এইমাত্র যা ঘটল
দক্ষিণ কোরিয়ার জাহাজ নির্মাতা হানওয়া ওশানের যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে চীনা কোম্পানিগুলোর ব্যবসা নিষিদ্ধ করে ওয়াশিংটনের সঙ্গে বাণিজ্যবিরোধ আরও বাড়িয়েছে চীন। এর জেরে বিশ্বজুড়ে শেয়ারবাজারে দরপতন হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ উপকরণে নতুন রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ, নতুন করে শুল্ক আরোপের হুমকি এবং উভয় পক্ষের বন্দর ফি বাড়ানোর কারণে বিনিয়োগকারীরা আগে থেকেই উদ্বিগ্ন ছিলেন। বেইজিং বিশ্ব অর্থনীতির গতি কমানোর চেষ্টা করলে তা চীনের জন্যই বুমেরাং হবে বলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সতর্ক করার পর বাজারের মনোভাব আরও দুর্বল হয়।
সূচিপত্র
বিভিন্ন অঞ্চলের বাজারেই বিক্রির চাপ ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের বাজার খোলার আগে শেয়ারসূচক ফিউচার দরপতন হয় এবং লেনদেন শুরুর পর এসঅ্যান্ডপি ৫০০ প্রায় ১ শতাংশ কমে যায়; দিনের শুরুর লেনদেনেও সূচকটি নিম্নমুখী ছিল। সকালের সর্বশেষ হিসাবে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ কমেছিল ০.৮৩ শতাংশ এবং ফিউচার কমেছিল ০.৮৭ শতাংশ। ইউরোপের স্টক্স ৬০০ কমেছিল ০.৪৯ শতাংশ, আর যুক্তরাজ্যের এফটিএসই ১০০ ছিল অপরিবর্তিত। এশিয়ার বাজারে পতন ছিল সবচেয়ে বেশি: জাপানের নিক্কেই ২২৫ কমেছিল ২.৫৮ শতাংশ, চীনের সিএসআই ৩০০ কমেছিল ১.২ শতাংশ, দক্ষিণ কোরিয়ার কসপি কমেছিল ০.৬৩ শতাংশ এবং ভারতের নিফটি ৫০ কমেছিল ০.৪২ শতাংশ। বিটকয়েনের দরও কমে প্রায় ১ লাখ ১১ হাজার ৮০০ ডলারে নেমে আসে।
আগের দিনের ঊর্ধ্বগতির পর এই দরপতন ছিল বড় ধরনের উল্টো মোড়। এর আগে এপেক সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠকের সম্ভাবনা বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি নেওয়ার আগ্রহ বাড়িয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হানওয়ার ইউনিটগুলোর ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা দ্রুত মনোযোগ ফিরিয়ে এনেছে সরবরাহ শৃঙ্খল, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম এবং স্থিতিশীল আন্তসীমান্ত সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল সামুদ্রিক বাণিজ্যপথের দিকে।
জাহাজ চলাচলবিষয়ক নিষেধাজ্ঞা কেন গুরুত্বপূর্ণ
হানওয়া ওশান বাণিজ্যিক জাহাজ ও নৌবাহিনীর জাহাজ নির্মাণে বড় প্রতিষ্ঠান। জাহাজ মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ ও যন্ত্রাংশ সরবরাহে সহায়তাকারী সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রেও তাদের কার্যক্রম রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চীনা কোম্পানির লেনদেন নিষিদ্ধ করে বেইজিং এমন চীনা যন্ত্রাংশ, সেবা ও অর্থায়নে প্রবেশাধিকার সীমিত করছে, যা ইস্পাত প্রস্তুতকারক ও ইঞ্জিন নির্মাতা থেকে শুরু করে ইলেকট্রনিকস সরবরাহকারী এবং বন্দর পরিচালনাকারী পর্যন্ত বৈশ্বিক জাহাজ নির্মাণ নেটওয়ার্কের সঙ্গে প্রায়ই যুক্ত। পরোক্ষ বিধিনিষেধও মেরামত ও সংস্কারের চুক্তিতে প্রভাব ফেলতে পারে, প্রকল্পের সময়সীমা পিছিয়ে দিতে পারে এবং বিকল্প সরবরাহকারী খুঁজতে বাধ্য হওয়া ক্রেতাদের খরচ বাড়াতে পারে।
বিশ্ববাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে জাহাজ চলাচল। বন্দরে জাহাজের আগমন, নথিপত্র বা অর্থ পরিশোধে বাধা সৃষ্টি করে—এমন যেকোনো পদক্ষেপ পণ্য পরিবহন ধীর করতে পারে। সর্বশেষ পদক্ষেপটি এমন এক ধারাবাহিকতার পর এসেছে, যেখানে দুই পক্ষই অপর দেশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন বা পরিচালিত জাহাজের ওপর নতুন বন্দর ফি আরোপ করেছে। পূর্ব এশিয়া ও ইউরোপের বাণিজ্যনির্ভর কেন্দ্রগুলো সামান্য বিঘ্নের প্রতিও সংবেদনশীল। তাই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে—এমন পরিচিত একটি জাহাজ নির্মাতাকে লক্ষ্য করে দেওয়া নিষেধাজ্ঞার প্রভাব একটি প্রতিষ্ঠানের গণ্ডি ছাড়িয়ে যায়।
বিরল মৃত্তিকা ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ: আরেকটি লড়াইয়ের ক্ষেত্র
বিরল মৃত্তিকা মৌল এবং সংশ্লিষ্ট চুম্বকের ওপর বেইজিংয়ের সর্বশেষ রপ্তানি বিধিনিষেধ উড়োজাহাজ ও প্রতিরক্ষা শিল্প, গাড়ি নির্মাণ এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতের উৎপাদকদের জন্য ঝুঁকি বাড়িয়েছে। এগুলো সর্বাত্মক নিষেধাজ্ঞা নয়; তবে বিশেষ লাইসেন্সের প্রয়োজন হয় এবং বিধি কার্যকর করার সময়ে চালান বন্ধ থাকতে পারে। বিশ্লেষকদের ধারণা, লাইসেন্স দেওয়ার প্রক্রিয়ায় মাঝারি ও ভারী বিরল মৃত্তিকার চালানে বিলম্ব হবে, কারণ এগুলোর বিকল্প খুঁজে পাওয়া সবচেয়ে কঠিন। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র বিশেষভাবে ঝুঁকিতে রয়েছে। নির্ভুল দিকনির্দেশনা ব্যবস্থা, জেট বিমানের অ্যাকচুয়েটর, সাবমেরিনের সোনার এবং উন্নত রাডারে ব্যবহৃত ভারী বিরল মৃত্তিকা প্রক্রিয়াজাতকরণে চীনের আধিপত্য রয়েছে। এসব উপকরণের ওপর নির্ভরশীল চুম্বক বায়ু টারবাইন ও বৈদ্যুতিক গাড়ির জন্যও অত্যাবশ্যক।
এই উপকরণগুলোর বিকল্প পাওয়া কঠিন কেন
বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উপকরণের বৈশ্বিক সরবরাহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে চীনের বড় অংশ রয়েছে। গ্রাফাইট ও অ্যান্টিমনির উৎপাদনে দেশটির অংশ উল্লেখযোগ্য; আর গ্যালিয়াম ও ভারী বিরল মৃত্তিকা পরিশোধন সক্ষমতার অধিকাংশই চীনের হাতে। লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির অ্যানোড তৈরিতে গ্রাফাইট অপরিহার্য, অগ্নিনিরোধক উপকরণ ও গোলাবারুদে অ্যান্টিমনি ব্যবহৃত হয়, আর চিপ, সেন্সর ও উন্নত অপটিকসে লাগে গ্যালিয়াম ও জার্মেনিয়াম। যুক্তরাষ্ট্র আফ্রিকা, আমেরিকা মহাদেশ ও অস্ট্রেলিয়ার সরবরাহকারীদের দিকে ঝুঁকে উৎস বৈচিত্র্যময় করতে পারে। দেশে খনি থেকে চুম্বক উৎপাদন পর্যন্ত সক্ষমতা গড়তে প্রতিরক্ষা দপ্তরও শত শত মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। এসব প্রকল্প এগোচ্ছে, তবে বিশেষ করে ভারী বিরল মৃত্তিকা পৃথকীকরণ ও চুম্বক তৈরির ক্ষেত্রে সেগুলো এখনো চীনের বর্তমান সক্ষমতার সামান্য অংশমাত্র।
অতীতের ঘটনাগুলো দেখিয়েছে, লাইসেন্স ব্যবস্থা কত দ্রুত বাণিজ্য ধীর করতে পারে। সরকারগুলো রপ্তানি যাচাই করার উদ্দেশ্যেই বিধি চালু করলেও কাগজপত্রের জট তৈরি হতে পারে, জাহাজ চলাচলের তারিখ পিছিয়ে যায় এবং ক্রেতারা বিকল্প উৎসের জন্য তৎপর হয়ে ওঠেন। মজুত কম থাকলে দাম বেড়ে যেতে পারে। এ কারণেই এসব উপকরণের ওপর নির্ভরশীল পণ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো লাইসেন্স কত দ্রুত দেওয়া হচ্ছে এবং শেষ ব্যবহারসংক্রান্ত কী নিয়ম প্রযোজ্য হচ্ছে, তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
শুল্ক বৃদ্ধি ও পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ
জাহাজ চলাচলবিষয়ক নিষেধাজ্ঞা আরও বিস্তৃত শুল্ক ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রণবিষয়ক বিরোধের মধ্যে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র চীনা আমদানির ওপর ব্যাপক শুল্কের পাশাপাশি তিন অঙ্কের শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছে। জবাবে বেইজিং যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর বড় অঙ্কের অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করেছে, বিরল মৃত্তিকা রপ্তানিতে নিয়ন্ত্রণ জোরদার করেছে এবং লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত কোম্পানিগুলোর সঙ্গে ব্যবসা সীমিত করতে ‘অবিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান’ তালিকা সম্প্রসারণ করেছে। ইউরোপীয় কর্মকর্তারা এই বিরোধের ভাষা ও সুরের সমালোচনা করেছেন এবং অন্য বাজার থেকে সরিয়ে দেওয়া পণ্য তাদের বাজারে ঢুকে পড়লে নিজেদের শিল্প সুরক্ষায় পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি রেখেছেন।
এই পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপের আগে চলতি বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বাণিজ্য আদালত হোয়াইট হাউসের শুল্ক কর্মসূচির কিছু অংশ বাতিল করে বলেছিলেন, সেগুলো প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার সীমা ছাড়িয়েছে। এতে মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে, আইনি তদারকি নতুন শুল্ক আরোপের সময় ও পরিধিকে প্রভাবিত করতে পারে। কাগজে শুল্ক পরিবর্তন হলেও বাণিজ্যের গন্তব্য দ্রুত বদলে যেতে পারে। অর্থনীতিবিদেরা বৈশ্বিক বাণিজ্য অন্যদিকে সরে যাওয়ার বিষয়ে সতর্ক করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রে আগের পরিমাণে আর প্রবেশ করতে না পারা পণ্য অন্য গন্তব্য খুঁজবে, যা তৃতীয় দেশগুলোর সক্ষমতা ও রাজনৈতিক সহনশীলতার পরীক্ষা নেবে।
কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকেরা যা বলছেন
বেসেন্টের যুক্তি, প্রতিদ্বন্দ্বীদের ওপর চাপ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে চীন বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি দমনের চেষ্টা করলে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ সরবরাহকারী দেশ হিসেবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বে। তিনি বিরল মৃত্তিকার ওপর নিয়ন্ত্রণকে শক্তির নয়, বরং দুর্বলতার সংকেত হিসেবেও তুলে ধরেন।






