চলমান মুখোমুখি অবস্থানের কথা জানালেন সীমান্তরক্ষী বাহিনীর প্রধান
অরুণাচল প্রদেশের একাধিক স্থানে ভারতীয় ও চীনা সেনারা মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে বলে জানিয়েছেন ইন্দো-তিব্বত সীমান্ত পুলিশ (আইটিবিপি)-এর মহাপরিচালক শত্রুজিৎ কাপুর। ২০২৬ সালের ২২ অক্টোবর তাঁর এই বক্তব্য এমন এক সীমান্ত অঞ্চলের দিকে নতুন করে মনোযোগ আকর্ষণ করেছে, যেখানে বাসিন্দারা তাঁদের পূর্বপুরুষদের জমিতে প্রবেশাধিকার হারানোর অভিযোগ করেছেন।
সূচিপত্র
- চলমান মুখোমুখি অবস্থানের কথা জানালেন সীমান্তরক্ষী বাহিনীর প্রধান
- তাকসিং এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ
- স্পর্শকাতর এলাকাগুলোর অবস্থান
- ভারত ও চীনের পরস্পরবিরোধী ব্যাখ্যা
- গ্রীষ্ম ও শরৎজুড়ে আলোচনা অব্যাহত
- অরুণাচল কেন বিরোধপূর্ণ
- ড্রোন ও নতুন কৌশলে ঝুঁকছে আইটিবিপি
- রাজনৈতিক চাপ ও বৃহত্তর সম্পর্ক
- টহলের বাইরেও সীমান্তবাসীর চাপ
- মূল বিষয়গুলো
রাজস্থানের আলওয়ারে সেন্ট্রাল ট্রেনিং কলেজে বক্তব্য দেওয়ার সময় কাপুর নবগঠিত শৌর্য কমান্ডো দলগুলোর প্রশংসা করেন এবং প্রশিক্ষণ, সরঞ্জাম ও প্রতিরক্ষা অবকাঠামোতে পরিবর্তনের কথা তুলে ধরেন। আইটিবিপির সরাসরি সম্প্রচার করা হিমবীর সম্মান সমারোহে তাঁর বক্তব্য কয়েক মাসের স্থানীয় অভিযোগ এবং অনুপ্রবেশের সরকারি অস্বীকারের পর চলমান মুখোমুখি অবস্থানের বিষয়টি জনসমক্ষে আনে।
চীনের সঙ্গে ৩,৪৮৮ কিলোমিটার প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা পাহারা দেওয়া বাহিনীর প্রধান কাপুর সদস্যদের বলেন, সম্প্রতি কয়েকটি সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে এবং তা এখনো চলছে:
গত কয়েক দিনে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, যখন অরুণাচলের কয়েকটি স্থানে মুখোমুখি অবস্থান হয়। তা এখনো চলছে।
পরে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সীমান্তে মাঝেমধ্যে সৃষ্ট উত্তেজনার জন্য চীনা টহলের ধরনে পরিবর্তনকে দায়ী করে। চীন এই বর্ণনা প্রত্যাখ্যান করে জানায়, বিদ্যমান চুক্তি অনুযায়ী তাদের সেনারা স্বাভাবিক টহল দিচ্ছে।
প্রতিরক্ষা সূত্রগুলো স্পর্শকাতর এলাকাগুলোকে স্থিতিশীল ও নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে বর্ণনা করেছে; সেখানে কোনো সহিংস সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়নি। মুখোমুখি অবস্থান বলতে দুই পক্ষের সেনাদের পরস্পরের মুখোমুখি হওয়াকে বোঝায়। সাধারণত টহলের পথ মিলে গেলে বা এক পক্ষ অন্য পক্ষের উপস্থিতিকে চ্যালেঞ্জ করলে এমনটা ঘটে। কাছাকাছি এলাকায় সেনা মোতায়েন রেখেই কমান্ডাররা এ ধরনের পরিস্থিতি সামাল দিতে পারেন।
তাৎক্ষণিক উদ্বেগ শুধু এসব মুখোমুখি অবস্থানেই সীমাবদ্ধ নয়। তাকসিং এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, পশুচারণ, শিকার এবং বনজ সম্পদ সংগ্রহে ব্যবহৃত জমিতে প্রবেশ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এদিকে সীমান্ত এলাকায় নতুন কৌশলগত প্রশিক্ষণ, ড্রোন ইউনিট এবং শক্তিশালী ভূগর্ভস্থ অবস্থান তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছে আইটিবিপি।
তাকসিং এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ
তাকসিংভিত্তিক আদিবাসী সংগঠন নাহ ওয়েলফেয়ার সোসাইটি ২০২৬ সালের ২৬ জুন আপার সুবানসিরি জেলার উপকমিশনারকে লেখা এক চিঠিতে বিস্তারিত অভিযোগ জানায়। এতে আসাফিলা এলাকার ওইং, চুজার্তা এলাকার পানিয়ার, মারনাফের মারপান, পোরত্রাং হ্রদ এবং টিংডিংটাংকে চীনা দখলে থাকা স্থান হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
সংগঠনটি বলেছে, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যগত ব্যবহারের এলাকায় পিপলস লিবারেশন আর্মি সড়ক, সেতু ও সামরিক শিবির নির্মাণ করেছে। ২০২০ সাল থেকে পূর্বপুরুষদের জমি ধীরে ধীরে দখলের ঘটনা আরও বেড়েছে বলে উল্লেখ করে তারা দুঃখ প্রকাশ করেছে।
ভারতীয় সেনাবাহিনী অনুপ্রবেশের খবরকে "ভুল এবং ভিত্তিহীন" বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। চীনা সেনারা ভারতের ভূখণ্ডের ৫০ থেকে ৬০ কিলোমিটার ভেতরে অগ্রসর হয়েছে বলে দাবি করে ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরোর ফ্যাক্ট চেক ইউনিট জানায়, ভিডিওগুলোর সঙ্গে ভারত-চীন সীমান্তের কোনো সম্পর্ক নেই।
আরও কিছু বিবরণে বলা হয়েছে, ২৫ ও ২৬ জুলাই তাকসিং সার্কেলে একটি মুখোমুখি অবস্থানের ঘটনা ঘটে। জ্যেষ্ঠ কমান্ডাররা হস্তক্ষেপ করার আগে তা প্রায় এক সপ্তাহ ধরে চলেছিল। অরুণাচল প্রদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মামা নাটুং চীনা অনুপ্রবেশের খবরকে "নিছক গুজব" বলে উড়িয়ে দেন।
চলমান মুখোমুখি অবস্থানগুলো কোথায় ঘটেছে, কত দিন ধরে চলছে, কিংবা কোন পক্ষ কোথায় অবস্থান করছে—কাপুর তা জানাননি। সংগঠনটির উল্লেখ করা স্থানগুলোর ভূখণ্ডগত পরিস্থিতি নিয়ে জনসমক্ষে দেওয়া বক্তব্যে এখনো কোনো সমাধান আসেনি।
স্পর্শকাতর এলাকাগুলোর অবস্থান
তাকসিং এলাকার আসাফিলা ও লংজুকে প্রতিরক্ষা সূত্রগুলো বিশেষ স্পর্শকাতর হিসেবে চিহ্নিত করেছে। কারণ, প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখার গতিপথ নিয়ে ভারত ও চীনের মতপার্থক্য রয়েছে। প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখাকে সাধারণত সংক্ষেপে এলএসি বলা হয়। এটি দুই দেশের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকার মধ্যবর্তী সীমারেখা; উভয় পক্ষের সম্মত কোনো আন্তর্জাতিক সীমান্ত নয়।
সাম্প্রতিক উত্তেজনার বিবরণে বলা হয়েছে, আসাফিলা ও তাকসিংয়ের কাছে ভারতের ধারণা করা এলএসি থেকে ছয় থেকে সাত কিলোমিটার ভেতরে চীনা সেনারা তাঁবু খাটিয়েছে। প্রতিরক্ষা সূত্রগুলো মাঝেমধ্যে টহলরত সেনাদের মুখোমুখি হওয়ার কথাও জানিয়েছে, তবে কোনো সহিংস সংঘর্ষের কথা বলেনি। তাদের ভাষ্য, কমান্ডাররা সংযম দেখাচ্ছেন।
উত্তেজনা সামাল দিতে স্থানীয় পতাকা বৈঠক, যেখানে সামরিক কর্মকর্তারা সরাসরি দেখা করেন, এবং টেলিফোন হটলাইন ব্যবহার করা হচ্ছে। এ ব্যবস্থায় কমান্ডাররা টহল চলাকালে সৃষ্ট পরিস্থিতি দ্রুত আলোচনা করতে পারেন এবং তা বড় সংঘাতে রূপ নেওয়ার আগে নির্দেশনা চাইতে পারেন।
ভারত ও চীনের পরস্পরবিরোধী ব্যাখ্যা
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, চীনা বাহিনী "প্রতিষ্ঠিত টহল-পদ্ধতি থেকে সরে এলে" সীমান্তে উত্তেজনা তৈরি হয়। কাপুরের বক্তব্যের পর নির্দিষ্ট সংঘাতের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি প্রশ্নগুলো প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠান।
জয়সওয়াল বলেন, অমীমাংসিত সমস্যার সমাধান এবং ভুল বোঝাবুঝি ঠেকাতে দুই সরকার বিদ্যমান যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে যাচ্ছে:
অমীমাংসিত বিষয়গুলোর সমাধান এবং প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর ভুল বোঝাবুঝি ও ভুল হিসাব এড়াতে উভয় পক্ষ বিদ্যমান কূটনৈতিক ও সামরিক প্রক্রিয়া ব্যবহার করে যাচ্ছে। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা আরও উন্নত করতে উপযুক্ত এলাকায় এলএসি সম্পর্কে বোঝাপড়া বাড়ানোর উপায় নিয়েও দুই পক্ষ আলোচনা করতে সম্মত হয়েছে।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন বলেন, চীন সংশ্লিষ্ট চুক্তি ও সমঝোতাগুলো কঠোরভাবে মেনে চলে এবং নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় স্বাভাবিক সীমান্ত টহল ও নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনা করে। তিনি ভারতকে চীনের সঙ্গে মিলে দুই দেশের অভিন্ন সমঝোতা বাস্তবায়ন এবং শান্তি বজায় রাখার আহ্বান জানান।
সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজি ইনস্টিটিউটের গবেষণা বিভাগের পরিচালক চিয়ান ফেং ভারতের অভিযোগকে কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন, যা আংশিকভাবে দেশীয় রাজনীতির প্রভাবে নেওয়া হয়েছে বলে তাঁর মত। তিনি বলেন, কম স্পর্শকাতর এলাকায় সহযোগিতা চালু রেখে প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার মাধ্যমে সীমান্ত বিরোধ সামলানো উচিত। ভারতের উদ্দেশ্য সম্পর্কে এটি তাঁর মূল্যায়ন; ভারত সরকারের ঘোষিত উদ্বেগ ছিল চীনের প্রতিষ্ঠিত টহল-পদ্ধতি থেকে সরে যাওয়া।
ভারতের চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ জেনারেল এনএস রাজা সুব্রামণি সেপ্টেম্বরে এলএসি পরিস্থিতিকে স্থিতিশীল বলে বর্ণনা করেছিলেন। পরে প্রতিরক্ষা সূত্রগুলো জানায়, কাপুরের বক্তব্যটি কোনো নির্দিষ্ট ঘটনা নয়, বরং নিয়মিত সেনা মোতায়েন ও প্রস্তুতি নিয়ে ছিল। তবে তাঁর বক্তব্যে চলমান মুখোমুখি অবস্থানের উল্লেখ স্থানীয় উত্তেজনা সামলানোর বিষয়টিকে জনসমক্ষে নিয়ে আসে।
গ্রীষ্ম ও শরৎজুড়ে আলোচনা অব্যাহত
মুখোমুখি অবস্থানের খবর ওঠার আগের ও পরের কয়েক মাসে ভারত ও চীন কূটনৈতিক, সামরিক ও নেতৃত্ব পর্যায়ে আলোচনা করেছে। প্রধান ঘটনাগুলো ঘটেছে এই ধারাবাহিকতায়:
- ২৬ জুন: তাকসিংয়ের আশপাশে চীনা দখলের অভিযোগ জানিয়ে নাহ ওয়েলফেয়ার সোসাইটি চিঠি পাঠায়।
- ২৫ ও ২৬ জুলাই: তাকসিং সার্কেলে মুখোমুখি অবস্থানের খবর পাওয়া যায়; পরে জ্যেষ্ঠ কমান্ডাররা হস্তক্ষেপ করেন।
- ৬ আগস্ট: নয়াদিল্লিতে ভারত-চীন সীমান্তবিষয়ক পরামর্শ ও সমন্বয়ের কার্যকরী ব্যবস্থার ৩৬তম বৈঠক হয়।
- আগস্টের শেষ দিকে: বেইজিংয়ে সীমান্তবিষয়ক আলোচনা করেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল ও চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই। একটি বিবরণে বৈঠকের তারিখ ২৬ আগস্ট, অন্যটিতে ২৫ আগস্ট বলা হয়েছে।
- ৩১ আগস্ট: বিশকেকে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের কথা হয়।
- ৬ সেপ্টেম্বর: অরুণাচল প্রদেশের ওয়াচা-দামাই সীমান্ত বৈঠকস্থলে কোর কমান্ডার পর্যায়ের আলোচনা হয়।
- ১২ সেপ্টেম্বর: নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলনের সময় মোদি ও শি বৈঠক করেন।
- ২২ অক্টোবর: অরুণাচল প্রদেশে চলমান মুখোমুখি অবস্থানের কথা প্রকাশ্যে জানান কাপুর।
ওয়াচা কিবিথু সেক্টরে অবস্থিত এবং এটি ভারতের সবচেয়ে পূর্বের সীমান্তরক্ষী সদস্যদের বৈঠকস্থল। স্থানীয় কমান্ডারদের বৈঠকের পর সেপ্টেম্বরে সামরিক আলোচনা হয়। খবরে বলা হয়েছে, কিছু মুখোমুখি অবস্থানের ঘটনা ভারতে শির সেপ্টেম্বর সফরের সময়ের সঙ্গে মিলে গিয়েছিল।
অরুণাচল কেন বিরোধপূর্ণ
পূর্বাঞ্চলে প্রায় ৯০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা দাবি করে চীন, যা মোটামুটিভাবে অরুণাচল প্রদেশের সঙ্গে মেলে। চীন এ এলাকাকে জাংনান বা দক্ষিণ তিব্বত বলে। ভারত এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে এবং অরুণাচল প্রদেশকে দেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে বর্ণনা করে।
চীনের নিয়ন্ত্রণাধীন আকসাই চিনের প্রায় ৩৮ হাজার বর্গকিলোমিটার এবং শাকসগাম উপত্যকার প্রায় ৫,৩০০ বর্গকিলোমিটার এলাকাও ভারত দাবি করে। ১৯৬৩ সালের এক চুক্তির আওতায় পাকিস্তান শাকসগাম উপত্যকা চীনের কাছে হস্তান্তর করেছিল, যা ভারত প্রত্যাখ্যান করে। ফলে বিরোধটি সেনাদের টহলের এলাকা এবং আরও বিস্তৃত ভূখণ্ডের সার্বভৌমত্ব—দুই বিষয় নিয়েই।
১৯৬২ সালের যুদ্ধে পূর্বাঞ্চলে দখল করা ভূখণ্ড থেকে চীনা বাহিনী সরে গিয়েছিল। আগের কিছু সমঝোতা প্রস্তাবে এমন বিনিময়ের কথা বিবেচনা করা হয়েছিল, যাতে পূর্বাঞ্চলের দাবি ছেড়ে দিয়ে চীন আকসাই চিনের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবে এবং ভারত তা মেনে নেবে। সীমান্ত নিয়ে কোনো সমঝোতা হয়নি।
১৯৮৬ ও ১৯৮৭ সালে সুমদোরং চু এলাকায় আবার উত্তেজনা দেখা দেয়। পরবর্তী সংঘাতগুলোর মধ্যে রয়েছে ২০১৭ সালে ভারত, চীন ও ভুটানের সীমান্তসংযোগস্থলের কাছে ডোকলাম এবং ২০২০ সালের জুনে পূর্ব লাদাখের গালওয়ান। গালওয়ানে ২০ জন ভারতীয় সেনা নিহত হন; চীন চার সেনার মৃত্যুর কথা স্বীকার করে।
দাবি প্রতিষ্ঠার আরেকটি ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে স্থানগুলোর নাম। ২০১৭ সাল থেকে অরুণাচলের বিভিন্ন স্থানের চীনা নাম প্রকাশ করেছে চীনের বেসামরিক বিষয়ক মন্ত্রণালয়; সর্বশেষ আরেকটি তালিকা প্রকাশিত হয় এপ্রিলে। আগস্টে ভারতের সরকারি মানচিত্রে ২৭টি স্থান ও ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের আনুষ্ঠানিক নাম উল্লেখ করা হয়।
ভারতের তালিকায় ছিল লংজু, যা ১৯৫৯ সাল থেকে চীনের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও ভারতের দাবি করা সীমারেখার ভেতরে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, স্থানগুলো সঠিকভাবে শনাক্ত করা এবং জনসচেতনতা বাড়ানোই মানচিত্র তৈরির উদ্দেশ্য।
ড্রোন ও নতুন কৌশলে ঝুঁকছে আইটিবিপি
আলওয়ারে কাপুরের বক্তব্যে সীমান্তের মুখোমুখি অবস্থানের সঙ্গে আইটিবিপির প্রস্তুতিতে বড় পরিবর্তনের বিষয়টিও উঠে আসে। তিনি শৌর্য প্লাটুন ও কমান্ডো দলগুলোর প্রশংসা করেন এবং জানান, ‘স্ট্রাইক’ নামে নতুন একটি কোর্সে যুদ্ধকৌশল ও সম্মুখসারির রণনীতি শেখানো হবে, যাতে গালওয়ানের মতো পরিস্থিতি এড়ানো যায়।
২০২৭ সালের শেষভাগের আগে পুরো বাহিনীর প্রশিক্ষণ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে; সম্মুখসারির সীমান্ত ফাঁড়িগুলোতে সরঞ্জাম সরবরাহ করা হবে। আধুনিক অস্ত্র থেকে সদস্যদের সুরক্ষা দিতে শক্তিশালী ভূগর্ভস্থ অবকাঠামো নির্মাণের কথাও জানান কাপুর।
সীমান্ত পাহারায় থাকা প্রতিটি ব্যাটালিয়নে একটি করে ড্রোন প্লাটুন দেওয়া হবে। বাহিনীর ভেতরেই ড্রোন তৈরির কাজ শুরু হয়েছে, পাশাপাশি পাইলটদের প্রশিক্ষণও চলছে। প্রতিটি স্থানে টহল না পাঠিয়েও দুর্গম ভূখণ্ড সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে ড্রোন; ড্রোন প্রতিরোধী ব্যবস্থা সেনা ও স্থাপনা সুরক্ষায় সহায়তা করতে পারে।
কাপুর বলেন, ড্রোন ও ড্রোন প্রতিরোধী ব্যবস্থার জন্য ৩,০০০ কোটি রুপির বেশি অর্থ বরাদ্দে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে অর্থায়ন পাওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে। এক কোটি সমান ১০ মিলিয়ন রুপি; সে হিসাবে প্রস্তাবিত অর্থের পরিমাণ ৩০ বিলিয়ন রুপির বেশি। নীতিগত অনুমোদন প্রাথমিক সম্মতি, আর ব্যয় ও মোতায়েনের পরিকল্পনা পরবর্তী কয়েক বছরের জন্য।
এই কর্মসূচিতে সীমান্ত পরিস্থিতি সামলানোর দুটি ভিন্ন সময়সীমা রয়েছে: চলমান মুখোমুখি অবস্থান কমান্ডারদের বৈঠক ও হটলাইনের মাধ্যমে সামলাতে হবে, আর প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জামের পরিবর্তনগুলো আগামী কয়েক বছরে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
রাজনৈতিক চাপ ও বৃহত্তর সম্পর্ক
কাপুরের বক্তব্যের পর কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে মোদির কাছে জবাব দাবি করেন। তিনি সীমান্ত নিরাপত্তা এবং বারবার কূটনৈতিক যোগাযোগের ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক ও রাজ্যসভার সদস্য জয়রাম রমেশও মুখোমুখি অবস্থান নিয়ে সরকারের জনসমক্ষে বক্তব্যের সমালোচনা করেন।
রমেশ টহল পয়েন্ট হারানোর স্থানীয় দাবির কথা উল্লেখ করেন এবং সেপ্টেম্বরের কোর কমান্ডার পর্যায়ের আলোচনার প্রসঙ্গ তোলেন। সীমান্তের পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের বর্ণনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বিতর্কের অংশ হয়ে রয়েছে এসব দাবি।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর বলেছেন, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক ২০২৫ সালের তুলনায় ভালো এবং স্বাভাবিক অবস্থার দিকে এগোচ্ছে। তিনি আরও বলেছেন, স্বাভাবিক সম্পর্কের জন্য সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা অপরিহার্য এবং অস্থিরতার প্রভাব বৃহত্তর সম্পর্কে পড়বে।
১২ সেপ্টেম্বরের দুই নেতার বৈঠক নিয়ে চীনের বিবৃতিতে বলা হয়, দুই দেশের অংশীদার হওয়া উচিত এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও সীমান্ত আলোচনা—উভয় ক্ষেত্রেই অগ্রগতি এগিয়ে নেওয়া উচিত। চলমান মুখোমুখি অবস্থানের মধ্যে দুই সরকার স্থানীয় সামরিক উত্তেজনা সামলানোর পাশাপাশি বৃহত্তর কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে।
টহলের বাইরেও সীমান্তবাসীর চাপ
অরুণাচলের দুর্গম গ্রামের বাসিন্দারা জমিতে প্রবেশাধিকার, নির্ভরযোগ্য যোগাযোগব্যবস্থা এবং মৌলিক সেবার ওপর নির্ভরশীল। তাই পশুচারণ ও শিকারের এলাকা হারানোর অভিযোগ দৈনন্দিন জীবিকা এবং সামরিক নিয়ন্ত্রণ—দুই বিষয়েই উদ্বেগ তৈরি করে।
প্রতিরক্ষা সূত্রগুলো বছরজুড়ে চলাচলের উপযোগী সড়ক, সেতু, টেলিযোগাযোগ এবং নাগরিক সুবিধা নির্মাণের কাজের কথা জানিয়েছে। তারা স্বাস্থ্যশিবির, জরুরি সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা, স্কুল নির্মাণ এবং নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতির সঙ্গে যুক্ত কর্মসংস্থানের কথাও উল্লেখ করেছে।
সীমান্তের দুই পাশের বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর কাছে পবিত্র ঐতিহাসিক সারি তীর্থপথ ভবিষ্যতে নিয়ন্ত্রিত যাতায়াত নিয়ে আলোচনার বিষয় হতে পারে। এ ধরনের ব্যবস্থা নির্ভর করবে নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং ভারত ও চীনের সমঝোতার ওপর।
আপার সিয়াং জেলায় একটি বড় বাঁধ নিয়েও অরুণাচলে আলাদা বিরোধ রয়েছে। বিরোধীরা উচ্ছেদ, পরিবেশগত ক্ষতি এবং জীবিকার বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন; ২৩ অক্টোবর সেখানে সহিংসতার খবর পাওয়া যায়। বিক্ষোভের মধ্যে আইটিবিপি সদস্যদের সীমান্ত এলাকা থেকে দিল্লিতে পুনরায় মোতায়েনের খবর সরকারের অগ্রাধিকার নিয়ে সমালোচনা বাড়ায়, যদিও মোতায়েনের কোনো সংখ্যা জানানো হয়নি।
বিতর্কিত সীমান্তের কাছের জনগোষ্ঠীর কাছে নিরাপত্তার অর্থ ঐতিহ্যগত জমি ব্যবহারের সুযোগ এবং উন্নয়নসংক্রান্ত সিদ্ধান্তে ঘরবাড়ি ও জীবিকা সুরক্ষিত থাকবে—এই আস্থা, দুটোই। সীমান্ত টহলের মুখোমুখি অবস্থান নিয়ন্ত্রণে রাখার তাৎক্ষণিক সামরিক দায়িত্বের পাশাপাশি এসব উদ্বেগও রয়েছে।
মূল বিষয়গুলো
- আইটিবিপি প্রধান শত্রুজিৎ কাপুর ২২ অক্টোবর বলেন, অরুণাচল প্রদেশের একাধিক স্থানে মুখোমুখি অবস্থান অব্যাহত রয়েছে।
- নাহ ওয়েলফেয়ার সোসাইটি তাকসিংয়ের আশপাশের পাঁচটি নির্দিষ্ট স্থানে চীনা দখলের অভিযোগ করেছে; ভারতীয় সেনাবাহিনী অনুপ্রবেশের খবর প্রত্যাখ্যান করেছে।
- ভারত চীনা টহলের ধরনে পরিবর্তনকে দায়ী করেছে; চীন তাদের কার্যক্রমকে স্বাভাবিক টহল বলে বর্ণনা করেছে।
- প্রতিরক্ষা সূত্রের ভাষ্য, স্পর্শকাতর এলাকাগুলো নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং কোনো সহিংস সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়নি।
- ওয়াচা-দামাইয়ে কোর কমান্ডার পর্যায়ের আলোচনা-সহ আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে সামরিক ও কূটনৈতিক আলোচনা অব্যাহত ছিল।
- আইটিবিপি নতুন কৌশলগত প্রশিক্ষণ, ড্রোন প্লাটুন এবং শক্তিশালী ভূগর্ভস্থ অবকাঠামোর পরিকল্পনা করছে। ২০২৭ সালের শেষভাগের আগে প্রশিক্ষণ এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ড্রোনের অর্থায়ন সম্পন্ন করার লক্ষ্য রয়েছে।






