চীন এখন কেন সুযোগ দেখছে
ডলারের দর তীব্রভাবে কমে যাওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে নতুন অস্থিরতা চীনের জন্য ইউয়ানকে বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থায় আরও গভীরভাবে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি করেছে। গুরুত্বপূর্ণ সূচকগুলোতে ১৯৭৩ সালের পর বছরের সবচেয়ে দুর্বল সূচনা করেছে ডলার; অন্যদিকে অফশোর ইউয়ানের দর সামান্য বেড়েছে। থেমে থেমে চীনা সম্পদে বিদেশি বিনিয়োগ ফিরছে, আর নির্দিষ্ট কিছু বাণিজ্যে ডলারের বিকল্প পরীক্ষা করছে আরও বেশি সরকার। এই মুহূর্ত কাজে লাগাতে এগোচ্ছে বেইজিং।
সূচিপত্র
- চীন এখন কেন সুযোগ দেখছে
- বেইজিং কী করছে, বিস্তারিত
- ডিজিটাল ইউয়ান ও নতুন পেমেন্ট অবকাঠামো
- এশিয়ায় বাণিজ্য ও অর্থায়নে যেভাবে পরিবর্তন আসছে
- ডলারের আধিপত্য ও ইউয়ানের সীমাবদ্ধতার পেছনের পরিসংখ্যান
- বৈশ্বিক ইউয়ান চালুর চীনের আগের উদ্যোগের পর কী বদলেছে
- জ্বালানি ও পণ্যে পরিবর্তন সবচেয়ে দৃশ্যমান
- ব্রিকস ও গ্লোবাল সাউথ: উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও বাস্তবতা
- বাজারের জন্য এর অর্থ কী
- পরবর্তী সময়ে কী নজরে রাখবেন
- একনজরে
কর্মকর্তারা ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ভাষায় এই কৌশল তুলে ধরছেন। লক্ষ্য হলো যেকোনো একটি সার্বভৌম মুদ্রার ওপর নির্ভরতা কমানো, নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি কমানো এবং ইউয়ানে লেনদেনের মূল্য নির্ধারণ, ঝুঁকি হেজ করা ও নিষ্পত্তির জন্য চীনা প্রতিষ্ঠান ও তাদের অংশীদারদের আরও ভালো উপায় দেওয়া। অর্থ পরিশোধের অবকাঠামো থেকে পণ্যবাজারে প্রবেশাধিকার পর্যন্ত কয়েক বছর ধরে ধাপে ধাপে চলা কাজের ওপর ভিত্তি করে এসব নীতি গড়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের রাজস্ব ও মুদ্রানীতি ব্যবস্থাপনার ওপর আস্থা টালমাটাল হওয়ায় এ উদ্যোগের গতি বাড়ানো হচ্ছে।
সাম্প্রতিক তথ্য একই সঙ্গে চ্যালেঞ্জের ব্যাপ্তি এবং পরিবর্তনের সুযোগ তুলে ধরে। ব্যবস্থাটির মূল ভরকেন্দ্র এখনো ডলার। ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল সেটেলমেন্টসের (বিআইএস) ২০২২ সালের ত্রিবার্ষিক জরিপে, বৈদেশিক মুদ্রার ৮৮ শতাংশ লেনদেনের এক পাশে ছিল ডলার; ইউয়ানের অংশ ছিল প্রায় ৭ শতাংশ। মে মাসে সুইফটের তথ্য অনুযায়ী, মূল্যের হিসাবে বৈশ্বিক পেমেন্টে ইউয়ানের অংশ ছিল প্রায় ৩ শতাংশ, যা ষষ্ঠ অবস্থানে। ডলারের অংশ ছিল প্রায় অর্ধেক এবং ইউরোর প্রায় এক-চতুর্থাংশ। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো তাদের রিজার্ভে বৈচিত্র্য এনেছে। ডলারের অংশ দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে, আর সোনার অংশ বেড়েছে। নীতিগত ধাক্কা ও নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা খোঁজা উদীয়মান বাজারগুলোতে এই প্রবণতা বিশেষভাবে লক্ষণীয়।
বেইজিং কী করছে, বিস্তারিত
চীনের পিপলস ব্যাংক একটি সরল বার্তা দিয়েছে। একটি প্রভাবশালী মুদ্রার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দুর্বলতা তৈরি করে, তাই ইউয়ান ব্যবহার ও হেজ করার ব্যবহারিক উপায় বাড়াবে চীন। ডিজিটাল ইউয়ানের আন্তর্জাতিক ব্যবহার এগিয়ে নিতে সাংহাইয়ে একটি কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ইউয়ানে মুদ্রা বিনিময়ের ঝুঁকি সামলাতে বিনিয়োগকারীদের আরও উপায় দিতে ইউয়ানের বৈদেশিক মুদ্রা ফিউচার ও সংশ্লিষ্ট পণ্য চালুর উদ্যোগও উৎসাহিত করেছে ব্যাংকটি।
এই উদ্যোগের পাশাপাশি বাজারে প্রবেশাধিকারও বাড়ছে। বিদেশি যোগ্য প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য মূল ভূখণ্ডের তিনটি বড় এক্সচেঞ্জে আরও ১৬টি ফিউচার ও অপশন চুক্তি চালু হয়েছে। এসব চুক্তির আওতায় প্রাকৃতিক রাবার, সিসা ও টিনের মতো পণ্য রয়েছে। এর আগে বিদেশিদের প্রবেশাধিকার বাড়ানোর যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এই উদ্যোগ। ইউয়ানে নিষ্পত্তি হওয়া লেনদেনে বিদেশি মুদ্রায় জামানত দেওয়ার অনুমতি দেওয়ার প্রস্তাব করেছে সাংহাই ফিউচার্স এক্সচেঞ্জ। এটি এমন একটি কারিগরি পরিবর্তন, যা বৈশ্বিক ঝুঁকি-হেজকারীদের ইউয়ানে আগাম অর্থ জমা দিতে বাধ্য না করেই আকৃষ্ট করতে পারে। এক্সচেঞ্জে লেনদেন হওয়া তহবিলের অপশনে যোগ্য বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণেও কর্তৃপক্ষ অনুমোদন দিয়েছে। আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বন্ডবাজারে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া স্থানীয় হিসাব খোলার ফিও মওকুফ করা হয়েছে।
বৈশ্বিক ব্যাংকগুলো পণ্য ব্রোকারেজ থেকে ইউয়ানে লেনদেন নিষ্পত্তি পর্যন্ত বিভিন্ন সেবা বাড়িয়ে বিদেশি গ্রাহকদের এসব ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করছে। অফশোর বাজারে চীন ইউয়ান ক্লিয়ারিং ব্যাংকের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে এবং আন্তঃসীমান্ত ইন্টারব্যাংক পেমেন্ট সিস্টেমের (সিআইপিএস) পরিসর বাড়িয়ে চলেছে। এই ব্যবস্থা ইউয়ানে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট প্রক্রিয়া করে এবং দেশের অভ্যন্তরীণ নিষ্পত্তি ব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্ত।
ডিজিটাল ইউয়ান ও নতুন পেমেন্ট অবকাঠামো
ডিজিটাল ইউয়ান, যা প্রায়ই ই-সিএনওয়াই নামে পরিচিত, চীনের ভেতরে খুচরা লেনদেনে চালু আছে। এখন নিয়ন্ত্রিতভাবে আন্তঃসীমান্ত পরীক্ষামূলক ব্যবহারের প্রস্তুতি চলছে। বিআইএস ইনোভেশন হাব এবং হংকং ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ কয়েকটি মুদ্রা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তৈরি বহু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এমব্রিজ প্রকল্পে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিজিটাল মুদ্রা ব্যবহার করে পাইকারি লেনদেন প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে নিষ্পত্তির পরীক্ষা চলছে। সিআইপিএসের সঙ্গে মিলে এটি এমন একগুচ্ছ পেমেন্ট ব্যবস্থা গড়ে তুলছে, যেগুলোকে ডলারভিত্তিক ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে যেতে হয় না। চীনা পক্ষ যুক্ত বাণিজ্য ও অর্থায়নে বিকল্প ব্যবস্থা, কম খরচ এবং দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করাই এর লক্ষ্য।
এসব পদক্ষেপ কেবল নাম বা পরিচিতির বিষয় নয়। ইউয়ানে ঝুঁকি হেজ করার আরও বিস্তৃত উপকরণ, আন্তর্জাতিক পেমেন্টের জন্য আরও স্পষ্ট অবকাঠামো এবং স্থানীয় বাজারে সহজ প্রবেশাধিকার—সব মিলিয়ে পণ্যের মূল্য নির্ধারণ, ঋণ নেওয়া ও লেনদেন নিষ্পত্তি ইউয়ানে করা বাস্তবসম্মত হতে পারে। এতে উদীয়মান অর্থনীতির সঙ্গে বাণিজ্য ও পণ্যবাজারে মুদ্রাটির ভূমিকা বাড়বে, যদিও পুঁজি নিয়ন্ত্রণ ও রূপান্তরযোগ্যতার সীমাবদ্ধতার কারণে অগ্রগতির গতি থাকবে পরিমিত।
এশিয়ায় বাণিজ্য ও অর্থায়নে যেভাবে পরিবর্তন আসছে
এশিয়াজুড়ে ইউয়ানসহ স্থানীয় মুদ্রায় আরও বেশি বাণিজ্য নিষ্পত্তি হচ্ছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন উৎসাহিত করেছে কর্তৃপক্ষ। তৈরি করা হয়েছে এমন পেমেন্ট সংযোগ, যার মাধ্যমে ডলার ব্যবহার না করেই সীমান্তের দুই পাশে কিউআর কোড স্ক্যান করে কেনাকাটা করা যায়। কয়েকটি দেশের সঙ্গে চীনের পিপলস ব্যাংকের মুদ্রা বিনিময় চুক্তি রয়েছে। থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার বড় ব্যাংকগুলো সরাসরি সিআইপিএসের সঙ্গে যুক্ত। কর্মকর্তাদের ভাষ্য, আসিয়ানের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যে স্থানীয় মুদ্রায় নিষ্পত্তির অংশ ২০১৯ সালের ১০ শতাংশের কম থেকে বেড়ে এক-চতুর্থাংশের বেশি হয়েছে। চীনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যও একই দিকে ঝুঁকছে। ২০২৩ সালে আসিয়ান ও চীনের মধ্যে পণ্যবাণিজ্যে আন্তঃসীমান্ত ইউয়ান প্রাপ্তি ও পরিশোধ ২ ট্রিলিয়ন ইউয়ান ছাড়িয়েছে, যা দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের মোট পরিমাণের ৩০ শতাংশের বেশি।
আর্থিক বাজারেও একই পরিবর্তনের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। ডলার এড়িয়ে মুদ্রা ঝুঁকি হেজ করার চাহিদা বাড়ছে বলে জানিয়েছেন ডিলাররা। প্রতিটি হেজের মূল্য ডলারের মাধ্যমে নির্ধারণ না করে প্রতিষ্ঠানগুলো ইউয়ানের সঙ্গে হংকং ডলার, দিরহাম, ইয়েন ও ইউরোর জোড়া তৈরি করছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ব্যাংকগুলো চীনা মুদ্রার জন্য বিশেষ বিভাগ চালু করছে। চীনের সঙ্গে যুক্ত সরবরাহকারী ও ক্রেতাদের প্রকল্পে ইউয়ানে ঋণের চাহিদাও বাড়ছে।
এশিয়ার বাইরেও ভারত ও বাংলাদেশের কিছু আমদানিকারক রাশিয়ার পণ্যের দাম ইউয়ানে পরিশোধ করেছেন। রাশিয়ার আরও বেশি জ্বালানিবাহী জাহাজের পণ্য ডলার ছাড়া অন্য মুদ্রায় নিষ্পত্তি হচ্ছে। খরচ কমানো থেকে নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি এড়ানো পর্যন্ত কারণগুলো ভিন্ন, তবে ফল একই। নিউইয়র্কের মধ্য দিয়ে কম লেনদেন পরিচালনা করতে হচ্ছে। চীনের কাছে পণ্য বিক্রি করে বা চীন থেকে পণ্য কেনে—এমন কোম্পানিগুলোর ডলারে কার্যকরী মূলধন কম রাখলেও চলছে।
ডলারের আধিপত্য ও ইউয়ানের সীমাবদ্ধতার পেছনের পরিসংখ্যান
ডলার এখনো ব্যবস্থাটির মূল ভরকেন্দ্র, কারণ এতে অতুলনীয় তারল্য, স্বল্পমেয়াদি অর্থায়নের গভীর বাজার এবং বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের আস্থাভাজন আইনি কাঠামো রয়েছে। এর আগে উল্লেখ করা বিআইএসের জরিপে বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেনে ডলারের আধিপত্য দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাইরের ঋণগ্রহীতাদের আন্তর্জাতিক ঋণ ইস্যুর বেশির ভাগ অর্থায়ন এখনো ডলারে হয়। পণ্যের বেঞ্চমার্কগুলোর মূল্য প্রধানত ডলারে নির্ধারিত হয়, আর ব্যাংকগুলোর আন্তঃসীমান্ত দায়ের বড় অংশও ডলারে হিসাব করা হয়।
রিজার্ভ ব্যবস্থাপকরা ব্যবস্থাটিকে উল্টে না দিয়ে ধীরে ধীরে পরিবর্তন আনছেন। সরকারি রিজার্ভের সবচেয়ে বড় অংশ এখনো ডলারের। এই অংশ দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে এবং সোনার অংশ বেড়েছে। উদীয়মান বাজারগুলোতে এই প্রবণতা সবচেয়ে জোরালো। সোনার দিকে এই ঝোঁক দাম বাড়াতে সহায়তা করেছে এবং বিনিময় হারের ওঠানামা ও নিষেধাজ্ঞা থেকে সুরক্ষা দিচ্ছে।
বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের পোর্টফোলিওতেও পরিবর্তন আসছে, যদিও ধীরগতিতে। বিশ্বায়নের শীর্ষ সময়ের তুলনায় ট্রেজারি বাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশ কমেছে। বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের সময় অর্ধেকের বেশি থাকা এই অংশ এখন প্রায় ৩০ শতাংশ। বিদেশি চাহিদা কমলে প্রান্তিক পর্যায়ে সুদহার বাড়তে পারে। অনেক উদীয়মান অর্থনীতিতে পরিবার ও কোম্পানিগুলো এখনো ব্যাংকে ডলার আমানত রাখতে পছন্দ করে। চীন এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। ২০১৭ সালের পর ডলার আমানতের অংশ কমেছে। এর পেছনে রয়েছে আন্তঃসীমান্ত লেনদেন ও অভ্যন্তরীণ অর্থায়নে ইউয়ানের ব্যবহার বাড়াতে নিয়ন্ত্রকদের উদ্যোগ এবং ঝুঁকি সামলাতে ইউয়ানভিত্তিক উপকরণ ব্যবহারের সুযোগ পাওয়া যাবে—এ বিষয়ে বাসিন্দাদের আস্থা বৃদ্ধি।
বৈশ্বিক ইউয়ান চালুর চীনের আগের উদ্যোগের পর কী বদলেছে
বর্তমান পদ্ধতিতে একটি কঠিন অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া শিক্ষা প্রতিফলিত হয়েছে। ২০০৮ সালের সংকটের পর চীন ডলারের সঙ্গে নরম পেগ বজায় রেখেছিল, যা রপ্তানিকে সহায়তা করে। ২০১৪ সালের মধ্যে দেশটি প্রায় ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ গড়ে তোলে এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বিশেষ অঙ্কন অধিকার (এসডিআর) ঝুড়িতে ইউয়ানের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করে। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ এবং বিদেশে নীতিভিত্তিক ব্যাংকগুলোর বড় অঙ্কের ঋণ বৈশ্বিকভাবে মুদ্রাটির ব্যবহার বাড়াবে বলে আশা করা হয়েছিল।
এরপর নীতির ত্রিমুখী দ্বন্দ্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কোনো দেশ একই সময়ে স্থির বিনিময় হার, অবাধ পুঁজি প্রবাহ এবং স্বাধীন মুদ্রানীতি বজায় রাখতে পারে না। ২০১৫ সালে ফেডারেল রিজার্ভ সুদহার বাড়ালে এবং চীনের অর্থনীতির পূর্বাভাস দুর্বল হলে ইউয়ানের দর অতিমূল্যায়িত মনে হতে থাকে। ২০১৬ সালে পুঁজিপ্রবাহে বড় ধরনের বহির্গমন ঘটে। পরিবারগুলো সঞ্চয় বিদেশে সরিয়ে নেয় এবং রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলো বিদেশি সম্পদ কেনে। জবাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রার দর কমতে দেয়, পুঁজি নিয়ন্ত্রণ কঠোর করে এবং ব্যবসায়িক চক্রের সঙ্গে ওঠানামা করে—এমন নিয়ন্ত্রিত ভাসমান বিনিময় হার চালু করে।
এরপর থেকে চীন প্রায় ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ ধরে রেখেছে, কয়েক বছর ধরে বিদেশমুখী একীভবন ও অধিগ্রহণ সীমিত করেছে এবং মুদ্রার দুই দিকেই ওঠানামার সুযোগ দিয়েছে। বৈশ্বিক ইউয়ান মানদণ্ডের উচ্চাকাঙ্ক্ষার জায়গা নিয়েছে বাস্তবভিত্তিক মনোযোগ: বাণিজ্যের বড় অংশ ইউয়ানে নিষ্পত্তি করা এবং এমন আইনি ও কারিগরি অবকাঠামো গড়ে তোলা, যাতে পুঁজিবাজার পুরোপুরি উন্মুক্ত না করেই অংশীদাররা মুদ্রাটি ব্যবহার করতে পারেন।
জ্বালানি ও পণ্যে পরিবর্তন সবচেয়ে দৃশ্যমান
মুদ্রার পরিবর্তন সাধারণত পণ্যবাণিজ্যেই প্রথম দেখা যায়। রাশিয়া এখন বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ক্রেতাদের কাছে স্থানীয় মুদ্রায় আরও বেশি জ্বালানি পণ্য বিক্রি করছে। কিছু চালানের মূল্য ইউয়ানে, অন্যগুলোর দিরহাম বা রুবলে নিষ্পত্তি হচ্ছে। চীন, ভারত ও তুরস্ক এমন চুক্তিতে যুক্ত, যেগুলোতে ডলারের ব্যবহার নেই। ক্রেতা ও বিক্রেতাদের এতে কার্যকরী মূলধনের জন্য ডলার মজুত রাখার প্রয়োজন কমে এবং অন্তর্নিহিত বাণিজ্যে যে মুদ্রা ব্যবহৃত হয়, সেই মুদ্রায় ঝুঁকি হেজ করা সহজ হয়।
উপসাগরীয় অঞ্চলের উৎপাদকরা এসব পরিবর্তনের দিকে নজর রাখছেন এবং বিকল্প গড়ে তুলছেন। তেল মূল্য নির্ধারণ ও রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় পেট্রোডলার ব্যবস্থা এখনো কাঠামো হিসেবে কাজ করছে। তবে কয়েকটি দেশ চীনের নিষ্পত্তি ব্যবস্থা ও ডিজিটাল মুদ্রার পরীক্ষামূলক উদ্যোগের সঙ্গে আরও গভীর সংযোগের কথা ভাবছে। ডিজিটাল ইউয়ান ও এমব্রিজ সীমান্ত পেরিয়ে পাইকারি লেনদেন দ্রুত নিষ্পত্তির পথ দেখাচ্ছে। সম্ভাব্য পথ হলো নিয়ন্ত্রিত বিবর্তন: তেলের বাণিজ্যের একটি অংশে ধীরে ধীরে ইউয়ানে নিষ্পত্তি বাড়বে, আর মূল্য নির্ধারণে ডলারের বেঞ্চমার্কই থাকবে মূল ভিত্তি।
এ অনুযায়ী বাজারের অবকাঠামো প্রস্তুত করছে চীন। পণ্য ফিউচার বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়িয়ে, ইউয়ানে নিষ্পত্তি হওয়া লেনদেনে বিদেশি মুদ্রায় জামানতের অনুমতি দিয়ে এবং ক্লিয়ারিং সক্ষমতা বাড়িয়ে নীতিনির্ধারকরা বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ইউয়ানে পণ্যের দামের ঝুঁকি সামলাতে আহ্বান জানাচ্ছেন। সময়ের সঙ্গে ইউয়ানে আরও বেশি পণ্যচুক্তির মূল্য নির্ধারণ ও ঝুঁকি হেজ করার ভিত্তি তৈরি হচ্ছে এতে।
ব্রিকস ও গ্লোবাল সাউথ: উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও বাস্তবতা
ব্রিকস সরকারগুলো এবং গ্লোবাল সাউথের অনেক দেশ আরও বেশি আর্থিক স্বায়ত্তশাসন চায়। বাণিজ্যে স্থানীয় মুদ্রার ব্যবহার বাড়ানোর অঙ্গীকার করেছে তারা, মুদ্রা বিনিময় সুবিধার পরিসর বাড়িয়েছে এবং ক্লিয়ারিং ব্যাংক ও পেমেন্ট সংযোগের মাধ্যমে ইউয়ান অবকাঠামো আরও গভীর করেছে। এসব বিকল্পের মধ্যে রেনমিনবি সবচেয়ে এগিয়ে, বিশেষত চীনের সরবরাহ শৃঙ্খল ও ঋণের সঙ্গে যুক্ত দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে।
অগ্রগতির পাশাপাশি সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। ইউয়ান অবাধে রূপান্তরযোগ্য নয় এবং চীন পুঁজি নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। ইউরোপের বাইরে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ইউরোর আকর্ষণও কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে কম। ব্রিকসের অন্য মুদ্রাগুলোর বিনিময় হার অস্থির, অথবা সেগুলোর তরল ঝুঁকি-হেজ বাজার নেই। বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের দেশগুলোর জন্য একটি অভিন্ন মুদ্রা চালু করা দূরের সম্ভাবনা। এখন যে পথটি গতি পাচ্ছে, তা হলো স্থানীয় মুদ্রায় আরও বেশি লেনদেন নিষ্পত্তি এবং সীমান্ত পেরিয়ে পরস্পরের সঙ্গে কাজ করতে পারে—এমন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিজিটাল মুদ্রা নিয়ে সহযোগিতা।
রিজার্ভে বৈচিত্র্য আনার কাজ ধীর হলেও অব্যাহত। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর জরিপে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি ও রাজস্ব টেকসইতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ার ইঙ্গিত মিলেছে। পাশাপাশি সোনার পরিমাণ এবং ইউরোর কিছু অতিরিক্ত মজুত বাড়ানোর প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে। এদিকে সুইফটের বিকল্প এবং একক কোনো ব্যবস্থার দুর্বলতা কমায়—এমন সমান্তরাল ব্যবস্থা নিয়ে কাজ চলছে। ডলার এখনো সবচেয়ে গভীর নিরাপদ সম্পদের ভাণ্ডার এবং সবচেয়ে বিস্তৃত আইনি সুরক্ষা দেয়। তবে পরিবর্তনের গতিপথ আরও বহুমুখী একটি ব্যবস্থার দিকে।
বাজারের জন্য এর অর্থ কী
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ঝুঁকিটি হলো মর্যাদা আকস্মিকভাবে হারানো নয়, বরং প্রান্তিক পর্যায়ে ধীরে ধীরে ক্ষয়। অন্য মুদ্রায় আরও বেশি বাণিজ্যের মূল্য নির্ধারণ ও নিষ্পত্তি হলে ডলারের চাহিদা সামান্য কমবে। বিদেশি ক্রেতারা ট্রেজারির কম অংশ কিনলে সুদহার বাড়বে। ডলারের দর কমলে রপ্তানিকারকরা লাভবান হতে পারেন, তবে বড় ঘাটতির অর্থায়ন এবং মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা স্থিতিশীল রাখা কঠিন হবে। ডলারের চাহিদার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি থাকবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা এবং নীতির ধারাবাহিকতা।
উদীয়মান বাজারগুলোর জন্য ডলারের দুর্বলতা এবং ডলার ছাড়া অন্য উৎস থেকে অর্থায়ন ও ঝুঁকি হেজ করার উন্নততর সুযোগ ইতিবাচক। যুক্তরাষ্ট্রের সুদহার কমলে কয়েকটি দেশের স্থানীয় মুদ্রায় ইস্যু করা বন্ড আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে। চীনের সঙ্গে যুক্ত সরবরাহ শৃঙ্খলের কোম্পানিগুলো ডলারের মাধ্যমে অতিরিক্ত বেসিস ঝুঁকি না নিয়েই ইউয়ানে ঋণ নিতে ও ঝুঁকি হেজ করতে পারে। চীনের কাছে পণ্য বিক্রি করা উৎপাদকরা তাদের ক্রেতাদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মূল্য নির্ধারণ ও নিষ্পত্তির বিকল্প পাবেন।
চীনের জন্য এ সুযোগ কৌশলগত। আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য মুদ্রা গড়ে তুলতে পূর্বানুমানযোগ্য নিয়ম, উন্মুক্ত ও গভীর বাজার এবং আইনি নিশ্চয়তা প্রয়োজন। বাজারে প্রবেশাধিকার, স্বচ্ছতা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় অগ্রগতিই ঠিক করবে বিনিয়োগকারীরা কত দ্রুত তাদের বিনিয়োগ বণ্টন বদলাবেন। নতুন লেনদেন পণ্য সহায়ক। স্থিতিশীল নীতি ও স্পষ্ট যোগাযোগও সমান গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
পরবর্তী সময়ে কী নজরে রাখবেন
কয়েকটি সূচক দেখে বোঝা যাবে এই গতি বজায় থাকছে কি না। সুইফটের পেমেন্ট ট্র্যাকার-এ ইউয়ানের অংশ, সিআইপিএসে অংশগ্রহণ এবং ইউয়ান ফিউচার ও অপশনের লেনদেনের পরিমাণ লক্ষ করুন। জ্বালানির চালান কত ঘন ঘন ইউয়ানে নিষ্পত্তি হচ্ছে এবং উপসাগরীয় উৎপাদকরা তেলের দাম হিসেবে আরও বেশি ইউয়ান নিচ্ছেন কি না, তা দেখুন। চীনের পিপলস ব্যাংকের সঙ্গে মুদ্রা বিনিময় সুবিধার বৃদ্ধি এবং সীমান্ত পেরিয়ে পরীক্ষামূলক ব্যবহারে ই-সিএনওয়াই চালুর অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করুন। উদীয়মান অর্থনীতিতে ইউয়ান ঋণের ব্যবহার এবং এশিয়ায় ডলার এড়িয়ে করা বাণিজ্যচুক্তির অংশের দিকে নজর দিন।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত সিদ্ধান্ত পরিস্থিতির গতিপথ নির্ধারণ করবে। রাজস্ব নীতির ধারা, আর্থিক নিষেধাজ্ঞার ব্যবহার ও পরিসর এবং মুদ্রানীতির ধারাবাহিকতা—এসব বিষয় ডলারের প্রতি বৈশ্বিক আগ্রহকে প্রভাবিত করে। টোকেনভিত্তিক আমানত ও স্টেবলকয়েনসহ ডিজিটাল আকারের ডলার উপকরণের জন্য স্পষ্ট নিয়ম এবং ডলারভিত্তিক পেমেন্ট অবকাঠামোর উন্নয়ন ডলারের অবস্থান আরও শক্ত করতে পারে। পেমেন্ট ব্যবস্থা আরও খণ্ডিত হয়ে উঠছে, আর এর মধ্যে ইউয়ানকে প্রতিষ্ঠিত করতে দ্রুত এগোচ্ছে চীন।
একনজরে
- ১৯৭৩ সালের পর বছরের সবচেয়ে দুর্বল সূচনা করেছে ডলার; অন্যদিকে ইউয়ানের দর সামান্য বেড়েছে এবং নতুন বিনিয়োগ এসেছে।
- বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য আরও ফিউচার ও অপশন চালু করছে চীন, ইউয়ানে ঝুঁকি হেজের উপকরণ বাড়াচ্ছে এবং সাংহাইয়ে ডিজিটাল ইউয়ান কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা করছে।
- সিআইপিএসে অংশগ্রহণ ও অফশোর ইউয়ান ক্লিয়ারিং নেটওয়ার্কের পরিসর বাড়ছে, ফলে অংশীদারদের ইউয়ানে লেনদেন নিষ্পত্তির আরও সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
- দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যে স্থানীয় মুদ্রায় নিষ্পত্তির অংশ এক-চতুর্থাংশ ছাড়িয়েছে; কিউআর কোডভিত্তিক আন্তঃসীমান্ত পেমেন্টের ব্যবহারও বাড়ছে।
- বিআইএস ও সুইফটের তথ্য বলছে, বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থায় ডলারের আধিপত্য এখনো রয়েছে; ইউয়ানের অংশ ছোট হলেও ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে।
- ২০১৬ সালে পুঁজি বাইরে চলে যাওয়ার পর চীন পুঁজি নিয়ন্ত্রণ কঠোর করে এবং নিয়ন্ত্রিত ভাসমান বিনিময় হার চালু করে। বৈশ্বিক ইউয়ান প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ থেকে বাণিজ্য ইউয়ানে নিষ্পত্তির দিকে মনোযোগ সরায়।
- পণ্যবাণিজ্যে পরিবর্তন সবচেয়ে দৃশ্যমান: রাশিয়ার আরও বেশি জ্বালানি ডলার ছাড়া অন্য মুদ্রায় বিক্রি হচ্ছে এবং ইউয়ানভিত্তিক পণ্যের বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়ছে।
- ব্রিকস দেশগুলো স্থানীয় মুদ্রার ব্যবহার বাড়াচ্ছে ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিজিটাল মুদ্রা নিয়ে কাজ করছে; একই সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো রিজার্ভে সোনা ও ইউরোর অংশ বাড়াচ্ছে।
- গুরুত্বপূর্ণ সূচকের মধ্যে রয়েছে পেমেন্টে ইউয়ানের অংশ, সিআইপিএসে অংশগ্রহণ, ইউয়ান ডেরিভেটিভের লেনদেনের পরিমাণ এবং তেল নিষ্পত্তিতে উপসাগরীয় উৎপাদকদের সিদ্ধান্ত।






