তাপ সুরক্ষাব্যবস্থা কার্যকরের অপেক্ষায়, করাচির শ্রমিকেরা অসুস্থ হয়ে পড়ছেন
চরম তাপমাত্রা মোকাবিলায় বিধিমালা তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছে এমন একটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা চুক্তির আওতায় রয়েছেন ৩০ লাখের বেশি পোশাকশ্রমিক। পাকিস্তানের করাচির কারখানাশ্রমিকদের জন্য বিপদটি ইতিমধ্যেই তাৎক্ষণিক: কর্মস্থলে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, অসুস্থতার সময় মজুরি হারানো এবং হাসপাতালের বিল মেটাতে হিমশিম খাওয়া।
সূচিপত্র
- তাপ সুরক্ষাব্যবস্থা কার্যকরের অপেক্ষায়, করাচির শ্রমিকেরা অসুস্থ হয়ে পড়ছেন
- যন্ত্রপাতি ও আর্দ্রতায় ঘরের ভেতর আটকে থাকে তাপ
- অজ্ঞান হওয়ার পর কাজে ফিরতে চাপ দেওয়া হয়
- অসুস্থতায় পরিবারের খাবারের বাজেট কমে যায়
- অ্যাকর্ড যে পরিবর্তনে সম্মত হয়েছে
- শ্রমিকদের অভিযোগ যেভাবে নিরাপত্তার আলোচ্যসূচিতে এল
- লাখো শ্রমিক আওতায়, তবে অনেকে এখনও বাইরে
- প্রাথমিক সুরক্ষার জন্য পানি, বিরতি ও তাপমাত্রা পরিমাপ জরুরি
- ব্র্যান্ডগুলোর পদক্ষেপের প্রতিশ্রুতি, প্রয়োগের ঘাটতি স্বীকার সিন্ধু সরকারের
- মূল বিষয়গুলো
২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর ক্লাইমেট রাইটস ইন্টারন্যাশনাল জানায়, টেক্সটাইল ও পোশাকশিল্পে স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাবিষয়ক আন্তর্জাতিক অ্যাকর্ড তাপজনিত চাপ মোকাবিলায় একটি প্রটোকল তৈরিতে সম্মত হয়েছে। এর দুই দিন আগে অ্যাকর্ড স্বীকার করে, শ্রমিকেরা তাপ নিয়ে অভিযোগ করেছেন; তবে তাদের পরিদর্শন ও মেরামত কর্মসূচিতে তখনও সমন্বিত কারিগরি পদক্ষেপের ঘাটতি ছিল।
করাচির উপকণ্ঠে জারা ও ম্যাংগোর জন্য পোশাক সেলাই করা শ্রমিক সিদ্দিকি আর্দ্র গরমের মধ্যে ভিড়ভাট্টার কারখানায় অজ্ঞান হয়ে পড়ার কথা জানান। তাঁর দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে, হৃৎস্পন্দন বেড়ে যায় এবং সহকর্মীরা তাঁর সুপারভাইজারকে ডাকেন। নিয়োগকর্তার প্রতিশোধের আশঙ্কায় তাঁর পরিচয় শুধু পদবি দিয়ে প্রকাশ করা হয়েছে।
অসুস্থতার কারণে কাজ চালিয়ে যেতে না পারার মুহূর্তটির কথা সিদ্দিকি এভাবে স্মরণ করেন:
হঠাৎ চোখের সামনে অন্ধকার নেমে এল।
করাচিতে সাক্ষাৎকার দেওয়া এক ডজনেরও বেশি শ্রমিক দমবন্ধ করা গরমের কর্মস্থল, তাপ সুরক্ষার অভাব এবং স্বাস্থ্যসমস্যার কথা জানিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ১০ জন বলেছেন, তাঁরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে বিক্রি হওয়া বৈশ্বিক ব্র্যান্ডের পণ্য তৈরি করেন। প্রত্যেক শ্রমিকই বলেছেন, সহকর্মীদের অজ্ঞান হতে দেখেছেন; কয়েকজন নিজেরাও একাধিকবার অজ্ঞান হয়েছেন।
প্রস্তাবিত তাপ প্রটোকল পোশাকের ব্র্যান্ড ও ট্রেড ইউনিয়নের মধ্যে আইনত বাধ্যতামূলক চুক্তিতে কর্মস্থলের ক্রমবর্ধমান বিপদটিকে অন্তর্ভুক্ত করবে। এর বিধিমালা এখনও পর্যালোচনাধীন, কার্যকর হয়নি। বাস্তবায়নের কোনো তারিখও জানানো হয়নি। এদিকে শ্রমিকেরা বলছেন, প্রতিদিন তাঁদের অসুস্থ শরীরে কাজ চালিয়ে যাওয়া অথবা খাবারের প্রয়োজন মেটানোর আয় হারানোর মধ্যে একটিকে বেছে নিতে হচ্ছে।
যন্ত্রপাতি ও আর্দ্রতায় ঘরের ভেতর আটকে থাকে তাপ
করাচির কারখানাগুলোতে তাপের একাধিক উৎস রয়েছে। শিল্পকারখানার যন্ত্রপাতি গাদাগাদি করে থাকা উৎপাদনকক্ষে তাপ ছড়ায়। ধাতব ছাদ সূর্যের তাপ শোষণ করে। শ্রমিকেরা বলেছেন, কোথাও পাখা নষ্ট বা আকারে ছোট; পাশাপাশি রয়েছে দেয়ালের ওপরের দিকে সরু জানালা, যা চুরি ঠেকাতে বন্ধ রাখা হয়।
বর্ষার আর্দ্রতায় এসব পরিবেশ আরও অসহনীয় হয়ে ওঠে। ত্বকের ঘাম বাষ্পীভূত হলে শরীর ঠান্ডা হতে পারে। বাতাসে আগে থেকেই প্রচুর আর্দ্রতা থাকলে বাষ্পীভবন ধীর হয়, ফলে শ্রমিকদের শরীর ও আশপাশের যন্ত্রপাতি থেকে উৎপন্ন তাপ শরীরের বাইরে বের করে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
সিদ্দিকি বলেন, তাঁর কারখানাটি ছয় সন্তানের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া ছোট ঘরটির চেয়েও গরম, যদিও সেখানে শীতাতপনিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নেই। তাপপ্রবাহের সময় তাঁর বাড়ির আশপাশের তাপমাত্রা নিয়মিত ৩৭.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়। তাই কর্মদিবস কিংবা বাড়িতে থাকা—কোনো সময়েই তাপ থেকে তেমন স্বস্তি মেলে না।
শ্রমিকেরা বলেছেন, নিয়োগকর্তারা তাঁদের পানির ব্যবস্থা করলেও তা সচরাচর ঠান্ডা থাকে না, আর পানির পরিচ্ছন্নতা নিয়েও তাঁরা নিশ্চিত নন। কেউই কর্মস্থলে তাপমাত্রা মাপার সেন্সর থাকার কথা জানাননি। কয়েকজন বলেছেন, গ্রীষ্মের অসহনীয় গরমে তাঁদের বাড়তি পানি বা অতিরিক্ত বিরতিও দেওয়া হয়নি।
অজ্ঞান হওয়ার পর কাজে ফিরতে চাপ দেওয়া হয়
শ্রমিকেরা সবচেয়ে গরমের মাসগুলোতে হাত-পা ফুলে যাওয়া, সাময়িকভাবে পেশি অবশ হয়ে যাওয়া, রক্তচাপের পরিবর্তন, শ্বাসকষ্ট, দৃষ্টি ঝাপসা হওয়া এবং চরম অবসাদের কথা জানিয়েছেন। এক নারী বলেন, নিয়মিত রাসায়নিকের সংস্পর্শে হওয়া খসখসে ফুসকুড়ির ব্যথা গ্রীষ্মে আরও বেড়ে যায়।
শরীর যখন অতিরিক্ত তাপ বের করে দিতে হিমশিম খায়, তখন তাপজনিত চাপ তৈরি হয়। দীর্ঘ সময় তাপের সংস্পর্শে থাকলে পানিশূন্যতা ও হিটস্ট্রোক হতে পারে, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং হৃদ্রোগ, ডায়াবেটিস ও হাঁপানির মতো বিদ্যমান অসুস্থতা আরও খারাপ হতে পারে। বাইরে থেকে লক্ষণ কম দেখা গেলেও শরীরের ভেতরে গুরুতর ক্ষতি হতে পারে।
তাপ ও স্বাস্থ্য নিয়ে গবেষণাকারী ফেম ল্যাবের প্রতিষ্ঠাতা আন্দ্রেয়াস ফ্লুরিস ব্যাখ্যা করেন, তাপের মধ্যে কাজ চালিয়ে গেলে বিপদ কীভাবে বাড়ে:
তাপের মধ্যে যত বেশি সময় কাজ করবেন, ততই এর ক্ষতি থেকে আপনার সুরক্ষা কমবে এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়বে।
অজ্ঞান হয়ে যাওয়া শ্রমিকেরা বলেছেন, কাজে ফিরতে বলার আগে তাঁদের প্রায়ই শুধু অল্প সময়ের বিরতি বা চিনিযুক্ত পানীয় দেওয়া হতো। তাঁদের ভাষ্য, সুপারভাইজারদের কাছে অভিযোগ করেও কোনো পরিবর্তন আসেনি। আশপাশে তাপ চলতে থাকলেও তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের লক্ষ্য ছিল শ্রমিকদের কাজে ফিরিয়ে দেওয়া।
অসুস্থতায় পরিবারের খাবারের বাজেট কমে যায়
সাক্ষাৎকার দেওয়া শ্রমিকদের মধ্যে মাত্র একজন বলেছেন, তিনি বেতনসহ অসুস্থতাজনিত ছুটি পান। অন্য সবাই জানিয়েছেন, তাপজনিত অসুস্থতায় কাজে যেতে না পারলে তাঁদের মজুরি কাটা যায়—কারখানার মেঝেতে অজ্ঞান হয়ে পড়ার পরও।
সিদ্দিকি বলেন, অজ্ঞান হওয়ার পর হাসপাতালে যাওয়ার খরচ বহন করতে তাঁর নিয়োগকর্তা অস্বীকার করেন। তাঁর মাসিক মজুরি ১৫ হাজার পাকিস্তানি রুপি, প্রায় ৫৪ ডলার; আবার ৩৫ হাজার রুপি, প্রায় ১২৫ ডলার বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। এই অসংগতি এখনও মীমাংসিত হয়নি। তিনি বলেন, চিকিৎসার খরচ দেওয়ার পর সন্তানদের জন্য পর্যাপ্ত খাবার কেনার সামর্থ্য তাঁর ছিল না।
বাড়িতে খাবারের ওপর এর প্রভাবের কথা সিদ্দিকি এভাবে জানান:
কখনো ওরা একবেলা খায়, কখনো একবেলাও খায় না।
তিনি বলেন, ছোট সন্তানরা কখনো কখনো ক্ষুধায় কাঁদে, আর বড়রা না খেয়ে থাকতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। চিকিৎসার খরচ ও মজুরি কেটে নেওয়ার ফলে কর্মস্থলের স্বাস্থ্যগত জরুরি পরিস্থিতি পরিবারের খাদ্যসংকটে রূপ নেয়।
এমন খরচের মুখে শ্রমিকেরা অসুস্থ হলেও কাজ চালিয়ে যাওয়ার প্রবল আর্থিক চাপে থাকেন। শীতলীকরণ সরঞ্জাম, পানির ব্যবস্থা এবং বিশ্রামের অনুমতি কারখানার ভেতরে তাপের সংস্পর্শ কমায়; আর বেতনসহ অসুস্থতাজনিত ছুটি সেই আয়ের চাপ সামলায়, যা অসুস্থ শ্রমিককে আবার উৎপাদনকক্ষে ফিরতে বাধ্য করতে পারে।
অ্যাকর্ড যে পরিবর্তনে সম্মত হয়েছে
২০১৩ সালে বাংলাদেশের রানা প্লাজা কারখানা ধসে ১১০০-এর বেশি মানুষের মৃত্যুর পর প্রতিষ্ঠিত নিরাপত্তা চুক্তি থেকে আন্তর্জাতিক অ্যাকর্ডের যাত্রা শুরু। কারখানার ঝুঁকি মোকাবিলায় এর দেশভিত্তিক কর্মসূচিতে স্বাধীন পরিদর্শন, শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ এবং অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা রয়েছে।
তাপসংক্রান্ত সিদ্ধান্তের আগ পর্যন্ত তাদের কাজ মূলত ভবন, অগ্নি, কাঠামো ও বয়লার নিরাপত্তায় কেন্দ্রীভূত ছিল। ক্লাইমেট রাইটস ইন্টারন্যাশনালের ১০ ডিসেম্বরের বিবৃতিতে তাপকে পরিদর্শন ও প্রতিকারমূলক ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করার অঙ্গীকারের কথা বলা হয়েছে; প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা বলতে অনিরাপদ পরিস্থিতি সংশোধনের প্রক্রিয়াকে বোঝানো হয়েছে।
অ্যাকর্ডের সচিবালয় ও কারিগরি কমিটি প্রটোকলটি তৈরি করবে। পরিকল্পিত আলোচনায় স্থানীয় ইউনিয়ন, শ্রমিক সহায়তা সংস্থা, ব্র্যান্ড এবং কারিগরি বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে; পর্যালোচ্য ব্যবস্থার মধ্যে প্রকৌশলভিত্তিক সমাধানও থাকবে।
ক্লাইমেট রাইটস ইন্টারন্যাশনালের গবেষক কারা শুল্টে বাধ্যতামূলক চুক্তিতে তাপকে ঝুঁকি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেন:
অ্যাকর্ডের এই উদ্যোগ বৈশ্বিক ফ্যাশনশিল্পে এক রূপান্তরমূলক মুহূর্তের সূচনা করতে পারে।
বাস্তব পরিবর্তনটি হবে, চরম তাপকে এমন একটি ঝুঁকি হিসেবে গণ্য করা, যা পরিদর্শকেরা মূল্যায়ন করবেন এবং অ্যাকর্ডের নিরাপত্তা প্রক্রিয়ার আওতায় কারখানাগুলোকে মোকাবিলা করতে হবে। শ্রমিকেরা পানির গুণমান ও তাপমাত্রা নিয়ে উদ্বেগসহ তাপসংক্রান্ত অভিযোগ জানাতে ইতিমধ্যেই অ্যাকর্ডের অভিযোগ ব্যবস্থা ব্যবহার করেছেন।
শ্রমিকদের অভিযোগ যেভাবে নিরাপত্তার আলোচ্যসূচিতে এল
ক্লাইমেট রাইটস ইন্টারন্যাশনাল ৪৫টি সংগঠনের স্বাক্ষরিত একটি চিঠির সমন্বয় করে, যেখানে তাপজনিত চাপকে অ্যাকর্ডের পঞ্চম নিরাপত্তা স্তম্ভ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে তাদের অনুসন্ধানে বিপজ্জনক ঘরোয়া তাপমাত্রা, অপর্যাপ্ত বায়ু চলাচল, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া এবং বিশ্রামে বাধা দেয় এমন উৎপাদনবিধির তথ্য উঠে এসেছে।
অভিযোগগুলো কীভাবে আনুষ্ঠানিক বিধিমালা তৈরির অঙ্গীকারে গড়াল, তার ধারাবাহিকতা হলো:
- সেপ্টেম্বর ২০২৫: জোটটি অ্যাকর্ডকে তাপজনিত চাপ স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানায় এবং স্টিয়ারিং কমিটি বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে।
- ২৪ নভেম্বর ২০২৫: ক্লাইমেট রাইটস ইন্টারন্যাশনাল পাকিস্তানে তাদের অনুসন্ধানের প্রাথমিক ফলাফল ব্যক্তিগতভাবে জানায় এবং অ্যাকর্ডের অবস্থান স্পষ্ট করার অনুরোধ করে।
- ৮ ডিসেম্বর ২০২৫: অ্যাকর্ড নিশ্চিত করে যে তাপজনিত চাপ তাদের দেশভিত্তিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় পড়ে এবং একটি প্রটোকল তৈরির অঙ্গীকার করে।
- ১০ ডিসেম্বর ২০২৫: ক্লাইমেট রাইটস ইন্টারন্যাশনাল অঙ্গীকারটি প্রকাশ্যে ঘোষণা করে।
পাকিস্তানবিষয়ক অনুসন্ধানটির শিরোনাম ছিল ‘তাপে আমাদের শরীরের কী হয়, তা তারা দেখে না’। এতে অনিরাপদ পানি, পানিশূন্যতা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া এবং চরম গরমের সময়ও বিরতি নিতে বাধা দেয় এমন কর্মস্থলের বিধির তথ্য তুলে ধরা হয়। এসব ফলাফলের সঙ্গে করাচির শ্রমিকদের বর্ণিত সমস্যাগুলোর ঘনিষ্ঠ মিল রয়েছে।
প্রস্তাবিত প্রটোকলটি পুনরাবৃত্ত এসব অভিযোগকে প্রতিরোধমূলক পরিদর্শন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করবে। অর্থাৎ আরেকজন শ্রমিক অসুস্থ হওয়ার আগেই বিপজ্জনক পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা হবে, পাশাপাশি অভিযোগ ওঠার পরও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
লাখো শ্রমিক আওতায়, তবে অনেকে এখনও বাইরে
অ্যাকর্ডে ২৮২টি ব্র্যান্ড স্বাক্ষরকারী হিসেবে রয়েছে এবং দক্ষিণ এশিয়ার ২,০০০-এর বেশি কারখানার ৩০ লাখের বেশি শ্রমিক এর আওতায়। সদস্যদের মধ্যে রয়েছে ইন্ডিটেক্স—জারার মূল কোম্পানি—এবং ম্যাংগো; পাশাপাশি অ্যাডিডাস, এএসওএস, বেস্টসেলার, এইচঅ্যান্ডএম গ্রুপ ও পিভিএইচ।
এনওয়াইইউ স্টার্ন সেন্টার ফর বিজনেস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস তাদের সিদ্ধান্তটির বিশ্লেষণে বলেছে, আওতাভুক্ত কারখানার সংখ্যা বাংলাদেশে ১,৬০০-এর কিছু বেশি এবং পাকিস্তানে ৪০০। বিশ্লেষণে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশের ৩,৩২০টি পোশাক কারখানার মাত্র প্রায় অর্ধেক এই চুক্তির আওতায়।
পোশাক উৎপাদনে এশিয়ার ভূমিকার কারণে বিষয়টি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কেন্দ্রটির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে বৈশ্বিক পোশাক ও টেক্সটাইল রপ্তানির ৫৫ শতাংশ এসেছে এ অঞ্চল থেকে এবং এ খাতে প্রায় ৬ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রায় ৭৫ শতাংশ শ্রমিক প্রতিবছর চরম তাপের মুখে পড়েন।
কেন্দ্রটি আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার হিসাব উদ্ধৃত করে বলেছে, বিশ্বজুড়ে প্রায় ২৪০ কোটি শ্রমিক—কর্মজীবী জনগোষ্ঠীর আনুমানিক ৭০ শতাংশ—প্রতি বছর চরম তাপের সম্মুখীন হন। বিভিন্ন পেশায় তাপের কারণে বছরে প্রায় ২ কোটি ৩০ লাখ প্রাণঘাতী নয় এমন আঘাত এবং প্রায় ১৯ হাজার মৃত্যু ঘটে।
প্রাথমিক সুরক্ষার জন্য পানি, বিরতি ও তাপমাত্রা পরিমাপ জরুরি
ফ্লুরিস কারখানাগুলোতে নেওয়ার মতো বাস্তবসম্মত কিছু ব্যবস্থার কথা বলেন: ঘরের ভেতরের তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা মাপা, ঠান্ডা পানীয় জলের ব্যবস্থা করা এবং শ্রমিকদের বিশ্রামের সুযোগ দেওয়া। তাপ ও আর্দ্রতা—দুটিই মাপা জরুরি, কারণ আর্দ্রতার ওপর নির্ভর করে একই বায়ু তাপমাত্রা শরীরের ওপর ভিন্ন চাপ ফেলতে পারে।
কারখানাগুলো যন্ত্রপাতি থেকে ছড়িয়ে পড়া তাপ কমাতে প্রতিবন্ধক বসাতে, বায়ু চলাচল ও শীতলীকরণব্যবস্থা উন্নত করতে এবং বেশি সূর্যালোক প্রতিফলনের জন্য ছাদ সাদা রং করতে পারে। এসব ব্যবস্থায় তাপের বিভিন্ন উৎস মোকাবিলা করা হয়; পুরো উৎপাদনকক্ষ ঠান্ডা করতে ছোট একটি পাখার ওপর নির্ভর করতে হয় না।
ফ্লুরিস ব্যবস্থাগুলোকে অর্থনৈতিকভাবে সম্ভব ও সহজ বলে বর্ণনা করেন:
আমরা খুবই সহজ কিছু কৌশলের কথা বলছি।
শ্রমিকেরা বলেছেন, তাঁদের কারখানায় এসব ব্যবস্থার প্রায় কোনোটিই ছিল না। মাত্র একজন বায়ু চলাচলব্যবস্থা থাকার কথা জানিয়েছেন; তবে তাঁর ভাষ্য, নিরীক্ষকেরা এলে কেবল সেটি চালানো হতো। এতে দৈনন্দিন পরিচালনার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে: শ্রমিকেরা যখন গরমের মুখে পড়েন, তখন স্বাভাবিক কর্মপরিবেশেও সরঞ্জামগুলো সচল থাকতে হবে।
অর্থায়নও গুরুত্বপূর্ণ। এনওয়াইইউ স্টার্নের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের অ্যাকর্ডে ব্র্যান্ডগুলোকে কারখানার নিরাপত্তা কর্মসূচিতে সহায়তা করতে এবং প্রয়োজনীয় মেরামতের খরচ বহনযোগ্য করে এমন ক্রয়শর্ত নিয়ে আলোচনা করতে উৎসাহিত করা হয়েছে। এতে আরও বলা হয়েছে, বাস্তবায়নের অধিকাংশ খরচ এখনও সরবরাহকারীদেরই বহন করতে হয়। উৎপাদনকক্ষের পরিবেশ কারখানার মালিকেরা নিয়ন্ত্রণ করেন, আর তাদের পণ্য কেনা ব্র্যান্ডগুলো দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়ন আর্থিকভাবে সম্ভব করতে সহায়তা করতে পারে।
ব্র্যান্ডগুলোর পদক্ষেপের প্রতিশ্রুতি, প্রয়োগের ঘাটতি স্বীকার সিন্ধু সরকারের
ইন্ডিটেক্স জানিয়েছে, কারখানার হালনাগাদ নিরীক্ষা, সরবরাহকারীদের নির্দেশনা ও প্রশিক্ষণ এবং শিল্পখাতের উদ্যোগগুলোর সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে তারা তাপ মোকাবিলায় নিজেদের পদক্ষেপ জোরদার করছে। ম্যাংগো জানিয়েছে, চরম তাপমাত্রা ও তাপজনিত চাপ মোকাবিলায় তাদের সরবরাহকারী আচরণবিধি আরও জোরদার করা হয়েছে।
শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা বিষয়ে কোম্পানির অবস্থান তুলে ধরে ম্যাংগোর এক মুখপাত্র বলেন:
আলোচনার ঊর্ধ্বে অগ্রাধিকার
করাচির পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব লেবার এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চের কর্মসূচি ব্যবস্থাপক ফারহান হায়দারের মতে, শ্রমিকদের সুরক্ষায় পাকিস্তানে জাতীয় ও প্রাদেশিক আইন এবং সাংবিধানিক সুরক্ষাব্যবস্থা রয়েছে। শ্রমিকদের বর্ণনায় বিদ্যমান সুরক্ষাব্যবস্থার প্রয়োগের বিষয়টি নতুন আন্তর্জাতিক বিধিমালা তৈরির পাশাপাশি উঠে এসেছে।
সিন্ধু সরকারের মুখপাত্র ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য সাদিয়া জাভেদ বিধিমালা বাস্তবায়নের অসুবিধা স্বীকার করেন:
সরকার এসব বিধিমালা কার্যকর করার চেষ্টা করছে, তবে প্রদেশের বিশাল আয়তন এবং অসংখ্য শিল্পাঞ্চলের উপস্থিতির কারণে অভিযোগ ওঠা অনিবার্য।
করাচির শ্রমিকদের বক্তব্যে প্রয়োজনগুলো একই: বিশুদ্ধ পানীয় জল, সচল শীতলীকরণব্যবস্থা, অসুস্থ হলে কাজ থামানোর অনুমতি এবং প্রয়োজনীয় আয় হারানো থেকে সুরক্ষা। অ্যাকর্ডের অঙ্গীকার পরিদর্শন ও প্রয়োজনীয় উন্নয়নের মাধ্যমে তাপ মোকাবিলার একটি পথ তৈরি করেছে। সিদ্দিকির অভিজ্ঞতা দেখায়, সুরক্ষাব্যবস্থা বাস্তবায়নের অপেক্ষায় থাকলে কী মূল্য দিতে হয়।
মূল বিষয়গুলো
- করাচির কারখানাশ্রমিকেরা তাপজনিত অসুস্থতায় অজ্ঞান হওয়া, শীতলীকরণব্যবস্থার ঘাটতি এবং মজুরি কেটে নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
- সাক্ষাৎকার দেওয়া শ্রমিকদের মধ্যে মাত্র একজন বেতনসহ অসুস্থতাজনিত ছুটি পাওয়ার কথা বলেছেন; কেউই কর্মস্থলে তাপমাত্রা মাপার সেন্সরের কথা জানাননি।
- আন্তর্জাতিক অ্যাকর্ড তাপজনিত চাপ মোকাবিলায় একটি প্রটোকল তৈরির অঙ্গীকার করেছে, তবে তা এখনও কার্যকর হয়নি।
- বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের ২,০০০-এর বেশি কারখানার ৩০ লাখের বেশি শ্রমিক এই চুক্তির আওতায় রয়েছেন।
- সুপারিশকৃত সুরক্ষাব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা মাপা, ঠান্ডা পানীয় জল, বিশ্রামের বিরতি, বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা এবং গরম যন্ত্রপাতির চারপাশে তাপরোধক প্রতিবন্ধক।
- ইন্ডিটেক্স ও ম্যাংগো তাপ সুরক্ষা জোরদারের কথা জানিয়েছে, আর সিন্ধু সরকার বিধিমালা প্রয়োগের সমস্যার কথা স্বীকার করেছে।






