মিয়ানমারের রাজনৈতিক সংকট: ২০২৫ সালের নির্বাচনের পথে
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে সাধারণ নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে মিয়ানমারের সামরিক সরকার, সম্প্রতি যার নতুন নাম দেওয়া হয়েছে স্টেট সিকিউরিটি অ্যান্ড পিস কমিশন (এসএসপিসি)। সাড়ে চার বছর ধরে চলা জরুরি অবস্থার আকস্মিক অবসানের পর এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ওই সময় গৃহযুদ্ধ, ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিকল্পিতভাবে ভেঙে ফেলার ঘটনা ঘটেছে। নির্বাসিত ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট (এনইউজি) এবং তাদের মিত্ররা একসময় মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার অগ্রদূত হিসেবে বিবেচিত হলেও এখন দেশের ভেতরে ও আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজেদের প্রাসঙ্গিকতা ও প্রভাব ধরে রাখার সংকটে পড়েছে।
সূচিপত্র
- মিয়ানমারের রাজনৈতিক সংকট: ২০২৫ সালের নির্বাচনের পথে
- মিয়ানমার কীভাবে এখানে এসে পৌঁছাল? সংক্ষিপ্ত পটভূমি
- জান্তার নির্বাচনী কৌশল: বৈধতা তৈরি
- নির্বাসিত বিরোধী পক্ষ: কমতে থাকা প্রভাব ও অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ
- বিরোধী পক্ষের কণ্ঠ
- সামরিক কৌশল: দমন-পীড়ন, ছাড় ও আন্তর্জাতিক কূটকৌশল
- আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া: সমালোচনা ও বাস্তববাদিতার টানাপোড়েন
- ময়দানের পরিস্থিতি: প্রতিরোধ, ফেডারেল ব্যবস্থা ও মানবিক সংকট
- ভূরাজনৈতিক সমীকরণ: চীন, রাশিয়া ও পশ্চিমা দেশগুলোর ভূমিকা
- এরপর কী? সম্ভাব্য পরিস্থিতি ও প্রভাব
- সারসংক্ষেপ
এই নাটকীয় পরিস্থিতির কেন্দ্রে রয়েছে বৈধতা অর্জনের লড়াই: কঠোর নিয়ন্ত্রণে নির্বাচন আয়োজন করে সামরিক জান্তা বৈধতা তৈরি করতে চাইছে। অন্যদিকে, প্রকৃত গণতন্ত্র এখনো সম্ভব—এ কথা বিশ্ববাসী ও নিজেদের জনগণকে বোঝাতে হিমশিম খাচ্ছে বিরোধী পক্ষ। এর ফল মিয়ানমারের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে এবং গণতন্ত্রের আবরণে নিজেদের আড়াল করতে চাওয়া কর্তৃত্ববাদী শাসনের জবাবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কী পদক্ষেপ নেয়, তার নজিরও তৈরি করতে পারে।
মিয়ানমার কীভাবে এখানে এসে পৌঁছাল? সংক্ষিপ্ত পটভূমি
মিয়ানমারের বর্তমান অস্থিরতার শুরু ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে। এর ফলে এক দশক ধরে চলা সীমিত গণতান্ত্রিক সংস্কারের অবসান ঘটে। অং সান সু চির ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে সেনাবাহিনী। ২০২০ সালের নির্বাচনে দলটি বিপুল জয় পেয়েছিল। নির্বাচনে জালিয়াতির অভিযোগ তুলে ক্ষমতা দখলের পক্ষে যুক্তি দেয় সেনাবাহিনী। তবে দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকেরা এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে ব্যাপকভাবে নাকচ করেন।
অভ্যুত্থানের পর দেশজুড়ে বিক্ষোভ, নৃশংস দমন-পীড়ন এবং বিস্তৃত প্রতিরোধ আন্দোলনের উত্থান ঘটে। ক্ষমতাচ্যুত আইনপ্রণেতারা এনইউজি গঠন করেন। পাশাপাশি দীর্ঘদিনের জাতিগত সশস্ত্র সংগঠনগুলোর মিত্র বেসামরিক মিলিশিয়াদের নেটওয়ার্ক পিপলস ডিফেন্স ফোর্সেসের (পিডিএফ) উত্থান ঘটে। এর জেরে গৃহযুদ্ধে দেশটি খণ্ডবিখণ্ড হয়ে পড়েছে। বড় শহর ও সমতল অঞ্চলগুলো সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকলেও সীমান্তবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকা ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ভূখণ্ডে প্রভাব রয়েছে বিরোধী বাহিনীর।
২০২১ সাল থেকে জান্তা রাজনৈতিক স্বাধীনতা, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। হাজারো মানুষ নিহত, কয়েক হাজার মানুষ গ্রেপ্তার এবং লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে, দারিদ্র্য বেড়েছে এবং মৌলিক পরিষেবা অচল হয়ে পড়েছে, বিশেষত সংঘাতপূর্ণ এলাকায়। শৃঙ্খলা ফেরানোর নামে সহিংসতা ও দমন-পীড়নের ওপর নির্ভর করেছে শাসকগোষ্ঠী। সামরিক শাসন পাকাপোক্ত করতে একের পর এক আইনি কৌশলও নিয়েছে তারা।
জান্তার নির্বাচনী কৌশল: বৈধতা তৈরি
২০২৫ সালের জুলাইয়ে জরুরি শাসনের অবসান ঘোষণা করে এসএসপিসি জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করে। এর সঙ্গে ছিল বিতর্কিত আদমশুমারি। সামরিক বাহিনীর পাহারায় পরিচালিত এই গণনায় সহিংসতা, জবরদস্তি এবং অসম্পূর্ণ তথ্য সংগ্রহের অভিযোগ রয়েছে। সমালোচকদের মতে, পরিকল্পিত নির্বাচনের মতো এই আদমশুমারিও শাসকগোষ্ঠীর বৈধতা দাবি করার হাতিয়ার। এর মাধ্যমে জান্তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা বিপুল জনগোষ্ঠীকে বাদ রাখা হচ্ছে।
শাসকগোষ্ঠীর ইউনিয়ন নির্বাচন কমিশন ৫৫টি রাজনৈতিক দলকে নিবন্ধন দিয়েছে এবং তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করছে। তবে নতুন নির্বাচনী আইনে অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তিদের—যার মধ্যে কার্যত প্রায় সব বিরোধী নেতাই রয়েছেন—অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এনএলডিসহ আরও কয়েক ডজন দল বিলুপ্ত করা হয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী, সংসদের ২৫ শতাংশ আসন সেনাবাহিনীর জন্য সংরক্ষিত। উচ্চকক্ষে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা চালু করে নির্বাচনী পদ্ধতিও বদলানো হয়েছে, যা জান্তার অনুকূলে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্রকে আরও কাত করেছে।
মানবাধিকার সংগঠন ও আন্তর্জাতিক নির্বাচন পর্যবেক্ষকেরা সর্বসম্মতিক্রমে এই প্রক্রিয়াকে প্রহসন বলে নিন্দা করেছেন। অংশগ্রহণকারীদের প্রায়ই জোর করা হচ্ছে। নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় বাধা দেওয়ার দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি—কারাদণ্ড, এমনকি মৃত্যুদণ্ডও। জান্তার কৌশল স্পষ্ট: কর্তৃত্ববাদী শাসন পাকাপোক্ত করতে এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেতে নির্বাচনের আবরণ ব্যবহার করা।
নির্বাসিত বিরোধী পক্ষ: কমতে থাকা প্রভাব ও অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ
এনইউজি ও তাদের অংশীদার ন্যাশনাল ইউনিটি কনসালটেটিভ কাউন্সিল (এনইউসিসি) ২০০৮ সালের সামরিক বাহিনীর প্রণীত সংবিধানের ভিত্তিতে আয়োজিত যেকোনো নির্বাচন ধারাবাহিকভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের অবস্থান হলো, যে শক্তি গণতন্ত্রকে উৎখাত করেছে, তাদের নিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রকৃত গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। তবে নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, বিরোধী পক্ষের কণ্ঠ তত ক্ষীণ হচ্ছে এবং মিয়ানমারের ভেতরে বা বিদেশে—ঘটনাপ্রবাহে প্রভাব রাখার সক্ষমতা কমছে।
এই প্রভাব কমে যাওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে:
- আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির অভাব: ব্যাপক সহানুভূতি থাকা সত্ত্বেও এনইউজি বড় শক্তিগুলো বা জাতিসংঘের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি আদায় করতে পারেনি। পশ্চিমা দেশগুলো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে এবং কথায় সমর্থন দিয়েছে, কিন্তু দৃঢ় পদক্ষেপ বা সামরিক সহায়তা দেওয়া থেকে বিরত থেকেছে। এদিকে চীন, রাশিয়া ও ভারত স্থিতিশীলতা এবং নিজেদের স্বার্থকে গণতান্ত্রিক নীতির চেয়ে অগ্রাধিকার দিয়ে জান্তার সঙ্গে যোগাযোগে আগ্রহ দেখিয়েছে।
- খণ্ডিত প্রতিরোধ: নির্বাসিত রাজনীতিক, জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী ও তৃণমূলের কর্মীদের নিয়ে বিরোধী পক্ষ একটি ঢিলেঢালা জোট। সামরিক শাসন প্রত্যাখ্যানের বিষয়ে তারা একমত হলেও কৌশল, নেতৃত্ব এবং ভবিষ্যতের ফেডারেল মিয়ানমারের রূপরেখা নিয়ে তাদের মতভেদ রয়েছে। জয়েন্ট কো-অর্ডিনেটিং বডি (জেসিবি) ও আর্টিকলস অব ফেডারেল ট্রানজিশনাল অ্যারেঞ্জমেন্ট (এএফটিএ)-এর মতো ঐক্যবদ্ধ কাঠামো গড়ার উদ্যোগে কিছু অগ্রগতি হয়েছে, তবে সেগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
- সম্পদের সীমাবদ্ধতা: এনইউজি ও তার মিত্ররা সীমিত আর্থিক ও রসদ-সহায়তা নিয়ে কাজ করছে। বৈশ্বিক অগ্রাধিকারের পরিবর্তনের কারণে আন্তর্জাতিক সহায়তা কমেছে বা অন্য খাতে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। পক্ষত্যাগী সেনাসদস্য, বাস্তুচ্যুত বেসামরিক মানুষ কিংবা ময়দানের যোদ্ধাদের দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা দেওয়ার মতো সামর্থ্যও বিরোধী পক্ষের নেই।
- কূটনৈতিক ক্লান্তি: ইউক্রেনের যুদ্ধ থেকে দক্ষিণ চীন সাগরের উত্তেজনা—বিভিন্ন বৈশ্বিক সংকট মিয়ানমার থেকে মনোযোগ সরিয়ে নিয়েছে। আসিয়ানের শান্তি উদ্যোগ থমকে আছে, আর পশ্চিমা সরকারগুলো জান্তার ক্ষমতা সুসংহত করাকে ক্রমেই অনিবার্য বলে মেনে নিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।
এর ফলে এনইউজির বিপ্লবী কূটনীতি সমর্থন আদায়ে হিমশিম খাচ্ছে। আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ, নিষেধাজ্ঞা এবং প্রতিরোধে সহায়তার আহ্বানে মূলত সাড়া মেলেনি। এমনকি মিয়ানমারের ভেতরেও সামরিক ও রাজনৈতিক কৌশলের সমন্বয় করতে বিরোধী পক্ষকে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে, বিশেষত সংঘাত আরও বিকেন্দ্রীভূত ও স্থানীয় পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ায়।
বিরোধী পক্ষের কণ্ঠ
এনইউজির ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দুয়া লাশি লা বারবার বাইরের সহায়তার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে জান্তার সঙ্গে যেকোনো সংলাপ প্রত্যাখ্যান করেছেন। সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন:
সামরিক জান্তার সঙ্গে সংলাপ করে গণতন্ত্রে ফেরা সম্ভব নয়। নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে সামরিক বাহিনী সময়ক্ষেপণ করছে এবং জনগণের বিরুদ্ধে অপরাধ করেছে। সফল হতে আমাদের আন্তর্জাতিক আর্থিক সহায়তা এবং সম্ভবত সামরিক সহায়তাও প্রয়োজন।
নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় স্থানীয় প্রশাসন প্রতিষ্ঠা ও মৌলিক পরিষেবা দেওয়ার জন্য এনইউজির প্রচেষ্টার কথাও তিনি তুলে ধরেন। তবে সীমিত সম্পদ ও স্বীকৃতির অভাবে এসব উদ্যোগের সীমাবদ্ধতাও স্বীকার করেন।
সামরিক কৌশল: দমন-পীড়ন, ছাড় ও আন্তর্জাতিক কূটকৌশল
আসন্ন নির্বাচন নিয়ে জান্তার কৌশল দ্বিমুখী: ভিন্নমত দমনে দমন-পীড়ন বাড়ানো এবং বিরোধী পক্ষকে বিভক্ত ও নিজেদের অনুগত করতে কৌশলগত ছাড় দেওয়া। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে অভ্যুত্থানের পর প্রথমবারের মতো সামরিক বাহিনী প্রকাশ্যে বিরোধী শক্তিগুলোকে অস্ত্র সমর্পণ করে রাজনৈতিক দল হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানায়। ২০১০ সালের নির্বাচনের আগে একই ধরনের কৌশল নেওয়া হয়েছিল। তাতে স্বল্প সময়ের জন্য আধা-বেসামরিক শাসন এলেও প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
বিরোধী নেতারা ও জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো দ্রুত এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। সংঘাতের মূল কারণগুলোর সমাধান না করেই সামরিক শাসনকে বৈধতা দেওয়ার কৌশল হিসেবে তারা একে দেখে। এনইউজির মুখপাত্র নে ফোন লাত সোজাসাপ্টা প্রশ্ন করেন:
রাজনৈতিক উপায়ে রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান করতে ব্যর্থ হলো ঠিক কারা? সামরিক বাহিনীর উচিত রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানো, একটি ফেডারেল ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠার জন্য নতুন সংবিধান প্রণয়ন মেনে নেওয়া এবং সংঘটিত সব যুদ্ধাপরাধের জন্য জবাবদিহি করা।
এসব প্রত্যাখ্যান সত্ত্বেও নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি বা অন্য প্রতীকী পদক্ষেপের মাধ্যমে নিজেদের ভাবমূর্তি কিছুটা নরম করার চেষ্টা করতে পারে জান্তা। পশ্চিমা রাজধানীগুলোতে নিজেদের অবস্থান উন্নত করতে ওয়াশিংটনভিত্তিক একটি জনসংযোগ সংস্থাকেও নিয়োগ দিয়েছে তারা। তবে কূটনৈতিক মনোভাব বদলেছে, এমন প্রমাণ খুব কম।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া: সমালোচনা ও বাস্তববাদিতার টানাপোড়েন
মিয়ানমারের নির্বাচনী পরিকল্পনা নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া মিশ্র। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাপানসহ পশ্চিমা সরকারগুলো প্রকাশ্যে জান্তার পদক্ষেপের সমালোচনা করেছে এবং রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি ও গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছে। তবে এসব বিবৃতির সঙ্গে অর্থবহ পরিণতি বা নতুন নিষেধাজ্ঞা খুব কমই যুক্ত হয়েছে।
উদাহরণ হিসেবে, জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইওয়ায়া তাকেশি নির্বাচন নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে এবং সহিংসতা বন্ধে জান্তার প্রতি আহ্বান জানিয়ে একটি বিবৃতি দিয়েছেন। তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, নীতিগত অবস্থান তুলে ধরলেও এই ধরনের কূটনৈতিক ভাষা অন্য দেশগুলোকে নির্বাচনের ফল স্বীকৃতি দেওয়া বা শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ করা থেকে বিরত রাখার জন্য যথেষ্ট জোরালো না-ও হতে পারে।
চীন, রাশিয়া ও ভারত আরও বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েছে। বিশেষ করে চীন নির্বাচনের ফলকে বৈধতা দেওয়ার জন্য নিজেদের প্রস্তুত করেছে। জান্তাপন্থী দলগুলোকে আতিথ্য দিয়েছে এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় কারিগরি সহায়তা দিয়েছে। সীমান্তে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ, বিশেষত চীন-মিয়ানমার ইকোনমিক করিডর সুরক্ষিত রাখাই বেইজিংয়ের প্রধান উদ্বেগ। রাশিয়া জান্তার সঙ্গে সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক গভীর করেছে। অন্যদিকে, ভারত সীমান্ত নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে।
আঞ্চলিক জোট আসিয়ান কার্যকর মধ্যস্থতা করতে হিমশিম খাচ্ছে। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম জান্তা ও এনইউজির মধ্যে সংলাপের উদ্যোগ নিয়েছেন এবং মানবিক প্রয়োজনে সীমিত যুদ্ধবিরতি চুক্তি করিয়েছেন। তবে জান্তা আপসে রাজি না হওয়ায় জোটের প্রধান শান্তি পরিকল্পনা, পাঁচ দফা ঐকমত্যে, সামান্যই অগ্রগতি হয়েছে। মিয়ানমারবিষয়ক স্পেশাল অ্যাডভাইজরি কাউন্সিল অন্তর্ভুক্তিমূলক আলোচনা, দেশব্যাপী যুদ্ধবিরতি এবং বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনভিত্তিক নতুন ঐকমত্যের আহ্বান জানিয়েছে। তবে এ ধরনের চুক্তির সম্ভাবনা এখনো ক্ষীণ।
ময়দানের পরিস্থিতি: প্রতিরোধ, ফেডারেল ব্যবস্থা ও মানবিক সংকট
রাজনৈতিক লড়াই চললেও ময়দানের পরিস্থিতি ভয়াবহ। দেশের অর্ধেকেরও কম ভূখণ্ড সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে; বিশেষ করে সীমান্তবর্তী এলাকায় প্রতিরোধ বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বড় এলাকা। সংঘাতে ৩৩ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও বিচারব্যবস্থার মতো মৌলিক পরিষেবা প্রায়ই রাষ্ট্রের বদলে বিরোধী গোষ্ঠীগুলো দিচ্ছে।
বাধা সত্ত্বেও কিছু এলাকায় বিপ্লবী শক্তি অগ্রগতি অর্জন করেছে। ফেডারেল ডেমোক্রেসি চার্টার এবং আর্টিকলস অব ফেডারেল ট্রানজিশনাল অ্যারেঞ্জমেন্ট (এএফটিএ)-এর মতো উদ্যোগ সামরিক বাহিনীর রাজনৈতিক ভূমিকা শেষ করে নতুন, অন্তর্ভুক্তিমূলক ফেডারেল ব্যবস্থা গড়ার সম্মিলিত প্রচেষ্টার প্রতিনিধিত্ব করে। তা-আং ও রাখাইনের মতো অঞ্চলে তৃণমূল পর্যায়ে ফেডারেল ব্যবস্থা শিকড় গাড়ছে। সেখানে স্থানীয় পরিষদ ও জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো কার্যত স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা করেছে।
তবে বিরোধী পক্ষকে বড় ধরনের বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে:
- সামরিক বাহিনীর অগ্রগতি: জান্তা কিছু ভূখণ্ড পুনর্দখল করেছে এবং প্রতিরোধ বাহিনীর শক্ত ঘাঁটিগুলোতে বিমান হামলা ও স্থল অভিযান অব্যাহত রেখেছে।
- মানবিক সংকট: চলমান সংঘাতে অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়েছে, দারিদ্র্যের হার দ্বিগুণ হয়েছে এবং লাখ লাখ মানুষ পর্যাপ্ত খাদ্য, আশ্রয় বা চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত।
- খণ্ডিত কর্তৃত্ব: সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিস্তার এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে পরস্পরবিরোধী ভাবনার কারণে ঐক্যবদ্ধ শাসন ও সমন্বিত সামরিক পদক্ষেপ কঠিন হয়ে পড়েছে।
আন্তর্জাতিক সহায়তা সীমিত এবং পরিস্থিতি আরও অবনতির ঝুঁকি বেশি। বিশেষ করে নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে এবং দুই পক্ষই নিজেদের অবস্থান সুসংহত করতে চাইছে, ততই এই ঝুঁকি বাড়ছে।
ভূরাজনৈতিক সমীকরণ: চীন, রাশিয়া ও পশ্চিমা দেশগুলোর ভূমিকা
বিশ্বশক্তির পরিবর্তনশীল সমীকরণের সঙ্গে মিয়ানমারের সংকট গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। একসময় মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক উত্তরণের জোরালো সমর্থক যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা কমিয়েছে এবং ক্রমেই নিজেদের সম্পৃক্ততা কমিয়ে নিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। আন্তর্জাতিকভাবে নিজেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া রাশিয়া জান্তাকে কৌশলগত অংশীদার হিসেবে গ্রহণ করেছে, অস্ত্র সরবরাহ করছে এবং অবকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগ করছে। সবচেয়ে প্রভাবশালী বাইরের পক্ষ চীন সব পক্ষের সঙ্গেই যোগাযোগ রেখেছে—সুবিধা হলে জান্তাকে সমর্থন করেছে, আবার নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গেও সম্পর্ক রেখেছে।
চীনের দৃষ্টিভঙ্গি আদর্শের বদলে বাস্তব রাজনীতিনির্ভর। সীমান্ত সুরক্ষিত রাখা, বিনিয়োগ রক্ষা করা এবং সংঘাত যেন সীমান্ত ছাড়িয়ে না পড়ে তা নিশ্চিত করাই তাদের প্রধান লক্ষ্য। বেইজিং জান্তা ও বিরোধী গোষ্ঠী—উভয়ের ওপর চাপ দিয়েছে। কখনো যুদ্ধবিরতিতে সহায়তা করেছে, আবার কখনো সামরিক অভিযানের পথও সুগম করেছে। এই বাস্তববাদী অবস্থান চীনের বহুল প্রচারিত হস্তক্ষেপ না করার নীতির সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করে এবং দেশটির পররাষ্ট্রনীতির স্বার্থপর চরিত্র তুলে ধরে।
বিরোধী পক্ষের জন্য ধারাবাহিক আন্তর্জাতিক সমর্থনের অভাব বড় বাধা। এক বিশ্লেষকের ভাষায়:
যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা কমে যাওয়ায় প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলো চীনের মধ্যস্থতা মেনে নিতে বাধ্য হতে পারে, ফলে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের সম্ভাবনা বাড়বে। তবে তাড়াহুড়ো করে হওয়া যুদ্ধবিরতি দীর্ঘস্থায়ী শান্তি বা গণতন্ত্র আনবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
ঝুঁকি হলো, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে ক্লান্ত এবং স্থিতিশীলতা ফেরাতে আগ্রহী আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচনকে অগ্রগতির পদক্ষেপ হিসেবে মেনে নিতে পারে। তাতে কার্যত অভ্যুত্থান ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য জান্তাকে পুরস্কৃত করা হবে।
এরপর কী? সম্ভাব্য পরিস্থিতি ও প্রভাব
২০২৫ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, ততই কয়েকটি পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে:
- শাসকগোষ্ঠীর ক্ষমতা সুসংহত: সবচেয়ে সম্ভাব্য ফল হলো, বিরোধী পক্ষকে বিভক্ত করতে সীমিত ছাড় দিয়ে এবং সহানুভূতিশীল রাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি চেয়ে জান্তা নির্বাচনের মাধ্যমে নিজেদের শাসন পাকাপোক্ত করবে।
- প্রতিরোধ অব্যাহত: বিশেষ করে সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণের বাইরের এলাকাগুলোতে নির্বাচনী প্রক্রিয়া ব্যাহত করার চেষ্টা জোরদার করবে বিরোধী বাহিনী। সহিংসতা ও দমন-পীড়ন বাড়তে পারে, ফলে মানবিক সংকট আরও গভীর হবে।
- আন্তর্জাতিক অস্পষ্ট অবস্থান: পশ্চিমা দেশগুলো প্রকাশ্যে শাসকগোষ্ঠীর সমালোচনা চালিয়ে যেতে পারে, পাশাপাশি নীরবে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথ খুঁজতে পারে—বিশেষত জান্তা নির্বাচনের মাধ্যমে বৈধতার আবরণ তৈরি করতে পারলে।
- আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতা: সম্ভাবনা কম হলেও আরেকটি দৃশ্যপট হলো, বিশেষত চীন ও আসিয়ানের বাইরের চাপ উভয় পক্ষকে আলোচনার টেবিলে বসাতে পারে। এর ফলে যুদ্ধবিরতি ও নতুন রাজনৈতিক কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। তবে এর জন্য বড় ধরনের আপস এবং জাতিগত অসন্তোষ ও রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর ভূমিকার মতো সংঘাতের মূল কারণগুলো সমাধানের সদিচ্ছা প্রয়োজন হবে।
মিয়ানমারের জনগণের জন্য ঝুঁকি এর চেয়ে বেশি হতে পারে না। অবাধ ও সুষ্ঠু বলে ব্যাপকভাবে বিবেচিত ২০২০ সালের নির্বাচনে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে জনগণের স্পষ্ট প্রত্যাখ্যান প্রতিফলিত হয়েছিল। বিপরীতে, আসন্ন ভোটকে অনেকেই সহিংসতা ও প্রতারণার মাধ্যমে সেই সিদ্ধান্ত উল্টে দেওয়ার উদ্দেশ্যে সাজানো প্রহসন হিসেবে দেখছেন।
সারসংক্ষেপ
- নৃশংস অভ্যুত্থান ও বছরের পর বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধের পর নিজেদের শাসনের বৈধতা প্রতিষ্ঠা করতে মিয়ানমারের সামরিক সরকার ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বিতর্কিত নির্বাচন আয়োজনের উদ্যোগ এগিয়ে নিচ্ছে।
- ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্টের নেতৃত্বাধীন নির্বাসিত বিরোধী পক্ষ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির অভাব, অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও সম্পদের সীমাবদ্ধতার কারণে ক্রমেই প্রভাব হারাচ্ছে।
- জান্তার নির্বাচনী কৌশলের ভিত্তি দমন-পীড়ন, আইনি কৌশল ও নিয়ন্ত্রিত অংশগ্রহণ। প্রধান বিরোধী দলগুলো নিষিদ্ধ এবং নতুন নির্বাচনী আইন সামরিক বাহিনীর ঘনিষ্ঠ প্রার্থীদের সুবিধা দিচ্ছে।
- আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া মিশ্র: পশ্চিমা দেশগুলো সমালোচনা করলেও পদক্ষেপ নিতে দ্বিধা করছে। অন্যদিকে চীন, রাশিয়া ও ভারত স্থিতিশীলতা ও শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
- ময়দানে প্রতিরোধ বাহিনী বড় এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে এবং ফেডারেল ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে তাদের সামরিক অভিযান ও ক্রমাবনতিশীল মানবিক সংকটের মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
- ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচনকে বৈধ বলে মেনে নেওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এর ফলে অন্য কর্তৃত্ববাদী শাসনের জন্য বিপজ্জনক নজির তৈরি হবে এবং বৈশ্বিক গণতান্ত্রিক নীতি দুর্বল হবে।
- সংকটের দিকে বিশ্ব তাকিয়ে থাকায় মিয়ানমারের ভবিষ্যৎ এবং গণতন্ত্রে আন্তর্জাতিক সমর্থনের বিশ্বাসযোগ্যতা—দুটিই অনিশ্চয়তার মুখে।






