দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জন্য এই সম্মেলন কেন গুরুত্বপূর্ণ
এশিয়া ও এর বাইরের নেতারা কুয়ালালামপুরে আসিয়ান সম্মেলনে জড়ো হয়েছেন। সম্মেলনটি গড়ে উঠেছে দুটি জরুরি বাস্তবতাকে ঘিরে। প্রথমটি হলো যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে তীব্রতর কৌশলগত ও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা, যার প্রভাব পড়ছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রতিটি রাজধানীতে। দ্বিতীয়টি হলো, আঞ্চলিক উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং বৈচিত্র্যময় সদস্যদের একই পথে এগিয়ে নিতে পারে—এটি আসিয়ানকে প্রমাণ করতে হবে। এ বছর stakes অনেক বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং—দুজনই সম্মেলনে উপস্থিত, আর তাঁদের কর্মসূচির ছায়া পড়ছে প্রতিটি বৈঠক ও দ্বিপক্ষীয় আলোচনায়।
সূচিপত্র
- দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জন্য এই সম্মেলন কেন গুরুত্বপূর্ণ
- দুই পরাশক্তির মাঝখানে একটি অঞ্চল
- নিরাপত্তা উত্তেজনাই আলোচ্যসূচি নির্ধারণ করছে
- দক্ষিণ চীন সাগর এবং দীর্ঘদিনের বিলম্বিত আচরণবিধি
- মিত্র, অংশীদার ও প্রতিরোধক্ষমতা
- বাণিজ্যে অস্থিরতা ও সরবরাহব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস
- আরসিইপি, বিরল মৃত্তিকা ও উন্মুক্ত বাণিজ্যের আহ্বান
- আসিয়ানের ঐক্য ও মিয়ানমার পরীক্ষা
- সদস্য দেশগুলোর অবস্থান
- কুয়ালালামপুরে নেতারা কী বার্তা দিচ্ছেন
- চাপে আসিয়ানের কেন্দ্রীয় ভূমিকা
- যা জানা জরুরি
রুদ্ধদ্বার বৈঠক ও প্রকাশ্য বিবৃতিতে আসিয়ানের নেতারা কূটনীতির সঙ্গে কঠিন সিদ্ধান্তের ভারসাম্য রাখছেন। জোটটি আনুষ্ঠানিকভাবে তিমুর-লেস্তেকে তাদের ১১তম সদস্য হিসেবে স্বাগত জানাবে, যা আসিয়ানের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বের প্রতীক। এ গ্রীষ্মে প্রাণঘাতী সীমান্ত সংঘর্ষের পর থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার মধ্যে হওয়া শান্তি সমঝোতা উপলক্ষে একটি অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা রয়েছে, যা সম্মেলনে স্বস্তির মুহূর্ত এনে দেবে। তবে বৃহত্তর প্রেক্ষাপট উত্তেজনাপূর্ণ। দক্ষিণ চীন সাগর এখনো সংঘাতের উৎস। পাল্টাপাল্টি শুল্কব্যবস্থা ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ বাণিজ্যের চেহারা বদলে দিচ্ছে। মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ সীমান্ত পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে এবং সংকট মোকাবিলায় আসিয়ানের সক্ষমতার পরীক্ষা নিচ্ছে।
সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী সতর্ক করে বলেছেন, ঐক্যকে নিশ্চিত ধরে নেওয়া যায় না। নেতাদের এক অবকাশকালীন বৈঠকে লরেন্স ওং জোটকে পক্ষ বেছে নেওয়ার চাপের মুখে নিজেদের অবস্থানে অটল থাকতে আহ্বান জানান। তিনি সতর্ক করেন, সদস্যরা পরস্পরের বিরুদ্ধে দাঁড়ালে আসিয়ানের প্রাসঙ্গিকতা ঝুঁকিতে পড়বে।
সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী লরেন্স ওং বলেন, বিভক্ত হলে আসিয়ানের অস্তিত্ব থাকবে না; বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র হলেও জোটকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
দুই পরাশক্তির মাঝখানে একটি অঞ্চল
কয়েক দশক ধরে আসিয়ান সব প্রধান শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে আঞ্চলিক সহযোগিতার ভিত্তি গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে। সেই পদ্ধতি এখন চাপে রয়েছে। ওয়াশিংটন ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলকে নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থা ও নৌ চলাচলের স্বাধীনতার দৃষ্টিতে দেখে। বেইজিং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার ওপর জোর দেওয়ার পাশাপাশি বিনিয়োগ, বাণিজ্য এবং ক্রমবর্ধমান সক্ষমতাসম্পন্ন সামরিক বাহিনীর মাধ্যমে নিজেদের প্রভাব বাড়াচ্ছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো বিনিয়োগ ও নিরাপত্তা সম্পর্কের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর এবং বাণিজ্য ও প্রবৃদ্ধির জন্য চীনের ওপর নির্ভরশীল। খুব কম দেশই তাদের মধ্যে একটিকে বেছে নিতে চায়।
ভারসাম্য বজায় রাখার এই আকাঙ্ক্ষা আসিয়ানের দীর্ঘদিনের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। একই সঙ্গে এটি জাতীয় স্বার্থও রক্ষা করে। ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ড—তিন দেশই উভয় পক্ষের সঙ্গে কাজ করে; চীনের কাছ থেকে বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি চায়, আবার যুক্তরাষ্ট্র ও তার অংশীদারদের সঙ্গে নিরাপত্তা ও প্রশিক্ষণ-সম্পর্ক বজায় রাখে। ভিয়েতনাম ও সিঙ্গাপুর যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য আঞ্চলিক অংশীদারের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্কও খোলা রাখে। কম্বোডিয়া, লাওস ও মিয়ানমার বিশেষত অর্থায়ন ও অবকাঠামোর ক্ষেত্রে চীনের ওপর বেশি নির্ভরশীল। ফিলিপাইন পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করছে, পাশাপাশি বেইজিংয়ের সঙ্গে জটিল সম্পর্ক সামলাচ্ছে।
ফলাফল হলো সতর্ক মধ্যপন্থা। আসিয়ান ‘ইন্দো-প্যাসিফিক বিষয়ে আসিয়ান দৃষ্টিভঙ্গি’র মতো অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্যোগকে স্বাগত জানায়। এতে কোনো অংশীদারকে বিচ্ছিন্ন না করে উন্মুক্ততা, স্বচ্ছতা ও সংলাপের আহ্বান জানানো হয়েছে। কঠোর পক্ষাবলম্বনের পরিবর্তে জোটটি স্বাস্থ্য, জলবায়ু, অবকাঠামো ও ডিজিটাল বাণিজ্যে বাস্তব সহযোগিতাকে অগ্রাধিকার দেয়। নেতারা প্রায়ই বলেন, ওয়াশিংটন ও বেইজিং—দুই পক্ষকেই সম্পৃক্ত রাখতে চান, তবে তাদের প্রতিযোগিতা যেন প্রতিদ্বন্দ্বী জোটে রূপ না নেয়।
নিরাপত্তা উত্তেজনাই আলোচ্যসূচি নির্ধারণ করছে
নিরাপত্তা নিয়ে উত্তেজনা সম্মেলনের ওপর দীর্ঘ ছায়া ফেলেছে। দক্ষিণ চীন সাগর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। চীনের কোস্টগার্ড ও সামুদ্রিক মিলিশিয়া বিতর্কিত ভূখণ্ডের কাছে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে, আর আসিয়ানের দাবিদার দেশগুলো আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। ফিলিপাইন প্রায় প্রতিদিনই তাদের একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলে উত্তেজনার মুখে পড়ছে। ভিয়েতনাম ও মালয়েশিয়া তাদের জলসীমার কাছে ঘন ঘন অনুপ্রবেশের ওপর নজর রাখছে। অবৈধ মাছ ধরা ও অননুমোদিত খনন ঠেকাতে ইন্দোনেশিয়া নাতুনা দ্বীপপুঞ্জের উত্তরে টহল বাড়িয়েছে।
দক্ষিণ চীন সাগর এবং দীর্ঘদিনের বিলম্বিত আচরণবিধি
আসিয়ান ও চীন বলেছে, তারা এই জলপথের জন্য আচরণবিধি নিয়ে আলোচনা ত্বরান্বিত করতে চায়। ঝুঁকি কমানো ও ঘটনাপ্রবাহ সামাল দিতে অভিন্ন নিয়ম প্রতিষ্ঠাই এর লক্ষ্য। বহু বছর ধরে অগ্রগতি ধীর, আর আইনি অবস্থানগুলোর মধ্যে ব্যবধান এখনো বড়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেশির ভাগ দেশ সামুদ্রিক অধিকার নির্ধারণের ভিত্তি হিসেবে সমুদ্র আইনবিষয়ক জাতিসংঘের কনভেনশনের কথা বলে। এর মধ্যে উপকূল থেকে ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলও রয়েছে। চীনের বিস্তৃত মানচিত্রভিত্তিক দাবি, যা সম্প্রতি ১০ দাগের রেখা দিয়ে হালনাগাদ করা হয়েছে, ওই অঞ্চলগুলোর সঙ্গে মিলে গেছে। ইউএনসিএলওএসের অধীনে ২০১৬ সালের একটি সালিশি রায়ে এসব দাবি প্রত্যাখ্যান করা হয়। এই আইনি বিরোধ সমুদ্রে এবং আলোচনার টেবিলে উত্তেজনা জিইয়ে রেখেছে।
কুয়ালালামপুরে বেইজিংয়ের বার্তা হলো, অঞ্চলটির উচিত সংঘাত থেকে সরে আসা। প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং জোটভিত্তিক রাজনীতির বিরুদ্ধে সতর্ক করে মতপার্থক্য সামাল দিতে সংলাপের আহ্বান জানিয়েছেন।
চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং আঞ্চলিক নেতাদের বলেছেন, দেশগুলোর উচিত পক্ষ নেওয়ার বিরোধিতা করা, জোটগত সংঘাতের বিরোধিতা করা এবং নতুন স্নায়ুযুদ্ধ এড়িয়ে চলা।
মিত্র, অংশীদার ও প্রতিরোধক্ষমতা
যুক্তরাষ্ট্র তাদের অব্যাহত উপস্থিতি ও মিত্রদের প্রতি সমর্থনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। দেশটি নৌ চলাচলের স্বাধীনতা, জাহাজ ও উড়োজাহাজের আইনসম্মতভাবে চলাচলের অধিকার এবং জবরদস্তির মাধ্যমে স্থিতাবস্থা বদলানোর প্রচেষ্টার বিরোধিতার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিচ্ছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি অংশীদারের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও কোস্টগার্ড সম্পর্কও আরও গভীর করছে এবং যৌথ টহল ও মহড়া চালাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা এটিকে পছন্দ চাপিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নয়, বরং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি অঙ্গীকার হিসেবে তুলে ধরেছেন। সম্মেলনে দেওয়া বার্তাটিও সমুদ্রে আইনি রীতিনীতি রক্ষার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আগের বিবৃতিগুলোর প্রতিধ্বনি।
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস পুনর্ব্যক্ত করেছেন, সমুদ্রে নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা—দক্ষিণ চীন সাগরসহ—সমুন্নত রাখতে যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে কাজ করবে এবং বেআইনি সামুদ্রিক দাবি ও উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের জবাব দেবে।
বাণিজ্যে অস্থিরতা ও সরবরাহব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস
নিরাপত্তার মতো অর্থনৈতিক স্বার্থও অনেক বড়। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বাণিজ্যযুদ্ধ এখন শুল্ক ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের একগুচ্ছ পদক্ষেপে রূপ নিয়েছে, যার প্রভাব দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সরবরাহব্যবস্থায় ছড়িয়ে পড়ছে। আসিয়ানের অর্থনীতিগুলো রপ্তানিনির্ভর এবং বৈশ্বিক উৎপাদন নেটওয়ার্কের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো পণ্যের ওপর বেশি শুল্ক প্রবৃদ্ধি কমিয়ে দিতে পারে এবং বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত জটিল করতে পারে। উন্নত সেমিকন্ডাক্টর ও গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জামের ওপর নিয়ন্ত্রণ মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে যন্ত্রাংশ সংযোজন বা পরীক্ষার কাজে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রভাবিত করে।
কুয়ালালামপুরের নেতারা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখার উপায় খুঁজছেন। সম্মেলনের আলোচ্যসূচিতে বাণিজ্য-ঝুঁকি ও ১০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্কের প্রভাব নিয়ে একটি ব্যতিক্রমী যৌথ অর্থনৈতিক অধিবেশন রয়েছে। কয়েকটি আসিয়ান দেশ শুল্কের ধাক্কা কমাতে দ্বিপক্ষীয় চুক্তির চেষ্টা করেছে। এসব সমঝোতা সময় কিনে দেয়, তবে বৃহত্তর কৌশলের বিকল্প নয়। আঞ্চলিক ফোরাম ভূমিকা রাখতে পারে। ২০২০ সালের পর সরাসরি প্রথম আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব (আরসিইপি) সম্মেলনটি আসিয়ান সম্মেলনের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আরসিইপিতে আসিয়ানের সঙ্গে চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড রয়েছে। এর লক্ষ্য শুল্ক ও পণ্যের উৎপত্তিস্থল নির্ধারণের নিয়ম সমন্বিত করা।
আরসিইপি, বিরল মৃত্তিকা ও উন্মুক্ত বাণিজ্যের আহ্বান
উন্মুক্ত বাণিজ্য ও গভীরতর আঞ্চলিক সংহতির পক্ষে প্রচার চালাতে চীন এ সপ্তাহের মনোযোগ কাজে লাগিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী লি সুরক্ষাবাদের বিরোধিতা এবং আরসিইপি সম্প্রসারণ ও বাস্তবায়নের নতুন প্রচেষ্টার আহ্বান জানিয়েছেন। বৈদ্যুতিক যান ও উচ্চপ্রযুক্তির উৎপাদনে অপরিহার্য বিরল মৃত্তিকা সরবরাহে চীনের নিয়ন্ত্রণ যেকোনো বাণিজ্যবিরোধে দেশটিকে প্রভাব খাটানোর সুযোগ দেয়। আঞ্চলিক অংশীদাররা সরবরাহব্যবস্থায় বৈচিত্র্য আনা, স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং একমুখী নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করছে, একই সঙ্গে যেখানে সম্ভব বাজার উন্মুক্ত রাখছে।
আসিয়ানের বিভিন্ন বাণিজ্যব্যবস্থা—আসিয়ান মুক্ত বাণিজ্য এলাকা থেকে আরসিইপি পর্যন্ত—বিশ্বজুড়ে সুরক্ষাবাদ বাড়লেও বাণিজ্য সচল রাখার উপায় দেয়। অনেক সদস্য দেশ চায়, যুক্তরাষ্ট্র তাদের নিরাপত্তা-সম্পৃক্ততার পাশাপাশি ইতিবাচক অর্থনৈতিক কর্মসূচিও দিক। ডিজিটাল বাণিজ্যের মানদণ্ড, সেবা খাতে বাজারে প্রবেশাধিকার এবং অবকাঠামো অর্থায়ন—এসব ক্ষেত্র প্রবৃদ্ধি আনতে পারে, কোনো দেশকে এক শক্তি বা অন্য শক্তির পক্ষে দাঁড়াতে বাধ্য না করেই।
আসিয়ানের ঐক্য ও মিয়ানমার পরীক্ষা
নিজেদের সদস্যদের মধ্যকার সংকট জোটের সংহতিকে চাপে ফেলেছে। মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ সীমান্তবর্তী অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করেছে, বেসামরিক মানুষকে বাস্তুচ্যুত করেছে এবং প্রতিবেশী দেশগুলো পর্যন্ত বিস্তৃত অপরাধী নেটওয়ার্ককে উসকে দিয়েছে। আসিয়ানের পাঁচ দফা ঐকমত্যে সহিংসতা বন্ধ, মানবিক সহায়তা এবং সব পক্ষের অংশগ্রহণে অন্তর্ভুক্তিমূলক সংলাপের আহ্বান জানানো হয়েছে। এর বাস্তবায়ন পিছিয়ে রয়েছে, আর অঞ্চলজুড়ে রাজধানীগুলোতে হতাশা বেড়েছে।
সিঙ্গাপুর জোটকে নীতিনিষ্ঠ অবস্থানে অবিচল থাকতে আহ্বান জানিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ওং উত্তেজনা প্রশমন, মানবিক সহায়তা পৌঁছানো এবং মিয়ানমারের সব গুরুত্বপূর্ণ অংশীজনের সঙ্গে ধারাবাহিক যোগাযোগের আহ্বান জানিয়েছেন। কূটনীতি সচল রাখতে আসিয়ানের বিশেষ দূতের মেয়াদ বাড়ানোর পক্ষেও তিনি মত দিয়েছেন। বিষয়গুলো সংবেদনশীল, কারণ অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করাই আসিয়ানের ঐতিহ্য। তবে সংঘাত চলতে থাকা এবং সীমান্ত পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ার ফলে সেই পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা আরও স্পষ্ট হয়েছে।
আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা সদস্যদের মধ্যকার বিরোধ সামাল দেওয়ার ওপরও নির্ভরশীল। থাইল্যান্ড-কম্বোডিয়া শান্তি সমঝোতা বিরল এক ইতিবাচক দৃষ্টান্ত। সর্বোচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিগত সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে চুক্তির পথ সুগম করতে মালয়েশিয়া সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করছে। চুক্তি স্বাক্ষরের সময় ট্রাম্পের উপস্থিতি ঘটনাটিকে আরও দৃশ্যমান করবে।
সদস্য দেশগুলোর অবস্থান
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া একরকম নয়। আসিয়ান দেশগুলোর কৌশলগত অবস্থান তাদের ভৌগোলিক অবস্থান, ইতিহাস ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের প্রতিফলন। কয়েকটি মোটাদাগের প্রবণতা চোখে পড়ে। কিছু দেশ চীনের সঙ্গে বাণিজ্য বজায় রেখেও যুক্তরাষ্ট্র ও তার অংশীদারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা সম্পর্ক গড়ে তুলছে। অন্যরা দুই পক্ষের সঙ্গেই উত্তেজনা এড়াতে ভারসাম্য রাখছে। তৃতীয় একটি গোষ্ঠী অর্থনৈতিক নির্ভরতা বা অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কারণে বেইজিংয়ের আরও ঘনিষ্ঠ হচ্ছে।
ফিলিপাইন তাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে। বর্ধিত প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর প্রবেশাধিকার বাড়িয়েছে, যৌথ টহল জোরদার করেছে এবং পুনর্ব্যক্ত করেছে যে দক্ষিণ চীন সাগরে তাদের বাহিনী বা সরকারি জাহাজে সশস্ত্র হামলার ক্ষেত্রে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি প্রযোজ্য। ম্যানিলা চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্কও বজায় রাখতে চায়। সেকেন্ড থমাস শোল বা স্কারবরো শোলের কাছে উত্তেজনা বাড়লে এই ভারসাম্য রক্ষা কঠিন হয়।
দুই মেরুর মধ্যে বেছে নেওয়া এড়ানোই ইন্দোনেশিয়ার স্বভাব। জাকার্তা প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ও প্রশিক্ষণে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করে, নৌ চলাচলের স্বাধীনতাকে সমর্থন করে এবং আসিয়ান-নেতৃত্বাধীন প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেয়। একই সঙ্গে অবকাঠামো ও বাণিজ্যে চীনের সঙ্গে অংশীদারত্ব রাখে এবং বৈদ্যুতিক যান ও ব্যাটারি খাতে বিদেশি বিনিয়োগ আনতে চায়। মালয়েশিয়াও একই পথ অনুসরণ করছে; নিরপেক্ষতার ইঙ্গিত দেওয়ার পাশাপাশি দুই শক্তির সঙ্গেই বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে।
চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ও সামুদ্রিক বিরোধ নিয়ে জটিল সম্পর্ক সামলানোর পাশাপাশি ভিয়েতনাম যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে প্রতিরক্ষা সংলাপ গভীর করছে, ইউরোপীয় অংশীদারদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হচ্ছে এবং নিজস্ব শিল্পভিত্তি গড়ে তুলছে। সিঙ্গাপুর আঞ্চলিক ভারসাম্যের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী উপস্থিতিকে অগ্রাধিকার দেয় এবং চীনের বাণিজ্য ও বিনিয়োগকে স্বাগত জানায়। কম্বোডিয়া ও লাওস চীনা অর্থায়ন ও রাজনৈতিক সহায়তার ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক দুর্বল হওয়ায় মিয়ানমারের চীন-নির্ভরতা বেড়েছে। এসব পার্থক্য আসিয়ানের অভ্যন্তরীণ ঐকমত্যকে কঠিন করে তোলে, তবে এগুলো মতাদর্শের চেয়ে বাস্তবভিত্তিক জাতীয় হিসাব-নিকাশের প্রতিফলন।
কুয়ালালামপুরে নেতারা কী বার্তা দিচ্ছেন
সম্মেলনে প্রকাশ্য মন্তব্যগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ পক্ষগুলোর বার্তা উঠে এসেছে। সামুদ্রিক অধিকার বিষয়ে অনড় থেকে উত্তেজনা কমাতে চাইছে ম্যানিলা। ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র জোর দিয়ে বলেছেন, তাঁর দেশ সংঘাত উসকে না দিয়ে নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে চায়।
ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র বলেন, ফিলিপাইন সংঘাত চায় না, তবে তাদের সার্বভৌমত্বের যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার দায়িত্ব রয়েছে।
মালয়েশিয়া সেতুবন্ধন তৈরির ভূমিকায় এগোচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম স্পষ্ট করেছেন, আসিয়ান ওয়াশিংটন ও বেইজিং—উভয়ের সঙ্গে যোগাযোগ চালিয়ে যাবে এবং নিরপেক্ষতা সিদ্ধান্তহীনতা নয়, বরং সচেতন পছন্দ।
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম বলেন, আসিয়ান যুক্তরাষ্ট্র ও চীন—উভয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখবে এবং কোনো দিকেই ঝুঁকছে না। তিনি যোগ করেন, দুই শক্তির সঙ্গেই সুসম্পর্ক বজায় রাখা অঞ্চলটির জন্য যুক্তিযুক্ত।
এসব বক্তব্য অন্তর্ভুক্তি ও বাস্তব সহযোগিতার প্রতি আসিয়ানের দীর্ঘদিনের অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। একই সঙ্গে এগুলো রাজনৈতিক বাস্তবতাও তুলে ধরে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে বড় বিনিয়োগকারী যুক্তরাষ্ট্র এবং সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার চীন। নেতারা চান, উভয় পক্ষই সম্পৃক্ত থাকুক; আর তাঁরা যেন বৃহৎ শক্তির কর্মসূচির বদলে স্থানীয় প্রয়োজন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পান।
চাপে আসিয়ানের কেন্দ্রীয় ভূমিকা
আসিয়ানের কেন্দ্রীয় ভূমিকার ধারণাটি এই বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে যে অঞ্চলটি নিজেই আলোচ্যসূচি নির্ধারণ করতে এবং অভিন্ন স্বার্থে অংশীদারদের একত্র করতে পারে। এই সম্মেলনে ট্রাম্প ও লি-র উপস্থিতি মনে করিয়ে দেয়, আসিয়ান এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ ফোরাম। একই সঙ্গে এটি একটি পরীক্ষা। নিজেদের সদস্যদের মতপার্থক্য সামলানোর পাশাপাশি প্রতিদ্বন্দ্বীদের উত্তেজনা না বাড়িয়ে আলোচনায় বসার মঞ্চ দিতে পারবে কি জোটটি?
কুয়ালালামপুরের গবেষক ও নীতিনির্ধারণী কাজে যুক্ত ব্যক্তিরা মনে করেন, আসিয়ানের ভবিষ্যৎ প্রাসঙ্গিকতা দুটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করবে। প্রথমত, সমুদ্রে আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং শান্তিপূর্ণভাবে বিরোধ নিষ্পত্তির অঙ্গীকারের মতো মৌলিক নীতিতে ঐক্য। দ্বিতীয়ত, নাগরিকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বাস্তব অগ্রগতি। এর অর্থ শুধু যৌথ বিবৃতি নয়, বরং যোগাযোগব্যবস্থা, সবুজ অর্থনীতি, ডিজিটাল মানদণ্ড ও জনস্বাস্থ্যে সুনির্দিষ্ট অগ্রগতি। অন্তর্ভুক্তি ও টেকসই উন্নয়নকে কেন্দ্র করে মালয়েশিয়ার সভাপতিত্বের প্রতিপাদ্য সেই দিকেই ইঙ্গিত করে।
আঞ্চলিক এক বিশেষজ্ঞ সংক্ষেপে বলেছেন, পথ ধরে এগিয়ে যাওয়ার পক্ষে যুক্তি নিহিত রয়েছে আসিয়ানের একত্র করার ক্ষমতা ও স্থির কূটনীতিতে।
অধ্যাপক জয়নাল আবেদিন সানুসি বলেন, পক্ষ নেওয়ায় নয়, সেতুবন্ধন তৈরিতেই আসিয়ানের শক্তি নিহিত; আগামী প্রজন্মের কাছে এর প্রাসঙ্গিকতা নির্ধারণ করবে এর ঐক্য ও মূল্যবোধভিত্তিক নেতৃত্ব।
যা জানা জরুরি
- নিরাপত্তা ও বাণিজ্য নিয়ে কূটনীতির গুরুত্ব বাড়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং কুয়ালালামপুরে আসিয়ান সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন।
- আসিয়ান তিমুর-লেস্তেকে ১১তম সদস্য হিসেবে স্বাগত জানানো এবং সাম্প্রতিক সীমান্ত সংঘর্ষের পর থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার শান্তি সমঝোতা সামনে আনার পরিকল্পনা করেছে।
- দক্ষিণ চীন সাগরের উত্তেজনা নিরাপত্তা আলোচনায় প্রাধান্য পাচ্ছে; আসিয়ান ও চীন আচরণবিধি নিয়ে আলোচনা ত্বরান্বিত করতে চায়।
- চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং পক্ষ নেওয়ার বিরুদ্ধে সতর্ক করে নতুন স্নায়ুযুদ্ধ এড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন; যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা সমুদ্রে নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
- যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্যযুদ্ধের শুল্ক ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে; সরবরাহব্যবস্থা সুরক্ষিত ও বাণিজ্য বাড়ানোর উপায় খুঁজছেন নেতারা।
- সুরক্ষাবাদের পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে আরসিইপি অংশীদাররা বাস্তবায়ন ও সম্প্রসারণ এগিয়ে নিতে সম্মেলনের ফাঁকে বৈঠক করেছেন।
- মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ আসিয়ানের ঐক্যে চাপ সৃষ্টি করছে; নেতারা উত্তেজনা প্রশমন, মানবিক সহায়তা পৌঁছানো ও ধারাবাহিক কূটনীতির আহ্বান জানিয়েছেন।
- সদস্য দেশগুলো ঘনিষ্ঠতর মার্কিন নিরাপত্তা সম্পর্ক থেকে চীনের সঙ্গে গভীর অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা পর্যন্ত ভিন্ন ভিন্ন কৌশল নিচ্ছে, তবে দুই মেরুর একটিকে বেছে নেওয়া এড়াতে চাইছে।
- মালয়েশিয়ার সভাপতিত্ব অন্তর্ভুক্তি ও টেকসই উন্নয়নকে গুরুত্ব দিচ্ছে; সবুজ অর্থনীতি, ডিজিটাল মানদণ্ড ও যোগাযোগব্যবস্থায় দৃশ্যমান সুফল আনার আহ্বান জানানো হয়েছে।
- অঞ্চলকে মেরুকরণ না করে ওয়াশিংটন ও বেইজিং—উভয়কে সম্পৃক্ত রাখা এবং আইনি নীতি ও বাস্তব সহযোগিতায় ঐক্য বজায় রাখার ওপর আসিয়ানের কেন্দ্রীয় ভূমিকা নির্ভর করছে।






