দ্রুত বদলে যাওয়া প্রতারণা: প্রেমের সঙ্গে ক্রিপ্টোর যোগ
২০২৫ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় ক্রিপ্টোকারেন্সিতে বিনিয়োগের প্রলোভন দেখিয়ে প্রেমের সম্পর্কের আড়ালে প্রতারণার ঘটনা বেড়েছে। এতে আবেগকে কাজে লাগানোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চাতুর্যপূর্ণ আর্থিক জালিয়াতি। ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির এক আইনপ্রণেতার কাছে জমা দেওয়া পুলিশি তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রেমের ফাঁদে প্রতারণার ১,৫৬৫টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এ বছর ক্ষতির পরিমাণ ১০ হাজার কোটি ওন ছাড়িয়েছে। ২০২৪ সালের তুলনায় গ্রেপ্তারের হার বেড়েছে, তবে অর্ধেকেরও কম ঘটনায় সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই প্রবণতা এমন এক অপরাধপদ্ধতির ইঙ্গিত দেয়, যা সহজে বড় পরিসরে ছড়ানো যায়, প্রযুক্তিনির্ভর এবং উপস্থাপনায় ক্রমেই স্থানীয় হয়ে উঠছে।
সূচিপত্র
- দ্রুত বদলে যাওয়া প্রতারণা: প্রেমের সঙ্গে ক্রিপ্টোর যোগ
- কোরীয় প্রেক্ষাপটে পিগ বুচারিং যেভাবে কাজ করে
- পরিসংখ্যানে: ঘটনা, ক্ষতি ও গ্রেপ্তার
- বিদেশি পরিচয় থেকে সাবলীল স্থানীয় ছদ্মবেশ
- এআইয়ের কারণে প্রতারণা আরও বাস্তব মনে হয়
- কম্বোডিয়ার যোগসূত্র ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রতারণা শিল্প
- ক্রিপ্টো লেনদেনের পথ ও অর্থ পাচার
- ভুক্তভোগীরা কেন ফাঁদে আটকে পড়েন
- নীতিগত পদক্ষেপ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাড়া
- নিজেকে যেভাবে সুরক্ষিত রাখবেন
- মূল কথা
এই প্রতারণার ছক প্রায়ই ‘পিগ বুচারিং’ নামে পরিচিত। অপরাধীরা কয়েক সপ্তাহ ধরে অনলাইনে সম্পর্ক গড়ে তোলে, তারপর ভুক্তভোগীদের এমন এক ক্রিপ্টো বিনিয়োগের প্রস্তাব দেয়, যা ব্যক্তিগত ও উচ্চ মুনাফার সুযোগ বলে মনে হয়। ভুয়া প্ল্যাটফর্মে জাল ব্যালান্স ও সাজানো মুনাফা দেখানো হয়। বড় অঙ্কের অর্থ জমা দেওয়ার পর, অথবা কেউ টাকা তুলতে গেলে, প্ল্যাটফর্মটি লেনদেন আটকে দেয় বা উধাও হয়ে যায়; যোগাযোগও বন্ধ করে দেয় প্রতারক। একই নেটওয়ার্ক অস্তিত্বহীন পার্সেলের কুরিয়ার ফি, ভুয়া ই-কমার্স প্রকল্প এবং আগাম প্রসেসিং ফি দিতে হয় এমন পয়েন্ট উপহারের স্কিমেও জড়িত থাকে।
এবারের প্রতারণার ঢেউকে আলাদা করেছে প্রচলিত প্রেমের ছকের সঙ্গে স্থানীয় ভাষায় সাবলীলতা, সংস্কৃতিসচেতন বার্তা এবং উন্নত ডিজিটাল সরঞ্জামের মিশেল। অপরাধী চক্র কোরীয় ভাষাভাষীদের নিয়োগ করে এবং স্থানীয় অভ্যাস ও কথ্য ভাষার সঙ্গে মানিয়ে চলতে শেখায়। ডিপফেক ছবি ও ভিডিও, জাল পরিচয়পত্র এবং নকল কণ্ঠস্বর ব্যবহার করে প্রতারকেরা সতর্ক লক্ষ্যব্যক্তিদের সাধারণ যাচাই এড়িয়ে যায়। কর্মী ও অবকাঠামো একাধিক দেশে ছড়িয়ে থাকলেও, পরিচিত অ্যাপে কথা বলা কোরীয় ব্যবহারকারীর কাছে তাদের বার্তাগুলো অবিশ্বাস্য রকমের ঘরোয়া মনে হয়।
কোরীয় প্রেক্ষাপটে পিগ বুচারিং যেভাবে কাজ করে
‘পিগ বুচারিং’ শব্দটির উৎপত্তি চীনা অপরাধজগতে প্রচলিত কথ্য ভাষায়। এতে বোঝায়, চূড়ান্ত ক্ষতির আগে প্রতারকেরা স্নেহ ও ভুয়া মুনাফা দেখিয়ে ভুক্তভোগীকে ধীরে ধীরে প্রতারণার জালে আরও জড়িয়ে ফেলে। দক্ষিণ কোরিয়ায় যোগাযোগ সাধারণত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা ডেটিং অ্যাপে শুরু হয় এবং দ্রুত এনক্রিপ্টেড বা ব্যক্তিগত মেসেজিং সেবায় চলে যায়। প্রতিদিনের আলাপ ঘনিষ্ঠতা তৈরি করে। এরপর প্রতারক শুধু আমন্ত্রিত ব্যক্তিদের জন্য উন্মুক্ত এমন একটি বিনিয়োগ প্ল্যাটফর্মের কথা বলে। পেশাদার বলে মনে হওয়া সাইটটিতে থাকে ড্যাশবোর্ড, দরদামের তথ্য এবং দ্রুত সাড়া দেওয়া গ্রাহকসেবা। ভুক্তভোগীদের প্রথমে অল্প টাকা জমা দিয়ে পরীক্ষা করতে, ভুয়া মুনাফা বাড়তে দেখতে, তারপর আবার বিনিয়োগ করতে বা আরও বড় অঙ্ক জমা দিতে উৎসাহিত করা হয়।
দক্ষিণ কোরিয়ার তদন্তকারীরা প্রতারণার কয়েকটি পুনরাবৃত্ত বৈশিষ্ট্যের কথা বলেছেন। প্রেমের কথাবার্তায় কাকাওটক একটি প্রচলিত মাধ্যম। প্রতারকেরা সম্মানসূচক সম্বোধন থেকে শুরু করে কাজ ও পরিবার নিয়ে পরিচিত আলাপ পর্যন্ত স্থানীয় ডেটিং রীতির অনুকরণ করে, ফলে সন্দেহ কমে। বিনিয়োগের প্রস্তাব দেওয়ার সময় তারা সেটিকে বিশ্বস্ত বন্ধু বা সঙ্গীর জন্য সংরক্ষিত বিশেষ সুযোগ বলে তুলে ধরে। টাকা তুলতে চাইলে ভুক্তভোগীকে সীমিত সময়ে লেনদেনের সুযোগ, করের ফি বা অ্যাকাউন্ট যাচাইয়ের কথা বলে দেরি করানো হয় বা টাকা তোলা আটকে দেওয়া হয়। এই বিলম্বের ফলে সময়ের চাপ তৈরি হয়, যা আরও টাকা জমা দিতে প্ররোচিত করে।
এসব অপরাধ দুজন মানুষের বিচ্ছিন্ন কথোপকথনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি পরিচয়ের আড়ালে পালা করে কাজ করা একটি দল থাকতে পারে, যারা নির্দিষ্ট ছক অনুসরণ করে, প্রতিটি ভুক্তভোগীর বার্তা ও আবেগগত প্রতিক্রিয়া নজরে রাখে এবং বড় অঙ্কের টাকা ঝুঁকিতে থাকলে প্রশিক্ষিত কর্মীদের দিয়ে চাপ বাড়ায়। বিনিয়োগের ওয়েবসাইটগুলো সাময়িক ব্যবহারের জন্য তৈরি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ফাঁকি দিতে ডোমেইন বদলানো হয়, অ্যাপের লিংক হালনাগাদ হয় এবং ব্যাংক স্থানান্তর, স্টেবলকয়েন ও অন্যান্য মাধ্যমে অর্থ লেনদেনের পথ পাল্টানো হয়।
পরিসংখ্যানে: ঘটনা, ক্ষতি ও গ্রেপ্তার
অভিযোগ বাড়তে থাকায় ২০২৪ সালের শুরুর দিকে পুলিশ প্রেমের ফাঁদে প্রতারণায় ক্ষতির হিসাব আলাদাভাবে রাখা শুরু করে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে কর্তৃপক্ষ ১,২৬৫টি ঘটনা নথিভুক্ত করে; ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ৬ হাজার ৭৫০ কোটি ওন। ২০২৫ সালের প্রথম সাত মাসে আরও ১,১৬৩টি ঘটনার খবর পাওয়া যায়, যার ক্ষতির পরিমাণ ৭ হাজার কোটি ওন ছাড়ায়। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ ঘটনার সংখ্যা দাঁড়ায় ১,৫৬৫-তে এবং ওই বছরে মোট ক্ষতি ১০ হাজার কোটি ওন ছাড়িয়ে যায়। ২০২৪ সালের তুলনায় ক্ষতি বেড়েছে প্রায় ৪৮ শতাংশ।
গ্রেপ্তারের হার বেড়েছে, তবে অনেক ঘটনাই অমীমাংসিত রয়ে গেছে। ২০২৫ সালে পুলিশ জানায়, ৪৬.৯ শতাংশ ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়েছে। গত বছর এই হার ছিল মাত্র ১২.৭ শতাংশ। অনেক সন্দেহভাজন বিদেশ থেকে কাজ করে বা দ্রুত এক দেশ থেকে অন্য দেশে চলে যায়, ফলে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর করা ও প্রত্যর্পণ জটিল হয়ে পড়ে। প্রকৃত পরিসর এর চেয়ে বড় হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে, কারণ লজ্জা ও দোষারোপের ভয়ে কিছু ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন না।
বিদেশি পরিচয় থেকে সাবলীল স্থানীয় ছদ্মবেশ
দক্ষিণ কোরিয়ায় আগের প্রেমের প্রতারণাগুলোতে বিদেশি পরিচয়ের ওপর অনেক বেশি নির্ভর করা হতো। প্রতারকেরা নিজেদের বিদেশে কর্মরত চিকিৎসক, শান্তিরক্ষা বাহিনীর সেনা বা অর্থ খাতের পেশাজীবী হিসেবে পরিচয় দিত, তারপর ভ্রমণ খরচ, শুল্ক ছাড় বা জরুরি অবস্থার কথা বলে টাকা চাইত। এসব পরিচয় ইংরেজিভাষী ব্যবহারকারীদের লক্ষ্য করত এবং চুরি করা ছবি ব্যবহার করত। সাম্প্রতিক অভিযানগুলো আলাদা। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অপরাধী চক্র সাবলীল কোরীয় ভাষাভাষীদের নিয়োগ করে এবং স্থানীয় নাম ও আচরণভঙ্গি রপ্ত করতে প্রশিক্ষণ দেয়। এতে প্রতারণা আরও বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় এবং সহজে চোখে পড়ার মতো সতর্কসংকেত কমে যায়।
এ বছরের একটি ঘটনা এই বিবর্তনের দিকটি তুলে ধরেছে। ১২০০ কোটি ওনের পিগ বুচারিং নেটওয়ার্কের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ ওঠা এক কোরীয় দম্পতিকে কম্বোডিয়ায় গ্রেপ্তার করা হয়; সিউল তাদের প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানায়। তদন্তকারীরা বলেন, নেটওয়ার্কটি দক্ষিণ কোরিয়ার নাগরিকদের নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ দিচ্ছিল, যাতে তারা দেশে থাকা ভুক্তভোগীদের লক্ষ্য করে প্রতারণার চক্র পরিচালনা করতে পারে। বিদেশের প্রতারণা-কম্পাউন্ডে কোরীয় কর্মী থাকায় স্থানীয় কথ্য ভাষা, কোরীয় প্ল্যাটফর্মের হালনাগাদ পরিবর্তন এবং ব্যাংকের পদ্ধতির সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নেওয়া যায়।
এআইয়ের কারণে প্রতারণা আরও বাস্তব মনে হয়
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতারণাকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করার সুযোগ বাড়িয়েছে। প্রতারকেরা ডিপফেক ছবি ও ভিডিও ব্যবহার করে তারকা, ব্যবসায়িক নির্বাহী বা সামরিক কর্মকর্তার ছদ্মবেশ নেয়; জাল পরিচয়পত্র সেই প্রতারণাকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে। সাম্প্রতিক এক ঘটনায়, পঞ্চাশোর্ধ্ব এক নারীকে এক বিখ্যাত তারকার এআই দিয়ে তৈরি ছবি ও ভিডিও দেখিয়ে ৫০ কোটি ওন হাতিয়ে নেওয়া হয়। আগে ভিডিও কলে কথা বলে যে আশ্বাস মিলত, এখন তা আর পরিচয়ের সত্যতা নিশ্চিত করতে পারে না। অল্প অডিও নমুনা থেকে উচ্চারণ ও কথার ওঠানামা নকল করতে পারে কণ্ঠস্বর ক্লোন করার সরঞ্জাম। স্বয়ংক্রিয় স্ক্রিপ্টের সাহায্যে একসঙ্গে অনেক ভুক্তভোগীর সঙ্গে ঘন ঘন যোগাযোগও বজায় রাখা যায়।
অনেক লক্ষ্যব্যক্তির ক্ষেত্রে আবেগগতভাবে কাছে টানা এবং প্রযুক্তির নিখুঁত ব্যবহার মিলে স্বাভাবিক সন্দেহ কাটিয়ে ওঠে। বিশ্বাসযোগ্য ভিডিও কল, ব্লকচেইন ঠিকানার সাবলীল ব্যাখ্যা এবং দ্রুত সাড়া দেওয়া গ্রাহকসেবা—এসবই কারও উদ্বেগ দূর করার জন্য যথেষ্ট হতে পারে। তবে সাধারণ কিছু যাচাই এখনও কাজে আসে। রিভার্স ইমেজ সার্চে চুরি করা ছবি ধরা পড়তে পারে; আবার ক্যামেরায় নির্দিষ্ট অঙ্গভঙ্গিসহ সংক্ষিপ্ত সরাসরি যোগাযোগ চাইলে কিছু ডিপফেকের ছক ভেস্তে যেতে পারে। তবু কয়েক বছর আগের তুলনায় বাস্তবসম্মত জালিয়াতি তৈরি করা অনেক সহজ হয়েছে, আর প্রতারকদের কৌশলের তালিকাও বাড়ছে।
কম্বোডিয়ার যোগসূত্র ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রতারণা শিল্প
দক্ষিণ কোরিয়ার অনেক ঘটনার যোগসূত্র কম্বোডিয়া ও প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রতারণা কেন্দ্রে গিয়ে মেলে। অক্টোবরে কম্বোডিয়ায় সাইবার প্রতারণার কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ৬৪ জন দক্ষিণ কোরীয় নাগরিককে দেশে ফিরিয়ে এনে হেফাজতে নেওয়া হয়। সিউলের কর্মকর্তারা বলছেন, কিছু নাগরিককে ভুয়া চাকরির প্রস্তাব দিয়ে প্রলুব্ধ করা হয়, তারপর প্রতারণা-কম্পাউন্ডে পাচার করে ভুক্তভোগীদের প্রতারণায় বাধ্য করা হয়। অন্যরা স্বেচ্ছায় এতে জড়ায়। আগস্টে কম্বোডিয়ায় এক কোরীয় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে হত্যার পর দক্ষিণ কোরিয়া পুলিশ ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল পাঠায় এবং প্রতারণা-কম্পাউন্ডের জন্য পরিচিত কয়েকটি এলাকায় ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করে।
মহামারির পর আঞ্চলিক প্রতারণা কেন্দ্রগুলো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে; কম্বোডিয়া, লাওস ও মিয়ানমারের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে এগুলোর ঘনত্ব বেশি। পরিচালকেরা নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ ও টেলিযোগাযোগ সুবিধার কাছাকাছি স্থান বেছে নেয় এবং দুর্বল তদারকির সুযোগ নেয়। মানবাধিকার সংগঠন ও তদন্তকারীরা ভয়াবহ এক চিত্র তুলে ধরেছেন: এশিয়ার বিভিন্ন দেশ ও অন্যান্য অঞ্চল থেকে আসা কর্মীদের উচ্চ বেতনের চাকরির প্রস্তাব দেওয়া হয়, তারপর পাসপোর্ট কেড়ে নিয়ে আটকে রাখা হয় বা নির্যাতন করা হয়। একই কম্পাউন্ডে প্রেমের ফাঁদে প্রতারণা, বিনিয়োগ জালিয়াতি, যৌন হয়রানির ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় এবং কণ্ঠস্বর নকল করে ফোনে প্রতারণা চালানো হয়; প্রয়োজনমতো ছক বদলে নেওয়া হয়।
আন্তর্জাতিক চাপ বাড়তে শুরু করেছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের কর্তৃপক্ষ প্রিন্স গ্রুপ নামে পরিচিত কম্বোডিয়াভিত্তিক একটি নেটওয়ার্কের ওপর নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে। তাদের অভিযোগ, নেটওয়ার্কটি অঞ্চলজুড়ে প্রতারণা কেন্দ্রের একটি শৃঙ্খল পরিচালনা করে। এসব পদক্ষেপের লক্ষ্য অর্থায়নের পথ বন্ধ করা, ব্যাংকিং ব্যবস্থায় প্রবেশ সীমিত করা এবং এই শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়া স্থানীয় ক্ষমতাধরদের পরিণতির বার্তা দেওয়া। সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া কঠিন, কারণ অপরাধী, সার্ভার ও অর্থের লেনদেনের পথ বহু দেশের সীমানা পেরিয়ে যায়।
ক্রিপ্টো লেনদেনের পথ ও অর্থ পাচার
দক্ষিণ কোরিয়ায় পিগ বুচারিংয়ের ব্যবসায়িক মডেলে ক্রিপ্টো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ভুয়া প্ল্যাটফর্মগুলো প্রায়ই স্টেবলকয়েনে অর্থ জমা দিতে বলে, অথবা অর্থপাচারের জন্য ব্যবহৃত ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ফিয়াট মুদ্রার স্থানান্তর ঘটিয়ে সেই অর্থ ডিজিটাল সম্পদে বদলে নেয়। রূপান্তরের পর অর্থ বিভিন্ন ওয়ালেট, এক্সচেঞ্জ ও পেমেন্ট প্রসেসরের মধ্য দিয়ে ঘোরানো হয়, ফলে তা উদ্ধার করা কঠিন হয়ে পড়ে। তদন্তকারীরা বলছেন, কম্বোডিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠান দক্ষিণ কোরিয়ার ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে অর্থ সরিয়েছে এবং স্থানীয় ওন-ভিত্তিক প্ল্যাটফর্মের গভীর তারল্যের সুযোগ নিয়েছে।
বিদেশি ও কোরীয় কর্তৃপক্ষের নজরে আসা একটি গোষ্ঠী হলো কম্বোডিয়াভিত্তিক হুইওন নেটওয়ার্ক। আন্তদেশীয় অপরাধে ভূমিকার জন্য যুক্তরাষ্ট্র এর ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। সিউলের আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে ভাগ করা নথিতে দেখা যায়, হুইওনের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান কয়েক বছর ধরে বড় কোরীয় এক্সচেঞ্জগুলোর সঙ্গে লাখ লাখ ডলারের ইউএসডিটি লেনদেন করেছে। এই লেনদেনের সময় কম্বোডিয়ার কম্পাউন্ডগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অপহরণ ও সাইবার প্রতারণার ঘটনা বেড়ে যায়। এ ঘটনা দেখায়, অপরাধলব্ধ অর্থ কীভাবে বৈধ লেনদেনের পথেও ঘুরে যেতে পারে এবং কেন এক্সচেঞ্জগুলোর নিয়ন্ত্রণ জোরদার, উচ্চ ঝুঁকির লেনদেন-সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে সতর্কভাবে যাচাই এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্যের দ্রুত জবাব দেওয়ার চাপ বাড়ছে।
ভুক্তভোগীরা কেন ফাঁদে আটকে পড়েন
ভুক্তভোগীরা প্রায়ই দীর্ঘ সময় ধরে চলা আপাতদৃষ্টিতে আন্তরিক সঙ্গের কথা বলেন। প্রতারক মন দিয়ে কথা শোনে, খোঁজখবর নেয় এবং উৎসাহ দেয়। প্ল্যাটফর্মে শুরুতে অল্প কিছু মুনাফা দেখানো সম্পর্ক ও বিনিয়োগের ধারণাটিকে সত্য বলে মনে করায়। স্নেহ, তাড়াহুড়ো এবং অন্যদের সমর্থনের ইঙ্গিত মিলিয়ে সন্দেহ কমে যায়। পরে লজ্জা ও সম্মানহানির ভয় মানুষকে সন্দেহ জাগলেও সাহায্য চাইতে বাধা দেয়।
দক্ষিণ কোরিয়ার সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যও এই গতিপ্রকৃতিকে প্রভাবিত করে। কথিত বিশেষজ্ঞদের প্রতি শ্রদ্ধা, ব্যক্তিগত বার্তা আদান-প্রদানের ঝোঁক এবং চ্যাটরুমে দ্রুত ছড়ানো ক্রিপ্টো-সংক্রান্ত আলোচনা প্রতারণাকে আরও প্রভাবশালী করে তুলতে পারে। অনেক ভুক্তভোগীই আর্থিক বিষয়ে সচেতন ও প্রযুক্তিতে দক্ষ। এতে বোঝা যায়, সমস্যাটি অজ্ঞতার নয়, মনস্তত্ত্বের। ভুক্তভোগীদের সহায়তা ফোরামে এমন মানুষের অভিজ্ঞতাও রয়েছে, যারা জীবনের সব সঞ্চয় হারিয়ে প্রতারণার বিষয়টি জানার পর মানসিক চিকিৎসা নিয়েছেন।
নীতিগত পদক্ষেপ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাড়া
সিউলের কর্তৃপক্ষ বিচ্ছিন্নভাবে গ্রেপ্তারের বদলে কূটনীতি, পুলিশি তৎপরতা ও আর্থিক নিয়ন্ত্রণ মিলিয়ে বৃহত্তর কৌশল গ্রহণ করেছে। ২০২৪ সালে পুলিশ প্রেমের ফাঁদে প্রতারণাকে আলাদা শ্রেণি হিসেবে নথিভুক্ত করতে শুরু করে। ২০২৫ সালে গ্রেপ্তারের হার বেড়েছে, তবে সন্দেহভাজনদের ৪৬.৯ শতাংশকে গ্রেপ্তার করার পরও বহু ঘটনা অমীমাংসিত রয়ে গেছে। ন্যাশনাল পুলিশ এজেন্সি কম্বোডিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছে এবং সন্দেহভাজন ও উদ্ধার হওয়া কর্মীদের সমন্বিতভাবে দেশে ফেরানোর উদ্যোগ নিয়েছে। প্রতারণা-কম্পাউন্ডে অপহরণ ও আটকে রাখার ঝুঁকি রয়েছে, এমন কম্বোডিয়ার কয়েকটি এলাকায় সরকার ভ্রমণও সীমিত করেছে।
এখন অপরাধকে সম্ভব করে তোলা অবকাঠামো লক্ষ্য করে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। নিয়ন্ত্রকেরা উচ্চ ঝুঁকির অর্থপ্রবাহ নজরদারিতে এক্সচেঞ্জ ও পেমেন্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চাপ দিচ্ছে; ব্যাংকগুলোও অর্থপাচারে ব্যবহৃত অ্যাকাউন্ট শনাক্তে সতর্কবার্তা উন্নত করছে। বিদেশে পরিচালিত কোরীয় নেতৃত্বাধীন নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের প্রত্যর্পণের উদ্যোগ নিচ্ছে পুলিশ ও প্রসিকিউটররা। জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তারা বলছেন, কৌশল সমন্বয়, উদ্ধার হওয়া কর্মীদের কাছ থেকে তথ্য ভাগাভাগি এবং সীমান্তপারের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকরের গতি বাড়াতে আঞ্চলিক সম্মেলনগুলোতে বিষয়টি তোলা হবে।
ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে অর্থ বেরিয়ে গেলে তা উদ্ধারে আইনি বাধা রয়েছে। প্রচলিত ভয়েস ফিশিংয়ের ঘটনায় সন্দেহজনক লেনদেন আটকে দিতে কোরিয়ার টেলিকমিউনিকেশনস ফিন্যান্সিয়াল ফ্রড প্রিভেনশন অ্যাক্ট সহায়তা করে। কিন্তু প্রেমের ফাঁদের প্রতারণায় অপরাধীরা লেনদেনকে কোনো সেবা বা বিনিয়োগের মূল্য হিসেবে দেখায় বলে এই আইন অনেক সময় প্রযোজ্য হয় না। কিছু আইনবিদ ও পুলিশি বিশেষজ্ঞের মতে, সাময়িকভাবে অর্থ আটকে রাখার ক্ষমতা বাড়ানো এবং প্রেমের ফাঁদে প্রতারণার লক্ষণ দেখা গেলে ব্যাংকগুলোর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য স্পষ্ট মানদণ্ড নির্ধারণ করা দরকার।
কোরিয়া ন্যাশনাল পুলিশ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক সিও জুন বে প্রেমের ফাঁদে প্রতারণার ভুক্তভোগীদের অন্য আর্থিক জালিয়াতির ক্ষেত্রে ব্যবহৃত একই ধরনের সুরক্ষা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা জোর দিয়ে বলেছেন। তিনি গবেষণা করেছেন, বিদ্যমান আইনি ব্যতিক্রমগুলো কীভাবে ভুক্তভোগীরা টাকা পাঠানোর বোতামে চাপ দেওয়ার পর অপরাধীদের দ্রুত অর্থ সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ দেয়।
“প্রেমের ফাঁদে প্রতারণায়ও একাধিক ভুক্তভোগীকে লক্ষ্য করা হয়। লেনদেনগুলো ভুয়া বিনিয়োগের সঙ্গে যুক্ত বলে টাকা তোলা বন্ধ করতে অস্বীকার করা অযৌক্তিক,” তিনি বলেন।
নিজেকে যেভাবে সুরক্ষিত রাখবেন
নিজে সতর্ক থাকলেই সব ঝুঁকি দূর হয় না। তবে উচ্চচাপের অনলাইন সম্পর্ক ও বিনিয়োগের প্রস্তাবে কয়েকটি অভ্যাস ঝুঁকি কমাতে পারে। শুধু আমন্ত্রিত ব্যক্তিদের জন্য উন্মুক্ত বা একান্ত বলে প্রচার করা যেকোনো ট্রেডিং প্রস্তাবকে সতর্কসংকেত হিসেবে দেখুন। কোরীয় কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণাধীন নয় এমন ওয়েবসাইট বা অ্যাপে টাকা পাঠাবেন না। প্ল্যাটফর্মের কর, টাকা তোলার বাধা দূর করা বা যাচাইয়ের ফি দেওয়ার নামে কোনো ব্যক্তির কাছে অর্থ পাঠানোর নির্দেশও মানবেন না। এমন সরাসরি পরিচয়-প্রমাণ চান, যা ডিপফেকের মাধ্যমে সহজে নকল করা যায় না—যেমন আপনার নাম ও সেদিনের তারিখ উল্লেখ করে তাৎক্ষণিকভাবে ক্যামেরায় নির্দিষ্ট অঙ্গভঙ্গি করা। রিভার্স ইমেজ সার্চের সাহায্যে ছবি ও ভিডিওও যাচাই করুন।
- যার সঙ্গে পরিচয় হয়েছে, যাচাইয়ের ধাপ শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেই প্ল্যাটফর্মেই আলাপ চালিয়ে যান। নজরদারি কমাতে প্রতারকেরা ভুক্তভোগীদের ব্যক্তিগত মেসেজিংয়ে যেতে বলে।
- কোরিয়ার সরকারি নিয়ন্ত্রকদের কাছে বিনিয়োগের লাইসেন্স ও নিবন্ধন যাচাই করুন। বৈধ ব্রোকারের যাচাইযোগ্য প্রতিষ্ঠান, ফোন নম্বর ও ঠিকানা থাকবে।
- বড় অঙ্কের টাকা জমা দেওয়ার আগে অল্প টাকা তুলে পরীক্ষা করুন। টাকা তোলার সময় যে প্ল্যাটফর্ম দেরি করে বা নতুন ফি বানিয়ে বলে, সেটি বিপদের লক্ষণ।
- ক্রিপ্টো ওয়ালেট বা এক্সচেঞ্জ অ্যাকাউন্ট খোলার সময় অন্য কাউকে আপনাকে পরিচালনা করতে দেবেন না। নিজের প্রবেশতথ্যের নিয়ন্ত্রণ নিজের কাছে রাখুন এবং শক্তিশালী দ্বি-স্তরীয় যাচাইকরণ চালু করুন।
- সময়ের চাপ, নিশ্চিত মুনাফার দাবি বা আজ রাতেই বন্ধ হয়ে যাবে এমন ভিআইপি সুযোগের বিষয়ে সতর্ক থাকুন। অতিরিক্ত চাপ ও নিশ্চিত লাভের প্রতিশ্রুতি সাধারণত প্রতারণার লক্ষণ।
- টাকা পাঠানোর আগে বিশ্বস্ত কারও সঙ্গে কথা বলুন। তৃতীয় পক্ষের মতামত প্রতারকদের তৈরি করা বিচ্ছিন্নতা কাটাতে পারে।
- প্রতারণার সন্দেহ হলে সঙ্গে সঙ্গে টাকা পাঠানো বন্ধ করুন এবং পুলিশ ও ব্যাংকে জানান। দ্রুত অভিযোগ করলে প্রমাণ সংরক্ষণ এবং আরও লেনদেন ঠেকাতে সহায়তা হতে পারে।
মূল কথা
- ক্রিপ্টো বিনিয়োগের সঙ্গে যুক্ত প্রেমের ফাঁদে প্রতারণায় ২০২৫ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার ভুক্তভোগীদের ক্ষতি ১০ হাজার কোটি ওন ছাড়িয়েছে; সেপ্টেম্বর নাগাদ ১,৫৬৫টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
- এ বছর ৪৬.৯ শতাংশ ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়েছে, যা ২০২৪ সালের ১২.৭ শতাংশের চেয়ে বেশি। তবে অনেক সন্দেহভাজন বিদেশে থেকে কাজ করে এবং গ্রেপ্তার এড়ায়।
- পিগ বুচারিংয়ের কৌশলে দীর্ঘদিন ধরে সম্পর্ক গড়ে তোলার পর ভুয়া ট্রেডিং প্ল্যাটফর্মে সাজানো মুনাফা দেখিয়ে টাকা তোলা আটকে দেওয়া হয়।
- প্রতারকেরা এখন সাবলীল কোরীয় ভাষাভাষী, ডিপফেক ও জাল নথি ব্যবহার করে স্থানীয় পরিচয়ের ছদ্মবেশ নেয় এবং সাধারণ যাচাই এড়ায়।
- প্রতারণা কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত ৬৪ জন নাগরিককে কম্বোডিয়া থেকে দেশে ফিরিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া; বৃহত্তর দমন অভিযানের অংশ হিসেবে উচ্চ ঝুঁকির এলাকায় ভ্রমণ সীমিত করেছে।
- আঞ্চলিক প্রতারণা-কম্পাউন্ড পরিচালনার অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য কম্বোডিয়াভিত্তিক একটি নেটওয়ার্কের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, যা বাড়তে থাকা আন্তর্জাতিক চাপের ইঙ্গিত।
- সিউলের কর্তৃপক্ষ ও আইনপ্রণেতারা এক্সচেঞ্জ ও ব্যাংকগুলোর নিয়ন্ত্রণ জোরদারের দাবি জানাচ্ছেন। বিশেষজ্ঞরা প্রেমের ফাঁদে প্রতারণার সন্দেহজনক লেনদেন ব্যাংকের আটকে দেওয়ার সুযোগ দিতে আইনি পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়েছেন।
- লাইসেন্স যাচাই, টাকা তুলে পরীক্ষা করা, চাপের কৌশল প্রত্যাখ্যান এবং সন্দেহজনক প্রতারণার খবর দ্রুত জানানো—এসব বাস্তব পদক্ষেপ ঝুঁকি কমাতে পারে।






