এখন বিরল মৃত্তিকা কেন গুরুত্বপূর্ণ
আধুনিক জীবন সচল রাখা মোটর, সেন্সর ও চিপের ভেতরে রয়েছে বিরল মৃত্তিকা উপাদান। এই ১৭টি ধাতব উপাদান চুম্বককে উচ্চ কোয়ের্সিভিটি ও তাপ-প্রতিরোধ ক্ষমতা দেয়। এ কারণেই এগুলো বৈদ্যুতিক গাড়ির মোটর, বায়ুচালিত টারবাইনের জেনারেটর, স্মার্টফোন, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও রাডার ব্যবস্থায় ব্যবহৃত হয়। এগুলো ছাড়া পরিচ্ছন্ন জ্বালানির লক্ষ্য অর্জন, উন্নত অস্ত্র তৈরি এবং কম্পিউটিংয়ের পরবর্তী ধাপে পৌঁছানো আরও ধীর ও ব্যয়বহুল হতো।
সূচিপত্র
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলোতে সরবরাহ একটিমাত্র দেশে কেন্দ্রীভূত। বিশ্বে বিরল মৃত্তিকা খননের আনুমানিক ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ, পৃথকীকরণ ও পরিশোধনের প্রায় ৯০ শতাংশ এবং স্থায়ী চুম্বক তৈরির প্রায় ৯৪ শতাংশ চীনের নিয়ন্ত্রণে। উচ্চ তাপমাত্রায় কার্যকর চুম্বকের জন্য অপরিহার্য ডিসপ্রোসিয়াম ও টার্বিয়ামের মতো ভারী বিরল মৃত্তিকার ক্ষেত্রে এই আধিপত্য আরও বেশি। এই কেন্দ্রীভবনের কারণে একটি বিশেষায়িত কাঁচামালের বাজার গাড়ি, জ্বালানি, মহাকাশ ও ইলেকট্রনিকস খাতের জন্য বড় কৌশলগত ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে।
২০২৫ সালে বেইজিং কাঁচা আকরিকের বাইরেও বিস্তৃত রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ বাড়ালে এই ঝুঁকি তাৎক্ষণিক হয়ে ওঠে। চীনা উৎসের বিরল মৃত্তিকা উপাদান রয়েছে, অথবা চীনা খনন, প্রক্রিয়াকরণ কিংবা চুম্বক প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি—এমন চুম্বক ও অন্যান্য পণ্য রপ্তানির জন্য এখন লাইসেন্স প্রয়োজন। সামান্য উপাদান থাকলেও নিয়ন্ত্রণ কার্যকর হতে পারে; ভারী বিরল মৃত্তিকার ক্ষেত্রে সীমা মাত্র ০.১ শতাংশ। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের যেকোনো পর্যায়ে চীনা উপাদানের ওপর নির্ভরশীল কোম্পানিগুলোকে এখন অনুমোদনের জন্য আবেদন করতে হচ্ছে, যা পেতে দেরি হতে পারে, অনিশ্চয়তা থাকতে পারে, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে অনুমোদন পাওয়াও অসম্ভব হতে পারে।
চীন কীভাবে আধিপত্য গড়েছে এবং তা সরানো কঠিন কেন
কয়েক দশক ধরে চীন খনন ও পৃথকীকরণ থেকে শুরু করে সংকর ধাতু তৈরি এবং চুম্বক কারখানা পর্যন্ত পুরো শিল্পব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, যেখানে রয়েছে বিপুলসংখ্যক দক্ষ প্রকৌশলী ও সরঞ্জাম নির্মাতা। বৃহৎ উৎপাদনের পরিসর, খনি ও মধ্যবর্তী প্রক্রিয়াকরণ কারখানার নৈকট্য এবং তুলনামূলক শিথিল পরিবেশগত মানের কারণে খরচ কম রাখা গেছে। এর ফলে এমন একটি শিল্পপরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে কাঁচামাল, বিক্রিয়ক ও দক্ষ শ্রমিক সহজেই পাওয়া যায়। এতে সরবরাহের সময় কমে এবং প্রক্রিয়ার ধারাবাহিক উন্নতি সম্ভব হয়। ভারী বিরল মৃত্তিকা প্রক্রিয়াকরণে চীনা কারখানাগুলোর অবস্থান প্রায় একচেটিয়া।
এর আগে এই প্রভাব খাটানো হয়েছে। ২০১০ সালে পূর্ব চীন সাগরের একটি ঘটনার পর জাপানি নির্মাতারা জানান, পণ্য চালান থমকে গেছে। পরে এক রায়ে বলা হয়, রপ্তানি সীমিত করে চীন বাণিজ্যবিধি লঙ্ঘন করেছে। দাম হঠাৎ বেড়ে যায়, চীনের বাইরের প্রকল্পগুলোর কাজ দ্রুত এগোয়, এরপর দাম কমে গেলে সেগুলো থেমে যায়। ২০১১ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে অনেক বিনিয়োগকারী সরে দাঁড়ান। ফলে চীনের বাইরের সম্পদ উন্নয়নের প্রকল্পের তালিকা সংকুচিত হয়, ঠিক যখন চাহিদা বাড়তে শুরু করেছিল।
এই চক্রগুলো গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বিরল মৃত্তিকার প্রকল্প এগিয়ে নিতে দীর্ঘ সময় লাগে এবং সেগুলোকে অনুমোদন করানোর ধাপগুলো জটিল। চুম্বক নির্মাতা ও চূড়ান্ত ব্যবহারকারীদের অক্সাইড, ধাতু ও তৈরি চুম্বকের নতুন উৎস ব্যবহারের অনুমোদন পেতে কয়েক বছর লাগে। দাম ওঠানামা করলে নতুন খনি বা মধ্যবর্তী প্রক্রিয়াকরণ কারখানার ব্যবসায়িক যুক্তি রাতারাতি হারিয়ে যেতে পারে। এগুলো আবার চালু করতে প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা ও সরঞ্জামও সহজে পুনর্গঠন করা যায় না।
২০২৫ সালের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণে কী বদলেছে
২০২৫ সালের এপ্রিলে চীনের নতুন বিধিতে কয়েকটি ভারী বিরল মৃত্তিকা উপাদান ও চুম্বক-সংশ্লিষ্ট পণ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পরবর্তী মাসগুলোতে রপ্তানির পরিমাণ কমে যায়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের গাড়ি নির্মাতারা উচ্চ কর্মক্ষমতার চুম্বকের সংকটে পড়ে, উৎপাদনের সময়সূচি সমন্বয় করা হয় এবং চীনের বাইরে দাম বেড়ে যায়।
২০২৫ সালের অক্টোবরে নিয়ন্ত্রণের পরিধি আরও বাড়ানো হয়। চীনা উপাদান অথবা চীনা উত্তোলন, পৃথকীকরণ কিংবা চুম্বক প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি চুম্বক ও অন্যান্য পণ্য রপ্তানির জন্য লাইসেন্স প্রয়োজন, এমনকি সেগুলো বিদেশে তৈরি হলেও। উন্নত চিপ ও মেমোরি-সংশ্লিষ্ট আবেদনগুলো প্রতিটি ক্ষেত্রে আলাদাভাবে পর্যালোচনা করা হবে। ২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে বিদেশি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট লাইসেন্সের আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হবে। অনুমোদন ছাড়া বিদেশে বিরল মৃত্তিকা প্রকল্পে সহায়তা করার ক্ষেত্রেও চীনা নাগরিকদের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এসব পদক্ষেপ কাঁচামালের বাইরেও দক্ষতা, প্রক্রিয়াগত জ্ঞান এবং চুম্বক উৎপাদনের ওপর নিয়ন্ত্রণ বিস্তৃত করেছে।
পারস্পরিক নির্ভরতা, নাকি ঝুঁকিপূর্ণ দুর্বলতা
ঝুঁকির পাশাপাশি পারস্পরিক নির্ভরতাও বেড়েছে। বাণিজ্য-তথ্যে দেখা যায়, ২০২২ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র চীনে নির্দিষ্ট কিছু বিরল মৃত্তিকা উপাদানের ক্রমবর্ধমান পরিমাণ রপ্তানি করেছে। চীন এরপর এসব উপাদানকে যন্ত্রাংশ ও চূড়ান্ত পণ্যে রূপান্তর করেছে, যা আবার বিশ্ববাজারে এসেছে। এই দ্বিমুখী বাণিজ্য কম কার্বন নিঃসরণকারী প্রযুক্তির বিস্তারকে সহায়তা করেছে এবং ভোক্তাদের জন্য খরচ কম রেখেছে।
রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকলে পারস্পরিক নির্ভরতা সরবরাহকে স্থিতিশীল রাখতে পারে। কিন্তু অনুমোদন ও লাইসেন্সিং নীতিগত হাতিয়ারে পরিণত হলে, একই আন্তসংযোগ ধাক্কার প্রভাব বাড়িয়ে দেয়। চুম্বকে সামান্য চীনা উপাদান থাকলেও এখন কোম্পানিগুলোকে আইনি যাচাই ও অপেক্ষার মুখে পড়তে হচ্ছে। শিক্ষা সহজ: সরবরাহের উৎসে বৈচিত্র্য আনতে হবে সেই মধ্যবর্তী ধাপগুলোতেও, যেখানে ঘনীভূত আকরিককে পৃথক অক্সাইড, ধাতু, সংকর ধাতু ও অনুমোদিত চুম্বকে রূপান্তর করা হয়।
কোথায় বিকল্প গড়ে উঠছে
সরকার ও কোম্পানিগুলো চীনের বাইরে সম্পূর্ণ সরবরাহ শৃঙ্খল গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। যুক্তরাষ্ট্র দেশে এবং অংশীদারদের সঙ্গে খনন, পৃথকীকরণ ও চুম্বক প্রকল্পে অর্থায়ন করছে। অস্ট্রেলিয়া উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াচ্ছে এবং উন্নয়ন অর্থায়ন আকৃষ্ট করছে। বিশ্বাসযোগ্য উৎপাদকদের সহায়তায় জাপান সরকারি পুঁজি, আগাম ক্রয়চুক্তি ও কারিগরি সহায়তার সমন্বয় ব্যবহার করছে। নতুন বিধি, লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা এবং সম্ভাব্য বাণিজ্যিক পদক্ষেপের মাধ্যমে নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন।
জাপানের কৌশল এবং লিনাসের সঙ্গে অংশীদারত্ব
২০১০ সালের ধাক্কার পর টোকিও অর্থায়ন, আগাম ক্রয়চুক্তি ও প্রক্রিয়াগত দক্ষতার সমন্বয়ে সাড়া দেয়। অস্ট্রেলিয়ায় সোজিৎজ ও জোগমেকের সঙ্গে লিনাসের অংশীদারত্ব জাপানি ব্যবহারকারীদের জন্য বিরল মৃত্তিকা অক্সাইডের স্থিতিশীল সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলে। ২০২৩ সালে ভারী উপাদানও এই অংশীদারত্বের আওতায় আসে। অর্থায়নকে সরাসরি পণ্য সরবরাহ ও গুণমান নিশ্চিতকরণের সঙ্গে যুক্ত করে এই পদ্ধতি নতুন উৎস ব্যবহারের অনুমোদনের সময় কমিয়েছে। অন্যরাও এটি নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী গ্রহণ করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপ ও সময়সীমা
নির্ভরতার ঝুঁকি কমাতে ওয়াশিংটন শিল্পনীতি ও বন্ধুদেশের সঙ্গে উৎপাদন স্থানান্তরের সমন্বয় করছে। যুক্তরাষ্ট্রের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক ভিক্টোরিয়ায় ভিএইচএম লিমিটেডের গোশেন প্রকল্পে ২০ কোটি ডলার পর্যন্ত অর্থায়নের ইঙ্গিত দিয়েছে। এই খনিতে হালকা ও ভারী বিরল মৃত্তিকা অক্সাইডের পাশাপাশি জিরকন ও রুটাইল রয়েছে। প্রকল্পটির গুরুত্বপূর্ণ অনুমোদন পাওয়া গেছে এবং উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে বৈদ্যুতিক গাড়ি ও প্রতিরক্ষা সরবরাহকারীদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি ক্রয়চুক্তির জন্য এটি সম্ভাব্য একটি প্রকল্প। একই সময়ে প্রশাসন কৌশলগত মজুত, দেশীয় উৎপাদকদের জন্য ন্যূনতম মূল্য এবং প্রক্রিয়াকরণ ও চুম্বক উৎপাদনে মিত্রদের সঙ্গে অংশীদারত্বের বিষয়েও আলোচনা করেছে। এশিয়াজুড়ে ঘোষিত নতুন চুক্তিগুলোর লক্ষ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা, চীনের বাইরে পরিশোধন সক্ষমতা বাড়ানো এবং জাপান, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার মতো অংশীদারদের সঙ্গে মজুত সমন্বয় করা।
ভিএইচএমের প্রধান নির্বাহী অ্যান্ড্রু কিং সাম্প্রতিক অর্থায়নের ইঙ্গিতকে সরবরাহ শৃঙ্খলের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে মোড় ঘোরানো ঘটনা বলেছেন। তাঁর ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রের একটি সংস্থার এই সহায়তা এমন একটি বাস্তব পদক্ষেপ, যা প্রকল্পটিকে পরিকল্পনা থেকে নির্মাণপর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে।






