এআইয়ের ভারসাম্য রক্ষায় মূল্য নির্ধারণ করছে কাজাখস্তান
কাজাখস্তান ২০২৬ সালের ১৫ জুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবকাঠামো প্রকল্পের জন্য চুক্তি করেছে, যাতে ১০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বিনিয়োগ আসতে পারে। এর মধ্যে একিবাস্তুজে এনভিডিয়ার প্রসেসর-সজ্জিত একটি ডেটা সেন্টার নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। দেশটির কূটনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাও সমান বড়: চীনের প্রচারিত একটি এআই সংস্থার গঠনপ্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখতে রাখতে মার্কিন প্রযুক্তিতে নির্ভরযোগ্য প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা।
সূচিপত্র
- এআইয়ের ভারসাম্য রক্ষায় মূল্য নির্ধারণ করছে কাজাখস্তান
- ১০ বিলিয়ন ডলারের প্রকল্পে আসলে কী রয়েছে
- ওয়াশিংটন ও বেইজিং কেন অংশীদার চাইছে
- কাজাখস্তানের কৌশলের সংক্ষিপ্ত সময়রেখা
- চলাফেরার সুযোগ খুঁজছে ইন্দোনেশিয়া ও সিঙ্গাপুর
- মার্কিন চিপ ও চীনা মডেলের সমন্বয় করছে সৌদি আরব
- ইউরোপ ও জাপানের সীমাবদ্ধতা ভিন্ন
- অর্থায়নের মাধ্যমে প্রভাব বাড়াচ্ছে চীন
- এআই চুক্তি কীভাবে কার্যকর পরিষেবায় রূপ নেয়?
- মূল বিষয়গুলো
মধ্য এশিয়ার দেশটি জুনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি অংশীদারত্ব ‘প্যাক্স সিলিকা’য় যোগ দেয়। এর তিন সপ্তাহ পর দেশটির এআইমন্ত্রী ঝাসলান মাদিয়েভ সাংহাইয়ে এক স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে যোগ দেন, যেখানে কাজাখস্তান চীনের ‘ওয়ার্ল্ড এআই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন’-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হয়।
প্রায় ২১ মিলিয়ন জনসংখ্যার দেশটির কাছে এর আকর্ষণ বাস্তব। মার্কিন অংশীদারত্ব উন্নত চিপ, কম্পিউটিং অবকাঠামো এবং সম্ভাব্য কর্মসংস্থানের সুযোগ দেয়। চীনের সঙ্গে অংশীদারত্ব আনে বিনিয়োগ, তুলনামূলক সাশ্রয়ী এআই প্রযুক্তি এবং এমন এক সংস্থায় মতামত দেওয়ার সুযোগ, যার অন্য ২৮ প্রতিষ্ঠাতা সদস্যের মধ্যে পাকিস্তান ও রাশিয়াও রয়েছে।
ওয়াশিংটন সতর্ক করেছে, প্রতিদ্বন্দ্বী এআই উদ্যোগে অংশ নিলে কোনো দেশের বিশ্বস্ত অংশীদার হিসেবে মর্যাদা ঝুঁকিতে পড়তে পারে। বেইজিং তাদের সংস্থাকে অন্তর্ভুক্তিমূলক বিকল্প হিসেবে তুলে ধরছে। উভয় পক্ষের সঙ্গেই সম্পর্ক রাখতে চাওয়া দেশগুলোকে ক্রমেই বিবেচনা করতে হচ্ছে, কোনো প্রযুক্তি কেনা বা কূটনৈতিক চুক্তি অন্য পক্ষের সঙ্গে প্রবেশাধিকারে প্রভাব ফেলতে পারে কি না।
কাজাখস্তানের অবস্থান ইন্দোনেশিয়া ও সিঙ্গাপুর থেকে শুরু করে সৌদি আরব ও ইউরোপ পর্যন্ত বিস্তৃত বৃহত্তর প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রতিচ্ছবি। সরকারগুলো এআইয়ের সুফল পেতে চায়, কিন্তু ব্যবসা ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন হবে এমন প্রসেসর, সফটওয়্যার ও কম্পিউটিং পরিষেবার ওপর অন্য কোনো দেশের চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ চায় না।
১০ বিলিয়ন ডলারের প্রকল্পে আসলে কী রয়েছে
কাজাখস্তানের চুক্তিগুলো হয়েছে এনভিডিয়ার সমর্থনপুষ্ট মার্কিন স্টার্টআপ ফায়ারবার্ড এবং রাষ্ট্রায়ত্ত অপারেটর কাজাখটেলিকমের সঙ্গে। পরিকল্পিত ‘ডেটা সেন্টার ভ্যালি’ উত্তর-পূর্বের জ্বালানি কেন্দ্র একিবাস্তুজে নির্মিত হবে। সেখানে কম খরচে বিদ্যুৎ পাওয়ার সুযোগই বড় আকর্ষণ।
প্রথম পর্যায়ের মূল্য প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে কাজাখটেলিকমের ১ বিলিয়ন ডলার রয়েছে। ১২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন স্থাপনাটির বাণিজ্যিক কার্যক্রম ২০২৭ সালে শুরু করার লক্ষ্য রয়েছে। মেগাওয়াট দিয়ে এর বিদ্যুৎ চাহিদার পরিমাণ বোঝানো হয়। বড় এআই কম্পিউটিং স্থাপনা বিপুল বিদ্যুৎ ব্যবহার করে বলে এটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়।
শিরোনামে উল্লেখ করা ১০ বিলিয়ন ডলার কয়েকটি চুক্তির আওতায় সম্ভাব্য মোট বিনিয়োগের পরিমাণ। কৌশলগত সহযোগিতার কাঠামোতে উদ্দেশ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তবে এতে বিনিয়োগের বাধ্যতামূলক অঙ্গীকার নেই। অন্যদিকে, কাজাখটেলিকম ও ফায়ারবার্ডের শর্তাবলির নথিটি বাধ্যতামূলক। প্রথম পর্যায় বাস্তবায়নে অর্থায়ন, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও চিপের চালান—সবকিছু নিশ্চিত হওয়া এখনো বাকি।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, স্থাপনাটি অন্তত ৩০০ মেগাওয়াটে সম্প্রসারিত হবে; দীর্ঘমেয়াদি উচ্চাকাঙ্ক্ষা এক গিগাওয়াট বা ১,০০০ মেগাওয়াটে পৌঁছানোর। প্রকল্পে ১ লাখ পর্যন্ত এনভিডিয়া গ্রাফিকস প্রসেসিং ইউনিট থাকতে পারে, যার মধ্যে থাকবে জিবি৩০০ ও ভেরা রুবিন প্রযুক্তি। সাধারণত জিপিইউ নামে পরিচিত এই প্রসেসরগুলো একসঙ্গে বহু হিসাব করতে পারে এবং উন্নত এআই প্রশিক্ষণ ও পরিচালনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রস্তাবিত ৩০০ মেগাওয়াট হবে প্রাথমিক ১২৫ মেগাওয়াটের ২.৪ গুণ। সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনার পরিসর এতে বোঝা যায়, যদিও বড় অঙ্কগুলো এখনো উন্নয়নলক্ষ্য।
ওয়াশিংটন ও বেইজিং কেন অংশীদার চাইছে
বিশ্বস্ত প্রযুক্তি অংশীদার ও নিরাপদ সরবরাহশৃঙ্খলকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ‘প্যাক্স সিলিকা’ সংগঠিত করছে। অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর সম্ভাব্য সুবিধার মধ্যে রয়েছে প্রযুক্তি সহযোগিতা জোরদার, উৎপাদনের সুযোগ এবং এআই অবকাঠামো সরবরাহকারী নেটওয়ার্কে স্থান পাওয়া।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর সতর্ক করেছে, সুপারইন্টেলিজেন্সের প্রতিদ্বন্দ্বী ধারণা এগিয়ে নেওয়া উদ্যোগে উল্লেখযোগ্যভাবে যুক্ত হলে ‘প্যাক্স সিলিকা’র বিশ্বস্ত অংশীদার হিসেবে কোনো দেশের অবস্থান ক্ষুণ্ন হতে পারে। সুপারইন্টেলিজেন্স বলতে এআইয়ের এমন একটি প্রস্তাবিত ভবিষ্যৎ রূপ বোঝায়, যা নানা ধরনের কাজে মানুষের চেয়ে বেশি সক্ষম হবে।
ওয়াশিংটনে চীনা দূতাবাসের বক্তব্য, দুই শক্তির উচিত নিজ নিজ এআই সক্ষমতা সহযোগিতামূলকভাবে কাজে লাগানো এবং বড় শক্তির বাইরেও প্রযুক্তিটির প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা। উন্নত এআই চিপ এবং সেগুলো তৈরির সরঞ্জামে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশাধিকার-সংক্রান্ত বিধিনিষেধের মুখে বেইজিংও অংশীদার খুঁজছে।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের জন এল. থর্নটন চায়না সেন্টারের গবেষক কাইল চ্যানের মতে, দুই পক্ষের কূটনৈতিক অবস্থানের সূচনা আলাদা। ওয়াশিংটনের শক্তিশালী মিত্রজোট আগে থেকেই রয়েছে, আর বেইজিং বিকল্প একটি জোটে দেশগুলোকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছে। তাই উভয় পক্ষের সঙ্গে কাজ করতে সক্ষম দেশগুলোর দর-কষাকষির ক্ষমতা রয়েছে।
কাজাখস্তানের কৌশলের সংক্ষিপ্ত সময়রেখা
কাজাখস্তানের পদক্ষেপে কূটনৈতিক সদস্যপদ, বিনিয়োগ চুক্তি এবং বিদেশে কম্পিউটিং পরিষেবা বিক্রির পরিকল্পনা একত্র হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো কয়েকটি তারিখজুড়ে বিস্তৃত:
- ২০২৫: স্থানীয় কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, কাজাখস্তানে চীনের প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ রেকর্ড ২.৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়।
- জুন: কাজাখস্তান ‘প্যাক্স সিলিকা’য় যোগ দেওয়ার সময় মাদিয়েভ ওয়াশিংটন সফর করেন।
- ১৫ জুন, ২০২৬: আস্তানায় প্রস্তাবিত এআই অবকাঠামো প্রকল্পের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
- ওয়াশিংটন সফরের তিন সপ্তাহ পর: চীনের এআই সংস্থার স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে যোগ দিতে মাদিয়েভ সাংহাই যান।
- ২০২৭: ‘ডেটা সেন্টার ভ্যালি’র প্রথম ১২৫ মেগাওয়াটের বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করার লক্ষ্য রয়েছে। একই সময়ে কাজাখস্তানের কম্পিউটিং সেবা রপ্তানি শুরুর পরিকল্পনাও রয়েছে।
কর্মকর্তারা বছরে ৩ বিলিয়ন ডলারের কম্পিউটিং সেবা রপ্তানির লক্ষ্য নিয়েছেন। বাস্তবে এর অর্থ, বিদেশি গ্রাহকেরা প্রয়োজনীয় সব সরঞ্জাম নিজেরা স্থাপন না করে কাজাখস্তানে থাকা প্রসেসর ব্যবহারের জন্য অর্থ দেবেন। কাজাখটেলিকমের প্রধান বাগদাত মুসিন ২০২৭ সালকে সম্ভাব্য শুরুর সময় হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভিস সেন্টার ফর রাশিয়ান অ্যান্ড ইউরেশিয়ান স্টাডিজের সঙ্গে যুক্ত স্বাধীন গবেষক ও সাবেক কাজাখ কূটনীতিক দানা মাসালিমোভার মতে, দুই শক্তির মধ্যে একটিকে বেছে নেওয়ার বদলে দেশটি নিজের ঝুঁকি ছড়িয়ে দিচ্ছে। তবে তিনি দেশটির অবস্থানকে ঝুঁকিপূর্ণ ও অত্যন্ত অনিশ্চিত বলেও বর্ণনা করেছেন।
কাজাখস্তানে বিদ্যুৎ ও খনিজ সম্পদ রয়েছে, যা দেশটিকে প্রযুক্তি বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। চ্যালেঞ্জ হলো, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের উভয় অংশীদারত্বে প্রবেশাধিকার বজায় রেখে এসব সুবিধাকে টেকসই আয় ও কার্যকর দেশীয় পরিষেবায় রূপ দেওয়া।
চলাফেরার সুযোগ খুঁজছে ইন্দোনেশিয়া ও সিঙ্গাপুর
চীনের এআই উদ্যোগে যোগ দিয়েও ইন্দোনেশিয়া মার্কিন প্রযুক্তি অংশীদারত্বের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। নিকেল ও তামার সম্পদ দেশটিকে প্রযুক্তি সরবরাহশৃঙ্খলের জন্য প্রাসঙ্গিক সুবিধা দিয়েছে। তবে উন্নত এআইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় চিপ, সফটওয়্যার ও দক্ষতা শুধু খনিজ সম্পদ দিয়ে পাওয়া সম্ভব নয়।
হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিজনেস স্কুলের অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের ভাইস চেয়ার মারি পাঙ্গেস্তু দেশটির পছন্দের কথা ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, ইন্দোনেশিয়া দুই শক্তির কাছ থেকেই সুবিধা পেতে চায়:
সহজভাবে বললে, আমাদের উভয় পক্ষের সঙ্গেই যুক্ত থাকতে এবং ব্যবস্থার জন্য যেটি সবচেয়ে ভালো, সেটি বেছে নিতে পারা উচিত।
মার্কিন কোম্পানিগুলো সিঙ্গাপুরে তাদের উপস্থিতি বাড়ালেও দেশটি চীনের এআই সংস্থায় যোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে। অ্যানথ্রপিক নগররাষ্ট্রটিতে এশিয়ার নতুন কার্যালয় স্থাপন করছে, যা দেশটির প্রযুক্তি খাতে আরেকটি মার্কিন এআই ব্যবসা যুক্ত করবে।
ইন্দোনেশিয়া ও সিঙ্গাপুরের দর-কষাকষির ক্ষমতার উৎস আলাদা। ইন্দোনেশিয়ার রয়েছে সম্পদ ও বড় বাজার। সিঙ্গাপুর আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি কার্যক্রমের জন্য প্রতিষ্ঠিত একটি কেন্দ্র। উভয় দেশই প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ধরে রাখার চেষ্টা করছে, পুরো এআই কৌশলকে কোনো এক সরবরাহকারী দেশের ওপর নির্ভরশীল করছে না।
মার্কিন চিপ ও চীনা মডেলের সমন্বয় করছে সৌদি আরব
সৌদি আরব উন্নত এনভিডিয়া কম্পিউটিং অবকাঠামো নেওয়ার পাশাপাশি চীনা ওপেন মডেলভিত্তিক প্রযুক্তিও গ্রহণ করছে। সৌদি এআই স্টার্টআপ হুমেইন সেপ্টেম্বরে এসব মডেল ব্যবহার করে একটি প্ল্যাটফর্ম চালু করেছে।
হার্ডওয়্যার ও মডেলের কাজ আলাদা। চিপ হিসাব-নিকাশ করে, আর এআই মডেল হলো প্রশিক্ষিত সফটওয়্যার, যা সেই হিসাব ব্যবহার করে উত্তর তৈরি, তথ্য বিশ্লেষণ বা অন্যান্য কাজ করে। তাই কোনো দেশ মার্কিন প্রসেসর কিনে তাতে অন্য কোথাও তৈরি সফটওয়্যার চালাতে পারে।
ওপেন মডেলে প্রশিক্ষিত ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলো ব্যবহারকারীদের কাছে উন্মুক্ত থাকে, যাতে লাইসেন্সের শর্ত মেনে তারা নিজেরা সেগুলো চালাতে বা নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন করতে পারেন। এতে সরকার ও কোম্পানিগুলো স্থাপনার ওপর বেশি নিয়ন্ত্রণ পেতে পারে এবং সম্পূর্ণভাবে বিদেশি সরবরাহকারীর পরিচালিত পরিষেবার ওপর নির্ভরতা কমাতে পারে।
সৌদি আরবের পদ্ধতি ব্যাখ্যা করে, কেন উদীয়মান জোটগুলোকে স্পষ্টভাবে আলাদা করা কঠিন। সরকারগুলো কোনো এক দেশের হার্ডওয়্যার, অন্য দেশের মডেল এবং নিজেদের ডেটা সেন্টার বেছে নিতে পারে। কূটনৈতিক চাপ এমন এক সমন্বয়ে জটিলতা তৈরি করতে পারে, যা বাণিজ্যিকভাবে যুক্তিযুক্ত।
ইউরোপ ও জাপানের সীমাবদ্ধতা ভিন্ন
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বাইরের সবচেয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী এআই ডেভেলপারদের একটি মিস্ত্রালের মাধ্যমে ফ্রান্স প্রযুক্তিগত স্বাধীনতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। দেশের ভেতরে মডেল তৈরির সক্ষমতা ফ্রান্সকে এমন একটি বিকল্প দিয়েছে, যা অনেক সরকারের নেই।
ব্রিটেন ও জার্মানির বড় অর্থনীতি এবং উল্লেখযোগ্য সামরিক সক্ষমতা রয়েছে। তবে কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের গবেষক আন্তন লেইখট ও স্যাম উইন্টার-লেভির মতে, দেশ দুটির তুলনীয় ক্ষমতাসম্পন্ন দেশীয় ফ্রন্টিয়ার মডেল নেই। ফ্রন্টিয়ার মডেল হলো এআই সক্ষমতার সর্বাধুনিক পর্যায়ে থাকা ব্যবস্থা।
গবেষকদের যুক্তি, ডেটা সেন্টারে প্রবেশাধিকার ও চিপ চুক্তি নিশ্চিত করতে মার্কিন অংশীদারত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এ ধরনের দেশের জন্য ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের সিদ্ধান্ত উন্নত ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার নির্ধারণ করে দিতে পারে, যদিও সেই সিদ্ধান্তে তাদের নিজস্ব সরকারের প্রভাব সীমিত।
কৌশলগত ও নিরাপত্তা বিষয়ে, যার মধ্যে উন্নত সেমিকন্ডাক্টর, বিশ্বস্ত এআই ও মানদণ্ড রয়েছে, জাপান ওয়াশিংটনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত রয়েছে। তবু কিয়োটো ইউনিভার্সিটি অব ফরেন স্টাডিজের অধ্যাপক তাকাহিরো সুচিয়ার ধারণা, কম ঝুঁকির কাজে সাশ্রয়ী চীনা মডেল ব্যবহারের সুযোগ থাকবে।
দেশীয় মডেল তৈরি করে ফ্রান্স এবং বেছে বেছে বিদেশি প্রযুক্তি ব্যবহার করে জাপান—স্বায়ত্তশাসন বাড়ানোর দুটি ভিন্ন পথ অনুসরণ করছে। তবে উভয় দেশই এমন এক শিল্পব্যবস্থার মধ্যে কাজ করছে, যেখানে সবচেয়ে উন্নত কম্পিউটিং সম্পদ ও এআই ব্যবস্থা অল্প কয়েকটি কোম্পানি ও দেশের হাতে কেন্দ্রীভূত।
অর্থায়নের মাধ্যমে প্রভাব বাড়াচ্ছে চীন
মডেল বিক্রি বা উন্মুক্ত করার বাইরেও আন্তর্জাতিক এআই ক্ষেত্রে চীনের ভূমিকা বিস্তৃত। ভার্জিনিয়ার উইলিয়াম অ্যান্ড মেরি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগার এইডডেটার গবেষণায় দেখা গেছে, অন্তত ৭৭টি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে এআই ব্যবহার বা প্রসারে সহায়ক প্রকল্প ও কার্যক্রমে চীনা সরকারের অনুদান ও ঋণ রয়েছে।
গবেষণায় চিহ্নিত বড় প্রাপক দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে নাইজেরিয়া, জাম্বিয়া, ঘানা, বাংলাদেশ, সেনেগাল, ক্যামেরুন ও কেনিয়া। অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তা এআই ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও দক্ষতা তৈরির আরেকটি পথ দেয় দেশগুলোকে।
ওডিআই গ্লোবালের গবেষক আলবার্তো লেমার যুক্তি, মডেলের ক্ষেত্রে চীনের উন্মুক্ত পদ্ধতি দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমাতে সহায়তা করতে পারে। কম্পিউটিং পরিষেবার জন্য সীমিত বাজেট থাকা সরকার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কাছে সাশ্রয়ী সফটওয়্যার বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের গবেষণাতেও দেখা গেছে, মধ্যম আয়ের দেশগুলোর মানুষের মধ্যে এআই ও এর নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে চীন সম্পর্কে ইতিবাচক মনোভাব বেশি। প্রযুক্তি অংশীদার বেছে নেওয়ার সময় সরকারগুলো যে পরিবেশে সিদ্ধান্ত নেয়, জনমতও তার অংশ।
সবচেয়ে উন্নত এআই ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের এগিয়ে থাকা অব্যাহত রয়েছে, আর চীন চিপ উৎপাদন ও এআই সক্ষমতার ব্যবধান কমানোর চেষ্টা করছে। চীনা অর্থায়ন বা সফটওয়্যার বেছে নেওয়া দেশগুলোরও সবচেয়ে চাহিদাসম্পন্ন কম্পিউটিং প্রয়োজনের জন্য মার্কিন প্রযুক্তি খোঁজার কারণ রয়েছে।
এআই চুক্তি কীভাবে কার্যকর পরিষেবায় রূপ নেয়?
কাজাখস্তানের অভ্যন্তরীণ পরিকল্পনা দেখায়, সরকারগুলো কেন আন্তর্জাতিক সংস্থার সদস্যপদের চেয়েও বেশি কিছু চায়। উপপ্রধানমন্ত্রী এবং এআই ও ডিজিটাল উন্নয়নমন্ত্রী মাদিয়েভ বলেছেন, জ্বালানি ও চিপ অবকাঠামো থেকে শুরু করে ভাষার মডেল ও অ্যাপ্লিকেশন পর্যন্ত এআই কার্যক্রমের পাঁচটি স্তর গড়ে তোলার পরিকল্পনা দেশটির রয়েছে।
মাদিয়েভ বৈশ্বিক এআই অর্থনীতির সম্ভাব্য আকার ৫০ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি বলে উল্লেখ করেছেন। এটি বর্তমান আয় নয়, বরং সম্ভাবনার একটি হিসাব। ব্যবসা আরও দক্ষভাবে পরিচালনা এবং মানুষের দৈনন্দিন কাজ সম্পন্ন করতে সহায়ক ব্যবহারিক অ্যাপ্লিকেশনে তিনি বিশেষ সম্ভাবনা দেখছেন।
ফ্রিডম হোল্ডিংয়ের প্রধান তৈমুর তুরলভ বলেছেন, তার কোম্পানি এনভিডিয়ার সঙ্গে ডেটা সেন্টার অংশীদারত্ব এবং তাদের সুপারঅ্যাপে একটি এআই সহকারী চালুর পরিকল্পনা করছে। প্রস্তাবিত সহকারী বিনিয়োগ ও বিমা থেকে শুরু করে কেনাকাটা, হোটেল ও ফ্লাইট—বিভিন্ন পরিষেবা ব্যবহারে গ্রাহকদের সহায়তা করবে। কোম্পানিটি ইতিমধ্যে প্রশাসন, প্রতিবেদন তৈরি ও প্রক্রিয়া পরিচালনায় এআই ব্যবহার করছে।
‘এআই অ্যান্ড ডিজিটাল ব্রিজ ২০২৬’ সম্মেলনে সোফরেহ ক্যাপিটালের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী শেরভিন পিশেভারও কাজাখস্তানে কার্যালয় খোলা এবং বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। কাজাখস্তানের ন্যাশনাল ইনফরমেশন টেকনোলজিস কোম্পানি এবং জর্জিয়ার ডিজিটাল গভর্ন্যান্স এজেন্সি ডিজিটাল সরকার, সরকারি পরিষেবা ও সম্ভাব্য যৌথ প্রযুক্তি প্রকল্পে সহযোগিতার একটি সমঝোতা স্মারক সই করেছে।
বিনিয়োগকারীদের তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত হলো, প্রসেসর, বিদ্যুৎ, ক্লাউড কম্পিউটিং ও ডেটা সেন্টারে অর্থ কোথায় যাবে। কাজাখস্তানের প্রকল্প দেখায়, শর্তগুলো কেন গুরুত্বপূর্ণ: বাধ্যতামূলক চুক্তি, অর্থায়ন পরিকল্পনা এবং চালু স্থাপনা উন্নয়নের ভিন্ন ভিন্ন পর্যায়। ফায়ারবার্ড জানিয়েছে, তাদের আর্মেনীয় এআই কারখানা প্রায় ছয় মাসে নির্মিত হয়েছে এবং জুলাইয়ে চালু হওয়ার কথা ছিল। নির্মাণ পরিকল্পনার তুলনার জন্য এটি একটি উদাহরণ।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের ওয়াধওয়ানি এআই সেন্টারের পরিচালক আলোক মেহতার মতে, এআই সার্বভৌমত্ব অর্জনের চেষ্টা করতে গিয়ে দেশগুলো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রযুক্তিব্যবস্থার শক্তি ও দুর্বলতা বিবেচনা করছে। দৈনন্দিন অর্থে, একটি দেশ গ্রহণ করতে পারে এমন শর্তে জরুরি পরিষেবা সচল রাখতে অবকাঠামো, সফটওয়্যার ও প্রবেশাধিকারের ওপর যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণ থাকা এর অর্থ।
কাজাখস্তানের পরবর্তী সুনির্দিষ্ট মাইলফলক হলো ২০২৭ সালে পরিকল্পিত বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু। বিদ্যুৎসংযুক্ত স্থাপনা চালু করা, চিপ সংগ্রহ এবং অর্থ দিয়ে পরিষেবা নেবে এমন গ্রাহক আকৃষ্ট করার ওপর নির্ভর করবে কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার কতটা কার্যকর শিল্পে রূপ নেয়।
মূল বিষয়গুলো
- কাজাখস্তান যুক্তরাষ্ট্রের ‘প্যাক্স সিলিকা’ অংশীদারত্বে যোগ দেওয়ার তিন সপ্তাহ পর চীনের এআই সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হয়।
- দেশটির এআই অবকাঠামো চুক্তিতে ১০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বিনিয়োগ আসতে পারে; প্রথম পর্যায়ের মূল্য প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার।
- একিবাস্তুজে ১২৫ মেগাওয়াটের স্থাপনাটি ২০২৭ সালে বাণিজ্যিকভাবে চালুর লক্ষ্য রয়েছে।
- প্রতিদ্বন্দ্বী এআই উদ্যোগে উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ বিশ্বস্ত অংশীদার হিসেবে মর্যাদায় প্রভাব ফেলতে পারে বলে ওয়াশিংটন সতর্ক করেছে।
- ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর ও সৌদি আরব মার্কিন ও চীনা প্রযুক্তির অংশীদারত্বের সমন্বয় করছে।
- এইডডেটার তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ৭৭টি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে এআই কার্যক্রমে সহায়তা করছে চীনা অনুদান ও ঋণ।
- অর্থায়ন, বিদ্যুৎ, উন্নত চিপ ও ব্যবহারযোগ্য সফটওয়্যারের প্রবেশাধিকার নির্ধারণ করবে দেশগুলো কতটা স্বাধীনতা অর্জন করতে পারবে।






