নীরব বন এবং নতুন গবেষণার সতর্কবার্তা
বাঘ ও চিতাবাঘ থেকে শুরু করে ভালুক, ভোঁদড় ও হরিণ—উত্তর কোরিয়ার বন ক্রমেই নীরব হয়ে পড়ছে। Biological Conservation সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি পিয়ার-রিভিউড গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে, দেশটিতে দ্রুত বন্যপ্রাণী হ্রাস পাচ্ছে—অর্থাৎ ভূদৃশ্য থেকে বন্যপ্রাণী উধাও হয়ে যাচ্ছে। এর পেছনে রয়েছে ক্ষুধা, জমজমাট কালোবাজার এবং রাষ্ট্রীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট শোষণ। গবেষকেরা বলছেন, প্রায় সব বড় স্তন্যপায়ী প্রাণীই মাংস, পশম বা দেহাংশের জন্য শিকার হচ্ছে। কোরীয় উপদ্বীপের পরিচিতি গড়ে দেওয়া কিছু প্রজাতি উত্তর কোরিয়া থেকে ইতিমধ্যে হারিয়ে গেছে।
সূচিপত্র
- নীরব বন এবং নতুন গবেষণার সতর্কবার্তা
- গবেষণায় কী পাওয়া গেছে, কীভাবে করা হয়েছে
- বেঁচে থাকা, বাজার ও রাষ্ট্র
- সবচেয়ে বেশি চাপে থাকা প্রজাতি
- সাবল, হারিয়ে যাওয়া এক প্রতীক
- সীমান্তে বাঘ ও চিতাবাঘ
- চাহিদায় ভালুক, হরিণ ও ভোঁদড়
- শীর্ষ শিকারি প্রাণী হারানো কেন গুরুত্বপূর্ণ
- আইন, নিষেধাজ্ঞা ও আঞ্চলিক দায়িত্ব
- এখন কী করা যেতে পারে
- সীমাবদ্ধতার মধ্যে বিজ্ঞান
- মূল কথা
ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন ও ইউরোপের সহযোগী প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানীদের নেতৃত্বে গবেষক দলটি বিচ্ছিন্ন দেশটির ভেতরে বন্যপ্রাণীর বর্তমান ব্যবহার নিয়ে প্রথম ভিত্তিচিত্র তৈরি করেছে। তাদের সাক্ষাৎকার থেকে ধারণা পাওয়া যায়, ঘন পশমের জন্য দীর্ঘদিন ধরে মূল্যবান ছোট মাংসাশী প্রাণী সাবল উত্তর কোরিয়ায় কার্যত বিলুপ্ত। গবেষকেরা আরও সতর্ক করেছেন, উত্তর-পূর্ব চীন ও রাশিয়া থেকে ছড়িয়ে আসা বিপন্ন আমুর বাঘ ও চিতাবাঘ সীমান্ত পেরোলে বড় ঝুঁকিতে পড়ে। এতে ওই দেশগুলোতে বহু কষ্টে অর্জিত পুনরুদ্ধার ব্যাহত হতে পারে।
এই চিত্র চোরাশিকারি ও ক্রেতাদের গণ্ডি ছাড়িয়ে আরও বিস্তৃত। ১৯৯০-এর দশকের অর্থনৈতিক পতনে মানুষ বেঁচে থাকার জন্য শিকারে নামে, অনানুষ্ঠানিক বাজার টেকসই বাণিজ্য-নেটওয়ার্কে রূপ নেয় এবং রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো বন্যপ্রাণীর পণ্য থেকে লাভবান হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। উত্তর কোরিয়া বন্য প্রাণী ও উদ্ভিদের বিপন্ন প্রজাতির আন্তর্জাতিক বাণিজ্যবিষয়ক কনভেনশনের (CITES) সদস্য নয়। গবেষকদের সতর্কতা, চীনে সীমান্তপারের বিক্রিতে সংরক্ষিত প্রজাতিও রয়েছে, যা CITES এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবনা মেনে চলা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করছে।
গবেষণায় কী পাওয়া গেছে, কীভাবে করা হয়েছে
স্বাধীন বিজ্ঞানীদের পক্ষে উত্তর কোরিয়ার ভেতরে কাজ করা প্রায় অসম্ভব। এই বাধা কাটাতে গবেষক দল ২০২১ ও ২০২২ সালে উত্তর কোরিয়ার ৪২ জন পলাতকের সঙ্গে কাঠামোবদ্ধ সাক্ষাৎকার নেয়। তাঁদের মধ্যে ছিলেন সাবেক সেনাসদস্য, শিকারি, ব্যবসায়ী ও ভোক্তা। প্রবেশাধিকার, নিরাপত্তা বা স্বচ্ছতা সীমিত হলে স্থানীয় পরিবেশবিষয়ক জ্ঞানভিত্তিক এই পদ্ধতি বহুল ব্যবহৃত হয়। পূর্ণাঙ্গ বন্যপ্রাণী জরিপের বিকল্প না হলেও, অভাবের সময় ও পরবর্তী বছরগুলোতে মানুষ কী দেখেছে, কিনেছে ও বিক্রি করেছে—সে বিষয়ে এটি বিস্তারিত বিবরণ দেয়।
উত্তরদাতারা আধা কিলোগ্রামের বেশি ওজনের প্রায় সব দেশীয় স্তন্যপায়ী প্রজাতি শিকারের কথা জানিয়েছেন। রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক সম্পদ হিসেবে ব্যবহৃত বন্যপ্রাণীর মধ্যে উত্তর কোরিয়ার আইনে সুরক্ষিত প্রাণীও ছিল বলে জানা গেছে। অনেক সাক্ষাৎকারদাতা শিকার ও বাণিজ্য বৃদ্ধির সূত্রপাত ঘটান ১৯৯০-এর দশকের শেষের দুর্ভিক্ষের সময়ে, যখন সরকারি বণ্টনব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। অনানুষ্ঠানিক বাজার বিস্তৃত হয়, আর বন্যপ্রাণী হয়ে ওঠে পরিবারের জন্য বিপদের সময়ের অবলম্বন এবং দেশীয় ও সীমান্তপারের ক্রেতাদের জোগান দেওয়া ব্যবসায়ীদের পণ্য।
ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও পরিবেশবিদ্যার সহযোগী প্রভাষক এবং গবেষণার সহলেখক জশুয়া এলভস-পাওয়েল বলেন, এই প্রবণতায় বন নাটকীয়ভাবে প্রাণশূন্য হয়ে পড়ছে। তাঁর সতর্কতা, এই ক্ষতির প্রভাব উত্তর কোরিয়ার জনগোষ্ঠীর ওপর পড়বে এবং সীমান্ত পেরিয়ে প্রতিবেশী বাস্তুতন্ত্রেও ছড়াবে।
উত্তর কোরিয়ার বন প্রাণশূন্য হয়ে পড়ার বড় ঝুঁকি রয়েছে, এমন পরিস্থিতিতে বন কার্যত খালি হয়ে যায়।
সাক্ষাৎকারে উঠে আসা শিকারের চাপের ব্যাপকতার কথাও তিনি তুলে ধরেন।
উত্তর কোরিয়ায় সজারুর চেয়ে বড় প্রায় সব স্তন্যপায়ী প্রজাতিই ভক্ষণ বা বাণিজ্যের জন্য সুযোগ পেলেই ধরা হয়।
গবেষণাটি Biological Conservation সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, অব্যাহত শোষণে কোরীয় উপদ্বীপ ও এশীয় মূল ভূখণ্ডের মধ্যে বন্যপ্রাণীর চলাচলের পথ বিচ্ছিন্ন হতে পারে, যা চীন ও রাশিয়ায় প্রজাতিগুলোর পুনরুদ্ধারকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
বেঁচে থাকা, বাজার ও রাষ্ট্র
সাক্ষাৎকারদাতারা দুর্ভিক্ষের বছরগুলোতে বেঁচে থাকার প্রয়োজনের সঙ্গে শিকার বৃদ্ধির যোগসূত্র টেনেছেন। রাষ্ট্রীয় বণ্টনব্যবস্থা ব্যর্থ হওয়ার পর লাখ লাখ মানুষ অভাবের মুখে পড়ে। খাবার ও আয়ের জন্য পরিবারগুলো বন, নদী ও উপকূলের দিকে ঝুঁকে পড়ে। স্থানীয়ভাবে জাংমাদাং নামে পরিচিত অনানুষ্ঠানিক বাজার দৈনন্দিন জীবনের মেরুদণ্ড হয়ে ওঠে। সেই সময়ে গড়ে ওঠা দক্ষতা, যোগাযোগ ও রুটগুলো পরে বাণিজ্য-নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছে, যা দেশের ভেতরে এবং চীনে প্রাণীর দেহাংশ সরবরাহ করে।
একাধিক পলাতক রাষ্ট্রীয় সংশ্লিষ্টতার কথা বলেছেন। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ খাজনা হিসেবে পশুর চামড়া ও অন্যান্য পণ্য সংগ্রহ করত। পরিবারগুলোকে নির্দিষ্ট কোটা পূরণের নির্দেশ দেওয়া হতো, আর শিশুদের খরগোশ পালন করে তাদের পশম জোগাড়ের দায়িত্ব দেওয়া হতো। সরকারি খামারে পিত্ত সংগ্রহের জন্য ভালুক রাখা হতো এবং দেহাংশ ও চামড়ার জন্য হরিণ, ভোঁদড় ও তিতির প্রজনন করানো হতো বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। দেশের বাইরের ক্রেতাদের কাছে পৌঁছানো বন্যপ্রাণীর পণ্যও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সরবরাহ করেছে বলে জানা গেছে।
উত্তর কোরিয়ায় আইন ও সংরক্ষিত এলাকার আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা থাকলেও, সাক্ষাৎকারদাতাদের বর্ণনায় নাগরিক ও কর্মকর্তারা নিয়মিত তা লঙ্ঘন করেন। বিপন্ন প্রজাতির আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণকারী চুক্তি CITES-এ দেশটি স্বাক্ষরকারী নয়। গবেষকদের সতর্কতা, চীনে সীমান্তপারের কিছু বিক্রিতে সংরক্ষিত প্রজাতি রয়েছে, যা CITES ও জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবনার অধীনে চীনের দায়বদ্ধতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। তাঁরা সীমান্তের উভয় পাশে নিয়ম মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন।
সবচেয়ে বেশি চাপে থাকা প্রজাতি
গবেষকদের সংগ্রহ করা বিবরণগুলো উপদ্বীপের প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের তালিকার মতো। সাক্ষাৎকারদাতারা বাঘ, চিতাবাঘ, ভালুক, হরিণ ও ভোঁদড়ের নাম বলেছেন। পাশাপাশি উল্লেখ করেছেন লম্বা লেজওয়ালা গোরাল, বুনো শূকর, লাল শিয়াল এবং ব্যাজার ও বেজির মতো ছোট মাংসাশী প্রাণী। মাংস, চামড়া ও হাড়ের জন্য শিকার করা হয়; পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী ওষুধে ব্যবহৃত দেহাংশ, যেমন হরিণের শিং ও ভালুকের পিত্তও সংগ্রহ করা হয়।
সাবল, হারিয়ে যাওয়া এক প্রতীক
একসময় উপদ্বীপজুড়ে সাধারণভাবে দেখা যেত সাবল; ঘন, চকচকে পশমের জন্য এর কদর ছিল। ব্যবসায়ী ও শিকারিরা গবেষকদের বলেছেন, প্রাণীটি উত্তর কোরিয়া থেকে হারিয়ে গেছে। গবেষণার সিদ্ধান্ত, সেখানে প্রজাতিটি কার্যত বিলুপ্ত—অর্থাৎ অবশিষ্ট প্রাণীর সংখ্যা এত কম যে তারা বাস্তুতন্ত্রে নিজেদের ভূমিকা রাখতে পারে না। সাবল বনের ছোট মাংসাশী প্রাণী; তারা ইঁদুর ও পাখি শিকার করে এবং খাদ্যজালের ভারসাম্য রক্ষায় সহায়তা করে।
পলাতকেরা স্মরণ করেছেন, বাজারে একসময় নিয়মিত দেখা যাওয়া সাবলের চামড়া প্রথমে বিরল হয়ে যায়, পরে একেবারেই হারিয়ে যায়। পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চলের প্রতিবেদনেও একই ধরনের পতনের কথা উঠে এসেছে, যেখানে পশমের জন্য নিবিড় ফাঁদ পাতায় কয়েক দশকের মধ্যে বন থেকে পশমওয়ালা প্রাণী উধাও হয়েছে।
সীমান্তে বাঘ ও চিতাবাঘ
উত্তর-পূর্ব চীন ও রুশ দূরপ্রাচ্যে আমুর বাঘ ও আমুর চিতাবাঘের সংখ্যা কম হলেও বাড়ছে, এমন প্রমাণ পাওয়া গেছে। গত এক দশকের সংরক্ষণ উদ্যোগে প্রাণীদের ছড়িয়ে পড়ার জন্য চাংবাই পর্বতমালা ও উত্তর কোরিয়া-সংলগ্ন তুমেন নদী অঞ্চলের দিকে পথ তৈরি হয়েছে। গবেষকদের সতর্কতা, উত্তর কোরিয়ার ভূখণ্ডে ঢুকে পড়া এই বিড়ালজাতীয় প্রাণীগুলো আঞ্চলিক বাজারে মূল্যবান চামড়া, হাড় ও অন্যান্য দেহাংশের জন্য হত্যার উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।
উত্তর কোরিয়ার দিকে কোনো প্রাণী হারালে সীমান্তজুড়ে নাজুক পুনরুদ্ধার দুর্বল হবে। বড় শিকারি প্রাণীরা বহু দূর পর্যন্ত বিচরণ করে এবং হরিণ ও বুনো শূকরের মতো শিকারপ্রাণীসহ সংযুক্ত আবাসস্থল তাদের প্রয়োজন। উপদ্বীপটি যদি ছড়িয়ে পড়া প্রাণীদের জন্য পথরোধী হয়ে ওঠে, তাহলে বৃহত্তর মেটাপপুলেশন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। দূরদূরান্তে বিচরণকারী অন্যান্য প্রজাতির ক্ষেত্রেও এই উদ্বেগ প্রযোজ্য।
চাহিদায় ভালুক, হরিণ ও ভোঁদড়
সাক্ষাৎকারদাতারা পিত্ত সংগ্রহের জন্য এশীয় কালো ভালুক ব্যবহারের এবং থাবা ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিক্রির কথা বলেছেন। মর্যাদাপূর্ণ খাবার হিসেবে হরিণের কদর ছিল, আর শিং ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী ওষুধের বাণিজ্যে ব্যবহৃত হতো। পশমের জন্য ভোঁদড় শিকার করা হতো। খাড়া পাহাড়ে থাকা ছাগলজাতীয় দুর্বল প্রজাতির লম্বা লেজওয়ালা গোরালকে মাংসের জন্য শিকার করা হতো। কিছু বিবরণে তেলের জন্য ব্যাজার ধরা, শিয়াল ও বেজির চামড়া বিক্রি এবং গ্রামের কাছের বনে ব্যাপকভাবে ফাঁদ ব্যবহারের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
উত্তরদাতারা জানিয়েছেন, রাষ্ট্রীয় সংস্থার খামারে চাহিদা মেটাতে ভালুক, হরিণ ও ভোঁদড় পালন করা হতো। পশমের জন্য খামারে পালা বহিরাগত ইঁদুরজাতীয় প্রাণী কোয়পু জলাভূমিতে ছড়িয়ে পড়ে আগ্রাসী প্রজাতিতে পরিণত হয়েছে বলেও খবর আছে। বন্যপ্রাণী আহরণ ও বন্দী অবস্থায় প্রজননের এই সমন্বয়ে বাজারে দেহাংশের সরবরাহ অব্যাহত থাকে এবং পণ্য ব্যবসায়ীদের হাতে যাওয়ার পর তার উৎস আড়াল হয়ে যেতে পারে।
শীর্ষ শিকারি প্রাণী হারানো কেন গুরুত্বপূর্ণ
বাস্তুবিদেরা বাস্তুতন্ত্রকে ধরে রাখা প্রাণীদের বোঝাতে ‘কীস্টোন প্রজাতি’ শব্দটি ব্যবহার করেন। শীর্ষ শিকারি প্রাণীরা প্রায়ই শিকারপ্রাণীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করে এবং উদ্ভিদ ও ছোট প্রাণীর বিকাশের সুযোগ দিয়ে এ ভূমিকা পালন করে। শীর্ষ শিকারি প্রাণী সরিয়ে ফেলা হলে তৃণভোজীরা বন ও তৃণভূমিতে অতিরিক্ত চারণ করতে পারে, ছোট শিকারি প্রাণীর সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে এবং পুরো ভূদৃশ্য এমনভাবে বদলে যেতে পারে, যাতে জীববৈচিত্র্য কমে যায় ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীল মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
উত্তর আমেরিকার নেকড়ে এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলের সামুদ্রিক তারামাছ নিয়ে গবেষণা থেকে এই ধারণা সুপরিচিত। পূর্ব এশিয়াতেও এটি প্রযোজ্য। আন্তঃসীমান্ত ভূদৃশ্যের এক পাশ থেকে বাঘ ও চিতাবাঘ হারিয়ে গেলে হরিণ ও বুনো শূকরের সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে, ফসলের ক্ষতি বাড়তে পারে এবং বনের চারা কমে যেতে পারে। সময়ের সঙ্গে শিকারি প্রাণী এবং সাবলের মতো মাঝারি আকারের মাংসাশী প্রাণীর ক্ষতিতে বাস্তুতন্ত্রের স্থিতিস্থাপকতা বজায় রাখা সংযোগগুলো দুর্বল হতে পারে; ফলে আগুন, রোগ ও জলবায়ুর চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে।
আবাসস্থল থেকে ধারাবাহিকভাবে বন্যপ্রাণী হারিয়ে যাওয়াকে বলা হয় ডিফনেশন। বড় ও মানুষের মনোযোগ আকর্ষণকারী প্রাণীর জন্য এটি একটি বিপর্যয়। পাশাপাশি এতে পরাগবাহী, বীজ ছড়ানো প্রাণী এবং পুষ্টি বহনকারী প্রাণীরাও হারিয়ে যায়। বন থেকে এই ভূমিকা পালনকারী প্রাণীরা উধাও হয়ে গেলে পরে সুরক্ষা বাড়লেও পুনরুদ্ধারে কয়েক দশক লেগে যেতে পারে।
আইন, নিষেধাজ্ঞা ও আঞ্চলিক দায়িত্ব
উত্তর কোরিয়া সংরক্ষিত প্রজাতির তালিকা ও সংরক্ষিত এলাকার মানচিত্র বজায় রাখে। সাক্ষাৎকারদাতারা বলেছেন, ব্যক্তিগত ব্যবহার, স্থানীয় বাজার ও রাষ্ট্রের জন্য শিকার এবং ফাঁদ পেতে ধরার সময় এসব সুরক্ষা প্রায়ই উপেক্ষা করা হয়। বিপন্ন বন্যপ্রাণীর বাণিজ্যে বিধিনিষেধ আরোপকারী বৈশ্বিক চুক্তি CITES-এর বাইরে দেশটি। ফলে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কোরীয় উপদ্বীপ থেকে আসা বন্যপ্রাণীর পণ্যের বড় গন্তব্য চীন। গবেষকদের সতর্কতা, উত্তর কোরিয়া থেকে আসা কিছু বাণিজ্য CITES ও জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবনার অধীনে চীনের অঙ্গীকার লঙ্ঘন করতে পারে। কার্যকর আইন প্রয়োগে শুল্ক বিভাগ, সীমান্ত পুলিশ ও বাজার পরিদর্শকদের সমন্বিত পদক্ষেপ দরকার। পাশাপাশি চাহিদা কমাতে হবে, যাতে ক্রেতারা বাঘের হাড়, ভালুকের পিত্ত ও হরিণের শিংয়ের মতো দেহাংশ কেনা বন্ধ করেন।
এই অঞ্চলে সীমান্তপারের বন্যপ্রাণী বাণিজ্যসংক্রান্ত জব্দ ও বিচার নিয়ে জনসমক্ষে প্রকাশিত তথ্য সীমিত। স্বচ্ছতা, তথ্য আদান-প্রদান ও যৌথ টহল সহায়ক হতে পারে। আরও উন্নত কিছু উপায়ও রয়েছে। ডিএনএ বিশ্লেষণ, আইসোটোপ পরীক্ষা ও ডিজিটাল ট্র্যাকিং বন্যপ্রাণীর দেহাংশের উৎস শনাক্ত করতে পারে, ফলে খামার বা মিথ্যা লেবেলের আড়ালে অবৈধ পণ্য বৈধ দেখানো কঠিন হবে।
এখন কী করা যেতে পারে
গবেষকেরা উত্তর কোরিয়াকে নিজেদের আইন প্রয়োগ এবং খামার ও সংগ্রহের কোটা দিয়ে রাষ্ট্রীয় মদদে চলা শোষণ বন্ধ করার সুপারিশ করেছেন। উত্তর কোরিয়ার বন্যপ্রাণী থেকে লাভবান হওয়া সরবরাহব্যবস্থা ও ক্রেতাদের ওপর চাপ দিতেও তাঁরা চীন ও অন্যান্য প্রতিবেশী দেশের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। চোরাশিকারের প্রণোদনা কমাতে আইন প্রয়োগ জোরদার করার পাশাপাশি বেঁচে থাকার জন্য বন ও নদীর ওপর নির্ভরশীল মানুষের বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা করতে হবে।
এ প্রেক্ষাপটে সংরক্ষণের জন্য মানবিক সহায়তাও গুরুত্বপূর্ণ। যেসব জনগোষ্ঠীর নির্ভরযোগ্য খাদ্য ও আয়ের ব্যবস্থা আছে, সেখানে শিকারের চাপ কমে। বন্যপ্রাণী পর্যবেক্ষণ বা ফাঁদ সরানোর জন্য স্থানীয় বাসিন্দাদের পারিশ্রমিক দেওয়ার কর্মসূচি আস্থা ও অর্থায়ন পেলে কার্যকর হতে পারে। গৃহপালিত পশুপালনে সহায়তা, উন্নত মাছ চাষ এবং বিকল্প ওষুধের ব্যবস্থা বন্য মাংস ও প্রাণীর দেহাংশের চাহিদা কমাতে পারে। ভোক্তা বাজারে প্রচারাভিযান বাঘের হাড় বা ভালুকের পিত্তের পণ্য রাখার সঙ্গে জড়িত সামাজিক মর্যাদার ধারণাও কমাতে পারে।
জীববিজ্ঞানীরা সংযোগ রক্ষার সুযোগও দেখছেন। কোরীয় উপদ্বীপ মহাদেশীয় পূর্ব এশিয়া ও দক্ষিণের দ্বীপসমৃদ্ধ সাগরের মাঝে অবস্থিত। চীন, রাশিয়া ও উপদ্বীপকে যুক্ত করা চলাচলের পথ সুরক্ষিত হলে বাঘ, চিতাবাঘ ও দূরদূরান্তে বিচরণকারী অন্যান্য প্রজাতি নিরাপদে চলাচল করতে পারবে। দক্ষিণ কোরিয়ার অসামরিকীকৃত অঞ্চল এবং সংলগ্ন বেসামরিক নিয়ন্ত্রণ অঞ্চল—যেখানে জাতীয় পরিবেশবিদ্যা ইনস্টিটিউট হাজার হাজার প্রজাতির নথি করেছে—দেখায়, মানুষের অনুপ্রবেশ সীমিত হলে বন্যপ্রাণী কীভাবে ফিরে আসে। উত্তর কোরিয়ায় দীর্ঘস্থায়ী সুরক্ষা নিশ্চিত করতে শিকার ও বাণিজ্য থেকে সত্যিকারের সুরক্ষিত এলাকা দরকার।
সীমাবদ্ধতার মধ্যে বিজ্ঞান
গবেষণাটিতে ক্যামেরা ট্র্যাপ ও মাঠপর্যায়ের জরিপের বদলে পলাতকদের সাক্ষ্যের ওপর নির্ভর করা হয়েছে। এ পদ্ধতিতে স্থান ও সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকে। তবে কয়েক ডজন সাক্ষাৎকারের বিস্তারিত বিবরণ এবং আঞ্চলিক বাজার থেকে পাওয়া একই ধরনের প্রতিবেদনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে সামগ্রিক চিত্রটি উড়িয়ে দেওয়া কঠিন। এটি বন্যপ্রাণীর ব্যবহার ও বাণিজ্যের একটি ভিত্তিচিত্র তৈরি করেছে, যা ভবিষ্যৎ গবেষণায় যাচাই করা যাবে।
প্রবেশাধিকার সীমিত থাকলেও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব। বিরল প্রজাতির উপস্থিতি নথিবদ্ধ করতে সীমান্তের কাছে ক্যামেরা ট্র্যাপ ও শব্দ শনাক্তকারী সেন্সর বসানো যেতে পারে। স্যাটেলাইট ছবি থেকে গাছ কাটার পথ, বনভূমি পরিষ্কার ও আগুনের দাগ শনাক্ত করা সম্ভব। বাজারে ফরেনসিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে পণ্যের উৎস উত্তর কোরিয়া পর্যন্ত অনুসরণ করা যেতে পারে। আঞ্চলিক বিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যে বাঘ ও চিতাবাঘ পর্যবেক্ষণে সহযোগিতা করছেন; উপদ্বীপ থেকে আরও তথ্য অন্তর্ভুক্ত করতে এই নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করা যেতে পারে।
মূল কথা
- পিয়ার-রিভিউড গবেষণায় ক্ষুধা, কালোবাজার ও রাষ্ট্রীয় সংশ্লিষ্টতার কারণে উত্তর কোরিয়ার বন থেকে দ্রুত বন্যপ্রাণী হ্রাসের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
- ৪২ জন পলাতকের সাক্ষাৎকারে আধা কিলোগ্রামের বেশি ওজনের প্রায় সব দেশীয় স্তন্যপায়ী প্রাণী শিকারের কথা উঠে এসেছে।
- উত্তর কোরিয়ায় সাবল কার্যত বিলুপ্ত বলে ধারণা করা হচ্ছে; সীমান্তপারের ঝুঁকিতে রয়েছে আমুর বাঘ ও চিতাবাঘ।
- রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো বন্যপ্রাণীর পণ্য সংগ্রহ করেছে এবং ভালুক, হরিণ, ভোঁদড় ও তিতিরের খামার চালিয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
- উত্তর কোরিয়া CITES-এর সদস্য নয়; চীনে কিছু বাণিজ্য আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার লঙ্ঘন করতে পারে।
- পণ্যের মধ্যে রয়েছে মাংস, চামড়া এবং ঐতিহ্যবাহী ওষুধে ব্যবহৃত দেহাংশ, যেমন হরিণের শিং ও ভালুকের পিত্ত।
- গবেষকেরা দেশের ভেতরে আইন প্রয়োগ, রাষ্ট্রীয় মদদে শোষণ বন্ধ এবং চাহিদা কমাতে চীনের জোরালো পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন।
- শীর্ষ শিকারি প্রাণী ও মাঝারি আকারের মাংসাশী প্রাণী হারালে ধারাবাহিক বাস্তুতান্ত্রিক পরিবর্তন ঘটতে পারে এবং প্রতিবেশী বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
- ডিজিটাল ফরেনসিক, সীমান্ত পর্যবেক্ষণ ও স্বচ্ছ তথ্য আদান-প্রদান অবৈধ বাণিজ্য-নেটওয়ার্ক ভাঙতে পারে।
- সংরক্ষণের সাফল্য নির্ভর করে সুরক্ষা এবং বন্যপ্রাণী আহরণের ওপর নির্ভরতা কমায় এমন উন্নত জীবিকা—দুটির ওপরই।






