চাপের মুখে মালয়েশিয়ার বিচার বিভাগ: বিক্ষোভ, রাজনীতি ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষার লড়াই
জুলাইয়ের এক আর্দ্র বিকেলে মালয়েশিয়ার প্রশাসনিক রাজধানী পুত্রজায়ার রাস্তায় কালো আলখাল্লা পরা আইনজীবীদের ভিড় জমে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষার দাবিতে তাঁদের কণ্ঠ প্রতিধ্বনিত হয়। দৃশ্যটি মালয়েশিয়ার ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ের কথা মনে করিয়ে দেয়, যখন আইন পেশাজীবী ও নাগরিক সমাজ আবারও দেশের আদালতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের আশঙ্কার মুখোমুখি হন। বিতর্কের কেন্দ্রে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের বিরুদ্ধে মালয়েশিয়ার শীর্ষ বিচারকদের নিয়োগে বিলম্ব ও বিতর্কিত ভূমিকার অভিযোগ, যা দেশটির আইনি ব্যবস্থার সততা নিয়ে জাতীয় বিতর্কের সূত্রপাত করে।
সূচিপত্র
- চাপের মুখে মালয়েশিয়ার বিচার বিভাগ: বিক্ষোভ, রাজনীতি ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষার লড়াই
- বিচারক নিয়োগ নিয়ে মালয়েশিয়ায় কেন বিক্ষোভ হচ্ছে?
- মালয়েশিয়ান বারের প্রধান দাবিগুলো
- রাজনৈতিক অভিঘাত: আনোয়ারের সরকারে অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন
- বৃহত্তর জনসাড়া ও নাগরিক সমাজের সক্রিয়তা
- মালয়েশিয়ায় বিচারক নিয়োগ হয় কীভাবে?
- ওয়ান আহমদ ফারিদ ওয়ান সালেহর নিয়োগ
- আনোয়ার ইব্রাহিমের প্রতিক্রিয়া: হস্তক্ষেপের অস্বীকার ও সম্মান দেখানোর আহ্বান
- ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: অতীতের বিচার বিভাগীয় সংকটের প্রতিধ্বনি
- বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিভঙ্গি: মালয়েশিয়ার গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ
- মালয়েশিয়ার বিচার বিভাগের সামনে এখন কী?
- সংক্ষেপে
বিচারক নিয়োগ নিয়ে মালয়েশিয়ায় কেন বিক্ষোভ হচ্ছে?
অস্থিরতার তাৎক্ষণিক কারণ ছিল মালয়েশিয়ার সর্বোচ্চ বিচারিক পদ দুটিতে—প্রধান বিচারপতি ও আপিল আদালতের প্রেসিডেন্ট—উত্তরসূরি নিয়োগে সরকারের ব্যর্থতা। ২০২৫ সালের ২ জুলাই প্রধান বিচারপতি তেংকু মাইমুন তুয়ান মাত উত্তরসূরি মনোনীত না হয়েই অবসরে যাওয়ায় বিচার বিভাগের শীর্ষ পদে নেতৃত্বের শূন্যতা তৈরি হয়। একই সময়ে আপিল আদালতের প্রেসিডেন্ট পদটিও শূন্য হয়। এ ছাড়া বছরের শেষ নাগাদ আরও কয়েকজন জ্যেষ্ঠ বিচারকের অবসর নেওয়ার কথা ছিল।
মালয়েশিয়ার আইনি অঙ্গনের অনেকের কাছে পরিস্থিতিটি নিছক প্রশাসনিক গাফিলতি ছিল না; বরং আইনের শাসনের ভিত্তির জন্য হুমকি ছিল। দেশটির প্রধান আইনজীবী সংগঠন মালয়েশিয়ান বার ২০২৫ সালের ১৪ জুলাই প্যালেস অব জাস্টিস থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পর্যন্ত ২.৬ কিলোমিটার পদযাত্রার আয়োজন করে। প্রায় ১,০০০ আইনজীবীর সঙ্গে রাজনীতিক, অধিকারকর্মী ও সাধারণ মানুষ এতে যোগ দেন। তাঁরা শূন্য পদগুলো পূরণে জরুরি পদক্ষেপ দাবি করেন এবং বিচারক নিয়োগে কথিত রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের তদন্তে একটি রয়্যাল কমিশন অব ইনকোয়ারি গঠনের আহ্বান জানান।
বিশিষ্ট আইনজীবী ও মালয়েশিয়ান বারের সাবেক সভাপতি আম্বিগা শ্রীনিবাসন বিক্ষোভের মনোভাব তুলে ধরে বলেন:
আমাদের [সরকারের] ওপর বাজপাখির মতো নজর রাখতে হয়েছে এবং সারাক্ষণ খোঁজখবর নিতে হয়েছে, যা আমরা কখনোই চাইনি,তিনি সাংবাদিকদের বলেন। তাঁর এই মন্তব্যে ১৯৮৮ সালের বিচার বিভাগীয় সংকটের সঙ্গে সাদৃশ্যের ইঙ্গিত ছিল, যখন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ বিতর্কিত রায়ের কারণে জ্যেষ্ঠ বিচারকদের অপসারণ করেছিলেন।
মালয়েশিয়ান বারের প্রধান দাবিগুলো
- শীর্ষ পদগুলোর শূন্যতা পূরণে যোগ্য ও স্বাধীন বিচারকদের অবিলম্বে নিয়োগ
- বিচারক নিয়োগ কমিশনের (জেএসি) বৈঠকের কার্যবিবরণী জনসমক্ষে প্রকাশ
- কথিত হস্তক্ষেপ তদন্তে রয়্যাল কমিশন অব ইনকোয়ারি গঠন
- বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্বচ্ছতা সুরক্ষায় সংস্কার
বারের সভাপতি মোহাম্মদ এজরি আবদুল ওয়াহাব জোর দিয়ে বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা আইনের শাসনের নিশ্চয়তা এবং “নীরব থাকা কোনো বিকল্প নয়”।
রাজনৈতিক অভিঘাত: আনোয়ারের সরকারে অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন
বিতর্কটি দ্রুত রাজনৈতিক অঙ্গনে ছড়িয়ে পড়ে। আনোয়ারের নিজ দল পিপলস জাস্টিস পার্টির (পিকেআর) নয়জন আইনপ্রণেতা, যাঁদের নেতৃত্বে ছিলেন সাবেক অর্থনীতিমন্ত্রী রাফিজি রামলি, বিলম্ব ও কথিত অনিয়মের বিষয়ে রয়্যাল ইনকোয়ারি এবং সংসদীয় তদন্তের আহ্বান জানান। ক্ষমতাসীন জোটের ভেতর থেকে এমন বিরল ভিন্নমত বিচার বিভাগ সামলানোর ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা নিয়ে গভীর অস্বস্তির ইঙ্গিত দেয়।
নাটকীয়তা আরও বাড়ে যখন আনোয়ারের মেয়ে ও পিকেআরের উপসভাপতি নুরুল ইজাহ আনোয়ার আইনজীবীদের পদযাত্রায় যোগ দেন। এতে দলের অবস্থান আরও জটিল হয়ে পড়ে। তাঁর অংশগ্রহণকে বারের দাবির প্রতি সমর্থন হিসেবে দেখা হয়, যদিও দলীয় নেতৃত্ব কোনো সংকট নেই বলে দাবি করছিল। রাফিজি রামলি বলেন, নুরুল ইজাহর উপস্থিতি দলের আনুষ্ঠানিক অবস্থানের কারণে দলকে অস্বস্তিকর অবস্থায় ফেলেছে।
জেএসির একটি বৈঠকের কথিত কার্যবিবরণী ফাঁস হওয়ার পর জনমনে নজর আরও বাড়ে। এতে বিচারক নিয়োগ প্রভাবিত করার চেষ্টার ইঙ্গিত ছিল। কর্তৃপক্ষ অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের আওতায় ফাঁসের তদন্ত শুরু করে, কিন্তু ততক্ষণে জনআস্থার ক্ষতি হয়ে গেছে।
বৃহত্তর জনসাড়া ও নাগরিক সমাজের সক্রিয়তা
১৪ জুলাইয়ের পদযাত্রা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। বারসিহ ২.০ এবং দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি প্রতিরোধ কেন্দ্রের মতো এনজিওর প্রতিনিধিসহ নাগরিক সমাজের শত শত সদস্য বিক্ষোভে যোগ দেন। ক্ষমতাসীন ও বিরোধী—উভয় পক্ষের আইনপ্রণেতাদের স্বচ্ছতার দাবির পাশাপাশি বিক্ষোভের ব্যাপকতা বিচার বিভাগের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের গভীরতা তুলে ধরে।
এর পরের দিনগুলোতে কুয়ালালামপুরে আরও হাজারো মালয়েশীয় সমাবেশ করেন। কথিত অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি ও বিচার বিভাগীয় বিতর্কের কারণে কেউ কেউ আনোয়ারের পদত্যাগ দাবি করেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ, যিনি অতীতের বিচার বিভাগীয় সংকটগুলোর কেন্দ্রীয় চরিত্র ছিলেন, এমনই একটি সমাবেশে প্রধান বক্তা ছিলেন। এতে বিষয়টির রাজনৈতিক গুরুত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
মালয়েশিয়ায় বিচারক নিয়োগ হয় কীভাবে?
বিতর্কটি বুঝতে মালয়েশিয়ার বিচারক নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পর্কে জানা দরকার। ফেডারেল সংবিধানের ১২২বি অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী ও শাসকদের সম্মেলনের (মালয়েশিয়ার বংশানুক্রমিক রাজ্য শাসকদের পরিষদ) সঙ্গে পরামর্শের পর প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে রাজা প্রধান বিচারপতি ও অন্যান্য শীর্ষ বিচারক নিয়োগ করেন। ২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত বিচারক নিয়োগ কমিশনের (জেএসি) কাজ হলো প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রার্থীদের সুপারিশ করা। পরে প্রধানমন্ত্রী সেই নামগুলো রাজার কাছে পাঠান।
সমালোচকদের মতে, এই ব্যবস্থায় বিচারক নিয়োগে প্রধানমন্ত্রীর উল্লেখযোগ্য প্রভাব থাকে, যা ক্ষমতার পৃথকীকরণকে দুর্বল করতে পারে। সাম্প্রতিক বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল আনোয়ার জেএসির সুপারিশ উপেক্ষা করে প্রক্রিয়ায় বিলম্ব করেছেন—এমন দাবি, যা রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে সন্দেহ বাড়ায়।
ওয়ান আহমদ ফারিদ ওয়ান সালেহর নিয়োগ
কয়েক সপ্তাহের অনিশ্চয়তার পর ২০২৫ সালের ১৮ জুলাই রাজা আপিল আদালতের বিচারক ওয়ান আহমদ ফারিদ ওয়ান সালেহকে নতুন প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেন। কয়েকটি কারণে এই নিয়োগ ছিল উল্লেখযোগ্য:
- ওয়ান আহমদকে আপিল আদালত থেকে পদোন্নতি দেওয়া হয়। এতে ফেডারেল কোর্ট ও হাইকোর্টের আরও জ্যেষ্ঠ ৩২ জন বিচারককে টপকে যাওয়া হয়, যা মালয়েশিয়ার আইনি ইতিহাসে নজিরবিহীন।
- তিনি এর আগে উপস্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং ইউনাইটেড মালয়স ন্যাশনাল অর্গানাইজেশনের (ইউএমএনও) সদস্য ছিলেন। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের জড়িত মামলায় তাঁর নিরপেক্ষতা নিয়ে এ কারণে উদ্বেগ দেখা দেয়।
- আনোয়ারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত এক সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেলসহ অন্য কয়েকজন সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম নিয়ে জনমনে বিরোধিতার পর এই নিয়োগকে কেউ কেউ সমঝোতা হিসেবে দেখেন।
সরকার ও কয়েকটি সংবাদমাধ্যম নিয়োগটিকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার বিজয় হিসেবে তুলে ধরলেও সমালোচকদের চোখে এটি ছিল রাজনৈতিক প্রভাব অব্যাহত থাকার প্রমাণ এবং বিচার বিভাগে মেধাভিত্তিক ব্যবস্থার জন্য আঘাত।
আনোয়ার ইব্রাহিমের প্রতিক্রিয়া: হস্তক্ষেপের অস্বীকার ও সম্মান দেখানোর আহ্বান
প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম বিচার বিভাগীয় বিষয়ে হস্তক্ষেপের অভিযোগ বারবার অস্বীকার করেছেন। প্রকাশ্য বক্তব্যে তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, তাঁর দায়িত্বকালে তিনি “আদালতের সিদ্ধান্তে কখনো হস্তক্ষেপ করেননি” এবং সরকার বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সমুন্নত রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ৩৭তম লঅ্যাশিয়া সম্মেলনে আনোয়ার বলেন:
রাজনৈতিক স্বার্থে বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় সরকারের হস্তক্ষেপের যুগ শেষ… এ ধরনের অপব্যবহার ও লঙ্ঘন আর কখনো ঘটতে দেব না।
সব পক্ষ সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকলে মালয়েশিয়ান বারের বিক্ষোভ করার অধিকারকে সমর্থন করেন বলেও জানান আনোয়ার। অ্যাটর্নি জেনারেলের চেম্বার্স ও রাজপ্রাসাদ ইস্তানা নেগারাও একই মত জানিয়ে বিচারক নিয়োগে ফেডারেল সংবিধান অনুসরণের আহ্বান জানায় এবং প্রক্রিয়াটিকে রাজনীতিকীকরণ না করার সতর্কতা দেয়।
এসব আশ্বাস সত্ত্বেও সংশয় কাটেনি। সম্মানিত বিদায়ী প্রধান বিচারপতির মেয়াদ বাড়াতে সরকারের অস্বীকৃতি, ওয়ান আহমদের আরও জ্যেষ্ঠ বিচারকদের টপকে নজিরবিহীনভাবে পদোন্নতি এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও বিচার বিভাগে রাজনৈতিক নিয়োগের বৃহত্তর প্রবণতাকে সমালোচকেরা নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতার অতিরিক্ত বিস্তারের প্রমাণ হিসেবে দেখান।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: অতীতের বিচার বিভাগীয় সংকটের প্রতিধ্বনি
বর্তমান বিতর্কের নজির আছে। এর আগে মালয়েশিয়ার বিচার বিভাগ রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েছে; সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা ১৯৮৮ সালের, যখন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ তাঁর সরকারের জন্য প্রতিকূল রায়ের পর জ্যেষ্ঠ বিচারকদের অপসারণের উদ্যোগ নেন। সেই ঘটনা বিচার বিভাগের সুনামে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি করে এবং জনআস্থা পুনরুদ্ধারে কয়েক দশকের প্রচেষ্টার জন্ম দেয়।
বিড়ম্বনার বিষয়, আনোয়ার ইব্রাহিম নিজেও একসময় মালয়েশিয়ার রাজনীতিকীকৃত আদালতের শিকার হয়েছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোকে ব্যাপকভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে করা হয়েছিল এবং তাঁকে কারাবন্দী করা হয়। আনোয়ারের পাকাতান হারাপান জোটকে ক্ষমতায় আনা ২০১৮ সালের নির্বাচনকে মালয়েশিয়ার গণতন্ত্রের মোড় পরিবর্তনের মুহূর্ত হিসেবে স্বাগত জানানো হয়েছিল। তখন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই সংস্কারগুলো উল্টে যাচ্ছে কি না, তা নিয়ে কিছু পর্যবেক্ষককে প্রশ্ন তুলতে বাধ্য করেছে।
বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিভঙ্গি: মালয়েশিয়ার গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ
আইনবিষয়ক গবেষক ও গণতন্ত্রের পক্ষে থাকা ব্যক্তিরা সতর্ক করে বলেছেন, মালয়েশিয়ার গণতান্ত্রিক উত্তরণে বিচার বিভাগের সততা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জার্নাল অব ডেমোক্রেসি-এর ভাষ্য অনুযায়ী, কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা মোকাবিলায় শক্তিশালী বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতা, রাজনৈতিক স্বাধীনতার সুরক্ষা এবং সুশাসন প্রয়োজন।
সাবেক প্রধান বিচারপতি তেংকু মাইমুন তুয়ান মাত এ বছরের শুরুতে এক আইন সম্মেলনে গণতন্ত্র রক্ষায় বিচারিক ক্ষমতার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন:
এ ধরনের ক্ষমতার প্রয়োগ (সাংবিধানিক সর্বোচ্চতা নিশ্চিত করার আদালতের ক্ষমতা) শুধু গণতন্ত্রকে সুরক্ষা দেয় ও টিকিয়ে রাখে না, এর অব্যাহত অস্তিত্বও নিশ্চিত করে। তাই আমি সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে এগুলো ভয় না পেতে এবং সীমিত করার চেষ্টা না করে বরং সমুন্নত রাখার আহ্বান জানাব।
স্থানীয় গণমাধ্যমের মতামতধর্মী লেখাগুলোতে নিয়োগপ্রক্রিয়া সামলানোর ক্ষেত্রে আনোয়ারের ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে। লেখাগুলোতে বলা হয়েছে, জ্যেষ্ঠ বিচারকদের টপকে যাওয়া এবং মেধাভিত্তিক ব্যবস্থা উপেক্ষা করা বিচার বিভাগের মনোবল দুর্বল করে ও জনআস্থা ক্ষয় করে। কেউ কেউ রাজনৈতিক অভিজাতদের বিচার বিভাগ নিয়ন্ত্রণের “অন্ধকার যুগে” ফিরে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন।
মালয়েশিয়ার বিচার বিভাগের সামনে এখন কী?
ওয়ান আহমদ ফারিদ ওয়ান সালেহ প্রধান বিচারপতি হওয়ায় মালয়েশিয়ার বিচার বিভাগের শীর্ষ নেতৃত্বের তাৎক্ষণিক সংকটের অবসান হয়েছে। তবে অন্তর্নিহিত সমস্যাগুলো রয়ে গেছে। এই বিতর্ক ক্ষমতাসীন জোটের গভীর বিভাজন সামনে এনেছে, আইনি ব্যবস্থার ওপর জনআস্থা নাড়িয়ে দিয়েছে এবং রাজনৈতিক প্রভাব থেকে বিচার বিভাগকে সুরক্ষিত রাখতে আরও সংস্কারের প্রয়োজন নিয়ে বিতর্ক নতুন করে উসকে দিয়েছে।
বিচারক নিয়োগে সাংবিধানিক ভূমিকা পালনকারী শাসকদের সম্মেলন প্রক্রিয়াটি নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। এদিকে মালয়েশিয়ান বার ও নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির দাবিতে চাপ অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করেছে।
সংক্ষেপে
- ২০২৫ সালের জুলাইয়ে শীর্ষ বিচারকদের অবসরের পরপর উত্তরসূরি নিয়োগ না হওয়ায় মালয়েশিয়ার বিচার বিভাগে নেতৃত্বের সংকট দেখা দেয়। এতে বিক্ষোভ ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ ওঠে।
- মালয়েশিয়ান বারের নেতৃত্বে বড় পদযাত্রায় জরুরি নিয়োগ, স্বচ্ছতা এবং কথিত হস্তক্ষেপ তদন্তে রয়্যাল কমিশন অব ইনকোয়ারি গঠনের দাবি জানানো হয়।
- প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম ও তাঁর সরকার কোনো অনিয়মের কথা অস্বীকার করে বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অটুট রয়েছে এবং সাংবিধানিক প্রক্রিয়া মেনেই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
- আরও জ্যেষ্ঠ বিচারকদের টপকে ওয়ান আহমদ ফারিদ ওয়ান সালেহকে শেষ পর্যন্ত প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করাকে সমালোচকেরা রাজনৈতিক প্রভাব অব্যাহত থাকার প্রমাণ হিসেবে দেখেছেন।
- এই বিতর্ক ক্ষমতাসীন জোটের অভ্যন্তরীণ বিভাজন সামনে এনেছে এবং মালয়েশিয়ায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক সংস্কারের ভবিষ্যৎ নিয়ে বৃহত্তর প্রশ্ন তুলেছে।






