কিমচির খ্যাতি থেকে কনভিনিয়েন্স স্টোরের সংস্কৃতি
একসময় কিমচি, বুলগোগি আর বিবিমবাপের মতো নামকরা খাবার খেতে পর্যটকেরা দক্ষিণ কোরিয়ায় যেতেন। এখন অনেকে গিমবাপের কাউন্টার, নদীর ধারে ইনস্ট্যান্ট নুডলস খাওয়া আর কনভিনিয়েন্স স্টোরের তাকজুড়ে পছন্দের জিনিস খোঁজার পরিকল্পনা করেই পুরো দিন কাটান। কোরিয়া ট্যুরিজম অর্গানাইজেশনের (কেটিও) ২০১৮ সাল থেকে এ বছরের জুলাই পর্যন্ত বিদেশি ক্রেডিট কার্ড লেনদেনের বিস্তারিত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, খরচের ধরন ক্রমে এমন খাবারের দিকে ঝুঁকছে, যেগুলোকে স্থানীয়রা দৈনন্দিন খাবার বলে মনে করেন। দ্রুত, সাশ্রয়ী আর বৈচিত্র্যে ভরপুর এসব খাবার কোরিয়ার প্রতিদিনের রুটিনকেই ভ্রমণের আকর্ষণে পরিণত করছে।
সূচিপত্র
- কিমচির খ্যাতি থেকে কনভিনিয়েন্স স্টোরের সংস্কৃতি
- কেন দ্রুত তৈরি দৈনন্দিন খাবার জনপ্রিয় হচ্ছে
- সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতিক্রিয়ার চক্র
- পর্যটনের পরিসংখ্যানে খাবারের জনপ্রিয়তার প্রেক্ষাপট
- কনভিনিয়েন্স স্টোরের অভিজ্ঞতা
- দর্শনার্থীরা সবচেয়ে বেশি যা কেনেন
- কোরীয় স্বাদের বার্গার, বেকারি ও ক্যাফে
- ঐতিহ্য ও ফাইন ডাইনিং এখনো মূল ভিত্তি
- কোরীয় পানীয়ের বিশ্বজয়
- পর্যটকদের চাহিদার সঙ্গে নীতি ও প্রচারের সমন্বয়
- কে-ওয়েভের যোগসূত্র: পপ সংস্কৃতি, নুডলস ও ভাগ করে নেওয়ার মুহূর্ত
- স্বল্প সময়ের ভ্রমণেও স্থানীয়দের মতো খাওয়ার পরামর্শ
- মূল বিষয়গুলো
পরিসংখ্যানগুলো বেশ উল্লেখযোগ্য। পর্যটকদের কার্ডে খরচের বার্ষিক বৃদ্ধির হারে সবার ওপরে আইসক্রিম, ৩৫ শতাংশ। এরপর কনভিনিয়েন্স স্টোরের খাবার ৩৪ শতাংশ এবং ক্রফল ২৫.৫ শতাংশ। জুলাইয়ে চালের কেক ও ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি কেনা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭৬.৯ শতাংশ বেড়েছে। নুডলস ও ডাম্পলিংয়ের কেনাকাটা বেড়েছে ৫৫.২ শতাংশ এবং শূকরের হাড়ের স্যুপ ৪৪ শতাংশ। এ বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত বিদেশি পর্যটকেরা ক্যাফেতে প্রায় ৮৯ লাখ, বেকারিতে ৩০ লাখ এবং বার্গার রেস্তোরাঁয় ২৩ লাখ লেনদেন করেছেন। একই সময়ে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ লেনদেন নিয়ে সব ধরনের প্রতিষ্ঠানের মধ্যে শীর্ষে ছিল কনভিনিয়েন্স স্টোর। পর্যটকদের অভিজ্ঞতায় এসব দোকার কতটা অবিচ্ছেদ্য হয়ে উঠেছে, তা থেকেই স্পষ্ট।
পর্যটকেরা কোথায় বার্গার খাচ্ছেন, সেটিও আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়। আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় ১০টি বার্গার ব্র্যান্ডের মধ্যে ছয়টিই দেশীয় চেইন। এতে বোঝা যায়, কোরিয়ার ক্যাজুয়াল ডাইনিং সম্পর্কে বিদেশিদের ধারণা গড়ে তুলছে স্থানীয় ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো। মৌসুমি ও আঞ্চলিক বিশেষ পদও পর্যটকদের আকৃষ্ট করছে—মিষ্টি আলু দিয়ে ভরা স্যান্ডউইচ থেকে শুরু করে অল্প সময়ের জন্য পাওয়া যায় এমন তিল-মাখনের নাশতা পর্যন্ত। এই প্রবণতা আরও বড় একটি বাস্তবতারই প্রতিফলন: খাবার এখন ভ্রমণের প্রধান কারণগুলোর একটি। কেটিওর ২০২৪ সালের এক জরিপে সম্ভাব্য পর্যটকদের ১৫.৭ শতাংশ খাবারের ট্যুরকে ভ্রমণের প্রধান প্রেরণা হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যা কেনাকাটা ও বিনোদনের চেয়েও বেশি। শিল্প খাতের হিসাব অনুযায়ী, পর্যটকদের মোট ব্যয়ের প্রায় এক-পঞ্চমাংশই যায় খাবারসংক্রান্ত অভিজ্ঞতায়।
কেন দ্রুত তৈরি দৈনন্দিন খাবার জনপ্রিয় হচ্ছে
ভ্রমণকারীদের জন্য দৈনন্দিন খাবারের তিনটি সুবিধা আছে: সহজে পাওয়া যায়, বুঝতে সুবিধা হয় এবং অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে খাওয়া যায়। সিউল ও বুসানের প্রায় প্রতিটি বড় সড়কেই রয়েছে কনভিনিয়েন্স স্টোর, বেকারি, বার্গারের দোকান ও ক্যাফে চেইন। মেনুগুলো পরিচিত, তবে তাতে কোরীয় স্বাদের ছোঁয়া আছে। ফ্রাইড চিকেন স্যান্ডউইচে থাকে গচুজাংয়ের গ্লেজ। লাটের ওপরের নকশায় ফুটে ওঠে পপ সংস্কৃতির ইঙ্গিত। এমনকি কাপ নুডলসের সারিতেও মেলে প্রিমিয়াম টপিংস ও বিভিন্ন অঞ্চলের স্বাদের ঝোল। দাম নাগালের মধ্যে থাকায় দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা বা বড় অঙ্কের খরচ ছাড়াই পর্যটকেরা এক দিনে একাধিক খাবার চেখে দেখতে পারেন।
পপ সংস্কৃতিও এর আকর্ষণের অংশ। কে-ড্রামা ও ভ্যারাইটি শো সাধারণ কিছু দৃশ্যকে রীতিতে পরিণত করেছে—যেমন গভীর রাতে কনভিনিয়েন্স স্টোরের টেবিলে বসে ইনস্ট্যান্ট নুডলস রান্না করা, কিংবা নদীর ধারে পিকনিকের জন্য গিমবাপ গুছিয়ে নেওয়া। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব রীতি ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বে; সেগুলোকে একই সঙ্গে পরিচিত ও নতুন মনে হয়। পর্যটকেরা নিজেদের ভিডিও পোস্ট করেন, বন্ধুরা ভ্রমণতালিকায় সেই জায়গাগুলো যোগ করেন, আর নতুন পণ্য ও সীমিত সময়ের বিশেষ সংস্করণ কৌতূহল জাগিয়ে এই চক্রকে সচল রাখে।
কেটিওতে পর্যটন তথ্য কৌশল বিভাগের নেতৃত্বে থাকা লি মি সুক জানান, এসব অভ্যাস এখন কত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এবং তাঁর দল কীভাবে তার সঙ্গে তাল মেলাচ্ছে। তাঁর কথায়, তথ্য-উপাত্ত নিশ্চিত করে যে দৈনন্দিন জীবনে পর্যটকদের কোরিয়ার সঙ্গে সংযোগ তৈরির ক্ষেত্রে খাবার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
প্রবণতা এখন বাস্তব সময়ে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে, আর কোরিয়ার নিত্যদিনের খাবারও অর্থবহ সাংস্কৃতিক বিনিময়ের মাধ্যম হয়ে ওঠে। দর্শনার্থীদের অভিজ্ঞতাকে কোরিয়ার দৈনন্দিন জীবন কীভাবে সমৃদ্ধ করে, তা তুলে ধরতে আমরা নীতি ও বিপণন পরিকল্পনায় এই প্রবণতাগুলোকে বিবেচনায় রাখব।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতিক্রিয়ার চক্র
ভাইরাল কনটেন্ট শুধু বিনোদন দেয় না, পণ্যের বিক্রিও বাড়ায়। সাম্প্রতিক একটি উদাহরণ হলো মধু-চালের কেকের সিরিয়াল—মজার এই খাবারটি বিদেশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। পোস্টগুলোতে কয়েক লাখ লাইক পড়ে, আর প্রবণতা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে স্থানীয় কোম্পানিগুলো নতুন পণ্য বাজারে আনে। ক্রফল, ত্রিকোণ গিমবাপ খাওয়ার কৌশল আর ইনস্ট্যান্ট নুডলসকে নতুনভাবে সাজানোর ক্ষেত্রেও একই চক্র দেখা যায়। ভিডিও নির্মাতারা দ্রুত তৈরি করা যায় এমন রেসিপি দেখান, ভ্রমণবিষয়ক ব্লগাররা কনভিনিয়েন্স স্টোর ঘুরে দেখার পথ সাজিয়ে দেন। এর ফলে, যা দেখেছেন তা চেখে দেখতে আগ্রহী পর্যটকদের মধ্যে নিয়মিত নতুন খাবার প্রথমবার কেনার প্রবণতা তৈরি হয়।
পর্যটনের পরিসংখ্যানে খাবারের জনপ্রিয়তার প্রেক্ষাপট
দক্ষিণ কোরিয়ায় বিদেশি পর্যটকের আগমন আবার বেড়েছে, ফলে দৈনন্দিন খাবারও পর্যটকদের মনোযোগ পাওয়ার বেশি সুযোগ পাচ্ছে। ২০১৯ সালে দেশটি ১ কোটি ৭৫ লাখ আন্তর্জাতিক পর্যটককে স্বাগত জানায়। এরপর মহামারির সময় পর্যটকের সংখ্যা তীব্রভাবে কমে যায়। তারপর থেকে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। ২০২৪ সালে পর্যটকের আগমন প্রায় ১ কোটি ৬৩ লাখ ৬০ হাজারে পৌঁছায়, যা মহামারির আগের সর্বোচ্চ সংখ্যার কাছাকাছি। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রায় ৩৪ লাখ ২০ হাজার পর্যটক এসেছেন; ওই প্রান্তিকে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় সামান্য বৃদ্ধি হয়েছে। ২০২৪ সালে পর্যটকদের গড় অবস্থানের সময় ছিল প্রায় ৭.৮ দিন।
আয়ও আবার বাড়ছে। ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক পর্যটকেরা ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি খরচ করেছেন। প্রতিটি বিদেশি পর্যটন সফরে গড় ব্যয় ছিল ১ হাজার মার্কিন ডলারের সামান্য বেশি। এই অর্থের উল্লেখযোগ্য অংশ সরাসরি খাবার, পানীয় ও ক্যাফেতে খরচ হচ্ছে। কোরিয়ার শহরগুলোর গঠনও এর অনুকূল। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় রেস্তোরাঁর পাশাপাশি রয়েছে সাংস্কৃতিক দর্শনীয় স্থান, আর দক্ষ গণপরিবহনের কারণে পর্যটকেরা এক বিকেলেই বাজার, বেকারি ও কনভিনিয়েন্স স্টোর ঘুরে দেখতে পারেন। এর ফলে খাবারকে কেন্দ্র করে দর্শনীয় স্থান ঘোরার এমন একটি অভিজ্ঞতা তৈরি হয়, যা যেকোনো ভ্রমণসূচিতে সহজেই মিশে যায়—সিউলের কেন্দ্রে জাদুঘর ঘুরে দেখা হোক কিংবা বুসানে সমুদ্রসৈকতে দিন কাটানো।
কনভিনিয়েন্স স্টোরের অভিজ্ঞতা
অনেক পর্যটকের কাছে কনভিনিয়েন্স স্টোরে যাওয়া কোরিয়ার দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার প্রথম ধাপ। অনেক দেশের কনভিনিয়েন্স স্টোরের তুলনায় এখানকার অভিজ্ঞতা ভিন্ন। বেশির ভাগ দোকানে মাইক্রোওয়েভ, নুডলসের জন্য গরম পানির কল এবং ছোট বসার জায়গা থাকে। একজন পর্যটক গিমবাপ রোল বেছে নিতে পারেন, প্যাকেটের ভাতের খাবার গরম করতে পারেন, দইয়ের পানীয় খুলে উজ্জ্বল আলোয় বসে খেতে পারেন; পেছনে বাজতে পারে কে-পপ। কয়েক সপ্তাহ পরপর মৌসুমি খাবার ও সীমিত স্বাদের পণ্য দিয়ে তাকগুলো নতুন করে সাজানো হয়, ফলে ঘুরে ঘুরে পণ্য দেখাও একধরনের খোঁজাখুঁজির খেলায় পরিণত হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিশ্লেষণেও দেখা যায়, এসব দোকান কতটা মনোযোগ পাচ্ছে। কোরিয়ার কনভিনিয়েন্স স্টোর নিয়ে করা পোস্টের প্রায় ৪০ শতাংশই খাবারকেন্দ্রিক। সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত শব্দের মধ্যে রয়েছে রামিয়ন, প্রায় ১৪ শতাংশ; কফি, প্রায় ১০ শতাংশ; আর নাশতা, প্রায় ৭ শতাংশ। জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত এসব দোকানে রেকর্ড হওয়া বিপুলসংখ্যক লেনদেনের সঙ্গেও এই চিত্র মিলে যায়। পর্যটকদের কাছে এটি কোরিয়ার দৈনন্দিন জীবনের স্বাদ নেওয়ার জায়গা, যা রাত পর্যন্ত খোলা থাকে এবং আন্তর্জাতিক কার্ড গ্রহণ করে।
দর্শনার্থীরা সবচেয়ে বেশি যা কেনেন
বিদেশি কার্ডে খরচ বৃদ্ধির তালিকায় সবার ওপরে রয়েছে আইসক্রিম। ফ্রিজারে স্থানীয় জনপ্রিয় পুরোনো স্বাদের পাশাপাশি থাকে ড্রামা ও মৌসুমি ফল থেকে অনুপ্রাণিত নতুন স্বাদ। ক্রসাঁ ও ওয়াফলের মিশেলে তৈরি ক্রফল এখনো ক্যাফেগুলোতে লাইন ধরাচ্ছে এবং প্রথমবার আসা পর্যটকদের কাছে এটি নৈমিত্তিক ডেজার্টের জনপ্রিয় পছন্দ হয়ে উঠেছে। ইনস্ট্যান্ট নুডলসও নির্ভরযোগ্য পছন্দ, বিশেষ করে কনভিনিয়েন্স স্টোর থেকে কেনা ডিম, চিজ বা ডাম্পলিং দিয়ে সাজিয়ে খেলে। ত্রিকোণ গিমবাপ, গরম বার স্কিউয়ার এবং গরম করে খাওয়ার জন্য তৈরি বেন্টো—সব মিলিয়ে সাধারণত কেনা খাবারের তালিকাটি পূর্ণ হয়। ক্যাফের কফি হোক কিংবা ঠান্ডা ক্যানের কফি, সারাদিন হাঁটাহাঁটির সঙ্গী হিসেবে তা জনপ্রিয়।
কোরীয় স্বাদের বার্গার, বেকারি ও ক্যাফে
কোরিয়ার বেকারিগুলোতে ফরাসি কৌশলের সঙ্গে স্থানীয় স্বাদের মিশেল দেখা যায়। ফলে তাকজুড়ে থাকে লাল শিম ও মাখনের রোল, ইনজলমি গুঁড়ো-মাখা পেস্ট্রি এবং মাচা বা কালো তিলের স্বাদযুক্ত ক্রিম ব্রেড। ক্যাফে একই সঙ্গে পানীয় তৈরির পরীক্ষাগার ও নান্দনিক পটভূমি হিসেবে কাজ করে, যা এ বছর কফিশপে বিদেশিদের বিপুলসংখ্যক লেনদেনের ব্যাখ্যা দেয়। বার্গারের দোকানগুলো পরিচিত খাবারের ধরন দেয়, ফলে পর্যটকেরা আরও সাহসী টপিংস চেখে দেখতে পারেন। তথ্য-উপাত্তে দেখা যায়, পর্যটকদের পছন্দের ১০টি বার্গার ব্র্যান্ডের মধ্যে ছয়টিই দেশীয়। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোও শুধু কোরিয়ার জন্য বিশেষ খাবার ও বিষয়ভিত্তিক অভ্যন্তরসজ্জার ব্যবস্থা করে, যা দ্রুত খাওয়ার অভিজ্ঞতাকেও সাংস্কৃতিক বিরতিতে পরিণত করে। এর একটি উদাহরণ হলো ইকসান অঞ্চলের মিষ্টি আলু দিয়ে তৈরি মোৎজারেলা বার্গার, যা ফাস্ট ফুডের স্যান্ডউইচকে একটি নির্দিষ্ট স্থানের সঙ্গে যুক্ত করে।
এতে পরিচিত খাবারের স্বস্তির সঙ্গে নতুন কিছু আবিষ্কারের অনুভূতিও মেলে। ভ্রমণকারীরা বার্গার বা লাটের মতো পরিচিত খাবারের সঙ্গে নতুন কোনো উপাদান, স্বাদ বা রীতি মিলিয়ে দেখেন। বাকিটা করে শহর নিজেই। ব্যস্ত ফুটপাত, নিয়ন আলোয় ঝলমলে দোকান আর রাত পর্যন্ত খোলা থাকার সুবাদে তৈরি হয় স্বচ্ছন্দ, নির্দিষ্ট গণ্ডিতে বাঁধা নয় এমন খাবারের পরিবেশ, যেখানে হঠাৎ করে কিছু বেছে নেওয়ার অভিজ্ঞতাও সার্থক হয়। একবার চেখে দেখলে প্রায়ই পরেরটিও খেতে ইচ্ছা করে।
ঐতিহ্য ও ফাইন ডাইনিং এখনো মূল ভিত্তি
দৈনন্দিন খাবারের জনপ্রিয়তা বাড়ছে, তবে তা পুরোনো ঐতিহ্যকে সরিয়ে দিচ্ছে না; বরং তার পাশাপাশি জায়গা করে নিচ্ছে। চালের কেক ও হাংওয়ার পুনরুজ্জীবন দেখায়, আধুনিক প্ল্যাটফর্মে ঐতিহ্য কীভাবে বিকশিত হতে পারে। কেটিওর তথ্য অনুযায়ী, ভাইরাল কনটেন্টের প্রভাবে জুলাইয়ে ঐতিহ্যবাহী মিষ্টিতে খরচ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় তীব্রভাবে বেড়েছে। কোরীয় খাবারের কেন্দ্রে এখনো রয়েছে গাঁজনের ঐতিহ্য—জাং থেকে কিমচি পর্যন্ত। সাংস্কৃতিক গুরুত্বের জন্য ইউনেসকোও এর স্বীকৃতি দিয়েছে। পর্যটকেরা এক দিনেই রাস্তার বাজার থেকে স্বাদ-পরীক্ষার নির্ধারিত মেনু পর্যন্ত খাবারের বিস্তৃত বৈচিত্র্য উপভোগ করতে পারেন।
দক্ষিণ কোরিয়ার ফাইন ডাইনিং দৃশ্যও সমৃদ্ধ হচ্ছে। মিশেলিন গাইড তাদের পরিধি বাড়িয়েছে, আর তারকাপ্রাপ্ত রেস্তোরাঁগুলোতে আধুনিক কোরীয় রান্নার পাশাপাশি দেশের ক্রমবর্ধমান বৈচিত্র্যময় রেস্তোরাঁ সংস্কৃতিও উঠে আসছে। সিউলে সমসাময়িক কোরীয় রেস্তোরাঁ মিংগলস তৃতীয় তারকা পেয়েছে। অন্যদিকে, তারকাপ্রাপ্ত একটি মেক্সিকান রেস্তোরাঁর উপস্থিতি দেখায় যে খাবারের দৃশ্য কতটা উদার ও নিরীক্ষাপ্রবণ হয়ে উঠেছে। এর সঙ্গে সুপারিশকৃত খাবারের দোকানের দীর্ঘ তালিকা যোগ হলে, ভ্রমণকারীরা সহজেই সকালের নাশতায় ক্রফল থেকে সন্ধ্যায় স্থানীয় উপকরণে তৈরি একাধিক পদের রাতের খাবারে যেতে পারেন।
কোরীয় পানীয়ের বিশ্বজয়
কোরীয় সুল, বিশেষ করে সোজু ও মাকগোল্লি, বিদেশে নতুন ভক্ত পাচ্ছে। কোরিয়ার বাইরের ক্ষুদ্র উৎপাদকেরা ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি শিখছেন এবং স্থানীয় শস্য ও পানি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন। ভ্রমণবিষয়ক লেখক ও প্রবণতা বিশ্লেষকেরা বার ও বোতলের দোকানে এসব পানীয়ের উপস্থিতি বাড়ার কথা বলছেন। কোরিয়ায় সোজু খেয়ে অনেক পর্যটক এর বৈচিত্র্যে অবাক হন—স্বচ্ছ, ঝাঁঝালো স্বাদ থেকে শুরু করে সূক্ষ্ম স্বাদের কারুশিল্পে তৈরি বোতল পর্যন্ত, যা খাবারের সঙ্গে পানীয়ের স্বাদ মেলানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া রেস্তোরাঁয় পরিবেশন করা হয়।
পর্যটকদের চাহিদার সঙ্গে নীতি ও প্রচারের সমন্বয়
সরকার ও শিল্প খাত ভ্রমণের কৌশলগত ভিত্তি হিসেবে খাবারকে দেখছে। সংস্কৃতি, ক্রীড়া ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং কেটিও ২০২৪ সালে ‘টেস্ট ইওর কোরিয়া’ প্রকল্প চালু করে। এতে আঞ্চলিক খাবারের ৩৩টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানকে মনোনীত করা হয়। তালিকায় খাবার ও উপকরণের সঙ্গে স্থানগুলোর যোগসূত্র তুলে ধরা হয়েছে—জেওনজুর বিবিমবাপ ও চুনচনের ডাকগালবি থেকে শুরু করে জেজুর সামুদ্রিক খাবার পর্যন্ত। এসব গন্তব্যের অনেকগুলোতেই খাবার চেখে দেখার সঙ্গে পরিবেশনা, ভ্রমণ এবং মৌসুমি উৎসবের আয়োজন থাকে, যাতে খাওয়া বৃহত্তর সাংস্কৃতিক ভ্রমণপথের অংশ হয়ে ওঠে। ‘১০০ ইয়ার স্টোর’ তালিকায় দীর্ঘদিন ধরে চালু থাকা বিশেষ খাবারের দোকানগুলোর দিশা মেলে—হাতে কাটা নুডলস, সয়া সসে জারিত কাঁকড়া কিংবা ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির দোকান পর্যন্ত।
ডিজিটাল সরঞ্জাম এই ঘোরাঘুরি সহজ করছে। কেটিও ও স্থানীয় অংশীদারেরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর রেস্তোরাঁর নির্দেশিকা এবং তাৎক্ষণিক অনুবাদ সেবা চালু করছে। ব্যস্ত দোকানে কিউআর মেনুতে অর্ডার দেওয়া সহজ হয়। ভার্চুয়াল ফুড ট্যুর সম্ভাব্য পর্যটকদের আগ্রহ ও আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। এই উন্নতিগুলো দৈনন্দিন খাবারের জনপ্রিয়তার সঙ্গে ভালোভাবে মানিয়ে যায়, কারণ এগুলো বাধা কমিয়ে পর্যটকদের ব্যবস্থাপনার ঝামেলার বদলে খাবার বেছে নেওয়ায় মনোযোগ দিতে সাহায্য করে।
খাবারভিত্তিক ভ্রমণের সঙ্গে সুস্থতা ও সংস্কৃতিরও যোগ রয়েছে। ২০২৫ সালের অক্টোবরের শেষ দিকে ইয়ংদক উপকূলে অনুষ্ঠেয় আন্তর্জাতিক এইচ ওয়েলনেস ফেস্টায় থাকবে ঐতিহ্যবাহী কোরীয় চিকিৎসার অধিবেশন, যোগব্যায়াম ও ধ্যান, এবং খাবারের মাধ্যমে সুস্থতা অর্জনের অঞ্চল—যেখানে দর্শনার্থীরা ভেষজ চা ও মৌসুমি খাবার চেখে দেখতে পারবেন। ইয়ংদক কাউন্টির গভর্নর কিম কোয়াংইয়ল এই আয়োজনকে ভ্রমণের ধরনে বৃহত্তর পরিবর্তনের অংশ হিসেবে তুলে ধরেছেন।
সুস্থতা এখন জীবনধারা এবং ভবিষ্যতের একটি শিল্পে পরিণত হয়েছে। এই উৎসবের লক্ষ্য কোরিয়ার নিরাময়ভিত্তিক পর্যটনশিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং ইয়ংদকের সুস্থতা ও পর্যটনশিল্পকে এগিয়ে নেওয়া।
কোরিয়ার সীমানার বাইরেও দিল্লিতে রং দে কোরিয়া উৎসবের মতো আয়োজন খাবারের স্টল, কে-পপ পরিবেশনা ও সাংস্কৃতিক কর্মশালার মাধ্যমে সিউলের রাস্তার প্রাণচাঞ্চল্য তুলে ধরে। এসব আয়োজন সম্ভাব্য পর্যটকদের উড়োজাহাজের টিকিট কাটার আগেই কোরিয়ার দৈনন্দিন জীবনের স্বাদ দেয় এবং প্রথমবার ভ্রমণে আগ্রহ জাগায়।
কে-ওয়েভের যোগসূত্র: পপ সংস্কৃতি, নুডলস ও ভাগ করে নেওয়ার মুহূর্ত
কে-পপ ও কে-ড্রামা এখনো সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ, তবে কে-ফুডও নিজস্ব জায়গায় আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। কোরিয়ার সরকারি সংস্থাগুলোর গণমাধ্যম পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, বিশ্বজুড়ে হ্যালিউ নিয়ে প্রতিবেদনের বড় অংশজুড়ে এখন খাবার—বিশেষ করে উত্তর আমেরিকায়। কিমচি, কোরীয় ফ্রাইড চিকেন ও ঝাল ইনস্ট্যান্ট রামিয়ন এখন দৈনন্দিন আলোচনার অংশ। ইনস্ট্যান্ট নুডলসের নতুন রেসিপি বা ঝাল বুলডাক রামিয়ন খাওয়ার চ্যালেঞ্জ নিয়ে ভিডিও এই উত্তেজনা আরও বাড়ায়। কখনো কখনো নিরাপত্তার বিষয়ও সামনে আসে, যেমন অতিরিক্ত ঝালের কারণে ডেনমার্কে সাময়িকভাবে একটি পণ্য প্রত্যাহার করা হয়েছিল। এতে মনে করিয়ে দেওয়া হয়, পর্যটকদের নিজেদের ঝাল সহ্য করার ক্ষমতা জানা দরকার। সামগ্রিকভাবে, কৌতূহল বাড়ছে; এর ফলে দেশে বসে এসব খাবারের অর্ডার দেওয়া হচ্ছে, আর কোরিয়ায় পৌঁছানোর পর মানুষ আরও গভীর অভিজ্ঞতা খুঁজছেন।
২০২৫ সালের প্রবণতাগুলোও একই দিক নির্দেশ করে। বিশ্বব্যাপী পূর্বাভাসে গুরুত্ব পাচ্ছে মজাদারভাবে খাওয়া, অতিরিক্ত উপকরণে সাজানো স্যান্ডউইচ, ছেঁকে পরিষ্কার করা ককটেল এবং প্রিমিয়াম টপিংস দিয়ে সাজানো ইনস্ট্যান্ট নুডলসের প্রতি স্পষ্ট আগ্রহ। কোরীয় পানীয় ছড়িয়ে পড়ছে, স্থানীয় নাশতা উপহার হিসেবে সহজে প্যাক করা যায়, আর প্রতিটি বাজারের স্টল বা কনভিনিয়েন্স স্টোরের তাকে মিলছে এমন অপ্রত্যাশিত স্বাদের সমন্বয়, যা দেখতে যেমন সুন্দর, খেতেও তেমন সুস্বাদু।
স্বল্প সময়ের ভ্রমণেও স্থানীয়দের মতো খাওয়ার পরামর্শ
কোরিয়ার দৈনন্দিন খাবারের স্বাদ নিতে এক সপ্তাহের প্রয়োজন নেই। একটু পরিকল্পনা করলে এক দিনেই অনেক কিছু ঘুরে দেখা যায়। ক্যাফেতে আমেরিকানো বা বিশেষ কোনো লাটে দিয়ে শুরু করুন। ক্রফল বা ইনজলমি পেস্ট্রি চেখে দেখুন। দুপুরের দিকে কনভিনিয়েন্স স্টোরে গিয়ে ত্রিকোণ গিমবাপ, গরম ভাতের বাটি আর দই বা ফলের জেলি দিয়ে দ্রুত একটি খাবার সেরে নিন। বিকেলবেলায় রাস্তার কোনো নাশতার জন্য জায়গা রাখুন—শীতকালে হয়তো হটটক, আর গরমে মৌসুমি স্বাদের আইসক্রিম। সন্ধ্যায় কোনো সাধারণ খাবারের দোকানে গিয়ে শূকরের হাড়ের স্যুপ বা ডাম্পলিংসহ নুডলসের সেট খান। তারপর হোটেলে ফেরার পথে কনভিনিয়েন্স স্টোর থেকে আইসক্রিম নিয়ে দিন শেষ করুন।
অভিজ্ঞতাটি নির্বিঘ্ন করতে কয়েকটি ব্যবহারিক পরামর্শ:
- সাবওয়ে ও বাসে চলাচলের জন্য টি-মানি বা ক্যাশবি কার্ডে টাকা ভরে নিন, আর দোকানের কেনাকাটার জন্য তাতে কিছু ব্যালান্স রাখুন।
- দ্রুত খাবারের দোকানে নিজে অর্ডার দেওয়ার কিয়স্ক ব্যবহার করুন। বেশির ভাগ কিয়স্কেই ভাষা বদলের সুবিধা আছে। মেনু বোর্ডের ছবি দেখে অর্ডার দেওয়া সহজ হয়।
- বর্জ্য পুনর্ব্যবহারের মৌলিক নিয়ম জেনে নিন। অনেক দোকানে কাগজের কাপ, প্লাস্টিক ও খাবারের বর্জ্য আলাদা করা হয়। বসার জায়গার কাছের নির্দেশনা মেনে চলুন।
- অনেক জায়গায় নগদবিহীন লেনদেনের ব্যবস্থা আছে। শহরগুলোতে বিদেশি ক্রেডিট কার্ড ব্যাপকভাবে গ্রহণ করা হয়।
- ঝালের মাত্রা খেয়াল করুন। প্রয়োজন হলে কম ঝালের খাবার চান এবং ইনস্ট্যান্ট নুডলসের প্যাকেটের গায়ের তথ্য দেখে নিন।
- নিরামিষ ও হালাল খাবারের ব্যবস্থা আছে, তবে সেগুলো খুঁজতে কিছুটা আগাম খোঁজ নিতে হতে পারে। বড় এলাকাগুলো এবং চেইন বেকারিগুলোতে খাবারের ধরন সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়।
মূল বিষয়গুলো
- কেটিওর তথ্য অনুযায়ী, আইসক্রিম, কনভিনিয়েন্স স্টোরের খাবার ও ক্রফলের মতো দৈনন্দিন খাবারে পর্যটকদের খরচ দ্রুত বাড়ছে।
- জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত কনভিনিয়েন্স স্টোরে বিদেশি কার্ডে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ লেনদেন হয়েছে, যা অন্যান্য কে-ফুড বিভাগের চেয়ে বেশি।
- ক্যাফে, বেকারি ও বার্গারের রেস্তোরাঁ পর্যটকদের কাছে বড় আকর্ষণ। পর্যটকদের পছন্দের শীর্ষ ১০ বার্গার ব্র্যান্ডের ছয়টিই দেশীয় চেইন।
- মধু-চালের কেকের সিরিয়াল, নতুনভাবে সাজানো ইনস্ট্যান্ট নুডলস এবং মৌসুমি নাশতার মতো খাবারের চাহিদা বাড়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম।
- ২০২৪ সালে দক্ষিণ কোরিয়া প্রায় ১ কোটি ৬৩ লাখ ৬০ হাজার পর্যটককে স্বাগত জানায়। পর্যটকদের গড় অবস্থান ছিল প্রায় ৭.৮ দিন এবং তাঁদের মোট খরচ ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি।
- খাবারের ট্যুর এখন ভ্রমণের অন্যতম প্রধান প্রেরণা। সম্ভাব্য পর্যটকদের ১৫.৭ শতাংশ খাবারকেই ভ্রমণের প্রধান কারণ হিসেবে বেছে নিয়েছেন।
- ‘টেস্ট ইওর কোরিয়া’ ও ‘১০০ ইয়ার স্টোর’-এর মতো কর্মসূচি আঞ্চলিক খাবার ও ঐতিহাসিক দোকানকে সংস্কৃতি ও উৎসবের সঙ্গে যুক্ত করে।
- কোরীয় সোজু ও মাকগোল্লির জনপ্রিয়তা বিশ্বজুড়ে বাড়ছে, অন্যদিকে মিশেলিন গাইডের আওতায় ফাইন ডাইনিংও বিস্তৃত হচ্ছে।
- ইয়ংদকের সুস্থতা উৎসব এবং বিদেশে সিউলকে কেন্দ্র করে আয়োজিত সাংস্কৃতিক মেলার মতো অনুষ্ঠান খাবার ও সংস্কৃতির টানে ভ্রমণে আগ্রহ বাড়ায়।
- বিশ্লেষকদের ধারণা, খাঁটি ও অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার মতো অভিজ্ঞতার খোঁজে পর্যটকদের আগ্রহ বাড়ায় ২০৩০ সাল পর্যন্ত কোরিয়ার খাবারকেন্দ্রিক পর্যটন বছরে ২০ শতাংশের বেশি হারে বাড়বে।






