২০২৫ সালে মালয়েশিয়ার ডিজিটাল ব্যাংক: আমানতে দ্রুত প্রবৃদ্ধি, নানা চ্যালেঞ্জ এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তির পথে যাত্রা

পড়তে 10 মিনিট
Malaysia setzt auf Wachstum der digitalen Wirtschaft

মালয়েশিয়ার ডিজিটাল ব্যাংকিং বিপ্লব: ২০২৫ সালে পরিস্থিতি কোথায়?

ডিজিটাল ব্যাংকগুলো জায়গা করে নেওয়ায় মালয়েশিয়ার আর্থিক খাতে বড় ধরনের রূপান্তর ঘটছে। এর ফলে লাখো মানুষের অর্থপ্রাপ্তি, সঞ্চয় ও ঋণ নেওয়ার পদ্ধতি বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ২০২২ সালে ব্যাংক নেগারা মালয়েশিয়া (বিএনএম) পাঁচটি ডিজিটাল ব্যাংককে লাইসেন্স দেওয়ার পর এ খাতে দ্রুত অগ্রগতি হয়েছে। এর মধ্যে তিনটি ব্যাংক—জিএক্সব্যাংক, বুস্ট ব্যাংক ও এইওন ব্যাংক—এখন পুরোপুরি কার্যক্রম চালাচ্ছে। অন্য দুটি, রাইট ব্যাংক ও কেএএফ ডিজিটাল ব্যাংক, পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের উন্নত পর্যায়ে রয়েছে এবং বৃহত্তর পরিসরে জনসাধারণের জন্য সেবা চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই নিবন্ধে আমানত বৃদ্ধির সর্বশেষ পরিসংখ্যান, ডিজিটাল ব্যাংকগুলোর চ্যালেঞ্জ, আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে তাদের প্রভাব এবং মালয়েশিয়ার ডিজিটাল ব্যাংকিং খাতের ভবিষ্যৎ তুলে ধরা হয়েছে।

সূচিপত্র
  1. মালয়েশিয়ার ডিজিটাল ব্যাংকিং বিপ্লব: ২০২৫ সালে পরিস্থিতি কোথায়?
  2. আমানত বৃদ্ধি: ডিজিটাল ব্যাংকের অগ্রযাত্রা
  3. মালয়েশিয়ার ডিজিটাল ব্যাংকগুলো কারা, আর তাদের বিশেষত্ব কী?
  4. আর্থিক অন্তর্ভুক্তি: পর্যাপ্ত সেবা না পাওয়া মানুষের কাছে পৌঁছানো
  5. চ্যালেঞ্জ: মুনাফা, ঋণ বিতরণ ও গ্রাহক ধরে রাখা
  6. প্রারম্ভিক ব্যয় ও লোকসান বেশি
  7. ঋণ বিতরণ বৃদ্ধি: প্রত্যাশার চেয়ে ধীর ও ব্যয়বহুল
  8. গ্রাহক ধরে রাখা ও গ্রাহক সংগ্রহের ব্যয়
  9. প্রচলিত ব্যাংকের জবাব: ডিজিটাল রূপান্তর ও প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা
  10. নিয়ন্ত্রক কাঠামো: স্থিতিশীলতা ও উদ্ভাবন নিশ্চিত করা
  11. নির্বাচিত ডিজিটাল ব্যাংক: কৌশল ও উদ্ভাবন
  12. জিএক্সব্যাংক: নেতৃত্বে এগিয়ে
  13. এইওন ব্যাংক: ইসলামি ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে পথিকৃৎ
  14. বুস্ট ব্যাংক: সমন্বিত অর্থায়ন ও আঞ্চলিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা
  15. সামনের পথ: সম্ভাবনা ও ঝুঁকি
  16. সংক্ষেপে

আমানত বৃদ্ধি: ডিজিটাল ব্যাংকের অগ্রযাত্রা

চালুর পর থেকে মালয়েশিয়ার ডিজিটাল ব্যাংকগুলোতে গ্রাহক আমানত দ্রুত বেড়েছে। এতে ভোক্তাদের প্রবল আগ্রহ এবং ডিজিটাল-প্রথম কৌশলের কার্যকারিতা—দুটিই প্রতিফলিত হয়েছে। ২০২৪ সালের শেষ ভাগ ও ২০২৫ সালের শুরুর দিকে, কার্যক্রম চালানো তিনটি ডিজিটাল ব্যাংকে সম্মিলিতভাবে প্রায় ১৩ লাখ গ্রাহকের ২৩০ কোটি রিঙ্গিতের বেশি আমানত জমা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছে জিএক্সব্যাংক। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকটি ২১৬ কোটি রিঙ্গিত আমানত এবং মোট ২৪০ কোটি রিঙ্গিত সম্পদের কথা জানায়। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি চালু হওয়া এইওন ব্যাংক ও বুস্ট ব্যাংকও শুরুতেই উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে। ২০২৪ সালের নভেম্বর নাগাদ এইওন ব্যাংকের আমানত ছিল ৩৩ কোটি ৯০ লাখ রিঙ্গিত এবং সম্পদ ৭১ কোটি ১০ লাখ রিঙ্গিত। ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত বুস্ট ব্যাংকের আমানত ছিল ৫৭ কোটি ৩০ লাখ রিঙ্গিত এবং সম্পদ ৮১ কোটি ৯০ লাখ রিঙ্গিত।

আগ্রাসী প্রচারাভিযান, উচ্চ মুনাফার সঞ্চয়ী হিসাব এবং নির্বিঘ্ন ডিজিটাল নিবন্ধনপ্রক্রিয়া আমানত দ্রুত বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। উদাহরণস্বরূপ, শুরুতে জিএক্সব্যাংক বাজারে অন্যতম আকর্ষণীয়, সর্বোচ্চ ৩ শতাংশ পর্যন্ত সঞ্চয়ী মুনাফার হার দিয়েছিল। অন্যদিকে, বুস্ট ব্যাংক তুলনামূলক সংযত কৌশল নিয়ে তহবিলের ব্যয় ১.৭ শতাংশে রেখেছে—দীর্ঘ মেয়াদে যা ভালো মুনাফার মার্জিন ধরে রাখতে সহায়ক হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

উৎসাহব্যঞ্জক এসব পরিসংখ্যান সত্ত্বেও, কার্যক্রম চালানো তিনটি ডিজিটাল ব্যাংকের সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ এখনো সামান্য। ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত মালয়েশিয়ার ব্যাংকিং খাতের মোট ৩.৭ ট্রিলিয়ন রিঙ্গিত সম্পদের ১ শতাংশেরও কম তাদের দখলে। প্রথম তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে প্রতিটি ডিজিটাল ব্যাংক নিয়ন্ত্রক নির্ধারিত ৩০০ কোটি রিঙ্গিত সম্পদের সীমায় পৌঁছালেও, তাদের সম্মিলিত ১ হাজার ৫০০ কোটি রিঙ্গিত হবে পুরো খাতের মোট সম্পদের মাত্র ০.৪ শতাংশ। এতে ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা যেমন বোঝা যায়, তেমনি বৃহত্তর আর্থিক ব্যবস্থায় তাদের বর্তমান প্রভাব যে সীমিত, সেটিও স্পষ্ট হয়।

মালয়েশিয়ার ডিজিটাল ব্যাংকগুলো কারা, আর তাদের বিশেষত্ব কী?

মালয়েশিয়ার ডিজিটাল ব্যাংকিং খাতে লাইসেন্সপ্রাপ্ত পাঁচটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্রত্যেকটির সেবার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও লক্ষ্যবাজার আছে:

  • জিএক্সব্যাংক: গ্র্যাব হোল্ডিংস ইনকরপোরেটেড ও কুওক গ্রুপের সমর্থনে গড়ে ওঠা জিএক্সব্যাংক মালয়েশিয়ার প্রথম লাইসেন্সপ্রাপ্ত ডিজিটাল ব্যাংক। এটি সম্পূর্ণ ডিজিটাল ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক ব্যাংকিং সেবা দেয়। গ্র্যাবের ইকোসিস্টেমের তথ্য কাজে লাগিয়ে গ্রাহকভেদে বিশেষভাবে সাজানো আর্থিক পণ্যও সরবরাহ করে।
  • এইওন ব্যাংক: দেশটির প্রথম সম্পূর্ণ শরিয়াহসম্মত ডিজিটাল ব্যাংক এইওন ব্যাংক নৈতিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক আর্থিক সেবায় গুরুত্ব দেয়। মালয়েশিয়ার বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর উপযোগী ডিজিটাল সঞ্চয়, পেমেন্ট কার্ড ও বাজেট ব্যবস্থাপনার সরঞ্জাম দেয় ব্যাংকটি।
  • বুস্ট ব্যাংক: অ্যাক্সিয়াটা গ্রুপ ও আরএইচবি ব্যাংকিং গ্রুপের যৌথ উদ্যোগে গড়ে ওঠা বুস্ট ব্যাংক মালয়েশিয়ার ফিনটেক ইকোসিস্টেমের সঙ্গে ডিজিটাল ব্যাংকিংকে যুক্ত করেছে। মোবাইল-প্রথম সেবা, সেভিংস জারসের মতো উদ্ভাবনী সুবিধা এবং বড় খুচরা বিক্রেতাদের সঙ্গে অংশীদারত্বের কারণে ডিজিটাল সেবায় অভ্যস্ত গ্রাহকদের মধ্যে এটি জনপ্রিয় হয়েছে।
  • কেএএফ ডিজিটাল ব্যাংক: মালয়েশিয়ার দ্বিতীয় ইসলামি ডিজিটাল ব্যাংক হতে যাওয়া কেএএফ ডিজিটাল ব্যাংক এখন পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে। ই-কমার্স ও ফিনটেক প্ল্যাটফর্মের জন্য শরিয়াহসম্মত সঞ্চয়, বিনিয়োগ সমাধান এবং সমন্বিত আর্থিক সেবা দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে এর।
  • রাইট ব্যাংক: সর্বশেষ যোগ দেওয়া রাইট ব্যাংক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর ব্যক্তিগত ব্যাংকিংয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে। এর সেবায় রয়েছে এআই আর্থিক সহকারী ও উন্নত নিরাপত্তাব্যবস্থা। ব্যবহারবান্ধব ও বহুভাষিক সহায়তার মাধ্যমে ব্যাংকটি পর্যাপ্ত সেবা না পাওয়া জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করছে।

সব ডিজিটাল ব্যাংক সম্পূর্ণ অনলাইনে চলে, ফলে সরাসরি শাখার প্রয়োজন হয় না। এতে তারা সেবা আরও সহজ করতে, ব্যয় কমাতে এবং প্রত্যন্ত বা পর্যাপ্ত ব্যাংকিং সেবা না পাওয়া এলাকার গ্রাহকদের কাছে প্রচলিত ব্যাংকের তুলনায় কার্যকরভাবে পৌঁছাতে পারে।

আর্থিক অন্তর্ভুক্তি: পর্যাপ্ত সেবা না পাওয়া মানুষের কাছে পৌঁছানো

মালয়েশিয়ার ডিজিটাল ব্যাংকিং উদ্যোগের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানো। বিএনএমের তথ্য অনুযায়ী, ডিজিটাল ব্যাংকের গ্রাহকদের প্রায় ৬০ শতাংশই পর্যাপ্ত আর্থিক সেবা না পাওয়া জনগোষ্ঠীর সদস্য; যেমন নিম্ন আয়ের পরিবার ও গ্রামীণ এলাকার মানুষ। কঠোর ঋণযোগ্যতা যাচাই, দীর্ঘ অনুমোদনপ্রক্রিয়া এবং সীমিত শাখা নেটওয়ার্কের কারণে প্রচলিত ব্যাংকগুলো দীর্ঘদিন ধরে এসব জনগোষ্ঠীকে সেবা দিতে হিমশিম খেয়েছে।

ডিজিটাল ব্যাংকগুলো যেসব সুবিধা দিচ্ছে:

  • সম্পূর্ণ ডিজিটাল নিবন্ধন: গ্রাহকেরা সরাসরি শাখায় না গিয়ে মোবাইল অ্যাপ বা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে হিসাব খুলতে ও ঋণের আবেদন করতে পারেন।
  • গ্রাহকের উপযোগী ঋণসেবা: তথ্য বিশ্লেষণ কাজে লাগিয়ে ডিজিটাল ব্যাংক সীমিত বা একেবারেই ঋণ-ইতিহাস নেই, এমন ব্যক্তিরও ঋণযোগ্যতা যাচাই করতে পারে। ফলে গিগ কর্মী, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও একক মালিকানাধীন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান অর্থায়নের সুযোগ পায়।
  • কম খরচের সেবা: পরিচালন ব্যয় কম হওয়ায় ডিজিটাল ব্যাংক কম ফি ও ভালো সুদের হার দিতে পারে, ফলে সবার জন্য ব্যাংকিং আরও সাশ্রয়ী হয়।
বিজ্ঞাপন

সঞ্চয় ও পেমেন্ট সেবার পাশাপাশি, ডিজিটাল ব্যাংকগুলো ২০২৪ সালের শেষ দিকে অর্থায়ন পণ্য চালু করতে শুরু করে। জিএক্সব্যাংক ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক গ্রাহকদের দ্রুত অনুমোদনের ঋণ দেয়। তবে আপাতত ব্যবসায়িক অর্থায়ন গ্র্যাবের ইকোসিস্টেমের ব্যবসায়ীদের মধ্যেই সীমিত। এইওন ব্যাংক ব্যক্তিগত অর্থায়ন পণ্য চালু করেছে, যার মধ্যে গিগ কর্মী ও কমিশনভিত্তিক আয়কারীদের জন্য শরিয়াহসম্মত সুবিধাও রয়েছে। অন্যদিকে, বুস্ট ব্যাংক ব্যবসায়িক ঋণের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগকে (এসএমই) লক্ষ্য করছে। এ খাতে অর্থায়নের জন্য সিজিসি ডিজিটালের সঙ্গে অংশীদারত্ব করে ১৩ কোটি রিঙ্গিত বরাদ্দ করেছে ব্যাংকটি।

চ্যালেঞ্জ: মুনাফা, ঋণ বিতরণ ও গ্রাহক ধরে রাখা

আমানত ও গ্রাহকসংখ্যা দ্রুত বাড়লেও মুনাফা অর্জন ও দীর্ঘমেয়াদি টেকসই কার্যক্রম নিশ্চিত করার পথে মালয়েশিয়ার ডিজিটাল ব্যাংকগুলো বড় চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।

প্রারম্ভিক ব্যয় ও লোকসান বেশি

প্রত্যাশিতভাবেই, কার্যক্রম চালানো তিনটি ডিজিটাল ব্যাংকই শুরুর বছরগুলোতে লোকসানে রয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে জিএক্সব্যাংকের করপূর্ব লোকসান ছিল ১৮ কোটি ৯০ লাখ রিঙ্গিত, এইওন ব্যাংকের লোকসান ৯ কোটি ১০ লাখ রিঙ্গিত এবং একই ধরনের সময়কালে বুস্ট ব্যাংকের লোকসান ছিল ৪ কোটি ৩০ লাখ রিঙ্গিত। প্রারম্ভিক ব্যয় বেশি হওয়া, আগ্রাসী বিপণন এবং প্রাথমিক পর্যায়ে সীমিত আয় দেয় এমন কম ঝুঁকির বিনিয়োগের ওপর নির্ভরতার কারণে মূলত এই লোকসান হয়েছে।

ঋণ বিতরণ বৃদ্ধি: প্রত্যাশার চেয়ে ধীর ও ব্যয়বহুল

ঋণ কার্যক্রমের পরিসর বাড়ানো প্রত্যাশার চেয়ে কঠিন প্রমাণিত হয়েছে। ডিজিটাল ব্যাংকগুলো মূলত পর্যাপ্ত ব্যাংকিং সেবা না পাওয়া এবং ব্যাংক হিসাববিহীন মালয়েশীয়দের লক্ষ্য করে, যাদের অনেকের ডিজিটাল সাক্ষরতা কম বা ঋণ-ইতিহাস সীমিত। এতে পরিচালনাগত ও ঋণঝুঁকি তৈরি হয়, ফলে দ্রুত ও নিরাপদে ঋণ পোর্টফোলিও বাড়ানো কঠিন হয়ে পড়ে।

ইউওবি কায় হিয়ানের বিশ্লেষক কিথ উই টেক কিয়ং বলেন:

এই জনগোষ্ঠীর অনেকের অ্যাপভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম পুরোপুরি ব্যবহারের মতো ডিজিটাল সাক্ষরতা নাও থাকতে পারে। আবার তাদের ঋণ-সংক্রান্ত তথ্য সম্পদের গুণমান নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করতে পারে।

ফলে ডিজিটাল ব্যাংকগুলো আমানত সংগ্রহের গতি কমাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে উচ্চ ব্যয়ের আমানত কম মুনাফার মানি মার্কেট উপকরণে বিনিয়োগ করার পরিস্থিতি এড়ানো যাবে, যা মুনাফার মার্জিন কমিয়ে দিত। এই কৌশলগত পরিবর্তনে প্রচলিত ব্যাংকগুলোর ওপর আমানত সংগ্রহের প্রতিযোগিতার চাপও কমতে পারে।

বিজ্ঞাপন

গ্রাহক ধরে রাখা ও গ্রাহক সংগ্রহের ব্যয়

ডিজিটাল সেবায় অভ্যস্ত এবং দামের প্রতি সংবেদনশীল গ্রাহকদের ধরে রাখাও বড় চ্যালেঞ্জ। উচ্চ সুদের হার ও প্রচারমূলক প্রস্তাবে দ্রুত গ্রাহক আকৃষ্ট করা গেলেও তাদের আগ্রহ ও আনুগত্য ধরে রাখতে ধারাবাহিক উদ্ভাবন, ব্যক্তিগত চাহিদাভিত্তিক সেবা এবং শক্তিশালী গ্রাহক সহায়তা প্রয়োজন। চলমান সম্প্রসারণ ও পণ্য উন্নয়নে সহায়তার জন্য তিনটি ব্যাংকই ২০২৪ সালে শেয়ারহোল্ডারদের কাছ থেকে অতিরিক্ত মূলধন পেয়েছে।

প্রচলিত ব্যাংকের জবাব: ডিজিটাল রূপান্তর ও প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা

মালয়েশিয়ার প্রতিষ্ঠিত ব্যাংকগুলোও পিছিয়ে নেই। প্রযুক্তি, পণ্যে উদ্ভাবন ও গ্রাহক অভিজ্ঞতায় বড় বিনিয়োগ করে তারা নিজস্ব ডিজিটাল পরিকল্পনা এগিয়ে নিচ্ছে। পণ্যের বিস্তৃত পরিসর, শক্তিশালী বিতরণ নেটওয়ার্ক এবং পর্যাপ্ত মূলধনের কারণে প্রচলিত ব্যাংকগুলো এখনো শক্তিশালী প্রতিযোগী।

ইউওবি কায় হিয়ান রিসার্চের মতে, বাইরের অনিশ্চয়তার মধ্যে আকর্ষণীয় মূল্যায়ন, পর্যাপ্ত সংরক্ষিত তহবিল এবং শক্তিশালী মূলধন ব্যবস্থাপনা রয়েছে—এমন ব্যাংকগুলো প্রতিকূল পরিস্থিতি সামলাতে ভালো অবস্থানে রয়েছে। তাদের পছন্দের তালিকায় রয়েছে হং লিয়ং ব্যাংক বারহাদ, পাবলিক ব্যাংক বারহাদ এবং এএমএমবি হোল্ডিংস বারহাদ। অস্থির পরিবেশে এসব ব্যাংক স্থিতিশীলতা ও সহনশীলতা দিতে পারে।

নিয়ন্ত্রক কাঠামো: স্থিতিশীলতা ও উদ্ভাবন নিশ্চিত করা

মালয়েশিয়ার ডিজিটাল ব্যাংকিং খাত গড়ে তোলায় ব্যাংক নেগারা মালয়েশিয়া সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে। ২০২০ সালে চালু করা লাইসেন্সিং কাঠামোতে ডিজিটাল ব্যাংকের জন্য কঠোর শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে:

  • প্রতি ব্যাংকের মোট সম্পদ ৩০০ কোটি রিঙ্গিতের মধ্যে রেখে তিন থেকে পাঁচ বছরের প্রাথমিক পর্যায় পরিচালনা
  • ন্যূনতম মূলধনের শর্ত: শুরুতে ১০ কোটি রিঙ্গিত, প্রাথমিক পর্যায় শেষে যা বেড়ে ৩০ কোটি রিঙ্গিত হবে
  • তারল্য, পর্যাপ্ত মূলধন, ভোক্তা সুরক্ষা ও সাইবার নিরাপত্তার মানদণ্ডের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে সামঞ্জস্য বজায় রাখা

এই পদ্ধতিতে ডিজিটাল ব্যাংকগুলো পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রমে যাওয়ার আগে পরিচালনাগত স্থিতিশীলতা ও টেকসই প্রবৃদ্ধির ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে। বিএনএমের ২০২৪ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনেও আর্থিক সেবার প্রবেশপথ বাড়ানো, ডিজিটাল সাক্ষরতা উন্নত করা এবং ইলেকট্রনিক গ্রাহক পরিচয় যাচাই (ই-কেওয়াইসি) ব্যবস্থার নিরাপদ ব্যবহার উৎসাহিত করার উদ্যোগের কথা তুলে ধরা হয়েছে। জাতীয় ডিজিটাল পরিচয় যাচাইয়ের জন্য মাইডিজিটাল আইডি চালুর উদ্যোগও এর অন্তর্ভুক্ত।

বিজ্ঞাপন

নির্বাচিত ডিজিটাল ব্যাংক: কৌশল ও উদ্ভাবন

জিএক্সব্যাংক: নেতৃত্বে এগিয়ে

গ্র্যাব ইকোসিস্টেমের সঙ্গে একীভূত হওয়া, আগ্রাসী প্রচারাভিযান এবং ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক ব্যাংকিংয়ে গুরুত্ব দেওয়ার ফলে জিএক্সব্যাংকের দ্রুত প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ব্যাংকটির জিএক্স ফ্লেক্সিক্রেডিট পণ্যে পাঁচ মিনিটে আবেদন করা যায় এবং সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫০ হাজার রিঙ্গিত পর্যন্ত ঋণসীমা পাওয়া যায়। এর লক্ষ্য ভোক্তা এবং ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোগ (এমএসএমই)। ঋণযোগ্যতা যাচাই ও আবেদনপ্রক্রিয়ার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এমএসএমইর জন্য উপযোগী আর্থিক পণ্য তৈরি করতে মালয়েশিয়া ডিজিটাল ইকোনমি করপোরেশনের সঙ্গে অংশীদারত্ব করেছে জিএক্সব্যাংক।

এইওন ব্যাংক: ইসলামি ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে পথিকৃৎ

মালয়েশিয়ার প্রথম সম্পূর্ণ শরিয়াহসম্মত ডিজিটাল ব্যাংক হিসেবে এইওন ব্যাংক স্বতন্ত্র। নৈতিক আর্থিক সেবা ও উদ্ভাবনীভাবে গ্রাহকদের যুক্ত করার কৌশলের জন্য ব্যাংকটি প্রশংসা পেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে গেমভিত্তিক আনুগত্য কর্মসূচি নেকো মিশনস এবং গ্রোথস্টার্ট আইটেকাড উদ্যোগ। এ উদ্যোগে বি৪০ জনগোষ্ঠীর নারী ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ ও ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়নে সহায়তা করা হয়। আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও দায়িত্বশীল ঋণদানে গুরুত্ব দেওয়ায় ইসলামি ডিজিটাল অর্থায়নে নেতৃত্বের অবস্থানে রয়েছে এইওন ব্যাংক।

বুস্ট ব্যাংক: সমন্বিত অর্থায়ন ও আঞ্চলিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা

ফিনটেক খাতের অভিজ্ঞতা এবং বড় খুচরা বিক্রেতা ও টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্ব কাজে লাগিয়ে বুস্ট ব্যাংক দ্রুত রূপান্তরমুখী প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। ১ রিঙ্গিতে হিসাব খোলা এবং সেভিংস জারসের মতো ব্যবহারবান্ধব সুবিধা বিপুলসংখ্যক গ্রাহকের কাছে সাড়া ফেলেছে। মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ৫০০ কোটি রিঙ্গিত ছাড়িয়েছে। এতে হাজারো এমএসএমই সহায়তা পেয়েছে। আর্থিক সেবার প্রবেশাধিকারের ঘাটতি কমানোর লক্ষ্যে ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়ায় উদ্যোগ নিয়ে আঞ্চলিকভাবেও সম্প্রসারণ করছে ব্যাংকটি।

বুস্ট ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফোজিয়া আমানুল্লা ব্যাংকটির লক্ষ্য তুলে ধরে বলেন:

বুস্ট ব্যাংকের যাত্রা আমাদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার পথে বড় অগ্রগতি। বিষয়টি শুধু আমানত বা হিসাবের নয়; ব্যক্তি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে সত্যিকার অর্থে সমৃদ্ধ হতে সক্ষম করে—এমন একটি প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলাই এর উদ্দেশ্য।

সামনের পথ: সম্ভাবনা ও ঝুঁকি

মালয়েশিয়ার ডিজিটাল ব্যাংকগুলো এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কয়েকটি প্রবণতা ও চ্যালেঞ্জ তাদের ভবিষ্যৎ গড়ে দেবে:

  • পণ্যের পরিসর বাড়ানো: এমএসএমই ও ব্যক্তিদের আরও ভালো সেবা দিতে ডিজিটাল ব্যাংকগুলো ক্ষুদ্রঋণ, ইনভয়েস অর্থায়ন এবং অ্যাপভিত্তিক আর্থিক শিক্ষার মতো আরও অর্থায়ন সুবিধা চালু করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
  • প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তাৎক্ষণিক তথ্য বিশ্লেষণ এবং সমন্বিত অর্থায়নের ব্যবহার আরও বুদ্ধিদীপ্ত ও ব্যক্তিগত চাহিদাভিত্তিক ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা তৈরি করবে।
  • নিয়ন্ত্রক কাঠামোর বিবর্তন: ২০২৪ সালে বিএনএমের ডিজিটাল বিমা ও তাকাফুল পরিচালকদের জন্য লাইসেন্সিং ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো (ডিআইটিও) চালুর ফলে আর্থিক খাতে আরও উদ্ভাবন ও প্রতিযোগিতার পথ তৈরি হয়েছে।
  • আর্থিক সাক্ষরতা ও অন্তর্ভুক্তি: ডিজিটাল সাক্ষরতা বাড়ানো ও আর্থিক সেবার প্রবেশপথ সম্প্রসারণের চলমান উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হবে, যাতে সব মালয়েশীয়—বিশেষ করে গ্রামীণ ও পর্যাপ্ত সেবা না পাওয়া এলাকার মানুষ—ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের সুবিধা পান।
  • মুনাফা ও টেকসই কার্যক্রম: মুনাফা অর্জন এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। অধিকাংশ ডিজিটাল ব্যাংকের ধারণা, লোকসান কাটিয়ে উঠতে তিন বছরের বেশি সময় লাগবে। দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের জন্য প্রবৃদ্ধি, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও গ্রাহক ধরে রাখার মধ্যে ভারসাম্য জরুরি।
বিজ্ঞাপন

সংক্ষেপে

  • মালয়েশিয়ার ডিজিটাল ব্যাংক জিএক্সব্যাংক, এইওন ব্যাংক ও বুস্ট ব্যাংকে আমানত দ্রুত বেড়েছে। ২০২৫ সালের শুরুর দিকে প্রায় ১৩ লাখ গ্রাহকের কাছ থেকে সম্মিলিতভাবে ২৩০ কোটি রিঙ্গিতের বেশি আমানত এসেছে।
  • সম্পদ ও আমানত—দুই ক্ষেত্রেই জিএক্সব্যাংক এগিয়ে। অন্যদিকে, ইসলামি অর্থায়ন ও সমন্বিত ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে যথাক্রমে নিজস্ব অবস্থান গড়েছে এইওন ব্যাংক ও বুস্ট ব্যাংক।
  • ডিজিটাল ব্যাংকের গ্রাহকদের প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যাপ্ত সেবা না পাওয়া জনগোষ্ঠীর সদস্য। এটি আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরে।
  • কার্যক্রম চালানো সব ডিজিটাল ব্যাংক এখনো লোকসানে রয়েছে। ঋণ বিতরণ বাড়ানো ও গ্রাহক ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ রয়েছে; গড়ে মুনাফায় পৌঁছাতে তিন বছরের বেশি সময় লাগবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
  • প্রচলিত ব্যাংকগুলোও ডিজিটাল রূপান্তরে বিনিয়োগ অব্যাহত রেখেছে। পণ্যের বিস্তৃত পরিসর ও শক্তিশালী মূলধনের কারণে তারা প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা ধরে রেখেছে।
  • বিএনএমের নিয়ন্ত্রক কাঠামো স্থিতিশীলতা, উদ্ভাবন ও ভোক্তা সুরক্ষা নিশ্চিত করে। আর্থিক সেবার প্রবেশাধিকার এবং ডিজিটাল সাক্ষরতা বাড়ানোর উদ্যোগও চলছে।
  • প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, পণ্যের বিস্তৃত পরিসর এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও টেকসই কার্যক্রমে অব্যাহত গুরুত্ব—এসবের ওপর নির্ভর করবে মালয়েশিয়ার ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের ভবিষ্যৎ।
এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন

আপনার পছন্দ হতে পারে