিরোধ মেটানোর সুযোগ দেয়।
দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য দেশের অভ্যন্তরে বিনিয়োগ ও সংস্কার দরকার। পাকিস্তান নদী থেকে দূরে পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা বাড়াতে, খালের টেলিমেট্রি উন্নত করতে, পানি পরিবহনের ক্ষতি কমাতে এবং পানির মান নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। ভারত এমন প্রকল্পের নকশাকে অগ্রাধিকার দিতে পারে, যাতে ভাটির দিকে নদীর প্রবাহ অনুমানযোগ্য থাকে; পাশাপাশি খরা ও বন্যা সামলাতে পাকিস্তানকে সহায়তা করে এমন তাৎক্ষণিক তথ্য ভাগ করে নিতে পারে। উন্মুক্ত তথ্যের ভিত্তিতে যৌথভাবে হিমবাহ ও তুষারস্তর পর্যবেক্ষণ দুই পক্ষেরই কাজে আসবে। এসব পদক্ষেপের কোনোটিই বৃহত্তর বিরোধ মেটাবে না। তবে শুষ্ক শীতকাল বা অসময়ে জলাধার থেকে পানি ছাড়া সংকটকে আরও তীব্র করে তোলার আশঙ্কা কমাতে পারে।
মূল কথা
- ২০২৫ সালের এপ্রিলে কাশ্মীরে হামলার পর ভারত সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত করে। পাকিস্তানের বক্তব্য, একতরফা স্থগিত অবৈধ এবং পানিপ্রবাহ কমানোর যেকোনো পদক্ষেপ যুদ্ধের শামিল হবে।
- চুক্তির অধীনে গঠিত হেগভিত্তিক ট্রাইব্যুনাল বলেছে, চুক্তি কার্যকর রয়েছে এবং এর এখতিয়ার আছে। ভারত ট্রাইব্যুনালের কর্তৃত্ব প্রত্যাখ্যান করেছে।
- প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি বলেছেন, পানিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার সফল হবে না; তিনি পানিকে সর্বজনীন মানবাধিকার হিসেবে অভিহিত করেছেন।
- ভারতের যুক্তি, চুক্তি পুরোনো ও অন্যায্য; দেশটি সংশোধন চাইছে এবং জলবিদ্যুৎ বিরোধের সালিশি রায় প্রত্যাখ্যান করেছে।
- কারিগরি সীমাবদ্ধতার কারণে এখনই পানিপ্রবাহ থামানোর ক্ষমতা ভারতের সীমিত। পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলোতে প্রবাহভিত্তিক জলবিদ্যুৎ ও পানি সংরক্ষণের সীমাবদ্ধতা বড় আকারে পানি সরানো কঠিন করে তোলে।
- সীমিত পানি সংরক্ষণ, সেচের বিশাল চাহিদা এবং জলবিদ্যুতের ওপর উল্লেখযোগ্য নির্ভরতার কারণে পাকিস্তান সিন্ধু নদীব্যবস্থার ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল।
- জলবায়ু পরিবর্তনে পানিপ্রবাহ আরও অস্থির হচ্ছে। সহযোগিতা কমলে কৃষি, বিদ্যুৎ ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বাড়ে।
- তথ্য বিনিময় নীরবে পুনরায় চালু করা, কমিশনের বৈঠক শুরু করা এবং কারিগরি সমঝোতা বৃহত্তর বিরোধ অমীমাংসিত থাকলেও ঝুঁকি কমাতে পারে।






