কারখানায় ঘুরে দাঁড়ানোর বিপরীতে নাজুক অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি
বিদেশে প্রযুক্তিপণ্যের জোরালো চাহিদা আবাসন খাতের গভীরতর মন্দার প্রভাব পুষিয়ে দিতে সহায়তা করায় ২০২৬ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে চীনের অর্থনীতি ৪.৫% বেড়েছে বলে ১৯ অক্টোবর জানিয়েছে ন্যাশনাল ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকস। এপ্রিল থেকে জুনে প্রবৃদ্ধি ছিল ৪.৩%, যা তিন বছরের বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে ধীর গতি; অর্থনীতিবিদদের ৪.৪% পূর্বাভাসকেও ছাড়িয়েছে এই প্রবৃদ্ধি।
সূচিপত্র
- কারখানায় ঘুরে দাঁড়ানোর বিপরীতে নাজুক অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি
- এআইয়ের উত্থানে যেভাবে বাড়ছে রপ্তানি
- সেমিকন্ডাক্টরের বাইরেও এগোচ্ছে শিল্পের আধুনিকায়ন
- পরিবারগুলো কেন এখনো ব্যয়ে সতর্ক
- আবাসন খাতের মন্দা ব্যয়ের ওপর ক্রমেই প্রভাব ফেলছে
- যুক্তরাষ্ট্রের বাইরেও ক্রেতা পাচ্ছে রপ্তানি পণ্য
- বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতায় প্রতিবাদ জানাচ্ছে ইউরোপ
- ঋণ নেওয়ার খরচের দিকে নজর রেখে সহায়তা বাড়াচ্ছে বেইজিং
- প্রবৃদ্ধি ও নীতির পরবর্তী দিক
- মূল বিষয়
অর্থনীতির এই ঘুরে দাঁড়ানোর মধ্যেই স্পষ্ট বিভাজন দেখা গেছে। সেপ্টেম্বরে খুচরা বিক্রি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় মাত্র ১.১% বেড়েছে, আর প্রথম নয় মাসে আবাসন উন্নয়ন খাতে বিনিয়োগ কমেছে ২০.৬%। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবকাঠামো নির্মাণে বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগের জোয়ারে কারখানাগুলো উপকৃত হলেও অনেক পরিবার ব্যয়ের বিষয়ে সতর্ক থেকেছে।
জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে চীন প্রায় ১০৭.১১ ট্রিলিয়ন ইউয়ানের অর্থনৈতিক উৎপাদন করেছে; গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ৪.৬%। এতে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি বেইজিংয়ের বার্ষিক ৪.৫% থেকে ৫% প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে রয়েছে। তবে তৃতীয় প্রান্তিকের প্রবৃদ্ধি বছরের শুরুতে নথিভুক্ত ৫% সম্প্রসারণের চেয়ে কম ছিল।
মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি একটি অর্থনীতিতে উৎপাদিত পণ্য ও সেবার মূল্য পরিমাপ করে। প্রান্তিকভিত্তিক পরিসংখ্যানে আগের বছরের একই সময়ের সঙ্গে উৎপাদনের তুলনা করা হয়। আগের প্রান্তিকের সঙ্গে তুলনা করলে, এপ্রিল থেকে জুনে ০.৯% সম্প্রসারণের পর চীনের অর্থনীতি ১.২% বেড়েছে।
পরিসংখ্যান ব্যুরো জানিয়েছে, চাপের মধ্যেও অর্থনীতির বিকাশ অব্যাহত ছিল। তবে তারা স্বীকার করেছে, অভ্যন্তরীণ চাহিদার ঘাটতি এখনো একটি উল্লেখযোগ্য সমস্যা। তাদের পরিসংখ্যানে এর কারণ স্পষ্ট: উন্নত উৎপাদন দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে, কিন্তু পুরো অর্থনীতিতে বিনিয়োগ কমছে এবং ভোক্তাদের কেনাকাটা ধীরে বাড়ছে।
বেইজিংয়ের জন্য তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ এখন এ বছরের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের চেয়ে উৎপাদন ও রপ্তানি থেকে পাওয়া সুফলকে পারিবারিক আয়, কর্মসংস্থান ও ব্যয়ে ছড়িয়ে দেওয়া।
এআইয়ের উত্থানে যেভাবে বাড়ছে রপ্তানি
চীনা কাস্টমসের বরাত দিয়ে প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে পণ্য রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৪৭.১৮ বিলিয়ন ডলারে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৬.৩% বেশি। ওই মাসে ৮.৩% বৃদ্ধির হিসাবও প্রচারিত হয়েছে। তবে রপ্তানি এক-তৃতীয়াংশের বেশি বেড়েছে—এমন বিবরণের সঙ্গে বড় অঙ্কটিই সামঞ্জস্যপূর্ণ।
প্রযুক্তিপণ্যের এই উল্লম্ফনের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ সমন্বিত বর্তনীর রপ্তানি: এর মূল্য ১৩৬% বেড়ে ৪৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, অথচ পাঠানো চিপের সংখ্যা বেড়েছে মাত্র ১%। সমন্বিত বর্তনী হলো ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতিতে ব্যবহৃত সেমিকন্ডাক্টর চিপ; এআই সেবার পেছনে থাকা সার্ভার ও অন্যান্য হার্ডওয়্যারেও এগুলো ব্যবহৃত হয়।
এই পরিসংখ্যানের অর্থ, প্রতি চিপের গড় রপ্তানিমূল্য দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। হিসাবটি করতে রপ্তানিমূল্যের পরিবর্তন—আগের তুলনায় ২.৩৬ গুণ—পাঠানো চিপের সংখ্যার পরিবর্তন—আগের তুলনায় ১.০১ গুণ—দিয়ে ভাগ করা হয়। দাম বৃদ্ধি ও বেশি দামের পণ্যের দিকে ঝোঁক, দুটিই এই গড় বাড়াতে পারে।
ডেটা সেন্টার, সার্ভার ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রাংশে বিশ্বজুড়ে ব্যয় চীনা প্রযুক্তিপণ্যের চাহিদা তৈরি করেছে। চিপের বাইরেও এই সুফল ছড়িয়েছে: এআই ব্যবস্থা চালাতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর জন্য যন্ত্রপাতি, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও অন্যান্য উৎপাদিত পণ্যও সরবরাহ করছে চীন।
প্রথম নয় মাসে চীনের মোট রপ্তানির ৬৪.৩% ছিল যন্ত্র ও বৈদ্যুতিক পণ্য; এসব পণ্যের রপ্তানিমূল্য বেড়েছে ২৩.৭%। ফলে প্রযুক্তিপণ্যের চাহিদা কোনো বিচ্ছিন্ন প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্র নয়, বরং আরও বিস্তৃত উৎপাদনভিত্তিক রপ্তানি ব্যবস্থার অংশ।
সেমিকন্ডাক্টরের বাইরেও এগোচ্ছে শিল্পের আধুনিকায়ন
প্রথম নয় মাসে চীনের উন্নত উৎপাদন খাত ১৪.৩% বেড়েছে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর নির্ধারিত আকারসীমার ওপরে থাকা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রবৃদ্ধি ছিল ৫.৩%। সরঞ্জাম উৎপাদন খাত বেড়েছে ১০.২%।
উৎপাদনের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, এই বিনিয়োগ কোন খাতে যাচ্ছে। ত্রিমাত্রিক মুদ্রণে ব্যবহৃত যন্ত্রের উৎপাদন বেড়েছে ৬২.৫%, লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির উৎপাদন ৩৯.৫% এবং শিল্প রোবটের উৎপাদন ২৯.১%। আবাসন খাত থেকে ঋণ ও সম্পদ সরিয়ে উন্নত উৎপাদনে দেওয়ার বেইজিংয়ের প্রচেষ্টার অংশ এসব শিল্প।
ন্যাশনাল ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকসের উপপ্রধান মাও শেংইয়ং বলেছেন, জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে উন্নত উৎপাদন, ডিজিটাল অর্থনীতি ও আধুনিক সেবা খাত প্রবৃদ্ধির ৪০%-এর বেশি অবদান রেখেছে। তিনি ওই সময়ের ৪.৬% সম্প্রসারণকে বলেছেন “কঠিন লড়াইয়ে অর্জিত”।
অর্থনীতির বিস্তারিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে শিল্প উৎপাদন আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫.৫% বেড়েছে, যেখানে আগস্টে বেড়েছিল ৫.২%; আরেকটি প্রকাশিত হিসাবে সেপ্টেম্বরে প্রবৃদ্ধি ছিল ৬.৫%। কারখানার জরিপেও উন্নতি দেখা গেছে: টানা দুই মাস সংকোচনের পর সরকারি উৎপাদন খাতের পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স বা পিএমআই ৫০.১-এ পৌঁছেছে।
প্রতিষ্ঠানগুলোর জরিপের মাধ্যমে ব্যবসায়িক পরিস্থিতির পরিবর্তন পরিমাপ করে পিএমআই। ৫০-এর বেশি মান সম্প্রসারণ নির্দেশ করে। সেপ্টেম্বরে এই সূচক থেকে কারখানার কার্যক্রমে সামান্য প্রবৃদ্ধি ফেরার ইঙ্গিত মেলে; নির্দিষ্ট প্রযুক্তি শিল্পের সম্প্রসারণ ছিল এর চেয়ে অনেক দ্রুত।
পরিবারগুলো কেন এখনো ব্যয়ে সতর্ক
সেপ্টেম্বরে খুচরা বিক্রি বেড়েছে ১.১%; আগস্টের ০.৪% থেকে বৃদ্ধি পেয়ে মার্চের পর সবচেয়ে দ্রুত গতি পেয়েছে। প্রায় ০.৫% থেকে ০.৬% প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসকে ছাড়িয়ে গেলেও উৎপাদন ও রপ্তানি খাতের সম্প্রসারণের তুলনায় এই বৃদ্ধি ছিল সামান্য।
প্রথম নয় মাসে পণ্যের তুলনায় সেবা খাতের অবস্থা ভালো ছিল। পণ্য ও সেবার খুচরা বিক্রি মিলিয়ে বেড়েছে ২.৬%; এর মধ্যে সেবার খুচরা বিক্রি বেড়েছে ৫% এবং পণ্যের বিক্রি ১%। অর্থাৎ, ভৌত পণ্য কেনার চেয়ে কার্যক্রম ও সেবায় ব্যয়ই বেশি সহায়তা জুগিয়েছে।
জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে মাথাপিছু গড় ব্যবহারযোগ্য আয় দাঁড়িয়েছে ৩৪,২৩০ ইউয়ানে; মূল্যস্ফীতি সমন্বয়ের পর বেড়েছে ৪.৪%। কর ও এ ধরনের কর্তন বাদ দেওয়ার পর ব্যয় বা সঞ্চয়ের জন্য মানুষের হাতে থাকা অর্থই ব্যবহারযোগ্য আয়। তবে জাতীয় গড়ের পাশাপাশি বিভিন্ন পরিবার ও শিল্পের অভিজ্ঞতায় বড় পার্থক্য রয়েছে।
দ্য কনফারেন্স বোর্ডের এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ম্যাক্স জেংলেইন বলেছেন, সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান অর্থনীতির অসম পরিস্থিতিকে আড়াল করছে। এই পার্থক্যকে তিনি বর্ণনা করেছেন এভাবে:
শিল্প, অঞ্চল ও পরিবারগুলোর মধ্যে বৈষম্য বাড়ছে
হাংঝৌয়ের ২৬ বছর বয়সী হিসাবরক্ষক ক্যারল হুয়াং বলেছেন, তাঁর নিয়োগকর্তা বোনাস প্রায় অর্ধেক কমিয়ে দিয়েছেন। তিনি চাকরিতে থেকে যাচ্ছেন, কারণ শহরে একই ধরনের চাকরিতে মাসে ৩,০০০ থেকে ৬,০০০ ইউয়ান বেতন দেওয়া হয়, যা তাঁর বর্তমান আয়ের চেয়ে কম। তাঁর পরিস্থিতি দেখায়, কর্মরত মানুষেরও ব্যয় সীমিত রাখার চাপ থাকতে পারে।
সেপ্টেম্বরে জরিপে পাওয়া শহুরে বেকারত্বের হার ছিল ৫.২%, যা আগস্টের চেয়ে ০.১ শতাংশীয় পয়েন্ট কম। কর্মসংস্থানের এই পরিমাপে সপ্তাহে অন্তত এক ঘণ্টা কাজ করলেও কাউকে কর্মরত হিসেবে গণনা করা হয়। ফলে নিয়মিত চাকরিজীবীদের পাশাপাশি খুব সীমিত সময় কাজ করা ব্যক্তিরাও এই হিসাবে অন্তর্ভুক্ত।
আবাসন খাতের মন্দা ব্যয়ের ওপর ক্রমেই প্রভাব ফেলছে
জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরে আবাসন উন্নয়ন খাতে বিনিয়োগ কমেছে ২০.৬%, যা আগস্ট পর্যন্ত নথিভুক্ত ১৯.৯% পতনের চেয়েও বেশি। নতুন নির্মিত বাণিজ্যিক ভবনের বিক্রিত মেঝের আয়তন কমেছে ১৩.২%, আর বিক্রিমূল্য কমেছে ১৩.৯%।
চীনে দীর্ঘস্থায়ী আবাসন মন্দা পরিবারের সম্পদের একটি বড় ভান্ডারের মূল্য কমিয়ে দিয়েছে। বাড়ির মূল্য কমে যাওয়া পরিবারগুলো বেশি সঞ্চয় করতে ও কেনাকাটা পিছিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, বিক্রি দুর্বল থাকায় আবাসন উন্নয়নকারীরা নির্মাণ ও বিনিয়োগ কমাচ্ছেন।
অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ শিয়ানা ইউ বলেছেন, আবাসন খাত দুর্বল থাকলে শিল্প কার্যক্রমের জোরালো প্রবৃদ্ধি পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়া কঠিন হবে:
আবাসন খাতের দীর্ঘস্থায়ী মন্দা শিল্প কার্যক্রমের জোরালো প্রবৃদ্ধির সুফল বৃহত্তর অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ার পথে বাধা হয়ে থাকবে
ইউ বলেছেন, বাড়ি বিক্রি, নির্মাণকাজ শুরু ও দামের পরিসংখ্যানে পুনরুদ্ধারের আভাস সামান্যই। এদিকে, আবাসন উন্নয়ন বাদে বিনিয়োগও প্রথম নয় মাসে ৪.২% কমেছে; এতে বোঝা যায়, মূলধনী ব্যয়ের দুর্বলতা আবাসন খাতের বাইরেও বিস্তৃত।
স্থায়ী সম্পদে মোট বিনিয়োগ—যার মধ্যে ভবন, যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামোর মতো সম্পদে ব্যয় অন্তর্ভুক্ত—কমেছে ৭.২%। বেসরকারি বিনিয়োগ কমেছে ১০.৪%, অবকাঠামো বিনিয়োগ ৪.২% এবং উৎপাদন খাতের বিনিয়োগ ২.১%; যদিও নির্বাচিত প্রযুক্তি খাতগুলোতে বেশি অর্থ গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাইরেও ক্রেতা পাচ্ছে রপ্তানি পণ্য
সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে চীনের রপ্তানি বেড়েছে ৯.৮%; আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোতে পাঠানো পণ্য বেড়েছে ২৮.৭%, তাইওয়ানে ৩৭.৩% এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় ৩৯.১%। ওই মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নে রপ্তানি বেড়েছে ১৬.৪%। এই বিস্তার দেখায়, যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি এশিয়া ও ইউরোপের অন্যান্য বাজারও চাহিদায় সহায়তা করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ শুল্কের কারণে চীনা কোম্পানিগুলো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, লাতিন আমেরিকা ও ইউরোপে ক্রেতা খুঁজছে। মোটরসাইকেলের হেডলাইট প্রস্তুতকারক একটি প্রতিষ্ঠানের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কার্যক্রম পরিচালনাকারী ঝাং চাও বলেছেন, এ বছর বিদেশি ক্রয়াদেশ দ্বিগুণ হয়েছে, আর প্রতিষ্ঠানটি দেশের অভ্যন্তরে বিক্রি প্রায় পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে।
চীনের বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতার বর্ণনা দিয়ে ঝাং বলেছেন:
প্রতিযোগিতা খুব বেশি, আর কোনো মুনাফা নেই
গত বছরের রপ্তানি অন্য বাজারে সরিয়ে নেওয়ার ধারাবাহিকতায় এই পরিবর্তন ঘটেছে; সে সময় যুক্তরাষ্ট্রে চালান কমে যাওয়ার প্রভাব অন্য বাজারে বিক্রি বাড়িয়ে পুষিয়ে নেওয়া হয়েছিল। ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত চীনের পণ্যবাণিজ্যে উদ্বৃত্ত এরই মধ্যে প্রায় ১.০৮ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল।
২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরে উদ্বৃত্ত ছিল ৯৩৮ বিলিয়ন ডলার; শুধু সেপ্টেম্বরে রেকর্ড ১৩৩.৫ বিলিয়ন ডলার। রপ্তানি থেকে আয় আমদানিতে ব্যয়ের চেয়ে যতটা বেশি, সেটিই বাণিজ্য উদ্বৃত্ত। আগের বছরের ১.২ ট্রিলিয়ন ডলারের রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়ার পথে রয়েছে চীন।
আমদানিও বাড়ছে: ইউয়ানের হিসাবে প্রথম নয় মাসে তা বেড়েছে ২২.৩%, যেখানে রপ্তানি বেড়েছে ১৬.৪%। রপ্তানির প্রাথমিক মূল্য অনেক বেশি হওয়ায় উদ্বৃত্ত এখনো বড়। রপ্তানির পরিমাণ ছিল ২৩.২০ ট্রিলিয়ন ইউয়ান, আর আমদানি ১৬.৭৪ ট্রিলিয়ন ইউয়ান।
বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতায় প্রতিবাদ জানাচ্ছে ইউরোপ
চীনের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাণিজ্য ঘাটতি দিনে ১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। প্রথম নয় মাসে জোটটিতে চীনের রপ্তানি প্রায় ১৬% বেড়েছে, যদিও ১৪% বৃদ্ধির হিসাবও প্রচারিত হয়েছে। সেপ্টেম্বরে জার্মানি ও ফ্রান্সের সঙ্গে চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত—দুটিই আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২০০%-এর বেশি বেড়েছে।
কম দামের চীনা পণ্যের বিরুদ্ধে সুরক্ষার দাবিতে ইউরোপীয় উৎপাদনকারীরা চাপ দিচ্ছেন। আগামী কয়েক বছরে চীনা হাইব্রিড গাড়ির আমদানি মোটামুটি অর্ধেকে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে চীন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে একটি সমঝোতা হয়েছে; একই সময়ে ব্রাসেলস আরও বিধিনিষেধ আরোপের কথা বিবেচনা করছে।
সোসিয়েতে জেনেরালের অর্থনীতিবিদ মিশেল ল্যাম সতর্ক করে বলেছেন, বিদেশি চাহিদার রাজনৈতিক সীমা রয়েছে:
আরও সংরক্ষণবাদী বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিবেশে চীনের রপ্তানি সম্প্রসারণেরও সীমা আছে
ন্যাটিক্সের এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ গ্যারি এনজি বলেছেন, আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারিত সীমা চীনকে ইউরোপীয় বাজারে প্রবেশাধিকার ধরে রাখতে এবং আরও বিস্তৃত শুল্ক বৃদ্ধি এড়াতে সহায়তা করতে পারে। আইএনজির বৃহত্তর চীনের প্রধান অর্থনীতিবিদ লিন সং বলেছেন, সমঝোতা হলেও বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা দূর হতে সময় লাগবে।
চীনের পিপলস ব্যাংকের গভর্নর পান গংশেং বলেছেন, উদ্বৃত্ত ও ঘাটতিতে থাকা অর্থনীতিগুলোর একসঙ্গে কাজ করা উচিত। তিনি আরও বলেছেন, অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়াতে চীন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। চীন বেশি পণ্য কেনা ও ভোগ করার মাধ্যমে সমন্বয় করবে, নাকি বাণিজ্য অংশীদারেরা আমদানি সীমিত করবে—এই নীতিগত বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে সমন্বয়ের ভার কীভাবে ভাগ হবে।
ঋণ নেওয়ার খরচের দিকে নজর রেখে সহায়তা বাড়াচ্ছে বেইজিং
সেপ্টেম্বরের শেষ দিক থেকে চীনা কর্তৃপক্ষ লক্ষ্যভিত্তিক সুদহার হ্রাস, বন্ধকি ঋণে ভর্তুকি এবং অবকাঠামো ও প্রযুক্তির জন্য সস্তা অর্থায়ন চালু করেছে। স্থানীয় সরকারের অর্থায়নের চাপ কমাতে ও বিনিয়োগে সহায়তা দিতে অব্যবহৃত সরকারি ঋণসীমা থেকে ৫৫০ বিলিয়ন ইউয়ানও বরাদ্দ করেছে তারা।
অবকাঠামো খাতে ব্যয় উৎসাহিত করতে ৮০০ বিলিয়ন ইউয়ানের একটি অতিরিক্ত নীতি-অর্থায়ন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ছোট বেসরকারি কোম্পানি ও ভোক্তাদের ঋণের সুদে ভর্তুকি বাড়িয়েছে কর্তৃপক্ষ; উৎপাদনে সহায়তার পাশাপাশি ঋণগ্রহীতা ও বাড়ির ক্রেতাদের জন্যও কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
সাম্প্রতিক এই পদক্ষেপের আগে ছিল মে মাসে বাড়তে থাকা ঋণের বোঝা; সে সময় চীনের আর্থিক খাতের বাইরের ঋণ জিডিপির ৩০২% ছাড়িয়েছিল। পরিবারগুলো ঋণ নিতে আরও অনিচ্ছুক হয়ে পড়ার পাশাপাশি সরকারি ও করপোরেট ঋণ বেড়েছিল।
দাম নীতিনির্ধারণের সিদ্ধান্তকে জটিল করে তুলেছে। সেপ্টেম্বরে কারখানা থেকে বিক্রির পর্যায়ের দাম বেড়েছে ৫%, অথচ ভোক্তা মূল্যস্ফীতি ১%-এর নিচে ছিল। উৎপাদন খরচ বাড়লেও ক্রেতারা বেশি দাম দিতে অনিচ্ছুক থাকলে কোম্পানিগুলোকে কম মুনাফা মেনে নিতে হতে পারে বলে জানিয়েছেন ইউ।
জিডিপির পরিসংখ্যান প্রকাশের আগে জরিপে অংশ নেওয়া অর্থনীতিবিদেরা ধারণা করেছিলেন, ২০২৭ সালের প্রথম প্রান্তিক পর্যন্ত ঋণের মানদণ্ড সুদহার ও ব্যাংকের রিজার্ভ রিকোয়ারমেন্ট রেশিও অপরিবর্তিত থাকবে। ব্যাংকগুলোকে আমানতের যে অংশ রিজার্ভে রাখতে হয়, তা নির্ধারণ করে রিজার্ভ রিকোয়ারমেন্ট রেশিও। এই হার কমালে ঋণ দেওয়ার জন্য তহবিল ছাড় হতে পারে।
সং বলেছেন, কর্মসংস্থান, আয় ও অভ্যন্তরীণ চাহিদায় আরও সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে। কর্মকর্তারা যদি সামগ্রিক মুদ্রানীতি অপরিবর্তিত রাখেন, তাহলে সরকারি ব্যয়কে আরও বেশি দায়িত্ব নিতে হতে পারে।
প্রবৃদ্ধি ও নীতির পরবর্তী দিক
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ২০২৬ সালে চীনের প্রবৃদ্ধি ৪.৫% হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। জিডিপির হিসাব প্রকাশের আগে পরিচালিত একটি জরিপেও ২০২৬ সালের জন্য ৪.৫% এবং ২০২৭ সালের জন্য ৪.৪% প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। সর্বশেষ পরিসংখ্যানের পর ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ তিয়ানচেন শু ২০২৬ সালের জন্য ৪.৭% প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছেন।
সাম্প্রতিক ধারাবাহিকতা দেখায়, প্রবৃদ্ধি কীভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে এবং পরবর্তী নীতিগত ইঙ্গিতগুলো কখন আসতে পারে:
- জানুয়ারি থেকে মার্চ ২০২৬: আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় জিডিপি ৫% বেড়েছে।
- এপ্রিল থেকে জুন: প্রবৃদ্ধি কমে ৪.৩% হয়েছে, যা তিন বছরের বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে ধীর গতি।
- সেপ্টেম্বরের শেষ দিক: বেইজিং লক্ষ্যভিত্তিক ঋণ সহায়তা ও বন্ধকি ঋণে ভর্তুকি চালু করেছে।
- অক্টোবর: কর্তৃপক্ষ অব্যবহৃত সরকারি ঋণসীমা থেকে ৫৫০ বিলিয়ন ইউয়ান বরাদ্দ করেছে।
- ১৯ অক্টোবর: পরিসংখ্যান ব্যুরো তৃতীয় প্রান্তিকে ৪.৫% এবং প্রথম নয় মাসে ৪.৬% প্রবৃদ্ধির কথা জানিয়েছে।
- ডিসেম্বর: বার্ষিক কেন্দ্রীয় অর্থনৈতিক কর্ম সম্মেলনে ২০২৭ সালের নীতিগত অগ্রাধিকার তুলে ধরা হবে বলে আশা করা হচ্ছে; একই সময়ে প্রত্যাশিত পলিটব্যুরোর বৈঠক থেকেও ইঙ্গিত আসতে পারে।
এআই খাতে বিনিয়োগ অনিশ্চয়তার আরেকটি উৎস। কম্পিউটিং অবকাঠামোয় ব্যয়ের ফলে চীনা রপ্তানিকারকেরা উপকৃত হচ্ছেন; তবে এই ব্যয়ের স্থায়িত্ব আংশিকভাবে নির্ভর করছে ক্রেতারা প্রত্যাশিত মুনাফা পাচ্ছেন কি না তার ওপর। চীনের জিডিপি প্রবৃদ্ধির কতটা নির্দিষ্টভাবে এআই চাহিদা থেকে এসেছে, তার সুনির্দিষ্ট হিসাব দেওয়া হয়নি।
পরিবারগুলোর জন্য বিস্তৃত পুনরুদ্ধারের অর্থ হবে আরও নিরাপদ কর্মসংস্থান, বেশি আয় এবং আবাসনের সম্পদমূল্য কমে যাওয়ার চাপ হ্রাস। রপ্তানিকারকদের তাৎক্ষণিক কাজ হলো বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ বাড়ার মধ্যেও বিদেশি ক্রেতাদের ধরে রাখা। উৎপাদন সম্প্রসারণে কতটা সহায়তা যাবে আর যাদের কেনাকাটা করার কথা, তাদের কাছে কতটা পৌঁছাবে—বেইজিংয়ের পরবর্তী সিদ্ধান্তে তা স্পষ্ট হবে।
মূল বিষয়
- ২০২৬ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে চীনের জিডিপি বেড়েছে ৪.৫%, আগের প্রান্তিকের ৪.৩% থেকে বেশি।
- জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরে গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ৪.৬%, যা বেইজিংয়ের বার্ষিক ৪.৫% থেকে ৫% লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে।
- এআই অবকাঠামোর চাহিদা ও উন্নত উৎপাদন রপ্তানিতে সহায়তা করেছে, অথচ সেপ্টেম্বরে খুচরা বিক্রি বেড়েছে মাত্র ১.১%।
- আবাসন উন্নয়ন খাতে বিনিয়োগ কমেছে ২০.৬% এবং প্রথম নয় মাসে স্থায়ী সম্পদে মোট বিনিয়োগ কমেছে ৭.২%।
- চীনের বাড়তে থাকা বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ইউরোপ ও অন্যান্য বাণিজ্য অংশীদারের চাপ বাড়াচ্ছে।
- লক্ষ্যভিত্তিক ঋণ সহায়তা ও সরকারি অর্থায়ন অর্থনৈতিক কার্যক্রমে সহায়তা করছে; পরবর্তী বড় পদক্ষেপের দিকে নজর থাকবে ডিসেম্বরে অর্থনৈতিক নীতিবিষয়ক বৈঠকগুলোতে।






