১৯৫৬ সালের চুক্তির ৭০ বছর পূর্তিতে রাশিয়ার সঙ্গে দ্বীপ-বিরোধের সমাধানে অগ্রগতির চেষ্টা জাপানের

পড়তে 9 মিনিট
Japan Seeks Breakthrough on Russian Island Dispute as 1956 Accord Turns 70

কূটনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যেও আলোচনাকে এজেন্ডায় রেখেছে টোকিও

১৯৫৬ সালের একটি চুক্তিতে শান্তিচুক্তির পর শিকোতান ও হাবোমাই দ্বীপপুঞ্জ হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতির ৭০ বছর পূর্তিতে, ২০২৬ সালের ১৯ অক্টোবর জাপান হোক্কাইদোর কাছে বিতর্কিত চারটি দ্বীপাঞ্চল নিয়ে সমাধানের চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করে। রাশিয়া চারটি অঞ্চলই নিয়ন্ত্রণ করে, ২০২২ সাল থেকে আলোচনা স্থগিত রয়েছে, আর সাম্প্রতিক সফর ও এক সাংবাদিকের আটক কূটনৈতিক টানাপোড়েন আরও বাড়িয়েছে।

সূচিপত্র
  1. কূটনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যেও আলোচনাকে এজেন্ডায় রেখেছে টোকিও
  2. ১৯৫৬ সালের ঘোষণায় আসলে কী মীমাংসা হয়েছিল
  3. চারটি অঞ্চল নিয়ে বিরোধে দুটি অঞ্চল কেন কেন্দ্রীয় হয়ে উঠল
  4. অঙ্গীকার ও বাধার সাত দশক
  5. ইউক্রেন যুদ্ধ আলোচনা থামিয়ে দিয়েছে
  6. পুতিনের সফর ও চীনা বিনিয়োগের পরিকল্পনায় উত্তেজনা বাড়ল
  7. সাংবাদিককে আটক করায় জরুরি কনস্যুলার বিরোধ তৈরি
  8. অচলাবস্থার মধ্যেও সীমিত যোগাযোগ অব্যাহত
  9. সাবেক বাসিন্দাদের জন্য মানবিক বিষয়টি অগ্রাধিকার
  10. মূল বিষয়গুলো

টোকিওতে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে চিফ ক্যাবিনেট সেক্রেটারি মিনোরু কিহারা বলেন, সম্পর্কের অবনতি সত্ত্বেও জাপান মস্কোর সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখবে।

জাপান-রাশিয়া সম্পর্কের কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও আমরা রুশ পক্ষের সঙ্গে প্রয়োজনীয় যোগাযোগ চালিয়ে যাব এবং বর্তমান অচলাবস্থা ভাঙার চেষ্টা করব,

বার্ষিকীটি অপূর্ণ থেকে যাওয়া এক অঙ্গীকারকে আবার সামনে এনেছে। ১৯৫৬ সালের জাপান-সোভিয়েত যৌথ ঘোষণার মাধ্যমে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপিত হয় এবং যুদ্ধাবস্থার অবসান ঘটে; তবে শান্তিচুক্তি ও ভূখণ্ডগত সমাধানের বিষয়টি পরবর্তী আলোচনার জন্য রাখা হয়। সাত দশক পরও চুক্তি কিংবা প্রতিশ্রুত দ্বীপ হস্তান্তর কোনোটিই বাস্তবায়িত হয়নি।

জাপান বিতর্কিত অঞ্চলগুলোকে উত্তরাঞ্চলীয় ভূখণ্ড বলে; রাশিয়া বলে দক্ষিণ কুরিল দ্বীপপুঞ্জ। এগুলো হলো এতোরোফু, রাশিয়ায় ইতুরুপ নামে পরিচিত, কুনাশিরি, শিকোতান এবং হাবোমাই দ্বীপপুঞ্জ। টোকিওর বক্তব্য, ১৯৪৫ সালের আগস্টে জাপানের আত্মসমর্পণের পর সোভিয়েত বাহিনী অবৈধভাবে এগুলো দখল করে। মস্কোর যুক্তি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বৈধ ফল হিসেবে অঞ্চলগুলো তাদের নিয়ন্ত্রণে এসেছে এবং ভূখণ্ডগত প্রশ্ন মীমাংসিত বলে তারা অবস্থান আরও কঠোর করেছে।

১৯৫৬ সালের ঘোষণায় আসলে কী মীমাংসা হয়েছিল

জাপানের জাতীয় মহাফেজখানার নথি অনুযায়ী, ঘোষণাটি ১৯৫৬ সালের ১৯ অক্টোবর স্বাক্ষরিত হয় এবং ১২ ডিসেম্বর অনুমোদিত হয়। ঘোষণার মহাফেজখানার নথিভুক্তি-তে প্রকাশিত মূল নথি দেখানো হয়েছে এবং ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে চুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধাবস্থার অবসান ঘটে ও কূটনৈতিক এবং কনস্যুলার সম্পর্ক পুনঃস্থাপিত হয়।

ঘোষণায় সোভিয়েত ইউনিয়নে আটক জাপানি নাগরিকদের প্রত্যাবর্তন, জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ক্ষতিপূরণের দাবি থেকে মস্কোর সরে আসা এবং বাণিজ্য সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার আলোচনা চালানোর বিষয়ও ছিল। জাতিসংঘে জাপানের সদস্যপদ লাভে সোভিয়েত সমর্থনও চুক্তির অংশ ছিল; এরপর জাপান সংস্থাটিতে যোগ দেয়।

বিজ্ঞাপন

শান্তিচুক্তির বিষয়টি তখনও অমীমাংসিত ছিল। ১৯৫৬ সালে যেসব বিষয়ের সমাধান সম্ভব হয়নি, সেগুলো নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি ঘোষণাটি দুই দেশকে স্বাভাবিক কূটনৈতিক যোগাযোগ পুনঃস্থাপনের সুযোগ দেয়।

জাপানের মন্ত্রিসভা সচিবালয়ের প্রকাশিত ঘোষণার উদ্ধৃতাংশে অনুচ্ছেদ ৯-এ গুরুত্বপূর্ণ ধারাবাহিকতাটি তুলে ধরা হয়েছে: কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের পর আলোচনা চলবে এবং শান্তিচুক্তি সম্পাদনের পর হাবোমাই ও শিকোতান প্রকৃতপক্ষে হস্তান্তর করা হবে। ভূখণ্ডগত বিরোধের কারণে সেই চূড়ান্ত চুক্তি এখনো অধরা।

চারটি অঞ্চল নিয়ে বিরোধে দুটি অঞ্চল কেন কেন্দ্রীয় হয়ে উঠল

১৯৫৬ সালের ঘোষণায় শিকোতান ও হাবোমাই হস্তান্তরের কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে বলে আলোচনায় এই দুই অঞ্চলের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। এ দুটির মর্যাদা নিয়ে দুই সরকার একমত হতে না পারায় কুনাশিরি ও এতোরোফুকে হস্তান্তরের বিধান থেকে বাদ রাখা হয়েছিল।

জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তার শান্তিচুক্তির ইতিহাসে টোকিওর মূল নীতির কথা জানিয়েছে: চারটি অঞ্চলের মর্যাদা নির্ধারণ করে শান্তিচুক্তি সম্পাদন করা। এখানে কেন্দ্রীয় বিষয় সার্বভৌমত্ব, অর্থাৎ কোনো স্থান শাসন করার আইনি কর্তৃত্ব কোন দেশের রয়েছে।

২০১৮ সালের নভেম্বরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে ও প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সিঙ্গাপুরে ১৯৫৬ সালের ঘোষণাকে ভিত্তি করে শান্তিচুক্তি আলোচনা ত্বরান্বিত করতে সম্মত হন। আবে-র এই উদ্যোগকে ব্যাপকভাবে চারটি নয়, বরং দুটি অঞ্চল ফেরত চাওয়ার দিকে অগ্রসর হওয়া হিসেবে দেখা হয়েছিল, কারণ ঘোষণায় কেবল শিকোতান ও হাবোমাই হস্তান্তরের কথা রয়েছে।

এর আগের চুক্তিগুলোতে চারটি অঞ্চলই অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৯৯৩ সালের টোকিও ঘোষণায় শান্তিচুক্তির আগে মীমাংসার জন্য ভূখণ্ডগত বিরোধ হিসেবে এগুলোর মর্যাদা নির্ধারণ করা হয়। ২০০১ সালের ইরকুতস্ক বিবৃতিতে ১৯৫৬ সালের ঘোষণার আইনি বৈধতা নিশ্চিত করে সেটিকে আলোচনার সূচনাবিন্দু করা হয়; পাশাপাশি টোকিও ঘোষণায় নির্ধারিত পদ্ধতিও পুনর্ব্যক্ত করা হয়।

অঙ্গীকার ও বাধার সাত দশক

কূটনৈতিক নথিপত্রে দেখা যায়, দুটি অঞ্চল নিয়ে করা প্রতিশ্রুতির সঙ্গে চারটি অঞ্চল নিয়ে চলা আলোচনার সমন্বয়ে বারবার চেষ্টা হয়েছে। সরকারগুলো সময়সীমা নির্ধারণ, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং সাবেক বাসিন্দাদের জন্য আরও ব্যবহারিক ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগও নিয়েছে।

আলোচনার বর্তমান অচলাবস্থায় পৌঁছানোর পথটি কয়েকটি তারিখে স্পষ্ট হয়:

  • ১৯ অক্টোবর, ১৯৫৬: জাপান ও সোভিয়েত ইউনিয়ন যৌথ ঘোষণা স্বাক্ষর করে; এতে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন এবং শান্তিচুক্তির পর হাবোমাই ও শিকোতান হস্তান্তরের বিধান রাখা হয়।
  • ১৯৬০: হস্তান্তরের আগে জাপানের ভূখণ্ড থেকে সব বিদেশি বাহিনী প্রত্যাহারের দাবি যোগ করে মস্কো। একতরফা এই পরিবর্তনে আপত্তি জানায় জাপান।
  • এপ্রিল ১৯৯১: সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট মিখাইল গর্বাচেভের জাপান সফরের সময় এক যৌথ বিবৃতিতে ভূখণ্ডগত আলোচনার বিষয় হিসেবে চারটি অঞ্চলের নাম লিখিতভাবে উল্লেখ করা হয়।
  • অক্টোবর ১৯৯৩: টোকিও ঘোষণায় অঞ্চলগুলোর মর্যাদা নির্ধারণ ও শান্তিচুক্তি সম্পাদনের নীতিমালা তুলে ধরা হয়।
  • নভেম্বর ১৯৯৭: ক্রাসনোয়ার্স্ক শীর্ষ বৈঠকে দুই সরকার ২০০০ সালের মধ্যে চুক্তি সম্পাদনে সর্বোচ্চ চেষ্টা করার অঙ্গীকার করে।
  • মার্চ ২০০১: ইরকুতস্ক বিবৃতিতে ১৯৫৬ সালের ঘোষণার আইনি বৈধতা নিশ্চিত করা হয়।
  • নভেম্বর ২০১৮: আবে ও পুতিন সিঙ্গাপুরে ঘোষণাটিকে ভিত্তি করে আলোচনা ত্বরান্বিত করতে সম্মত হন।
  • ২০২২: ইউক্রেনে আগ্রাসনের জেরে জাপানের নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর রাশিয়া শান্তিচুক্তি আলোচনা স্থগিত করে।
  • ১৯ অক্টোবর, ২০২৬: ঘোষণার ৭০ বছর পূর্তিতে অগ্রগতির চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে জাপান।

২০০০ সালের মধ্যে চুক্তির লক্ষ্য পূরণ হয়নি। ১৯৯৮ সালের এপ্রিলে কাওয়ানা শীর্ষ বৈঠকে নেতারা এও সম্মত হয়েছিলেন যে চুক্তির মাধ্যমে চারটি অঞ্চলের মর্যাদা নির্ধারণ করা হবে এবং ভবিষ্যৎ বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার নীতিমালা অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

বিজ্ঞাপন

ইউক্রেন যুদ্ধ আলোচনা থামিয়ে দিয়েছে

২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের ফলে পরপর জাপানি সরকারগুলো যে আলোচনাপ্রক্রিয়া চালিয়ে আসছিল, তা ভেঙে পড়ে। স্থিতাবস্থা বদলাতে বলপ্রয়োগের বিরোধিতা করে জাপান মস্কোর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞায় যোগ দেয়। এর জবাবে রাশিয়া শান্তিচুক্তি আলোচনা চালিয়ে যেতে অস্বীকৃতি জানায় এবং জাপানকে অবন্ধুসুলভ দেশ হিসেবে চিহ্নিত করে।

বিতর্কিত দ্বীপগুলোতে ভিসা ছাড়া যাতায়াতের বিষয়ে করা চুক্তিও বাতিল করে মস্কো। আলোচনা বন্ধ হওয়ার পর থেকে জাপান ও রাশিয়ার নেতাদের মধ্যে কোনো শীর্ষ বৈঠক হয়নি; কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের পর থেকে সম্পর্ক এখন সবচেয়ে বেশি টানাপোড়েনের মধ্যে রয়েছে।

সিঙ্গাপুরে গৃহীত পদ্ধতির পক্ষে একাধিকবার সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করার পরই এই ভাঙন ঘটে। জাপানের সরকারি আলোচনার ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে, ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে প্রধানমন্ত্রী ইয়োশিহিদে সুগা ও পুতিন ২০১৮ সালের চুক্তি পুনরায় নিশ্চিত করেন। ২০২১ সালের অক্টোবরে প্রধানমন্ত্রী ফুমিও কিশিদা ও পুতিন আগের দ্বিপক্ষীয় চুক্তির ভিত্তিতে শান্তিচুক্তি আলোচনা এগিয়ে নিতে সম্মত হন।

জাপান নিয়ে গবেষণাকারী মস্কো স্টেট ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনসের অধ্যাপক দিমিত্রি স্ত্রেলৎসভ বৃহত্তর আন্তর্জাতিক বিভাজনকে প্রধান বাধা হিসেবে দেখেন। তাঁর মতে, দুই দেশ বিপরীত শিবিরে থাকা অবস্থায় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে ইতিবাচক অগ্রগতির সম্ভাবনা কম।

পুতিনের সফর ও চীনা বিনিয়োগের পরিকল্পনায় উত্তেজনা বাড়ল

২০২৬ সালের আগস্টে এতোরোফু সফর করেন পুতিন। ২০০০ সালে প্রথমবার দায়িত্ব নেওয়ার পর দ্বীপটিতে এটিই ছিল তাঁর প্রথম সফর। প্রতিবাদ জানায় জাপান। সফরের আগের দিন সাখালিনে রাশিয়ার প্রশান্ত মহাসাগরীয় নৌবহরের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে ভাষণ দেন তিনি। বিতর্কিত অঞ্চলগুলোতে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফল হিসেবে তুলে ধরে সম্পর্কের অবনতির জন্য জাপানকে দায়ী করেন পুতিন।

১৩ অক্টোবর, সাখালিন সরকার এতোরোফুতে আরেকটি সফরের ঘোষণা দেয়, এবার চীনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় হেইলংজিয়াং প্রদেশের কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীদের একটি প্রতিনিধিদলের। সাখালিনের গভর্নর ভ্যালেরি লিমারেঙ্কোর আমন্ত্রণে রাশিয়া ও চীনের সম্ভাব্য যৌথ প্রকল্প যাচাই করছিল দলটি।

পর্যটন উন্নয়নের সম্ভাব্য স্থানগুলো পরিদর্শন করেন সফরকারীরা এবং সামুদ্রিক আর্চিন ও সামুদ্রিক শসা চাষে আগ্রহ প্রকাশ করেন। লিমারেঙ্কো বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নয়নে বাসিন্দাদের জীবনমান বাড়া উচিত; অন্যদিকে করছাড়সহ বিভিন্ন পদক্ষেপের মাধ্যমে বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা করছে রুশ কর্তৃপক্ষ।

বিজ্ঞাপন

কূটনৈতিক চ্যানেলে রাশিয়া ও চীন উভয়ের কাছেই প্রতিবাদ জানায় জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয় বলেছে, রাশিয়ার পদক্ষেপ দ্বীপগুলো জাপানের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে জাপানের যে অবস্থান, তার সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ।

টোকিওর দাবিকৃত একটি দ্বীপের বাস্তব উন্নয়ন কার্যক্রমে চীনের অংশগ্রহণের ফলে তৃতীয় একটি সরকারও যুক্ত হলো। গত মে মাসে পুতিন ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের যৌথ বিবৃতিতে জাপানের "নতুন সামরিকতন্ত্রের" সমালোচনার পর এ ঘটনা ঘটল। এর আগে সম্ভাব্য তাইওয়ান সংকট নিয়ে প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির মন্তব্যকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল।

সাংবাদিককে আটক করায় জরুরি কনস্যুলার বিরোধ তৈরি

১৩ অক্টোবর রুশ কর্তৃপক্ষ জানায়, গুপ্তচরবৃত্তির সন্দেহে সাখালিনে হোক্কাইদো শিম্বুনের সংবাদদাতা ইমাই ইউকিকে আটক করা হয়েছে। তাঁকে মস্কোয় স্থানান্তর করা হয়, যেখানে আদালত ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত তাঁর আটকাদেশ দেন।

রাশিয়ার ফেডারেল সিকিউরিটি সার্ভিসের অভিযোগ, জাপানি গোয়েন্দাদের নির্দেশে ইমাই রাশিয়ার প্রতিরক্ষা সক্ষমতা-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করেছেন। অভিযোগগুলো ইউক্রেনে যুদ্ধ করতে যাদের নিয়োগ বা স্বেচ্ছায় যোগদান করা হয়েছে, কুরিল দ্বীপপুঞ্জের এমন বাসিন্দাদের তথ্য নিয়ে। এগুলো একটি ফৌজদারি তদন্তের অভিযোগ, প্রমাণিত সত্য নয়।

ইমাইয়ের কাছে রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া সংবাদমাধ্যমের স্বীকৃতিপত্র ছিল। তাঁর সংবাদপত্র জানিয়েছে, তাঁর নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে তারা ঘটনার সত্যতা যাচাই করছে। রাশিয়ায় গুপ্তচরবৃত্তির মামলায় দোষী সাব্যস্ত হলে ২০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।

জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত নিকোলাই নোজদ্রেভকে তলব করে, আটক ও কোনো আগাম ব্যাখ্যা ছাড়াই মস্কোর ঘোষণার প্রতিবাদ জানায় এবং ইমাই সম্পর্কে তথ্য ও তাঁর সঙ্গে দ্রুত সাক্ষাতের সুযোগ চায়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী তোশিমিৎসু মোতেগি ১৪ অক্টোবর বলেন, জাপান মানবিক বিবেচনা এবং ন্যায্য ও নিরপেক্ষ আচরণ চাইছে।

জাপানি কর্মকর্তারা দ্রুত কনস্যুলার সাক্ষাতের সুযোগ নিশ্চিত করতে পারেননি। এ ধরনের সাক্ষাতে কূটনীতিকরা আটক নাগরিকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে, তাঁর শারীরিক ও মানসিক অবস্থা যাচাই করতে এবং সহায়তা পেতে তাঁকে সহযোগিতা করতে পারেন। মামলায় পরবর্তী নির্ধারিত তারিখ হলো ১২ ডিসেম্বর, যেদিন আটকাদেশের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা।

অচলাবস্থার মধ্যেও সীমিত যোগাযোগ অব্যাহত

২০২৫ সালের অক্টোবরে ক্ষমতায় আসা প্রধানমন্ত্রী তাকাইচির সরকার নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকলেও রাশিয়ার সঙ্গে কিছু যোগাযোগ বজায় রেখেছে। জাপানের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা ২০২৬ সালের মে মাসে রাশিয়া সফর করেন। জুলাইয়ে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভের সঙ্গে বৈঠক করেন মোতেগি।

মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা এবং রাশিয়ার জ্বালানি সরবরাহে জাপানের অব্যাহত আগ্রহের প্রেক্ষাপটে এসব যোগাযোগ হয়েছে। সাখালিনে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসসহ জ্বালানি খাতে জাপানের স্বার্থ রয়েছে। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস হলো এমন গ্যাস, যা জাহাজে পরিবহনের উপযোগী করতে ঠান্ডা করে তরলে পরিণত করা হয়।

বিজ্ঞাপন

তাই ভূখণ্ডগত আলোচনার পাশাপাশি কূটনৈতিক যোগাযোগের তাৎক্ষণিক কয়েকটি উদ্দেশ্য রয়েছে: আটক নাগরিককে সুরক্ষা দেওয়া, দ্বীপ সফর নিয়ে বিরোধ সামলানো এবং অর্থনৈতিক স্বার্থের বিষয়গুলো দেখা। শান্তিচুক্তি আলোচনা কবে আবার শুরু হবে বা দুই দেশের নেতাদের বৈঠক কবে হবে, সে বিষয়ে কিহারা কোনো তারিখ দেননি।

আগের সহযোগিতার সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির পার্থক্য বেশ বড়। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে আবে ও পুতিন চারটি অঞ্চলেই বিশেষ কাঠামোর অধীনে যৌথ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোচনা শুরু করতে সম্মত হন। সাবেক বাসিন্দাদের কবর জিয়ারতের সফর আরও সহজ করার বিষয়েও তাঁরা একমত হন। এখন আনুষ্ঠানিক ভূখণ্ডগত আলোচনা স্থগিত থাকতেই যোগাযোগ চলছে।

সাবেক বাসিন্দাদের জন্য মানবিক বিষয়টি অগ্রাধিকার

সাবেক দ্বীপবাসীদের কবর জিয়ারতে সফর পুনরায় চালুর জন্য জাপান মানবিক কারণে চাপ দেওয়া অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা করছে। অঞ্চলগুলোর সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে এমন মানুষের জন্য কূটনৈতিক অচলাবস্থার অর্থ, স্বজনেরা যে স্থানে বাস করতেন এবং যেখানে তাঁদের সমাহিত করা হয়েছে, সেখানে যাওয়ার সুযোগ সীমিত হওয়া।

সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন অমীমাংসিত থাকলেও কবর জিয়ারত এমন একটি ক্ষেত্র ছিল, যেখানে সরকারগুলো বাস্তবসম্মত উন্নতি করতে পেরেছিল। অর্থনৈতিক সহযোগিতার আলোচনা ছাড়াও ২০১৬ সালের চুক্তিতে ওই সফরগুলোর প্রক্রিয়া সহজ করার বিষয়টি বিশেষভাবে ছিল।

রাশিয়ার বিনিময় কার্যক্রম স্থগিতের ফলে সেই যোগাযোগের পথ সংকুচিত হয়েছে। এখন টোকিও বিস্তৃত ভূখণ্ডগত সমাধানের অপেক্ষায় না থেকে নিষেধাজ্ঞা নীতি বজায় রেখেই মানবিক যাতায়াতের ক্ষেত্রে অগ্রগতি চাইছে।

তাই বার্ষিকীতে জাপানের সামনে পরস্পর-সম্পর্কিত দুটি চ্যালেঞ্জ রয়েছে: শান্তিচুক্তির সম্ভাবনা ধরে রাখা এবং বিরোধে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য বাস্তব সহযোগিতা নিশ্চিত করা। কিহারার অঙ্গীকারে কূটনৈতিক যোগাযোগের বিষয়টি এজেন্ডায় থাকছে; অন্যদিকে ১৯৫৬ সালে প্রতিশ্রুত দ্বীপ হস্তান্তর এমন এক চুক্তির ওপর নির্ভরশীল, যা কোনো সরকারই সম্পাদন করেনি।

মূল বিষয়গুলো

  • রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকা চারটি অঞ্চল নিয়ে সমাধানের চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছে জাপান, ২০২৬ সালের ১৯ অক্টোবর।
  • ১৯৫৬ সালের ঘোষণায় যুদ্ধাবস্থার অবসান ঘটে, কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপিত হয় এবং শান্তিচুক্তির পর শিকোতান ও হাবোমাই হস্তান্তরের বিধান রাখা হয়।
  • ইউক্রেনে আগ্রাসনের জেরে জাপানের নিষেধাজ্ঞার পর ২০২২ সালে শান্তিচুক্তি আলোচনা স্থগিত করে রাশিয়া।
  • আগস্টে পুতিনের এতোরোফু সফর এবং এরপর চীনা প্রতিনিধিদলের সফরে প্রতিবাদ জানায় জাপান।
  • সাংবাদিক ইমাই ইউকির বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তির তদন্ত চলছে; মস্কোর আদালত ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত তাঁর আটকাদেশ দিয়েছেন।
  • নিষেধাজ্ঞা বজায় রেখেও সাবেক দ্বীপবাসীদের কবর জিয়ারতের মতো মানবিক সফর চালুর চেষ্টা করছে জাপান।
এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন

আপনার পছন্দ হতে পারে