আফ্রিকার জন্য জাপানের সাহসী নতুন দৃষ্টিভঙ্গি: TICAD 9-এ বিনিয়োগ, উদ্ভাবন ও অংশীদারত্ব
জাপানের ইয়োকোহামায় অনুষ্ঠিত আফ্রিকার উন্নয়নবিষয়ক নবম টোকিও আন্তর্জাতিক সম্মেলনে (TICAD 9) প্রধানমন্ত্রী শিগেরু ইশিবা আফ্রিকার সঙ্গে জাপানের সম্পর্ক নতুনভাবে গড়ে তোলার উচ্চাভিলাষী কৌশল তুলে ধরেছেন। ৫.৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ দেওয়ার অঙ্গীকার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বিষয়ে ৩০ হাজার বিশেষজ্ঞকে প্রশিক্ষণের ব্যাপক উদ্যোগ এবং নতুন ভারত মহাসাগর–আফ্রিকা অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ার প্রস্তাবের মাধ্যমে জাপান জানিয়েছে, আফ্রিকার প্রবৃদ্ধি ও রূপান্তরের পরবর্তী অধ্যায়ে তারা নেতৃস্থানীয় অংশীদার হতে চায়। ৪৯টি আফ্রিকান দেশের নেতা, বৈশ্বিক সংস্থা ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলন প্রথাগত সহায়তা থেকে বিনিয়োগনির্ভর ও যৌথভাবে পরিচালিত উন্নয়নের দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সূচিপত্র
- আফ্রিকার জন্য জাপানের সাহসী নতুন দৃষ্টিভঙ্গি: TICAD 9-এ বিনিয়োগ, উদ্ভাবন ও অংশীদারত্ব
- TICAD কী এবং কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?
- জাপানের ৫.৫ বিলিয়ন ডলারের অঙ্গীকার: আফ্রিকার অর্থায়নসংক্রান্ত প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা
- এআই প্রশিক্ষণ ও ডিজিটাল রূপান্তর: আফ্রিকার ভবিষ্যৎ কর্মশক্তি গড়ে তোলা
- ভারত মহাসাগর–আফ্রিকা অর্থনৈতিক অঞ্চল: প্রবৃদ্ধির জন্য মহাদেশগুলোর সংযোগ
- সহায়তা থেকে বিনিয়োগ: আফ্রিকা নীতিতে জাপানের কৌশলগত পরিবর্তন
- তরুণ ও নারীর ক্ষমতায়ন: মানবসম্পদ উন্নয়নই মূল
- শান্তি, স্থিতিশীলতা ও বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা: বিশ্বমঞ্চে আফ্রিকার কণ্ঠ
- প্রতিযোগিতা ও সহযোগিতা: আফ্রিকার উন্নয়নের ভূরাজনীতি
- বৃহত্তর তাৎপর্য: বৈশ্বিক অর্থনীতিতে আফ্রিকার ভূমিকা
- সারসংক্ষেপ
TICAD কী এবং কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?
১৯৯৩ সালে শুরু হওয়া TICAD হলো জাপানের নেতৃত্বে একটি বহুপক্ষীয় ফোরাম, যা জাতিসংঘ, আফ্রিকান ইউনিয়ন কমিশন, ইউএনডিপি ও বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে যৌথভাবে আয়োজিত হয়। এর মূল দর্শন হলো আফ্রিকার নিজস্ব নেতৃত্ব ও আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব। কয়েক দশকে TICAD দাতা-নির্ভর সহায়তা সম্মেলন থেকে ব্যবসা, বিনিয়োগ ও উদ্ভাবনের একটি মঞ্চে পরিণত হয়েছে। এ বছরের সম্মেলনের প্রতিপাদ্য “আফ্রিকার সঙ্গে যৌথভাবে উদ্ভাবনী সমাধান তৈরি” নতুন যুগের প্রতিফলন, যেখানে জাপান ও আফ্রিকা সমান অংশীদার হিসেবে একসঙ্গে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা ও সুযোগ কাজে লাগাবে।
বিশ্বপরিস্থিতির পরিবর্তনে TICAD 9-এর গুরুত্ব আরও বেড়েছে: আফ্রিকায় যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা কমছে, আর চীনের প্রভাব বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে জাপান নিজেকে নির্ভরযোগ্য, দীর্ঘমেয়াদি অংশীদার হিসেবে তুলে ধরছে। সম্মেলনের ফলাফল শুধু আফ্রিকা-জাপান সম্পর্কই নয়, মহাদেশটিতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বৃহত্তর পরিসরকেও প্রভাবিত করবে।
জাপানের ৫.৫ বিলিয়ন ডলারের অঙ্গীকার: আফ্রিকার অর্থায়নসংক্রান্ত প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা
সম্মেলনের অন্যতম প্রধান ঘোষণা ছিল আফ্রিকান উন্নয়ন ব্যাংকের মাধ্যমে জাপানের ৫.৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি। এই অর্থ অবকাঠামো, বিদ্যুতায়ন ও শিল্পায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যয় হবে, যেগুলো আফ্রিকার টেকসই উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য। ক্রমবর্ধমান ঋণের বোঝা সামাল দিতে এবং রূপান্তরমূলক প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় সাশ্রয়ী অর্থায়ন পেতে আফ্রিকান দেশগুলোকে সহায়তা করার লক্ষ্যেই ঋণগুলো দেওয়া হবে।
অ্যাঙ্গোলার প্রেসিডেন্ট ও আফ্রিকান ইউনিয়নের চেয়ার জোয়াও লরেনসো এই সহায়তার জরুরি প্রয়োজনের কথা তুলে ধরে বলেন, অনেক আফ্রিকান দেশ “আন্তর্জাতিক অর্থায়নে অব্যাহত প্রতিবন্ধকতা এবং সীমিত ও জটিল প্রবেশাধিকারের” মুখে রয়েছে। তিনি ব্যাখ্যা করেন, উচ্চ ঝুঁকির ঋণগ্রহীতা হিসেবে মূল্যায়িত হওয়ায় প্রায়ই আফ্রিকান দেশগুলো স্বল্প সুদের অর্থায়নের সুযোগ পায় না, অথচ অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নে বিনিয়োগের জন্য এ ধরনের অর্থায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আফ্রিকা মহাদেশ আন্তর্জাতিক অর্থায়নে অব্যাহত প্রতিবন্ধকতা এবং সীমিত ও জটিল প্রবেশাধিকারের মুখে রয়েছে ... অনেক আফ্রিকান দেশকে উচ্চ ঝুঁকির ঋণগ্রহীতা হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে, ফলে তারা স্বল্প সুদের অর্থায়নের সুযোগ প্রায় পায় না। অথচ অবকাঠামো, বিদ্যুতায়ন, শিল্পায়ন ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নে বিনিয়োগের জন্য এ ধরনের অর্থায়ন একান্ত জরুরি।
অন্য কয়েকটি বৈশ্বিক শক্তির তুলনায় জাপানের পদ্ধতিতে দায়িত্বশীল ঋণদান ও অংশীদারত্বের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এর লক্ষ্য, অতীতে আফ্রিকার কয়েকটি ঋণগ্রহীতা দেশকে যে ঋণের ফাঁদে পড়তে হয়েছে, তা এড়ানো।
এআই প্রশিক্ষণ ও ডিজিটাল রূপান্তর: আফ্রিকার ভবিষ্যৎ কর্মশক্তি গড়ে তোলা
TICAD 9-এ জাপানের কর্মসূচির সবচেয়ে দূরদর্শী দিকগুলোর একটি হলো আগামী তিন বছরে আফ্রিকা জুড়ে ৩০ হাজার এআই বিশেষজ্ঞকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার অঙ্গীকার। জাপান-আফ্রিকা শিল্প সহ-সৃজন কাঠামোর অংশ এই উদ্যোগের লক্ষ্য ডিজিটাল রূপান্তর ত্বরান্বিত করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আফ্রিকার ক্রমবর্ধমান তরুণ জনগোষ্ঠীকে ক্ষমতায়িত করা।
প্রধানমন্ত্রী ইশিবা তাঁর বক্তব্যে মানবসম্পদ উন্নয়নের গুরুত্ব তুলে ধরেন:
এআইসহ ডিজিটাল-সংশ্লিষ্ট শিল্প এবং সৃজনশীল শিল্পের মতো নতুন ক্ষেত্রে মানবসম্পদ উন্নয়ন ভবিষ্যতের প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার অন্যতম ভিত্তি হবে।
এআই প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে আফ্রিকার বিশ্ববিদ্যালয়, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি এবং জাপানি কোম্পানিগুলোর অংশীদারত্ব থাকবে। লক্ষ্য শুধু প্রযুক্তিগত দক্ষতা শেখানো নয়; উদ্যোক্তা হওয়া ও চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রেও সহায়তা করা, যাতে প্রশিক্ষিত বিশেষজ্ঞরা নিজ নিজ দেশে উদ্ভাবন এগিয়ে নিতে পারেন।
ডিজিটাল দক্ষতার ওপর এই গুরুত্ব সময়োপযোগী। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৫০ সালের মধ্যে আফ্রিকার জনসংখ্যা ২৪০ কোটির বেশি হবে এবং মধ্যম বয়স হবে মাত্র ২৪.৪ বছর। এই জনমিতিক সুবিধাকে কাজে লাগাতে তরুণ আফ্রিকানদের বৈশ্বিক ডিজিটাল অর্থনীতিতে অংশ নেওয়ার উপযোগী করে তুলতে হবে। জাপানের উদ্যোগটির লক্ষ্য ডিজিটাল বিভাজন কমানো এবং প্রযুক্তিনির্ভর প্রবৃদ্ধির কেন্দ্র হিসেবে আফ্রিকাকে প্রতিষ্ঠিত করা।
ভারত মহাসাগর–আফ্রিকা অর্থনৈতিক অঞ্চল: প্রবৃদ্ধির জন্য মহাদেশগুলোর সংযোগ
TICAD 9-এ আরেকটি বড় প্রস্তাব হলো ভারত মহাসাগর–আফ্রিকা অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠন। এই উদ্যোগের লক্ষ্য আফ্রিকা, ভারত, মধ্যপ্রাচ্য ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য অর্থনীতির মধ্যে সংহতি আরও গভীর করা। বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও যোগাযোগব্যবস্থা জোরদার করে অঞ্চলটি আফ্রিকান ব্যবসার নতুন সুযোগ তৈরি এবং আঞ্চলিক মূল্যশৃঙ্খল গড়ে তুলতে চায়।
এই দৃষ্টিভঙ্গি আফ্রিকান কন্টিনেন্টাল ফ্রি ট্রেড এরিয়া (AfCFTA)-এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেটিকে জাপান জোরালোভাবে সমর্থন করে। সীমান্তপারের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহজ করে জাপান আফ্রিকাকে বড় বাজার, সরবরাহকারী ও বিনিয়োগের গন্তব্য হিসেবে তার সম্ভাবনা বাস্তবায়নে সহায়তা করতে চায়। অর্থনৈতিক অঞ্চলটি জাপানের “মুক্ত ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক” কৌশলের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে সহনশীল প্রতিষ্ঠান, সংযোগ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সহায়তা থেকে বিনিয়োগ: আফ্রিকা নীতিতে জাপানের কৌশলগত পরিবর্তন
TICAD 9 আফ্রিকাবিষয়ক জাপানি দৃষ্টিভঙ্গিতে স্পষ্ট পরিবর্তনের সূচনা করছে: প্রথাগত সহায়তা থেকে বিনিয়োগ ও ব্যবসানির্ভর উন্নয়নের দিকে অগ্রসর হচ্ছে দেশটি। মহাদেশটিতে জাপানি কোম্পানির উপস্থিতি বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে এই পরিবর্তন স্পষ্ট। ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে আফ্রিকায় জাপানি বা জাপানি অর্থায়নে পরিচালিত কোম্পানির কার্যালয়ের সংখ্যা ৪০ শতাংশ বেড়ে ৪০টি দেশে ৯৪৮টিতে পৌঁছেছে।
জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলো সামাজিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রকল্পে ক্রমেই বেশি যুক্ত হচ্ছে; যেমন ম্যালেরিয়া দমনে ড্রোন ও এআই ব্যবহার কিংবা জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের বাইরে বিদ্যুৎ সরবরাহ। স্থানীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও উদ্ভাবনকে এগিয়ে নেবে, এমন টেকসই ব্যবসায়িক মডেল গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এই কৌশল অন্যান্য বড় শক্তির পদ্ধতির সঙ্গে ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্র যখন তার সহায়তা কর্মসূচি কমিয়েছে এবং চীন ঋণদান বাড়িয়েছে, তখন জাপানের মডেলে অংশীদারত্ব, সক্ষমতা বৃদ্ধি ও পারস্পরিক লাভের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (JICA) জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা কেই ইয়োশিজাওয়া বলেন, জাপানের সহায়তা স্বনির্ভরতাকে উৎসাহিত করে এবং আফ্রিকায় নতুন ব্যবসা গড়ে উঠতে ভূমিকা রেখেছে।
তরুণ ও নারীর ক্ষমতায়ন: মানবসম্পদ উন্নয়নই মূল
আফ্রিকার তরুণ ও নারীদের ক্ষমতায়ন জাপানের TICAD 9 কর্মসূচির অন্যতম মূল স্তম্ভ। আগামী কয়েক দশক আফ্রিকার জনসংখ্যা বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে তরুণ থাকবে। তাই অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির জন্য শিক্ষা, দক্ষতা ও উদ্যোক্তা উন্নয়নে বিনিয়োগকে অপরিহার্য মনে করা হচ্ছে।
ABE Initiative-এর মতো জাপানের কর্মসূচিগুলো আফ্রিকার তরুণদের জাপানে পড়াশোনা ও ইন্টার্নশিপের সুযোগ দেয়; এর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক ও জ্ঞান বিনিময় গড়ে ওঠে। নতুন এআই প্রশিক্ষণ উদ্যোগ এই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে উচ্চ প্রবৃদ্ধির খাতগুলোকে লক্ষ্য করছে এবং আফ্রিকার নতুন প্রজন্মের উদ্ভাবক ও নেতা তৈরিতে সহায়তা করছে।
সম্মেলনের সমাপনী নথি ইয়োকোহামা ঘোষণায় মানবসম্পদ, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং তরুণ ও নারীর ক্ষমতায়নে বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সহনশীল সমাজ গড়তে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব জোরদার এবং আঞ্চলিক সংহতিতে সহায়তার আহ্বান জানানো হয়েছে।
শান্তি, স্থিতিশীলতা ও বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা: বিশ্বমঞ্চে আফ্রিকার কণ্ঠ
অর্থনীতির বাইরেও TICAD 9-এ শান্তি, স্থিতিশীলতা ও বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আফ্রিকান নেতারা ও আন্তর্জাতিক অংশীদারেরা সংঘাত মোকাবিলা, প্রতিষ্ঠান গঠন এবং অস্থিতিশীলতার মূল কারণগুলোর সমাধানে আফ্রিকার নেতৃত্বাধীন উদ্যোগের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেন।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সম্মেলনে বৈশ্বিক ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের বকেয়া সংস্কারের আহ্বান জানান:
আফ্রিকার ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করে এমন সিদ্ধান্তগুলো নির্ধারণে আফ্রিকার আরও জোরালো কণ্ঠ থাকতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে নিরাপত্তা পরিষদের দীর্ঘদিনের বকেয়া সংস্কার, যেখানে অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, আফ্রিকার কোনো স্থায়ী সদস্য নেই ... এবং আজকের অন্যায্য ও অবিচারপূর্ণ আন্তর্জাতিক আর্থিক কাঠামোর আমূল সংস্কার, যার মাধ্যমে আফ্রিকার প্রতিনিধিত্ব বাড়াতে হবে এবং গৃহীত সিদ্ধান্তে আফ্রিকার শক্তিশালী কণ্ঠকে স্বীকৃতি দিতে হবে।
ইয়োকোহামা ঘোষণায় বহুপক্ষবাদ, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার, পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ এবং দায়িত্বশীল বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার প্রতি অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। এতে জলবায়ু অর্থায়ন, জ্বালানি রূপান্তর ও দুর্যোগঝুঁকি হ্রাসের প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে—যেসব ক্ষেত্রে আফ্রিকা তীব্র ঝুঁকির মুখে এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিযোগিতা ও সহযোগিতা: আফ্রিকার উন্নয়নের ভূরাজনীতি
আফ্রিকায় প্রভাব বিস্তারে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা তীব্র হওয়ার প্রেক্ষাপটে TICAD 9 অনুষ্ঠিত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র যখন আফ্রিকায় সহায়তার পরিসর কমাচ্ছে এবং চীন তার অর্থনৈতিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে, তখন অংশীদারত্ব, উদ্ভাবন ও পারস্পরিক লাভের ভিত্তিতে ভিন্ন এক মডেল তুলে ধরছে জাপান।
চীনের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তে ৫৩টি আফ্রিকান দেশ থেকে আমদানিতে শুল্ক শূন্যে নামানো এবং আফ্রিকার সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করতে রাশিয়া ও ভারতের উদ্যোগ বিশ্বমঞ্চে মহাদেশটির ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব তুলে ধরছে। জাপানের চ্যালেঞ্জ হলো মানসম্মত বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং আফ্রিকার নেতৃত্বাধীন সমাধানে সহায়তার ওপর জোর দিয়ে নিজেদের আলাদা করে তুলে ধরা।
TICAD 9-এ জাপানের বার্তা স্পষ্ট: “জাপানে তৈরি” থেকে “জাপানের সঙ্গে তৈরি” ধারণার দিকে এগিয়ে গিয়ে আফ্রিকান অংশীদারদের সঙ্গে যৌথভাবে সমাধান তৈরি এবং সহযোগিতার নতুন যুগ গড়ে তুলতে চায় দেশটি।
বৃহত্তর তাৎপর্য: বৈশ্বিক অর্থনীতিতে আফ্রিকার ভূমিকা
আফ্রিকার অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বিপুল। ২১০০ সালের মধ্যে জনসংখ্যা ৩৮০ কোটিতে পৌঁছানোর পূর্বাভাস রয়েছে, আর অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় মধ্যম বয়স অনেক কম। ফলে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে মহাদেশটির। ২০২৪ সালে আফ্রিকায় প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ রেকর্ড ৯৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে এবং অঞ্চলটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বৈশ্বিক গড়কে ছাড়িয়ে গেছে।
তবে চ্যালেঞ্জ এখনো রয়েছে। দারিদ্র্য, বৈষম্য, সংঘাত ও জলবায়ু পরিবর্তন উল্লেখযোগ্য বাধা হয়ে আছে। আফ্রিকার সম্ভাবনা বাস্তবায়নে সাশ্রয়ী অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও দক্ষতায় প্রবেশাধিকার গুরুত্বপূর্ণ হবে। TICAD 9-এ জাপানের উদ্যোগগুলো এসব ঘাটতি মোকাবিলার লক্ষ্য নিয়েছে, তবে সাফল্য নির্ভর করবে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব, আফ্রিকার নিজস্ব নেতৃত্ব এবং পরিবর্তনশীল চাহিদার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতার ওপর।
সারসংক্ষেপ
- TICAD 9-এ জাপান আফ্রিকার জন্য ৫.৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে, যার লক্ষ্য অবকাঠামো, বিদ্যুতায়ন ও শিল্পায়ন।
- একটি বড় উদ্যোগের আওতায় আগামী তিন বছরে আফ্রিকা জুড়ে ৩০ হাজার এআই বিশেষজ্ঞকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে; এতে ডিজিটাল রূপান্তর ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়তা মিলবে।
- আঞ্চলিক সংহতি ও বাণিজ্য বাড়াতে সম্মেলনে নতুন ভারত মহাসাগর–আফ্রিকা অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠনের প্রস্তাব এসেছে।
- সহায়তা থেকে বিনিয়োগের দিকে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে TICAD 9; জাপান অংশীদারত্ব, উদ্ভাবন ও বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণে গুরুত্ব দিচ্ছে।
- তরুণ ও নারীর ক্ষমতায়ন, আফ্রিকার নেতৃত্বাধীন সমাধানে সহায়তা এবং বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার সংস্কার ছিল মূল বিষয়।
- ইয়োকোহামা ঘোষণায় টেকসই প্রবৃদ্ধি, শান্তি, জলবায়ু সহনশীলতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নে অঙ্গীকারের কথা তুলে ধরা হয়েছে।
- চীন, ভারত ও অন্যান্য বৈশ্বিক শক্তির সঙ্গে প্রতিযোগিতা বাড়ার মধ্যে জাপান নিজস্ব পদ্ধতিকে আলাদা করে তুলে ধরতে চায়।






