ভিয়েতনামের প্রযুক্তি শিল্পের উত্থান: সামান্য সূচনা থেকে বৈশ্বিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা
গত তিন দশকে ভিয়েতনামের প্রযুক্তি খাতে উল্লেখযোগ্য রূপান্তর ঘটেছে। একসময় সীমিত অবকাঠামো ও বৈশ্বিক অভিজ্ঞতার অভাবই ছিল এ খাতের পরিচয়। এখন ভিয়েতনামের প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো আন্তর্জাতিক বাজারের সামনের সারিতে রয়েছে; বিশ্বজুড়ে রপ্তানি করছে ডিজিটাল সমাধান, সফটওয়্যার ও উদ্ভাবন। স্থানীয় অগ্রপথিক থেকে বৈশ্বিক শক্তিধর হয়ে ওঠার এই যাত্রা শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গল্প নয়, বরং ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা, অভিযোজন এবং কৌশলগত দূরদৃষ্টিরও গল্প।
সূচিপত্র
- ভিয়েতনামের প্রযুক্তি শিল্পের উত্থান: সামান্য সূচনা থেকে বৈশ্বিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা
- ভিয়েতনামের প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো কীভাবে বিশ্ববাজারে পৌঁছাল?
- নতুন প্রজন্ম, নতুন কৌশল
- বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিভা ও বিনিয়োগের কাছে ভিয়েতনাম কেন আকর্ষণীয়?
- বৈশ্বিক অংশীদারত্ব ও বাস্তুতন্ত্রের বিকাশ
- নীতিগত সংস্কার: বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার জন্য আইনি কাঠামো গড়ে তোলা
- বৈশ্বিক নেতৃত্বের পথে চ্যালেঞ্জ
- উদাহরণ: ভিয়েতনামের প্রযুক্তি খাতের সাফল্যের গল্প
- এফপিটি করপোরেশন: আউটসোর্সিং থেকে ডিজিটাল রূপান্তর
- ভিয়েতেল গ্রুপ: উদীয়মান বাজারে টেলিযোগাযোগের অগ্রপথিক
- রিকিফট ও আমানোটস: শুরু থেকেই বৈশ্বিক স্টার্টআপ
- আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও সহযোগিতা
- ভিয়েতনামের প্রযুক্তি শিল্পের পরবর্তী লক্ষ্য কী?
- সংক্ষেপে
বর্তমানে দ্রুত সম্প্রসারণ, দক্ষ কর্মীবাহিনী এবং উচ্চমূল্যের বাজারে ক্রমবর্ধমান উপস্থিতির জন্য ভিয়েতনামের প্রযুক্তি শিল্প বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত। ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি বাজার থেকে দেশটির আয় বেড়ে দাঁড়ায় ১১.৫ বিলিয়ন ডলারে, কয়েক বছর আগেও যা ছিল ৭.৫ বিলিয়ন ডলার। ৫২ হাজারের বেশি ডিজিটাল ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং বিদেশে আয় করে এমন ১,৫০০-এর বেশি প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতিতে ভিয়েতনাম এখন আর শুধু আউটসোর্সিংয়ের গন্তব্য নয়; এটি উদ্ভাবন ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতারও উৎস।
ভিয়েতনামের প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো কীভাবে বিশ্ববাজারে পৌঁছাল?
এই যাত্রার শুরু ১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে। তখন এফপিটি ও ভিয়েতেলের মতো কোম্পানি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সাহসী উদ্যোগ নেয়। সে সময় ভিয়েতনামের প্রযুক্তি খাত ছিল একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ে; প্রোগ্রামার ছিলেন মাত্র প্রায় ২,০০০ জন, যাঁদের অধিকাংশেরই ইংরেজিতে দক্ষতা ও বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা ছিল না। এসব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও এফপিটির নেতৃত্ব “রপ্তানি করো, নইলে বিলীন হও” কৌশল গ্রহণ করে। প্রোগ্রামারদের প্রশিক্ষণ ও সফটওয়্যার রপ্তানির উদ্যোগে তারা নগদ সঞ্চয়ের পুরোটা বিনিয়োগ করে। তখনকার ছোট টেলিযোগাযোগ কোম্পানি ভিয়েতেলও বিদেশের বাজার লক্ষ্য করে। শেখা, প্রতিযোগিতা করা ও ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করার লক্ষ্যে তারা কম্বোডিয়া ও লাওসে প্রকল্প চালু করে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মতো বাজারে প্রবেশের প্রাথমিক উদ্যোগগুলো বাধার মুখে পড়ে। ২০০০ সালের ডট-কম ধস সম্ভাব্য অংশীদারদের অনেককে বাজার থেকে সরিয়ে দেয়, আর ব্র্যান্ড পরিচিতির অভাবে ব্যবসা পাওয়াও কঠিন হয়ে ওঠে। তবে ভিয়েতনামের কোম্পানিগুলো দ্রুত নিজেদের মানিয়ে নেয়। কঠোর মানদণ্ড থাকলেও অফশোর সফটওয়্যার উন্নয়নের স্থিতিশীল চাহিদা থাকায় এফপিটি জাপানের দিকে মনোযোগ দেয়। উন্নয়ন কেন্দ্র গড়ে তোলা, একীভবনের মাধ্যমে নতুন প্রযুক্তি অর্জন এবং সিঙ্গাপুর, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে এফপিটি ধীরে ধীরে বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
অন্যদিকে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ভিয়েতেলকে সাংস্কৃতিক ও আইনি বাধা থেকে শুরু করে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও রাজনৈতিক অস্থিরতা—বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, মোজাম্বিকে বন্যা ও ঝড়ের পর নেটওয়ার্ক সচল করতে গিয়ে ভিয়েতেলের প্রকৌশলীরা জীবন ঝুঁকিতে ফেলেছিলেন। তাঁদের অধ্যবসায় সাফল্য এনে দিয়েছে: ভিয়েতেল এখন তিনটি মহাদেশের ১০টি দেশে কার্যক্রম পরিচালনা করছে, ৯ কোটি ব্যবহারকারীকে সেবা দিচ্ছে এবং এর সাতটি দেশের মোবাইল বাজারে শীর্ষস্থানীয়।
নতুন প্রজন্ম, নতুন কৌশল
রিকিফট, আমানোটস, এলসা স্পিক, স্কাই মাভিস ও কাইবার নেটওয়ার্কের মতো ভিয়েতনামের নতুন প্রজন্মের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো শুরু থেকেই বৈশ্বিক বাজারকে লক্ষ্য করে গড়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন প্রকৌশলীদের প্রতিষ্ঠিত এসব কোম্পানি প্রথম থেকেই বৈশ্বিক ব্যবহারকারীদের জন্য পণ্য তৈরি করেছে। উদাহরণস্বরূপ, রিকিফট যুক্তরাষ্ট্রে ১,০০০টির বেশি প্রকল্প সম্পন্ন করেছে এবং তাদের গ্রাহক ধরে রাখার হার ৯৭ শতাংশ। অন্যদিকে, ১৯০টি দেশে আমানোটসের মিউজিক গেম ৩৫০ কোটির বেশি বার ডাউনলোড হয়েছে।
এসব কোম্পানি “দ্রুত ব্যর্থ হও, আরও দ্রুত শেখো” মানসিকতা গ্রহণ করেছে। তারা স্থানীয় বাজারের উপযোগী করে পণ্য বদলাচ্ছে, কনটেন্ট তৈরিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কাজে লাগাচ্ছে এবং আন্তর্জাতিকভাবে সম্প্রসারণযোগ্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে মনোযোগ দিচ্ছে। শুরুতেই বিদেশের বাজারকে লক্ষ্য করায় তারা সরাসরি বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে, ফলে শেখার গতি ও বাজারে পৌঁছানোর পরিসর বাড়ছে।
বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিভা ও বিনিয়োগের কাছে ভিয়েতনাম কেন আকর্ষণীয়?
প্রযুক্তি কেন্দ্র হিসেবে ভিয়েতনামের আকর্ষণের পেছনে রয়েছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ:
- তরুণ, দক্ষ কর্মীবাহিনী: ১৬ লাখ ৭০ হাজারের বেশি তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী এবং বছরে ৫০ হাজারের বেশি নতুন স্নাতক মিলে প্রতিভার বড় ভাণ্ডার গড়ে তুলেছেন। জনসংখ্যার অধিকাংশের বয়স ৩৫ বছরের নিচে, আর ইংরেজিতে দক্ষতাও বাড়ছে।
- সাশ্রয়ী ব্যয়: উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর তুলনায় ভিয়েতনামের প্রযুক্তি পেশাজীবীদের নিয়োগে খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কম। ফলে কোম্পানিগুলো আর্থিক দক্ষতা বজায় রেখেই উচ্চমানের দক্ষতা কাজে লাগাতে পারে।
- সরকারি সহায়তা: বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত (এসটিইএম) শিক্ষায়, ডিজিটাল অবকাঠামো এবং উদ্ভাবন কেন্দ্রে ব্যাপক বিনিয়োগ সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সবুজ জ্বালানি খাতের প্রবৃদ্ধিতে গতি এনেছে।
- কৌশলগত অবস্থান: এশিয়ার বড় বাজারগুলোর কাছাকাছি অবস্থান, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক সরবরাহশৃঙ্খলে সম্পৃক্ততা আঞ্চলিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ভিয়েতনামকে আকর্ষণীয় ঘাঁটি করে তুলেছে।
আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি জায়ান্টদের নজরও পড়েছে। এনভিডিয়া ভিয়েতনামে একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণা কেন্দ্র ও ডেটা সেন্টার স্থাপন করছে, গুগল ডিজিটাল রূপান্তরে সহায়তার জন্য স্থানীয় প্রতিষ্ঠান চালু করেছে এবং অ্যাপলের সরবরাহকারী ফক্সকন চিপ উৎপাদনে বিনিয়োগ করছে। এসব উদ্যোগের মধ্য দিয়ে কম খরচে উৎপাদনের গন্তব্য থেকে প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও প্রতিভার কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে ভিয়েতনাম।
বৈশ্বিক অংশীদারত্ব ও বাস্তুতন্ত্রের বিকাশ
বৈশ্বিক সম্প্রসারণ ত্বরান্বিত করতে ভিয়েতনামের কোম্পানিগুলো ক্রমেই কৌশলগত অংশীদারত্ব গড়ে তুলছে। বৈশ্বিক ডেটা সেন্টার সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ইকুইনিক্সের সঙ্গে এফপিটির সহযোগিতার ফলে ভিয়েতনামের কোম্পানিগুলো আন্তর্জাতিক কার্যক্রমের জন্য উচ্চগতির, স্বল্প বিলম্বের সংযোগ পাচ্ছে। একইভাবে, দাসো সিস্টেমসের সঙ্গে ভিয়েতেলের অংশীদারত্বের লক্ষ্য হলো উৎপাদন ও গবেষণা-উন্নয়নে উদ্ভাবন ত্বরান্বিত করতে উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল নকশা ও সিমুলেশন প্রযুক্তি কাজে লাগানো।
এসব জোট শুধু অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকারই দেয় না; প্রতিভা বিকাশ, দক্ষতা উন্নয়ন ও জ্ঞান বিনিময়েও সহায়তা করে, যা ডিজিটাল যুগে টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য জরুরি।
নীতিগত সংস্কার: বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার জন্য আইনি কাঠামো গড়ে তোলা
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ডিজিটাল প্রযুক্তির গুরুত্ব স্বীকার করে ভিয়েতনাম সরকার প্রযুক্তি রপ্তানি ও আন্তর্জাতিকীকরণে সহায়তার জন্য ব্যাপক সংস্কার করেছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে পাস হওয়া ডিজিটাল প্রযুক্তি শিল্প আইনটি ডিজিটাল খাতের জন্য বিশ্বের প্রথম সমন্বিত আইন। এতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্রিপ্টোকারেন্সি ও প্রযুক্তি স্টার্টআপবিষয়ক বিধিবিধানকে একটি কাঠামোর অধীনে আনা হয়েছে। এর লক্ষ্য:
- ২০৩৫ সালের মধ্যে প্রযুক্তি কোম্পানির সংখ্যা ১ লাখ ৫০ হাজারে উন্নীত করা
- ভিয়েতনামের ব্র্যান্ডগুলোকে বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে উৎসাহিত করা
- প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কর ও আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া
- শিক্ষায় অর্থায়ন, কর অব্যাহতি ও সহজ ভিসা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রতিভা বিকাশে সহায়তা করা
- বিদেশে ডিজিটাল প্রযুক্তি কার্যালয় এবং সেমিকন্ডাক্টর ও সবুজ প্রযুক্তির মতো খাতের জন্য বিশেষ প্রযুক্তি অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করা
এই সমন্বিত পদ্ধতির লক্ষ্য ব্যবস্থাপনা সহজ করা, বিনিয়োগ আকর্ষণ করা এবং উদ্যোক্তাদের জন্য নীতিমালা স্পষ্ট করা। এতে ব্লকচেইন ও ফিনটেকের জন্য নিয়ন্ত্রক স্যান্ডবক্সও চালু করা হয়েছে, যেখানে সরকারের তত্ত্বাবধানে উদ্ভাবনী ব্যবসায়িক মডেল পরীক্ষা করা যাবে।
বৈশ্বিক নেতৃত্বের পথে চ্যালেঞ্জ
এসব অগ্রগতি সত্ত্বেও ভিয়েতনামের প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে উল্লেখযোগ্য বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে:
- কর্মীবাহিনীর দক্ষতা: প্রতিভার ভাণ্ডার বড় হলেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সেমিকন্ডাক্টরের মতো উন্নত ক্ষেত্রে উচ্চদক্ষ পেশাজীবীর ঘাটতি রয়েছে। বেশি বেতনের প্রলোভনে প্রায়ই বিদেশে চলে যাওয়া শীর্ষ প্রতিভাদের ধরে রাখাও একটি চ্যালেঞ্জ।
- ব্র্যান্ড পরিচিতি: অনেক আন্তর্জাতিক বাজারে ভিয়েতনামের প্রযুক্তি ব্র্যান্ড এখনো তুলনামূলকভাবে অপরিচিত। ফলে চুক্তি পাওয়া ও আস্থা তৈরি করা কঠিন হয়।
- বাজারে প্রবেশের বাধা: যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মতো বাজারে মেধাস্বত্ব, সাইবার নিরাপত্তা ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত কঠোর আইনি কাঠামো প্রবেশ ও প্রবৃদ্ধি সীমিত করতে পারে।
- সরকারি সহায়তা সীমিত: আঞ্চলিক প্রতিযোগীদের তুলনায় বাণিজ্য প্রসার ও বাস্তুতন্ত্রের বিকাশে অর্থায়ন এখনো কম।
- মূল্যশৃঙ্খলে অবস্থান: বেশির ভাগ কোম্পানি এখনো আউটসোর্সিং ও সেবা প্রদানে মনোযোগী। দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতার সক্ষমতার জন্য মূল্যশৃঙ্খলে আরও ওপরে উঠে পরামর্শ, সমাধান নকশা ও নিজস্ব পণ্য উন্নয়নে যেতে হবে।
বিশেষজ্ঞ ও শিল্পনেতারা আরও সমন্বিত বাস্তুতন্ত্র, উন্নত তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষা এবং বৈশ্বিক পরিসরে ভিয়েতনামের প্রযুক্তি ভাবমূর্তি তুলে ধরতে সমন্বিত জাতীয় প্রচারের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিচ্ছেন। বড় প্রযুক্তি কেন্দ্রে যৌথ কার্যালয় গড়ে তোলা, বাণিজ্য প্রসারের বাজেট বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করাকে পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
উদাহরণ: ভিয়েতনামের প্রযুক্তি খাতের সাফল্যের গল্প
এফপিটি করপোরেশন: আউটসোর্সিং থেকে ডিজিটাল রূপান্তর
এফপিটির যাত্রায় ভিয়েতনামের প্রযুক্তি খাতের বিবর্তন প্রতিফলিত হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতে প্রাথমিক বাধার পর অফশোর সফটওয়্যার উন্নয়নে মনোযোগ দিয়ে জাপানে সাফল্য পায় এফপিটি। পরে একীভবন ও অধিগ্রহণের মাধ্যমে ডিজিটাল রূপান্তর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ক্লাউড কম্পিউটিংয়ে বৈশ্বিক উপস্থিতি গড়ে তোলে প্রতিষ্ঠানটি। ২০২৪ সাল নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে এফপিটির আয় বেড়ে ১.৭ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। ফরচুন ৫০০-এর কোম্পানিগুলোর সঙ্গে চুক্তির পাশাপাশি হার্ডওয়্যার ও অটোমোটিভ প্রযুক্তিতে এর পণ্যসম্ভারও বাড়ছে।
ভিয়েতেল গ্রুপ: উদীয়মান বাজারে টেলিযোগাযোগের অগ্রপথিক
কম্বোডিয়া ও লাওসে প্রকল্প দিয়ে ভিয়েতেলের আন্তর্জাতিক সম্প্রসারণ শুরু হয়, যা শেষ পর্যন্ত তিনটি মহাদেশের ১০টি দেশে পৌঁছায়। অবকাঠামোয় বিনিয়োগ, স্থানীয় পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও অধ্যবসায়ের কারণে কোম্পানিটি কয়েকটি বাজারে শীর্ষস্থান অর্জন করেছে। দাসো সিস্টেমসের সঙ্গে অংশীদারত্বের মতো কৌশলগত উদ্যোগ এখন ভিয়েতেলকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস ও স্মার্ট উৎপাদনের মতো উচ্চপ্রযুক্তি খাতে এগিয়ে যেতে সহায়তা করছে।
রিকিফট ও আমানোটস: শুরু থেকেই বৈশ্বিক স্টার্টআপ
জাপানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রকৌশলীদের প্রতিষ্ঠিত রিকিফট দ্রুত আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়ে মান ও পেশাদারত্বের সুনাম গড়ে তোলে। জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রে তাদের দ্রুত প্রবৃদ্ধি প্রমাণ করে, ভিয়েতনামের স্টার্টআপগুলোর বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার সম্ভাবনা রয়েছে। হো চি মিন সিটিভিত্তিক মিউজিক গেম কোম্পানি আমানোটস কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও শুরু থেকেই বৈশ্বিক বাজারকে লক্ষ্য করার কৌশল কাজে লাগিয়ে ১৯০টি দেশে ৩৫০ কোটি ডাউনলোড পেয়েছে এবং নিজস্ব ক্ষেত্রের শীর্ষ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও সহযোগিতা
ভিয়েতনামের উত্থান বৈশ্বিক প্রযুক্তি জায়ান্টদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণায় এনভিডিয়ার বিনিয়োগ, গুগলের স্থানীয় সম্প্রসারণ এবং ফক্সকনের চিপ উৎপাদন প্রকল্প এর কয়েকটি উদাহরণ। এসব বিনিয়োগ শুধু পুঁজিই আনে না; অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক সর্বোত্তম চর্চার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগও তৈরি করে, যা ভিয়েতনামের প্রযুক্তি বাস্তুতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করে।
ভিয়েতনামের প্রযুক্তি শিল্পের পরবর্তী লক্ষ্য কী?
ভিয়েতনামের উচ্চাকাঙ্ক্ষা স্পষ্ট: বিশ্বের উৎপাদনকেন্দ্র থেকে প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও নেতৃত্বের কেন্দ্রে পরিণত হওয়া। এর ভিত্তি ইতিমধ্যে তৈরি হয়েছে—অনুকূল জনমিতি, সরকারি সহায়তা এবং মান ও নির্ভরযোগ্যতার ক্রমবর্ধমান সুনাম। তবে এই লক্ষ্য পূরণে প্রয়োজন:
- বিশেষ করে উন্নত ক্ষেত্রে শিক্ষা ও প্রতিভা বিকাশে অব্যাহত বিনিয়োগ
- স্টার্টআপ ও উদ্ভাবনী কোম্পানির জন্য সহজতর বিধিবিধান ও দ্রুত অনুমোদন প্রক্রিয়া
- মেধাস্বত্ব সুরক্ষা ও সাইবার নিরাপত্তার মান জোরদার করা
- শীর্ষ প্রযুক্তি দেশগুলোর সঙ্গে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও দ্বিপক্ষীয় চুক্তি বাড়ানো
- সমন্বিত বিপণন ও বাণিজ্য উদ্যোগের মাধ্যমে ভিয়েতনামের প্রযুক্তি ব্র্যান্ডের প্রচার
বিশ্বজুড়ে ডিজিটাল রূপান্তর ত্বরান্বিত হচ্ছে এবং উন্নত দেশগুলো প্রযুক্তি প্রতিভার তীব্র ঘাটতিতে পড়ছে। এ অবস্থায় নির্ভরযোগ্য তথ্যপ্রযুক্তি গন্তব্য হিসেবে ভিয়েতনামের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে। এখন চ্যালেঞ্জ হলো বৈশ্বিক মূল্যশৃঙ্খলে আরও ওপরে ওঠা—আউটসোর্সিং থেকে উদ্ভাবনে এবং সেবা প্রদান থেকে সমাধান প্রদানের নেতৃত্বে পৌঁছানো।
সংক্ষেপে
- স্থানীয় সূচনা থেকে ভিয়েতনামের প্রযুক্তি শিল্প বৈশ্বিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে; ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আয় হয়েছে ১১.৫ বিলিয়ন ডলার।
- এফপিটি ও ভিয়েতেলের মতো অগ্রপথিকেরা বিশ্বমুখী স্টার্টআপের নতুন প্রজন্মের পথ তৈরি করেছে।
- তরুণ ও দক্ষ কর্মীবাহিনী, সাশ্রয়ী ব্যয় এবং সরকারের জোরালো সহায়তা এ খাতের প্রধান শক্তি।
- এনভিডিয়া ও গুগলের মতো প্রতিষ্ঠানের বড় আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ভিয়েতনামের প্রযুক্তিগত রূপান্তর ত্বরান্বিত করছে।
- ডিজিটাল প্রযুক্তি শিল্প আইনসহ নীতিগত সংস্কারের লক্ষ্য রপ্তানি ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা বাড়ানো।
- প্রতিভা ধরে রাখা, ব্র্যান্ড পরিচিতি এবং মূল্যশৃঙ্খলে ওপরে ওঠার ক্ষেত্রে এখনো চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
- ভিয়েতনামের লক্ষ্য বিশ্বমানের প্রযুক্তি কেন্দ্রে পরিণত হওয়া, যেখানে শুধু সেবা নয়, উদ্ভাবন ও নেতৃত্বও রপ্তানি হবে।






