ভারতের চেনাব সেতু: কাশ্মীরের প্রাণকেন্দ্রে রেকর্ড গড়া এক কীর্তি
২০২৫ সালের ৬ জুন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পার্বত্য কাশ্মীর অঞ্চলে বিশ্বের সর্বোচ্চ রেলসেতু চেনাব রেলসেতুর উদ্বোধন করেন। চেনাব নদীর ৩৫৯ মিটার (১,১৭৮ ফুট) ওপরে মাথা তুলে দাঁড়ানো এই সেতু আইফেল টাওয়ারের চেয়ে ৩৫ মিটার উঁচু। প্রকৌশলের এই বিস্ময় শুধু একটি সেতু নয়। এটি জাতীয় উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতীক, আঞ্চলিক সংহতির হাতিয়ার এবং দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতির এক উত্তেজনাকর বিষয়। সেতুটির উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে উধমপুর-শ্রীনগর-বারামুলা রেল সংযোগ (ইউএসবিআরএল) প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে। এর ফলে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ট্রেনে কাশ্মীর উপত্যকা ভারতের বাকি অংশের সঙ্গে যুক্ত হলো।
সূচিপত্র
- ভারতের চেনাব সেতু: কাশ্মীরের প্রাণকেন্দ্রে রেকর্ড গড়া এক কীর্তি
- চেনাব সেতু কেন গুরুত্বপূর্ণ
- অসম্ভবকে বাস্তবে রূপ: যেভাবে নির্মিত হলো চেনাব সেতু
- ইউএসবিআরএল: কাশ্মীরকে ভারতীয় রেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করা
- বন্দে ভারত ট্রেন ও সব আবহাওয়ায় যোগাযোগ
- অর্থনৈতিক, সামাজিক ও কৌশলগত প্রভাব
- রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক দিক: শুধু একটি সেতুর চেয়েও বেশি কিছু
- পরিবেশ ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
- অঞ্চলটির মানুষের কথা: আশা, গর্ব ও সংশয়
- সংক্ষেপে
চেনাব সেতু কেন গুরুত্বপূর্ণ
চেনাব সেতু শুধু রেকর্ড গড়েনি; এটি অঞ্চলটির জন্য এক রূপান্তরমূলক প্রকল্প। কয়েক দশক ধরে কাশ্মীরের পার্বত্য ভূপ্রকৃতি ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা অঞ্চলটিকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল; যাতায়াতের ভরসা ছিল বিপজ্জনক পাহাড়ি সড়ক অথবা ব্যয়বহুল বিমানযাত্রা। ৩৬টি সুড়ঙ্গ ও ৯৪৩টি সেতু পেরিয়ে ২৭২ কিলোমিটার বিস্তৃত নতুন রেলপথটি এখন সব আবহাওয়ায় যোগাযোগ নিশ্চিত করছে। এতে পর্যটন, বাণিজ্য ও সামাজিক সংহতি বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদি বলেন:
চেনাব রেলসেতুর ওপর উঁচুতে উড়ছে ত্রিবর্ণ পতাকা! সেতুটি যে উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও বাস্তবায়নের মধ্যে অনায়াসে মেলবন্ধন ঘটিয়েছে, তা গভীর গর্বের অনুভূতি জাগায়। সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং ভূখণ্ডেও ভবিষ্যতমুখী অবকাঠামো নির্মাণে ভারতের ক্রমবর্ধমান সক্ষমতার প্রতিফলন এটি। আজ মেগা অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর উদ্বোধন জম্মু ও কাশ্মীরের উন্নয়নযাত্রায় এক সন্ধিক্ষণ।
তাঁর কথায় প্রতিফলিত হয়েছে অবকাঠামোর মাধ্যমে অঞ্চলটিকে ভৌত ও আবেগগত—দুই দিক থেকেই ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করার সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি।
অসম্ভবকে বাস্তবে রূপ: যেভাবে নির্মিত হলো চেনাব সেতু
চেনাব সেতু জম্মু ও কাশ্মীরের রিয়াসি জেলায় একটি গভীর গিরিখাতের ওপর ১,৩১৫ মিটার (৪,৩১৪ ফুট) বিস্তৃত একক-খিলানবিশিষ্ট ইস্পাতের কাঠামো। এর প্রধান ডেক নদীর তলদেশ থেকে ৩৫৯ মিটার উঁচুতে অবস্থিত। ফলে এটি বিশ্বের সর্বোচ্চ রেলসেতু এবং সর্বোচ্চ খিলানসেতু। ডব্লিউএসপি ফিনল্যান্ড সেতুটির নকশা করেছে। কনকন রেলওয়ে করপোরেশনের তত্ত্বাবধানে এর নির্মাণকাজ হয়েছে; দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে এতে হাজারো প্রকৌশলী, ভূতত্ত্ববিদ ও শ্রমিকের অবদান রয়েছে।
হিমালয়ে নির্মাণকাজে ছিল নানা অনন্য চ্যালেঞ্জ:
- ভূমিকম্পের ঝুঁকি: অঞ্চলটিতে ভূমিকম্পের প্রবণতা রয়েছে। সেতুটি ৮ মাত্রা পর্যন্ত ভূমিকম্প এবং ঘণ্টায় ২৬৬ কিলোমিটার (১৬৫ মাইল) পর্যন্ত বাতাসের গতি সহ্য করার উপযোগী করে নির্মাণ করা হয়েছে।
- কঠিন ভূখণ্ড: চেনাব গিরিখাতের শিলা ফাটলযুক্ত, ভূকম্পনপ্রবণতা বেশি এবং আবহাওয়া অনিশ্চিত। নির্মাণসামগ্রী পরিবহন ও যথাস্থানে বসাতে বিশেষায়িত কেবল ক্রেন এবং পাহাড়ের ঢালে সংযোজনের প্রয়োজন হয়েছে।
- বিস্ফোরণ-প্রতিরোধী উপকরণ: সংঘাতপ্রবণ অঞ্চলের নিরাপত্তা উদ্বেগ বিবেচনায় সেতুটিতে বিস্ফোরণ-প্রতিরোধী ইস্পাত ও স্ব-সংকোচনশীল কংক্রিট ব্যবহার করা হয়েছে।
- দীর্ঘস্থায়িত্ব: উন্নত নির্মাণ সফটওয়্যারের সহায়তায় নির্ভুলতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে সেতুটিকে অন্তত ১২০ বছর স্থায়ী হওয়ার উপযোগী করে নকশা করা হয়েছে।
প্রকল্পটির ভূপ্রযুক্তি পরামর্শক ড. জি মাধবী লাথা এই অর্জনের পেছনে সম্মিলিত প্রচেষ্টার কথা তুলে ধরেন:
পরিকল্পনা, নকশা ও নির্মাণের সব কৃতিত্ব ভারতীয় রেলওয়ে ও এএফকনসের। কঠিন ভূখণ্ডে ঢাল স্থিতিশীল রাখা ও ভিত্তির নকশা তৈরির বিশেষায়িত কাজে আমার অবদান ছিল—এটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ, তবে সুনির্দিষ্টভাবে সীমাবদ্ধ একটি দায়িত্ব। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে কয়েক বছর ধরে শত শত প্রকৌশলী, শ্রমিক ও পরিকল্পনাবিদকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হয়েছে।
নির্মাণকাজের উল্লেখযোগ্য ধাপগুলোর মধ্যে রয়েছে ২০১৩ সালে কেবল ক্রেন চালু করা, ২০১৭ সালে ধাপে ধাপে সেতুর কাঠামো এগিয়ে নেওয়া, ২০২১ সালের এপ্রিলে খিলান যুক্ত করা এবং ২০২২ সালের আগস্টে চূড়ান্ত ‘গোল্ডেন জয়েন্ট’ অনুষ্ঠান। সেতুটি আনুষ্ঠানিকভাবে চীনের নাজিয়েহে রেলসেতুকে ছাড়িয়ে বিশ্বের সর্বোচ্চ সেতু হয়েছে।
ইউএসবিআরএল: কাশ্মীরকে ভারতীয় রেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করা
চেনাব সেতু ইউএসবিআরএল প্রকল্পের মুকুটমণি। ২৭২ কিলোমিটার দীর্ঘ রেলপথটি উধমপুর (জম্মু অঞ্চল) থেকে শুরু হয়ে শ্রীনগর (কাশ্মীরের প্রধান শহর) পেরিয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে নিয়ন্ত্রণরেখার কাছে বারামুলায় গিয়ে শেষ হয়েছে। প্রকল্পটির ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪৩,৭৮০ কোটি রুপি (প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার)। এতে রয়েছে:
- মোট ১১৯ কিলোমিটার দীর্ঘ ৩৬টি সুড়ঙ্গ; এর মধ্যে রয়েছে ভারতের দীর্ঘতম পরিবহন সুড়ঙ্গ (টি৫০, ১২.৭৭ কিলোমিটার)
- ৯৪৩টি সেতু; এর মধ্যে রয়েছে চেনাব সেতু ও অঞ্জি খাদ সেতু (ভারতের প্রথম কেবল-স্টেইড রেলসেতু)
- জ্বালানি-সাশ্রয়ী ও টেকসই রেল পরিবহনের জন্য বিদ্যুতায়িত রেলপথ
- বিশেষভাবে উপযোগী করে তৈরি বন্দে ভারত এক্সপ্রেস ট্রেন, যা মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাতেও চলতে সক্ষম
অঞ্চলটির জটিল ভূতত্ত্ব, কঠোর শীত ও নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে ইউএসবিআরএল প্রকল্পে বারবার বিলম্ব হয়েছে। চেনাব সেতুর প্রধান খিলান ২০২১ সালের এপ্রিলে সম্পন্ন হলেও পুরো রেলপথটি চালু হয়েছে ২০২৫ সালে।
বন্দে ভারত ট্রেন ও সব আবহাওয়ায় যোগাযোগ
উদ্বোধনের পর জম্মুর কাটরা ও কাশ্মীরের শ্রীনগরের মধ্যে এখন দুটি বন্দে ভারত এক্সপ্রেস ট্রেন চলাচল করছে। এতে যাত্রার সময় কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় তিন ঘণ্টা। ট্রেনগুলোতে রয়েছে হিটারযুক্ত উইন্ডশিল্ড, তাপরোধী টয়লেট এবং তুষার সরানোর জন্য বিশেষ ট্রেন। ফলে হিমালয়ের কঠোরতম শীতেও সারা বছর ট্রেন চলাচল নিশ্চিত হবে।
অর্থনৈতিক, সামাজিক ও কৌশলগত প্রভাব
ইউএসবিআরএল ও চেনাব সেতুর নির্মাণ সম্পন্ন হওয়ায় অঞ্চলটিতে সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে বলে আশা করা হচ্ছে:
- পর্যটন: প্রায়ই “পৃথিবীর স্বর্গ” নামে পরিচিত কাশ্মীর তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত, তবে সেখানে পৌঁছানো কঠিন ছিল। নতুন রেলপথে ধর্মীয় ও অ্যাডভেঞ্চার পর্যটন বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। বৈষ্ণোদেবী, গুলমার্গ ও পাহেলগামের মতো গন্তব্যে তীর্থযাত্রী ও পর্যটকদের যাতায়াত সহজ হবে।
- বাণিজ্য ও কৃষি: আপেল, শুকনো ফল, পশমিনা শাল ও হস্তশিল্পের মতো পণ্য পরিবহন সহজ হবে। এতে খরচ কমবে এবং ভারতের বিভিন্ন বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়বে।
- কর্মসংস্থান: নির্মাণকাজ এবং রেলপথের চলমান পরিচালনা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে হাজারো কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
- সামরিক চলাচল: বিশ্বের অন্যতম সামরিকায়িত অঞ্চলে সেনা ও সরঞ্জাম পরিবহন আরও সহজ হবে, যা ভারতের জন্য কৌশলগত সুবিধা।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পরিবহন দ্রুত ও সাশ্রয়ী করে এই রেলপথ স্থানীয় অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে। পাশাপাশি, অঞ্চলটিকে দেশের বাকি অংশের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করবে।
রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক দিক: শুধু একটি সেতুর চেয়েও বেশি কিছু
কাশ্মীরে উত্তেজনা বেড়ে যাওয়ার সময়ে চেনাব সেতুর উদ্বোধন হলো। উদ্বোধনের কয়েক সপ্তাহ আগে পাহেলগামে এক প্রাণঘাতী হামলায় ২৬ জন পর্যটক নিহত হন। এর জেরে ১৯৯৯ সালের পর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ সামরিক অচলাবস্থা তৈরি হয়। জঙ্গিদের সহায়তা দেওয়ার জন্য ভারত পাকিস্তানকে দায়ী করে। এরপর ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও গোলাবারুদের সংক্ষিপ্ত কিন্তু তীব্র পাল্টাপাল্টি হামলা হয়। ১০ মে যুদ্ধবিরতিতে সম্মতি জানানো হলেও অঞ্চলটি এখনো অস্থিতিশীল।
প্রধানমন্ত্রী মোদির সরকারের কাছে সেতুটি কাশ্মীরকে ভৌত ও রাজনৈতিক—দুই দিক থেকেই জাতীয় মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করার ভারতের সংকল্পের প্রতীক। ২০১৯ সালে নয়াদিল্লি অঞ্চলটির বিশেষ সাংবিধানিক মর্যাদা (৩৭০ অনুচ্ছেদ) বাতিল করার পর থেকে সরকার অবকাঠামো খাতে কয়েক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। এর লক্ষ্য স্থিতিশীলতা বাড়ানো, দুর্নীতি কমানো এবং অর্থনীতিকে চাঙা করা।
তবে প্রকল্পটি বিতর্কমুক্ত নয়। সমালোচকদের যুক্তি, রেলপথটি মূলত ভারতের স্বার্থে কাজ করছে: এর মাধ্যমে সেনা ও হিন্দু তীর্থযাত্রীদের চলাচল সহজ হবে, অথচ স্থানীয় কৃষকেরা উচ্ছেদ হবেন এবং অঞ্চলটির জনমিতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো বদলে যাবে। মিডল ইস্ট আই উল্লেখ করেছে, অবকাঠামো ব্যবহার করে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ঔপনিবেশিক কৌশলের প্রতিফলন রয়েছে এই প্রকল্পে। কাশ্মীরিদের যাতায়াতও এখনো সীমাবদ্ধ; নিয়মিত নিরাপত্তা তল্লাশি ও ইন্টারনেট বন্ধের ঘটনা ঘটছে।
“প্রকৌশলগত বিস্ময় হলেও এই রেলপথ অঞ্চলটির ওপর ভারতের অস্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণের প্রতীক। সমালোচকদের যুক্তি, এটি উন্নয়নের চেয়ে দখলদারির সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত।” — মিডল ইস্ট আই
তবে সমর্থকেরা সেতুটিকে ঐক্যের শক্তি হিসেবে দেখেন। আর্মেনপ্রেস-এর ভাষায়, চেনাব সেতু “ঐক্য, সহনশীলতা এবং অসম্ভবকে জয় করার ভারতের অদম্য মানসিকতার প্রতীক”।
পরিবেশ ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
ভঙ্গুর হিমালয় বাস্তুতন্ত্রে এত বড় নির্মাণকাজ পরিবেশবাদীদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। চেনাব সেতু ও উত্তরাখণ্ডের চারধাম মহাসড়কের মতো বড় অবকাঠামো প্রকল্পের বিরুদ্ধে ঢাল অস্থিতিশীল করা, ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ানো এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ত্বরান্বিত করার অভিযোগ রয়েছে। উত্তরাখণ্ডে সুড়ঙ্গ ধসে পড়া এবং মিজোরাম ও বিহারে সেতু ধসের মতো সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোও নির্মাণের মান ও নিরাপত্তার মানদণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
ভারতীয় রেলওয়ে ও প্রকল্পের প্রকৌশলীরা বলছেন, চেনাব সেতু ও ইউএসবিআরএল সর্বোচ্চ নিরাপত্তা মান মেনে নির্মিত হয়েছে। এতে উন্নত নজরদারি ব্যবস্থা এবং অঞ্চলটির চরম পরিস্থিতি সহ্য করার উপযোগী উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছে। সেতুটির ১২০ বছরের নকশাগত আয়ুষ্কাল এবং ভূমিকম্প ও প্রবল বাতাস সহ্য করার সক্ষমতা এই অঙ্গীকারেরই প্রমাণ।
অঞ্চলটির মানুষের কথা: আশা, গর্ব ও সংশয়
চেনাব সেতুর উদ্বোধন কাশ্মীরি ও ভারতীয়দের মধ্যে গর্ব, আশা ও সংশয়ের মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। অনেকের কাছে সেতুটি জাতীয় গর্বের উৎস এবং মানুষের উদ্ভাবনী ক্ষমতার প্রমাণ। অন্যদের কাছে এটি অঞ্চলটির বিতর্কিত অবস্থান এবং স্বায়ত্তশাসন ও পরিচয়ের জন্য চলমান সংগ্রামের স্মারক।
প্রকল্পে অবদান রাখা স্থানীয় প্রকৌশলী ও শ্রমিকদের কাছে এটি স্বপ্নপূরণ। সর্বভারতীয় কারিগরি শিক্ষা পরিষদের (এআইসিটিই) চেয়ারম্যান টি জি সিথারাম সেতুটিকে বর্ণনা করেছেন “বিজ্ঞান, ঘাম ও প্রাণের ১৫ বছরের যাত্রা” হিসেবে।
সাধারণ কাশ্মীরিদের জন্য রেলপথটি সহজ যাতায়াত, পণ্য ও সেবায় উন্নত প্রবেশাধিকার এবং নতুন অর্থনৈতিক সুযোগের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। তবে বাস্তুচ্যুতি, পরিবেশগত প্রভাব এবং বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে।
সংক্ষেপে
- ২০২৫ সালের ৬ জুন উদ্বোধন করা চেনাব রেলসেতু বিশ্বের সর্বোচ্চ রেলসেতু। কাশ্মীরে চেনাব নদীর ৩৫৯ মিটার ওপরে এটি দাঁড়িয়ে আছে।
- সেতুটি ইউএসবিআরএল প্রকল্পের মূল অংশ। ২৭২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেলপথ প্রথমবারের মতো ট্রেনে কাশ্মীরকে ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
- দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে নির্মিত সেতুটি প্রকৌশলের এক বিস্ময়। ভূমিকম্প, প্রবল বাতাস ও হিমালয়ের কঠোর পরিস্থিতি সহ্য করার উপযোগী করে এটি নকশা করা হয়েছে।
- রেলপথটি পর্যটন, বাণিজ্য ও সামরিক চলাচল বাড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে; পাশাপাশি পরিবেশগত প্রভাব ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে।
- প্রকল্পটি জাতীয় ঐক্যের প্রতীক এবং কাশ্মীরকে ঘিরে চলমান সংঘাতের উত্তেজনাকর বিষয়—এ অঞ্চলে প্রকৌশল, রাজনীতি ও পরিচয়ের জটিল আন্তঃসম্পর্কের প্রতিফলন।
- ভারতের প্রকৌশল ও উচ্চাকাঙ্ক্ষার বিজয় হিসেবে উদ্যাপিত হলেও, সেতুটির উত্তরাধিকার নির্ভর করবে এটি কাশ্মীরের মানুষের জীবন ও আকাঙ্ক্ষাকে কীভাবে প্রভাবিত করে তার ওপর।






