চীনের একটি করোটি মানবজাতির উৎপত্তির সময় আরও পেছনে ঠেলে দিয়েছে
মধ্য চীনের হুবেই প্রদেশে নদীর ধারের একটি উঁচু ভূমিতে আবিষ্কৃত চূর্ণবিচূর্ণ একটি করোটি আমাদের প্রজাতির ইতিহাসে নতুন এক মাপকাঠি হয়ে উঠেছে। উন্নত স্ক্যানিং ও ডিজিটাল পুনর্গঠনের সাহায্যে একটি আন্তর্জাতিক দল দ্বিতীয় ইউনশিয়ান করোটি, যা ইউনশিয়ান ২ নামেও পরিচিত, ভার্চুয়ালি পুনর্গঠন করেছে এবং শতাধিক মানব জীবাশ্মের সঙ্গে তুলনা করেছে। ফলাফল থেকে ইঙ্গিত মেলে, এটি এমন এক বংশধারার প্রাচীন সদস্য, যার মধ্যে হোমো লংগি—কখনো যাকে ‘ড্রাগন ম্যান’ বলা হয়—এবং রহস্যময় ডেনিসোভানরা অন্তর্ভুক্ত। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, হোমো স্যাপিয়েন্স, হোমো লংগি ও নিয়ান্ডারথালদের দিকে যাওয়া প্রধান শাখাগুলো অনেক বিজ্ঞানীর ধারণার চেয়ে বহু আগে, সম্ভবত ১৩ লাখ বছরেরও আগে, পৃথক হয়ে গিয়েছিল।
সূচিপত্র
- চীনের একটি করোটি মানবজাতির উৎপত্তির সময় আরও পেছনে ঠেলে দিয়েছে
- ইউনশিয়ান করোটির ভেতরে গবেষকেরা কী পেয়েছেন
- জীবাশ্মটির বয়স কত
- পুরোনো ও নতুন বৈশিষ্ট্যের মিশ্রণ
- প্রত্যাশার চেয়ে অনেক আগে বিভক্ত হয়েছে মানববংশের শাখাগুলো
- ডেনিসোভান কারা
- মানবজাতির ইতিহাসে এর গুরুত্ব
- চূর্ণবিচূর্ণ করোটি কীভাবে ভার্চুয়ালি পুনর্গঠন করা হলো
- বিতর্ক, সীমাবদ্ধতা এবং কোন প্রমাণে মীমাংসা হতে পারে
- আদি মানবগোষ্ঠী কোথায় বাস করত এবং চলাচল করত
- মূল বিষয়গুলো
এই আবিষ্কার মানববিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করছে, যাকে প্রায়ই ‘মধ্যবর্তী সময়ের জট’ বলা হয়। সময়টি প্রায় ১০ লাখ থেকে ৩ লাখ বছর আগের। পুনর্গঠিত ইউনশিয়ান ২ করোটিতে বৈশিষ্ট্যের চোখে পড়ার মতো মিশ্রণ দেখা যায়। কিছু বৈশিষ্ট্য বিস্তৃত এলাকায় বসবাসকারী প্রাচীন মানব হোমো ইরেক্টাসের মতো। অন্যগুলো এশিয়ার পরবর্তী বৃহৎ মস্তিষ্কের মানুষের সঙ্গে বেশি মেলে। গবেষকদের মতে, ইউনশিয়ান ২ হোমো লংগি এবং সম্ভবত ডেনিসোভানদের অন্তর্ভুক্ত এশীয় গোষ্ঠীর গোড়ার কাছাকাছি। এই অবস্থান সঠিক হলে, আমাদের প্রজাতি, নিয়ান্ডারথাল ও ডেনিসোভানদের জন্ম দেওয়া জনগোষ্ঠী প্রায় ১০ লাখ বছর আগেই পৃথক দলে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল।
ইউনশিয়ান করোটির ভেতরে গবেষকেরা কী পেয়েছেন
১৯৯০ সালে হানজিয়াং নদীর কাছে শুয়েতাংলিয়াংজিতে ইউনশিয়ান ২ আবিষ্কৃত হয়। কবরস্থ হওয়ার সময় করোটিটি চ্যাপ্টা ও বিকৃত হয়ে গিয়েছিল, ফলে প্রথম দিকে সেটি শনাক্ত করা কঠিন ছিল। সতর্কতার সঙ্গে ভার্চুয়ালি পুনর্গঠনের পর গবেষকেরা এর আসল আকৃতি ও মাপ মূল্যায়ন করতে পেরেছেন। করোটিটি লম্বা ও নিচু, ভ্রূ-অস্থি মজবুত, মস্তিষ্কের খুলি প্রশস্ত ও চ্যাপ্টা। মুখমণ্ডল বড় হলেও তুলনামূলকভাবে চ্যাপ্টা, গালের হাড় নিচু। করোটির ধারণক্ষমতা ১১০০ মিলিলিটারের বেশি—এই বয়সের মানুষের মধ্যে জানা সবচেয়ে বড়—এবং আধুনিক মানুষের ধারণক্ষমতার নিম্নসীমার মধ্যে পড়ে। পেছনের দিকে ঢালু কপাল ও মজবুত ভ্রূ-অস্থির সঙ্গে চ্যাপ্টা গালের হাড় ও বড় মস্তিষ্কের এই সমন্বয় জীবাশ্মটিকে ধ্রুপদি হোমো ইরেক্টাস থেকে আলাদা করেছে।
জীবাশ্মটির বয়স কত
ইউনশিয়ান ২-এর সঙ্গে পাওয়া পলির স্তর ও প্রাণীর জীবাশ্ম থেকে বয়স নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে চৌম্বকস্তরবিদ্যা ও রেডিওমেট্রিক পদ্ধতির মতো কৌশলও ব্যবহার করা হয়েছে। গবেষকদের হিসাবে, করোটিটির বয়স ৯ লাখ ৪০ হাজার থেকে ১১ লাখ বছরের মধ্যে। এশিয়ায় পাওয়া আধুনিক মানুষের মতো মস্তিষ্কের খুলি-আকারবিশিষ্ট সবচেয়ে প্রাচীন করোটিগুলোর মধ্যে এটি একটি।
পুরোনো ও নতুন বৈশিষ্ট্যের মিশ্রণ
ইউনশিয়ান ২-এ এমন বৈশিষ্ট্যের মিশ্রণ রয়েছে, যা প্রাচীন ও পরবর্তী যুগের মানুষের মধ্যে যোগসূত্র তৈরি করে। করোটির ওপরের অংশ পুরু ও লম্বা, আর গম্বুজ নিচু—হোমো ইরেক্টাসের মতো। মুখমণ্ডল প্রশস্ত হলেও তুলনামূলক চ্যাপ্টা; গালের হাড় নিচু ও অগভীর, নাকের ছিদ্র প্রশস্ত। করোটির পেছনের অংশ প্রসারিত। তালু প্রশস্ত এবং কানের পাশের অঞ্চলে এমন স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা প্রস্তাবিত লংগি গোষ্ঠীর অন্য জীবাশ্মেও দেখা যায়। বড় মস্তিষ্কের পাশাপাশি এসব অভিন্ন বৈশিষ্ট্য হারবিন করোটি ও জিনিউশানের মতো পরবর্তী যুগের এশীয় জীবাশ্মের সঙ্গে মেলে এবং পৃথক একটি এশীয় গোষ্ঠীকে চিহ্নিত করতে সহায়তা করে।
প্রত্যাশার চেয়ে অনেক আগে বিভক্ত হয়েছে মানববংশের শাখাগুলো
বিভিন্ন গোষ্ঠীর পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ণয়ে গবেষকেরা শতাধিক করোটি ও চোয়ালের মাপ এবং শারীরিক বৈশিষ্ট্য ব্যবহার করেছেন। তাঁরা একটি বংশবিকাশের বৃক্ষ তৈরি করেছেন, যা বিভিন্ন মানবগোষ্ঠীর সম্পর্কের একটি শাখাচিত্র। এই বিশ্লেষণে প্রায় ১৩ লাখ ৮০ হাজার বছর আগে নিয়ান্ডারথালদের শাখাটি প্রথমে আলাদা হয়ে যায়। এরপর হোমো স্যাপিয়েন্স ও লংগি গোষ্ঠীর দিকে যাওয়া বংশধারাগুলো প্রায় ১৩ লাখ ২০ হাজার বছর আগে পৃথক হয়। অন্য কথায়, ডেনিসোভান ও তাদের লংগি-গোষ্ঠীর নিকটাত্মীয়রা নিয়ান্ডারথালদের চেয়ে আধুনিক মানুষের বেশি কাছাকাছি বলে মনে হয়। গবেষণায় ইউনশিয়ান ২-কে এই বিভাজনের খুব কাছাকাছি স্থাপন করা হয়েছে, যা ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করে কেন করোটিটিতে আদিম ও অপেক্ষাকৃত বিকশিত বৈশিষ্ট্য—দুই-ই রয়েছে।
ডেনিসোভান কারা
ডেনিসোভানদের সম্পর্কে জানা যায় মূলত কয়েকটি খণ্ডিত হাড় ও দাঁত থেকে পাওয়া প্রাচীন ডিএনএর মাধ্যমে। ২০১০ সালে সাইবেরিয়ার ডেনিসোভা গুহায় প্রথম তাদের শনাক্ত করা হয়। তাদের পূর্বপুরুষদের জিনগত চিহ্ন আজ এশিয়ার বহু মানুষের মধ্যে এবং মেলানেশিয়া ও ফিলিপাইনের কিছু জনগোষ্ঠীর মধ্যে উচ্চ মাত্রায় পাওয়া যায়। নতুন বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ডেনিসোভানরা হোমো লংগি গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত—এশীয় জীবাশ্ম, যেমন হারবিন করোটি, যার প্রমাণ দেয়। এটি সঠিক হলে, ডেনিসোভানরা কয়েক লাখ বছর ধরে এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বসবাস করেছে, অন্য মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করেছে এবং আধুনিক জনগোষ্ঠীর জিনগত বৈশিষ্ট্যে অবদান রেখেছে।
মানবজাতির ইতিহাসে এর গুরুত্ব
১০ লাখ থেকে ৩ লাখ বছর আগের মানববিবর্তনের সময়টিতে এমন অনেক জীবাশ্ম রয়েছে, যেগুলোর শ্রেণিবিন্যাস কঠিন। কিছু জীবাশ্ম আফ্রিকা থেকে, কিছু ইউরোপ থেকে, আর অনেকগুলো এশিয়া থেকে পাওয়া গেছে। এসব আবিষ্কার কীভাবে একে অপরের সঙ্গে মেলে, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে মতভেদ রয়েছে। নতুন গবেষণায় মধ্য প্লেইস্টোসিন যুগের এশীয় মানুষদের হোমো স্যাপিয়েন্স ও নিয়ান্ডারথালদের থেকে পৃথক লংগি বংশধারায় শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। এই পুনর্বিন্যাস বিশেষজ্ঞদের দীর্ঘদিনের বহু অসংগতির সমাধান করতে পারে এবং ব্যাখ্যা দিতে পারে কেন এশিয়ার বেশ কিছু জীবাশ্মকে ধ্রুপদি হোমো ইরেক্টাস বা আদি আধুনিক মানুষ—কোনোটির সঙ্গেই পুরোপুরি মেলেনি।
গবেষণাটি বড় মস্তিষ্কের মানুষের বংশধারাগুলোর বিচ্ছিন্ন হওয়ার সময়ও ১০ লাখ বছরেরও বেশি পেছনে নিয়ে গেছে। তিনটি প্রধান শাখা যদি এত আগেই পৃথক হয়ে থাকে, তাহলে সেগুলোর আদি সদস্যরা দীর্ঘ সময় ধরে একই সময়ে বসবাস করে থাকতে পারে। এতে বিভিন্ন মানবগোষ্ঠীর দেখা হওয়া, মেলামেশা করা এবং কখনো কখনো আন্তঃপ্রজননের সুযোগের সময়কাল আরও দীর্ঘ হয়। এই পুরোনো বিভাজন যাচাই করতে এশিয়া ও আফ্রিকার আরও প্রাচীন প্রত্নস্থলের ওপর গবেষণার গুরুত্বও বাড়বে।
লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের মানববিবর্তন গবেষণার প্রধান এবং গবেষণাটির সহলেখক ক্রিস স্ট্রিঙ্গার বিষয়টির গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।
এটি অনেক চিন্তাভাবনাই বদলে দিচ্ছে। কারণ, এর ইঙ্গিত হলো, ১০ লাখ বছর আগেই আমাদের পূর্বপুরুষেরা পৃথক গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিলেন। এতে বোঝা যায়, মানুষের বিবর্তনীয় বিভাজন আগের ধারণার চেয়ে অনেক আগে এবং আরও জটিলভাবে ঘটেছে।
কিছু ব্যাখ্যায় আরও বলা হয়েছে, পশ্চিম এশিয়ার কাছাকাছি কোনো সাধারণ পূর্বপুরুষ থেকে হোমো স্যাপিয়েন্স, নিয়ান্ডারথাল ও ডেনিসোভানদের শাখার উদ্ভব হতে পারে। তবে এ দাবি নিয়ে এখনো বিতর্ক রয়েছে। আদি হোমো স্যাপিয়েন্স হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত সবচেয়ে প্রাচীন জীবাশ্মগুলো এখনো আফ্রিকায় পাওয়া, যেগুলোর বয়স প্রায় ৩ লাখ বছর। নতুন পুনর্গঠন সেই প্রমাণ বদলায় না; তবে এতে বলা হয়েছে, পরবর্তী সময়ে আমাদের প্রজাতির জন্ম দেওয়া আরও প্রাচীন পূর্বপুরুষের জনগোষ্ঠী অন্য মানুষদের থেকে বহু গবেষণায় প্রস্তাবিত সময়ের চেয়ে অনেক আগে পৃথক হয়েছিল।
চূর্ণবিচূর্ণ করোটি কীভাবে ভার্চুয়ালি পুনর্গঠন করা হলো
হাজার হাজার বছর ধরে পলির ভার ও মাটির নড়াচড়ায় ইউনশিয়ান ২ করোটিটি বিকৃত হয়ে গিয়েছিল। এ ধরনের বিকৃতিতে হাড় বেঁকে ও মুচড়ে যায়, ফলে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য আড়াল হতে পারে বা অতিরঞ্জিত মনে হতে পারে। গবেষকেরা পাথরের স্তরের ভেতর দেখতে কম্পিউটেড টমোগ্রাফি, পৃষ্ঠের খুঁটিনাটি ধারণ করতে কাঠামোবদ্ধ আলোক স্ক্যানিং এবং চূর্ণ হওয়ার বিকৃতি উল্টে দিতে ডিজিটাল রেট্রোডিফরমেশন ব্যবহার করেছেন। সহজভাবে বললে, এটি ডিজিটাল অস্ত্রোপচার। গবেষকেরা পাথর থেকে হাড়ের অংশ আলাদা করেছেন, অনুপস্থিত অংশ পূরণে অক্ষত অংশের প্রতিচ্ছবি ব্যবহার করেছেন এবং শারীরস্থানগত সীমাবদ্ধতা মেনে খণ্ডগুলোকে আবার যথাস্থানে বসিয়েছেন।
বেইজিংয়ের ফুদান বিশ্ববিদ্যালয় ও ইনস্টিটিউট অব ভার্টিব্রেট প্যালিওন্টোলজি অ্যান্ড প্যালিওঅ্যানথ্রোপলজির অধ্যাপক শিজুন নি এই কাজের নেতৃত্ব দিয়েছেন। পুনর্গঠিত করোটি ও বংশবিকাশের বৃক্ষের ফলাফল প্রথম একসঙ্গে মেলার সময় দলের বিস্ময়ের কথা তিনি জানিয়েছেন।
শুরুতে ফলাফল পাওয়ার পর আমাদের মনে হয়েছিল, এটা অবিশ্বাস্য। সব মডেল ও পদ্ধতি ব্যবহার করে আমরা বারবার পরীক্ষা করেছি, আর এখন ফলাফল নিয়ে আমরা আত্মবিশ্বাসী। আমরা সত্যিই খুব উচ্ছ্বসিত।
ইউনশিয়ান ২ ও হারবিন করোটির সঙ্গে করোটির বৈশিষ্ট্যে মিল রয়েছে—এমন এশীয় জীবাশ্মের সমষ্টিও এই গবেষণার পক্ষে প্রমাণ জোগায়। এর মধ্যে চীনের দালি ও জিনিউশান এবং শ্রেণিবিন্যাস করা কঠিন বলে দীর্ঘদিন ধরে বিবেচিত অন্য নমুনাও রয়েছে। ২০২২ সালে আবিষ্কৃত ইউনশিয়ানের তৃতীয় একটি করোটি প্রস্তুত করা হচ্ছে। বিশ্লেষণ শেষে এটি পুনর্গঠন এবং এসব জীবাশ্মকে লংগি গোষ্ঠীতে অন্তর্ভুক্ত করার আরেকটি পরীক্ষা হবে।
বিতর্ক, সীমাবদ্ধতা এবং কোন প্রমাণে মীমাংসা হতে পারে
অনেক জিনগত গবেষণায় অনুমান করা হয়েছে, আধুনিক মানুষ, নিয়ান্ডারথাল ও ডেনিসোভানরা ৭ লাখ থেকে ৫ লাখ বছর আগে একটি সাধারণ পূর্বপুরুষ থেকে পৃথক হয়েছিল। এসব অনুমান মিউটেশনের হার ও জনগোষ্ঠীর ইতিহাসের মডেলের ওপর নির্ভরশীল এবং সুদূর অতীতের ক্ষেত্রে এগুলোর নির্ভুলতা সীমিত। করোটির বৈশিষ্ট্য থেকে তৈরি শারীরিক বৈশিষ্ট্যভিত্তিক বংশবিকাশের বৃক্ষ প্রাচীন বিভাজন অধ্যয়নের আরেকটি উপায়, তবে এরও সীমাবদ্ধতা আছে। সম্পর্কহীন গোষ্ঠীতে একই বৈশিষ্ট্য সমান্তরালভাবে বিবর্তিত হতে পারে, আর কোন বৈশিষ্ট্য বেছে নেওয়া হচ্ছে ও সেগুলোকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, তাও ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে।
বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞ ইউনশিয়ান ২-এর পুনর্গঠনকে স্বাগত জানিয়েছেন, তবে বংশবিকাশের বৃক্ষে দেওয়া সময়কাল নিয়ে সতর্ক করেছেন। কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের মানববিবর্তন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ফ্রিদো ওয়েলকার বলেছেন, করোটিটির নতুন মডেল একটি বড় সম্পদ; তবে এর অবস্থান নিশ্চিত করতে আণবিক পরীক্ষা সহায়ক হবে।
এই গুরুত্বপূর্ণ করোটির একটি ডিজিটাল পুনর্গঠন হাতে পাওয়া খুবই রোমাঞ্চকর। আরও জীবাশ্ম ও জিনগত প্রমাণে নিশ্চিত হলে বিভাজনের সময়কাল হবে বিস্ময়কর। বিকল্পভাবে, নমুনাটি থেকেই আণবিক তথ্য পাওয়া গেলে তা শারীরিক বৈশিষ্ট্যভিত্তিক অনুমানকে সমর্থন বা চ্যালেঞ্জ করে এমন অন্তর্দৃষ্টি দিতে পারে।
গবেষণায় যুক্ত ছিলেন না, এমন স্মিথসোনিয়ান ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল হিস্ট্রির প্যালিওঅ্যানথ্রোপোলজিস্ট রায়ান ম্যাকরে পুনর্গঠনের প্রশংসা করলেও বৃহত্তর বংশবিকাশের বৃক্ষ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
পুনর্গঠনটি বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে এবং লংগি ও ডেনিসোভান বংশধারার সঙ্গে এর মিল যুক্তিসংগত। সীমিত তথ্য দিয়ে বংশবিকাশের বৃক্ষটি একসঙ্গে অনেক কঠিন প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করছে। প্রস্তাবিত সময়কাল প্রত্যাশার চেয়ে প্রাচীন; আরও জীবাশ্ম ও জিনগত প্রমাণের সঙ্গে তা মিলিয়ে যাচাই করতে হবে।
১০ লাখ বছর পুরোনো জীবাশ্মে জিনগত উপাদান বিরল, তবে প্রাচীন প্রোটিনের মতো অন্য আণবিক চিহ্ন কখনো কখনো এত দিন টিকে থেকেছে। আফ্রিকা, এশিয়া ও ইউরোপে আরও সম্পূর্ণ করোটি ও চোয়ালসহ বিস্তৃত নমুনা সংগ্রহ করলে চিত্রটি আরও স্পষ্ট হতে পারে। নতুন গবেষণার লেখকেরা জানিয়েছেন, তাঁরা আরও জীবাশ্ম ও তথ্য যুক্ত করে বিশ্লেষণ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছেন।
আদি মানবগোষ্ঠী কোথায় বাস করত এবং চলাচল করত
নতুন মডেল ভূগোল নিয়ে একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলেছে। হোমো স্যাপিয়েন্স, নিয়ান্ডারথাল ও লংগি গোষ্ঠীর পূর্বপুরুষেরা আফ্রিকার ভেতরে, নাকি বাইরে বাস করত? মানবজাতির বংশধারার আদি নিবাস আফ্রিকা এবং সেখানে প্রায় ৩ লাখ বছর আগের হোমো স্যাপিয়েন্সের সবচেয়ে প্রাচীন জীবাশ্ম রয়েছে। একই সময়ে, হোমো ইরেক্টাস প্রায় ২০ লাখ বছর আগেই ইউরেশিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছিল এবং এশিয়ায় মধ্য প্লেইস্টোসিন যুগের অনেক প্রত্নস্থল রয়েছে। বংশধারাগুলোর গভীর বিভাজন যদি প্রায় ১৩ লাখ বছর আগে ঘটে থাকে, তাহলে তাতে দুই মহাদেশে ছড়িয়ে থাকা জনগোষ্ঠী জড়িত থাকতে পারে।
প্রাচীন মানুষেরা যে চলাচল করত, ছোট ছোট দলে থাকত এবং দেখা হলে কখনো কখনো আন্তঃপ্রজনন করত, তার প্রমাণ ক্রমেই বাড়ছে। নিয়ান্ডারথাল ও ডেনিসোভানদের সঙ্গে আধুনিক মানুষের জিনগত আদান-প্রদানের ইতিহাস রয়েছে। আজকের মানুষের মধ্যে পাওয়া ডেনিসোভান ডিএনএর চিহ্ন থেকে বোঝা যায়, লংগি গোষ্ঠী এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিল। এই ধরনটি এক গোষ্ঠীকে আরেকটি গোষ্ঠী দিয়ে পুরোপুরি প্রতিস্থাপনের বদলে, মাঝেমধ্যে সংযোগ থাকা শাখাবিভক্ত বংশবিকাশের সঙ্গে বেশি মেলে। দেখা হওয়া ও মিশে যাওয়ার জন্য ১০ লাখ বছর অনেক দীর্ঘ সময়।
আপাতত সবচেয়ে সতর্ক ব্যাখ্যা হলো, ইউনশিয়ান ২ বড় মস্তিষ্ক ও চ্যাপ্টা মুখমণ্ডলবিশিষ্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ এশীয় বংশধারার আদি পর্যায়কে তুলে ধরে; এই বংশধারায় সম্ভবত ডেনিসোভানরাও অন্তর্ভুক্ত। গবেষণাটিতে বলা হয়েছে, এই বংশধারা আধুনিক মানুষের দিকে যাওয়া বংশধারা থেকে ১০ লাখ বছরেরও আগে পৃথক হয়েছিল। বিভাজনটি আফ্রিকা, পশ্চিম এশিয়া নাকি বিস্তৃত কোনো অঞ্চলে ঘটেছিল, তা ভবিষ্যতের আবিষ্কার দিয়ে যাচাই করতে হবে। নির্ভরযোগ্যভাবে বয়স নির্ধারণ ও পুনর্গঠন করা যায়—এমন প্রতিটি নতুন করোটি বা চোয়াল আবারও চিত্রটি বদলে দিতে পারে।
মূল বিষয়গুলো
- মধ্য চীনে পাওয়া ইউনশিয়ান ২ করোটির ভার্চুয়াল পুনর্গঠনে এটিকে হোমো লংগি গোষ্ঠীর গোড়ার কাছাকাছি স্থাপন করা হয়েছে; এই গোষ্ঠীতে সম্ভবত ডেনিসোভানরা অন্তর্ভুক্ত।
- জীবাশ্মটির বয়স ৯ লাখ ৪০ হাজার থেকে ১১ লাখ বছরের মধ্যে। এশিয়ায় পাওয়া আধুনিক মানুষের মতো মস্তিষ্কের খুলি-আকারবিশিষ্ট সবচেয়ে প্রাচীন করোটিগুলোর মধ্যে এটি একটি।
- শতাধিক জীবাশ্মের নতুন বিশ্লেষণে ইঙ্গিত মেলে, প্রায় ১৩ লাখ ৮০ হাজার বছর আগে নিয়ান্ডারথালদের শাখা আলাদা হয়েছিল এবং প্রায় ১৩ লাখ ২০ হাজার বছর আগে লংগি ও স্যাপিয়েন্স বংশধারা পৃথক হয়েছিল।
- গবেষণায় বলা হয়েছে, নিয়ান্ডারথালদের তুলনায় ডেনিসোভানরা হোমো স্যাপিয়েন্সের বেশি কাছাকাছি—যা প্রচলিত জিনগত মডেলকে চ্যালেঞ্জ করে।
- হারবিন, দালি ও জিনিউশানের মতো মধ্য প্লেইস্টোসিন যুগের এশীয় জীবাশ্ম লংগি গোষ্ঠীর সঙ্গে মেলে, যা দীর্ঘদিনের শ্রেণিবিন্যাস-সংক্রান্ত সমস্যার সমাধানে সহায়তা করে।
- বিশেষজ্ঞরা পুনর্গঠনকে স্বাগত জানিয়েছেন, তবে বলেছেন, সুদূর অতীতের বিভাজনের সময়কাল নিশ্চিত করতে জিনগত বা প্রোটিনের প্রমাণ এবং আরও জীবাশ্ম প্রয়োজন।
- ফলাফল আফ্রিকায় পাওয়া সর্বজনস্বীকৃত সবচেয়ে প্রাচীন হোমো স্যাপিয়েন্স জীবাশ্মের সময়কাল বদলায় না; তবে মানববংশের আরও গভীর বিভাজনকে ১০ লাখ বছরেরও বেশি পেছনে ঠেলে দেয়।
- ২০২২ সালে আবিষ্কৃত ইউনশিয়ানের তৃতীয় করোটি এবং আফ্রিকা ও এশিয়ায় ভবিষ্যতের আবিষ্কার প্রস্তাবিত বংশবিকাশের বৃক্ষ যাচাই ও পরিমার্জনে সহায়তা করতে পারে।






