২০২৫ সালে রাশিয়ান ন্যাফথার বৃহত্তম আমদানিকারক তাইওয়ান

পড়তে 11 মিনিট
২০২৫ সালে রাশিয়ান ন্যাফথার বৃহত্তম আমদানিকারক তাইওয়ান

তাইওয়ানের বিপুল কেনাকাটা কেন গুরুত্বপূর্ণ

২০২৫ সালের প্রথমার্ধে রাশিয়ান ন্যাফথার বিশ্বের বৃহত্তম ক্রেতা হয়ে উঠেছে তাইওয়ান। ইউক্রেনকে সমর্থন করা এবং মস্কোর ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করা একটি গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে এটি এক বিস্ময়কর পরিবর্তন। সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ার এবং সহযোগী সংস্থাগুলোর যৌথ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে তাইওয়ান রাশিয়া থেকে প্রায় ১.৩ বিলিয়ন ডলারের ন্যাফথা কিনেছে। মাসিক গড় কেনাকাটা ২০২২ সালের মাসিক গড়ের প্রায় ছয় গুণ। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত তাইওয়ান রাশিয়া থেকে ৬৮ লাখ টন ন্যাফথা আমদানি করেছে, যার মূল্য প্রায় ৪.৯ বিলিয়ন ডলার। ওই সময়ে রাশিয়ার মোট ন্যাফথা রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশ এটি।

সূচিপত্র
  1. তাইওয়ানের বিপুল কেনাকাটা কেন গুরুত্বপূর্ণ
  2. ন্যাফথা কী এবং চিপশিল্প এর ওপর কীভাবে নির্ভরশীল
  3. নিষেধাজ্ঞার বিধি, মূল্যসীমা ও কথিত লঙ্ঘন
  4. তাইওয়ানের জ্বালানি নীতিতে দুই ধারা
  5. আলোচনার কেন্দ্রে ফরমোসা পেট্রোকেমিক্যাল
  6. আঞ্চলিক বাজার দ্রুত বদলে গেছে
  7. নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক ঝুঁকি
  8. নীতি কীভাবে বদলাতে পারে
  9. যা জানা দরকার

এই পরিসংখ্যান তাইপের রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর তাইওয়ান নিষেধাজ্ঞায় যোগ দেয় এবং ইউক্রেনকে দ্বিপক্ষীয় সহায়তা হিসেবে ৫০ মিলিয়ন ডলার দিয়েছে। তবু ২০২২ সাল থেকে রাশিয়ার জ্বালানির জন্য তাইওয়ান ১১.২ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থও দিয়েছে। প্রতিবেদনের হিসাব অনুযায়ী, এসব কেনাকাটা থেকে রাশিয়া খনিজ উত্তোলন কর হিসেবে প্রায় ১.৭ বিলিয়ন ডলার পেয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই অর্থ দিয়ে ইউক্রেনে হামলায় ব্যবহৃত সর্বোচ্চ ১ লাখ ৭০ হাজার গেরবেরা ড্রোন তৈরি করা সম্ভব।

আধুনিক উৎপাদনশিল্পের কেন্দ্রে রয়েছে ন্যাফথা। এটি পেট্রোকেমিক্যাল কারখানার একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল, যা থেকে প্লাস্টিক, দ্রাবক ও ইলেকট্রনিকসে ব্যবহৃত উন্নত উপকরণের মৌলিক উপাদান তৈরি হয়। আমদানি করা জ্বালানির ওপর তাইওয়ান ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল; দেশের প্রয়োজনের প্রায় ৯৭ শতাংশই বিদেশ থেকে আসে। এশিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে মুনাফার হার কম থাকায় সস্তা ন্যাফথা তাইওয়ানের পেট্রোকেমিক্যাল খাতের ওপর চাপ কমানোর উপায় হয়ে উঠেছে।

বাণিজ্যের এই উল্লম্ফনে তাইওয়ানের রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি খাতের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্যও দেখা যায়। তাইপাওয়ার ও চায়না পেট্রোলিয়াম করপোরেশনসহ রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল ও হালকা তেলজাত পণ্য কেনা বন্ধ করে। এই প্রক্রিয়া ২০২৩ সালের মধ্যে শুরু হয়ে ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সম্পন্ন হয়। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো উল্টো পথে এগিয়েছে। এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ ন্যাফথা ক্রেতা ফরমোসা পেট্রোকেমিক্যাল যুদ্ধের আগে রাশিয়ার সরবরাহের অংশীদারত্ব প্রায় ৯ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে প্রতিবেদনে উল্লেখিত ৯০ শতাংশে নিয়ে যায়। কোম্পানির ভাষ্য, তাদের অভ্যন্তরীণ তথ্য অনুযায়ী এই হার ৮৫ শতাংশের কাছাকাছি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গবেষণার সময়ে তাইওয়ানে আসা রাশিয়ার ন্যাফথার প্রায় ৭২ শতাংশের উৎস ছিল রুশ উৎপাদক নোভাটেক, যার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

ন্যাফথা কী এবং চিপশিল্প এর ওপর কীভাবে নির্ভরশীল

ন্যাফথা হলো অপরিশোধিত তেল পাতন করে পাওয়া তরল হাইড্রোকার্বনের মিশ্রণ। পেট্রোকেমিক্যাল কারখানায় বাষ্পীয় ক্র্যাকার দিয়ে এটি প্রক্রিয়াজাত করে ইথিলিন ও প্রোপিলিনের মতো ওলেফিন এবং বেনজিন ও প্যারাক্সিলিনের মতো অ্যারোমেটিক যৌগ তৈরি করা হয়। এসব যৌগ থেকে রেজিন, ফিল্ম, দ্রাবক ও বিশেষায়িত রাসায়নিক তৈরি হয়, যা স্মার্টফোনের কাঠামো ও ডেটা সেন্টারের যন্ত্রাংশ থেকে শুরু করে সেমিকন্ডাক্টর কারখানায় ব্যবহৃত ফটোরেজিস্ট ও প্যাকেজিং উপকরণ পর্যন্ত নানা ক্ষেত্রে লাগে। সংক্ষেপে, চিপশিল্পের অর্থনীতি নানা ধরনের রাসায়নিক উপকরণের ওপর নির্ভরশীল, আর এসব উপকরণের অনেকগুলো তৈরির প্রধান কাঁচামাল ন্যাফথা।

যুক্তরাষ্ট্রের মতো কিছু পেট্রোকেমিক্যাল কেন্দ্র প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে পাওয়া ইথেন দিয়ে ক্র্যাকার চালায়। তাইওয়ানের বৃহত্তম কারখানাগুলো মূলত ন্যাফথা ব্যবহারের উপযোগী করে তৈরি। ক্র্যাকারকে অন্য কাঁচামাল ব্যবহারের উপযোগী করতে নতুন করে সাজাতে কয়েক বছর এবং বিপুল পুঁজি লাগে। তাইওয়ানের ক্রেতারা সরবরাহ নিশ্চিত করতে মেয়াদি চুক্তি ও তাৎক্ষণিক বাজারের চালান ব্যবহার করে। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ছাড়ে রাশিয়ার তেল কেনার সিদ্ধান্ত এশিয়ায় ওলেফিনের বৈশ্বিক মুনাফার হার তীব্রভাবে কমে যাওয়ার সময় ব্যয়চাপ কমিয়েছিল।

শিল্পখাতের তথ্য দেখায়, প্রচলিত বাজারগুলো মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার পর এশিয়ার বিভিন্ন ক্রেতা এই ছাড়ে আকৃষ্ট হয়। আগ্রাসনের পর ইউরোপ ও দক্ষিণ কোরিয়ার রাশিয়ান ন্যাফথার চাহিদা কমে গেলে রাশিয়া অনুকূল দামে তাইওয়ান, চীন ও ভারতে চালান পাঠায়। কাগজে-কলমে এটিকে বাজারের সরবরাহ অন্য পথে চালিত হওয়ার সাধারণ ঘটনা বলে মনে হতে পারে। বাস্তবে এর সঙ্গে নিষেধাজ্ঞার বিধি ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার জড়িয়ে আছে।

বিজ্ঞাপন

নিষেধাজ্ঞার বিধি, মূল্যসীমা ও কথিত লঙ্ঘন

মস্কোর আয় সীমিত রেখে বৈশ্বিক সরবরাহ সচল রাখতে জি৭ ও ইউরোপীয় অংশীদাররা রাশিয়ার তেল ও পরিশোধিত পণ্যের জন্য মূল্যসীমা ব্যবস্থা তৈরি করে। এই ব্যবস্থায় জোটভুক্ত দেশগুলোর জাহাজ চলাচল, বিমা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সেবা ব্যবহার করা যায়, তবে শর্ত হলো অপরিশোধিত তেল ও পণ্য নির্ধারিত সীমার সমান বা তার কম দামে কিনতে হবে। ন্যাফথার মতো কম মূল্যের পরিশোধিত পণ্যের সীমা ব্যারেলপ্রতি ৪৫ ডলার। ডিজেল বা পেট্রলের মতো বেশি মূল্যের পণ্যের সীমা ১০০ ডলার। সাধারণত ব্যবসায়ী ও পরিবহনকারীদের প্রত্যয়নের ওপর নির্ভর করে বিধি মানা হচ্ছে কি না, যেখানে তারা জানায় যে চালান মূল্যসীমার মধ্যে কেনা হয়েছে।

তাইওয়ানের কেনাকাটা নিয়ে প্রতিবেদনে দুর্বল প্রয়োগের ইঙ্গিত দেয় এমন একটি ধারার অভিযোগ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, তাইওয়ানগামী রাশিয়ার ন্যাফথার চালানের প্রায় ৮৮ শতাংশ এমন জাহাজে পরিবহন করা হয়েছে, যেগুলোর মালিকানা বা বিমা মূল্যসীমা জোটের আওতাভুক্ত এলাকায়। অথচ বাণিজ্যসংক্রান্ত তথ্য থেকে বোঝা যায়, কার্যকর দাম ব্যারেলপ্রতি ৪৫ ডলারের বেশি ছিল। গবেষণায় অন্য পরিশোধিত পণ্যের ক্ষেত্রেও কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বরের একটি চালান রয়েছে, যেখানে একটি ট্যাংকার ৪৩.৮ মিলিয়ন ডলার মূল্যের ডিজেল ভাদিনার শোধনাগার থেকে খালাস করে। বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের ঘটনা নিষেধাজ্ঞার বিধির ভাষা এবং বাজারের বাস্তবতার মধ্যে ফাঁক তুলে ধরে।

তাইওয়ানের এনভায়রনমেন্টাল রাইটস ফাউন্ডেশনের পরিচালক এবং গবেষণার সহলেখক সিন শুয়ান সান সতর্ক করে বলেন, সস্তা কাঁচামালের অর্থনৈতিক যুক্তির সঙ্গে দ্বীপটির নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক স্বার্থের সংঘাত রয়েছে।

তাইওয়ানের ক্রেমলিনের যুদ্ধযন্ত্রে অর্থ জোগানো উচিত নয়।

মূল্যসীমা কার্যকর রাখতে প্রত্যয়ন, পরিবহনব্যবস্থা ও বিমা চুক্তির জটিল এক নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভর করতে হয়। এই শৃঙ্খলের যেকোনো অংশে সমস্যা হলে প্রতিরোধমূলক প্রভাব দুর্বল হয়ে পড়ে। বিধি লঙ্ঘন ইচ্ছাকৃত হতে পারে, আবার নথিপত্রের দুর্বলতার কারণেও ঘটতে পারে। যে কারণেই হোক, ব্যবস্থাটির বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং জোটভুক্ত এলাকায় কার্যক্রম চালানো কোম্পানিগুলো আরও বেশি আইনি ও সুনামগত ঝুঁকিতে পড়ে।

বিজ্ঞাপন

তাইওয়ানের জ্বালানি নীতিতে দুই ধারা

২০২২ সালের পর সরকার-নিয়ন্ত্রিত কোম্পানিগুলো রাশিয়ার জ্বালানি থেকে সরে আসে। সাধারণভাবে সিপিসি নামে পরিচিত চায়না পেট্রোলিয়াম করপোরেশন এবং অন্যান্য রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ২০২৩ সালের মধ্যে রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল ও ন্যাফথা কেনা বন্ধ করে; এই প্রক্রিয়া ২০২৪ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত চলে। তাইপে রাশিয়ার জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানি নিষিদ্ধ না করায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্পষ্ট কোনো আমদানি নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়নি। ফলে দুটি ধারা তৈরি হয়: একদিকে সরকারি নীতি ও কূটনীতি, অন্যদিকে বেসরকারি ক্রেতাদের বাজার আচরণ।

তাইওয়ানের অর্থনৈতিক বিষয়ক মন্ত্রণালয় বলেছে, সংবেদনশীল পণ্যের রাশিয়ামুখী রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ তারা কঠোর করেছে এবং দেশীয় কোম্পানিগুলোর সঙ্গে বিধি মানা ও ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা করছে। নিষেধাজ্ঞার পরিবর্তিত পরিস্থিতির আলোকে নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা পুনর্বিবেচনার কথাও জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।

আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আরও বিস্তৃত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা আরও পর্যালোচনা করবে এবং বিধি মেনে চলার বিষয়ে দেশীয় কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আলোচনা করবে। পাশাপাশি আগ্রাসনের বিরোধিতা এবং আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার দৃঢ় সংকল্প তুলে ধরতে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাবে।
বিজ্ঞাপন

আলোচনার কেন্দ্রে ফরমোসা পেট্রোকেমিক্যাল

এই ঘটনার সঙ্গে ফরমোসা পেট্রোকেমিক্যালের মতো আর কোনো কোম্পানি এতটা ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত নয়। এটি এশিয়ার বৃহত্তম একক ন্যাফথা ক্রেতা এবং তাইওয়ানের পশ্চিম উপকূলের মেইলিয়াওতে বিস্তৃত একটি শিল্প কমপ্লেক্স পরিচালনা করে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগ্রাসনের আগে রাশিয়ার চালানের ওপর ফরমোসার নির্ভরতা প্রায় ৯ শতাংশ ছিল, যা ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে বেড়ে ৯০ শতাংশে দাঁড়ায়। প্রতিবেদনে হিসাব করা হয়েছে, ওই সময়ে তাইওয়ানের ন্যাফথা আমদানির প্রায় ৯৬ শতাংশের জন্য শুধু মেইলিয়াও কমপ্লেক্সই দায়ী ছিল। কোম্পানির প্রতিনিধিরা কয়েকটি পরিসংখ্যান নিয়ে দ্বিমত পোষণ করে বলেছেন, ২০২৫ সালে এ পর্যন্ত তাদের কেনা ন্যাফথার প্রায় ৮৫ শতাংশ ছিল রাশিয়ার এবং এই অংশ বাজার পরিস্থিতির প্রতিফলন, নীতিগত সিদ্ধান্তের নয়।

ফরমোসার ভাষ্য, তারা উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে কেনাকাটা করে এবং সব বিক্রেতাকে নিষেধাজ্ঞার বিধি ও মূল্যসীমা মেনে চলার শর্ত দেয়। ভবিষ্যতে কোনো নিষেধাজ্ঞা জারি হলে তা মেনে চলবে বলেও জানিয়েছে কোম্পানিটি। ব্যবসায়িক ঝুঁকি কমাতে রাশিয়া থেকে কেনাকাটা কমানোর বিষয়টিও তারা বিবেচনা করছে।

আন্তর্জাতিক বিধি আরও কঠোর হলে বা আমাদের সরকার নতুন নিষেধাজ্ঞা জারি করলে কোম্পানি অবিলম্বে তা মেনে চলবে এবং সব প্রাসঙ্গিক পদক্ষেপকে পূর্ণ সমর্থন দেবে।

শিল্পখাতের বাজার পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, ইতিমধ্যে কিছু পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। অক্টোবরের সরবরাহের জন্য বাজারের তথ্য থেকে বোঝা যায়, প্রস্তাব সীমিত থাকায় ফরমোসা রাশিয়ার ন্যাফথা নেয়নি। বাজারে পুনর্বিক্রয়ের সুযোগ বদলালে বা বিক্রেতারা চুক্তির সীমায় পৌঁছালে ছাড়ে পণ্য পাওয়ার সুযোগ দ্রুত বন্ধ হয়ে যেতে পারে, যা স্বল্পমেয়াদি চালানপ্রবাহেও প্রভাব ফেলে।

বিজ্ঞাপন

আঞ্চলিক বাজার দ্রুত বদলে গেছে

আগ্রাসনের আগে রাশিয়ার ন্যাফথার সবচেয়ে বড় গন্তব্যগুলোর মধ্যে ছিল দক্ষিণ কোরিয়ার ক্রেতারা এবং ইউরোপের আমস্টারডাম, রটারডাম ও অ্যান্টওয়ার্প অঞ্চল। নিষেধাজ্ঞা এবং কোম্পানিগুলোর ঝুঁকি নীতি কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই বাণিজ্য কমে যায়। এরপর রাশিয়া তার বিক্রির মানচিত্র নতুন করে সাজায়। ২০২৫ সালে দেশটি দৈনিক প্রায় ৩ লাখ ৯৭ হাজার ব্যারেল ন্যাফথা রপ্তানি করে, যার মধ্যে দৈনিক প্রায় ৭৪ হাজার ব্যারেল যায় তাইওয়ানে, মূলত মেইলিয়াও কমপ্লেক্সের জন্য। চীন ও ভারতও আগের তুলনায় বেশি অংশ নেয়; ইউরোপ ও দক্ষিণ কোরিয়া যে ব্যারেল আর কিনতে চায়নি, সেগুলো তারা গ্রহণ করে।

দক্ষিণ কোরিয়ার শোধনাগার ও পেট্রোকেমিক্যাল কোম্পানিগুলো ২০২২ সালের জুলাইয়ের মধ্যে রাশিয়ার ন্যাফথা কেনা পুরোপুরি বন্ধ করে এবং সরবরাহের উৎসে বৈচিত্র্য আনে। দেশটির কর্মকর্তারা স্বীকার করেন, রাশিয়ার চালানগুলোতে বড় ছাড় থাকায় এই পরিবর্তনে ব্যয়ের হিসাব ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তবে তাদের বক্তব্য, আইনি ও সুনামগত ঝুঁকি সাশ্রয়ের চেয়ে বেশি ছিল। তাইওয়ানের ওপরও এই হিসাবের চাপ বাড়ছে, যেখানে সস্তা কাঁচামালের অর্থনৈতিক সুবিধা স্পষ্ট হলেও কূটনৈতিক ও বিধি মানার ঝুঁকি বাড়ছে।

জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের হিসাব, ২০২৫ সালে এ পর্যন্ত তাইওয়ানে রাশিয়ার ন্যাফথা আমদানি দৈনিক গড়ে প্রায় ৭৫ হাজার ব্যারেল হয়েছে, যা ২০২৪ সালে ছিল দৈনিক প্রায় ৭১ হাজার ব্যারেল। শুধু ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে রাশিয়া থেকে তাইওয়ানের ন্যাফথা আমদানি ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৪৪ শতাংশ বেড়েছে। কয়লার চিত্র ভিন্ন। ২০২৫ সালের শুরুর দিকে আগের বছরের তুলনায় রাশিয়া থেকে কয়লা কেনা প্রায় ৬৭ শতাংশ কমিয়েছে তাইওয়ান। এতে বোঝা যায়, জ্বালানি বাণিজ্যের কিছু অংশ ইতিমধ্যেই রাশিয়ার উৎস থেকে সরে যাচ্ছে।

নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক ঝুঁকি

কৌশলগত প্রেক্ষাপট উপেক্ষা করা কঠিন। চীন তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে এবং দ্বীপটির ওপর সামরিক চাপ সৃষ্টি করে। মস্কো ও বেইজিংয়ের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। বিশ্লেষকেরা উদ্বিগ্ন, রাশিয়ার জ্বালানির ওপর নির্ভরতা সংকটের সময় চীনের নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠ এক অংশীদারকে চাপ সৃষ্টির সুযোগ করে দিতে পারে। জ্বালানির ক্ষেত্রে তাইওয়ানের নির্ভরশীলতা এই ঝুঁকি আরও বাড়ায়। রাজনৈতিক কারণে রাশিয়া থেকে সরবরাহ ব্যাহত হলে পেট্রোকেমিক্যাল ও ইলেকট্রনিকস খাত তাৎক্ষণিক চাপে পড়বে।

এ ছাড়া সুনাম ও মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক সামলানোর বিষয়ও রয়েছে। রাশিয়ার জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোরভাবে কার্যকর করতে গণতান্ত্রিক অংশীদাররা চাপ দিচ্ছে। বেসরকারি সংস্থাগুলো সতর্ক করেছে, রাশিয়ার তেলের ওপর নির্ভরতা বাড়লে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও অন্যান্য মিত্রের কাছে তাইওয়ানের অবস্থান দুর্বল হবে। এমন সময়ে এটি ঘটছে, যখন তাইপে নিরাপত্তা ও বাণিজ্য সহযোগিতা আরও ঘনিষ্ঠ করতে চাইছে।

ডেমোক্রেটিক প্রগ্রেসিভ পার্টির আইনপ্রণেতা পুমা শেনের মতে, সংকটের সময় সহযোগী অংশীদারদের সমর্থন পেতে চাইলে তাইওয়ানের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোকে তার পররাষ্ট্রনীতির অঙ্গীকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।

তাইওয়ানের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে আমাদের গণতান্ত্রিক অংশীদারদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে, নইলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমাদের সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

সরবরাহের ঝুঁকি কেবল তাত্ত্বিক নয়। এশিয়া ও ইউরোপের অন্য দেশগুলোর বিরুদ্ধে চীন অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করেছে। বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়া রাশিয়া যদি চাপের মুখে বা কৌশলগত কারণে চালান কমিয়ে দেয়, তাহলে আরও সংকুচিত তাৎক্ষণিক বাজারে কাঁচামালের চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাবে তাইওয়ান। এমন ধাক্কায় প্লাস্টিক রেজিন ও অন্যান্য রাসায়নিক উপকরণের দাম বাড়তে পারে। এগুলো দ্বীপটির রপ্তানিমুখী শিল্পে ব্যবহৃত হয়, যার মধ্যে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের উপকরণও রয়েছে।

নীতি কীভাবে বদলাতে পারে

জনমত ও রাজনৈতিক মহলের যাচাই-বাছাই ইতিমধ্যেই তাইপেকে নতুন ইঙ্গিত দিতে প্ররোচিত করেছে। অর্থনীতিমন্ত্রী কুং মিং-সিন এ মাসে বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন অনুরোধ করলে বেসরকারি শোধনাগারগুলো রাশিয়ার ন্যাফথা কেনা বন্ধ করতে প্রস্তুত। তিনি আরও বলেন, সরকার ব্রাসেলস ও শিল্পখাতের সঙ্গে আলোচনা করেছে এবং ইইউ ও জি৭-এর নীতিমালা মেনে চলবে। এই অবস্থান থেকে বোঝা যায়, আগামী বছর আনুষ্ঠানিক বিধিনিষেধ এলে বেসরকারি কোম্পানিগুলো দ্রুত দিক বদলাতে পারে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও অর্থনৈতিক বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য, সংবেদনশীল উচ্চপ্রযুক্তির পণ্যের রাশিয়ামুখী রপ্তানির ওপর তাইওয়ান নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়েছে এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো আর রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল বা হালকা তেলজাত পণ্য আমদানি করে না। নিয়ন্ত্রকেরা হালকা তেলের আমদানিতে নিয়ন্ত্রণ না থাকার বিষয়টি পর্যালোচনা করছেন এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিধি মানা নিয়ে আলোচনা করছেন। বাণিজ্যসংক্রান্ত তথ্যেও কৌশলগত সমন্বয়ের ইঙ্গিত আছে। যেমন, প্রস্তাব সীমিত থাকায় অক্টোবরের সরবরাহের জন্য রাশিয়া থেকে কেনাকাটা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।

কোম্পানিগুলো সরবরাহের নিরাপত্তার সঙ্গে সুনাম ও আইনি ঝুঁকির ভারসাম্য করছে। ফরমোসা জানিয়েছে, নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা এলে তারা তা সমর্থন করবে এবং ব্যবসায়িক ঝুঁকি কমাতে রাশিয়ার অংশীদারত্ব কমানোর কথা বিবেচনা করছে। শিল্পখাতের সংগঠনগুলোর মতে, গ্রহণযোগ্য দামে মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে সমপরিমাণ সরবরাহ পাওয়াই হবে মূল চ্যালেঞ্জ। যেকোনো পরিবর্তন পেট্রোকেমিক্যালের মুনাফার কাঠামোয় প্রভাব ফেলবে এবং প্যাকেজিং, গাড়ির যন্ত্রাংশ ও ইলেকট্রনিকসের পরবর্তী ধাপের উৎপাদন খরচ বাড়াতে পারে।

যা জানা দরকার

  • ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে তাইওয়ান প্রায় ১.৩ বিলিয়ন ডলারের রাশিয়ান ন্যাফথা কিনেছে, ফলে দেশটি বিশ্বে বৃহত্তম ক্রেতা হয়েছে।
  • ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত তাইওয়ান ৬৮ লাখ টন ন্যাফথা আমদানি করেছে, যার মূল্য প্রায় ৪.৯ বিলিয়ন ডলার; এটি রাশিয়ার ন্যাফথা রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশ।
  • রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল ও হালকা তেল কেনা বন্ধ করলেও ফরমোসা পেট্রোকেমিক্যালের নেতৃত্বে বেসরকারি ক্রেতারা কেনাকাটা ব্যাপকভাবে বাড়িয়েছে।
  • প্রতিবেদনের হিসাব অনুযায়ী, তাইওয়ানের জ্বালানি কেনাকাটা থেকে রাশিয়া প্রায় ১.৭ বিলিয়ন ডলার উত্তোলন কর পেয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই অর্থ দিয়ে ১ লাখ ৭০ হাজার গেরবেরা ড্রোন তৈরি করা সম্ভব।
  • তাইওয়ানে রাশিয়ার ন্যাফথা চালানের প্রায় ৭২ শতাংশ এসেছে নোভাটেক থেকে, যার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
  • গবেষণায় অভিযোগ করা হয়েছে, চালানগুলোর ৮৮ শতাংশে মূল্যসীমা জোটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পরিবহন বা বিমা ব্যবহার করা হয়েছে, যদিও ন্যাফথার ব্যারেলপ্রতি ৪৫ ডলারের সীমা ছাড়িয়ে দাম দেওয়া হয়েছিল।
  • ফরমোসার ভাষ্য, ২০২৫ সালে এ পর্যন্ত তাদের ন্যাফথা আমদানির প্রায় ৮৫ শতাংশ ছিল রাশিয়ার এবং নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা এলে তা মেনে চলবে তারা।
  • তাইওয়ানের অর্থনীতিমন্ত্রীর ভাষ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন অনুরোধ করলে বেসরকারি শোধনাগারগুলো রাশিয়ার ন্যাফথা কেনা বন্ধ করতে প্রস্তুত।
  • দক্ষিণ কোরিয়া ২০২২ সালে রাশিয়ার ন্যাফথা কেনা বন্ধ করে এবং নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি এড়াতে বেশি খরচ মেনে নিয়ে বিকল্প উৎস থেকে সরবরাহ নিশ্চিত করে।
  • কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে তাইওয়ান রাশিয়া থেকে দৈনিক গড়ে প্রায় ৭৫ হাজার ব্যারেল ন্যাফথা আমদানি করেছে, যা ২০২৪ সালে ছিল দৈনিক প্রায় ৭১ হাজার ব্যারেল।
এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন

আপনার পছন্দ হতে পারে