নির্বাচন নিয়ে সতর্কবার্তার পেছনে বিশাল তথ্যভান্ডার
তাইওয়ানের ডাবলথিংক ল্যাবের পর্যালোচনা করা চীনা একটি কোম্পানির ফাঁস হওয়া নথিতে রয়েছে তাইওয়ানের প্রায় ২ কোটি ৩০ লাখ পরিবারের নিবন্ধন-সংক্রান্ত রেকর্ড, সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ৬২ লাখের বেশি তথ্য এবং প্রায় ৫,০০০ লক্ষ্যবস্তু অ্যাকাউন্ট। স্থানীয় নির্বাচন সামনে রেখে ২০২৬ সালের ২৮ নভেম্বরের আগে তাইওয়ানের জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের নতুন সতর্কবার্তার পেছনে থাকা তথ্য ও প্রযুক্তির বিস্তারিত চিত্র পাওয়া যায় এসব নথিতে।
সূচিপত্র
- নির্বাচন নিয়ে সতর্কবার্তার পেছনে বিশাল তথ্যভান্ডার
- ২ কোটি ৩০ লাখ রেকর্ডে কী আছে
- কীভাবে দর্শকদের আলাদা লক্ষ্যবস্তু করা হয়
- স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ থেকে রাজনৈতিক আক্রমণ
- ভুয়া পরিচয় টিকিয়ে রাখার অবকাঠামো
- এআইয়ের মাধ্যমে নজরদারি, লেখালেখি ও প্রচারের সংযোগ
- নথিতে কয়েক বছরের নির্বাচন-সংক্রান্ত কাজের বিবরণ
- গোল্যাক্সির সঙ্গে কারা যুক্ত
- কেন্দ্রে তাইওয়ান, আরও বিস্তৃত অভিযান
- মূল বিষয়গুলো
সম্প্রতি এক অভ্যন্তরীণ ব্রিফিংয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কর্মকর্তারা বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে চীন বিশ্বাসযোগ্য ভুয়া পরিচয় তৈরি করছে, দর্শকদের রাজনৈতিক শ্রেণিতে ভাগ করছে এবং বিভাজন বাড়াতে বা ভোটদানে নিরুৎসাহিত করতে পরিকল্পিত বার্তা ছড়াচ্ছে। তাঁদের বর্ণনা অনুযায়ী, এ ধরনের অভিযান শুরু হতে পারে সাধারণ জীবনযাপন নিয়ে পোস্ট দিয়ে, পরে তা রাজনৈতিক আক্রমণে রূপ নিতে পারে।
ডিজিটাল গোয়েন্দা দল ও গবেষক অ্যাথেনা টংয়ের লেখা ডাবলথিংক ল্যাবের গোল্যাক্সির নথি বিশ্লেষণে রাজনৈতিক নজরদারি, ব্যক্তিগত প্রোফাইল, স্বয়ংক্রিয় লেখালেখি এবং সমন্বিতভাবে প্রকাশনার সংযোগ ঘটানো একটি ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। চায়নিজ একাডেমি অব সায়েন্সেসের ইনস্টিটিউট অব কম্পিউটিং টেকনোলজি থেকে গড়ে ওঠা কোম্পানিটির আরেক নাম ঝংকে তিয়ানজি।
ভোটারদের জন্য বাস্তব উদ্বেগ হলো, স্বাস্থ্য, স্কুল বা দৈনন্দিন জীবন নিয়ে কথা বলা পরিচিত কোনো অ্যাকাউন্ট বিদেশ থেকে পরিচালিত কাল্পনিক ব্যক্তির হতে পারে। এরপর সেই অ্যাকাউন্টের রাজনৈতিক বার্তা অনুসারীদের আগ্রহ ও হতাশা অনুযায়ী বদলে দেওয়া হতে পারে।
তাইওয়ানে স্থানীয় নির্বাচনের নয়টি ধরনে স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রার্থীরা ভোটারদের মুখোমুখি হন। জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের আরও অভিযোগ, ২০২৫ সালের গ্রীষ্মে চীন ১,৮৫০ জন প্রার্থীকে লক্ষ্য করে পদ্ধতিগতভাবে আক্রমণ চালায়। তাঁদের ভাষ্য, সাম্প্রতিক সময়ে পরিচালকেরা বাছাই করা আলোচনার বিষয়, সংবাদ সম্মেলন ও তৃতীয় পক্ষকে কাজে লাগিয়ে সংশ্লিষ্ট বয়ান ছড়িয়েছেন।
২ কোটি ৩০ লাখ রেকর্ডে কী আছে
ডাবলথিংক ল্যাবের বর্ণনা অনুযায়ী, সবচেয়ে বড় সংবেদনশীল তথ্যভান্ডারটিতে প্রায় ২ কোটি ৩০ লাখ পরিবারের নিবন্ধন-সংক্রান্ত রেকর্ড রয়েছে, যা অপ্রকাশ্য সূত্র থেকে পাওয়া। নথিতে আরও আছে ১৭০টি বিস্তারিত রাজনৈতিক প্রোফাইল, ৭৫টি রাজনৈতিক দল, ১,৪৭৮টি কোম্পানি, ১৩ হাজারের বেশি ধর্মীয় গোষ্ঠী এবং প্রায় ২৪ হাজার নাগরিক সংগঠন।
পরিবারগুলোর রেকর্ডের উৎস, বয়স, নির্ভুলতা এবং এতে কতজন স্বতন্ত্র মানুষের তথ্য আছে, তা স্পষ্ট নয়। ভোটে কথিত অভিযানের পরিমাপযোগ্য প্রভাবও অজানা। সংখ্যাটি ডেটাবেসের রেকর্ড বোঝায়; আর বৃহত্তর সংগ্রহে রয়েছে ব্যক্তিগত তথ্য, প্রতিষ্ঠান-সংক্রান্ত রেকর্ড এবং অনলাইনে প্রকাশিত কনটেন্ট।
বিশ্বজুড়ে তাইওয়ান-সম্পর্কিত অন্তত ১০ হাজার সূত্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করে গোল্যাক্সি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রায় ৫,০০০ গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুকে এমন ব্যক্তি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যাঁদের অনলাইন পরিচয়ের সঙ্গে বাস্তব ব্যক্তিকে যুক্ত করা সম্ভব। এভাবে কোনো অ্যাকাউন্টের পোস্ট পর্যবেক্ষণ থেকে পরিচালকেরা ওই ব্যক্তির রাজনৈতিক, পেশাগত বা সামাজিক সম্পর্ক খতিয়ে দেখতে পারেন।
রাজনৈতিক প্রোফাইলগুলোতে বিভিন্ন শিবিরের ব্যক্তিত্ব রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে আছেন প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে, সাবেক প্রেসিডেন্ট সাই ইং-ওয়েন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী সু সেং-চাং, তাইওয়ান পিপলস পার্টির সাবেক চেয়ারম্যান কো ওয়েন-জে এবং কুওমিনতাংয়ের রাজনীতিক হৌ ইউ-ইহ। প্রোফাইলে দলীয় সদস্যপদ, সরকারি পদ, জন্মস্থান, বাসস্থান, শিক্ষা, ধর্ম ও সামাজিক সম্পর্কের মতো তথ্য রয়েছে।
এ-সম্পর্কিত একটি নলেজ গ্রাফে দল, নেতা, প্রতিষ্ঠান ও স্থানগুলোর মধ্যে সংযোগ দেখানো হয়েছে। নলেজ গ্রাফ হলো সম্পর্ক খুঁজে দেখার উপযোগী একটি মানচিত্র: আলাদা আলাদা নাম সংরক্ষণের বদলে এটি দেখাতে পারে কে কোনো সংগঠনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, সেটি কোথায় কাজ করে এবং অন্য ব্যক্তিদের সঙ্গে কীভাবে যুক্ত। গোল্যাক্সির সংস্করণে কোনো প্রতিষ্ঠানের চীন-সম্পর্কিত মনোভাব নথিবদ্ধ করার ঘরও রয়েছে।
কীভাবে দর্শকদের আলাদা লক্ষ্যবস্তু করা হয়
জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তারা দর্শকদের চারটি শ্রেণির কথা বলেছেন: কট্টরপন্থী, বন্ধুভাবাপন্ন ব্যক্তি, যাঁরা মত বদলাতে পারেন এবং যাঁদের নিরপেক্ষ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়। কাকে কোন বার্তা পাঠানো হবে, তা ঠিক করতে পরিচালকেরা এসব শ্রেণির নাম ব্যবহার করেন।
ফাঁস হওয়া নথিতে আরও নির্দিষ্ট একটি প্রকল্পের শর্ত খুঁজে পেয়েছে ডাবলথিংক ল্যাব। এতে তাইওয়ান-সম্পর্কিত অন্তত ৫০ হাজার সংবাদ সংগ্রহ এবং সেগুলোতে উল্লিখিত ব্যক্তিদের ওই চারটি শ্রেণি ও তাদের বিপরীত শ্রেণিতে ভাগ করার কথা বলা হয়েছে। প্রতিটি শ্রেণিতে অন্তত ১,০০০ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি রাখার লক্ষ্যও ছিল।
১৭০টি বিস্তারিত রাজনৈতিক প্রোফাইল এবং প্রতি শ্রেণিতে অন্তত ১,০০০ ব্যক্তির শর্ত নথির ভিন্ন অংশের বিষয়: সারসংক্ষেপে বর্ণিত বিদ্যমান সংগ্রহ এবং আরও বিস্তৃত প্রকল্পের লক্ষ্য। একসঙ্গে এগুলো থেকে বোঝা যায়, কী তথ্য গোছানো হচ্ছিল এবং আরও কত ব্যাপকভাবে শ্রেণিবিন্যাস করার পরিকল্পনা ছিল।
দর্শক শ্রেণিবিন্যাস বলতে একই বৈশিষ্ট্য থাকা ছোট ছোট দলে বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে ভাগ করাকে বোঝায়। বিজ্ঞাপনে এর মাধ্যমে ঠিক করা হতে পারে কারা কোনো প্রচার দেখতে পাবেন। কর্মকর্তাদের ভাষ্য, এখানে মানুষের মনোভাব ও দুর্বলতা অনুযায়ী রাজনৈতিক বয়ান বাছাই করতে এ পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে।
একনিষ্ঠ সমর্থকদের লক্ষ্য করে পাঠানো বার্তায় একই শিবিরের অন্যদের প্রতি ক্ষোভ উসকে দেওয়া হতে পারে। আর যাঁরা নিশ্চিত নন, তাঁদের উদ্দেশে বলা হতে পারে যে কোনো প্রার্থীই উপযুক্ত নন, অথবা রাজনৈতিক প্রচেষ্টা অর্থহীন। এর উদ্দেশ্য নির্দিষ্ট কোনো প্রতিদ্বন্দ্বীকে সমর্থন করানো না-ও হতে পারে; বরং মানুষকে রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হতে পারে।
স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ থেকে রাজনৈতিক আক্রমণ
কর্মকর্তারা চারটি নিয়মিত পদ্ধতির কথা বলেছেন: বিভিন্ন দর্শকের জন্য বয়ান সাজানো, বিশ্বাসযোগ্য ভুয়া অ্যাকাউন্ট দিয়ে কমিউনিটিতে প্রবেশ, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ কমানো এবং দৈনন্দিন উদ্বেগ নিয়ে মিথ্যা দাবি ছড়ানো।
একটি উদাহরণে এমন একটি অ্যাকাউন্ট বা পেজের কথা বলা হয়েছে, যেটি শুরুতে স্বাস্থ্য ও সুস্থতা নিয়ে আলোচনা করে। দর্শক আকৃষ্ট হওয়ার পর সেটি অভিযোগ তুলতে পারে যে স্বাস্থ্য ও কল্যাণ মন্ত্রণালয় ওই পাঠকদের অবহেলা করেছে। পরিচিত বিষয় সাধারণ আলাপ থেকে রাজনৈতিক চাপ তৈরির সেতু হয়ে ওঠে।
অন্য উদাহরণে বলা হয়েছে, কোনো প্রার্থী নির্বাচিত হলে বিতর্কিত ওষুধ বিপুল পরিমাণে ব্যবহারের অনুমতি দেবেন, অথবা দায়িত্ব নেওয়ার পর রাত্রিকালীন বিনোদন ব্যবসার ওপর বিধিনিষেধ শিথিল করবেন—এমন মিথ্যা দাবি বানানো হতে পারে। কর্মকর্তাদের মতে, বাবা-মা ও বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে উদ্বেগ উসকে দিতেই এসব মিথ্যা বয়ান তৈরি করা হয়।
পরিচালকেরা কোনো কমিউনিটির রাজনৈতিক আনুগত্যের ভাগীদার হওয়ার ভান করে সংবেদনশীল কোনো ঘটনার সময় চরম মন্তব্যও পোস্ট করতে পারেন। মিত্র বলে মনে হওয়া কেউ কোনো গোষ্ঠীর ভেতর থেকেই পারস্পরিক বিরোধ উসকে দিতে পারেন, যাতে বিরোধটি প্রকৃত সমর্থকদের স্বতঃস্ফূর্ত মতানৈক্য বলে মনে হয়।
জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তারা বলেন, তাইওয়ানিদের বলে মনে হওয়া থ্রেডসের কয়েকটি অ্যাকাউন্ট যাচাই করে অন্য দেশের নিবন্ধিত ফোন নম্বর পাওয়া গেছে। চলমান নজরদারির অংশ হিসেবে তদন্তকারীরা এসব তথ্যের পাশাপাশি পোস্ট করার ধরন, বানানো পরিচয় এবং বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে সমন্বয়ের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখছেন।
ভুয়া পরিচয় টিকিয়ে রাখার অবকাঠামো
গোল্যাক্সির নথিতে ফেসবুক, এক্স, ইনস্টাগ্রাম, লাইন, টেলিগ্রাম, টিকটক, ইউটিউবসহ বিভিন্ন সেবায় অ্যাকাউন্ট গড়ে তোলার একটি কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার বর্ণনা আছে। অ্যাকাউন্ট তৈরির প্রতিটি ব্যবস্থা ৫০টির বেশি মোবাইল ডিভাইস পরিচালনা করতে পারত। একটি ড্যাশবোর্ডের স্ক্রিনশটে ৩,৬৯২টি ভার্চুয়াল পরিচয় দেখা গেছে।
অ্যাকাউন্ট তৈরি করা বলতে দীর্ঘ সময় ধরে অ্যাকাউন্ট বানানো ও সচল রাখাকে বোঝায়, যাতে সেগুলো সাধারণ ব্যবহারকারীর বলে মনে হয়। কাল্পনিক ব্যক্তির একটি সামঞ্জস্যপূর্ণ নাম, ছবি, ভাষা, যোগাযোগের তথ্য এবং পোস্টের ইতিহাস প্রয়োজন। নিয়মিত কার্যকলাপের ফলে ওই পরিচয়টি পরিচিত হয়ে উঠতে পারে, এরপর সেটি রাজনৈতিক বার্তা ছড়ায়।
নথিতে বর্ণনা করা হয়েছে, কীভাবে নির্দিষ্ট একটি ডিভাইস কাল্পনিক কোনো ব্যক্তির জন্য বরাদ্দ করা হয়; সেই ব্যক্তির বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে অ্যাকাউন্টও থাকতে পারে। নতুন তৈরি অ্যাকাউন্ট এবং সাম্প্রতিক সময়ে স্থগিতাদেশ কাটিয়ে ফিরে আসা অ্যাকাউন্টসহ বিভিন্ন অবস্থার অ্যাকাউন্ট পরিচালনার নিয়মও এতে দেওয়া হয়েছে।
এসব পরিচয়কে সহায়তা করতে গোল্যাক্সির ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক ফোন নম্বর, ইমেইল ঠিকানা ও নেটওয়ার্ক সংযোগ দিত। প্ল্যাটফর্মের শনাক্তকরণ এবং অ্যাকাউন্ট সরিয়ে ফেলার বিষয়টিকে অভ্যন্তরীণ আলোচনায় বড় পরিচালনাগত বাধা হিসেবে দেখা হয়েছে। তাই কনটেন্ট তৈরির পাশাপাশি অ্যাকাউন্ট সচল রাখতেও পরিচালকেরা সম্পদ ব্যয় করতেন।
গোল্যাক্সির পরিচালিত বলে ধারণা করা সাতটি অ্যাকাউন্ট শনাক্ত করেছে ডাবলথিংক ল্যাব। ফাঁস হওয়া নথির অন্য অংশে নাম ও ছবি পাওয়া যাওয়া কয়েকজন প্রকৌশলীর সঙ্গে কিছু অ্যাকাউন্টের যোগসূত্রও খুঁজে পেয়েছেন গবেষকেরা। তদন্তে চুরি করা বা এআই দিয়ে তৈরি প্রোফাইল ছবি ব্যবহার করা এবং তাইওয়ানের নাগরিক পরিচয় দেওয়া কথিত সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টও পাওয়া গেছে।
২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর একই ধরনের এআই-তৈরি পোষা প্রাণীর ছবি শেয়ার করা সন্দেহভাজন তিনটি অ্যাকাউন্ট দেখেছেন গবেষকেরা। কয়েকটি অ্যাকাউন্টে তাইওয়ানের রাজনীতি নিয়েও পোস্ট ছিল। শনাক্ত করা গেছে এমন কয়েকটি অ্যাকাউন্টে যোগাযোগ ও প্রতিক্রিয়া ছিল সামান্য, আর সেগুলোর কনটেন্টও ছিল বেশ সাধারণ; অথচ নথিতে অনেক বেশি উচ্চাভিলাষী সক্ষমতার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে।
এআইয়ের মাধ্যমে নজরদারি, লেখালেখি ও প্রচারের সংযোগ
গোল্যাক্সির প্রস্তাবিত গোপ্রো প্রচারব্যবস্থা চারটি ধাপকে একত্র করে: রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ পর্যবেক্ষণ, লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণ, কনটেন্ট তৈরি এবং বিদেশি প্ল্যাটফর্মে অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে তা প্রকাশ। নথিতে ব্যবস্থাটির জন্য কাজ করা ৫০ জনের একটি বিশেষ দলের কথা বলা হয়েছে।
প্রাকৃতিক ভাষা প্রক্রিয়াকরণ—মানুষের ভাষা বিশ্লেষণকারী সফটওয়্যার—বিষয়, অনুভূতি ও রাজনৈতিক অবস্থান অনুযায়ী পোস্ট ও সংবাদ সাজাতে সাহায্য করে। এরপর পরিচালকেরা ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বেছে নিয়ে তাদের উপযোগী কনটেন্ট তৈরি করতে এবং কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ভিন্ন ভিন্ন সংস্করণ ছড়াতে পারেন।
কনটেন্ট তৈরির সরঞ্জামগুলোর মধ্যে রয়েছে অনুচ্ছেদ সম্পূর্ণ করা, সহায়ক উপকরণ সুপারিশ করা এবং একই বার্তা ভিন্ন ভাষায় নতুন করে লেখা। এতে পরিচালকেরা অভিন্ন বয়ান ছড়াতে পারেন, অথচ প্রতিটি অ্যাকাউন্টে হুবহু একই বাক্য বারবার লেখার প্রয়োজন হয় না।
পাশাপাশি একটি পরিচয় তৈরির প্রকল্পে তাইওয়ানের মান্দারিন, তাইওয়ানি হোকিয়েন ও ইংরেজিতে কথোপকথন ও যোগাযোগের জন্য স্ক্রিপ্ট চাওয়া হয়েছিল। শর্ত অনুযায়ী, ১০টি ভার্চুয়াল পরিস্থিতিতে অন্তত ১০০টি ভার্চুয়াল পরিচয় থাকতে হবে; কথোপকথন ও কনটেন্টে লেখা, ছবি, অডিও ও ভিডিও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
এই সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ, কারণ নজরদারি ও বার্তা তৈরি একে অপরকে প্রভাবিত করতে পারে। পরিচালকেরা কোনো বিষয়ে মানুষের প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করে ভাষা বদলে অন্য অ্যাকাউন্ট বা প্ল্যাটফর্মে আবার চেষ্টা করতে পারেন। জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তারা বলেছেন, সহায়ক কর্মীরা এসব অভিযান পর্যবেক্ষণ, মূল্যায়ন ও সংশোধন করে চলেন।
টোকিও বিশ্ববিদ্যালয় ও চায়না স্ট্র্যাটেজিক রিস্কস ইনস্টিটিউটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গবেষক টং বলেন, এআই পরিচালকেরা যে পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারেন এবং যে সংখ্যক বার্তার ভিন্নতা তৈরি করতে পারেন, তা অনেক বাড়িয়ে দেয়। ডাবলথিংক ল্যাবের তদন্তে এ সক্ষমতার পাশাপাশি বাস্তব মানুষের সাড়া পাওয়া যায় এমন বিশ্বাসযোগ্য অ্যাকাউন্ট চালিয়ে যাওয়ার চলমান কঠিনতার কথাও তুলে ধরা হয়েছে।
নথিতে কয়েক বছরের নির্বাচন-সংক্রান্ত কাজের বিবরণ
ফাঁস হওয়া নথির সংগ্রহটি ৩৯৯ পৃষ্ঠার। এতে উপস্থাপনা, বিক্রয়-সংক্রান্ত উপকরণ এবং অভ্যন্তরীণ বৈঠকের রেকর্ড আছে। গবেষক ব্রেট জে. গোল্ডস্টেইন ও ব্রেট ভি. বেনসন ফাইলগুলো খুঁজে পান; একাডেমিক গবেষণার জন্য সেগুলো ভ্যান্ডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ন্যাশনাল সিকিউরিটিতে সংরক্ষিত রয়েছে।
কয়েকটি তারিখ সাম্প্রতিক সতর্কবার্তার সঙ্গে আগের পরিকল্পনা ও নজরদারির যোগসূত্র দেখায়:
- ডিসেম্বর ২০২২: বৈঠকের নথিতে তাইওয়ানকে লক্ষ্য করে তথ্য প্রভাবিত করার কাজে সহযোগিতা, তথ্য সংগ্রহ, বিশ্বাসযোগ্য ডিজিটাল পরিচয় এবং কনটেন্ট প্রচার নিয়ে আলোচনা হয়।
- ২৫ নভেম্বর থেকে ১ ডিসেম্বর ২০২৩: তাইওয়ানের ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে একটি নির্বাচন পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে ৬,৩৪,৪৪৮টি কনটেন্টের তথ্য অনুসরণ করা হয়।
- গ্রীষ্ম ২০২৫: তাইওয়ানের জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের মতে, চীন পদ্ধতিগতভাবে ১,৮৫০ জন প্রার্থীকে লক্ষ্যবস্তু করে।
- ৫ আগস্ট ২০২৫: গোল্যাক্সির ফাইলের অস্তিত্ব ও গুরুত্ব জনসমক্ষে আসে।
- ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫: সন্দেহভাজন সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টগুলোকে একই ধরনের এআই-তৈরি পোষা প্রাণীর ছবি সমন্বিতভাবে শেয়ার করতে দেখেন গবেষকেরা।
- অক্টোবর ২০২৬: ২৮ নভেম্বরের স্থানীয় নির্বাচন সামনে রেখে ক্রমবর্ধমান স্বয়ংক্রিয় হস্তক্ষেপ নিয়ে সতর্ক করেন কর্মকর্তারা।
২০২৩ সালের শেষ দিকের সাপ্তাহিক প্রতিবেদনটিতে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের অনুসরণ করা হয় এবং হৌ ইউ-ইহ, জাও শাও-কং ও কো ওয়েন-জের মতো ব্যক্তিত্বদের নিয়ে মানুষের মনোযোগে পরিবর্তন নথিবদ্ধ করা হয়। এতে আক্রমণ, পাল্টা আক্রমণ এবং চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে বিতর্কও খতিয়ে দেখা হয়।
সাত দিনে ৬,৩৪,৪৪৮টি তথ্য মানে দৈনিক প্রায় ৯০,৬৩৫টি। এই হিসাব নজরদারির কাজের ব্যাপ্তি বোঝায়। রাজনৈতিক বয়ান এবং প্রধান শিবিরগুলোর ভেতরের সংহতি মূল্যায়নে প্রতিবেদনটিতে কনটেন্ট ও মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগ বিশ্লেষণ করা হয়।
গোল্যাক্সির সঙ্গে কারা যুক্ত
ডাবলথিংক ল্যাবের ভাষ্য, নথির একটি প্রকল্প ও গ্রাহক-তালিকায় চীনের সাইবারস্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশনের সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি কমিশন, তাইওয়ান অ্যাফেয়ার্স অফিস এবং বেস ৩১১-এর নাম রয়েছে। বেস ৩১১ পিএলএ ইউনিট ৬১৭১৬ নামেও পরিচিত; এটি ফুঝৌতে অবস্থিত এবং তাইওয়ানকে লক্ষ্য করে মনস্তাত্ত্বিক অভিযানের সঙ্গে যুক্ত।
চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে সরাসরি যোগসূত্র থাকার কথা অস্বীকার করেছে গোল্যাক্সি। টং বলেন, তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে স্বাক্ষরিত কিছু চুক্তির সঙ্গে পিপলস লিবারেশন আর্মি, দল বা সরকারি সংস্থার স্পষ্ট যোগসূত্র ছিল।
নথিতে প্রযুক্তি ও গণমাধ্যম অংশীদারদের একটি নেটওয়ার্কের কথাও রয়েছে। তাদের কাজের মধ্যে তথ্য সংগ্রহ, ভাষা প্রযুক্তি, ডিজিটাল গণমাধ্যমের কনটেন্ট তৈরি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরিচালনা অন্তর্ভুক্ত। ২০২২ সালের ডিসেম্বরের বৈঠকে তাইওয়ানকেন্দ্রিক একটি প্রকল্পের বিভিন্ন অংশে কয়েকটি অংশীদার কীভাবে অবদান রাখবে, তা নিয়ে আলোচনা হয়।
তাই ডাবলথিংক ল্যাবের বিশ্লেষণে বাণিজ্যিক সরবরাহকারী, গবেষণা-দক্ষতা এবং রাষ্ট্রীয় গ্রাহকদের নিয়ে গড়ে ওঠা একটি ব্যবস্থার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। সরকার বা সামরিক সংস্থাগুলো ব্যবহার করতে পারে—এমন ডেটাবেস, সফটওয়্যার ও অ্যাকাউন্ট অবকাঠামো সরবরাহ করে কোম্পানিগুলো।
কেন্দ্রে তাইওয়ান, আরও বিস্তৃত অভিযান
গোল্যাক্সির নথিতে যুক্তরাষ্ট্র, হংকং এবং চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড রুটের পাশের দেশগুলোতেও একই ধরনের নজরদারির বর্ণনা রয়েছে। হংকংয়ের ক্ষেত্রে কোম্পানির একটি উপস্থাপনায় দাবি করা হয়, ১ লাখ ৮০ হাজার টুইটার ব্যবহারকারীর তথ্য বিশ্লেষণ করে ৩,০০০-এর বেশি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এবং ১০০-এর বেশি অনলাইন জনমত-প্রভাবক শনাক্ত করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র-সংক্রান্ত উপকরণে আরও ২,০০০-এর বেশি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও জনমত-প্রভাবকের পাশাপাশি সাংবাদিক, গবেষক, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও প্রতিষ্ঠানের তথ্য রয়েছে। নির্বাচন-সংক্রান্ত একটি ড্যাশবোর্ডের নকশায় রাজনৈতিক ক্যালেন্ডার, প্রার্থীদের প্রতি মানুষের মনোযোগ, প্রচারের অর্থায়ন এবং অঙ্গরাজ্যভিত্তিক ভোট বিশ্লেষণ একত্র করা হয়েছে।
অসম্পূর্ণ কাজের নমুনাও পেয়েছে ডাবলথিংক ল্যাব। যুক্তরাষ্ট্রের প্রার্থীদের তৎপরতা নিয়ে প্রস্তাবিত একটি মানচিত্রের প্রদর্শনীতে হাংজৌর ওয়েস্ট লেকের মানচিত্র ব্যবহার করা হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী অ্যাপ্লিকেশনের প্রস্তাব বর্ণনা করতে গিয়ে উপস্থাপনার একটি সরঞ্জামে তখনও চীনের অভ্যন্তরীণ মানচিত্র ব্যবহার করা হচ্ছিল।
পরিবারের রেকর্ড, নাগরিক সংগঠন, রাজনৈতিক সম্পর্ক এবং ভাষাভিত্তিক ভার্চুয়াল পরিচয় মিলিয়ে নথিজুড়ে তাইওয়ানকে অস্বাভাবিক রকম বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। তাইওয়ান ও লিথুয়ানিয়ার সম্পর্ক নিয়ে আলাদা অ্যাকাউন্ট চালানোর নির্দেশও ছিল, যা দেখায় কীভাবে একটি কূটনৈতিক বিষয়কে নির্দিষ্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অভিযান হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে।
চীনের বৃহত্তর তথ্য কৌশল প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমকেও ঘিরে। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের এক তদন্তে আন্তর্জাতিক সম্প্রচারে বিনিয়োগ, বিদেশি গণমাধ্যমে অংশীদারত্ব এবং উন্নয়নশীল দেশের সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচির কথা বলা হয়েছে। চীন ও তাইওয়ান নিয়ে প্রতিবেদন বা চীনা প্রভাব বিস্তারের কার্যক্রমের খবর প্রকাশের পর ডেনমার্ক ও ফিলিপাইনের সাংবাদিকদের ওপর দূতাবাসের চাপের ঘটনাও তদন্তে নথিবদ্ধ হয়েছে।
তাইওয়ানের নভেম্বরের নির্বাচনে তাৎক্ষণিক প্রশ্নটি আরও ব্যক্তিগত: সাধারণ অনলাইন কমিউনিটির ভেতরে কে কথা বলছেন, সেই পরিচয় কীভাবে তৈরি হয়েছে এবং নির্দিষ্ট কোনো ভোটারের কাছে বিশেষ একটি বার্তা কেন পৌঁছাচ্ছে। কর্মকর্তারা বলছেন, পরিচালকেরা স্বয়ংক্রিয় অ্যাকাউন্ট, মানুষের নির্দেশনা এবং স্থানীয় রাজনৈতিক বিরোধ একসঙ্গে কাজে লাগালে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে তৎপরতা অব্যাহতভাবে পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।
মূল বিষয়গুলো
- ২০২৬ সালের ২৮ নভেম্বরের স্থানীয় নির্বাচন সামনে রেখে এআই-সহায়তায় হস্তক্ষেপের বিষয়ে সতর্ক করেছেন তাইওয়ানের জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তারা।
- ডাবলথিংক ল্যাবের মতে, গোল্যাক্সির নথিতে তাইওয়ানের পরিবারের প্রায় ২ কোটি ৩০ লাখ নিবন্ধন-সংক্রান্ত রেকর্ড এবং সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ৬২ লাখের বেশি তথ্য রয়েছে।
- নথিতে রাজনৈতিক প্রোফাইল তৈরি, দর্শকদের শ্রেণিবিন্যাস, স্বয়ংক্রিয়ভাবে কনটেন্ট তৈরি এবং কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত ভুয়া অ্যাকাউন্টের বর্ণনা রয়েছে।
- কর্মকর্তারা বলছেন, পরিচালকেরা বিভাজন বাড়াতে, উদ্বেগ উসকে দিতে এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণে নিরুৎসাহিত করতে চান।
- গবেষকেরা গোল্যাক্সি পরিচালিত বলে মনে করা সাতটি অ্যাকাউন্ট শনাক্ত করেছেন; এর কয়েকটির সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ ছিল সীমিত।
- চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে সরাসরি যোগসূত্র অস্বীকার করেছে গোল্যাক্সি; তবে গবেষকেরা নথি ও চুক্তিতে সরকারি ও সামরিক সংস্থার সঙ্গে সংযোগের কথা উল্লেখ করেছেন।






