নৌযান নির্মাণে যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে চীন, বদলে যাচ্ছে বৈশ্বিক সামুদ্রিক শক্তির ভারসাম্য
দ্রুত জাহাজ নির্মাণ সম্প্রসারণের ফলে বিশ্বের বৃহত্তম নৌবাহিনী গড়ে তুলেছে চীন, যা যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করছে এবং সমুদ্রে শক্তির ভারসাম্য বদলে দিচ্ছে।
গত দুই দশকে চীন নজিরবিহীন গতিতে তার জাহাজ নির্মাণশিল্প ও নৌবাহিনীকে রূপান্তরিত করেছে। এখন বিশ্বের মোট জাহাজ নির্মাণাদেশের ৬০ শতাংশের বেশি চীনের দখলে, আর যুদ্ধজাহাজের সংখ্যার হিসাবে দেশটি বিশ্বের বৃহত্তম নৌবাহিনী পরিচালনা করছে। সামুদ্রিক সক্ষমতার এই উল্লম্ফন শুধু চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করছে না, বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যও বদলে দিচ্ছে। এতে ওয়াশিংটন এবং ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সূচিপত্র
- নৌযান নির্মাণে যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে চীন, বদলে যাচ্ছে বৈশ্বিক সামুদ্রিক শক্তির ভারসাম্য
- দ্রুত জাহাজ নির্মাণ সম্প্রসারণের ফলে বিশ্বের বৃহত্তম নৌবাহিনী গড়ে তুলেছে চীন, যা যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করছে এবং সমুদ্রে শক্তির ভারসাম্য বদলে দিচ্ছে।
- কীভাবে বিশ্বের বৃহত্তম নৌবাহিনী গড়ে তুলল চীন?
- সামরিক-বেসামরিক সমন্বয়: চীনের অনন্য সুবিধা
- কেন নৌবাহিনী সম্প্রসারণ করছে চীন?
- বৈশ্বিক বিস্তার: বন্দর, ঘাঁটি ও বিদেশে প্রভাব
- যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে জবাব দিচ্ছে?
- ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে জোট ও কৌশলগত অবস্থান
- ঝুঁকি ও বৈশ্বিক প্রভাব কী?
- প্রযুক্তি ও পরিচালনাগত ব্যবধান
- আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া
- বৈশ্বিক সামুদ্রিক শক্তির ভবিষ্যৎ কী?
- মূল বিষয়গুলো
রাষ্ট্রনির্দেশিত শিল্পনীতি, জাহাজ নির্মাণ কারখানায় বিপুল বিনিয়োগ এবং দক্ষিণ চীন সাগরের মতো বিরোধপূর্ণ জলসীমায় নিজেদের স্বার্থ প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি দেশের সীমানার বাইরেও প্রভাব বিস্তারের কৌশলগত লক্ষ্য—এসবের সমন্বয়ে চীনের নৌবাহিনীর সম্প্রসারণ ঘটছে। যুক্তরাষ্ট্র ও তার অংশীদারেরা এর জবাব দিতে তৎপর হওয়ার মধ্যে দিয়ে বিশ্ব সামুদ্রিক প্রতিযোগিতার এক নতুন যুগ প্রত্যক্ষ করছে, যার নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও ভূরাজনীতিতে সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে।
কীভাবে বিশ্বের বৃহত্তম নৌবাহিনী গড়ে তুলল চীন?
সামুদ্রিক শক্তি হিসেবে চীনের উত্থানের মূলে রয়েছে নৌবাহিনীকে আধুনিক করা এবং বৈশ্বিক জাহাজ নির্মাণে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার সুপরিকল্পিত, দীর্ঘমেয়াদি কৌশল। ১৯৯০-এর দশকে চীনের নৌবাহিনীর বেশির ভাগই ছিল পুরোনো ধাঁচের। কিন্তু ২০২১ সালের মধ্যে দেশটির পিপলস লিবারেশন আর্মি নেভি (পিএলএএন) যুদ্ধক্ষমতাসম্পন্ন জাহাজের সংখ্যায় যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীকে ছাড়িয়ে যায়। বর্তমানে পিএলএএনের বহরে ৩৭০টির বেশি জাহাজ রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। ২০৩০ সালের মধ্যে এ সংখ্যা ৪৩৫-এ পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস রয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর জাহাজ রয়েছে প্রায় ২৯০টি, আর আগামী কয়েক দশকে লক্ষ্য ৩৮১টি।
চীনের বিশাল জাহাজ নির্মাণশিল্প এই রূপান্তরের চালিকাশক্তি। দেশটিতে প্রায় ১৭৫টি বড় জাহাজ নির্মাণ কারখানা রয়েছে। এর অনেকগুলোই দ্বৈত ব্যবহারের উপযোগী, অর্থাৎ সেখানে বাণিজ্যিক ও সামরিক—দুই ধরনের জাহাজই তৈরি করা যায়। ২০১৮ সাল থেকে বাণিজ্যিক জাহাজ নির্মাণে চীন বিশ্বে শীর্ষে রয়েছে। দেশটির জাহাজ নির্মাণ কারখানাগুলো যুক্তরাষ্ট্রের কারখানার তুলনায় ২০০ গুণ বেশি উৎপাদনক্ষম বলে ধারণা করা হয়। শুধু ২০২৪ সালেই চীনের চারটি বৃহত্তম জাহাজ নির্মাণ কারখানা মোট ৫ লাখ ৫০ হাজার টন ধারণক্ষমতার ৩৯টি যুদ্ধজাহাজ তৈরি করেছে—যা যুক্তরাজ্যের পুরো রাজকীয় নৌবাহিনীর চেয়েও বেশি।
২০১৯ সালে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত বৃহত্তম দুই জাহাজ নির্মাণ কোম্পানিকে একীভূত করে চায়না শিপবিল্ডিং গ্রুপ করপোরেশন গঠন করায় দেশটির জাহাজ নির্মাণের সক্ষমতা আরও বেড়েছে। এতে উৎপাদন ও প্রযুক্তি হস্তান্তর আরও সমন্বিত হয়েছে। এই সংহতির ফলে নৌযান নির্মাণ দ্রুত বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে; ২০১০ সালের পর থেকে পানিতে নামানো চীনা যুদ্ধজাহাজের প্রায় ৭০ শতাংশই এর উদাহরণ।
সামগ্রিক টন ধারণক্ষমতায় এবং বড় বিমানবাহী রণতরি ও পারমাণবিক সাবমেরিন পরিচালনায় যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী এখনো এগিয়ে। তবে উন্নত সারফেস কমব্যাট্যান্ট ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতায় ব্যবধান কমিয়ে আনছে চীন। গত দুই দশকে পিএলএএন তাদের ডেস্ট্রয়ার বহর দ্বিগুণ করেছে। ২০২৭ সালের মধ্যে উল্লম্বভাবে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের সেলসংখ্যায় যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে যাওয়ার পথে রয়েছে তারা, যা সমুদ্রে আরও উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের সুযোগ দেবে।
সামরিক-বেসামরিক সমন্বয়: চীনের অনন্য সুবিধা
চীনের জাহাজ নির্মাণে সাফল্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো দেশটির “সামরিক-বেসামরিক সমন্বয়” নীতি। এই পদ্ধতিতে বাণিজ্যিক ও সামরিক জাহাজ নির্মাণকে একীভূত করা হয়, ফলে কারখানাগুলো দ্রুত ও দক্ষতার সঙ্গে উৎপাদন লাইন বদলাতে পারে। দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য কারখানায় প্রথমে বাণিজ্যিক পণ্যবাহী জাহাজ তৈরি করে, প্রয়োজন হলে দ্রুতই যুদ্ধজাহাজ বা সহায়ক জাহাজ নির্মাণে যাওয়া যায়। বিশ্বে এ ধরনের নমনীয়তার তুলনা নেই। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে এটি নির্ণায়ক হতে পারে, কারণ চীন প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় অনেক দ্রুত ক্ষয়ক্ষতি পূরণ ও নৌ অভিযান চালিয়ে যেতে পারবে।
বিদেশি কোম্পানিগুলো প্রায়ই এসব দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য কারখানায় বাণিজ্যিক জাহাজ নির্মাণের আদেশ দেয়। প্রযুক্তি হস্তান্তর ও বৃহৎ পরিসরে উৎপাদনের সুবিধার মাধ্যমে তা পরোক্ষভাবে চীনের নৌবাহিনীর আধুনিকায়নেও সহায়তা করে। ফলে এমন একটি জাহাজ নির্মাণব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, যা চীনের বাণিজ্যিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে সমর্থনের পাশাপাশি তার ক্রমবর্ধমান সামরিক শক্তির ভিত্তিও জোগাচ্ছে।
কেন নৌবাহিনী সম্প্রসারণ করছে চীন?
অর্থনৈতিক, কৌশলগত ও ঐতিহাসিক নানা কারণ চীনের নৌবাহিনী সম্প্রসারণের পেছনে কাজ করছে। বিশ্বের বৃহত্তম বাণিজ্যিক দেশ হিসেবে চীন তার আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ৯৫ শতাংশের জন্য নিরাপদ সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীল। বিশ্বের ১০টি ব্যস্ততম বন্দরের ৭টিই চীনে অবস্থিত। তাই সামুদ্রিক নিরাপত্তা বেইজিংয়ের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের বিষয়।
কৌশলগতভাবে চীন দক্ষিণ ও পূর্ব চীন সাগরে নিজেদের ভূখণ্ডগত দাবি প্রতিষ্ঠা, আঞ্চলিক বিরোধে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ ঠেকানো এবং পারস্য উপসাগর ও আফ্রিকার সঙ্গে সংযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথসহ বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করছে। বেইজিং যে তাইওয়ানকে বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রদেশ মনে করে, সেখানে সম্ভাব্য সামরিক অভিযানেও সহায়তার লক্ষ্য রয়েছে পিএলএএনের আধুনিকায়নের।
অতীতে বিদেশি আগ্রাসন ও ঔপনিবেশিক যুগের অসম চুক্তির মতো অপমানের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে শক্তিশালী নৌবাহিনীর গুরুত্বের ওপর প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বারবার জোর দিয়েছেন। চীনের নৌ অস্ত্রভান্ডারের দ্রুত সম্প্রসারণকে জাতীয় গৌরবের পুনরুত্থান এবং শীর্ষ বিশ্বশক্তি হিসেবে চীনের অবস্থান সুরক্ষিত করার উপায় হিসেবে দেখা হয়।
বৈশ্বিক বিস্তার: বন্দর, ঘাঁটি ও বিদেশে প্রভাব
চীনের সামুদ্রিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এখন নিকটবর্তী অঞ্চল ছাড়িয়ে অনেক দূর বিস্তৃত। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ এবং মেরিটাইম সিল্ক রোডের মাধ্যমে চীন বিদেশের বন্দর ও অবকাঠামোয় ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। এতে এশিয়া, আফ্রিকা, এমনকি ইউরোপজুড়ে কৌশলগত অবস্থানের একটি নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছে। ২০২৩ সাল পর্যন্ত চীন ৬৬টি দেশের সঙ্গে ৭০টি দ্বিপক্ষীয় ও আঞ্চলিক নৌপরিবহন চুক্তি সই করেছে। এর মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে নৌপথ ও সেবা নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
বিদেশে চীনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনাটি জিবুতির দোরালেহ বন্দরে। জলদস্যুবিরোধী অভিযান এবং চীনা নৌযানকে রসদ সহায়তা দেওয়ার জন্য ২০১৭ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। কম্বোডিয়ার রিয়াম নৌঘাঁটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাণিজ্যিক স্থাপনা বলা হলেও সেখানে চীনা যুদ্ধজাহাজ অবস্থান করেছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় শক্তি বিস্তারের গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি হিসেবে একে দেখা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নিরক্ষীয় গিনি ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ আরও কয়েকটি স্থান চিহ্নিত করেছে, যেখানে চীন সামরিক স্থাপনা গড়ার চেষ্টা করতে পারে।
বিদেশে ১২৮টির বেশি সামরিক ঘাঁটি পরিচালনাকারী যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় চীনের কৌশল দ্বৈত ব্যবহারের সম্ভাবনাযুক্ত বাণিজ্যিক বন্দরে বিনিয়োগের ওপর নির্ভরশীল। এতে আনুষ্ঠানিক সামরিক ঘাঁটি চুক্তির রাজনৈতিক জটিলতা এড়িয়ে বেইজিং কৌশলগত নমনীয়তা বজায় রাখতে পারে। পাশাপাশি প্রয়োজন হলে দ্রুত নৌবাহিনীর শক্তি মোতায়েনের সুযোগও থাকে।
যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে জবাব দিচ্ছে?
চীনের নৌবাহিনীর সম্প্রসারণের ব্যাপকতা ও গতি ওয়াশিংটন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব জাহাজ নির্মাণ সক্ষমতা দ্রুত কমেছে। চীনের ১৭৫টির তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রে বড় জাহাজ নির্মাণ কারখানা রয়েছে মাত্র ৭টি। বিশ্বজুড়ে জাহাজ নির্মাণ সক্ষমতার ০.১ শতাংশেরও কম এখন যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে; দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে দেশটির আধিপত্যের সঙ্গে এর তীব্র পতন স্পষ্ট।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই প্রবণতা উল্টে দিতে একের পর এক নীতিগত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের সামুদ্রিক আধিপত্য পুনরুদ্ধারে একটি নির্বাহী আদেশ জারি করে। এতে কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলোকে মেরিটাইম অ্যাকশন প্ল্যান তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের বন্দরে প্রবেশকারী চীন-নির্মিত জাহাজের ওপর নতুন ফি আরোপের প্রস্তাব করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের জাহাজ নির্মাণ ও মেরামতশিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করা, কর্মীদের প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ এবং জাহাজ নির্মাণ কারখানার আধুনিকায়নে কংগ্রেস কয়েক হাজার কোটি ডলারের তহবিল বরাদ্দের আইন পাস করেছে।
জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত ও ফিলিপাইনের মতো মিত্রদের সঙ্গে অংশীদারত্ব আরও গভীর করার উদ্যোগও চলছে। ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্রের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করছে যুক্তরাষ্ট্র। এখন জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার বাণিজ্যিক জাহাজ নির্মাণ কারখানায় মার্কিন যুদ্ধজাহাজের বড় ধরনের মেরামত হচ্ছে। চীনের ক্রমবর্ধমান নৌ-পরিসরের মুখে বিশ্বাসযোগ্য অগ্রবর্তী উপস্থিতি বজায় রাখতে এসব আঞ্চলিক সহযোগিতা অপরিহার্য বলে মনে করা হয়।
এসব উদ্যোগ সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে। উৎপাদন ঘাটতি, শ্রমিক সংকট ও স্থাপনার সীমাবদ্ধতার কারণে ব্যয়বহুল বিলম্ব হচ্ছে এবং কার্যক্রম পরিচালনার প্রস্তুতি কমছে। আরলেই বার্ক-শ্রেণির ডেস্ট্রয়ারের মতো উন্নত যুদ্ধজাহাজ নির্মাণে চীনের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রে কয়েক বছর বেশি সময় লাগে। গত দুই দশকে যুক্তরাষ্ট্রের জাহাজ নির্মাণশিল্পের কর্মীসংখ্যা ১ লাখ ২০ হাজার থেকে কমে প্রায় ৭২ হাজারে নেমেছে, যা সম্প্রসারণ পরিকল্পনাকে আরও বাধাগ্রস্ত করছে।
ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে জোট ও কৌশলগত অবস্থান
চীনের সামুদ্রিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা মোকাবিলায় ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে জোট ও নিরাপত্তা অংশীদারত্ব জোরদার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র জাপান জরুরি পরিস্থিতিতে সামরিক ব্যবহারের জন্য ১৪টি বিমানবন্দর ও ২৬টি সমুদ্রবন্দর নির্ধারণ করেছে। এর মাধ্যমে তথাকথিত ফার্স্ট আইল্যান্ড চেইন আরও শক্তিশালী হচ্ছে—জাপান থেকে তাইওয়ান ও ফিলিপাইন পর্যন্ত বিস্তৃত একটি প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। অস্ট্রেলিয়া, জাপান ও ভারতকে নিয়ে গঠিত অকাস চুক্তি এবং কোয়াড উদ্যোগের লক্ষ্য সামুদ্রিক নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানো ও চীনের আগ্রাসন প্রতিহত করা।
জাপান তার ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থাও জোরদার করেছে এবং বেসামরিক অবকাঠামোয় আত্মরক্ষা বাহিনীর প্রবেশাধিকার বাড়িয়েছে। চীনের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রভান্ডার এবং রিউকিউ দ্বীপপুঞ্জ ও তাইওয়ানের কাছে দেশটির নৌ তৎপরতা নিয়ে বাড়তে থাকা উদ্বেগের প্রতিফলন এসব পদক্ষেপ। চীনের সামরিক তৎপরতা ঠেকানো এবং প্রতিরোধক্ষমতা দেখানোই এগুলোর লক্ষ্য।
ঝুঁকি ও বৈশ্বিক প্রভাব কী?
চীনের জাহাজ নির্মাণে আধিপত্য ও নৌবাহিনীর সম্প্রসারণ বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি তৈরি করছে। পিএলএএনের দ্রুত বিকাশ সামুদ্রিক দাবি কার্যকর করা, শক্তি বিস্তার এবং দক্ষিণ চীন সাগর ও তাইওয়ান প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করার সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। ২০২৫ সালের আগস্টে স্কারবরো শোলের কাছে পিএলএএনের একটি ডেস্ট্রয়ারের সঙ্গে চীনের কোস্ট গার্ডের একটি জাহাজের সংঘর্ষের মতো সাম্প্রতিক ঘটনা দেশটির সামুদ্রিক বাহিনীর দৃঢ় অবস্থান এবং সমন্বয়ের চ্যালেঞ্জ—দুটিই তুলে ধরেছে।
বিদেশের বন্দর ও ঘাঁটির ক্রমবর্ধমান নেটওয়ার্ক, যার অনেকগুলোই দ্বৈত ব্যবহারের উপযোগী, নৌবাহিনীর সম্পদ মোতায়েন এবং দূরপাল্লার অভিযান পরিচালনায় চীনকে আরও নমনীয়তা দেয়। তবে এ পদ্ধতি স্বাগতিক দেশগুলোর জন্য ঝুঁকিও তৈরি করে। এসব দেশের অনেকেই চীনের কাছে ব্যাপক ঋণগ্রস্ত এবং অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতায় ভুগছে। কৌশলগত প্রভাব বিস্তারে বাণিজ্যিক বিনিয়োগ ব্যবহারের ফলে ঋণের টেকসই অবস্থা এবং চীনা অর্থায়নে তৈরি বন্দর থাকা দেশগুলোর কূটনৈতিক অবস্থান বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য দেশের ভেতরে জাহাজ নির্মাণ সক্ষমতার পতন সামরিক প্রস্তুতি এবং গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ সুরক্ষার সামর্থ্যকে হুমকির মুখে ফেলছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক নৌবহরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে চলাচলকারী জাহাজের সংখ্যা ১৮০টির নিচে নেমে এসেছে, ফলে সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে সৈন্য ও সরঞ্জাম সমুদ্রপথে পরিবহনের সক্ষমতা সীমিত হচ্ছে। জাহাজ নির্মাণের দক্ষতা ও শিল্পভিত্তির ক্ষতিকে জাতীয় নিরাপত্তার ঝুঁকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। এ কারণে মার্কিন সামুদ্রিক শক্তি পুনর্গঠনে আধুনিককালের মার্শাল প্ল্যানের আহ্বান উঠেছে।
প্রযুক্তি ও পরিচালনাগত ব্যবধান
জাহাজের সংখ্যায় চীনের নৌবাহিনী এখন বৃহত্তম হলেও কিছু ক্ষেত্রে তারা যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে পিছিয়ে। পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিনে যুক্তরাষ্ট্রের স্পষ্ট এগিয়ে থাকা—চীনের ১২টির বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে ৬৬টি। বড় বিমানবাহী রণতরিও যুক্তরাষ্ট্রের বেশি। বিশেষ করে সাবমেরিন ও বিমানবাহী রণতরির বিমান পরিচালনায় চীনা নৌপ্রযুক্তিকে কম উন্নত বলে মনে করা হয়। তবে টাইপ ০০৩ বিমানবাহী রণতরি ও চালকবিহীন পানির নিচের ড্রোনের মতো নতুন প্ল্যাটফর্মে বিনিয়োগ বাড়ায় ব্যবধান কমছে।
দ্রুত জাহাজ মেরামত ও প্রতিস্থাপনের সক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে চীনকে কৌশলগত সুবিধা দেয়। তবে এসব সম্পদের কার্যকর ব্যবহার নির্ভর করে কর্মীদের দক্ষতা, প্রশিক্ষণ ও সমন্বয়ের ওপর। ২০২৫ সালের আগস্টে দক্ষিণ চীন সাগরে সংঘর্ষটি পিএলএএন ও চীনের কোস্ট গার্ডের মধ্যে কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত সমস্যা সামনে এনেছে। এতে বিভিন্ন সামুদ্রিক বাহিনীকে সমন্বিত করার চ্যালেঞ্জ স্পষ্ট হয়েছে।
আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া
চীনের নৌবাহিনীর সম্প্রসারণ ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলসহ বিশ্বের নানা জায়গায় বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের মতো আঞ্চলিক দেশগুলো প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়িয়েছে, সামুদ্রিক টহল জোরদার করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা গভীর করেছে। দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের দৃঢ় অবস্থান নিয়ে সতর্ক দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো বেইজিংয়ের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং নিরাপত্তা উদ্বেগের মধ্যে ভারসাম্য আনার চেষ্টা করছে।
চীনের বাইরে জাহাজ নির্মাণ সক্ষমতা বাড়াতেও যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা কাজ করছে। মিত্রদেশগুলোর জাহাজ নির্মাণ কারখানায় বিনিয়োগ, চীন-নির্মিত জাহাজের ওপর নোঙর ফি আরোপ এবং চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত জাহাজ নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আর্থিক সম্পর্ক ছিন্ন করার সুপারিশ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিক সংগঠন ও শিল্প খাতের বিভিন্ন গোষ্ঠী দেশের জাহাজ নির্মাণশিল্পে জোরালো সহায়তা এবং চীনের আধিপত্যের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির আহ্বান জানিয়েছে।
চীন অবশ্য জোর দিয়ে বলে, তাদের নৌবাহিনীর সম্প্রসারণ প্রতিরক্ষামূলক এবং সামুদ্রিক স্বার্থ সুরক্ষার উদ্দেশ্যে। চীনা কর্মকর্তারা বলেছেন, তাইওয়ান ছাড়া বিদেশে সামরিক হস্তক্ষেপের কোনো আগ্রহ দেশটির নেই; তাইওয়ানই সম্ভাব্য সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু। তবে আন্তর্জাতিক জলসীমায়, অস্ট্রেলিয়ার আশপাশে এবং জাপানের কাছে চীনা যুদ্ধজাহাজের উপস্থিতি বাড়ায় আঞ্চলিক উদ্বেগ তীব্র হয়েছে এবং আরও স্বচ্ছতা ও আস্থা তৈরির পদক্ষেপের দাবি উঠেছে।
বৈশ্বিক সামুদ্রিক শক্তির ভবিষ্যৎ কী?
চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান নৌ অস্ত্র প্রতিযোগিতা বৈশ্বিক সামুদ্রিক ব্যবস্থাকে নতুন রূপ দিচ্ছে। রাষ্ট্রীয় সহায়তায় পরিচালিত চীনের জাহাজ নির্মাণ খাত, কৌশলগত বিনিয়োগ ও উৎপাদন দক্ষতার সমন্বয়ে পিএলএএনকে এমন পরিসরে সম্প্রসারিত করেছে, যার সঙ্গে পাল্লা দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে, কাঠামোগত ও পরিচালনাগত চ্যালেঞ্জ যুক্তরাষ্ট্রের নৌ উৎপাদনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে অগ্রবর্তী উপস্থিতি ধরে রাখার ক্ষমতা সীমিত করছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, যুক্তরাষ্ট্র সাহসী পদক্ষেপ না নিলে এবং সামুদ্রিক শিল্পভিত্তিতে বিনিয়োগ না করলে সমুদ্রের নিয়ন্ত্রণ এবং সামুদ্রিক শক্তি থেকে আসা ভূরাজনৈতিক প্রভাব হারানোর ঝুঁকি রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক শক্তির মেরুদণ্ড মহাসাগরগুলো। নৌ শক্তির বর্তমান ভারসাম্য বদলে গেলে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও নিয়মভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থায় গভীর প্রভাব পড়তে পারে।
চীন নৌবাহিনী ও বৈশ্বিক বন্দর নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ অব্যাহত রাখায় যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের প্রতিক্রিয়ার দিকে বিশ্ব নিবিড়ভাবে নজর রাখবে। এই প্রতিযোগিতার ফল আগামী কয়েক দশকের সামুদ্রিক শক্তির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
মূল বিষয়গুলো
- জাহাজের সংখ্যায় চীন এখন বিশ্বের বৃহত্তম নৌবাহিনী পরিচালনা করছে। তাদের যুদ্ধজাহাজের সংখ্যা ৩৭০টির বেশি এবং ২০৩০ সালের মধ্যে তা ৪৩৫টিতে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
- বিশ্বের মোট জাহাজ নির্মাণাদেশের ৬০ শতাংশের বেশি চীনের শিল্পের দখলে; দেশটির জাহাজ নির্মাণ খাত যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ২০০ গুণ বেশি উৎপাদনক্ষম বলে ধারণা করা হয়।
- সামগ্রিক টন ধারণক্ষমতা, বিমানবাহী রণতরি ও পারমাণবিক সাবমেরিনে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী এখনো এগিয়ে। তবে উন্নত সারফেস কমব্যাট্যান্ট ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতায় দ্রুত ব্যবধান কমিয়ে আনছে চীন।
- চীনের সামরিক-বেসামরিক সমন্বয় নীতি নৌযান নির্মাণ দ্রুত বাড়ানো এবং বাণিজ্যিক জাহাজ নির্মাণ কারখানার দ্বৈত ব্যবহারের সুযোগ দেয়।
- কৌশলগত বন্দর ও বেছে নেওয়া সামরিক ঘাঁটির বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক এশিয়ার বাইরে চীনের উপস্থিতি বিস্তৃত করছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামুদ্রিক আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।
- জাহাজ নির্মাণশিল্প পুনরুজ্জীবিত করতে এবং ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে জোট গভীর করতে যুক্তরাষ্ট্র কয়েক শ কোটি ডলার বিনিয়োগ করছে। তবে কর্মী, সক্ষমতা ও ক্রয়প্রক্রিয়ায় বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
- আঞ্চলিক দেশগুলো প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার, সামরিক অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা উদ্বেগের মধ্যে ভারসাম্য আনার মাধ্যমে সাড়া দিচ্ছে।
- চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান নৌ প্রতিযোগিতা বৈশ্বিক শক্তির সমীকরণ বদলে দিচ্ছে এবং আগামী বহু বছর আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও বাণিজ্যে প্রভাব ফেলবে।






