ইন্দোনেশিয়ার বিনামূল্যে খাবার কর্মসূচি: উচ্চাকাঙ্ক্ষা, কৃচ্ছ্রসাধন ও বিতর্ক
প্রেসিডেন্ট প্রবোও সুবিয়ান্তোর অন্যতম প্রধান নীতি ইন্দোনেশিয়ার উচ্চাভিলাষী বিনামূল্যে খাবার কর্মসূচি বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল সামাজিক উদ্যোগগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে। স্কুলশিক্ষার্থী, ছোট শিশু এবং গর্ভবতী বা স্তন্যদানকারী নারীসহ ৮ কোটি ৩০ লাখ মানুষকে পুষ্টিকর খাবার দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে এতে। অপুষ্টি ও শিশুর খর্বাকৃতি রোধে কর্মসূচিটি নেওয়া হলেও এর বিশাল পরিসর, অর্থায়ন কৌশল এবং বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ ঘিরে তীব্র বিতর্ক, জনবিক্ষোভ এবং ইন্দোনেশিয়ার অর্থনীতি ও সমাজে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
সূচিপত্র
- ইন্দোনেশিয়ার বিনামূল্যে খাবার কর্মসূচি: উচ্চাকাঙ্ক্ষা, কৃচ্ছ্রসাধন ও বিতর্ক
- ইন্দোনেশিয়ার বিনামূল্যে খাবার কর্মসূচি কী?
- বাজেট ছাঁটাই ও আর্থিক অগ্রাধিকারের দ্বন্দ্ব: কর্মসূচির অর্থায়ন কীভাবে হচ্ছে?
- অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব: প্রবৃদ্ধি, ঘাটতি ও জনমত
- বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ: সরবরাহব্যবস্থা, খাদ্য নিরাপত্তা ও বেসরকারি বিনিয়োগ
- খাদ্য নিরাপত্তা ও মান নিয়ে উদ্বেগ
- দুর্নীতির ঝুঁকি ও সুশাসনের চ্যালেঞ্জ
- বিনামূল্যে খাবার কর্মসূচি কি সঠিক সমাধান?
- বৃহত্তর প্রভাব: রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি
- সংক্ষেপে
ইন্দোনেশিয়ার বিনামূল্যে খাবার কর্মসূচি কী?
২০২৫ সালের শুরুতে চালু হওয়া ফ্রি নিউট্রিশাস মিল (Makan Bergizi Gratis, বা MBG) কর্মসূচির লক্ষ্য, লাখ লাখ ইন্দোনেশীয়কে সপ্তাহে পাঁচ দিন খাবার দেওয়া। এর প্রধান লক্ষ্য শিক্ষার্থী, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু এবং অন্তঃসত্ত্বা বা স্তন্যদানকারী মা। জাতির মানবসম্পদ উন্নয়ন, শিশুর খর্বাকৃতির হার কমানো এবং ২০৪৫ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার ইন্দোনেশিয়ার লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করা প্রেসিডেন্ট প্রবোওর পরিকল্পনার অংশ এই উদ্যোগ।
দীর্ঘস্থায়ী অপুষ্টির কারণে শারীরিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ব্যাহত হওয়ার একটি অবস্থা হলো শিশুর খর্বাকৃতি। ইন্দোনেশিয়ায় পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এ সমস্যায় আক্রান্ত। বিনামূল্যে পুষ্টিকর খাবার দিয়ে শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধি ও শেখার সক্ষমতা বাড়ানো এবং শেষ পর্যন্ত দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে অবদান রাখার আশা করছে সরকার।
বাজেট ছাঁটাই ও আর্থিক অগ্রাধিকারের দ্বন্দ্ব: কর্মসূচির অর্থায়ন কীভাবে হচ্ছে?
প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, কর্মসূচিটির বার্ষিক ব্যয় হতে পারত ৪৫০ ট্রিলিয়ন রুপিয়াহ (প্রায় ২৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার)। যুক্তরাষ্ট্রের পর এটি হতো বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যয়ের বিনামূল্যে খাবার উদ্যোগ। তবে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সরকার ২০২৬ সালের পরিকল্পিত ব্যয় ২২% কমানোর ঘোষণা দেয়। উপকরণের ব্যয়ের হিসাব সংশোধন এবং কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা পুনর্বিন্যাসের পর বাজেট কমিয়ে ৩৫০ ট্রিলিয়ন রুপিয়াহে (২১.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) আনা হয়। এ বছর ব্যয় হবে আনুমানিক ৭.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা আগের পরিকল্পনার চেয়ে ২৯% কম।
কর্মসূচির অর্থ জোগাতে প্রেসিডেন্ট প্রবোও বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও আঞ্চলিক বরাদ্দে ব্যাপক বাজেট ছাঁটাইয়ের নির্দেশ দেন। এর পরিমাণ দাঁড়ায় ৩০৬.৭ ট্রিলিয়ন রুপিয়াহ (প্রায় ১৯.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার)। এসব কৃচ্ছ্রসাধনমূলক পদক্ষেপে সরকারি অবকাঠামো, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও গবেষণাসহ নানা খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের বাজেট ৮০% কমানো হয়েছে, আর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ কমেছে ১৮.৫৬%। উচ্চশিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় খাবার কর্মসূচিতে অর্থ জোগাতে গবেষণার তহবিল পুনর্নির্দেশ করেছে। জাতীয় গ্রন্থাগারও তাদের খোলার সময় কমিয়েছে।
অর্থমন্ত্রী শ্রী মুলিয়ানি ইন্দ্রাবতী জোর দিয়ে বলেছেন, বিনামূল্যে খাবার কর্মসূচির মতো যেসব উদ্যোগে সরাসরি জনসাধারণ উপকৃত হয়, সেগুলোকে অগ্রাধিকার দিতেই এই ছাঁটাই করা হয়েছে। তবে বরাদ্দ পুনর্বণ্টনের ফলে অপরিহার্য সেবা, সরকারি কার্যক্রম এবং ইন্দোনেশিয়ার আর্থিক সক্ষমতার ওপর এর প্রভাব নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব: প্রবৃদ্ধি, ঘাটতি ও জনমত
কর্মসূচিটির সমর্থকদের যুক্তি, স্থানীয় খাদ্যপণ্যের চাহিদা বাড়ানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্য ও উৎপাদনশীলতা উন্নত করার মাধ্যমে এটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গতি আনবে। প্রেসিডেন্টের এক উপদেষ্টার মতে, বিনামূল্যে খাবারের জন্য অতিরিক্ত বাজেট এ বছর ইন্দোনেশিয়ার জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে প্রায় দুই শতাংশ পয়েন্ট যোগ করতে পারে, যা দেশটিকে ৫.২% প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাতে সাহায্য করবে।
তবে কর্মসূচিটির ব্যয় এবং আর্থিক বিচক্ষণতার জন্য পরিচিত ইন্দোনেশিয়ার সুনামের ওপর এর প্রভাব নিয়ে আর্থিক বাজার ও বিশ্লেষকেরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। নোমুরা হোল্ডিংসের পূর্বাভাস, দুর্বল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, পণ্যের কম দাম এবং বিনামূল্যে খাবার কর্মসূচিতে দ্রুত ব্যয়ের কারণে এ বছর রাজস্ব ঘাটতি জিডিপির ২.৯% হতে পারে, যা আইনগত ৩% সীমার কাছাকাছি। বছরের মাঝামাঝি বাজেট পর্যালোচনায় সরকার আরও বেশি ঘাটতির পূর্বাভাস ঘোষণা করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কৃচ্ছ্রসাধনমূলক পদক্ষেপের প্রতিবাদেও জনবিক্ষোভ হয়েছে, বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও নাগরিক সমাজের গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে “ডার্ক ইন্দোনেশিয়া” (Indonesia Gelap) আন্দোলন বড় শহরগুলোতে বিক্ষোভ করেছে। শিক্ষা, বৃত্তি ও জনসেবায় কাটছাঁটের নিন্দা জানিয়েছে তারা। বিক্ষোভকারীদের বক্তব্য, শিশুরা বিনামূল্যে খাবার পেলেও বৃহত্তর জনগোষ্ঠী চাকরি হারানো, সামাজিক সহায়তা কমে যাওয়া এবং ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ার মুখে রয়েছে। প্রেসিডেন্ট প্রবোওর প্রশাসনের জন্য বিক্ষোভগুলো প্রথম বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। কয়েকটি বিক্ষোভ সহিংসতায় রূপ নিয়েছে এবং সরকারের অগ্রাধিকার নিয়ে দেশজুড়ে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ: সরবরাহব্যবস্থা, খাদ্য নিরাপত্তা ও বেসরকারি বিনিয়োগ
ইন্দোনেশিয়ার মতো বিশাল ও বৈচিত্র্যময় দেশে এত বড় পরিসরের কর্মসূচি চালু করা কঠিন প্রমাণিত হয়েছে। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ লক্ষ্যমাত্রার ৮ কোটি ৩০ লাখ মানুষের কাছে পৌঁছাতে চায় সরকার—বর্তমান ৫০ লাখের তুলনায় যা ১৬ গুণ বেশি। এর জন্য ১৭ হাজারেরও বেশি দ্বীপজুড়ে রান্নাঘর, খাদ্য সরবরাহব্যবস্থা ও বিতরণ নেটওয়ার্ক ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ করতে হবে।
স্থানীয়ভাবে পর্যাপ্ত খাবার সংগ্রহ করা অন্যতম বড় বাধা। কর্মসূচিটি দেশীয় উৎপাদকদের ডিম, মুরগি, মাছ, শাকসবজি ও ফলের ওপর নির্ভরশীল। তবে দুধের চাহিদা সরবরাহ ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ কারণে অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ব্রাজিল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ থেকে ১৫ লাখ পর্যন্ত দুগ্ধজাত গরু আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে, যা ইন্দোনেশিয়ার বর্তমান গরুর সংখ্যা তিন গুণ পর্যন্ত বাড়াতে পারে। কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, এখনই ঘাটতি না থাকলেও স্থানীয় উৎপাদন বাড়াতে সময় লাগবে।
খাবার তৈরি ও বিতরণের জন্য প্রয়োজনীয় আনুমানিক ৩২ হাজার রান্নাঘর নির্মাণ ও পরিচালনায় বেসরকারি বিনিয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বর্তমানে ১ হাজার ৯০০টিরও কম রান্নাঘর চালু রয়েছে, আর বিনিয়োগকারীরা এখনো সতর্ক। প্রতিটি রান্নাঘরে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৮৩ হাজার মার্কিন ডলার খরচ হতে পারে এবং বিনিয়োগ তুলে আনতে দুই বছর পর্যন্ত লাগতে পারে। ইন্দোনেশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রভাষক আদিত্য পেরদানা বলেন:
বিনিয়োগের মডেলটি নিয়ে মানুষ নিশ্চিত নয়, তাই অগ্রগতি দেখার জন্য অপেক্ষা করতেই পছন্দ করছে।
কর্মসূচির গতি বাড়াতে ৩০ হাজার বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতককে রান্নাঘর ব্যবস্থাপক হিসেবে নিয়োগের পরিকল্পনা করেছে সরকার। তবু প্রত্যন্ত অঞ্চলে খাবার পৌঁছানো, খাবারের সতেজতা বজায় রাখা এবং সময়মতো বিতরণ নিশ্চিত করার মতো সরবরাহগত চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।
খাদ্য নিরাপত্তা ও মান নিয়ে উদ্বেগ
কর্মসূচির খাবার খেয়ে বিষক্রিয়ার বেশ কয়েকটি আলোচিত ঘটনা ঘটায় খাদ্য নিরাপত্তা বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে। জাকার্তার দক্ষিণে চিয়ানজুরে দুর্গন্ধযুক্ত খাবার খাওয়ার পর প্রায় ৮০ শিক্ষার্থীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তদন্তে খাবার তৈরিতে অবহেলার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। নিরাপত্তাব্যবস্থা উন্নত করার অঙ্গীকার করেছে কর্তৃপক্ষ। কর্মসূচি চালুর পর থেকে খাদ্যে বিষক্রিয়ার অন্তত আটটি ঘটনার খবর পাওয়া গেছে, যাতে শিক্ষার্থী ও কর্মী—দুই পক্ষই আক্রান্ত হয়েছে।
কিছু শিক্ষার্থী খাবারের মান নিয়ে অভিযোগ করে বলেছে, সেগুলো বিস্বাদ, বাসি বা খাওয়ার অনুপযোগী। অনলাইনে খাবারের ছবি ছড়ানো ঠেকাতে শিক্ষকদের শিক্ষার্থীদের ফোন কেড়ে নেওয়ার খবরও এসেছে। বিলম্বিত অর্থ পরিশোধ ও নগদ প্রবাহের সমস্যায় কিছু খাবার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কর্মসূচি থেকে সরে গেছে।
বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকেরা তড়িঘড়ি বাস্তবায়ন এবং পরিচ্ছন্নতা, পুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তার বিস্তারিত মানদণ্ডের অভাবের সমালোচনা করেছেন। সেন্টার ফর ইন্দোনেশিয়াস স্ট্র্যাটেজিক ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভস (CISDI) জানিয়েছে, স্থানীয় সরকারের সঙ্গে সমন্বয়ের ক্ষেত্রে জাতীয় পুষ্টি সংস্থার কর্তৃত্ব সীমিত, যা কার্যকর তদারকিতে বাধা সৃষ্টি করছে। পুষ্টিবিদ তান শট ইয়েন সতর্ক করে বলেছেন, তৃণমূল পর্যায়ে যথেষ্ট সম্পৃক্ততা ছাড়া কর্মসূচি খুব দ্রুত চালু করলে খাবারের অপচয় এবং দুর্বল ফলাফলের ঝুঁকি রয়েছে।
দুর্নীতির ঝুঁকি ও সুশাসনের চ্যালেঞ্জ
ইন্দোনেশিয়ায় বড় পরিসরের সামাজিক সহায়তা কর্মসূচিগুলো ঐতিহাসিকভাবে দুর্নীতির ঝুঁকিতে রয়েছে, আর বিনামূল্যে খাবার উদ্যোগও এর ব্যতিক্রম নয়। অর্থ আত্মসাৎ, সরবরাহকারীদের পাওনা পরিশোধ না করা এবং স্বচ্ছতার অভাবের অভিযোগ ইতোমধ্যে উঠেছে। এক ঘটনায়, দক্ষিণ জাকার্তার এক খাবার সরবরাহকারী স্কুলের মধ্যাহ্নভোজে খরচ করা প্রায় এক বিলিয়ন রুপিয়াহ ফেরত না দেওয়ার অভিযোগ করেছে কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। এ নিয়ে পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। কর্মসূচির বিশাল বাজেটের কারণে জালিয়াতির “বাস্তব আশঙ্কা” রয়েছে বলে সতর্ক করেছে জাতীয় দুর্নীতিবিরোধী ব্যুরো।
এসব সমস্যা মোকাবিলা এবং জনগণের অর্থ সুরক্ষার অঙ্গীকার করেছেন প্রেসিডেন্ট প্রবোও, তবে সংশয় রয়ে গেছে। ইন্দোনেশিয়ার নিরীক্ষা বোর্ডের গবেষণা বিশ্লেষক মুহাম্মদ রাফি বাকরি বলেন:
বাজেটের বিপুল আকার বিবেচনায়, এই কর্মসূচি দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের জন্য অর্থের খনি।
বিনামূল্যে খাবার কর্মসূচি কি সঠিক সমাধান?
পুষ্টি উন্নত করা, শিশুর খর্বাকৃতি কমানো এবং মানবসম্পদে বিনিয়োগ—কর্মসূচিটির এসব লক্ষ্য ব্যাপকভাবে সমর্থিত। তবে সমালোচকেরা প্রশ্ন তুলেছেন, অপুষ্টি মোকাবিলায় MBG-ই সবচেয়ে কার্যকর বা দক্ষ পদ্ধতি কি না। পোসইয়ান্দু কমিউনিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র, পরিবার কল্যাণ কার্ড (KKS) নগদ সহায়তা কর্মসূচি এবং সম্পূরক খাদ্য কর্মসূচি (PMT)-এর মতো আগের সরকারি উদ্যোগগুলো নানা মাত্রায় সফলতার সঙ্গে অপুষ্টি মোকাবিলা করেছে। কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, ব্যয়বহুল নতুন উদ্যোগ শুরুর বদলে বিদ্যমান কর্মসূচিগুলো সম্প্রসারণ করাই অধিক বিচক্ষণ হবে।
এ ছাড়া, জাতীয় জরিপে দেখা গেছে, গত এক বছরে ইন্দোনেশিয়ার মাত্র প্রায় ১% পরিবার এমন একটি দিনের অভিজ্ঞতা পেয়েছে, যেদিন তাদের কোনো খাবার ছিল না। আর আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে পুষ্টিকর খাবার পেতে অসুবিধা হয়েছে বলে জানিয়েছে ৮%-এরও কম পরিবার। এতে বোঝা যায়, অপুষ্টি উদ্বেগের বিষয় হলেও ব্যাপক অনাহার প্রধান সমস্যা নয়। শুধু বেশি খাবার দেওয়ার বদলে খাদ্যতালিকার মান উন্নত করা হতে পারে আরও লক্ষ্যভিত্তিক সমাধান।
কর্মসূচিটির “সর্বজনীন” পদ্ধতি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। এতে স্থানীয় পুষ্টির চাহিদা উপেক্ষিত হতে পারে এবং বিভিন্ন অঞ্চলে খাবারের প্রাপ্যতা ও খাদ্যাভ্যাসের পার্থক্য বিবেচনায় নাও আসতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতার উচ্চ হার এবং দেশের ভেতরে সীমিত উৎপাদনের কারণে দুধ দেওয়ার পরিকল্পনা জটিল হয়ে পড়েছে। স্থানীয় ছোট ব্যবসাকে শক্তিশালী করার বদলে কেন্দ্রীয় রান্নাঘরের ওপর নির্ভরতা কর্মসূচিটির কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক সুফল ও অভিযোজন সক্ষমতাকেও ক্ষুণ্ন করতে পারে।
বৃহত্তর প্রভাব: রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি
ইন্দোনেশিয়ার উন্নয়ন অগ্রাধিকার, আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং সামাজিক চুক্তি নিয়ে বৃহত্তর বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে বিনামূল্যে খাবার কর্মসূচি। প্রেসিডেন্ট প্রবোওর জনপ্রিয়তা এখনো প্রায় ৮০% হলেও, এই বিশাল উদ্যোগে অর্থায়নের জন্য যেসব আপস করতে হচ্ছে, তা নিয়ে ক্রমবর্ধমান অস্বস্তির ইঙ্গিত দিচ্ছে বিক্ষোভ ও জনঅসন্তোষ।
শিক্ষার্থী ও নাগরিক সমাজের গোষ্ঠীগুলোর আশঙ্কা, শিক্ষা, গবেষণা ও জনসেবায় কাটছাঁট ইন্দোনেশিয়ার দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনাকে ক্ষুণ্ন করবে। অথচ সরকার বিনামূল্যে খাবার কর্মসূচি এবং জাভা উপকূলের কাছে ৮০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমুদ্রপ্রাচীর নির্মাণের মতো আলোচিত প্রকল্প এগিয়ে নিচ্ছে। কৃচ্ছ্রসাধনের ফলে সরকারি সেবা কমেছে, বৃত্তি বাতিল হয়েছে, এমনকি সরকারি দপ্তরে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ও আলো ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকেরা সতর্ক করেছেন, অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি হলে বা জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়লে জনঅসন্তোষ তীব্র হতে পারে, যা সরকারের স্থিতিশীলতা ও সংস্কার কর্মসূচির জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। ইন্দোনেশিয়ার অতীতের শিক্ষার্থী-নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের অভিজ্ঞতা বলে, বৃহত্তর সমাজের মানুষের সমর্থন পেলে দীর্ঘস্থায়ী বিক্ষোভের উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক প্রভাব থাকতে পারে।
সংক্ষেপে
- ইন্দোনেশিয়ার বিনামূল্যে খাবার কর্মসূচি বিশ্বের বৃহত্তম ও সবচেয়ে ব্যয়বহুল সামাজিক উদ্যোগগুলোর একটি। এতে সর্বোচ্চ ৮ কোটি ৩০ লাখ মানুষকে খাবার দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
- ২০২৬ সালের জন্য কর্মসূচির বাজেট ২২% কমানো হয়েছে। তবে সরকারি বিভিন্ন খাতে ব্যাপক কৃচ্ছ্রসাধনের অর্থে পরিচালিত এই কর্মসূচি এখনো বড় আর্থিক অঙ্গীকার।
- সরবরাহগত চ্যালেঞ্জ, খাদ্য নিরাপত্তার ঘটনা, পাওনা পরিশোধে বিলম্ব এবং বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণে সমস্যার কারণে বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
- শিক্ষা ও অন্যান্য সেবায় বাজেট ছাঁটাইয়ের প্রতিবাদে, বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে, জনবিক্ষোভ শুরু হয়েছে।
- অপুষ্টি ও শিশুর খর্বাকৃতি মোকাবিলায় কর্মসূচিটি সবচেয়ে কার্যকর উপায় কি না, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন রয়েছে। তাঁদের মতে, বিদ্যমান উদ্যোগগুলো সম্প্রসারণ করাই অধিক বিচক্ষণ হতে পারে।
- দুর্নীতির ঝুঁকি ও সুশাসনের চ্যালেঞ্জ কর্মসূচির কার্যকারিতা এবং জনআস্থা ক্ষুণ্ন করতে পারে।
- কর্মসূচির সাফল্য বা ব্যর্থতা ইন্দোনেশিয়ার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং উন্নয়নের গতিপথে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলবে।






