৪০% দরপতনে চীনের প্রযুক্তি উচ্চাকাঙ্ক্ষা চাপে
চার মাসেরও কম সময়ে চীনের STAR50 সূচক প্রায় ৪০% কমেছে। এতে বাজারমূল্য থেকে প্রায় ৪৮০ বিলিয়ন ডলার উধাও হয়েছে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে উৎসাহের সঙ্গে কোম্পানিগুলোর অর্জিত মুনাফার ব্যবধান আরও স্পষ্ট হয়েছে। ২০২৬ সালের ২৬ ও ২৭ অক্টোবরের তারিখে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে উঠে আসা এ পরিসংখ্যান প্রায় দুই বছর ধরে চলা দরবৃদ্ধির পর তীব্র বিপর্যয়ের চিত্র তুলে ধরে।
সূচিপত্র
- ৪০% দরপতনে চীনের প্রযুক্তি উচ্চাকাঙ্ক্ষা চাপে
- কেন পুরো বাজারজুড়ে ক্ষতি ছড়িয়েছে
- জনপ্রিয় তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ারে বড় পতন
- দর কমলেও মূল্যায়ন এখনো উচ্চ
- এআই সেবায় মূল্যছাড়, চিপের খরচ বাড়ছে
- রোবট ও রপ্তানির সুযোগের আলাদা পরীক্ষা
- তহবিলের সংকটে বেইজিংয়ের বাজার সংস্কার
- দরপতনের পেছনের ঘটনাক্রম
- আঞ্চলিক ঝুঁকি বাড়লেও কিছু বিনিয়োগকারী বাজারে রয়েছেন
- মূল কথা
একটি প্রতিবেদনে জুলাইয়ের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে দরপতন হিসাব করা হয়েছে; অন্যটিতে জুন থেকে। চীনের বড় কোম্পানিগুলোর শেয়ারের গতিবিধি অনুসরণকারী বিস্তৃত CSI300 সূচক জুনের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে প্রায় ২০% কমেছে। হিসাব অনুযায়ী, মে মাস থেকে চীনের শেয়ারবাজারে মোট ক্ষতির পরিমাণ ২.৪ ট্রিলিয়ন ডলার, যা STAR50-সংশ্লিষ্ট ক্ষতির চেয়ে অনেক বিস্তৃত পরিমাপ।
চাপ শুধু শেয়ারের দরে সীমাবদ্ধ নয়। শেয়ার বিক্রির প্রস্তুতি নেওয়া কোম্পানিগুলো বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে দুর্বল সাড়া পাচ্ছে, প্রযুক্তি খাতে উত্থানের সময় বিনিয়োগ করা পরিবারগুলো এখন লোকসানের মুখে, আর সঞ্চয়কে দেশীয় উদ্ভাবনে কাজে লাগানোর বেইজিংয়ের প্রচেষ্টা আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
দরপতনের পরও STAR50-এর শেয়ারগুলো গত ১২ মাসের আয়ের প্রায় ১০০ গুণ দরে লেনদেন হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের Nasdaq 100-এর ক্ষেত্রে এ অনুপাত প্রায় ৩০ গুণ। চীনা প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর চাহিদা, রপ্তানির সুযোগ এবং মুনাফা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও বিনিয়োগকারীরা এখনো সেগুলোর জন্য বড় অঙ্কের বাড়তি দাম দিচ্ছেন।
দরপতনের কোনো একক কারণ চিহ্নিত করা যায়নি। ব্যবসায়ীরা উচ্চ মূল্যায়ন, করের দায় এবং যুক্তরাষ্ট্রের ডেটা সেন্টারে চীনা সরঞ্জাম ব্যবহারে ওয়াশিংটন বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে—এমন উদ্বেগের কথা বলেছেন। এসব চাপ মিলেই ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি নিয়ে বিতর্ককে ব্যবসার আয়ের তাৎক্ষণিক পরীক্ষায় পরিণত করেছে।
কেন পুরো বাজারজুড়ে ক্ষতি ছড়িয়েছে
গোল্ডম্যান স্যাকসের হিসাব, এআই-সংশ্লিষ্ট শেয়ারগুলো চীনের মূল ভূখণ্ডের এ-শেয়ার এবং হংকংয়ের এইচ-শেয়ারের সম্মিলিত বাজারমূল্যের ৪২% এবং লেনদেনমূল্যের ৫৭%। এ-শেয়ার মূল ভূখণ্ডের এক্সচেঞ্জে লেনদেন হয়, আর এইচ-শেয়ার হলো মূল ভূখণ্ডের কোম্পানিগুলোর হংকংয়ে তালিকাভুক্ত শেয়ার।
এই পরিসংখ্যান দেখায়, বিনিয়োগ কতটা কেন্দ্রীভূত হয়েছে। ওই বাজারে প্রতি ১০ ডলারের বাজারমূল্যের মধ্যে ৪ ডলারের বেশি এআই-সংশ্লিষ্ট কোম্পানির, আর হাতবদল হওয়া অর্থের অর্ধেকেরও বেশি যাচ্ছে এসব শেয়ারে। ফলে এই গোষ্ঠীর বড় দরপতনের প্রভাব বিশেষায়িত প্রযুক্তি তহবিলের বাইরের বিনিয়োগকারীদের ওপরও পড়ে।
চীনের শেয়ারবাজারে ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীর সংখ্যা অনেক। হাইনানের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারী চেন ওয়েনশেং দরবৃদ্ধির সময় বিনিয়োগে যোগ দিয়েছিলেন, আংশিকভাবে এই বিশ্বাস থেকে যে ইউনিট্রির মতো রোবট নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারি সমর্থন পায়। এখন তিনি ও তাঁর বন্ধুরা লোকসানের মুখে পড়েছেন।
বেইজিংভিত্তিক তহবিল ব্যবস্থাপক দং বাওঝেন আগের উত্থানকে জল্পনানির্ভর জোয়ার বলে বর্ণনা করেছেন, যা এখন উল্টে গেছে:
পরে শেয়ারবাজার জল্পনানির্ভর উন্মত্ত ঊর্ধ্বমুখী বাজারে পরিণত হয়েছিল। আর এখন আমরা বুদ্বুদ ফেটে যেতে দেখছি।
যুক্তরাষ্ট্রের Nasdaq Composite তিন সপ্তাহ আগে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছানোর পর থেকে প্রায় ৬% কমেছে। চীনের STAR50-এর ৪০% পতন দীর্ঘতর সময়ের হিসাব, তবে এই পরিসংখ্যান চীনা প্রযুক্তি খাতের বিনিয়োগকারীদের সামনে থাকা অনেক গভীর দরপতনের চিত্র তুলে ধরে।
জনপ্রিয় তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ারে বড় পতন
আগস্টে লেনদেন শুরুর পর ইউনিট্রির শেয়ারের দর প্রায় অর্ধেক কমেছে। প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওর সময় ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীরা তাঁদের জন্য বরাদ্দ শেয়ারের তুলনায় প্রায় ৮,০০০ গুণ বেশি শেয়ার কেনার আবেদন করেছিলেন। আইপিও হলো কোনো কোম্পানির শেয়ার জনসাধারণের কাছে প্রথমবার বিক্রি করা।
অস্বাভাবিক চাহিদার পর এসেছে বড় দরপতন। মেমোরি চিপ নির্মাতা সিএক্সএমটির শেয়ারের দর আগের মাসে ২৫%-এর বেশি কমেছে। চিপ নির্মাতা মেটাএক্স ইন্টিগ্রেটেড সার্কিটস ও মুর থ্রেডস টেকনোলজির শেয়ারের দর জুলাই থেকে প্রতিটিরই প্রায় অর্ধেক কমেছে।
২০২৫ সালে প্রথম লেনদেনের দিন মেটাএক্স ও মুর থ্রেডসের শেয়ারের দর যথাক্রমে প্রায় ৭০০% ও ৪০০% বেড়েছিল। এ ধরনের উল্লম্ফনে এমন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল যে নতুন প্রযুক্তি কোম্পানির শেয়ার খুব অল্প সময়ে অসাধারণ মুনাফা এনে দিতে পারে।
অপটিক্যাল যোগাযোগের যন্ত্রাংশ নির্মাতা ঝংজি ইনোলাইট ও ইঅপটোলিংক টেকনোলজির শেয়ারের দর জুন ও জুলাইয়ের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে প্রায় ৬০% কমেছে। এআই কম্পিউটিংয়ের অবকাঠামোতে তথ্য আদান-প্রদানে তাদের পণ্য ব্যবহৃত হয়। তাই বিদেশি ডেটা সেন্টারের গ্রাহকদের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ একটি বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে।
দর কমলেও মূল্যায়ন এখনো উচ্চ
STAR50-এর মূল্য-আয় অনুপাত প্রায় ২৫০ থেকে কমে প্রায় ১০০ হয়েছে। এই অনুপাতে শেয়ারের দরের সঙ্গে কোম্পানিগুলোর গত বছরের আয়ের তুলনা করা হয়। আয়ের ১০০ গুণ দরে লেনদেন হলে, সূচকে প্রতিফলিত বার্ষিক আয়ের প্রতি ১ ডলারের জন্য বিনিয়োগকারীরা প্রায় ১০০ ডলার দিচ্ছেন।
Nasdaq 100-এর মূল্য-আয় অনুপাত প্রায় ৩০। এই হিসাবে STAR50-এর অনুপাত এখনো প্রায় ৩.৩ গুণ বেশি। দুই সূচকে ভিন্ন ধরনের ব্যবসা রয়েছে, তবে বড় দরপতনের পরও বিনিয়োগকারীরা কেন শেয়ারের দাম নিয়ে উদ্বিগ্ন, এই তুলনা তা বুঝতে সাহায্য করে।
উচ্চ অনুপাতে মূল্যায়িত কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে সাধারণত ভবিষ্যৎ মুনাফায় জোরালো প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা থাকে। বিক্রি প্রত্যাশার চেয়ে ধীরে বাড়লে, খরচ বেড়ে গেলে বা প্রতিযোগিতায় মুনাফার হার কমে গেলে বিনিয়োগকারীরা আয়ের প্রতি ডলারের জন্য কম দাম দিতে রাজি হতে পারেন।
ইউরেশিয়া গ্রুপের চীনবিষয়ক পরিচালক ড্যান ওয়াং উদ্বেগের কারণ হিসেবে দুর্বল অভ্যন্তরীণ চাহিদা, হতাশাজনক মুনাফার হার এবং যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হারের চাপের কথা বলেছেন। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোও উদ্বিগ্ন, কারণ রাষ্ট্রের সহায়তায় করা বিনিয়োগ পর্যাপ্ত বাণিজ্যিক চাহিদায় রূপ নেবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
চীনা ভোক্তাদের ব্যয় করতে অনীহা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ব্যবসার জন্য বিনিয়োগের অর্থের পাশাপাশি অর্থ পরিশোধে আগ্রহী গ্রাহকও প্রয়োজন। উন্নত চিপ, এআই ব্যবস্থা বা রোবট তৈরি উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে পারে; কিন্তু টেকসই মুনাফার জন্য এমন গ্রাহক দরকার, যারা উন্নয়ন ও পরিচালন ব্যয় মেটানোর মতো অর্থ দিতে প্রস্তুত।
এআই সেবায় মূল্যছাড়, চিপের খরচ বাড়ছে
এআই সেবায় মূল্য প্রতিযোগিতা ২০২৪ সালের মে মাসেই স্পষ্ট হয়েছিল। আলিবাবা তাদের কিছু টংই কিয়েন মডেলের দাম ৯৭% পর্যন্ত কমায়। বাইদু ব্যবসায়িক ব্যবহারকারীদের জন্য আর্নি স্পিড ও আর্নি লাইট বিনা মূল্যে দেয়, আর বাইটড্যান্স তাদের প্রধান দৌবাও মডেলের দাম শিল্পের গড়ের তুলনায় ৯৯.৩% কম রাখে।
এসব মডেলই বহু জেনারেটিভ এআই পণ্যের পেছনের সফটওয়্যার ব্যবস্থা। নিজস্ব ব্যবস্থা তৈরি না করেও প্রতিষ্ঠানগুলো ক্লাউড সেবার মাধ্যমে এগুলো ব্যবহারের জন্য অর্থ দিতে পারে। ব্যবহারের দাম কমলে গ্রাহক আকৃষ্ট হতে পারে, তবে প্রতিবার ব্যবহারের বিপরীতে সরবরাহকারীদের আয় কমে যায়।
সম্প্রতি হার্ডওয়্যারের ক্ষেত্রে উল্টো চাপ দেখা দিয়েছে। ২০২৬ সালের ১০ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী হুয়াওয়ের অ্যাসেন্ড ৯৫০ডিটি অ্যাক্সিলারেটর কার্ডের নির্দেশিত দাম দুই মাস আগের দরপ্রস্তাবের তুলনায় ২০% থেকে ৫০% বেড়েছে। ক্যামব্রিকনের পরিকল্পিত পরবর্তী প্রজন্মের প্রসেসরের দাম নতুন করে ২০% থেকে ৩০% বাড়ানো হয়েছে। মেটাএক্স ও ইলুভাটার কোরএক্সের ক্ষেত্রেও একই ধরনের বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে।
উচ্চ ব্যান্ডউইথের মেমোরির ঘাটতি এসব দাম বাড়ার পেছনে ভূমিকা রেখেছে। এ ধরনের মেমোরিতে চিপগুলো উল্লম্বভাবে স্তূপ করে রাখা হয়, যাতে এআই প্রসেসর দ্রুত বিপুল পরিমাণ তথ্য পেতে পারে। যন্ত্রাংশের দাম বাড়লে কম্পিউটিং ক্ষমতা সরবরাহের খরচ বাড়ে, অথচ গ্রাহকেরা এআই সেবার দাম কমানোর চেষ্টা করছেন।
সাংহাই ঝুওঝু ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজমেন্টের অংশীদার ওয়াং ঝুও সতর্ক করে বলেছেন, প্রতিযোগিতার চাপ শেষ পর্যন্ত চিপ নির্মাতা ও এআই সেবা সরবরাহকারীদের ওপরও পড়বে:
চীনের অন্য সব নির্মাতার মতো চিপ নির্মাতা ও এআই সেবা সরবরাহকারীরাও শেষ পর্যন্ত মূল্যযুদ্ধে জড়াবে। এর কোনো ব্যতিক্রম নেই। সব বুদ্বুদই অবশ্যম্ভাবীভাবে ফেটে যায়।
রোবট ও রপ্তানির সুযোগের আলাদা পরীক্ষা
অক্টোবরের প্রতিবেদনগুলোতে আলোচিত মাসে চীন ৬০ বিলিয়ন ইউয়ানের একটি রাষ্ট্র-সমর্থিত এআই বিনিয়োগ তহবিল চালু করেছে। বাজারে দরপতন সত্ত্বেও দেশীয় প্রযুক্তি উন্নয়নে বেইজিংয়ের অব্যাহত অঙ্গীকারের প্রতিফলন এই তহবিল।
এই প্রচেষ্টায় রোবটিকস গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করেছে। এমবডিড এআই বলতে এমন যন্ত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুক্ত করাকে বোঝায়, যা হিউম্যানয়েড রোবটের মতো ভৌত জগতের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে। জনসংখ্যার বার্ধক্য ও কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমে আসার প্রেক্ষাপটে চীন এসব যন্ত্রের সম্ভাব্য ব্যবহার দেখছে।
এখন এ ধরনের যন্ত্রের চাহিদা মূলত সরকারি সংস্থা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে আসছে। অনেক পরিবারের ক্রেতার কাছে এখনো যন্ত্রগুলো অতিরিক্ত ব্যয়বহুল বা যথেষ্ট ব্যবহারিক নয়। এই ব্যবসা কত দ্রুত সাধারণ ভোক্তাদের কাছে পৌঁছাতে পারে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ড্যান ওয়াং:
মনে হচ্ছে না, এমবডিড ইন্টেলিজেন্স গণবাজারে মুনাফা এনে দিতে পারবে।
বিদেশে বিক্রির ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক ঝুঁকি রয়েছে। চীনা হিউম্যানয়েড রোবটের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের বিধিনিষেধ মার্কিন গ্রাহকদের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। অন্যদিকে, ডেটা সেন্টারে ব্যবহৃত চীনা যন্ত্রাংশে সম্ভাব্য বিধিনিষেধ অপটিক্যাল সরঞ্জাম সরবরাহকারীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
ডেটা সেন্টারের যন্ত্রাংশে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন বিধিনিষেধের সময়সীমা ও পরিধি এখনো অনিশ্চিত। দেশে দুর্বল চাহিদার সঙ্গে লড়াইরত কোম্পানিগুলোর জন্য রপ্তানির সুযোগ হারানোর আশঙ্কা বিনিয়োগকারীদের মুনাফার পূর্বাভাস নতুন করে ভাবার আরেকটি কারণ।
তহবিলের সংকটে বেইজিংয়ের বাজার সংস্কার
বারবার উত্থান-পতনের বদলে স্থিতিশীল দরবৃদ্ধি আনতে চীনা কর্তৃপক্ষ নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। শেয়ার কেনার জন্য ঋণ নেওয়া এবং উচ্চ গতির লেনদেনের ওপর নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা হয়েছে। উচ্চ গতির লেনদেনে কম্পিউটার খুব দ্রুত বিপুল সংখ্যক ক্রয়-বিক্রয়ের আদেশ দেয়। দরবৃদ্ধির সময় অতিরিক্ত উত্থান ঠেকাতে রাষ্ট্র-সমর্থিত বিনিয়োগকারীরাও শেয়ার বিক্রি করেছেন।
চায়না সিকিউরিটিজ রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান উ ছিং মাসের শুরুর দিকে পুঁজিবাজারের উন্নয়নে প্রস্তাব শুনতে বাজারসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৃহত্তর নীতিগত লক্ষ্য হলো শেয়ারে বিনিয়োগকে আরও নির্ভরযোগ্য করা এবং প্রযুক্তির উন্নয়নে সহায়তাকারী ব্যবসায় পুঁজি প্রবাহিত করা।
বেইজিংভিত্তিক চিয়ানচুয়াং ক্যাপিটালের অংশীদার লিও ওয়াং বলেন, প্রধান সূচকগুলোতে প্রযুক্তি কোম্পানির ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব অন্য খাত থেকে অর্থ সরিয়ে নিয়েছে এবং পছন্দের খাতগুলোতে অতি উচ্চ মূল্যায়নে উৎসাহ জুগিয়েছে।
দরপতনের ফলে এখন তহবিল সংগ্রহের পরবর্তী ধাপ জটিল হয়ে পড়েছে। একই পরিমাণ অর্থ তুলতে তালিকাভুক্ত কোনো কোম্পানিকে আরও বেশি শেয়ার বিক্রি করতে হতে পারে। আইপিওর প্রস্তুতি নেওয়া ব্যবসাকে কম মূল্যায়ন মেনে নিতে অথবা পরিকল্পনা পিছিয়ে দিতে হতে পারে।
হংকংয়ের লোটাস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের ব্যবস্থাপনা অংশীদার ও প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা হং হাও সম্ভাব্য তালিকাভুক্তির অপেক্ষায় থাকা কোম্পানিগুলোর ওপর প্রভাবের কথা বলেছেন:
এখন যা ঘটছে, তাতে অনেক কোম্পানির তালিকাভুক্ত হওয়ার চেষ্টা থেমে যাবে।
চীন বিদেশি বিনিয়োগের ওপর বিধিনিষেধও কঠোর করেছে। এ-সংক্রান্ত আরও নিয়ম ১ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হওয়ার কথা। দেশীয় বিনিয়োগে উৎসাহ দেওয়ার প্রচেষ্টার পাশাপাশি এসব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তবে শেয়ারে লোকসানের মুখে পড়া পরিবারগুলো ক্রমেই তুলনামূলক নিরাপদ সম্পদের দিকে ঝুঁকছে।
দরপতনের পেছনের ঘটনাক্রম
বর্তমান বিক্রির চাপের আগে ছিল কয়েক ধাপের উচ্ছ্বাস, চড়া মূল্য নির্ধারণ ও খরচ বৃদ্ধি। ঘটনাগুলো ধারাবাহিকভাবে দেখলে বোঝা যায়, বিনিয়োগকারীরা এখন গ্রাহক চাহিদার পাশাপাশি এআই সরবরাহের ব্যয়ও খতিয়ে দেখছেন।
- ২১ মে, ২০২৪: আলিবাবা, বাইদু ও বাইটড্যান্সের মূল্যছাড় এআই মডেল সেবায় তীব্রতর প্রতিযোগিতার চিত্র তুলে ধরে।
- ২০২৫: শেয়ারবাজারে প্রথম লেনদেনের দিন মেটাএক্স ও মুর থ্রেডসের শেয়ারের দর যথাক্রমে প্রায় ৭০০% ও ৪০০% বাড়ে।
- জুন ও জুলাই, ২০২৬: প্রধান চীনা সূচক এবং কয়েকটি এআই সরবরাহকারী কোম্পানি সেই সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছায়, যেখান থেকে পরবর্তী দরপতন হিসাব করা হয়েছে।
- আগস্ট, ২০২৬: আইপিওতে ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীদের অসাধারণ চাহিদার পর ইউনিট্রির শেয়ারের লেনদেন শুরু হয়।
- ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬: এআই প্রসেসরের দাম বৃদ্ধির প্রতিবেদন মেমোরির ঘাটতির কারণে সৃষ্ট চাপের চিত্র তুলে ধরে।
- ২৬ ও ২৭ অক্টোবর, ২০২৬: বাজারসংক্রান্ত প্রতিবেদনে STAR50-এর প্রায় ৪০% দরপতন এবং প্রযুক্তি খাতের মূল্যায়ন নিয়ে বাড়তে থাকা উদ্বেগের কথা উঠে আসে।
- ১ ডিসেম্বর: বিদেশি বিনিয়োগে প্রভাব ফেলবে এমন আরও চীনা বিধিনিষেধ কার্যকর হওয়ার কথা।
যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর মুনাফার প্রতিবেদনও নিকটবর্তী সময়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ। অক্টোবরের বাজারসংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশের সপ্তাহে অ্যালফাবেট, মাইক্রোসফট, অ্যামাজন ও মেটা প্ল্যাটফর্মসের মুনাফার প্রতিবেদন প্রকাশ করার কথা ছিল। এআই অবকাঠামোর যন্ত্রপাতি বিক্রি করা সরবরাহকারীদের জন্য এসব কোম্পানির ব্যয়ের পূর্বাভাস গুরুত্বপূর্ণ।
আঞ্চলিক ঝুঁকি বাড়লেও কিছু বিনিয়োগকারী বাজারে রয়েছেন
এইচএসবিসির গবেষণায় দেখা গেছে, আগের তিন মাসে নিট বিক্রি সত্ত্বেও এশিয়াভিত্তিক তহবিলগুলো তাদের বেঞ্চমার্কে থাকা অনুপাতের তুলনায় চীনা শেয়ারের বেশি অংশ ধরে রেখেছে। বেঞ্চমার্ক হলো সেই সূচক, যার সঙ্গে কোনো তহবিলের বিনিয়োগ বণ্টন ও কার্যকারিতা তুলনা করা হয়।
গোল্ডম্যান স্যাকস চীনা এআই শেয়ার নিয়ে সংশোধিত সুপারিশের তালিকায় কয়েক ডজন কোম্পানির মধ্যে ইনোলাইট ও সিএক্সএমটির নাম রেখেছে। বিএনপি পারিবাস সিকিউরিটিজের কৌশলবিদ উইলিয়াম ব্র্যাটনও সতর্ক বিনিয়োগকারীদের জন্য বেছে বেছে কেনার সুযোগ দেখেছেন। তাঁদের অবস্থান থেকে বোঝা যায়, বাজারের দরপতনে বিভিন্ন কোম্পানি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মূল্যায়ন এক নয়।
ড্যান ওয়াং বলেন, এআই গবেষণা ও স্যাটেলাইট খাত নিয়ে আশাবাদ এখনো রয়েছে। সামরিক সংশ্লিষ্টতার কারণে রাষ্ট্রের ধারাবাহিক সহায়তা পাওয়ার প্রত্যাশায় স্যাটেলাইট খাত লাভবান হচ্ছে। একই সময়ে, মূল ভূখণ্ডের অনেক বিনিয়োগকারী অন্য খাতে ঝুঁকছেন অথবা আরও কম দামের অপেক্ষায় রয়েছেন।
এই সমন্বয় কীভাবে এগোয়, তাতে থাইল্যান্ডসহ এশিয়ার অন্যান্য অর্থনীতির স্বার্থ রয়েছে, কারণ আঞ্চলিক ইলেকট্রনিকস ও সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহব্যবস্থায় চীনের বড় ভূমিকা রয়েছে। চীনা কোম্পানিগুলো তহবিল সংগ্রহ বা উৎপাদন সক্ষমতা সম্প্রসারণ পিছিয়ে দিলে অন্য দেশের সরবরাহকারীরা বিনিয়োগ পরিকল্পনা ও ভবিষ্যৎ ক্রয়াদেশে পরিবর্তনের মুখে পড়তে পারেন।
নজরে রাখার মতো বাস্তব সূচক হলো কোম্পানির মুনাফা, গ্রাহকের ক্রয়াদেশ, মূলধনী ব্যয় এবং সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত। শেয়ারের দর কারখানা বা ক্রয়চুক্তির তুলনায় অনেক দ্রুত বদলাতে পারে। আঞ্চলিক সরবরাহকারীদের ওপর ব্যবসায়িক প্রভাব নির্ভর করবে আর্থিক চাপ এসব পরিচালনগত সিদ্ধান্তে পৌঁছায় কি না, তার ওপর।
মূল কথা
- STAR50 প্রায় ৪০% কমেছে, আর বাজারমূল্য থেকে প্রায় ৪৮০ বিলিয়ন ডলার উধাও হয়েছে।
- বিস্তৃত CSI300 সূচক জুনের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে প্রায় ২০% কমেছে।
- গোল্ডম্যান স্যাকসের হিসাব, এআই শেয়ারগুলো এ-শেয়ার ও এইচ-শেয়ারের সম্মিলিত বাজারমূল্যের ৪২% এবং লেনদেনমূল্যের ৫৭%।
- STAR50 এখনো গত ১২ মাসের আয়ের প্রায় ১০০ গুণ দরে লেনদেন হচ্ছে; Nasdaq 100-এর ক্ষেত্রে তা প্রায় ৩০ গুণ।
- দুর্বল চাহিদা, যন্ত্রাংশের উচ্চ দাম, সেবার মূল্যছাড় এবং যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য বিধিনিষেধ প্রত্যাশিত মুনাফায় চাপ সৃষ্টি করছে।
- কম মূল্যায়নের কারণে আইপিও পিছিয়ে যেতে পারে এবং প্রযুক্তি খাতের তহবিল সংগ্রহ কঠিন হতে পারে।
- কিছু বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান এখনো কেনার সুযোগ দেখছে, আর আঞ্চলিক সরবরাহকারীরা ক্রয়াদেশ ও মূলধনী ব্যয়ের দিকে নজর রাখছে।






