জাপানের শৃঙ্গগুলোতে একাকিত্বের টানে কেন বাড়ছে ভিড়
জাপানে একাকী পর্বতারোহণ এখন আর সীমিত গণ্ডির বিষয় নয়, বরং জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সূর্যোদয়ের সময় চূড়ায় পৌঁছানোর ভিডিও, সরঞ্জাম নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা এবং নিরিবিলি ক্যাম্পসাইটের দৃশ্য ভরপুর। এসব কনটেন্ট পাহাড়ে একা থাকার স্বাধীনতাকে তুলে ধরে। আগ্রহের এই উত্থানের পেছনে রয়েছে উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান। ন্যাশনাল পুলিশ এজেন্সির তথ্য বলছে, বিপদে পড়া মানুষের বড় একটি অংশ এখন একাকী পর্বতারোহী; দলবদ্ধভাবে চলা ব্যক্তিদের তুলনায় তাঁদের মৃত্যুহারও বেশি। ২০২৩ সালে দুর্ঘটনার সংখ্যা রেকর্ড ছাড়ায় এবং ২০২৪ সালেও তা উচ্চ পর্যায়ে ছিল। এর পেছনে যেমন বাইরের পরিবেশে ঘোরাফেরার ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে, তেমনি রয়েছে প্রতিরোধযোগ্য দুর্ঘটনার ধারাবাহিকতা। ফুজি পর্বতসহ জনপ্রিয় অন্য শৃঙ্গগুলোতে দুর্ঘটনার খবর বেড়েছে। মৌসুমের শুরুতে একা ওঠা ব্যক্তিদের মৃত্যুর একাধিক ঘটনাও ঘটেছে। ঝুঁকি সত্ত্বেও অনেকে নিজেদের গতিতে চলা, মনোযোগ ধরে রাখা এবং আত্মনির্ভরতার অনুভূতির জন্য একা হাইকিং বেছে নেন। এই প্রতিবেদনে দেখা হয়েছে, কেন এই অভিজ্ঞতা আকর্ষণীয়, পরিসংখ্যানে কী উঠে এসেছে, কোথায় ঝুঁকি বাড়ে এবং কীভাবে নিরাপদ একাকী ভ্রমণের পরিকল্পনা করা যায়।
সূচিপত্র
- জাপানের শৃঙ্গগুলোতে একাকিত্বের টানে কেন বাড়ছে ভিড়
- কারা একা পর্বতারোহণ বেছে নিচ্ছেন, কেন
- একজন উল্লেখযোগ্য একাকী কনটেন্ট নির্মাতার পরিচিতি
- ঝুঁকি নিয়ে পরিসংখ্যান কী বলছে
- একা চলা বনাম দলবদ্ধ যাত্রা: পরিণতিতে স্পষ্ট ব্যবধান
- চাপের মুখে ফুজি পর্বত ও অন্যান্য জনপ্রিয় শৃঙ্গ
- কোথায় একা চলার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি
- নতুন গবেষণায় কী ইঙ্গিত মিলছে
- নিরাপদ সীমার মধ্যে একাকী ভ্রমণ রাখতে প্রস্তুতি
- কনটেন্ট নির্মাতা ও দায়িত্ব
- মূল বিষয়গুলো
কারা একা পর্বতারোহণ বেছে নিচ্ছেন, কেন
এর মূল আকর্ষণ সহজ: অনেকে ভিড় থেকে দূরে নিরিবিলি ও নিজের মতো করে দিন কাটাতে চান। একা ভ্রমণে হাইকার নিজের গতি ঠিক করতে পারেন, আলোচনা ছাড়াই পরিকল্পনা বদলাতে পারেন এবং বিশাল প্রাকৃতিক পরিবেশে নিজের ভাবনার সঙ্গে সময় কাটাতে পারেন। কারও কাছে এই একাকিত্ব মানসিক প্রশান্তি আনে। অন্যদের কাছে এটি বিচারবুদ্ধি ও দক্ষতার পরীক্ষা। মহামারির সময় ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শ এড়িয়ে বাইরের পরিবেশে করা যায় এমন কর্মকাণ্ডের প্রতি আগ্রহ দ্রুত বেড়ে যায়। এতে শহরের কাছের পাহাড়ে এবং যাত্রীবাহী রেলপথে সহজে যাওয়া যায় এমন এলাকায় নতুনদের আনাগোনা বাড়ে। একই সময়ে নিচু পাহাড়ে হাইকিং জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। অল্প সময়ের চূড়া-আরোহণ, পর্বতশিরা ধরে হাঁটা এবং বনের পথ ঘুরে আসার মতো ভ্রমণ জনপ্রিয় হয়; অনেকেই যেকোনো মূল্যে চূড়ায় পৌঁছানোর বদলে যাত্রাপথকে বেশি গুরুত্ব দেন।
একজন উল্লেখযোগ্য একাকী কনটেন্ট নির্মাতার পরিচিতি
এই ধারার পরিচিত মুখদের একজন মারিয়া। জাপানি এই কনটেন্ট নির্মাতার প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার গ্রাহক রয়েছে। তিনি জাপানের নর্দার্ন আল্পস থেকে শুরু করে বিদেশের মন ব্লাঁর মতো উঁচু শৃঙ্গ পর্যন্ত একাকী ভ্রমণের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। গুয়াতেমালায় অল্পের জন্য বড় বিপদ এড়ানোর পর তিনি বুঝতে পারেন, ছোট ছোট ভুল কত সহজে একের পর এক বড় হয়ে উঠতে পারে। এখন তিনি পদ্ধতিগতভাবে পরিকল্পনা করেন, অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে রাত কাটাতে হলে যা দরকার তা সঙ্গে রাখেন এবং প্রতিটি যাত্রাকে টিকে থাকার অনুশীলন হিসেবে দেখেন। ভিডিও ও লেখায় তিনি যেমন তৃপ্তির কথা বলেন, তেমনি ভয়ের কথাও তুলে ধরেন। সরঞ্জাম, আবহাওয়া, পথ খুঁজে নেওয়া ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিয়ে চেকলিস্টও প্রকাশ করেন। তাঁর বার্তা বরাবরই এক: প্রস্তুতি নেওয়া, শরীর ও আবহাওয়ার প্রাথমিক সতর্কসংকেত খেয়াল করা এবং ফেরার পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগেই ফিরে আসা—এই অভ্যাসগুলোই একাকী আরোহণকে বেপরোয়া না করে আনন্দদায়ক করে তোলে।
ঝুঁকি নিয়ে পরিসংখ্যান কী বলছে
পুলিশের পরিসংখ্যানে সমস্যার ব্যাপকতা স্পষ্ট। ২০২৩ সালে জাপানে হাইকিং ও পর্বতারোহণে ৩,১২৬টি দুর্ঘটনা নথিভুক্ত হয়, যা রেকর্ডে এক বছরে সর্বোচ্চ। বিপদে পড়েন ৩,৫৬৮ জন; তাঁদের মধ্যে ৩৩৫ জন নিহত বা নিখোঁজ হন এবং ১,৪০০ জন আহত হন। পরের বছর পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও দুর্ঘটনার সংখ্যা উচ্চ পর্যায়ে ছিল। ২০২৪ সালে ২,৯৪৬টি দুর্ঘটনায় জড়িত ছিলেন ৩,৩৫৭ জন। তাঁদের মধ্যে ৩০০ জন নিহত বা নিখোঁজ হন এবং ১,৩৯০ জন আহত হন। এদের বড় একটি অংশ ছিলেন একাকী হাইকার। ২০২৪ সালে পাহাড়ে দুর্ঘটনায় জড়িতদের প্রায় ৩৯.১ শতাংশ ছিলেন একা চলা পর্বতারোহী; দলবদ্ধভাবে চলা ব্যক্তিদের তুলনায় তাঁদের মৃত্যুহারও বেশি। উদ্ধারকাজে ব্যবহৃত একটি প্রধান অবস্থান-শনাক্তকরণ সেবার মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতাও এই পরিসংখ্যানের সঙ্গে মেলে। পর্বতারোহীদের ব্যবহৃত সদস্যভিত্তিক অবস্থান শনাক্তকরণ ব্যবস্থা কোকোহেলির তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজ বা আহত ব্যক্তিকে খুঁজে বের করার জন্য করা কলের তিন-চতুর্থাংশেরও বেশি ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি একা বেরিয়েছিলেন।
বয়সও ধারাবাহিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। প্রতি বছর বিপদে পড়া ব্যক্তিদের মধ্যে ষাট ও সত্তরের কোঠায় থাকা মানুষের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। নিহত বা নিখোঁজ ব্যক্তিদের ৭০ শতাংশের বেশি বয়স ৬০ বা তার ঊর্ধ্বে। এর কারণ বিভিন্ন। বয়স বাড়লে ভারসাম্য, প্রতিক্রিয়ার সময় এবং সেরে ওঠার ক্ষমতা কমতে পারে। যৌবনে পরিচিত পথও সহজ মনে হলেও সেখানে প্রকৃত বিপদ থাকতে পারে। খাড়া বা পিচ্ছিল পথে সামান্য পা পিছলেও গুরুতর পতন ঘটতে পারে। বর্তমান শারীরিক সক্ষমতা ও কৌশলগত দক্ষতার মধ্যে ভ্রমণের লক্ষ্য সীমিত রাখা এবং সময়ের চাপ এড়ানো সব বয়সের মানুষের ঝুঁকি কমায়।
দুর্ঘটনার স্থান ও কারণেও স্পষ্ট কিছু ধরন দেখা যায়। ২০২৪ সালে নাগানোতে পাহাড়-সংশ্লিষ্ট দুর্ঘটনা ছিল সবচেয়ে বেশি, ৩২১টি। এরপর ছিল হোক্কাইডোতে ১৮৯টি এবং টোকিও ও কানাগাওয়ায় ১৮৩টি করে। পর্যটকদের জনপ্রিয় শৃঙ্গগুলোতে দুর্ঘটনা দ্রুত বেড়েছে। ২০২৪ সালে ফুজি পর্বতে দুর্ঘটনায় জড়িত ছিলেন ৮৩ জন, যা পাঁচ বছরের গড়ের তুলনায় ৬২ শতাংশ বেশি। তাকাও পর্বতে এ সংখ্যা ছিল ১৩১, যা একই গড়ের চেয়ে ৫২ শতাংশ বেশি। দুর্ঘটনার কারণের তালিকায় ৩০.৪ শতাংশ নিয়ে পথ হারানো ছিল শীর্ষে। এরপর পাহাড় থেকে পড়ে যাওয়া ২০.০ শতাংশ, পা পিছলে পড়া ১৭.২ শতাংশ, ক্লান্তি ১০.২ শতাংশ এবং অসুস্থতা ৭.৬ শতাংশ। পরিসংখ্যানে বিদেশি পর্যটকদের উপস্থিতিও বাড়ছে। ২০২৪ সালে ৯৯টি দুর্ঘটনায় ১৩৫ জন জড়িত ছিলেন; তাঁদের মধ্যে সাতজন নিহত বা নিখোঁজ হন।
একা চলা বনাম দলবদ্ধ যাত্রা: পরিণতিতে স্পষ্ট ব্যবধান
সাম্প্রতিক বছরগুলোর ন্যাশনাল পুলিশ এজেন্সির পরিসংখ্যানে পরিণতির এই পার্থক্য স্পষ্ট। ২০১৯ সালের তথ্য অনুযায়ী, দলবদ্ধভাবে চলার সময় বিপদে পড়া ব্যক্তিদের ৬.৫ শতাংশ নিহত বা নিখোঁজ হয়েছিলেন। একা চলা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই হার বেড়ে দাঁড়ায় ১৬.১ শতাংশে। এরপর মোট সংখ্যা বদলালেও ধরনটি প্রায় একই রয়েছে। একজন সঙ্গী বা ছোট একটি দল সঙ্গে থাকলে বাড়তি সহায়তার সুযোগ তৈরি হয়। আপনি শান্ত থাকার দিকে মনোযোগ দিলে সঙ্গী সাহায্যের জন্য ফোন করতে পারেন, শরীর অতিরিক্ত ঠান্ডা হওয়া ঠেকাতে পারেন, রক্তপাত বন্ধ করতে পারেন কিংবা পথের খোঁজ রাখতে পারেন। একাকী হাইকারদের পরিকল্পনা ও সরঞ্জামের মধ্যেই এই বাড়তি সহায়তার ব্যবস্থা রাখতে হয়।
চাপের মুখে ফুজি পর্বত ও অন্যান্য জনপ্রিয় শৃঙ্গ
ফুজি পর্বত জাপানের প্রতীক এবং সহজে যাওয়া যায় বলে এমন অনেক মানুষকে আকর্ষণ করে, যাঁরা আগে কখনো গাছের সীমারেখার ওপরে ওঠেননি। আবহাওয়া ভালো থাকলে পথের ঢাল সহজ মনে হতে পারে, কিন্তু পথটি দীর্ঘ ও পাথুরে, উচ্চতা দ্রুত বাড়ে এবং কয়েক মিনিটের মধ্যেই বাতাস ও তাপমাত্রা বদলে যেতে পারে। ২০২৪ সালের আরোহণ মৌসুমের শুরুতে, দক্ষিণ পাশের পথগুলো খুলে দেওয়ার প্রথম সপ্তাহেই শিজুওকা প্রিফেকচারের পুলিশ চারজনের মৃত্যুর খবর জানায়। তাঁদের সবাই একা আরোহণ করছিলেন বলে ধারণা করা হয়। স্থানীয় কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলেন, অন্তত একজন সঙ্গী নিয়ে আরোহণ করা অনেক বেশি নিরাপদ। কিছু ভুল হলে সঙ্গী দ্রুত সাহায্যের জন্য ফোন করতে পারেন।
ফুজিতে আরোহণের নিরাপত্তা-নির্দেশনা স্পষ্ট। সরকারি আরোহণ-তথ্যবিষয়ক ওয়েবসাইটে সতর্ক করা হয়েছে, এই পাহাড় সহজ নয়; শারীরিক সক্ষমতা ও জ্ঞান না থাকলে একা ওঠা ঝুঁকিপূর্ণ। সূর্যোদয় দেখার জন্য রাতভর দ্রুত চূড়ায় ওঠার বিরুদ্ধেও সতর্ক করা হয়েছে। এই পদ্ধতিকে কখনো কখনো ‘বুলেট ক্লাইম্বিং’ বলা হয়। নতুনদের সঙ্গে কথা বলার সময় অনেক গাইড ও পাহাড়ি আশ্রয়কেন্দ্রের কর্মীরাও একই ধরনের পরামর্শ দেন।
ফুজি একটি উঁচু পর্বত। শারীরিক সক্ষমতা বা পর্বতারোহণের জ্ঞান না থাকলে একা আরোহণ এড়িয়ে চলুন।
বুলেট ক্লাইম্বিং সুপারিশ করা হয় না।
ফুজি পর্বতের ওয়েবসাইটে আরও বলা হয়েছে, আগ্নেয়গিরিটির উপরিভাগ আলগা ল্যাপিলাসের স্তরে গঠিত। পায়ের নিচে এবং ওপর থেকে পাথর আলগা হয়ে পড়তে পারে। অনেক অংশেই পাথর গড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি সবসময় থাকে। হাইকারদের হেলমেট পরতে, পাথর পড়ার ঝুঁকি কম এমন জায়গায় বিশ্রাম নিতে এবং নিজের কারণে পাথর গড়ালে বা তা চোখে পড়লে “রাকু” (পাথর পড়ছে) অথবা “রকস” বলে চিৎকার করে অন্যদের সতর্ক করতে বলা হয়েছে। আঘাত বা পথ হারানোর ঝুঁকি কমাতে দিনের আলোয় চলা এবং চিহ্নিত পথেই থাকার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।
কোথায় একা চলার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি
ছোট ভুলের আশঙ্কা বাড়লে এবং সাহায্য পেতে বেশি সময় লাগলে ঝুঁকিও বাড়ে। আবহাওয়ার আকস্মিক পরিবর্তন, পথ চিনতে ভুল, ভেজা পাথরে পিছলে পড়া কিংবা দলের সব সরঞ্জাম একা বহনের কারণে অতিরিক্ত ক্লান্তির ঝুঁকি একাকী হাইকারদের বেশি। ব্যস্ত পথ এবং সময়ের চাপ থাকায় বিকেল ও ছুটির দিনে দুর্ঘটনা বাড়ে। কুয়াশা বা তুষারে দৃশ্যমানতা কমে গেলে পথ খুঁজে নেওয়া আরও কঠিন হয়; অল্প দূরের পথচ্যুতিও তখন দীর্ঘ সময় ধরে চিহ্নিত পথের বাইরে হাঁটার কারণ হতে পারে। কোনো পথ শুরুস্থল বা পাহাড়ি আশ্রয়কেন্দ্র থেকে যত দূরে, সময়মতো ফিরে আসার সিদ্ধান্ত তত বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
নতুন গবেষণায় কী ইঙ্গিত মিলছে
সোফিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা ২০২৫ সালে এমন একটি মডেল তৈরি করেন, যা নাগানোতে দুর্ঘটনার ধরন অনুমান করতে আরোহণের আগের তথ্য ব্যবহার করে। গবেষক দলটি ২০১৪ থেকে ২০২৩ সালের ২,৫৯৬টি দুর্ঘটনার তথ্য দিয়ে একটি ভাষা মডেলকে প্রশিক্ষণ দেয়। মডেলটি ঝুঁকিকে চারটি শ্রেণিতে ভাগ করে: উচ্চতা থেকে পড়ে যাওয়া, ভূমিতে পড়ে যাওয়া, ক্লান্তি এবং পথ হারিয়ে দিশা না পাওয়া। দিনের সময়, পাহাড়ের অবস্থান, আবহাওয়া ও পর্বতারোহীর পরিচিতির মতো প্রেক্ষাপট এতে বিবেচনা করা হয়। উচ্চতা থেকে পড়ে যাওয়া এবং পথ হারিয়ে দিশা না পাওয়া—এই দুই ধরনের দুর্ঘটনার পূর্বাভাস ৬০ শতাংশের বেশি নির্ভুল ছিল। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পূর্বাভাস-উপাদানগুলো সহজেই ব্যাখ্যা করা যায়। সকালে এবং নির্দিষ্ট কিছু শৃঙ্গে উচ্চতা থেকে পড়ে যাওয়ার ঘটনা বেশি দেখা গেছে। কিছু পর্বতশ্রেণিতে দুপুরের দিকে ভূমিতে পড়ে যাওয়ার ঘটনা বেশি ঘটেছে। বয়স্ক পর্বতারোহী ও বিকেলের শেষ ভাগের সঙ্গে ক্লান্তির যোগসূত্র বেশি ছিল। দৃশ্যমানতা কম থাকলে এবং একা হাইকিং করলে পথ হারানোর ঝুঁকি বেড়েছে। গবেষকদের ধারণা, এই পদ্ধতি ব্যবহার করে পরিকল্পনার সময় ব্যক্তিগত ঝুঁকি যাচাইয়ের কার্যকর সরঞ্জাম তৈরি করা সম্ভব। এটি প্রশিক্ষণ বা বিচারবুদ্ধির বিকল্প নয়, তবে ভবিষ্যতের অ্যাপগুলো ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত থেকে উদ্ধার-সহায়তার ফোনে পৌঁছানোর আগেই হাইকারদের সতর্ক করতে পারে বলে ইঙ্গিত দেয়।
নিরাপদ সীমার মধ্যে একাকী ভ্রমণ রাখতে প্রস্তুতি
সাধারণ কিছু অভ্যাসে একাকী ভ্রমণের অনেক দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব। সবচেয়ে কার্যকর উদ্ধারকাজ হলো যে উদ্ধারকাজের দরকারই পড়ে না। একটি প্রধান অবস্থান-শনাক্তকরণ সেবার তথ্য অনুযায়ী, অনুসন্ধানের জন্য করা কলের ৭৬ শতাংশের বেশি একাকী হাইকারদের ক্ষেত্রে আসে। সতর্ক পরিকল্পনা, সংযত লক্ষ্য এবং পথনির্দেশ ও যোগাযোগের বিকল্প ব্যবস্থা রাখলে এ সংখ্যা কমতে পারে। নিচের পদক্ষেপগুলো দুর্ঘটনার সবচেয়ে সাধারণ কারণগুলো মোকাবিলা করে।
- বর্তমান শারীরিক সক্ষমতা ও দক্ষতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে লক্ষ্য ঠিক করুন। জটিল পথে বা দীর্ঘ ভ্রমণে যাওয়ার আগে ছোট পথ ও সহজ ভূখণ্ডে অভিজ্ঞতা বাড়ান।
- পথের পরিকল্পনা করুন এবং তা অন্যদের জানান। কোথায় যাচ্ছেন ও কখন ফিরবেন, পরিবারের সদস্য বা বন্ধুকে বলুন। সুবিধা থাকলে পথের শুরুতে থাকা ডাকবাক্সে কাগজে লেখা পরিকল্পনা রেখে যান।
- বাতাস, তাপমাত্রা ও মেঘের উচ্চতাসহ পুরো আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখুন। কখন ফিরে আসবেন তা আগেই ঠিক করুন এবং সেই সময় মেনে চলুন।
- দিনের আলোকে অগ্রাধিকার দিন। দিনের শেষ ভাগে ক্লান্তি ও পথ চিনতে ভুল এড়াতে সকালে রওনা দিন। অভিজ্ঞতা ও উপযুক্ত সরঞ্জাম না থাকলে রাতে চূড়ায় ওঠা এড়িয়ে চলুন।
- সূর্যোদয় দেখার জন্য ফুজিতে সারারাত চূড়ার দিকে হাঁটা এড়িয়ে চলুন। ভোরে চূড়ায় পৌঁছানোই লক্ষ্য হলে কোনো আশ্রয়কেন্দ্রে রাত কাটান।
- প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সঙ্গে রাখুন: গরম রাখার পোশাকের স্তর, জলরোধী বাইরের পোশাক, দস্তানা ও টুপি, অতিরিক্ত ব্যাটারিসহ হেডল্যাম্প, মানচিত্র ও কম্পাস, চার্জ করা ফোন ও পাওয়ার ব্যাংক, অফলাইন মানচিত্রসহ জিপিএস অ্যাপ, বাঁশি, প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জাম এবং পাথর পড়ার ঝুঁকিপূর্ণ পথে হেলমেট। ভূমি ও মৌসুম অনুযায়ী উপযুক্ত জুতা পরুন।
- পথের চিহ্ন মেনে চলুন। চিহ্নিত পথেই থাকুন। অবস্থান নিয়মিত যাচাই করুন, যাতে ছোট ভুল বড় না হয়।
- যোগাযোগের বিকল্প ব্যবস্থা রাখুন। বিশ্বস্ত কারও সঙ্গে নিজের অবস্থান ভাগ করুন। সেলফোনের নেটওয়ার্ক দুর্বল এলাকায় কোকোহেলির মতো অবস্থান শনাক্তকারী যন্ত্র, বিপদসংকেত পাঠানোর যন্ত্র বা স্যাটেলাইট মেসেঞ্জার সঙ্গে রাখুন।
- উচ্চতা ও আবহাওয়াজনিত উপসর্গ খেয়াল করুন। মাথাব্যথা, বমিভাব বা মাথা ঘোরা শুরু হলে গতি কমান, পানি পান করুন এবং নিচে নেমে আসুন। বাতাস ও মেঘ দ্রুত বাড়লেও একই পদক্ষেপ নিন।
- যতক্ষণ বাইরে থাকার পরিকল্পনা, তার চেয়ে বেশি সময়ের জন্য খাবার ও পানি সঙ্গে নিন। হালকা জরুরি আশ্রয়সামগ্রী থাকলে দীর্ঘ অপেক্ষা সামলানো সহজ হয়।
- যে এলাকায় যাওয়ার পরিকল্পনা করেছেন, সেখানে মৌসুমি বিপদ সম্পর্কে জেনে নিন। নিচু শৃঙ্গেও তুষার, বরফ ও ভারী বৃষ্টিতে পথের অবস্থা বদলে যায়।
- কখন থামতে হবে তা জানুন। ফিরে আসাও একটি দক্ষতা। সামনে আরও দিন আসবে।
দূরবর্তী বা কারিগরিভাবে কঠিন পথে বিশেষ করে দলবদ্ধভাবে চললে বাড়তি সহায়তা পাওয়া যায়। যাঁরা একা ভ্রমণ পছন্দ করেন, দক্ষতা বাড়া পর্যন্ত তাঁদের সংযত লক্ষ্য বেছে নেওয়া উচিত। পথনির্দেশ, খাড়া ভূখণ্ডে চলাচল এবং ঝুঁকি মূল্যায়ন শেখার জন্য পর্বতারোহণ ক্লাব বা গাইড সেবার প্রশিক্ষণ নেওয়া যেতে পারে।
কনটেন্ট নির্মাতা ও দায়িত্ব
মিডিয়া মানুষের প্রত্যাশাকে প্রভাবিত করে। প্রস্তুতির কথা বাদ দিয়ে তৈরি করা সদুদ্দেশ্যপূর্ণ ভিডিওও কঠিন পথকে সহজসাধ্য বলে মনে করাতে পারে। সবচেয়ে কার্যকর কনটেন্ট নির্মাতারা অনুপ্রেরণার পাশাপাশি শেখার বিষয়ও তুলে ধরেন। মারিয়া এবং জাপানের আরও অনেক একাকী হাইকার এখন চেকলিস্ট, আবহাওয়া বিশ্লেষণ এবং সাফল্যের পাশাপাশি ভুলের পর্যালোচনাও প্রকাশ করেন। এই উপস্থাপনাভঙ্গি গুরুত্বপূর্ণ। এতে নতুনরা বুঝতে পারেন, সিদ্ধান্ত নেওয়া ও প্রস্তুতি ভ্রমণের আনন্দেরই অংশ, শুধু চূড়ায় তোলা ছবিই সব নয়। প্রতিটি গন্তব্যের পোস্টে স্পষ্ট নিরাপত্তা-তথ্য দিয়ে এবং আকর্ষণীয় ছবি তোলার জন্য পথ ছেড়ে শর্টকাট নেওয়ার মতো ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ নিরুৎসাহিত করে ব্র্যান্ড, পর্যটন দপ্তর ও কনটেন্ট নির্মাতারাও এই বার্তা জোরদার করতে পারেন।
মূল বিষয়গুলো
- একাকিত্বের আকর্ষণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং মহামারির পর বাইরের পরিবেশে ঘোরাফেরার ব্যাপক জনপ্রিয়তার কারণে জাপানে একাকী পর্বতারোহণ বাড়ছে।
- ন্যাশনাল পুলিশ এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ৩,১২৬টি দুর্ঘটনা ঘটে, যা রেকর্ড। ২০২৪ সালে ৩,৩৫৭ জন জড়িত ছিলেন এমন দুর্ঘটনা ছিল ২,৯৪৬টি।
- ২০২৪ সালে পাহাড়ে দুর্ঘটনায় জড়িতদের প্রায় ৩৯.১ শতাংশ ছিলেন একাকী হাইকার; দলবদ্ধ ব্যক্তিদের তুলনায় তাঁদের মৃত্যুহার বেশি।
- দুর্ঘটনার কারণের তালিকায় পথ হারানো সবার ওপরে, এরপর রয়েছে পড়ে যাওয়া ও পিছলে যাওয়া। বিপদে পড়া এবং নিহত বা নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে বয়স্ক পর্বতারোহীদের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি।
- ২০২৪ সালে নাগানোতে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটে। পাঁচ বছরের গড়ের তুলনায় ফুজি ও তাকাও পর্বতের মতো পর্যটন-আকর্ষণীয় শৃঙ্গে দুর্ঘটনা অনেক বেড়েছে।
- ২০২৪ সালের আরোহণ মৌসুমের শুরুতে শিজুওকা প্রিফেকচারের পুলিশ ফুজি পর্বতে একাধিক মৃত্যুর খবর জানায়। নিহতদের সবাই একা আরোহণ করছিলেন বলে ধারণা করা হয়।
- ফুজি পর্বতের সরকারি ওয়েবসাইটে শারীরিক সক্ষমতা বা জ্ঞান না থাকলে একা আরোহণ এড়াতে বলা হয়েছে। বুলেট ক্লাইম্বিং নামে পরিচিত রাতভর চূড়ায় ওঠার বিরুদ্ধেও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
- সোফিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন গবেষণায় দৃশ্যমানতা কম থাকলে একাকী হাইকিংয়ের সঙ্গে পথ হারিয়ে দিশা না পাওয়ার যোগসূত্র পাওয়া গেছে। ভ্রমণের আগে ব্যক্তিগত ঝুঁকি যাচাইয়ের সম্ভাবনাও এতে উঠে এসেছে।
- স্পষ্ট পরিকল্পনা ঝুঁকি কমায়: পথের পরিকল্পনা অন্যদের জানান, আবহাওয়া দেখুন, রাতে আরোহণ এড়িয়ে চলুন, উপযুক্ত সরঞ্জাম সঙ্গে নিন, অবস্থান ভাগাভাগি বা সংকেত পাঠানোর যন্ত্র ব্যবহার করুন এবং পরিস্থিতির অবনতি হলে আগেভাগেই ফিরে আসুন।






