কোরিয়ার অত্যন্ত দক্ষ সৌর পাতনযন্ত্র
দক্ষিণ কোরিয়ার উলসান ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির (ইউএনআইএসটি) একটি গবেষক দল সৌরশক্তিচালিত একটি লবণমুক্তকরণ যন্ত্র তৈরি করেছে। তাদের হিসাবে, সূর্যালোকের একক মানে প্রতি বর্গমিটারে ঘণ্টায় ৩.৪ লিটার পানি বাষ্পীভূত করতে পারে যন্ত্রটি। প্রোটোটাইপটি বাইরের কোনো বিদ্যুৎ ছাড়াই সূর্যালোক ও La0.7Sr0.3MnO3 নামের উন্নত ফোটোথার্মাল উপাদান ব্যবহার করে সমুদ্রের পানিকে পানযোগ্য পানিতে রূপান্তর করে। সৌর লবণমুক্তকরণের অন্যতম কঠিন সমস্যারও সমাধান করে যন্ত্রটি: বাষ্পীভবন পৃষ্ঠে লবণ জমে আলো আটকে দেয় এবং কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়। দ্রবীভূত লবণকে উত্তপ্ত কেন্দ্র থেকে সরিয়ে কিনারার দিকে চালিত করে এই ব্যবস্থা দীর্ঘ সময় কাজ করতে পারে এবং এমন বিশুদ্ধ জলীয় বাষ্প তৈরি করে, যা ঘনীভূত করে তরলে রূপান্তর করা যায়।
সূচিপত্র
- কোরিয়ার অত্যন্ত দক্ষ সৌর পাতনযন্ত্র
- যন্ত্রটি যেভাবে কাজ করে
- La0.7Sr0.3MnO3 উপাদানটি কেন উল্লেখযোগ্য
- লবণের সমস্যা মোকাবিলা
- প্রেক্ষাপটে কার্যক্ষমতার পরিসংখ্যান
- প্রচলিত লবণমুক্তকরণ পদ্ধতির সঙ্গে তুলনা
- ব্যবহারের ক্ষেত্র ও স্থাপনের উপায়
- বড় পরিসরে উৎপাদন ও প্রকৌশলগত চ্যালেঞ্জ
- জলবায়ু ও টেকসইতার বিবেচনা
- জেনে রাখা দরকার
ইউএনআইএসটির স্কুল অব এনার্জি অ্যান্ড কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক জি হিউন জাংয়ের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণাটিতে সাধারণ কাগজভিত্তিক পানি শোষণকারী কাঠামোর সঙ্গে উচ্চ দক্ষতার ফোটোথার্মাল পৃষ্ঠ যুক্ত করা হয়েছে। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে Advanced Energy Materials সাময়িকীতে। স্থায়িত্ব পরীক্ষায় ২০ শতাংশ লবণযুক্ত ঘন লবণপানিতে যন্ত্রটি দুই সপ্তাহ স্থিতিশীলভাবে কাজ করেছে, যা সাধারণ সমুদ্রের পানির ৩.৫ শতাংশ লবণাক্ততার চেয়ে অনেক বেশি। গবেষক দলের ভাষ্য, একই নকশা সম্পদ পুনরুদ্ধারেও কাজে লাগতে পারে। ঘন লবণপানি সমুদ্রে ফেলে দেওয়ার বদলে কিনারায় লবণ স্ফটিকায়িত করে সংগ্রহ করা যাবে।
আরও বেশি অঞ্চলে পানির সংকট দেখা দেওয়ায় নিষ্ক্রিয় সৌর লবণমুক্তকরণে আগ্রহ বাড়ছে। নিরাপদভাবে ব্যবস্থাপিত পানীয় জল নিয়মিত পাওয়ার সুযোগ নেই কোটি কোটি মানুষের; উপকূলীয় জনপদগুলোও প্রায়ই ডিজেলচালিত রিভার্স অসমোসিস কারখানার ওপর নির্ভর করে, যেগুলো চালাতে খরচ বেশি এবং প্রচুর ঘন লবণপানি তৈরি হয়। অল্প রক্ষণাবেক্ষণে ও বিদ্যুৎ গ্রিড ছাড়াই কেবল সূর্যালোক ব্যবহার করে মিঠা পানি তৈরি করতে পারে এমন মডিউলার ব্যবস্থা প্রত্যন্ত গ্রাম, দ্বীপ, খামার ও দুর্যোগ-পরবর্তী ত্রাণকাজের গুরুত্বপূর্ণ চাহিদা মেটাতে পারে। ইউএনআইএসটির যন্ত্রটি সেই প্রয়োজনকে সরাসরি লক্ষ্য করেছে: বড় অবকাঠামোর বদলে সহজ উপকরণ, বুদ্ধিদীপ্ত নকশা ও সূর্যালোক ব্যবহার করে।
যন্ত্রটি যেভাবে কাজ করে
ইউএনআইএসটির নকশায় পানি শোষণকারী কাগজ দিয়ে তৈরি বিশেষ উল্টো ইংরেজি L-আকৃতির বাষ্পীভবন কাঠামো ব্যবহার করা হয়েছে। কাগজটি লিটমাস কাগজের মতো কাজ করে এবং কৈশিক ক্রিয়ায় সমুদ্রের পানিকে ওপরের দিকে টেনে তোলে। উল্লম্ব অংশের শীর্ষে রয়েছে La0.7Sr0.3MnO3 দিয়ে তৈরি আলো শোষণকারী ফোটোথার্মাল স্তর। এটি একধরনের পেরোভস্কাইট অক্সাইড, যা সূর্যালোককে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে তাপে রূপান্তর করে। সমুদ্রের পানি এই উত্তপ্ত পৃষ্ঠে পৌঁছালে দ্রুত বাষ্পীভূত হয় এবং লবণ পেছনে থেকে যায়। এরপর জলীয় বাষ্প অপেক্ষাকৃত শীতল পৃষ্ঠে গিয়ে ঘনীভূত হয় এবং তরল মিঠা পানি হিসেবে সংগ্রহ করা হয়।
এ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো প্রবাহের দিক। উত্তপ্ত পৃষ্ঠজুড়ে একমুখী তরল প্রবাহ তৈরি করে গবেষক দল লবণের ঘনত্বে একটি ঢাল তৈরি করেছে। দ্রবীভূত আয়নগুলো পানির সক্রিয়তা কম এমন কিনারার দিকের অঞ্চলে সরে যায় এবং সেখানে কঠিন লবণ হিসেবে স্ফটিকায়িত হয়, ফলে আলো আটকে যায় না। নিজে থেকেই পরিষ্কার হওয়ার এই প্রভাব কেন্দ্রীয় ফোটোথার্মাল অঞ্চলকে সূর্যালোকের জন্য উন্মুক্ত রাখে; একই সঙ্গে কিনারায় লবণ জমা হয়, যা সরানো বা পুনর্ব্যবহার করা যায়। নকশা ও তরল প্রবাহের পথই মূল কাজটি করে, ফলে পাম্প, ঝিল্লি বা ঘন ঘন হাতে পরিষ্কার করার প্রয়োজন কমে।
La0.7Sr0.3MnO3 উপাদানটি কেন উল্লেখযোগ্য
যন্ত্রটির মূল উপাদান La0.7Sr0.3MnO3, সংক্ষেপে যাকে প্রায়ই LSMO বলা হয়। এটি একটি পেরোভস্কাইট অক্সাইড, অর্থাৎ এমন একশ্রেণির উপাদান, যার আলোকীয় ও বৈদ্যুতিক বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রণ করা যায়। সৌরকোষে ব্যবহৃত সিসাভিত্তিক হ্যালাইড পেরোভস্কাইটের মতো নয় LSMO। এতে ল্যান্থানাম, স্ট্রনশিয়াম ও ম্যাঙ্গানিজ রয়েছে; উদ্বায়ী বা বিষাক্ত সিসার ওপর নির্ভর করতে হয় না। ফলে স্থিতিশীলতা ও পরিবেশগত নিরাপত্তা জরুরি এমন পানিসংক্রান্ত কাজে এটি আকর্ষণীয় উপাদান।
সূর্যালোকে উত্তেজিত চার্জবাহী কণাগুলোর সঙ্গে এর আচরণের কারণে LSMO দক্ষ ফোটোথার্মাল রূপান্তরক হিসেবে কাজ করে। সহজভাবে বললে, উপাদানটির ইলেকট্রনিক কাঠামোর মধ্যে ট্র্যাপ স্টেট তৈরি হয়। আলো ইলেকট্রনকে উচ্চতর শক্তিস্তরে তুললে, তাদের অনেকগুলো আলো নির্গত না করেই পুনরায় যুক্ত হয় এবং সরাসরি তাপ হিসেবে শক্তি ছেড়ে দেয়। এই অ-বিকিরণশীল প্রক্রিয়াকে প্রায়ই থার্মালাইজেশন বলা হয়; এর মাধ্যমে আগত সৌরশক্তির বড় একটি অংশ পৃষ্ঠে স্থানীয়ভাবে উৎপন্ন তাপে রূপান্তরিত হয়। দক্ষতার সঙ্গে তাপ নির্গত হওয়ায় তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ে এবং একই পরিমাণ সূর্যালোকে বাষ্পীভবন দ্রুত হয়।
লবণের সমস্যা মোকাবিলা
লবণ জমে যাওয়া দীর্ঘদিন ধরে সৌর লবণমুক্তকরণের অগ্রগতিতে বাধা হয়ে আছে। পানি বাষ্পীভূত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্রবীভূত লবণের ঘনত্ব বাড়ে এবং শেষ পর্যন্ত উত্তপ্ত পৃষ্ঠে স্ফটিক তৈরি হয়। ওই স্ফটিক আলো ছড়িয়ে দেয় ও তাপ সঞ্চালনে বাধা সৃষ্টি করে, ফলে বাষ্পীভবনের হার দ্রুত কমে যায়। আগের অনেক ব্যবস্থা কয়েক ঘণ্টা ভালোভাবে চললেও পরে পরিষ্কার করতে হতো, অথবা লবণ ধুয়ে সরানোর জন্য কাজ থামাতে হতো। ইউএনআইএসটির গবেষক দল জটিল প্রলেপ বা চলমান যন্ত্রাংশের বদলে জ্যামিতিক নকশা ও নিয়ন্ত্রিত প্রবাহ দিয়ে এ সমস্যার সমাধান করছে।
উল্টো L-আকৃতি ও একমুখী প্রবাহের ফলে লবণের একটি স্থিতিশীল ঘনত্ব-ঢাল তৈরি হয়, যা আয়নগুলোকে সবচেয়ে উজ্জ্বল উত্তপ্ত অঞ্চল থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। কিনারায় স্ফটিক তৈরি ও বড় হয়, যেখানে সেগুলো সহজে সংগ্রহ করা যায়। পরীক্ষাগারে দেখা গেছে, মোট দ্রবীভূত লবণের পরিমাণ ২০ শতাংশ এমন অত্যন্ত লবণাক্ত দ্রবণেও যন্ত্রটি দুই সপ্তাহ কাজ করেছে। শিল্পপ্রক্রিয়া থেকে নির্গত ঘন লবণপানিতে সাধারণত লবণের পরিমাণ এমন থাকে, যা খোলা সমুদ্রের পানির চেয়ে অনেক বেশি। এতে বাস্তব পরিবেশে সমুদ্রের পানি ব্যবহারের জন্য বড় কার্যক্ষমতার সুরক্ষা-সীমা এবং ঘন লবণপানি কেন্দ্রীভূত করা ও সম্পদ পুনরুদ্ধারে সম্ভাব্য ব্যবহারের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
প্রেক্ষাপটে কার্যক্ষমতার পরিসংখ্যান
গবেষকেরা সূর্যালোকের একক মানে প্রতি বর্গমিটারে ঘণ্টায় ৩.৪০ কিলোগ্রাম বাষ্পীভবনের হার জানিয়েছেন। একক সূর্যালোক বলতে প্রতি বর্গমিটারে প্রায় এক কিলোওয়াট শক্তির মানদণ্ড পরীক্ষামূলক সূর্যালোক বোঝায়। একই ধরনের পরীক্ষায় অনেক নিষ্ক্রিয় সৌর পাতনযন্ত্র প্রতি বর্গমিটারে ঘণ্টায় প্রায় ০.৩ থেকে ০.৪ কিলোগ্রাম পানি উৎপাদন করে। সে হিসাবে ইউএনআইএসটির প্রোটোটাইপটি আট থেকে দশ গুণ দ্রুত কাজ করে। বাস্তবে দৈনিক পানি উৎপাদন নির্ভর করে সারাদিনের স্থানীয় সূর্যালোক এবং বাষ্পকে তরলে পরিণত করা ঘনীভবন যন্ত্রের দক্ষতার ওপর। কয়েক ঘণ্টা তীব্র রোদ থাকলে, ঘোষিত হারে এক বর্গমিটারের একটি মডিউল থেকে দিনে কয়েক দশ লিটারের মতো পানি পাওয়া যেতে পারে। একাধিক মডিউলের সারি ব্যবহার করলে উৎপাদন আরও বাড়ানো সম্ভব।
বাষ্পীভবনের হার আর সরবরাহ করা পানীয় জলের পরিমাণের পার্থক্য মনে রাখা দরকার। পরীক্ষাগারের পরিমাপে উত্তপ্ত পৃষ্ঠ থেকে প্রতি ঘণ্টায় বাষ্প হিসেবে কত ভর বেরিয়ে যায়, তা মাপা হয়। বাস্তব ব্যবস্থায় তাপক্ষয় কমিয়ে ওই বাষ্পের প্রায় পুরোটাই ধরে পরিষ্কার জলাধারে ঘনীভূত করতে হবে। ভালো ঘনীভবন-যন্ত্রের নকশা, তাপ নিরোধক এবং বাষ্পীভবনের সুপ্ত তাপ পুনর্ব্যবহার করলে পুরো ব্যবস্থার উৎপাদন বাষ্পীভবন যন্ত্রটির হারের কাছাকাছি নেওয়া সম্ভব। স্থিতিশীল উৎপাদনে যন্ত্রটির লবণ জমা প্রতিরোধী আচরণও গুরুত্বপূর্ণ বলে জানিয়েছে ইউএনআইএসটির গবেষক দল। কারণ, পরিষ্কার ফোটোথার্মাল পৃষ্ঠ দীর্ঘ সময় আলো শোষণ ও তাপ উৎপাদন বজায় রাখে।
প্রচলিত লবণমুক্তকরণ পদ্ধতির সঙ্গে তুলনা
আধুনিক লবণমুক্তকরণে রিভার্স অসমোসিসের প্রাধান্য। উচ্চচাপে সমুদ্রের পানিকে সূক্ষ্ম ঝিল্লির মধ্য দিয়ে প্রবাহিত করে শহর ও শিল্পের জন্য প্রচুর মিঠা পানি তৈরি করা হয়। তবে এই কার্যক্ষমতার সঙ্গে কিছু বিনিময় জড়িত। প্রতি ঘনমিটার পানি উৎপাদনে রিভার্স অসমোসিসে কয়েক কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ লাগে, ঝিল্লি রক্ষায় আগে থেকে পানি শোধন করতে হয় এবং ঘন লবণপানি নির্গত হয়, যা দায়িত্বশীলভাবে ব্যবস্থাপনা করা জরুরি। এসব কারখানায় বড় মূলধন বিনিয়োগ লাগে এবং সাধারণত বিদ্যুৎ গ্রিড বা নির্দিষ্ট বিদ্যুৎ উৎসের সঙ্গে যুক্ত থাকতে হয়।
ইউএনআইএসটির নকশার মতো নিষ্ক্রিয় সৌর বাষ্পীভবন যন্ত্রে উচ্চচাপ, পাম্প ও বিপুল বিদ্যুতের প্রয়োজন এড়ানো যায়। প্রতি একক সময়ে ও এলাকায় এতে কম পানি উৎপাদিত হলেও এটি গ্রিডের বাইরে, নীরবে এবং তুলনামূলক সহজ রক্ষণাবেক্ষণে কাজ করতে পারে। লবণ স্ফটিকায়িত করে কিনারায় পাঠানোর ফলে ঘন লবণপানির পরিমাণও কমে। উপযোগী জলবায়ুতে মডিউলার বাষ্পীভবন যন্ত্রের সারি পরিবার, স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা খামারের পানীয় জলের চাহিদা মেটাতে পারে; বড় স্থাপনা থেকে পুরো এলাকার চাহিদাও পূরণ করা সম্ভব। শহরের ক্ষেত্রে সৌর বাষ্পীভবন উচ্চ উৎপাদনক্ষম কারখানার বিকল্প না হয়ে বরং পরিপূরক হবে বলেই বেশি সম্ভাবনা; এটি নির্ভরযোগ্য জরুরি ব্যবস্থা বা গ্রিডের প্রান্তে থাকা প্রত্যন্ত পাড়ার সমাধান হিসেবে কাজে লাগতে পারে।
ব্যবহারের ক্ষেত্র ও স্থাপনের উপায়
এই যন্ত্রের লক্ষ্য এমন সব এলাকা, যেখানে বিদ্যুৎ গ্রিডের সরবরাহ সীমিত এবং রক্ষণাবেক্ষণকর্মীর অভাব রয়েছে। দ্বীপাঞ্চল, জেলেপাড়া ও উপকূলীয় খামার এ ধরনের এলাকার উদাহরণ। ঝড়, ভূমিকম্প বা সংঘাতের পর পানি অবকাঠামো অচল হয়ে পড়লে মানবিক সহায়তা কার্যক্রমেও এটি কাজে লাগতে পারে। গবেষক দলের ধারণাটি মডিউলার; ফলে কম চাহিদার ক্ষেত্রে একক প্যানেল এবং বেশি চাহিদায় একাধিক প্যানেলের সমষ্টি স্থাপন করা যায়। কম শব্দ ও উচ্চচাপের সরঞ্জাম না থাকায় স্কুল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রের জন্যও এটি উপযোগী, যেখানে নির্ভরযোগ্যতা ও নিরাপত্তা গুরুত্বপূর্ণ।
নকশাটি লবণকে কিনারায় পাঠায় বলে ব্যবস্থাটি সম্পদ পুনরুদ্ধারের কাজেও ব্যবহার করা যেতে পারে। ঘন তরল লবণপানি সমুদ্রে না ছেড়ে পরিচালকেরা শুকনো লবণ ও অন্যান্য স্ফটিকায়িত খনিজ সংগ্রহ করতে পারবেন। এতে পরিবেশের ওপর প্রভাব কমতে পারে এবং সামান্য আয়ের পথ তৈরি হতে পারে। মাঠপর্যায়ে স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণ আরও সহজ করার লক্ষ্যে অনেকগুলো উল্টো L-আকৃতির বাষ্পীভবন যন্ত্রকে বড় মডিউলে যুক্ত করে ভবিষ্যৎ সংস্করণ তৈরির প্রস্তাব দিয়েছে গবেষক দল।
বড় পরিসরে উৎপাদন ও প্রকৌশলগত চ্যালেঞ্জ
পরীক্ষাগারের প্রোটোটাইপকে মাঠপর্যায়ের যন্ত্রে রূপ দিতে উপকরণ, উৎপাদন ও তাপ ব্যবস্থাপনায় সতর্ক মনোযোগ প্রয়োজন। বাষ্পীভবন যন্ত্রের কাগজের সলতেকে মাসের পর মাস ভেজা-শুকনো চক্র, সামুদ্রিক জীবের কারণে জৈব আস্তরণ এবং অতিবেগুনি রশ্মির সংস্পর্শ সহ্য করতে হবে। ফোটোথার্মাল পৃষ্ঠের আলো শোষণ ও তাপ রূপান্তরের ক্ষমতা যেন খুব বেশি ক্ষয় না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। LSMO পেরোভস্কাইট অক্সাইড হওয়ায় তাপের বিরুদ্ধে এর স্থিতিশীলতা ভালো, যা সহায়ক। খরচের ক্ষেত্রে উৎপাদন-পদ্ধতি গুরুত্বপূর্ণ হবে। কম তাপমাত্রায় বড় এলাকাজুড়ে সমান প্রলেপ দেওয়ার কৌশল খরচ কমাতে এবং উৎপাদনের ধারাবাহিকতা বাড়াতে পারে।
ঘনীভবন ও তাপ পুনরুদ্ধার ব্যবস্থার দক্ষতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতি কিলোগ্রাম বাষ্পে প্রচুর সুপ্ত তাপ থাকে। আগত সমুদ্রের পানির সঙ্গে তাপ ভাগ করে এমন পৃষ্ঠে বাষ্প ঘনীভূত করার নকশা এই শক্তি পুনর্ব্যবহার করে মোট উৎপাদন বাড়াতে পারে। তাপক্ষয় ও বাষ্প বেরিয়ে যাওয়া কমানোর পাশাপাশি আবরণগুলো সহজে পরিষ্কার করা যায় এমন হতে হবে। ধুলো, পানির ছিটা ও লবণের স্ফটিক সহজে পরিষ্কারের ব্যবস্থা দিয়ে সামলাতে হবে। অত্যন্ত লবণাক্ত পানিতে গবেষক দলের স্থায়িত্ব পরীক্ষার ফল আশাব্যঞ্জক; তবে দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব ও রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন প্রমাণে উপকূলীয় পরিবেশে কয়েক মাসের পরীক্ষা দরকার। সহায়তা সংস্থা ও স্থানীয় পরিষেবা সংস্থার সঙ্গে অংশীদারত্ব এসব পরীক্ষা চালাতে এবং বিভিন্ন জলবায়ুর জন্য নকশা নির্ধারণে সহায়তা করতে পারে।
জলবায়ু ও টেকসইতার বিবেচনা
গ্রিডবিহীন এলাকায় সৌর লবণমুক্তকরণের জলবায়ুগত সুবিধা স্পষ্ট। এটি বিদ্যুতের বদলে সূর্যালোক ব্যবহার করে এবং ডিজেল জেনারেটরের জ্বালানি খরচ ও নির্গমন এড়ায়। তবে ল্যান্থানাম ও স্ট্রনশিয়াম সংগ্রহ থেকে শুরু করে শোষক ও আবরণ তৈরির মতো বিষয়েও জীবনচক্রের পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনা করতে হবে। টেকসই উপকরণ ও সহজ সংযোজন-পদ্ধতি ব্যবহার করলে যন্ত্রটির কার্যকাল বাড়তে পারে এবং বহু বছরের ব্যবহারের ওপর উৎপাদনের সময় সৃষ্ট কার্বন নিঃসরণ ছড়িয়ে দেওয়া যায়। উচ্চচাপের পাম্প না থাকায় শক্তি খরচ ও শব্দ—দুটিই কমে, যা উপকূলীয় জনপদ ও বন্যপ্রাণীর জন্য উপকারী।
প্রচলিত কারখানার তুলনায় এ ব্যবস্থায় বর্জ্যের ধরনও আলাদা। কিনারায় লবণ স্ফটিকায়িত করে ইউএনআইএসটির পদ্ধতিতে উপকূলের কাছের পানিতে ঘন লবণপানি নির্গমন কমানো যেতে পারে। সম্ভব হলে সংগৃহীত লবণ শিল্পপ্রক্রিয়ায় পুনর্ব্যবহার করা বা নিরাপদে লবণক্ষেতে ফেরত দেওয়া যায়। সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের সঙ্গে লবণমুক্তকরণকে আরও সামঞ্জস্যপূর্ণ করার প্রচেষ্টার পাশাপাশি এটি বৈশ্বিক উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশন-সংক্রান্ত লক্ষ্যগুলোর সঙ্গেও মেলে। জলবায়ু পরিবর্তনে খরা ও তাপপ্রবাহ আরও তীব্র হওয়ায় অল্প শক্তি ব্যবহার করে প্রচুর সমুদ্রের পানিকে নিরাপদ পানীয় জলে রূপান্তরের কার্যকর প্রযুক্তি স্থানীয় অভিযোজন পরিকল্পনার অংশ হয়ে উঠবে।
জেনে রাখা দরকার
- ইউএনআইএসটির গবেষকেরা বিদ্যুৎ ছাড়াই চলা একটি সৌর লবণমুক্তকরণ যন্ত্র তৈরি করেছেন, যা সূর্যালোকের একক মানে প্রতি বর্গমিটারে ঘণ্টায় ৩.৪০ কিলোগ্রাম পানি উৎপাদনের কথা জানিয়েছে।
- নকশাটিতে কাগজের সলতে ও উল্টো ইংরেজি L-আকৃতির কাঠামো ব্যবহার করে সমুদ্রের পানি ফোটোথার্মাল পৃষ্ঠে পৌঁছে দেওয়া হয়।
- ফোটোথার্মাল স্তরটি La0.7Sr0.3MnO3; এটি একটি অক্সাইড পেরোভস্কাইট, যা অ-বিকিরণশীল পুনঃসংযোজনের মাধ্যমে সূর্যালোককে তাপে রূপান্তর করে।
- একমুখী প্রবাহের ধরন লবণকে কিনারায় সরিয়ে দেয়, ফলে উত্তপ্ত কেন্দ্রের পৃষ্ঠে লবণ জমা ও আলো আটকে যাওয়া কমে।
- স্থায়িত্ব পরীক্ষায় দেখা গেছে, সাধারণ সমুদ্রের পানির চেয়ে বেশি লবণযুক্ত ২০ শতাংশ লবণের দ্রবণে যন্ত্রটি দুই সপ্তাহ স্থিতিশীলভাবে কাজ করেছে।
- সাধারণ নিষ্ক্রিয় সৌর পাতনযন্ত্র প্রতি বর্গমিটারে ঘণ্টায় ০.৩ থেকে ০.৪ কিলোগ্রাম পানি দেয়; তাই ঘোষিত হারটি প্রায় আট থেকে দশ গুণ বেশি।
- এ ধারণায় লবণ সংগ্রহ করা যায় এবং অনেক প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় তরল ঘন লবণপানি নির্গমন কমানো সম্ভব।
- একাধিক মডিউলের সারি গ্রাম, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, দ্বীপ ও দুর্যোগ-পরবর্তী ত্রাণকাজে গ্রিডবিহীন পানি সরবরাহ করতে পারে।
- গবেষণাটি Advanced Energy Materials সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। অধ্যাপক জি হিউন জাংয়ের নেতৃত্বে এতে প্রধান লেখক হিসেবে রয়েছেন ড. সৌরভ চৌলে।
- বাস্তবে কত পানি উৎপাদিত হবে ও খরচ কত পড়বে, তা নির্ধারণ করবে মাঠপর্যায়ের পরীক্ষা, ঘনীভবন-যন্ত্রের নকশা এবং বড় পরিসরে উৎপাদনের সক্ষমতা।






