জঙ্গি আস্তানার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ চায় ইসলামাবাদ
আফগানিস্তান থেকে পরিচালিত জঙ্গিদের বিরুদ্ধে যাচাইযোগ্য পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছে পাকিস্তান। ২০২৬ সালের ২৪ অক্টোবর দেশটি বলেছে, আনুমানিক ৪,০০০ থেকে ৬,০০০ তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) যোদ্ধা সেখানে রয়েছে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা নিয়ে পাকিস্তানের উদ্বেগ এড়িয়ে যাওয়ার অভিযোগ করেছে তালেবান কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। বারবার সীমান্ত সংঘর্ষ, আফগানিস্তানের ভেতরে পাকিস্তানের বিমান হামলা এবং পাকিস্তানে হামলার দায় নিয়ে বিরোধের মধ্যে এ দাবি জানানো হয়েছে।
সূচিপত্র
- জঙ্গি আস্তানার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ চায় ইসলামাবাদ
- কাবুলের কাছে কী বন্ধ করতে বলছে পাকিস্তান
- দাবির পক্ষে আন্তর্জাতিক মূল্যায়ন
- টিটিপি ও বিএলএ আলাদা গোষ্ঠী
- দায় অস্বীকার করে পাকিস্তানের দিকেই অভিযোগ কাবুলের
- প্রাণহানি ও হামলার পরিসংখ্যান নিয়ে মতবিরোধ
- আফগানদের কথিত নিয়োগ নিয়ে দ্বিতীয় বিরোধ
- বিরোধের পটভূমি
- নিরাপত্তা সহযোগিতার ওপর নির্ভর করছে আলোচনা ও বাণিজ্য
- মূল কথা
পাকিস্তানের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় কাবুলকে টিটিপি, বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) এবং তাদের সহযোগীদের আফগান ভূখণ্ড ব্যবহার করে হামলার পরিকল্পনা, প্রস্তুতি বা হামলা চালানো বন্ধ করতে বলেছে। কান্দাহারের কর্মকর্তাসহ তালেবান কর্মকর্তারা জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোকে সহায়তা করেছেন বলেও অভিযোগ করেছে মন্ত্রণালয়।
পাকিস্তানের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন আফগান তালেবানের মুখপাত্র জবিউল্লাহ মুজাহিদ। তিনি বলেন, পাকিস্তানে অস্থিতিশীলতা তৈরির আগ্রহ বা সক্ষমতা, কোনোটিই আফগানিস্তানের নেই। দেশে ব্যর্থতার দায় প্রতিবেশীর ওপর চাপানোর জন্য পাকিস্তানের সামরিক ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলোকে অভিযুক্ত করেন তিনি।
ইসলামাবাদের জবাবে বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে একটি সুনির্দিষ্ট দাবি: সীমান্ত পেরিয়ে চলাচল, জঙ্গি আশ্রয়স্থল ও সহায়তা নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে এমন পদক্ষেপ, যা পাকিস্তান যাচাই করতে পারে। প্রতিবেশী দেশগুলোর বিরুদ্ধে আফগান ভূখণ্ড ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার মূল অভিযোগটি কাবুল এখনো অস্বীকার করে আসছে।
কাবুলের কাছে কী বন্ধ করতে বলছে পাকিস্তান
টিটিপি ও বিএলএর প্রতি সহনশীলতা, সহায়তা বা সমর্থন বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয়। হামলার আগের বিভিন্ন ধাপের পাশাপাশি হামলা নিজেকেও অন্তর্ভুক্ত করেছে তাদের দাবি; এর মধ্যে রয়েছে পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ, প্রস্তুতি এবং পাকিস্তানে সীমান্ত পেরিয়ে প্রবেশ।
মন্ত্রণালয় বলেছে, পাকিস্তানি প্রতিষ্ঠানগুলোকে দোষারোপ করলেই নিয়ন্ত্রণাধীন ভূখণ্ড থেকে হামলা ঠেকানোর তালেবান সরকারের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। এক বিবৃতিতে তারা দাবি জানায়:
টিটিপি, বিএলএ ও তাদের সহযোগীসহ সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর প্রতি যেকোনো ধরনের সহনশীলতা, সহায়তা বা সমর্থন আফগান তালেবান সরকারকে বন্ধ করতে হবে এবং নিশ্চিত করতে হবে, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে হামলার পরিকল্পনা, প্রস্তুতি বা হামলা চালাতে আফগান ভূখণ্ড ব্যবহার করা হবে না।
সশস্ত্র জঙ্গিদের বারবার সীমান্ত পেরিয়ে আসার চেষ্টা, পাকিস্তানের সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে আফগান নাগরিকদের মৃত্যু এবং বিদেশে তৈরি অস্ত্র উদ্ধারের কথাও উল্লেখ করেছে পাকিস্তান। সাধারণ অস্বীকারের বদলে বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যা এবং যাচাই করা যায় এমন পদক্ষেপ চেয়েছে তারা।
দাবির পক্ষে আন্তর্জাতিক মূল্যায়ন
নিজেদের অবস্থানের সমর্থনে দুটি নথির কথা বলেছে পাকিস্তানের মন্ত্রণালয়: জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বিশ্লেষণী সহায়তা ও নিষেধাজ্ঞা পর্যবেক্ষণ দলের ১৬তম প্রতিবেদন, S/2025/796, যা ২০২৫ সালে প্রকাশিত হয়; এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত সময় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের লিড ইনস্পেক্টর জেনারেলের ‘অপারেশন এন্ডিউরিং সেন্টিনেল’ প্রতিবেদন।
যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যায়ন সম্পর্কে মন্ত্রণালয়ের বর্ণনা অনুযায়ী, তালেবান কর্তৃপক্ষ আফগানিস্তান থেকে টিটিপিকে কার্যক্রম চালাতে দিয়ে আসছে। মন্ত্রণালয় বলেছে, তালেবানের সমর্থন এবং গোষ্ঠীটির চলাচলের স্বাধীনতা বৃদ্ধি পাকিস্তানে তাদের হামলা বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে।
টিটিপি যোদ্ধার সংখ্যা ৪,০০০ থেকে ৬,০০০ বলে যে অনুমান করা হয়েছে, তা ওই মার্কিন প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়। এই পরিসর থেকে বোঝা যায়, আফগান ভূখণ্ডে প্রবেশের সুযোগ নিয়ে পাকিস্তানের দাবি অনুযায়ী কত বড় বাহিনী লাভবান হচ্ছে; তবে সুনির্দিষ্ট সংখ্যা এখনো অনুমাননির্ভর।
২৩ অক্টোবরের এক সংবাদ সম্মেলনে আরও বিস্তৃত উদ্বেগের কথা বলেন পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সাজ্জাদ হায়দার খান। জাতিসংঘের পর্যবেক্ষণ ও যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যায়নের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, আফগানিস্তানে ২০টির বেশি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী রয়েছে এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই কার্যক্রম চালাচ্ছে। এসব গোষ্ঠীর হুমকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে চীন, উজবেকিস্তান ও ইরানের নাম উল্লেখ করেন তিনি।
টিটিপি ও বিএলএ আলাদা গোষ্ঠী
সাধারণভাবে পাকিস্তানি তালেবান নামে পরিচিত টিটিপি আফগানিস্তানের ক্ষমতাসীন তালেবান থেকে আলাদা, যদিও দুই গোষ্ঠীর ঘনিষ্ঠ মিত্রতা রয়েছে। পাকিস্তানের অভিযোগ, টিটিপির নেতা ও যোদ্ধারা আফগানিস্তানে আশ্রয় নিয়ে পাকিস্তানের ভেতরে হামলার সংগঠিত পরিকল্পনা করছে।
বিএলএ পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় বেলুচিস্তান প্রদেশে সক্রিয় একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী জঙ্গিগোষ্ঠী। ইসলামাবাদের দাবিতে এই গোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করায় বিরোধটি টিটিপির গণ্ডি ছাড়িয়ে পাকিস্তানের পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চলের আরেকটি বড় অংশে ছড়িয়ে পড়া সহিংসতাকেও অন্তর্ভুক্ত করেছে।
আল-কায়েদা, ভারতীয় উপমহাদেশে আল-কায়েদা, ইস্ট তুর্কিস্তান ইসলামিক মুভমেন্ট এবং ইসলামিক স্টেট-খোরাসান নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছেন পাকিস্তানি কর্মকর্তারা। ইসলামাবাদের বক্তব্য, জঙ্গি আস্তানা, প্রশিক্ষণকেন্দ্র, উন্নত অস্ত্রে প্রবেশাধিকার এবং সীমান্তপথ—সবই সেই হুমকির অংশ, যা মোকাবিলায় তারা কাবুলের পদক্ষেপ চায়।
পাকিস্তানের দাবি, ২০২১ সালের আগস্টে আফগান তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর বিশেষ করে খাইবার পাখতুনখোয়া ও বেলুচিস্তানে সহিংসতা বেড়েছে। আফগান সীমান্তের কাছে জঙ্গিদের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযান চালাচ্ছে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ।
দায় অস্বীকার করে পাকিস্তানের দিকেই অভিযোগ কাবুলের
২৩ অক্টোবর মুজাহিদ বলেন, পাকিস্তানে অস্থিতিশীলতা দেখা দিলে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও মানবিক দিক থেকে আফগানিস্তানও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাঁর যুক্তি, প্রতিবেশী দেশে অস্থিতিশীলতা থেকে লাভবান হওয়ার বদলে আফগানিস্তান এর ক্ষতির শিকার হবে।
জনগণের ক্ষোভ অন্যদিকে ঘোরাতে পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্ব ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলো আফগানিস্তানকে ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ করেন তালেবান মুখপাত্র:
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্ব ও অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থা যখনই নিজেদের দেশে নিরাপত্তা বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়, তখনই তারা জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে এসব ঘটনার দায় আফগানিস্তানের ওপর চাপায়।
আফগান কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, যোদ্ধারা উল্টো দিক থেকেও সীমান্ত পেরিয়েছে। তারা জানিয়েছে, সেপ্টেম্বরে তাদের বাহিনী ২৮ যোদ্ধাকে হত্যা এবং ৩২ জনকে আটক করেছে; এর মধ্যে পাকিস্তান থেকে প্রবেশ করা কথিত ইসলামিক স্টেট সদস্যরাও ছিলেন। তবে আফগান কর্তৃপক্ষের বরাত দেওয়া অন্য পরিসংখ্যানে নিহতের সংখ্যা ৫৮ এবং আটক ব্যক্তির সংখ্যা ২৩ বা ২৮ বলা হয়েছে।
পরস্পরবিরোধী এই সংখ্যার কারণে অভিযানের পরিসর অনিশ্চিত রয়ে গেছে। তবে কাবুলের অভিযোগ থেকে বোঝা যায়, দুই সরকারই সীমান্ত পেরিয়ে জঙ্গিদের চলাচলকে অন্য দিক থেকে আসা নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে তুলে ধরছে।
প্রাণহানি ও হামলার পরিসংখ্যান নিয়ে মতবিরোধ
আফগান ভূখণ্ড থেকে আসা সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে যুক্ত করে ২০২৬ সালে ১,৩২৭ জন নিহত এবং ২,৪৮৪ জন আহত হওয়ার কথা জানিয়েছে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ। সীমান্তের ওপার থেকে শুরু হওয়া হামলার সঙ্গে ইসলামাবাদ যেসব হতাহতের ঘটনা নির্দিষ্টভাবে যুক্ত করছে, এই পরিসংখ্যান সেগুলোই তুলে ধরে।
জানুয়ারি থেকে পাকিস্তানজুড়ে জঙ্গি সহিংসতার পরিসংখ্যানে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের নামে উদ্ধৃত হিসাবে ২,৮০০টির বেশি হামলা ও ৩,০০০ মৃত্যু রয়েছে। পাশাপাশি উল্লেখযোগ্যভাবে কম আরেকটি হিসাবে ২,৬০০টির বেশি হামলা ও প্রায় ১,৩০০ মৃত্যুর কথা বলা হয়েছে। বিবৃতিগুলোর সঙ্গে প্রকাশিত তথ্য থেকে এই দুই জাতীয় পরিসংখ্যানের অমিল মেলানো যায় না।
খান আলাদাভাবে বলেছেন, আগের এক বছরে সীমান্তের ওপার থেকে আসা হামলায় ১,৩০০-এর বেশি পাকিস্তানি নাগরিক নিহত হয়েছেন। এই সময়সীমা বর্ষপঞ্জির বছরভিত্তিক পরিসংখ্যানের সঙ্গে মেলে না; ফলে সংখ্যাগুলো ভিন্ন সময়কালকে নির্দেশ করে।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তানে ১২ বছরের মধ্যে এক মাসে জঙ্গি হামলার সর্বোচ্চ সংখ্যা নথিভুক্ত হয়েছে। ফলে সরকারের ওপর চাপ সাম্প্রতিক বিবৃতির পাল্টাপাল্টিতেই সীমাবদ্ধ নয়: নিরাপত্তা বাহিনী অভিযান চালাচ্ছে, আর উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল ও বেলুচিস্তানের জনগণ বারবার সহিংসতার মুখে পড়ছে।
আফগানদের কথিত নিয়োগ নিয়ে দ্বিতীয় বিরোধ
আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক বিশেষ প্রতিনিধি জালমে খলিলজাদ ২৩ অক্টোবর আরেকটি অভিযোগ তোলেন। এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এমন কিছু দাবির কথা উল্লেখ করেন, যেখানে বলা হয় পাকিস্তান আফগানিস্তানের ভেতরে তালেবানের বিরুদ্ধে লড়তে আফগানদের অস্ত্র দিচ্ছে এবং পাকিস্তানকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়তে আফগান নাগরিকদের নিয়োগ করছে।
খলিলজাদ কোনো প্রমাণ দেননি এবং এসব দাবির উৎসও শনাক্ত করেননি। পরদিন পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয় দুই অভিযোগই প্রত্যাখ্যান করে সেগুলোকে ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর বলে আখ্যা দেয়।
মন্ত্রণালয় বলেছে, পাকিস্তানি নাগরিকদের জন্য হুমকি সৃষ্টিকারী জঙ্গি সংগঠনগুলোকে লক্ষ্য করে তাদের সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান চলছে। আফগান ভূখণ্ড থেকে হামলা ঠেকানোর দায়ে তালেবান সরকারের দায়িত্ব থেকে মনোযোগ সরানোর অভিযোগও খলিলজাদের বিরুদ্ধে করেছে তারা।
২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও তালেবানের মধ্যে হওয়া চুক্তির আলোচনায় কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছিলেন খলিলজাদ। ওই চুক্তির পথ ধরেই মার্কিন ও ন্যাটো বাহিনী প্রত্যাহার হয়। কাবুলের উদ্দেশে দেওয়া বিবৃতির পাশাপাশি খলিলজাদের সর্বশেষ মন্তব্যের জবাবেও আলাদা প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে পাকিস্তান।
পাকিস্তানের অভিযোগ, তাদের বিরুদ্ধে সক্রিয় জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো ভারতের সমর্থন পায়। নয়াদিল্লি জঙ্গি সহিংসতায় সমর্থন দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে। এই অভিযোগ এমন এক বিরোধে আঞ্চলিক মাত্রা যোগ করেছে, যেখানে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সীমান্ত পেরিয়ে চলাচল নিয়ে পাকিস্তান ও আফগানিস্তান পরস্পরবিরোধী দাবি করছে।
বিরোধের পটভূমি
পাকিস্তানের দাবি, ২০২১ সাল থেকে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক ও আন্তর্জাতিক ফোরামে তালেবান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে তারা। খান মস্কো ফরম্যাট এবং কাতার, তুরস্ক, সৌদি আরব ও চীনের অংশগ্রহণে হওয়া বৈঠকের কথা উল্লেখ করেন। তবে তাঁর মতে, এসব প্রচেষ্টায় ইসলামাবাদের চাওয়া পদক্ষেপ আদায় হয়নি।
বিরোধের পেছনের প্রধান ঘটনাগুলো কয়েক বছরজুড়ে ছড়িয়ে আছে; অক্টোবরের কয়েক দিনে কূটনৈতিক পাল্টাপাল্টিও হয়েছে:
- ফেব্রুয়ারি ২০২০: খলিলজাদের কেন্দ্রীয় ভূমিকার আলোচনার পর যুক্তরাষ্ট্র ও তালেবানের মধ্যে চুক্তি হয়।
- আগস্ট ২০২১: আফগান তালেবান ক্ষমতায় ফিরে আসে। পাকিস্তানের দাবি, এরপর বিশেষ করে দেশটির পশ্চিমাঞ্চলে জঙ্গি সহিংসতা বেড়েছে।
- ২০২৫: জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা পর্যবেক্ষণ দল S/2025/796 প্রতিবেদন প্রকাশ করে; পরে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের সমর্থনে পাকিস্তান সেটি উদ্ধৃত করে।
- জানুয়ারি থেকে মার্চ ২০২৬: পাকিস্তানের উদ্ধৃত ‘অপারেশন এন্ডিউরিং সেন্টিনেল’ মূল্যায়নে এই সময়কাল অন্তর্ভুক্ত ছিল।
- ২৩ অক্টোবর ২০২৬: মুজাহিদ পাকিস্তানের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন, খলিলজাদ নিয়োগসংক্রান্ত অভিযোগ তোলেন এবং খান পরবর্তী আলোচনার শর্ত তুলে ধরেন।
- ২৪ অক্টোবর ২০২৬: জঙ্গিদের বিরুদ্ধে যাচাইযোগ্য পদক্ষেপ দাবি করে পাকিস্তান এবং আলাদাভাবে খলিলজাদের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে।
বারবার সীমান্ত সংঘর্ষ ও আফগানিস্তানের ভেতরে পাকিস্তানের বিমান হামলা মতবিরোধকে আরও বিপজ্জনক করে তুলেছে। হামলা ঠেকানোর দায় কোন সরকারের, তা নিয়ে কূটনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি এখন সামরিক পদক্ষেপও চলছে।
নিরাপত্তা সহযোগিতার ওপর নির্ভর করছে আলোচনা ও বাণিজ্য
খান বলেন, পরবর্তী সংলাপের জন্য তালেবানকে আফগানিস্তানে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর উপস্থিতি স্বীকার করতে হবে এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য হুমকি ঠেকাতে একটি বিশ্বাসযোগ্য ব্যবস্থায় সম্মত হতে হবে। বাস্তবে ইসলামাবাদ চায়, প্রতিশ্রুতির সঙ্গে এমন ব্যবস্থাও থাকুক, যার মাধ্যমে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখা হচ্ছে কি না যাচাই করা যাবে।
আফগানিস্তানে রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের বিশেষ প্রতিনিধি জামির কাবুলভ নিশ্চিত করেছেন, পাকিস্তান ও তালেবানের মতবিরোধের কারণে অষ্টম মস্কো ফরম্যাট বৈঠক কোনো যৌথ ঘোষণা ছাড়াই শেষ হয়েছে। খান বলেন, আঞ্চলিক নিরাপত্তায় রাশিয়ার ভূমিকার মূল্য দেয় পাকিস্তান; তবে রাশিয়ার পক্ষ থেকে মধ্যস্থতার কোনো নতুন প্রস্তাব আলোচনায় ছিল না।
তালেবান কর্তৃপক্ষ পাকিস্তানে সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রবেশ ঠেকাতে সহযোগিতা করলে সীমান্তপথ আবার খুলে দেওয়া এবং বাণিজ্য পুনরায় শুরুর প্রস্তুতি আছে বলে জানিয়েছে পাকিস্তান। দুই দেশের মধ্যে পণ্য চলাচলের ওপর নির্ভরশীল ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের জীবিকার সঙ্গে তাই নিরাপত্তা সহযোগিতার পাশাপাশি সীমান্তে প্রবেশাধিকারও সরাসরি যুক্ত।
ইসলামাবাদ বলেছে, তাদের পদক্ষেপ আফগান জনগণের বিরুদ্ধে নয়, জঙ্গি হুমকির বিরুদ্ধে; পারস্পরিক সম্মান ও যাচাইযোগ্য অঙ্গীকারের ভিত্তিতে আলোচনার পথও খোলা রয়েছে। নতুন আলোচনার তারিখ, যাচাইব্যবস্থা বা সীমান্তপথ আবার খোলার বিষয়ে কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
মূল কথা
- আফগান ভূখণ্ড থেকে পরিচালিত টিটিপি, বিএলএ ও তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ দাবি করেছে পাকিস্তান।
- পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয় টিটিপির সদস্যসংখ্যা ৪,০০০ থেকে ৬,০০০ বলে করা মার্কিন মূল্যায়নের কথা উল্লেখ করেছে।
- পাকিস্তানের নিরাপত্তাহীনতার দায় অস্বীকার করে ইসলামাবাদের বিরুদ্ধে দায় চাপানোর অভিযোগ করেছে তালেবান।
- আফগান যোদ্ধাদের অস্ত্র দেওয়া বা নিয়োগের অভিযোগ খলিলজাদের বিরুদ্ধে আলাদাভাবে অস্বীকার করেছে পাকিস্তান।
- কর্তৃপক্ষের নামে উদ্ধৃত হতাহত ও হামলার পরিসংখ্যানে বড় ধরনের অমীমাংসিত অসংগতি রয়েছে।
- পরবর্তী আলোচনা ও সীমান্ত বাণিজ্য পুনরায় শুরুর বিষয়টি সুনির্দিষ্ট নিরাপত্তা সহযোগিতার সঙ্গে যুক্ত করেছে পাকিস্তান।






