ইন্দোনেশিয়ার সংকুচিত মধ্যবিত্ত: অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতার জন্য অদৃশ্য হুমকি

পড়তে 9 মিনিট
ইন্দোনেশিয়ার সংকুচিত মধ্যবিত্ত: অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতার জন্য অদৃশ্য হুমকি

ইন্দোনেশিয়ার মধ্যবিত্ত: একসময় প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি, এখন হুমকির মুখে

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম অর্থনীতি ইন্দোনেশিয়া দীর্ঘদিন ধরে গতিশীল প্রবৃদ্ধি ও প্রাণবন্ত মধ্যবিত্তের বিকাশের জন্য প্রশংসিত হয়ে আসছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই গুরুত্বপূর্ণ জনগোষ্ঠীর আকার উদ্বেগজনক হারে কমেছে। সরকারি পরিসংখ্যানে অর্থনীতির সম্মানজনক গতিতে সম্প্রসারণের চিত্র দেখা গেলেও—কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি ছিল ৫.১২ শতাংশ—মধ্যবিত্ত হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ ইন্দোনেশীয়দের সংখ্যা ২০১৯ সালের ৫ কোটি ৭০ লাখের বেশি থেকে কমে ২০২৪ সালে ৪ কোটি ৮০ লাখের নিচে নেমেছে। এই পতন নিছক পরিসংখ্যানগত ব্যতিক্রম নয়; এটি আরও গভীর সংকটের ইঙ্গিত, যা দেশটির অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ, সামাজিক স্থিতিশীলতা ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে হুমকির মুখে ফেলছে।

সূচিপত্র
  1. ইন্দোনেশিয়ার মধ্যবিত্ত: একসময় প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি, এখন হুমকির মুখে
  2. ইন্দোনেশিয়ার মধ্যবিত্ত কারা, আর তারা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
  3. ইন্দোনেশিয়ার মধ্যবিত্ত কেন সংকুচিত হচ্ছে?
  4. মহামারির পরবর্তী ধাক্কা ও শ্রমবাজারের পরিবর্তন
  5. স্থবির মজুরি ও বাড়তি ব্যয়
  6. করভার ও নীতিগত অনিশ্চয়তা
  7. অর্থনীতির কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ
  8. বৈশ্বিক প্রতিকূলতা ও বহিরাগত ঝুঁকি
  9. মধ্যবিত্তের পতনের মানবিক চিত্র
  10. অর্থনৈতিক পরিণতি: প্রবৃদ্ধির গতি কমা ও ভোগব্যয়ে পরিবর্তন
  11. নীতিগত উদ্যোগ: এ পর্যন্ত কী করা হয়েছে, আর কী দরকার?
  12. শ্রমঘন শিল্প ও উদ্ভাবন কি মধ্যবিত্তকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারে?
  13. সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব: বাড়তে থাকা উদ্বেগ ও অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি
  14. সারসংক্ষেপ

ইন্দোনেশিয়ার জিডিপির অর্ধেকের বেশি আসে এমন খাত, সেই পারিবারিক ভোগব্যয় বেড়েছে ৫ শতাংশের সামান্য কম—মহামারির আগের মাত্রার নিচে এবং অভ্যন্তরীণ ব্যয়ের ওপর এতটা নির্ভরশীল অর্থনীতির জন্য অপর্যাপ্ত। সরকারি নীতি দরিদ্রতম ইন্দোনেশীয়দের কিছুটা সুরক্ষা দিলেও মধ্যবিত্তকে অনেকটাই নিজের মতো করে চলতে হয়েছে; জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, মজুরি স্থবির থাকা এবং সীমিত সামাজিক সহায়তার চাপে তারা জর্জরিত।

ইন্দোনেশিয়ার মধ্যবিত্ত কারা, আর তারা কেন গুরুত্বপূর্ণ?

বিশ্বব্যাংকের সংজ্ঞা অনুযায়ী, ইন্দোনেশিয়ার মধ্যবিত্ত বলতে সাধারণত এমন মানুষদের বোঝায়, যাদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা রয়েছে এবং যারা ন্যূনতম জীবনধারণের প্রয়োজনের বাইরেও বিবেচনামূলক পণ্যে ব্যয় করতে পারেন। সরকার মাসে ১৩২ থেকে ৬৪৩ ডলার ব্যয় করেন—এমন পরিবারগুলোকে মধ্যবিত্ত হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করে। এই গোষ্ঠী শুধু ভোগব্যয়ের মূল চালিকাশক্তিই নয়—বেসরকারি ব্যয়ের প্রায় ৪০ শতাংশ আসে তাদের কাছ থেকে—তারা করভিত্তির মেরুদণ্ড, ক্ষুদ্র ব্যবসার সহায়ক এবং সামাজিক সংহতির ভিত্তিও।

মধ্যম আয়ের পরিবারগুলো কয়েকটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ:

  • তারা নির্ভরযোগ্য করদাতা এবং রাষ্ট্রের রাজস্বে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে।
  • তারা ঋণগ্রহীতা ও বিনিয়োগকারী, ফলে আর্থিক ব্যবস্থাকে সহায়তা করে।
  • শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার ব্যয়ের বড় অংশ তারা বহন করে, ফলে সরকারি সেবার ওপর চাপ কমে।
  • ব্যয়ের মাধ্যমে তারা ক্ষুদ্র ব্যবসা ও স্থানীয় অর্থনীতিকে সহায়তা করে।
  • তারা সামাজিক স্থিতিশীলতা ও রাজনৈতিক মধ্যপন্থাকে এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখে।

মধ্যবিত্তের সমৃদ্ধি হলে শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ চাহিদা, উদ্ভাবন এবং স্থিতিশীল বিনিয়োগ পরিবেশের মাধ্যমে অর্থনীতি লাভবান হয়। আর এই শ্রেণি দুর্বল হলে তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে সব খাতে।

ইন্দোনেশিয়ার মধ্যবিত্ত কেন সংকুচিত হচ্ছে?

ইন্দোনেশিয়ার মধ্যবিত্তের পতনের পেছনে রয়েছে পরস্পর-সম্পর্কিত একাধিক কারণ। কোভিড-১৯ মহামারি ও এর পরবর্তী অর্থনৈতিক ধাক্কায় সেগুলোর অনেকগুলো আরও তীব্র হয়েছে।

মহামারির পরবর্তী ধাক্কা ও শ্রমবাজারের পরিবর্তন

মহামারি ইন্দোনেশিয়ার আনুষ্ঠানিক খাতে বড় আঘাত হানে। কারখানা বন্ধ ও ব্যবসা সংকুচিত হওয়ায় লাখ লাখ মানুষ স্থিতিশীল চাকরি হারান। যেমন, পশ্চিম জাভার জুতার কারখানার সাবেক শ্রমিক রহমত হিদায়াত এখন রাস্তায় গ্রিল করা মিটবল বিক্রি করে আগের আয়ের অর্ধেকেরও কম পান। অন্য অনেকের মতো তিনিও এখন পরিবারের জরুরি স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় বহন করতে পারেন না। সারা দেশেই এমন গল্প শোনা যায়: ছাঁটাই এবং আনুষ্ঠানিক খাতে নতুন চাকরির সুযোগের অভাবে অনেকেই অনানুষ্ঠানিক খাতে চলে যাচ্ছেন, যেখানে মজুরি কম এবং সুযোগ-সুবিধা সামান্য।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মসংস্থানের হার ৫৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫৯ শতাংশ হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তৈরি হওয়া বেশির ভাগ নতুন চাকরিই অনানুষ্ঠানিক, যা মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতা কমতে অবদান রাখছে।

স্থবির মজুরি ও বাড়তি ব্যয়

সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি প্রায় ২.৩৭ শতাংশে নিয়ন্ত্রণে থাকলেও শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মতো মধ্যবিত্তের জন্য জরুরি পরিষেবার ব্যয় মজুরির তুলনায় অনেক দ্রুত বাড়ছে। আনুষ্ঠানিক খাতের গড় বেতন বেড়েছে মাত্র ৩.৮ শতাংশ, ফলে কর্মীদের প্রকৃত আয়ে প্রবৃদ্ধি সামান্যই। এর ফলে মধ্যবিত্ত পরিবারের বাজেটের আরও বড় অংশ খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে ব্যয় হচ্ছে, বিবেচনামূলক খরচের জন্য থাকছে কম। এই পরিবর্তন অর্থনৈতিক চাপ ও জীবনমানের অবনতির একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ।

করভার ও নীতিগত অনিশ্চয়তা

সাম্প্রতিক করনীতির পরিবর্তন চাপ আরও বাড়িয়েছে। মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ১১ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১২ শতাংশ করার সরকারি উদ্যোগ হঠাৎ সংশোধন করে শুধু বিলাসপণ্যের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য করা হয়। এতে ব্যবসা ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো তাৎক্ষণিক প্রভাব থেকে রেহাই পেলেও মধ্যবিত্তের বৃহত্তর বৈষম্যগুলোর সমাধানে এটি তেমন কিছু করেনি। আঞ্চলিক সমপর্যায়ের দেশগুলোর তুলনায় ইন্দোনেশিয়ার কর-জিডিপি অনুপাত এখনো কম, ফলে অবকাঠামো, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষায় জরুরি বিনিয়োগে অর্থায়নের সক্ষমতা সরকারের সীমিত।

অর্থনীতির কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ

ইন্দোনেশিয়ার অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে নিকেল, কয়লা ও পাম তেলের মতো পণ্যের ওপর নির্ভরশীল। এসব খাত বিনিয়োগ আকর্ষণ করলেও ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্তকে টিকিয়ে রাখার মতো পর্যাপ্ত ভালো বেতনের আনুষ্ঠানিক চাকরি তৈরি করতে পারেনি। উৎপাদনশিল্পে দেশের সীমিত মনোযোগ ভিয়েতনাম ও মালয়েশিয়ার মতো প্রতিবেশীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাধাগ্রস্ত করেছে; দেশ দুটি শক্তিশালী রপ্তানিমুখী শিল্প গড়ে তুলেছে। ফলে উৎপাদন ও বিনিয়োগের বৈশ্বিক পরিবর্তন থেকে সুবিধা নিতে ইন্দোনেশিয়া হিমশিম খেয়েছে।

বৈশ্বিক প্রতিকূলতা ও বহিরাগত ঝুঁকি

বাণিজ্যযুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও জ্বালানির দামের অস্থিরতাসহ বহিরাগত ঝুঁকি অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ইন্দোনেশিয়ার বাজারে আগ্রহী থাকলেও সেই আস্থা ধরে রাখতে বড় ও সমৃদ্ধ ভোক্তাগোষ্ঠী প্রয়োজন। শক্তিশালী মধ্যবিত্ত না থাকলে বিনিয়োগের গন্তব্য হিসেবে দেশটির আকর্ষণ কমে যেতে পারে।

বিজ্ঞাপন

মধ্যবিত্তের পতনের মানবিক চিত্র

পরিসংখ্যানের আড়ালে রয়েছে লাখো মানুষের ব্যক্তিগত গল্প। উত্তর সুমাত্রার হালিমাহ নাসুতিওন ও তাঁর স্বামী একসময় স্বচ্ছল ব্যবসায়ী ছিলেন। মহামারিতে সামাজিক অনুষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাঁদের অনুষ্ঠান-সরঞ্জামের ব্যবসা ধসে পড়ে, আর তাঁরা সব হারান। অন্য অনেকের মতো তাঁরাও এখন আগের জীবনমান ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছেন; সংকটের সময় সরকারি সহায়তা পেয়েছেন সামান্যই।

নাসুতিওন ও হিদায়াত পরিবারের মতো পরিবারগুলোর জন্য মধ্যবিত্ত অবস্থান হারানো মানে শুধু আর্থিক দুরবস্থা নয়। এর সঙ্গে আসে ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ, মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় কম সুযোগ এবং এমন এক বঞ্চিত বোধ—যেন সরকারি নীতিতে শুধু অতি দরিদ্র বা অতি ধনীদেরই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে পরিচালিত “ডার্ক ইন্দোনেশিয়া” (#IndonesiaGelap) আন্দোলনের মতো সাম্প্রতিক বিক্ষোভ মধ্যবিত্ত ও শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বাড়তে থাকা ক্ষোভ সামনে এনেছে। প্রস্তাবিত টিউশন ফি বৃদ্ধি ও বৃত্তি কমানোর প্রতিবাদে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ পরে সুশাসন, চাকরির সুযোগ ও সামাজিক সুরক্ষার মতো আরও বিস্তৃত দাবিতে ছড়িয়ে পড়ে। উদ্বেগ স্পষ্ট: ঘরে সীমিত সম্ভাবনা থেকে মুক্তি পেতে অনেক তরুণ ইন্দোনেশীয় কাজ বা পড়াশোনার জন্য বিদেশে যাওয়ার কথা ভাবছেন।

অর্থনৈতিক পরিণতি: প্রবৃদ্ধির গতি কমা ও ভোগব্যয়ে পরিবর্তন

মধ্যবিত্তের পতন বৃহত্তর অর্থনীতিতে ইতোমধ্যে পরিমাপযোগ্য প্রভাব ফেলছে। ভোক্তা ব্যয় কমেছে; সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পণ্যের দাম কমার প্রবণতা দেখা গেছে এবং বড় খুচরা বিক্রেতারা বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা পূরণে হিমশিম খাচ্ছেন। যেমন, ২০২৪ সালে গাড়ি বিক্রি ১৪ শতাংশ কমেছে। দুর্বল চাহিদার জেরে পিৎজা হাট ইন্দোনেশিয়ার মতো ফাস্ট-ফুড চেইনও শাখা বন্ধ করেছে এবং কর্মী কমিয়েছে।

পিৎজা হাট ইন্দোনেশিয়া পরিচালনাকারী সারিমেলাতি কেনকানার প্রধান নির্বাহী বয় লুকিতো মধ্যবিত্তের মধ্যে সতর্কভাবে ব্যয় করার প্রবণতা বাড়ার কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেন, “অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে ইন্দোনেশীয়রা খরচের ব্যাপারে আরও মিতব্যয়ী হচ্ছেন।” ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো ছাড়ের প্রস্তাব ও পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়িয়ে পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়াচ্ছে, কিন্তু মূল চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে: মধ্যবিত্ত ইন্দোনেশীয়রা বিবেচনামূলক ব্যয়ের চেয়ে সঞ্চয় ও জরুরি প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।

বিজ্ঞাপন

ভোক্তা আচরণের এই পরিবর্তন সরকারের উচ্চাভিলাষী প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যের জন্য বড় বাধা। প্রেসিডেন্ট প্রবোও সুবিয়ান্তো ২০২৯ সালের মধ্যে বার্ষিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশে উন্নীত করা এবং ১ কোটি ৯০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন। কিন্তু আনুষ্ঠানিক ও ভালো বেতনের চাকরি তৈরি এবং উৎপাদনশিল্পে বিনিয়োগ বাড়ানোর মতো মধ্যবিত্তকে প্রভাবিত করা কাঠামোগত সমস্যাগুলোর সমাধান না হলে এসব লক্ষ্য অর্জন কঠিন হতে পারে।

নীতিগত উদ্যোগ: এ পর্যন্ত কী করা হয়েছে, আর কী দরকার?

এ পর্যন্ত সরকারি উদ্যোগের মূল লক্ষ্য ছিল দারিদ্র্য বিমোচন; নগদ সহায়তা ও কল্যাণমূলক কর্মসূচি দরিদ্রতম ইন্দোনেশীয়দের জন্য। এসব উদ্যোগ দারিদ্র্যের হার কমালেও যেসব পরিবারের আয় সহায়তা পাওয়ার যোগ্যতার চেয়ে বেশি, কিন্তু বাড়তি ব্যয় সামাল দেওয়ার মতো যথেষ্ট নয়, তাদের বেশির ভাগই উপেক্ষিত হয়েছে। বছরের প্রথমার্ধে সরকারি ব্যয় ১৪ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে, ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে এর বহুগুণ প্রভাব সীমিত হয়েছে।

প্রেসিডেন্ট প্রবোওর প্রশাসন অবকাঠামো বিনিয়োগ ও দরিদ্রদের জন্য কল্যাণ সহায়তা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি শিশু ও গর্ভবতী মায়েদের জন্য ২৮ বিলিয়ন ডলারের বিনা মূল্যে খাবার কর্মসূচির মতো নতুন উদ্যোগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও মধ্যবিত্ত হওয়ার প্রত্যাশী মানুষদের সহায়তায় ৩০ লাখ বাড়ি নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, এসব পদক্ষেপ সহায়ক হলেও মধ্যবিত্তের বিশেষ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যথেষ্ট নয়।

বিশেষজ্ঞরা মধ্যবিত্তকে কৌশলগত সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করে নীতি পুনর্গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন। প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  • শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার ব্যয়ে সাময়িক করছাড় বা কর্তন
  • মধ্যম আয়ের পরিবারের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক জ্বালানি ভর্তুকি বা নগদ সহায়তা
  • ভর্তুকিযুক্ত দক্ষতা প্রশিক্ষণ এবং চাকরি হারানোর বিরুদ্ধে আরও শক্তিশালী সুরক্ষা
  • আনুষ্ঠানিক ও ভালো বেতনের চাকরি তৈরিতে শ্রমঘন, চাহিদানির্ভর শিল্পে বিনিয়োগ
  • করভিত্তি বিস্তৃত ও কর পরিপালন উন্নত করতে সামগ্রিক কর সংস্কার

সাবেক অর্থমন্ত্রী ও সরকারি উপদেষ্টা চাতিব বাসরি বিশেষ করে রপ্তানিমুখী খাতে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে কর্মসংস্থান তৈরিতে মনোযোগ দেওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, “শুধু কল্যাণমূলক ব্যবস্থা নিলেই যথেষ্ট হবে না। আরও আনুষ্ঠানিক ও ভালো বেতনের চাকরি তৈরি করতে হবে এবং আমাদের অর্থনীতির প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়াতে হবে।”

বিজ্ঞাপন

শ্রমঘন শিল্প ও উদ্ভাবন কি মধ্যবিত্তকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারে?

একটি সম্ভাবনাময় পথ হলো শ্রমঘন ও চাহিদাকেন্দ্রিক শিল্পের বিকাশ। কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, বস্ত্র, নির্মাণ, পর্যটন ও তথ্যপ্রযুক্তির মতো খাত লাখ লাখ চাকরি তৈরি এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়াতে পারে। যেমন, ২০২৪ সালে ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সী ইন্দোনেশীয়দের ২৮ শতাংশের বেশি কৃষি, বনায়ন ও মৎস্য খাতে কাজ করেছেন; অন্যদিকে উৎপাদনশিল্প জিডিপিতে ১৮ শতাংশের বেশি অবদান রেখেছে এবং কর্মশক্তির প্রায় ১৪ শতাংশকে নিয়োগ দিয়েছে।

জাকার্তার প্রাদেশিক সরকার শ্রমঘন অর্থনৈতিক পরিবেশ গড়ে তুলতে বিনা মূল্যে পুষ্টিকর খাবার, সমবায় সঞ্চয় এবং ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য ক্ষুদ্রঋণসহ কয়েকটি পরীক্ষামূলক কর্মসূচি চালু করেছে। এসব উদ্যোগের লক্ষ্য খাদ্যের দাম স্থিতিশীল রাখা, চাহিদা বাড়ানো এবং ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীকে মধ্যবিত্তে উত্তরণের সহায়তা করা। খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, বস্ত্র উৎপাদন ও নির্মাণে বিনিয়োগ মূল্য সংযোজন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বিভিন্ন অঞ্চলে জীবনমান উন্নত করতে পারে।

প্রযুক্তি আরেকটি উদীয়মান সম্ভাবনার ক্ষেত্র। প্রায় সব ইন্দোনেশীয় মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। ফলে ডিজিটাল উদ্যোক্তা, কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং সফটওয়্যার উন্নয়ন, তথ্যপ্রযুক্তি সহায়তা ও ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরির মতো ক্ষেত্রে চাকরি সৃষ্টির যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে বিশ্বব্যাংক সতর্ক করেছে, কম মজুরির শ্রমঘন খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা অর্থনীতিকে স্থবির করতে পারে এবং দক্ষতা উন্নয়ন সীমিত করতে পারে। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে ইন্দোনেশিয়াকে দক্ষতাভিত্তিক উচ্চমানের চাকরি তৈরিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং শিক্ষা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ করতে হবে। কৃষিকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করা বা নির্মাণে প্রযুক্তির ব্যবহারসহ বিভিন্ন খাতের সমন্বয় স্থিতিস্থাপকতা গড়ে তুলতে এবং টেকসই প্রবৃদ্ধি এগিয়ে নিতে পারে।

বিজ্ঞাপন

সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব: বাড়তে থাকা উদ্বেগ ও অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি

মধ্যবিত্তের সংকোচন শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এর গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে। সাম্প্রতিক জরিপে মধ্যবিত্তের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগের চিত্র উঠে এসেছে, বিশেষ করে উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে। তাঁরা পরিবারের আয় স্থবির বা কমে যাওয়া, সঞ্চয় হ্রাস এবং ক্রয়ক্ষমতা কমার কথা জানিয়েছেন। খাবারের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে বাড়তি ব্যয় অর্থনৈতিক দুর্বলতা ও ঝুঁকির ইঙ্গিত দেয়।

#IndonesiaGelap এবং #KaburAjaDulu (“আগে পালাও”)—এমন প্রতিবাদী আন্দোলন সরকারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে ক্রমবর্ধমান অবিশ্বাসের প্রতিফলন। সামগ্রিকভাবে প্রেসিডেন্ট প্রবোওর জনপ্রিয়তা বেশি হলেও শিক্ষিত মধ্যবিত্তের মধ্যে অসন্তোষ তুলনামূলকভাবে বেশি। এসব উদ্বেগের সমাধান না হলে ইন্দোনেশিয়া অন্য দেশগুলোর মতো রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার ঝুঁকিতে পড়তে পারে, যেখানে মধ্যবিত্তের ক্ষোভ বড় ধরনের অস্থিরতার জন্ম দিয়েছে।

সামাজিক সংহতি বজায় রাখতে ও অস্থিরতা ঠেকাতে মধ্যবিত্তের জন্য সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ, সরকারি সেবার মানোন্নয়ন এবং সুশাসন নিশ্চিত করা জরুরি। ২০৪৫ সালের মধ্যে উচ্চ আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য অর্জনে মধ্যবিত্তের সুস্থতা হবে নির্ধারক বিষয়।

সারসংক্ষেপ

  • ইন্দোনেশিয়ার মধ্যবিত্তের সংখ্যা ২০১৯ সালের ৫ কোটি ৭০ লাখের বেশি থেকে কমে ২০২৪ সালে ৪ কোটি ৮০ লাখের নিচে নেমেছে, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলছে।
  • মহামারির পরবর্তী ধাক্কা, শ্রমবাজারের পরিবর্তন, স্থবির মজুরি, বাড়তি ব্যয় ও নীতিগত অনিশ্চয়তা এই পতনের কারণ।
  • মধ্যবিত্ত পরিবার ভোগব্যয়, কর রাজস্ব ও সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রধান চালিকাশক্তি; তাদের দুর্বলতার সুদূরপ্রসারী পরিণতি রয়েছে।
  • ভোক্তা ব্যয় কমছে, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সংকটে পড়ছে এবং উচ্চাভিলাষী প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ঝুঁকিতে রয়েছে।
  • সরকারের বর্তমান নীতির মূল লক্ষ্য দারিদ্র্য বিমোচন; মধ্যবিত্তের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি প্রয়োজন, কিন্তু তারা অনেকটাই উপেক্ষিত।
  • মধ্যবিত্তকে পুনরুজ্জীবিত ও প্রবৃদ্ধি টেকসই করতে শ্রমঘন শিল্প, উদ্ভাবন এবং সামগ্রিক কর সংস্কার জরুরি।
  • মধ্যবিত্তের বাড়তে থাকা উদ্বেগের সমাধান না হলে সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
  • অন্তর্ভুক্তিমূলক ও দূরদর্শী নীতির মাধ্যমে মধ্যবিত্তকে পুনরুদ্ধার ও সম্প্রসারণের ওপরই ইন্দোনেশিয়ার সমৃদ্ধির পথ নির্ভর করছে।
এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন

আপনার পছন্দ হতে পারে