উৎপাদনে শীর্ষে থেকেও চীনের অবস্থান দশম কেন
বহুল আলোচিত উদ্ভাবন সূচকের শীর্ষ স্তরে উঠে এসেছে চীন। জ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতে উৎপাদনে দেশটি বিশ্বে প্রথম হলেও গ্লোবাল ইনোভেশন ইনডেক্সের (জিআইআই) সম্মিলিত তালিকায় রয়েছে দশম স্থানে। বিশ্ব মেধাস্বত্ব সংস্থা (ডব্লিউআইপিও) প্রণীত এই সূচকে আবারও প্রথম হয়েছে সুইজারল্যান্ড। শীর্ষ তিনে রয়েছে সুইডেন ও যুক্তরাষ্ট্র। এরপর আছে দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্য, ফিনল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস ও ডেনমার্ক; চীনের অবস্থান দশম।
সূচিপত্র
- উৎপাদনে শীর্ষে থেকেও চীনের অবস্থান দশম কেন
- গ্লোবাল ইনোভেশন ইনডেক্স কী পরিমাপ করে
- উদ্ভাবনের উপকরণ
- উদ্ভাবনের ফলাফল
- কেন বছরের পর বছর শীর্ষে সুইজারল্যান্ড
- জিআইআই কি পক্ষপাতদুষ্ট, নাকি ভিন্ন কিছু পরিমাপ করে
- চীনের উদ্ভাবনী শক্তি, যা জিআইআইয়ে কম প্রতিফলিত হতে পারে
- নীতি ও ব্যবসার জন্য এর গুরুত্ব
- কী বদলালে র্যাঙ্কিং বদলাতে পারে
- এরপর কী নজরে রাখবেন
- মূল কথা
প্রথম নজরে চীনের এই ফলাফলকে পরস্পরবিরোধী মনে হতে পারে। একদিকে, চীনের গবেষণা উৎপাদনশীলতা, পেটেন্ট আবেদন এবং উন্নত প্রযুক্তিপণ্যের রপ্তানি এতটাই বেড়েছে যে উৎপাদন স্তম্ভে দেশটি শীর্ষে। অন্যদিকে, সম্মিলিত অবস্থানে তালিকার ওপরের দিকে থাকা ছোট, উচ্চ আয়ের অর্থনীতিগুলোর পেছনে রয়েছে দেশটি। উৎপাদন এবং উদ্ভাবনের বৃহত্তর পরিবেশের এই ব্যবধান থেকেই পরিমাপবিজ্ঞান, অর্থনৈতিক কাঠামো ও নীতিগত অগ্রাধিকার নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত।
ডব্লিউআইপিওর সূচকে ৭৮টি নির্দেশকের মাধ্যমে ১৩৯টি অর্থনীতির মূল্যায়ন করা হয়। এতে প্রতিষ্ঠান, অবকাঠামো, মানবসম্পদ ও ব্যবসায়িক দক্ষতার মতো উপকরণ এবং জ্ঞান সৃষ্টি ও সৃজনশীল শিল্পের মতো ফলাফল বিবেচনা করা হয়। মূলত ২০২৪ সালের তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি ২০২৫ সালের সংস্করণে বৈশ্বিক উদ্ভাবনের চিত্রে বেশ কিছু পরিবর্তন দেখা গেছে। গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে ব্যয় বৃদ্ধির গতি বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর সবচেয়ে দুর্বল পর্যায়ে নেমেছে। ২০২৩ সালের পতনের পর ভেঞ্চার ক্যাপিটাল কার্যক্রমও ঘুরে দাঁড়ায়নি। তবে আরও সবুজ সুপারকম্পিউটার থেকে শুরু করে ব্যাটারির দাম কমা পর্যন্ত নানা প্রযুক্তির অগ্রগতি অব্যাহত ছিল; এদিকে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছেছে ৫জি নেটওয়ার্ক।
চীনের শীর্ষ দশে ওঠায় জার্মানি এক ধাপ পিছিয়ে এগারোতে নেমেছে। গত বছর বিশ্বের মোট আন্তর্জাতিক পেটেন্ট আবেদনের প্রায় এক-চতুর্থাংশই এসেছে চীন থেকে। বৈজ্ঞানিক প্রকাশনা এবং উন্নত উৎপাদনশিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রপ্তানির জটিলতার ক্ষেত্রেও দেশটি শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। নতুন সূচকে ভারত, তুরস্ক, ভিয়েতনাম ও আফ্রিকার কয়েকটি রাষ্ট্রসহ মধ্যম আয়ের অর্থনীতিগুলোর দ্রুত অগ্রগতিও উঠে এসেছে। ডিজিটাল অর্থায়ন ও শাসনব্যবস্থার সংস্কারে প্রত্যাশার চেয়ে ভালো করেছে তারা।
গ্লোবাল ইনোভেশন ইনডেক্স কী পরিমাপ করে
একটি অর্থনীতি কতটা দক্ষতার সঙ্গে ধারণাকে নতুন পণ্য, সেবা ও প্রবৃদ্ধিতে রূপান্তর করে, তার তুলনামূলক মূল্যায়নের জন্য জিআইআই তৈরি করা হয়েছে। এর সাতটি স্তম্ভকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়: উপকরণ ও ফলাফল। উদ্ভাবন ও বাণিজ্যিকীকরণে সহায়ক পরিবেশ এবং জ্ঞান ও সৃজনশীলতার পরিমাপযোগ্য ফলাফল তুলে ধরাই এই পদ্ধতির লক্ষ্য।
উদ্ভাবনের উপকরণ
প্রাতিষ্ঠানিক মানের ক্ষেত্রে আইনের শাসন, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার কার্যকারিতা ও ব্যবসা করার সহজতা দেখা হয়। শক্তিশালী চুক্তি, পূর্বানুমানযোগ্য বিধিবিধান এবং কম দুর্নীতি উদ্ভাবক ও বিনিয়োগকারীদের অনিশ্চয়তা কমায়। মানবসম্পদ ও গবেষণার মূল্যায়নে দেখা হয় বিদ্যালয়শিক্ষা, উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম। উচ্চশিক্ষায় ভর্তির হার বেশি, বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিষয়ে শক্তিশালী কর্মসূচি এবং পর্যাপ্ত অর্থায়ন পাওয়া গবেষণাগার রয়েছে—এমন অর্থনীতিগুলো সাধারণত এ ক্ষেত্রে ভালো করে। অবকাঠামোর মধ্যে রয়েছে ডিজিটাল সংযোগ, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ ও সরবরাহব্যবস্থা। দ্রুত নেটওয়ার্ক, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ এবং দক্ষ পরিবহন ধারণার বিস্তার ও প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্প্রসারণে সহায়তা করে।
বাজারের পরিশীলিততার সূচকে ঋণের প্রাপ্যতা, বিনিয়োগ প্রবাহ ও বাণিজ্য অর্থায়ন বিবেচনা করা হয়, যা ঝুঁকি নেওয়া ও স্টার্টআপ গঠনে সহায়তা করে। ব্যবসায়িক পরিশীলিততার সূচকে দেখা হয়, প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে জ্ঞান কাজে লাগায় এবং গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ করে; এর মধ্যে কোম্পানি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতাও রয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো গবেষণায় প্রচুর অর্থ ব্যয় করলে, দক্ষ কর্মী নিয়োগ দিলে এবং যৌথ প্রকল্পে অংশ নিলে তা এই স্তম্ভে প্রতিফলিত হয়।
উদ্ভাবনের ফলাফল
জ্ঞান ও প্রযুক্তি-সংক্রান্ত ফলাফলের মধ্যে রয়েছে পেটেন্ট, বৈজ্ঞানিক প্রকাশনা, উচ্চমূল্যের রপ্তানি এবং উদ্ভাবনের সঙ্গে সম্পর্কিত উৎপাদনশীলতার পরিমাপ। সৃজনশীলতার ফলাফলে ব্র্যান্ড ও ট্রেডমার্কের মতো অমূর্ত সম্পদ, সাংস্কৃতিক ও গণমাধ্যমসামগ্রী এবং অনলাইন সৃজনশীলতা অন্তর্ভুক্ত। বাস্তবে, বিপুলসংখ্যক আন্তর্জাতিক পেটেন্ট আবেদন, ব্যাপক প্রকাশনা এবং উন্নত প্রযুক্তিপণ্যের বড় রপ্তানি আয়তনের মাধ্যমে একটি অর্থনীতি ফলাফলে এগিয়ে থাকতে পারে। একই সময়ে, সৃজনশীল পণ্য ও ডিজিটাল কনটেন্টে ভালো অবস্থান ছোট অর্থনীতির স্কোরও বাড়াতে পারে।
এই কাঠামো চীনের অবস্থান বুঝতে সাহায্য করে। চীন বিপুলসংখ্যক পেটেন্ট, গবেষণাপত্র ও উন্নত প্রযুক্তিপণ্য রপ্তানি করে। এসব শক্তি দেশটির ফলাফল স্তম্ভকে এগিয়ে নেয়। তবে সম্মিলিত স্কোরে বৃহত্তর পরিসরের উপকরণও বিবেচিত হয়, যেখানে অত্যন্ত সমন্বিত নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, ঘন গবেষণা কেন্দ্র এবং বেসরকারি ঝুঁকিপুঁজি সহজে পাওয়ার সুবিধা থাকা ছোট অর্থনীতিগুলো এগিয়ে। চূড়ান্ত র্যাঙ্কিংয়ে দুই দিকেরই ভারযুক্ত সমন্বয় প্রতিফলিত হয়।
কেন বছরের পর বছর শীর্ষে সুইজারল্যান্ড
শীর্ষে সুইজারল্যান্ডের অবস্থান উল্লেখযোগ্যভাবে ধারাবাহিক। ছোট ভৌগোলিক পরিসর ও উচ্চমানের সুশাসনের পাশাপাশি দেশটির রয়েছে বিজ্ঞান ও প্রকৌশলে উৎকর্ষের শক্তিশালী ভিত্তি। ওষুধ, রোগনির্ণয়, বিশেষায়িত যন্ত্রপাতি ও রাসায়নিক খাতের বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোও সেখানে রয়েছে, যারা গবেষণা ও পণ্য উন্নয়নে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করে। প্রতিভা, পুঁজি ও করপোরেট চাহিদার এই সমন্বয় গবেষণাগার থেকে বাজার পর্যন্ত একটি ঘনিষ্ঠ কার্যচক্র গড়ে তোলে।
একাডেমিক দক্ষতা দেশটির বড় সম্পদ। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পেটেন্ট আবেদনের তুলনামূলক গবেষণায় শিক্ষার্থীর সংখ্যার অনুপাতে হিসাব করলে সুইজারল্যান্ড শীর্ষের কাছাকাছি রয়েছে। প্রতি এক লাখ শিক্ষার্থীর বিপরীতে দেশটির বিশ্ববিদ্যালয় ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো বিপুলসংখ্যক আন্তর্জাতিক পেটেন্ট আবেদন করে। একাডেমিক গবেষণাকে সুরক্ষাযোগ্য মেধাস্বত্বে রূপান্তর করার দক্ষতার একটি সূচক এটি। শিল্প খাতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, শক্তিশালী প্রযুক্তি হস্তান্তর দপ্তর এবং ইউরোপীয় গবেষণা নেটওয়ার্কে সহজ প্রবেশাধিকার এই সুবিধাকে আরও জোরদার করে।
নীতিগত ও আইনি ভিত্তিও গুরুত্বপূর্ণ। মেধাস্বত্ব সুরক্ষায় সুইজারল্যান্ডের সুনাম উন্নত চিকিৎসা ও যন্ত্রপাতি তৈরিতে নিয়োজিত কোম্পানিগুলোর ঝুঁকি কমায়। মেধাস্বত্বের স্বীকৃতি সহজ করা এবং গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানো বাণিজ্য কাঠামোও সুইস প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা করেছে। সব মিলিয়ে, এসব বৈশিষ্ট্য জিআইআইয়ের উপকরণ স্তম্ভগুলোকে শক্তিশালী করে এবং সেগুলোকে পরিমাপযোগ্য ফলাফলে রূপান্তরের হার বাড়ায়।
জিআইআই কি পক্ষপাতদুষ্ট, নাকি ভিন্ন কিছু পরিমাপ করে
চীনে জনপরিসরের বিতর্কে প্রশ্ন উঠেছে, এই সূচক কি ধনী পশ্চিমা অর্থনীতিগুলোকে বাড়তি সুবিধা দেয়? সমালোচকদের যুক্তি, মাথাপিছু বা জিডিপির অনুপাতে হিসাব করা পদ্ধতিতে ছোট, উচ্চ আয়ের রাষ্ট্রগুলো প্রায় সব সময়ই এগিয়ে থাকবে, কারণ তুলনামূলকভাবে সমজাতীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে তাদের ফলাফল গড় করা হয়। বড় ও বৈচিত্র্যময় অর্থনীতির অভিজ্ঞতাকে একটি মাত্র স্কোরে ধরে রাখা কঠিন। শেনঝেনের মতো একটি শহরের অগ্রগতি ১৪০ কোটি মানুষের মধ্যে ফলাফল ভাগ করে হিসাব করলে ম্লান হয়ে যেতে পারে।
দ্বিতীয় একটি উদ্বেগ হলো, তথ্যের উৎস উন্নত হওয়া এবং নীতিগত অগ্রাধিকারের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রতি বছর সূচকটি হালনাগাদ করা হয়। সাম্প্রতিক সংস্করণগুলোতে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল, ডিজিটাল সংযোগ ও টেকসই উন্নয়নের সূচকগুলো কীভাবে বিবেচনা করা হবে, তাতে পরিবর্তন এসেছে। এসব পরিবর্তনের যৌক্তিকতা থাকলেও ফলাফল বদলে যেতে পারে। তথ্যপ্রযুক্তি সেবায় বেশি গুরুত্ব দিলে কোনো দেশ র্যাঙ্কিংয়ে উঠতে পারে; আবার নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা বা অবকাঠামোতে বেশি গুরুত্ব দিলে নেমে যেতে পারে। এই পরিবর্তনশীলতা সূচকটিকে সময়োপযোগী রাখে, তবে বছরওয়ারি তুলনা কঠিন করে তোলে।
এসব সমস্যা ইচ্ছাকৃত পক্ষপাতের চেয়ে পরিমাপের সঙ্গে জড়িত কঠিন সিদ্ধান্তগুলোর দিকেই বেশি ইঙ্গিত করে। যেকোনো বৈশ্বিক সূচককে ঠিক করতে হয় কোন নির্দেশকগুলো উদ্ভাবনকে সবচেয়ে ভালোভাবে তুলে ধরে, সেগুলো কীভাবে সমমানের করা হবে এবং কীভাবে একটিমাত্র সংখ্যায় একত্র করা হবে। এসব সিদ্ধান্তে সমন্বিত, ছোট অর্থনীতি সুবিধা পেতে পারে; অন্যদিকে, বড় দেশগুলোর সেরা অঞ্চলে যে প্রাণচাঞ্চল্য রয়েছে, তা তুলে ধরা কঠিন হতে পারে।
চীনের উদ্ভাবনী শক্তি, যা জিআইআইয়ে কম প্রতিফলিত হতে পারে
অর্থনৈতিক ক্ষমতা ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ উন্নত শিল্প খাতে চীনের উদ্ভাবনব্যবস্থা দ্রুত এগোচ্ছে। স্বাধীন মূল্যায়নে দেখা গেছে, বাণিজ্যিক পারমাণবিক বিদ্যুৎ, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও ব্যাটারির ক্ষেত্রে চীন এগিয়ে আছে বা সমপর্যায়ে রয়েছে। রোবটিকস, ডিসপ্লে প্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কয়েকটি শাখায়ও ব্যবধান কমাচ্ছে দেশটি। তবে উচ্চমানের সেমিকন্ডাক্টর ও উন্নত মেশিন টুলের মতো কয়েকটি কৌশলগত উপকরণে পিছিয়ে রয়েছে এবং সেখানে বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল। অনেক উৎপাদক ও বিনিয়োগকারী বাস্তবে যে চিত্র দেখেন, তার সঙ্গে এই প্রবণতা মেলে।
মাত্রা, গতি ও বিশেষায়ন চীনা মডেলের মূল বৈশিষ্ট্য। বড় অভ্যন্তরীণ বাজারের কারণে কম খরচে দ্রুত নতুন পণ্য পরীক্ষা ও উন্নত করা যায়। কোনো পণ্য বাজারের চাহিদা পূরণ করতে পারলে সরবরাহ শৃঙ্খল দ্রুত উৎপাদন বাড়াতে পারে, দাম কমাতে এবং ব্যবহার ছড়িয়ে দিতে পারে। বৈদ্যুতিক গাড়ির ক্ষেত্রে এই চক্র স্পষ্ট: খরচ কমা ও দ্রুত উন্নয়নের ফলে বৈশ্বিক মূল্যমান এবং কর্মদক্ষতা নিয়ে প্রত্যাশা বদলে গেছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়েও চীনের দৃষ্টিভঙ্গি ব্যবহারিক প্রয়োগকেন্দ্রিক। কোম্পানিগুলো যন্ত্রপাতি, কারখানা ও সেবায় এআই প্রয়োগে জোর দেয়। সর্বাধুনিক মানদণ্ডের স্কোরের বদলে সাশ্রয়ী মূল্য ও ব্যাপক প্রাপ্যতাকে প্রায়ই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। এই পথ দেশটির বৃহত্তর উৎপাদন কৌশলের প্রতিফলন, যেখানে সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যারের সমন্বয় শক্তির উৎস। রপ্তানি ও পেটেন্টের মাধ্যমে জিআইআই এই চিত্রের কিছু অংশ ধারণ করে। তবে উৎপাদন-সংক্রান্ত জ্ঞান, বাস্তুতন্ত্রের সমন্বয় এবং দ্রুত উৎপাদন বাড়ানোর সক্ষমতা কীভাবে প্রতিযোগিতামূলক শক্তি গড়ে তোলে, তা হয়তো পুরোপুরি ধরা পড়ে না।
নীতি ও ব্যবসার জন্য এর গুরুত্ব
র্যাঙ্কিং আচরণে প্রভাব ফেলে। সরকার কৌশল প্রণয়নে এগুলো উদ্ধৃত করে, আর বিনিয়োগকারীরা বাজার মূল্যায়নে সংক্ষিপ্ত নির্দেশক হিসেবে ব্যবহার করেন। এর ফলে পরিমাপ যথাযথ করা এবং স্কোর সতর্কভাবে ব্যাখ্যা করার গুরুত্ব বাড়ে। ভালো নীতি প্রণয়নের শুরুতেই বুঝতে হবে, সূচকটি কী পরিমাপ করে আর কী করে না।
পরিমাপ নিয়ে উদ্বেগ শুধু উদ্ভাবনের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। উৎপাদনশিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা যাচাইয়ে ইউনিভার্সিটি অব সারের গবেষকেরা একটি নতুন মডেল তৈরি করেছেন। তাঁদের দেখা গেছে, অতিসরল ওজন নির্ধারণের কারণে প্রচলিত বৈশ্বিক পরিমাপ ভুল কারণে দেশগুলোকে পুরস্কৃত বা দণ্ডিত করতে পারে। গবেষণাটির নেতৃত্ব দেওয়া অধ্যাপক আলি এমরুজনেজাদ লক্ষ্যটি সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করেছেন।
ইউনিভার্সিটি অব সারের সেন্টার ফর বিজনেস অ্যানালিটিকস ইন প্র্যাকটিসের পরিচালক আলি এমরুজনেজাদ বলেন: "আমাদের মডেল বহু বছর ধরে যেভাবে শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার র্যাঙ্কিং করা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। বর্তমান বৈশ্বিক সূচক ভুল কারণে দেশগুলোকে পুরস্কৃত করতে পারে। প্রযুক্তি, বাণিজ্য ও উৎপাদনশীলতার মধ্যে ভারসাম্য রেখে বাস্তব পরিস্থিতির প্রতিফলন ঘটায়—এমনভাবে শিল্পের শক্তি পরিমাপের একটি পদ্ধতি আমরা তৈরি করেছি।"
উদ্ভাবন নীতির জন্য শিক্ষা স্পষ্ট। জিআইআইকে শক্তি ও ঘাটতি শনাক্তের উপায় হিসেবে ব্যবহার করতে হবে, পুরস্কারের তালিকা হিসেবে নয়। এরপর খাতভিত্তিক প্রমাণ, উৎপাদনশীলতার তথ্য এবং বাস্তব পণ্যের ফলাফলের সঙ্গে এর তুলনা করতে হবে। এতে বাস্তব অগ্রগতির বদলে সূচক পূরণে মনোযোগ দেওয়ার ঝুঁকি কমে।
কী বদলালে র্যাঙ্কিং বদলাতে পারে
তিনটি পরিবর্তনে সম্মিলিত স্কোর ভিন্ন হতে পারে। প্রথমত, সীমান্ত ছাড়িয়ে উদ্ভাবনের প্রভাব—যেমন বিশ্ববাজারে পৌঁছাতে লাগা সময় বা বিশ্বজুড়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তির সরবরাহে অংশ—আরও গুরুত্ব পেলে কোনো অর্থনীতির উদ্ভাবনের ব্যাপ্তি প্রতিফলিত হবে। দ্বিতীয়ত, বড় দেশগুলোর শহরভিত্তিক গতিশীলতা ধরার আরও ভালো পদ্ধতি থাকলে বিশাল জনগোষ্ঠীর গড় থেকে তৈরি হওয়া প্রভাব কমবে। তৃতীয়ত, নির্দেশক বাছাই ও ওজন নির্ধারণে আরও স্থিতিশীল পদ্ধতি সময়ের সঙ্গে প্রবণতা তুলনা সহজ করবে।
সম্মিলিত অবস্থানে আরও ওপরে ওঠার জন্য চীনের করণীয় মোটামুটি স্পষ্ট। প্রাতিষ্ঠানিক মান জোরদার করা, বিধিবিধানের পূর্বানুমানযোগ্যতা বাড়ানো এবং ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক পরিশীলিততা উন্নত করলে উপকরণ স্তম্ভগুলো এগোবে। বৈশ্বিক ভোক্তা ব্র্যান্ড গড়ে তোলা এবং মেধাস্বত্ব থেকে আয় বাড়ানো সৃজনশীলতার ফলাফলকে শক্তিশালী করবে। বিজ্ঞান ও উন্নত উৎপাদনশিল্পে ধারাবাহিক অগ্রগতি ফলাফলের অবস্থান ধরে রাখতে সাহায্য করবে।
শীর্ষ র্যাঙ্কিংয়ে থাকা অর্থনীতিগুলোর চ্যালেঞ্জ হলো শিক্ষা ও গবেষণায় উৎকর্ষ ধরে রাখার পাশাপাশি কম্পিউটিং সক্ষমতা বাড়ানো এবং প্রতিভাবানদের আকৃষ্ট করা। এআই, জৈবচিকিৎসা ও পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তিতে প্রতিযোগিতা তীব্র হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মেধাস্বত্বের জন্য শক্তিশালী আইনি পরিবেশও স্বাতন্ত্র্যসূচক সুবিধা হয়ে থাকবে।
এরপর কী নজরে রাখবেন
উদ্ভাবনে বিনিয়োগে ভাটা থাকলেও প্রযুক্তিগত অগ্রগতি অব্যাহত। সবুজ ডেটা সেন্টার দক্ষতার নতুন রেকর্ড গড়ছে। বৈদ্যুতিক গাড়ি, ৫জি ও রোবটিকস এগোচ্ছে, যদিও অঞ্চলভেদে গ্রহণের হার আলাদা। ব্যক্তিনির্ভর চিকিৎসার নতুন পথ খুলে দিয়ে মানব জিনোমের সিকোয়েন্সিংয়ের খরচ কমছে; একই সময়ে গত বছর ওষুধ অনুমোদন প্রায় ১৯ শতাংশ কমেছে। এসব মিশ্র সংকেত ইঙ্গিত দেয়, অর্থায়ন সাময়িকভাবে গতি হারালেও উদ্ভাবনের চক্র এগিয়ে চলেছে।
জিআইআইয়ে অবস্থানের পরিবর্তনও নজরে রাখা দরকার। শীর্ষে ইউরোপের উপস্থিতি শক্তিশালী। জার্মানির এগারোতে নেমে যাওয়া দেখায়, উপকরণ বা ফলাফলে সামান্য পরিবর্তনেও অবস্থান বদলে যেতে পারে। ডিজিটাল সরকারি অবকাঠামো, সেবা রপ্তানি ও প্রাণবন্ত স্টার্টআপ খাতের শক্তিতে গত পাঁচ বছরে এগিয়েছে ভারত। ভিয়েতনাম, তুরস্ক ও সেনেগালের মতো মধ্যম আয়ের অর্থনীতিগুলো আয়ের স্তরের তুলনায় প্রত্যাশার চেয়ে ভালো করেছে বলে চিহ্নিত হয়েছে। এতে বোঝা যায়, লক্ষ্যভিত্তিক সংস্কারে সূচকে দ্রুত উন্নতি সম্ভব।
মূল কথা
- জ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতে উৎপাদনে চীন বিশ্বে শীর্ষে, তবে গ্লোবাল ইনোভেশন ইনডেক্সের সম্মিলিত র্যাঙ্কিংয়ে দশম স্থানে।
- পঞ্চদশ বছরেও সুইজারল্যান্ড শীর্ষে রয়েছে; শীর্ষ দশে আছে আরও কয়েকটি ছোট, উচ্চ আয়ের ইউরোপীয় অর্থনীতি।
- প্রতিষ্ঠান ও মানবসম্পদের মতো উপকরণের সঙ্গে পেটেন্ট ও সৃজনশীল পণ্যের মতো ফলাফল মিলিয়ে সাতটি স্তম্ভে ৭৮টি নির্দেশকের ভিত্তিতে জিআইআই তৈরি হয়।
- সূচক তৈরির পদ্ধতি ও মানসমন্বয় সমন্বিত ছোট অর্থনীতিকে সুবিধা দিতে পারে এবং বড়, বৈচিত্র্যময় দেশের ভেতরের প্রাণচাঞ্চল্যকে গড়ের কারণে ম্লান করতে পারে।
- বৈদ্যুতিক গাড়ি, ব্যাটারি, পারমাণবিক বিদ্যুৎ ও ব্যবহারিক এআইয়ে চীনের গতি শক্তিশালী, তবে উচ্চমানের সেমিকন্ডাক্টরে দেশটি এখনও পিছিয়ে।
- র্যাঙ্কিং নীতি ও বিনিয়োগে প্রভাব ফেলে; তাই খাতভিত্তিক প্রমাণ ও বাস্তব পণ্যের ফলাফলের পাশাপাশি এগুলোকে রোগনির্ণয়ের উপায় হিসেবে ব্যবহার করাই ভালো।
- বৃহৎ পরিসরে প্রভাব, শহরভিত্তিক কার্যকারিতা এবং আরও স্থিতিশীল ওজন নির্ধারণের উন্নত পরিমাপ সময়ের প্রবণতা তুলনাকে আরও অর্থবহ করবে।
- গবেষণা অর্থায়ন ও ভেঞ্চার ক্যাপিটালের মন্থরতার সঙ্গে পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তি, ৫জি ও রোবটিকসের ধারাবাহিক অগ্রগতির সম্পর্ক কীভাবে বদলায়, তা নজরে রাখুন।






