ক্যাফেগুলোতে নীরবতা: ইন্দোনেশিয়ায় সংগীত রয়্যালটির কড়াকড়িতে বদলে যাচ্ছে জনপরিসর, শুরু হয়েছে জাতীয় বিতর্ক

পড়তে 9 মিনিট
ক্যাফেগুলোতে নীরবতা: ইন্দোনেশিয়ায় সংগীত রয়্যালটির কড়াকড়িতে বদলে যাচ্ছে জনপরিসর, শুরু হয়েছে জাতীয় বিতর্ক

ইন্দোনেশিয়ার ক্যাফেগুলোতে নীরবতা: রয়্যালটি আদায়ে কড়াকড়িতে বদলে গেছে দৈনন্দিন জীবনের সুর

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দেশজুড়ে ক্যাফে ও রেস্তোরাঁ থেকে ইন্দোনেশীয় পপ ও রকসংগীতের চেনা গুঞ্জন মিলিয়ে গেছে। আগে যেখানে বাতাসে ভেসে বেড়াত সাম্প্রতিক জনপ্রিয় গান আর স্থানীয় ইন্ডি ব্যান্ডের সুর, এখন সেখানে শোনা যায় শুধু এসপ্রেসো মেশিনের হিসহিস শব্দ আর কাপের ঠোকাঠুকি। এই আকস্মিক নীরবতা রুচি বা প্রবণতার কারণে নয়; বকেয়া সংগীত রয়্যালটি আদায়ে ব্যাপক কড়াকড়ির ফল এটি। এতে ব্যবসায়ীরা উদ্বিগ্ন, সংগীতশিল্পীরা বিভক্ত, আর কোন সংগীত বাজানো যাবে এবং কত খরচে—তা নিয়ে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত।

সূচিপত্র
  1. ইন্দোনেশিয়ার ক্যাফেগুলোতে নীরবতা: রয়্যালটি আদায়ে কড়াকড়িতে বদলে গেছে দৈনন্দিন জীবনের সুর
  2. কড়াকড়ির সূত্রপাত কীভাবে? মি গাকোয়ান মামলা ও এর প্রভাব
  3. ইন্দোনেশিয়ার সংগীত রয়্যালটি ব্যবস্থা
  4. ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো এত উদ্বিগ্ন কেন?
  5. সংগীতশিল্পীরা বিভক্ত: কে, কীভাবে পারিশ্রমিক পাবেন?
  6. আইনি বিভ্রান্তি ও জনজীবনে প্রভাব
  7. স্বচ্ছতা, প্রযুক্তি ও সামনের পথ
  8. সংস্কৃতি সংকটে: ইন্দোনেশীয় সমাজে বৃহত্তর প্রভাব
  9. সরকারের প্রতিক্রিয়া ও সমাধানের সন্ধান
  10. সংক্ষেপে

কড়াকড়ির সূত্রপাত কীভাবে? মি গাকোয়ান মামলা ও এর প্রভাব

দেশজুড়ে এই পরিবর্তনের সূত্রপাত জনপ্রিয় নুডলস রেস্তোরাঁ চেইন মি গাকোয়ানকে ঘিরে একটি আলোচিত বিরোধ থেকে। ২০২৪ সালের আগস্টে খবর আসে, বালি ফ্র্যাঞ্চাইজিটি ২০২২ সাল থেকে সংগীত রয়্যালটি পরিশোধ করেনি। ইন্দোনেশিয়ান মিউজিক লাইসেন্স সেন্টার (সেলমি)-এর কয়েক মাসের সতর্কতা ও মধ্যস্থতার ব্যর্থ চেষ্টার পর বিষয়টি পুলিশের কাছে গড়ায়। শেষ পর্যন্ত ৬৫টি আউটলেটের বকেয়া রয়্যালটি বাবদ ২.২ বিলিয়ন রুপিয়াহ (প্রায় ১ লাখ ৩৫ হাজার ডলার) পরিশোধ করে ফ্র্যাঞ্চাইজিটি মীমাংসায় পৌঁছায়। তবে ততক্ষণে ক্ষতি হয়ে গেছে: এ ঘটনা আতিথেয়তা খাতে আলোড়ন তোলে এবং অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে ব্যাকগ্রাউন্ড সংগীত ব্যবহারের পদ্ধতি নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।

মীমাংসার খবর ছড়িয়ে পড়তেই দেশজুড়ে ক্যাফে ও রেস্তোরাঁর মালিকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ায়। নিয়মকানুন নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং আইনি জটিলতার আশঙ্কায় অনেকে সংগীত বাজানো পুরোপুরি বন্ধ করে দেন। কেউ কেউ বিদেশি গান বা যন্ত্রসংগীতে চলে যান—ভুল করে ভেবে নেন, এগুলো রয়্যালটির আওতায় পড়বে না। কেউ আবার প্রকৃতির শব্দ বা বৌদ্ধ মন্ত্র বাজাতে শুরু করেন; পরে জানতে পারেন, সেগুলোও কপিরাইট সুরক্ষার আওতায় পড়তে পারে।

এর ফলে ইন্দোনেশিয়ার জনপরিসরের পরিবেশে নাটকীয় পরিবর্তন এসেছে। যেমন, জাকার্তায় ক্রেতা ও কর্মী—দুই পক্ষই এই পরিবর্তন টের পেয়েছেন। দক্ষিণ জাকার্তার একটি নুডলসের দোকানের কর্মী গুস্তি বলেন, “ব্যাকগ্রাউন্ড সংগীত না থাকায় পরিবেশটা ফাঁকা আর নিরস হয়ে গেছে। সংগীত শুধু ক্রেতাদের মন ভালো করে না, কর্মীদের মেজাজও চাঙা করে।”

বিজ্ঞাপন

ইন্দোনেশিয়ার সংগীত রয়্যালটি ব্যবস্থা

এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ইন্দোনেশিয়ার ২০১৪ সালের কপিরাইট আইন। এ আইনে কনসার্ট হল থেকে কফিশপ—সব বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের জন্য সংগীত বাজানোর অধিকার পেতে বার্ষিক রয়্যালটি পরিশোধ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। জাতীয় কালেক্টিভ ম্যানেজমেন্ট এজেন্সি (এলএমকেএন) এ ব্যবস্থা পরিচালনা করে। তারা ফি সংগ্রহ করে এবং ছোট ছোট কালেক্টিভ সংস্থা (এলএমকে)-এর মাধ্যমে গীতিকার, পরিবেশক ও প্রযোজকদের মধ্যে তা বণ্টন করে।

আসনসংখ্যা, খোলার সময় এবং অবস্থানের মতো বিষয় বিবেচনায় নিয়ে রয়্যালটির হার নির্ধারণ করা হয়। যেমন, ক্যাফে ও রেস্তোরাঁয় সাধারণত প্রতি আসনের জন্য বছরে ১ লাখ ২০ হাজার রুপিয়াহ নেওয়া হয়; অন্যদিকে বার ও নৈশক্লাবের ক্ষেত্রে মেঝের আয়তন ধরে ফি নির্ধারিত হয়। ক্ষুদ্র ও ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান কম হারের জন্য যোগ্য হতে পারে, তবে এ ছাড়ের জন্য দর-কষাকষির প্রক্রিয়া সব সময় স্পষ্ট নয়।

২০১৪ সালে আইনটি পাস হলেও ২০২১ সাল পর্যন্ত এর প্রয়োগ ছিল ঢিলেঢালা। ওই বছর সরকার বাণিজ্যিক জনপরিসরের সব পরিচালকের জন্য রয়্যালটি পরিশোধ বাধ্যতামূলক করে। এরপর থেকে তদারকি আরও কঠোর হয়েছে। আইন ও মানবাধিকার মন্ত্রণালয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে মনে করিয়ে দিয়েছে, জনপরিসরে বাজানো সব সংগীতের জন্যই রয়্যালটি দিতে হবে—এর মধ্যে স্পটিফাই বা অ্যাপল মিউজিকের মতো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকে স্ট্রিম করা গানও রয়েছে। এসব সেবার সাবস্ক্রিপশন, এমনকি ব্যবসায়িক অ্যাকাউন্টও, জনসমক্ষে পরিবেশনের অধিকার অন্তর্ভুক্ত করে না।

ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো এত উদ্বিগ্ন কেন?

অনেক ব্যবসার মালিকের অভিযোগ, রয়্যালটি ব্যবস্থা অস্পষ্ট ও চাপের; বিশেষ করে সীমিত মুনাফায় চলা ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য। জনসমক্ষে পরিবেশনা বলতে কী বোঝায়, কোন গান রয়্যালটির আওতায় পড়ে, আর এলএমকেএনকে অর্থ দিলেই যথেষ্ট কি না—নাকি শিল্পীদের কাছ থেকেও সরাসরি অনুমতি নিতে হবে—এসব নিয়ে ব্যাপক বিভ্রান্তি রয়েছে। কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, নির্ধারিত ফি দেওয়ার পরও ব্যক্তিগতভাবে সংগীতশিল্পী বা অধিকারধারীরা আইনি পদক্ষেপ নিতে পারেন।

ইন্দোনেশিয়ান হোটেল অ্যান্ড রেস্তোরাঁ অ্যাসোসিয়েশনের (পিএইচআরআই) মহাসচিব মাওলানা ইউসরান বলেন, অনেক মালিক ভুল করে মনে করেন, ডিজিটাল সংগীতসেবা সাবস্ক্রাইব করলেই তাঁদের দায়িত্ব পূরণ হয়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, “জনসমক্ষে সংগীত পরিবেশনের জন্য আলাদা লাইসেন্স প্রয়োজন।” সংগীত কিউরেটর দিমাস আরিও আদ্রিয়ান্তো যোগ করেন, প্রাকৃতিক শব্দের রেকর্ডিংও ফোনোগ্রাম হিসেবে বিবেচিত হয় এবং এর জন্যও রয়্যালটি দিতে হয়।

বিজ্ঞাপন

সংগীতশিল্পীরা বিভক্ত: কে, কীভাবে পারিশ্রমিক পাবেন?

অধিকাংশ সংগীতশিল্পীই একমত যে তাঁদের সৃষ্টিকর্ম ব্যবহারের জন্য স্রষ্টাদের পারিশ্রমিক পাওয়া উচিত। তবে রয়্যালটি কীভাবে সংগ্রহ ও বণ্টন করা হবে, তা নিয়ে যথেষ্ট মতবিরোধ রয়েছে। প্রবীণ রকার ইকাং ফাওজির মতো কেউ কেউ বর্তমান ব্যবস্থার পক্ষে। তাঁর যুক্তি, “কারও সৃষ্টিশীল কাজ ব্যবহার করলে তার প্রতি সম্মান দেখানো এবং পারিশ্রমিক দেওয়া উচিত।” অন্যদিকে আহমাদ ধানি ও পিউয়ের মতো পরিচিত ব্যক্তিরা কালেক্টিভ ম্যানেজমেন্ট সংস্থাকে পাশ কাটিয়ে শিল্পী ও ভেন্যুর মধ্যে সরাসরি লাইসেন্স চুক্তির পক্ষে।

শিল্পীদের কম রয়্যালটি পাওয়ার খবর এ বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে। অথচ মোট রয়্যালটি সংগ্রহ আইনের শুরুর দিকের মাত্র ৪০০ মিলিয়ন রুপিয়াহ (২৪ হাজার ৪০০ ডলার) থেকে বেড়ে এখন ২০০ বিলিয়ন রুপিয়াহে (১ কোটি ২২ লাখ ডলার) দাঁড়িয়েছে। কিছু সংগীতশিল্পী জানান, বছরে তাঁদের প্রাপ্তি ৬০ হাজার রুপিয়াহ (৩.৭০ ডলার) পর্যন্তও নেমে আসে। উদাহরণস্বরূপ, পপসংগীতের কিংবদন্তি আরি লাসো সম্প্রতি মাত্র ৭৬৫ হাজার রুপিয়াহ (৪৭ ডলার) রয়্যালটি পাওয়ার কথা প্রকাশ্যে জানিয়ে ব্যবস্থাটির ন্যায্যতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

সংগীত রয়্যালটি সংস্থা ওয়ামি জানায়, এক মাসের জন্য ওই অর্থের পরিমাণ সঠিক ছিল এবং ব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ চলছে। তবে আরি লাসোর যুক্তি, তাঁর জনপ্রিয়তা এবং তাঁর গানের ব্যাপক ব্যবহারের বিবেচনায় রয়্যালটির অঙ্ক আরও অনেক বেশি হওয়া উচিত।

এসব বিরোধের জেরে সংস্কারের দাবি উঠেছে। ২০২৫ সালের মার্চে ২৯ জন বিশিষ্ট গায়ক আরও স্পষ্ট ও স্বচ্ছ রয়্যালটি ব্যবস্থা চেয়ে সাংবিধানিক আদালতে বিচারিক পর্যালোচনার আবেদন করেন। এরপর আইনপ্রণেতারা কপিরাইট আইন সংশোধন এবং ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে নিয়মিত নিরীক্ষাসহ রয়্যালটি সংগ্রহের দায়িত্ব এলএমকেএনের অধীনে কেন্দ্রীভূত করার প্রতিশ্রুতি দেন।

আইনি বিভ্রান্তি ও জনজীবনে প্রভাব

এই কড়াকড়ির প্রভাব শুধু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সংগীতশিল্পীদের ওপরই পড়েনি; অনুষ্ঠান আয়োজক ও সাধারণ মানুষের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়েছে। আগস্টের মাঝামাঝি একটি অলাভজনক সংস্থা জানায়, বিয়ে ও ঐতিহ্যবাহী উদ্‌যাপনে বাজানো সংগীতের ক্ষেত্রেও রয়্যালটি দিতে হতে পারে। এতে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়। আরেকটি সংগীত লাইসেন্স সংস্থা ওয়াহানা মিউজিক ইন্দোনেশিয়া (ওয়ামি) তাদের নীতি পুনর্ব্যক্ত করে জানায়, উদ্‌যাপনে বাজানো লাইভ বা রেকর্ড করা সংগীতের জন্য বিয়ের আয়োজকদের রয়্যালটি দিতে হবে। সংগীত প্রযোজনার মোট খরচের ২ শতাংশ হারে ফি নির্ধারণ করা হয়েছে।

তবে কপিরাইট আইনের খসড়া প্রণয়নকারীদের একজন অধ্যাপক আহমাদ রামলি স্পষ্ট করেন, বিয়ের মতো অবাণিজ্যিক অনুষ্ঠান সাধারণত এ নিয়মের বাইরে। তিনি সতর্ক করে বলেন, অতিরিক্ত কঠোর প্রয়োগ জনসাধারণকে বিমুখ করে এবং সংগীতের ব্যবহার নিরুৎসাহিত করে শিল্প ও শিল্পী—উভয়েরই ক্ষতি করতে পারে।

ইউনিভার্সিতাস মুহাম্মাদিয়াহ ইয়োগিয়াকার্তার ড. ত্রিস্নো রাহারজোর মতো আইন বিশেষজ্ঞরা ভারসাম্য রক্ষার ওপর জোর দেন। তিনি ব্যাখ্যা করেন, “জনপরিসরে সংগীত বাজানো আর ব্যক্তিগতভাবে সংগীত শোনার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। ক্রেতা আকৃষ্ট করতে সংগীত ব্যবহার করা হয়, তাই স্রষ্টারা রয়্যালটি পাবেন—এটাই স্বাভাবিক। তবে আইন প্রয়োগ যেন অতিরিক্ত কঠোর না হয়; তাতে ক্রেতা বা ছোট ব্যবসাকে অপরাধী বানানো হবে।”

বিজ্ঞাপন

স্বচ্ছতা, প্রযুক্তি ও সামনের পথ

বর্তমান ব্যবস্থার প্রধান সমালোচনাগুলোর একটি হলো, রয়্যালটি কীভাবে হিসাব করা ও বণ্টন করা হয়, তা যথেষ্ট স্বচ্ছ নয়। ব্যবসার মালিকেরা নিশ্চয়তা চান যে তাঁদের দেওয়া অর্থ আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বা পরিচালন ব্যয়ে হারিয়ে না গিয়ে প্রকৃত গীতিকার ও পরিবেশকদের কাছে পৌঁছাচ্ছে। পরিচালন ব্যয়ের জন্য ২০ শতাংশ অর্থ রেখে দেওয়া এলএমকেএন এ উদ্বেগের কথা স্বীকার করেছে। সংস্থাটি সমন্বিত অনলাইন লাইসেন্স ব্যবস্থা চালু করা এবং তথ্য সংগ্রহ উন্নত করার কাজ করছে। স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের প্লেলিস্ট যুক্ত করা এবং বার্ষিক নিরীক্ষা করার উদ্যোগও চলছে।

এসব সমস্যা সমাধানে প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আরমান্ড মৌলানার মতো সংগীতশিল্পীরা বলেছেন, ব্লকচেইন বা এ ধরনের উদ্ভাবন রয়্যালটি ব্যবস্থাপনায় প্রকৃত স্বচ্ছতা আনতে পারে। উদাহরণ হিসেবে প্রতিবেশী মালয়েশিয়ার কথা বলা যায়, যেখানে আরও কেন্দ্রীভূত ও সমন্বিত ব্যবস্থা স্রষ্টাদের ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করতে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।

আপাতত সরকার যেসব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পক্ষে নির্ধারিত ফি দেওয়া সম্ভব নয়, তাদের এলএমকেএনের সঙ্গে দর-কষাকষি করতে বলছে। ক্ষুদ্র ও ছোট ব্যবসার জন্য আরও ছাড় দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করছে। আইনপ্রণেতারা আইনি নিশ্চয়তা বাড়াতে এবং নিয়মকানুন যেন ছোট ব্যবসার ওপর অযথা চাপ না ফেলে বা দেশের প্রাণবন্ত সংগীত সংস্কৃতিকে দমিয়ে না দেয়, তা নিশ্চিত করতে কপিরাইট আইন পর্যালোচনা করছেন।

বিজ্ঞাপন

সংস্কৃতি সংকটে: ইন্দোনেশীয় সমাজে বৃহত্তর প্রভাব

ইন্দোনেশিয়ার ক্যাফে ও রেস্তোরাঁর নীরবতা শুধু অসুবিধার বিষয় নয়—এর সুদূরপ্রসারী প্রভাবসহ একটি সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত এটি। সংগীত দীর্ঘদিন ধরেই দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ; এটি শুধু বিনোদনই নয়, পরিচয় ও সামাজিক বন্ধনেরও অনুভূতি জোগায়। বর্তমান কড়াকড়ি এই ঐতিহ্যকে ক্ষয় করার ঝুঁকি তৈরি করেছে। আইনি ঝামেলায় পড়ার আশঙ্কায় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো সংগীত বন্ধ করে দিচ্ছে, কিংবা পরিচিত গানের বদলে সাধারণ ব্যাকগ্রাউন্ড সুর বাজাচ্ছে।

পরিবর্তনটি নিয়ে কিছু ক্রেতা হতাশা প্রকাশ করেছেন। জাকার্তার এক নিয়মিত ক্যাফেগামী বলেন, “চেনা ইন্দোনেশীয় গানের বদলে এখন সাধারণ ব্যাকগ্রাউন্ড সুর বাজছে, পরিবেশটাও নিরস লাগছে।” অন্যদের উদ্বেগ, স্থানীয় সংগীতের অনুপস্থিতিতে উদীয়মান শিল্পীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, কারণ ভক্তগোষ্ঠী গড়ে তুলতে জনসমক্ষে তাঁদের গান শোনানোর সুযোগ গুরুত্বপূর্ণ।

আশঙ্কা রয়েছে, এই কড়াকড়ি উল্টো ফল দিতে পারে: ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো সংগীত এড়িয়ে চলবে, আর শিল্পীরা রয়্যালটি ও প্রচার—দুটিই হারাবেন। এক রেস্তোরাঁ পরিচালকের কথায়, “প্রতিটি গীতিকারের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হলে, হয়তো আমাদের নিজেদেরই গান গাওয়া উচিত, অথবা যেকোনো শব্দ রেকর্ড করা উচিত।”

সরকারের প্রতিক্রিয়া ও সমাধানের সন্ধান

বিভ্রান্তি ও অসন্তোষ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি স্বীকার করে সরকারি কর্মকর্তারা জনগণকে আশ্বস্ত করার উদ্যোগ নিয়েছেন। উপপ্রধান স্পিকার সুফমি দাসকো আহমাদ সম্প্রতি বলেন, আইন সংশোধনের কাজ চলাকালে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো আগের মতোই গান বাজাতে বা গাইতে পারবে; খামখেয়ালি রয়্যালটি দাবির ভয় পাওয়ার কারণ নেই। রয়্যালটি সংগ্রহ এলএমকেএনের অধীনে কেন্দ্রীভূত করা এবং নিয়মিত নিরীক্ষার মাধ্যমে স্বচ্ছতা বাড়াতে প্রতিনিধি পরিষদ মন্ত্রণালয়, সংগীতশিল্পী ও শিল্পসংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে কাজ করছে।

আইন ও মানবাধিকার মন্ত্রণালয় ক্ষুদ্র ও ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে এলএমকেএনের সঙ্গে ফি নিয়ে দর-কষাকষি করতেও উৎসাহিত করেছে। ন্যায্য ও বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজতে ব্যবসায়ী সমিতিগুলোর সঙ্গে আলোচনার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে মন্ত্রণালয়। লক্ষ্য হলো স্রষ্টাদের অধিকার রক্ষা করা, একই সঙ্গে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর অযথা চাপ না ফেলা বা সংগীত বাজাতে নিরুৎসাহিত না করা।

এর মধ্যে কিছু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো পাবলিক ডোমেইনে চলে যাওয়া সংগীত—যেমন শাস্ত্রীয় সুর বা যেসব পুরোনো জনপ্রিয় গানের কপিরাইটের মেয়াদ শেষ হয়েছে—ব্যবহার করতে পারে। আইনি কাঠামো হালনাগাদ না হওয়া পর্যন্ত এটি সাময়িক বিকল্প হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

সংক্ষেপে

  • মি গাকোয়ান রেস্তোরাঁ চেইনকে ঘিরে আলোচিত মামলার পর সংগীত রয়্যালটি আদায়ে কড়াকড়ির কারণে ইন্দোনেশিয়ার ক্যাফে ও রেস্তোরাঁগুলোতে সংগীত বন্ধ হয়ে গেছে।
  • ২০১৪ সালের কপিরাইট আইন অনুযায়ী জনপরিসরে সংগীত বাজানো সব বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের রয়্যালটি দিতে হয়; ২০২১ সাল থেকে আইনটির প্রয়োগ আরও কঠোর হয়েছে।
  • নিয়মকানুন নিয়ে ব্যবসার মালিকেরা বিভ্রান্ত, খরচ নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং এলএমকেএনকে অর্থ দিলেই যথেষ্ট কি না—নাকি শিল্পীর সরাসরি অনুমতি দরকার—তা নিয়ে অনিশ্চিত।
  • রয়্যালটি সংগ্রহ ও বণ্টনের সর্বোত্তম পদ্ধতি নিয়ে সংগীতশিল্পীরা বিভক্ত; কেউ সরাসরি লাইসেন্সের পক্ষে, কেউ জাতীয় সংস্থার ব্যবস্থাকে সমর্থন করছেন।
  • রয়্যালটি বণ্টনে স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা বড় উদ্বেগের বিষয়। মোট সংগ্রহ বাড়লেও কিছু শিল্পী খুব কম অর্থ পাওয়ার কথা জানিয়েছেন।
  • কড়াকড়ির প্রভাব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সংগীতশিল্পীদের পাশাপাশি জনসমাগমের অনুষ্ঠান এবং বৃহত্তর সাংস্কৃতিক পরিবেশেও পড়েছে; ফলে আইনি সংস্কার ও আরও স্পষ্ট নিয়মের দাবি উঠেছে।
  • স্রষ্টাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ইন্দোনেশিয়ার সংগীত সংস্কৃতিকে দমিয়ে না রেখে কপিরাইট আইন সংশোধন, রয়্যালটি সংগ্রহ কেন্দ্রীভূত করা এবং নিয়মকানুনের ভারসাম্য রক্ষায় সরকার কাজ করছে।
এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন

আপনার পছন্দ হতে পারে