জাপানের সবচেয়ে বয়স্ক জীবিত ব্যক্তি: শিগেকো কাগাওয়ার অসাধারণ জীবনযাত্রা
অসাধারণ দীর্ঘায়ুর জন্য পরিচিত এক দেশে শিগেকো কাগাওয়া সহনশীলতা ও প্রাণশক্তির নতুন প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। ১১৪ বছর বয়সী নারা প্রিফেকচারের এই অবসরপ্রাপ্ত চিকিৎসক সম্প্রতি মিয়োকো হিরোইয়াসুর মৃত্যুর পর আনুষ্ঠানিকভাবে জাপানের সবচেয়ে বয়স্ক জীবিত ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। হিরোইয়াসুর বয়সও ছিল ১১৪ বছর। কাগাওয়ার জীবনকাহিনি শুধু ব্যক্তিগত অধ্যবসায়ের সাক্ষ্য নয়, বরং জাপানের জনমিতিক পরিবর্তন এবং শতবর্ষী মানুষের সংখ্যায় বিশ্বে শীর্ষস্থানে থাকার পেছনের রহস্যেরও প্রতিফলন।
সূচিপত্র
- জাপানের সবচেয়ে বয়স্ক জীবিত ব্যক্তি: শিগেকো কাগাওয়ার অসাধারণ জীবনযাত্রা
- শিগেকো কাগাওয়া কে?
- দীর্ঘায়ুর রহস্য: শিগেকো কাগাওয়া কী বলেন?
- জাপানের সুপারসেন্টেনারিয়ানরা: বিশ্বজুড়ে এক বিস্ময়
- এত জাপানি মানুষ দীর্ঘজীবী হন কেন?
- মিয়োকো হিরোইয়াসু ও অন্যান্য সুপারসেন্টেনারিয়ানের উত্তরাধিকার
- জাপানের বয়স্ক সমাজ: চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা
- জাপান কীভাবে সাড়া দিচ্ছে?
- শিগেকো কাগাওয়ার চিরস্থায়ী অনুপ্রেরণা
- সংক্ষেপে
শিগেকো কাগাওয়া কে?
১৯১১ সালের ২৮ মে নারা প্রিফেকচারে জন্ম নেওয়া শিগেকো কাগাওয়ার জীবন জাপানের এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের নাটকীয় পরিবর্তনের সাক্ষী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে তিনি ওসাকা উইমেন’স মেডিকেল কলেজ (বর্তমানে কানসাই মেডিকেল ইউনিভার্সিটি) থেকে স্নাতক হন, যা সে সময় নারীদের জন্য ছিল বিরল অর্জন। কর্মজীবনের শুরুর দিকে প্রশান্ত মহাসাগরীয় যুদ্ধ চলাকালে তিনি ওসাকার একটি হাসপাতালে কাজ করেন। সেখানে তিনি বিমান হামলার ধ্বংসযজ্ঞ এবং নিজের সম্প্রদায়ের প্রতিরোধক্ষমতা প্রত্যক্ষ করেন। যুদ্ধের পর কাগাওয়া পরিবারের ক্লিনিকের দায়িত্ব নেন এবং প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। কাজের প্রতি তাঁর নিষ্ঠা ছিল সুপরিচিত; রোগীদের ফোনে সাড়া দিতে তিনি প্রায়ই বিছানার পাশে টেলিফোন রাখতেন, যাতে যেকোনো সময় সাড়া দিতে পারেন। ছয় দশকেরও বেশি সময়ের কর্মজীবনের ইতি টেনে ৮৬ বছর বয়সে অবসর নেন কাগাওয়া।
অবসর নেওয়ার পরও কাগাওয়া সক্রিয় ও কর্মচঞ্চল ছিলেন। ১০৯ বছর বয়সে তিনি ইতিহাসের সবচেয়ে বয়স্ক অলিম্পিক মশালবাহকদের একজন হিসেবে শিরোনামে আসেন। টোকিও ২০২১ মশাল রিলে অংশ নেওয়ার সেই মুহূর্তটি দেশ-বিদেশের মানুষের কল্পনায় দাগ কেটেছিল। বর্তমানে তিনি নারা প্রিফেকচারের ইয়ামাতোকোরিয়ামায় পরিবারের সঙ্গে বাড়িতে থাকেন। নিয়মিত রুটিন মেনে চলেন এবং পত্রিকা পড়া, টেলিভিশন দেখা ও ক্যালিগ্রাফি চর্চার মতো সাধারণ আনন্দ উপভোগ করেন।
দীর্ঘায়ুর রহস্য: শিগেকো কাগাওয়া কী বলেন?
জাপানের সুপারসেন্টেনারিয়ানদের দীর্ঘ জীবনের রহস্য প্রায়ই জানতে চাওয়া হয়, আর কাগাওয়াও এর ব্যতিক্রম নন। তবে তাঁর উত্তরগুলো বেশ সহজ-সরল। ২০২৩ সালে টিওএস নিউজ তাঁর রহস্য জানতে চাইলে কাগাওয়া বলেন:
আমার কোনো রহস্য নেই। আমি প্রতিদিন শুধু আনন্দ করি। আমার প্রাণশক্তিই আমার সবচেয়ে বড় সম্পদ। যেখানে যেতে চাই, সেখানে যাই; যা খেতে চাই, তা খাই; আর যা করতে চাই, তা-ই করি। আমি স্বাধীন ও স্বনির্ভর।
তাঁর পরিবারও একই কথা জানায় এবং বলে, তিনি কোনো অসাধারণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলেন না। বরং নিয়মিত রুটিন বজায় রাখেন—নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যান ও ঘুম থেকে ওঠেন, দিনে তিনবার পরিমিত পরিমাণে পুষ্টিকর খাবার খান এবং মানসিক ও শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকেন। ১১৩তম জন্মদিনে কাগাওয়া সহজভাবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন:
সুস্থ থাকতে পেরে আমি কৃতজ্ঞ।
জাপানের সবচেয়ে বয়স্ক ব্যক্তি হওয়ার পর তিনি নগর কর্মকর্তাদের বলেন, চিকিৎসক হিসেবে কর্মজীবনে কঠিন সময়ে অন্যদের সাহায্য করাও তাঁর দীর্ঘায়ুতে অবদান রেখেছে—এটি সেবার প্রতি তাঁর আজীবন অঙ্গীকারেরই প্রতিফলন।
জাপানের সুপারসেন্টেনারিয়ানরা: বিশ্বজুড়ে এক বিস্ময়
কাগাওয়ার গল্প অসাধারণ, তবে তিনি একা নন। জাপানে এক লাখের কাছাকাছি শতবর্ষী মানুষ (যাঁদের বয়স ১০০ বছর বা তার বেশি) রয়েছেন—মাথাপিছু হিসাবে যা বিশ্বে সর্বোচ্চ। ২০২৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রেকর্ড ৩ কোটি ৬০ লাখ মানুষ—জনসংখ্যার ২৯ শতাংশ—৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী ছিলেন। আর ৮০ বছর বা তার বেশি বয়সীদের সংখ্যা এখন মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশ। এই জনমিতিক পরিবর্তন জাতীয় গর্বের বিষয়, একই সঙ্গে বড় সামাজিক চ্যালেঞ্জও।
সুপারসেন্টেনারিয়ানদের বিষয়ে শীর্ষস্থানীয় সংস্থা জেরন্টোলজি রিসার্চ গ্রুপ শত শত জাপানি নাগরিকের দীর্ঘায়ুর দাবির সত্যতা যাচাই করেছে; তাঁদের অধিকাংশই নারী। যাচাই করা তথ্য অনুযায়ী, জাপানের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বয়স পর্যন্ত বেঁচে থাকা ব্যক্তি ছিলেন কানে তানাকা। তিনি ১১৯ বছর ১০৭ দিন বেঁচে ছিলেন, যা ইতিহাসে যাচাইকৃত ব্যক্তিদের মধ্যে তাঁকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বয়সী করে তুলেছে। বিশ্বের সবচেয়ে বয়স্ক পুরুষ জিরোএমন কিমুরাও জাপানের বাসিন্দা ছিলেন। তিনি ১১৬ বছর ৫৪ দিন বেঁচে ছিলেন।
এত জাপানি মানুষ দীর্ঘজীবী হন কেন?
জাপানের দীর্ঘায়ুর পেছনে কয়েকটি কারণের কথা গবেষকেরা উল্লেখ করেন:
- খাদ্যাভ্যাস: ঐতিহ্যবাহী জাপানি খাবারে প্রচুর শাকসবজি, মাছ, ভাত ও গাঁজানো খাবার থাকে; প্রক্রিয়াজাত চিনি ও লাল মাংস থাকে কম।
- স্বাস্থ্যসেবা: সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা এবং প্রতিরোধমূলক চিকিৎসার ওপর জোর দেওয়ায় রোগ দ্রুত শনাক্ত ও চিকিৎসা করা সম্ভব হয়।
- সামাজিক সংহতি: পরিবার ও সম্প্রদায়ের দৃঢ় বন্ধন মানসিক সহায়তা এবং জীবনের উদ্দেশ্যবোধ জোগায়।
- সক্রিয় জীবনযাপন: অনেক বয়স্ক জাপানি জীবনের শেষ বয়স পর্যন্ত শারীরিক ও মানসিকভাবে সক্রিয় থাকেন।
- দৃষ্টিভঙ্গি: কাগাওয়ার জীবনযাপনের ধরনে যেমন দেখা যায়, তেমনি দেশের প্রবীণতম নাগরিকদের মধ্যেও ইতিবাচক মনোভাব ও মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা সাধারণ বৈশিষ্ট্য।
জিনগত বৈশিষ্ট্যেরও ভূমিকা থাকলেও, জাপানের বিস্ময়কর দীর্ঘায়ুর প্রধান কারণ হিসেবে জীবনযাপন ও সামাজিক বিষয়গুলোকে ব্যাপকভাবে বিবেচনা করা হয়।
মিয়োকো হিরোইয়াসু ও অন্যান্য সুপারসেন্টেনারিয়ানের উত্তরাধিকার
কাগাওয়ার আগে জাপানের সবচেয়ে বয়স্ক জীবিত ব্যক্তির খেতাব ছিল মিয়োকো হিরোইয়াসুর। তাঁরও জন্ম ১৯১১ সালে। হিরোইয়াসু টোকিওতে শিল্পকলা অধ্যয়ন করেন, হিরোশিমা প্রিফেকচারে শিক্ষকতা করেন এবং তিন সন্তানকে বড় করেন। জীবনের শেষ বছরগুলো তিনি ওইতা প্রিফেকচারের একটি বৃদ্ধাশ্রমে কাটান। সেখানে তিনি পত্রিকা পড়া, ছবি আঁকা ও তাস খেলতে পছন্দ করতেন। কাগাওয়ার মতো হিরোইয়াসুও জীবনের শেষ বয়স পর্যন্ত সক্রিয় ও কর্মচঞ্চল ছিলেন।
জাপানের সুপারসেন্টেনারিয়ানদের গল্পে প্রায়ই মিল দেখা যায়—এসব জীবন সহনশীলতা, মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা ও গভীর কৃতজ্ঞতাবোধে চিহ্নিত। দেশের প্রবীণতম নাগরিকেরা যুদ্ধ, অর্থনৈতিক উত্থান-পতন ও দ্রুত প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এসেছেন, তবু আশাবাদী থেকেছেন এবং চারপাশের বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।
জাপানের বয়স্ক সমাজ: চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা
জাপানের দ্রুত বয়স্ক হয়ে ওঠা জনসংখ্যা একই সঙ্গে চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা তৈরি করছে। দেশটির মোট জনসংখ্যা কমছে, কিন্তু প্রবীণ নাগরিকদের অনুপাত বাড়ছে। এই জনমিতিক পরিবর্তনের স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতে বড় প্রভাব রয়েছে।
একদিকে, প্রবীণ মানুষের সংখ্যা বাড়ায় সরকারি সম্পদ ও কর্মশক্তির ওপর চাপ পড়ছে। অন্যদিকে, জাপানের প্রবীণদের ক্রমেই মূল্যবান সম্পদ হিসেবে দেখা হচ্ছে—তাঁরা তরুণ প্রজন্মকে প্রজ্ঞা, অভিজ্ঞতা ও অনুপ্রেরণা দিতে পারেন। সক্রিয় বার্ধক্য, প্রজন্মের মধ্যে বিনিময় এবং আজীবন শিক্ষার প্রসারে দেশজুড়ে নানা উদ্যোগ গতি পাচ্ছে।
জাপান কীভাবে সাড়া দিচ্ছে?
বয়স্ক সমাজের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জাপান সরকার ও স্থানীয় সম্প্রদায় বিভিন্ন নীতি বাস্তবায়ন করছে:
- স্বাস্থ্যসেবায় উদ্ভাবন: চিকিৎসা প্রযুক্তি, ঘরে স্বাস্থ্যসেবা এবং প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্য কর্মসূচিতে বিনিয়োগ।
- কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ: প্রবীণদের আরও বেশি সময় কর্মক্ষেত্রে থাকতে উৎসাহিত করা এবং নমনীয় কর্মব্যবস্থায় সহায়তা দেওয়া।
- সম্প্রদায়ে সম্পৃক্ততা: স্বেচ্ছাসেবা, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে প্রবীণদের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা।
- নগর পরিকল্পনা: সহজে চলাচলযোগ্য পরিবহন, আবাসন ও গণপরিসরসহ প্রবীণবান্ধব শহর গড়ে তোলা।
এসব প্রচেষ্টার লক্ষ্য, জাপানের প্রবীণেরা যেন সমাজে অবদান রাখার পাশাপাশি পরিপূর্ণ ও স্বাধীন জীবনযাপন চালিয়ে যেতে পারেন।
শিগেকো কাগাওয়ার চিরস্থায়ী অনুপ্রেরণা
শিগেকো কাগাওয়ার জীবন সুস্থভাবে বার্ধক্যে পৌঁছানোর সম্ভাবনার এক শক্তিশালী স্মারক। তাঁর গল্প শুধু জাপানেই নয়, সারা বিশ্বের মানুষের কাছেও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ সব সমাজই দীর্ঘায়ুর বাস্তবতা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। কাগাওয়ার বার্তা সহজ, কিন্তু গভীর: জীবনকে উপভোগ করুন, সক্রিয় থাকুন এবং নিজের স্বাধীনতাকে মূল্য দিন। পথিকৃৎ চিকিৎসক হিসেবে তাঁর অর্জন এবং দীর্ঘায়ুর প্রতীক হিসেবে তাঁর ভূমিকা সব বয়সের মানুষকে অনুপ্রাণিত করে চলেছে।
জাপানের সবচেয়ে বয়স্ক ব্যক্তি হিসেবে কাগাওয়ার স্বীকৃতি প্রসঙ্গে ইয়ামাতোকোরিয়ামার মেয়র কিয়োশি উয়েদা বলেন:
আমরা আশা করি, তিনি তাঁর হাসি দিয়ে আমাদের অনুপ্রাণিত করে যাবেন।
বার্ধক্যের চ্যালেঞ্জের দিকেই যখন প্রায়ই মনোযোগ দেওয়া হয়, তখন কাগাওয়ার জীবন তুলে ধরে ভিন্ন এক দৃষ্টিভঙ্গি—সম্ভাবনা, সহনশীলতা ও আনন্দের।
সংক্ষেপে
- ১১৪ বছর বয়সী শিগেকো কাগাওয়া এখন জাপানের সবচেয়ে বয়স্ক জীবিত ব্যক্তি। চিকিৎসক হিসেবে দীর্ঘ কর্মজীবন ও সক্রিয় জীবনযাপনের জন্য তিনি স্বীকৃতি পেয়েছেন।
- দীর্ঘায়ু নিয়ে কাগাওয়ার দৃষ্টিভঙ্গি সহজ: নিয়মিত রুটিন মেনে চলা, সক্রিয় থাকা, স্বাধীনতা বজায় রাখা এবং ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করা।
- দীর্ঘায়ুতে জাপান বিশ্বে শীর্ষে; দেশটিতে ৯৫ হাজারের বেশি শতবর্ষী মানুষ রয়েছেন এবং জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশের বয়স ৬৫ বছর বা তার বেশি।
- জনসংখ্যার বার্ধক্যের সঙ্গে সঙ্গে দেশটি নানা চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার মুখোমুখি হচ্ছে, যা স্বাস্থ্যসেবা, নগর পরিকল্পনা ও সামাজিক নীতিতে উদ্ভাবনে গতি দিচ্ছে।
- কাগাওয়ার গল্প অনুপ্রেরণার উৎস; এটি সহনশীলতা, সেবা এবং প্রতিটি বয়সে জীবনকে উপভোগ করার গুরুত্ব তুলে ধরে।






