ইয়ারলুং সাংপো নদীতে চীনের মেগা বাঁধ: প্রকৌশলের বিস্ময়, নাকি আঞ্চলিক উত্তেজনার কেন্দ্র?

পড়তে 8 মিনিট
ইয়ারলুং সাংপো নদীতে চীনের মেগা বাঁধ: প্রকৌশলের বিস্ময়, নাকি আঞ্চলিক উত্তেজনার কেন্দ্র?

তিব্বতে চীনের উচ্চাভিলাষী মেগা বাঁধ: জলবিদ্যুতের নতুন যুগ ও আঞ্চলিক উত্তেজনা

চীন আনুষ্ঠানিকভাবে এমন একটি জলবিদ্যুৎ বাঁধের নির্মাণকাজ শুরু করেছে, যা বিশ্বের বৃহত্তম হতে যাচ্ছে। বাঁধটি তিব্বতের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের দুর্গম ও পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল এলাকায় অবস্থিত। মোতুও জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র বা ইয়ারলুং সাংপো বাঁধ নামে পরিচিত এই প্রকল্পটি শুধু প্রকৌশলের এক বিস্ময় নয়, বরং তা ভূরাজনৈতিক ও পরিবেশগত বিতর্কেরও বড় উৎস। আনুমানিক ১.২ ট্রিলিয়ন ইউয়ান (প্রায় ১৬৭ বিলিয়ন ডলার) ব্যয়ে নির্মিতব্য বাঁধটি চীনের বর্তমান রেকর্ডধারী থ্রি গর্জেস বাঁধের আকার ও সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যাবে এবং সেখানকার উৎপাদনের তিন গুণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সূচিপত্র
  1. তিব্বতে চীনের উচ্চাভিলাষী মেগা বাঁধ: জলবিদ্যুতের নতুন যুগ ও আঞ্চলিক উত্তেজনা
  2. বিশ্বের বৃহত্তম বাঁধ এখানে কেন?
  3. প্রকৌশলের কীর্তি, নাকি পরিবেশ নিয়ে জুয়া?
  4. ভূরাজনৈতিক অভিঘাত: ভারত, বাংলাদেশ ও পানিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের আশঙ্কা
  5. কূটনৈতিক অচলাবস্থা: পানি বণ্টন চুক্তির অনুপস্থিতি
  6. তিব্বতিদের দৃষ্টিতে: বাস্তুচ্যুতি, সাংস্কৃতিক ক্ষতি ও প্রতিরোধ
  7. চীনের কৌশলগত হিসাব: জ্বালানি, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি
  8. বিশ্বের জন্য শিক্ষা: সহযোগিতা ও টেকসই উন্নয়নের প্রয়োজন
  9. সংক্ষেপে

ইয়ারলুং সাংপো নদীটি ভারতে প্রবেশের পর ব্রহ্মপুত্র এবং বাংলাদেশে যমুনা নামে পরিচিত। দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে লাখো মানুষের জীবনধারণের অবলম্বন এই নদী। তাই বাঁধ নির্মাণ নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। দেশ দুটি আশঙ্কা করছে, তাদের পানির নিরাপত্তা, পরিবেশগত ভারসাম্য, এমনকি জাতীয় সার্বভৌমত্বও হুমকির মুখে পড়তে পারে। অন্যদিকে, চীন প্রকল্পটিকে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির উচ্চাভিলাষ এবং তিব্বতের অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবন পরিকল্পনার ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরছে।

বিশ্বের বৃহত্তম বাঁধ এখানে কেন?

তিব্বতে নামচা বারওয়া পর্বত ঘুরে নাটকীয়ভাবে বাঁক নেওয়ার সময় ইয়ারলুং সাংপো নদী বিশ্বের গভীরতম ও দীর্ঘতম গিরিখাতের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এই “গ্রেট বেন্ড” ভৌগোলিক বিস্ময় তো বটেই, জলবিদ্যুৎ উৎপাদনেরও এক অনন্য সুযোগ। ৫০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে নদীটির উচ্চতা প্রায় ২,০০০ মিটার নেমে যাওয়ায় এ সুযোগ তৈরি হয়েছে। এই শক্তিকে কাজে লাগিয়ে নতুন বাঁধটির বার্ষিক উৎপাদনক্ষমতা ৩০০ বিলিয়ন কিলোওয়াট-ঘণ্টা হবে বলে আশা করা হচ্ছে, যা পুরো প্রদেশের বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে এবং চীনের ক্রমবর্ধমান জ্বালানির চাহিদা পূরণে যথেষ্ট।

প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং ও প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংসহ চীনের নেতারা xidiandongsong (পশ্চিমাঞ্চলের বিদ্যুৎ পূর্বাঞ্চলে পাঠানো) নামের বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে প্রকল্পটির পক্ষে কথা বলেছেন। লক্ষ্য হলো তিব্বত ও অন্যান্য পশ্চিমাঞ্চলের জলবিদ্যুতের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে পূর্ব চীনের বিদ্যুৎ-ক্ষুধার্ত শহরগুলোকে জ্বালানি সরবরাহ করা, কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং ২০৬০ সালের মধ্যে কার্বন নিরপেক্ষতা অর্জনের অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সহায়তা করা।

এ লক্ষ্য পূরণে প্রকৌশলীরা ধাপে ধাপে সাজানো পাঁচটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ এবং নামচা বারওয়া পর্বতশ্রেণির ভেতর দিয়ে ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ একাধিক সুড়ঙ্গ খননের পরিকল্পনা করেছেন। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন সর্বোচ্চ করতে নদীর প্রবাহের একটি অংশ অন্য পথে চালিত করা হবে। উৎপাদিত বিদ্যুৎ তিব্বতের বাইরে পাঠানো হবে, তবে স্থানীয় ব্যবহারের জন্যও কিছু বিদ্যুতের ব্যবস্থা থাকবে।

বিজ্ঞাপন

প্রকৌশলের কীর্তি, নাকি পরিবেশ নিয়ে জুয়া?

প্রকল্পটির কারিগরি উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই, তবে পরিবেশগত ঝুঁকিও সমানভাবে বিস্ময়কর। ইয়ারলুং সাংপো গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন জীববৈচিত্র্যের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এখানে ৪,৫০০টিরও বেশি উদ্ভিদ প্রজাতি, এশিয়ার সবচেয়ে উঁচু গাছ এবং তুষার চিতা, বেঙ্গল টাইগার ও তিব্বতি বাদামি ভালুকসহ উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বড় মাংসাশী প্রাণীর বাস। অঞ্চলটি জাতীয় প্রকৃতি সংরক্ষণাগারও; তিব্বতিদের কাছে এর গভীর আধ্যাত্মিক তাৎপর্য রয়েছে, কারণ তাঁরা নদীটিকে পবিত্র মনে করেন।

পরিবেশবাদীদের সতর্কতা, নদীতে বাঁধ দিলে বাস্তুতন্ত্রে অপরিবর্তনীয় পরিবর্তন আসতে পারে, জীববৈচিত্র্যের জন্য বিখ্যাত উপত্যকাগুলো প্লাবিত হতে পারে এবং এ অঞ্চলের উদ্ভিদ ও প্রাণিজগতের সূক্ষ্ম ভারসাম্য বিঘ্নিত হতে পারে। নির্মাণস্থলটি ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় হওয়ায় ভূমিকম্পজনিত বিপর্যয়ের আশঙ্কাও রয়েছে। এতে বাঁধের কাঠামো এবং ভাটির দিকে বসবাসকারী জনগোষ্ঠী, উভয়ই হুমকির মুখে পড়তে পারে।

মেকংয়ের মতো অন্যান্য বড় নদীতে চীনের বাঁধ নির্মাণের অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, উজানের বাঁধ খরা সৃষ্টি করতে পারে, মাছের সংখ্যা কমাতে পারে এবং কৃষি ও বদ্বীপের স্থিতিশীলতার জন্য অত্যাবশ্যক পলিপ্রবাহে বাধা দিতে পারে। ইয়ারলুং সাংপো বাঁধও বিপুল পরিমাণ পলি আটকে রাখতে পারে। এতে বাংলাদেশ ও ভারতের খাদ্যনিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে, বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনে উপকূলীয় ভাঙন বাড়বে এবং জীবিকার জন্য নদীর ওপর নির্ভরশীল লাখো মানুষের জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

বিজ্ঞাপন

ভূরাজনৈতিক অভিঘাত: ভারত, বাংলাদেশ ও পানিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের আশঙ্কা

ইয়ারলুং সাংপো/ব্রহ্মপুত্র নদীটি একাধিক দেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় বাঁধটি আঞ্চলিক উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ভাটির দিকে অবস্থিত ভারত ও বাংলাদেশ প্রকল্পটি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের আশঙ্কা, এর ফলে পানির সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে, কৃষি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং সংঘাতের সময় নদীর পানি কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার করা হতে পারে।

অরুণাচল প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী পেমা খান্ডুসহ ভারতীয় কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, বাঁধটি স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও তাদের জীবিকার জন্য “অস্তিত্বের হুমকি” হয়ে উঠতে পারে। খান্ডু বাঁধটিকে সম্ভাব্য “পানির বোমা” বলেও বর্ণনা করেছেন। সংকটের সময় চীন হঠাৎ পানি ছেড়ে দিলে তা ভয়াবহ বন্যা ঘটাতে পারে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বেইজিংয়ের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বেগ জানিয়ে স্বচ্ছতা, পরামর্শ এবং ভাটির দিকের দেশগুলোর স্বার্থ সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছে।

বাংলাদেশেও নদীটি যমুনা নামে পরিচিত। বাংলাদেশ চীনের কাছে আরও তথ্য চেয়েছে এবং ঘনবসতিপূর্ণ ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার ঝুঁকির কথা তুলে ধরেছে। এ অববাহিকার প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ পানি, কৃষি ও মাছ ধরার জন্য নদীটির ওপর নির্ভরশীল।

এসব উদ্বেগ সত্ত্বেও চীনের দাবি, প্রকল্পটির বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন হয়েছে এবং এটি ভাটির দিকের দেশগুলোর পরিবেশ বা পানির অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত করবে না। চীনা কর্মকর্তারা বলছেন, বাঁধটি বরং মৌসুমি বন্যা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করবে এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানি সরবরাহ করবে। তাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

কূটনৈতিক অচলাবস্থা: পানি বণ্টন চুক্তির অনুপস্থিতি

ইয়ারলুং সাংপো বাঁধ প্রকল্পের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকগুলোর একটি হলো, চীন, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বাধ্যতামূলক কোনো পানি বণ্টন চুক্তি নেই। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে চুক্তির আওতায় পরিচালিত সিন্ধু নদ কিংবা ১৪টি দেশের কনভেনশনে পরিচালিত ইউরোপের দানিয়ুব নদীর বিপরীতে, ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় সহযোগিতা বা বিরোধ নিষ্পত্তির কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেই।

২০০০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে চীন ভারত ও বাংলাদেশকে পানিসম্পর্কিত তথ্য দিয়ে আসছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, বিরোধ ঠেকাতে বা একতরফা বাঁধ নির্মাণের ঝুঁকি সামাল দিতে এসব ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। কোনো চুক্তি না থাকায় ভাটির দিকের দেশগুলো উজানের সিদ্ধান্তের কাছে অসহায় হয়ে পড়ে, যা অবিশ্বাস এবং উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তোলে।

এর জবাবে ভারত অরুণাচল প্রদেশে ব্রহ্মপুত্রের স্থানীয় নাম সিয়াং নদীর ওপর বিশাল বাঁধ নির্মাণের নিজস্ব পরিকল্পনা আবার সক্রিয় করছে। চীনের বাঁধ থেকে হঠাৎ পানি ছেড়ে দেওয়ার ঘটনা মোকাবিলায় সুরক্ষাব্যবস্থা হিসেবে এ প্রকল্প নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, ভারতের প্রকল্পেও একই ধরনের পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব পড়তে পারে, গ্রাম ডুবে যেতে পারে এবং স্থানীয়দের বিরোধিতা দেখা দিতে পারে।

বিজ্ঞাপন

তিব্বতিদের দৃষ্টিতে: বাস্তুচ্যুতি, সাংস্কৃতিক ক্ষতি ও প্রতিরোধ

তিব্বতিদের কাছে এই বাঁধ সম্পদ আহরণ ও প্রান্তিকীকরণের দীর্ঘ ইতিহাসে আরেকটি অধ্যায়। ইয়ারলুং সাংপো শুধু একটি নদী নয়; এটি পবিত্র সত্তা, যার মধ্যে দেবী দর্জে ফাগমোর উপস্থিতি রয়েছে বলে বিশ্বাস করা হয়। অঞ্চলটির উপত্যকা ও পাহাড়জুড়ে আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বসম্পন্ন বহু স্থান রয়েছে। বাঁধ ও এর জলাধারের কারণে এসব স্থানের অনেকগুলো ডুবে যেতে পারে বা সেখানে যাওয়া অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে।

বাঁধ, খনি কার্যক্রম ও অবকাঠামো প্রকল্পের জন্য হাজারো তিব্বতিকে ইতিমধ্যে জোরপূর্বক স্থানান্তর করা হয়েছে। ঐতিহ্যবাহী চারণভূমি প্লাবিত হয়েছে বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে জীবিকা হারিয়েছে মানুষ এবং সাংস্কৃতিক অবক্ষয় আরও ত্বরান্বিত হয়েছে। তিব্বতি নির্বাসিত গোষ্ঠী ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাঁধ নির্মাণের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের জবাবে গ্রেপ্তার ও সহিংসতাসহ কঠোর দমন-পীড়ন চালানো হয়েছে।

তিব্বত রিভিউয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “ক্রমবর্ধমান পরিবেশগত ক্ষতি শুধু তিব্বতের উচ্চভূমির জীববৈচিত্র্যকেই হুমকিতে ফেলছে না, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর জীবনধারণের অবলম্বন নদীব্যবস্থাগুলোর স্বাস্থ্যকেও বিপন্ন করছে।” অধিকারকর্মীদের বক্তব্য, তিব্বতের সম্পদ উন্নয়নের তাড়াহুড়োয় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর ও অধিকার উপেক্ষা করা হচ্ছে।

চীনের কৌশলগত হিসাব: জ্বালানি, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি

বেইজিংয়ের দৃষ্টিতে, ইয়ারলুং সাংপো বাঁধ একাধিক ক্ষেত্রে কৌশলগত সম্পদ। এটি পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে চীনের উত্তরণে সহায়তা করবে, পূর্বাঞ্চলের শহরগুলোর ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাবে এবং দেশটির দরিদ্রতম অঞ্চলগুলোর একটি তিব্বতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি বাড়াবে। ভারত–চীন ভূখণ্ডগত বিরোধের মধ্যে অশান্ত সীমান্ত এলাকায় নিয়ন্ত্রণ সুসংহত করা এবং চীনের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার উপায় হিসেবেও প্রকল্পটিকে দেখা হচ্ছে।

উপপ্রধানমন্ত্রী ঝাং গুওছিং রাষ্ট্রায়ত্ত চায়না ইয়াজিয়াং গ্রুপ গঠনকে “জাতীয় ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য কৌশলগত সিদ্ধান্ত” হিসেবে বর্ণনা করেছেন। বাঁধটি ২০৩৩ সালের মধ্যে বাণিজ্যিকভাবে চালু হওয়ার কথা। উৎপাদিত বিদ্যুতের বেশির ভাগই চীনের বৃহত্তর উন্নয়ন লক্ষ্য পূরণে তিব্বতের বাইরে পাঠানো হবে।

তবে প্রকল্পটির বিশাল ব্যাপ্তি ও অবস্থান প্রকৌশলগত বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। দুর্গম নির্মাণস্থলে সরঞ্জাম পৌঁছানো, নামচা বারওয়া পর্বতশ্রেণির ভেতর দিয়ে সুড়ঙ্গ খনন এবং নদীর শক্তিশালী স্রোত সামলাতে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও বিপুল বিনিয়োগ দরকার। ব্যয় বেড়ে যাওয়া, বিলম্ব এবং অপ্রত্যাশিত পরিবেশগত প্রভাবের ঝুঁকিও যথেষ্ট বেশি।

বিজ্ঞাপন

বিশ্বের জন্য শিক্ষা: সহযোগিতা ও টেকসই উন্নয়নের প্রয়োজন

ইয়ারলুং সাংপো বাঁধ এশিয়া ও বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে একাধিক দেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নদী ব্যবস্থাপনার বৃহত্তর চ্যালেঞ্জের প্রতিচ্ছবি। জলবায়ু পরিবর্তনে হিমবাহ গলার গতি বাড়ছে এবং বৃষ্টিপাতের ধরন পাল্টে যাচ্ছে; ফলে পানির নিরাপত্তা, খাদ্য উৎপাদন ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা আরও ঝুঁকির মুখে পড়ছে। ১০টি দেশের ১৩০ কোটিরও বেশি মানুষ তিব্বত মালভূমি থেকে উৎসারিত নদীগুলোর ওপর নির্ভরশীল। টেকসই উন্নয়নের জন্য তাই সহযোগিতা অপরিহার্য।

বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবাদীরা ইউরোপের দানিয়ুব কনভেনশনের মতো চীন, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় পানি বণ্টন চুক্তির আহ্বান জানিয়েছেন। এমন চুক্তি পানিতে ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে, বাস্তুতন্ত্র রক্ষা করতে এবং সংঘাত ঠেকাতে সহায়তা করতে পারে। তবে গভীর অবিশ্বাস, পরস্পরবিরোধী জাতীয় স্বার্থ এবং অভিন্ন আইনি কাঠামোর অনুপস্থিতির কারণে অগ্রগতি কঠিন।

চীন যখন মেগা বাঁধ নির্মাণে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন বিশ্ব দেখবে প্রকল্পটি প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রতীকে পরিণত হয়, নাকি পরিবেশগত অবক্ষয় ও ভূরাজনৈতিক সংঘাতের কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

সংক্ষেপে

  • তিব্বতে ইয়ারলুং সাংপো নদীর ওপর বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ বাঁধ নির্মাণ শুরু করেছে চীন। প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয় ১৬৭ বিলিয়ন ডলার।
  • বাঁধটি থ্রি গর্জেস বাঁধের তিন গুণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে চীনের লক্ষ্য পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
  • ভাটির দিকে অবস্থিত ভারত ও বাংলাদেশ পানির নিরাপত্তা, পরিবেশগত ভারসাম্য ও জীবিকা নিয়ে উদ্বিগ্ন; তারা পানিকে সম্ভাব্য “অস্ত্র” হিসেবে ব্যবহারের আশঙ্কাও জানিয়েছে।
  • জীববৈচিত্র্য ও পলিপ্রবাহের ঝুঁকি এবং ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় বাঁধ নির্মাণের বিপদ তুলে ধরেছেন পরিবেশবাদীরা।
  • তিব্বতিরা বাস্তুচ্যুতি, সাংস্কৃতিক ক্ষতি ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের মুখে পড়ছেন; প্রকল্পের উন্নয়ন নিয়ে তাঁদের মতামত দেওয়ার সুযোগ সামান্য।
  • চীন, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বাধ্যতামূলক পানি বণ্টন চুক্তি নেই, ফলে সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ছে।
  • আঞ্চলিক সহযোগিতা ও টেকসই নদী ব্যবস্থাপনার দাবি জোরালো হচ্ছে, তবে গভীর অবিশ্বাস রয়ে গেছে।
এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন

আপনার পছন্দ হতে পারে