আর্থিক সংকটে চীনের মেট্রো ব্যবস্থা
চীনের বিভিন্ন শহরের মেট্রো ব্যবস্থা আর্থিক সংকটের মুখে পড়েছে। দেশটির আবাসন খাতের মন্দা আরও গভীর হওয়া এবং যাত্রী চলাচলের ধরন বদলে যাওয়ায়, ক্রমবর্ধমান লোকসান ঠেকাতে ছোট-বড় শহরের অপারেটররা ভাড়া বাড়াচ্ছেন এবং সেবা কমাচ্ছেন। কয়েক দশক ধরে চীনের নগর আধুনিকায়ন ও অর্থনৈতিক গতিশীলতার প্রতীক হয়ে থাকা এই খাতে পদক্ষেপগুলো বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সূচিপত্র
- আর্থিক সংকটে চীনের মেট্রো ব্যবস্থা
- চীনের মেট্রো ব্যবস্থা কেন সংকটে?
- মেট্রো অপারেটররা কীভাবে সাড়া দিচ্ছেন?
- জনসাধারণের প্রতিক্রিয়া ও বৃহত্তর প্রভাব
- চীনের মেট্রো সংকট ও বৈশ্বিক প্রবণতার তুলনা
- যুক্তরাষ্ট্র: সেপটা ও এমটিএর অভিজ্ঞতা
- কানাডা: ট্রান্সলিংকের অর্থায়ন সমাধান
- অন্যান্য আন্তর্জাতিক উদাহরণ
- বৃহত্তর প্রভাব কী?
- ভাড়া থেকে আয়ের সীমাবদ্ধতা
- সরকারি ভর্তুকির ভূমিকা
- উদ্ভাবন ও অভিযোজন
- চীনের মেট্রো ব্যবস্থার সামনে কী?
- সংক্ষেপে
বেইজিং ও সাংহাইয়ের ব্যস্ত মেট্রো লাইন থেকে ফোশানের মতো শহরের নতুন নেটওয়ার্ক—সবখানেই পরিস্থিতি ক্রমে একই রকম: আয় কমছে, ব্যয় বাড়ছে, আর হিসাবের ভারসাম্য ফেরাতে নতুন পথ খোঁজার তৎপরতা চলছে। এসব চ্যালেঞ্জ শুধু চীনের নয়, তবে পরিবর্তনের ব্যাপকতা ও গতি দেশ-বিদেশে দৃষ্টি আকর্ষণ করছে।
চীনের মেট্রো ব্যবস্থা কেন সংকটে?
বর্তমান সংকটের কারণগুলো জটিল, তবে কয়েকটি প্রধান বিষয় স্পষ্ট। ঐতিহ্যগতভাবে চীনের মেট্রো ব্যবস্থা ভাড়া থেকে আয়, সরকারি ভর্তুকি এবং স্টেশনসংলগ্ন জমি উন্নয়ন থেকে প্রাপ্ত আয়ের সমন্বয়ের ওপর নির্ভর করেছে। তথাকথিত এই “ভূমি-অর্থায়ন” মডেলের মাধ্যমে নতুন পরিবহন লাইনের কাছাকাছি আবাসনের মূল্য বেড়ে যাওয়ার সুফল কাজে লাগিয়ে শহরগুলো বড় অবকাঠামো প্রকল্পের অর্থ জোগাড় করতে পেরেছে।
তবে চীনের আবাসন বাজার শীতল হয়ে পড়ায় এই মডেল তীব্র চাপে পড়েছে। সাউথ চায়না আরবান রিসার্চ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হু গাং বলেন, “অতীতে স্টেশনসংলগ্ন জমির মূল্যবৃদ্ধি থেকে উল্লেখযোগ্য আয় হতো। সরকার পরিচালন ব্যয় মেটাতে জমির বাড়তি মূল্য কাজে লাগাত। কিন্তু আবাসন বাজার গভীর সমন্বয়ের মধ্য দিয়ে যাওয়ায় ভূমি-অর্থায়ননির্ভর এই ভর্তুকি মডেল এখন প্রকৃত চাপের মুখে।”
একই সময়ে মেট্রো নেটওয়ার্ক দ্রুত সম্প্রসারিত হলেও যাত্রীর সংখ্যা সেই হারে বাড়েনি। উদাহরণস্বরূপ, ফোশানের মেট্রো ব্যবস্থা ১৫০ কিলোমিটারের বেশি এলাকাজুড়ে বিস্তৃত হলেও প্রতি কিলোমিটারে যাত্রীর সংখ্যা প্রতিবেশী গুয়াংঝু বা শেনঝেনের তুলনায় অনেক কম। ব্যক্তিগত গাড়ি ও বৈদ্যুতিক স্কুটারের ব্যবহার বাড়ায় মেট্রোর যাত্রীভিত্তি আরও সংকুচিত হয়েছে।
ফোশান মেট্রো গ্রুপের ২০২৪ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে স্পষ্ট চিত্র উঠে এসেছে: পরিচালন আয় ৫৮ কোটি ৬০ লাখ ইউয়ান, বিপরীতে ব্যয় ২৬৮ কোটি ৯০ লাখ ইউয়ান; সরকারি ভর্তুকির পরও নিট লোকসান ১৭ কোটি ৮০ লাখ ইউয়ান। আরও অনেক শহরের পরিস্থিতিও একই রকম, যেখানে পরিচালন ব্যয় মেটাতে শুধু ভাড়া থেকে আয় কয়েক গুণ বাড়াতে হবে।
মেট্রো অপারেটররা কীভাবে সাড়া দিচ্ছেন?
এই চ্যালেঞ্জের মুখে মেট্রো অপারেটররা কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছেন। ফোশানে খরচ বাঁচাতে আলো ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কমিয়ে দেওয়ায় যাত্রীদের ম্লান আলোয় স্টেশনে চলাচল করতে হচ্ছে, আর ট্রেনের কামরা থাকছে তুলনামূলক উষ্ণ। এসকেলেটর বন্ধ রাখা হচ্ছে এবং সেবার সময় কমানো হয়েছে; সব লাইন আগের চেয়ে ৩০ মিনিট আগে বন্ধ হচ্ছে। ট্রেন চলাচলের বিরতি স্থায়ীভাবে বাড়ানো হয়েছে, আর্থিক চাপ অব্যাহত থাকলে আরও কাটছাঁটের আশঙ্কা রয়েছে।
ব্যয় কমানোর এসব পদক্ষেপে বছরে ১ কোটি ইউয়ানের বেশি সাশ্রয় হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, তবে এর বিনিময়ে যাত্রীদের আরাম ও সুবিধা কমছে। ফোশান মেট্রো গ্রুপ জানিয়েছে, “ব্যয় কমানো এবং দক্ষতা বাড়ানোর” বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ হিসেবে এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
অন্য শহরগুলোও একই পথে হাঁটছে: ভাড়া বাড়ানো হচ্ছে এবং সেবার ঘনত্ব কমানো হচ্ছে। চীনের অনেক শহরে ভাড়া দূরত্বের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়, যার পরিমাণ ২ থেকে ১২ ইউয়ান। তবে ভাড়া বাড়ানোর পরও অপারেটররা স্বীকার করছেন, ভাড়া থেকে আয় একা কমতে থাকা ভর্তুকি ও আবাসন খাতের আয়ের ঘাটতি পূরণ করতে পারবে না।
জনসাধারণের প্রতিক্রিয়া ও বৃহত্তর প্রভাব
পরিবর্তনগুলো জনসাধারণের নজর এড়ায়নি। মুদ্রাস্ফীতি ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় পরিবারের বাজেটে চাপ বাড়ার মধ্যে সেবা কমানো ও খরচ বাড়ায় যাত্রীরা হতাশা প্রকাশ করেছেন। অনেকের জন্য মেট্রো জীবনরেখার মতো; কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও জরুরি সেবায় যাতায়াতের সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য মাধ্যম এটি।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, ভাড়া বৃদ্ধি ও সেবা হ্রাস “গণপরিবহনের পতনের দুষ্টচক্র” তৈরি করতে পারে। এতে ভাড়া বাড়া ও সেবা কমে যাওয়ায় যাত্রী কমে যায়, আয় আরও কমে এবং আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হয়। অন্যান্য দেশেও এই চক্র দেখা গেছে। প্রাণবন্ত ও সবার নাগালের মধ্যে থাকা গণপরিবহন ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে চীনের শহরগুলোর জন্য এটি বড় উদ্বেগের বিষয়।
চীনের মেট্রো সংকট ও বৈশ্বিক প্রবণতার তুলনা
এ ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে শুধু চীনই নয়। বিশ্বজুড়ে মেট্রো ও গণপরিবহন ব্যবস্থা একই ধরনের সমস্যায় পড়েছে: যাত্রী কমছে, ব্যয় বাড়ছে এবং অর্থায়নের উৎস অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। কোভিড-১৯ মহামারি এসব প্রবণতার অনেকগুলোকে ত্বরান্বিত করেছে; দূর থেকে কাজ করা এবং যাতায়াতের ধরন বদলে যাওয়ায় যাত্রীর সংখ্যা দ্রুত কমে যায়।
যুক্তরাষ্ট্র: সেপটা ও এমটিএর অভিজ্ঞতা
যুক্তরাষ্ট্রে ফিলাডেলফিয়া অঞ্চলে সেবা দেওয়া সাউথইস্টার্ন পেনসিলভানিয়া ট্রান্সপোর্টেশন অথরিটি (সেপটা) ফেডারেল মহামারি-সহায়তার মেয়াদ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বছরে ২৪ কোটি ডলারের ঘাটতির মুখে পড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সেপটা ভাড়া ২১.৫ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে এবং ২০ শতাংশ সেবা কমানোর পরিকল্পনা করেছে। এতে কয়েক ডজন বাস রুট বন্ধ হবে এবং অন্য রুটে চলাচলের ঘনত্ব কমবে। অতিরিক্ত রাজ্য তহবিল নিশ্চিত না হলে আরও কঠোর কাটছাঁটের পরিকল্পনা রয়েছে; এর মধ্যে কয়েকটি আঞ্চলিক রেললাইনে সেবা বন্ধ করা এবং প্রতি রাতে রাত ৯টার পর কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়াও রয়েছে।
সেপটার প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা স্কট সাওয়ার পরিস্থিতিটি স্পষ্ট ভাষায় বর্ণনা করেছেন:
আমরা যে গণপরিবহনের পতনের দুষ্টচক্রের কথা বলে আসছি, এটি তার শুরু।কর্তৃপক্ষের হিসাব, এসব কাটছাঁটে সব সেবা মিলিয়ে প্রতিদিন ৩ লাখ ৫০ হাজার যাত্রা কমে যাবে। এতে ওই অঞ্চলের মানুষের চলাচল, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও জীবনযাত্রার মানে গুরুতর প্রভাব পড়বে।
নিউইয়র্ক সিটির মেট্রোপলিটন ট্রান্সপোর্টেশন অথরিটিও (এমটিএ) আর্থিক অস্থিরতার মুখে পড়েছে। ফেডারেল সহায়তা ও রাজ্য তহবিল আপাতত ভাড়া বৃদ্ধি এবং সেবা হ্রাস ঠেকালেও, সেবার মান বজায় রাখা ও উন্নত করতে নিয়মিত ভাড়া বাড়ানো আবার শুরু হয়েছে। ২০২৩ সালের আগস্টে একবারের সাবওয়ে যাত্রার মূল ভাড়া ২.৭৫ ডলার থেকে বেড়ে ২.৯০ ডলার হয়; সাপ্তাহিক ও মাসিক পাসের ভাড়াও একইভাবে বাড়ানো হয়। যাত্রীর সংখ্যা পুনরুদ্ধার না হলে এবং নতুন অর্থায়নের উৎস না মিললে ঘাটতি দেখা দেবে বলে এমটিএ বারবার সতর্ক করছে।
কানাডা: ট্রান্সলিংকের অর্থায়ন সমাধান
মেট্রো ভ্যাঙ্কুভারে ট্রান্সলিংক ২০২৬ সাল থেকে বছরে ৬০ কোটি ডলারের পরিচালন ঘাটতির মুখে পড়ার কথা ছিল। বড় ধরনের সেবা হ্রাস এড়াতে সংস্থাটি ভাড়া বৃদ্ধি, সম্পত্তি কর বাড়ানো এবং নতুন প্রাদেশিক তহবিলের সমন্বয়ে একটি পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। চুক্তিতে ২০২৬ সালের জুলাইয়ে ভাড়া ৫ শতাংশ বৃদ্ধি, সম্পত্তি কর ০.৫ শতাংশ বাড়ানো এবং তিন বছরে প্রাদেশিক সরকারের কাছ থেকে ৩১ কোটি ২০ লাখ ডলারের পরিচালন আয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। এই প্যাকেজে অন্তত ২০২৭ সাল পর্যন্ত ব্যবস্থা সচল থাকবে এবং কিছু ক্ষেত্রে সেবা সম্প্রসারণ করা যাবে। তবে কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, এটি স্থায়ী সমাধান নয়, সাময়িক ব্যবস্থা।
অ্যাডভোকেসি গ্রুপ মুভমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ডেনিস আগার মন্তব্য করেন:
এটি এমন একটি সাময়িক ব্যবস্থা, যা স্থায়ী সমাধানের পথে কিছুটা এগিয়ে নেয়। আমরা আশা করি, ২০২৬ সালের একটি পরিকল্পনা স্থায়ী অর্থায়নের সমাধান দেবে এবং গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নতি ঘটাবে, যাতে অতিরিক্ত ভিড় এড়ানো যায়।
অন্যান্য আন্তর্জাতিক উদাহরণ
পাকিস্তানে ইসলামাবাদ মেট্রো বাসে ভাড়া ১০০ শতাংশ বাড়ানোর পর জনরোষ দেখা দেয়। প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপের পর দ্রুত তা প্রত্যাহার করা হয়। যাত্রীরা স্বস্তি পেলেও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেন, পর্যাপ্ত আয় ছাড়া মানসম্মত সেবা বজায় রাখা কঠিন হবে। তারা আরও টেকসই সমাধান হিসেবে লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকি ও ধাপে ধাপে ভাড়া বাড়ানোর পরামর্শ দেন।
সৌদি আরবে মক্কা মেট্রো মূলত বার্ষিক হজের সময় চলাচল করে এবং চরম পরিস্থিতিতে লাখো যাত্রী সামলায়। ব্যবস্থাটি ব্যাপক ভর্তুকিনির্ভর এবং বিশেষ সময়ের বিপুল চাহিদা মেটানোর জন্য তৈরি; বিশ্বজুড়ে অর্থায়ন ও পরিচালনার মডেলের বৈচিত্র্যের উদাহরণ এটি।
বৃহত্তর প্রভাব কী?
চীনের মেট্রো ব্যবস্থা এবং বিদেশের সমতুল্য ব্যবস্থাগুলোর আর্থিক সংকট নগর গণপরিবহনের ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, পরিবেশগত টেকসই উন্নয়ন ও সামাজিক ন্যায়বিচারের জন্য গণপরিবহন অত্যন্ত জরুরি বলে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত। কিন্তু প্রচলিত অর্থায়ন মডেলগুলো চাপে রয়েছে, আর দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকার জন্য নতুন পন্থা দরকার।
ভাড়া থেকে আয়ের সীমাবদ্ধতা
ফোশানসহ অন্যান্য শহরের অভিজ্ঞতা দেখায়, আধুনিক মেট্রো ব্যবস্থা পরিচালনার পুরো ব্যয় মেটাতে শুধু ভাড়া থেকে আয় সাধারণত যথেষ্ট হয় না। ভাড়া উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ালেও আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান অনেক থেকে যায়। এ বাস্তবতায় অনেক বিশেষজ্ঞ আয়ের উৎস বহুমুখী করার আহ্বান জানিয়েছেন; এর মধ্যে রয়েছে বাণিজ্যিক উন্নয়ন, বিজ্ঞাপন এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের নতুন মডেল।
শেনঝেন ও চেংদুর মতো শহরে বাণিজ্যিক উন্নয়ন এবং পরিবহনব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বিত প্রকল্প মেট্রোর আয়ের ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ জোগায়, যা ভাড়া থেকে আয়ের ঘাটতি পুষিয়ে নিতে সহায়তা করে। অন্যদিকে ফোশান এখনো আয়ের উৎস বহুমুখী করেনি, ফলে যাত্রীর সংখ্যা ও সরকারি সহায়তার ওঠানামায় শহরটি বেশি ঝুঁকিতে পড়ে।
সরকারি ভর্তুকির ভূমিকা
অধিকাংশ মেট্রো ব্যবস্থার জন্য সরকারি ভর্তুকি এখনো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবলম্বন। তবে অর্থনৈতিক মন্দা ও প্রতিদ্বন্দ্বী অগ্রাধিকারের কারণে সরকারি বাজেটে চাপ বাড়ায় এই ভর্তুকির প্রাপ্যতা ও নির্ভরযোগ্যতা ক্রমেই অনিশ্চিত হচ্ছে। সীমিত সম্পদ কীভাবে বণ্টন করা হবে, তা নিয়ে নীতিনির্ধারকদের কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। গণপরিবহনে বিনিয়োগ অব্যাহত রাখার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরতে হচ্ছে পরিবহন সংস্থাগুলোকে।
উদ্ভাবন ও অভিযোজন
সামনের দিনগুলোতে দক্ষতা বাড়ানো এবং যাত্রী আকৃষ্ট করতে চীনসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানের মেট্রো অপারেটররা নতুন ব্যবসায়িক মডেল ও প্রযুক্তি খতিয়ে দেখছেন। এর মধ্যে রয়েছে:
- নিয়মিত যাত্রীদের জন্য গণপরিবহন আরও সাশ্রয়ী করতে চাহিদাভিত্তিক ভাড়া নির্ধারণ ও ভাড়ার সর্বোচ্চ সীমা
- সাইকেল ভাগাভাগি ও বৈদ্যুতিক স্কুটারের মতো অন্যান্য যাতায়াত মাধ্যমের সঙ্গে সমন্বয়
- অতিরিক্ত আয় অর্জনে স্টেশনসংলগ্ন বাণিজ্যিক উন্নয়ন
- যাত্রীদের অভিজ্ঞতা উন্নত করতে ডিজিটাল টিকিটিং ও রিয়েল-টাইম তথ্যব্যবস্থায় বিনিয়োগ
হু গাং বলেন, “আজকের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে প্রবৃদ্ধির নতুন ক্ষেত্র খুঁজে পেতে মেট্রো ব্যবস্থার জন্য অন্যান্য শহরের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং আয়ের বহুমুখী ব্যবসায়িক মডেল খতিয়ে দেখা জরুরি।”
চীনের মেট্রো ব্যবস্থার সামনে কী?
আগামী বছরগুলো চীনের মেট্রো ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে। লাখো নগরবাসীর জন্য সহজলভ্য ও নির্ভরযোগ্য সেবা দেওয়ার বাধ্যবাধকতার সঙ্গে আর্থিক স্থায়িত্বের ভারসাম্য রাখতে হবে অপারেটরদের। এ জন্য ভাড়ার কাঠামো, সেবার মাত্রা এবং বিনিয়োগের অগ্রাধিকার নিয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
একই সঙ্গে বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও নীতিগত পরিবেশও নির্ধারক ভূমিকা পালন করবে। আবাসন বাজার স্থিতিশীল হলে এবং সরকারি সহায়তা জোরালো থাকলে মেট্রো ব্যবস্থাগুলো বর্তমান সংকট সামলে উঠতে পারে। তা না হলে আরও অনেক শহর ফোশানের পথ অনুসরণ করতে বাধ্য হতে পারে; বাড়তে পারে ভাড়া, কমতে পারে সেবা।
শেষ পর্যন্ত চীনের মেট্রোর ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া, উদ্ভাবন গ্রহণ এবং নগর যাতায়াতে অব্যাহত সরকারি বিনিয়োগের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরার সক্ষমতার ওপর।
সংক্ষেপে
- আবাসন খাতের মন্দা ও যাত্রী কমে যাওয়ায় ক্রমবর্ধমান আর্থিক লোকসানের মুখে চীনের মেট্রো ব্যবস্থাগুলো ভাড়া বাড়াচ্ছে এবং সেবা কমাচ্ছে।
- প্রচলিত “ভূমি-অর্থায়ন” মডেল চাপে রয়েছে, আর শুধু ভাড়া থেকে আয় পরিচালন ব্যয় মেটাতে পারে না।
- ফোশানের মতো শহর সেবার সময় কমানো, কম এসকেলেটর চালু রাখা এবং ভাড়া বাড়ানোসহ কঠোর ব্যয়সংকোচনমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে।
- যুক্তরাষ্ট্র, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশের গণপরিবহন ব্যবস্থাও ঘাটতি, ভাড়া বৃদ্ধি ও সেবা হ্রাসের মতো একই চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।
- বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, ভাড়া বৃদ্ধি ও সেবা হ্রাসে যাত্রী কমে গেলে আয় আরও কমবে এবং “গণপরিবহনের পতনের দুষ্টচক্র” তৈরি হতে পারে।
- নগর গণপরিবহন দীর্ঘমেয়াদে টেকসই রাখতে অর্থায়নের উদ্ভাবনী মডেল, আয়ের বহুমুখী উৎস এবং অব্যাহত সরকারি সহায়তা জরুরি।
- পরিবর্তনশীল অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে খাপ খাইয়ে নেওয়া, উদ্ভাবন এবং স্থিতিশীল অর্থায়ন নিশ্চিত করার সক্ষমতার ওপর চীনের মেট্রো ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে।






