আড়ালে জমে ওঠা ঋণের পাহাড়
বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যম যখন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকারের ঋণ বৃদ্ধির দিকে নজর দিয়েছে, তখন চীনে নীরবে আরও অনেক বড় ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। এর ফলে দেশটির মোট ঋণ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা এখন পৃথিবীর প্রায় সব বড় অর্থনীতির চেয়েও বেশি। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন চীনা প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখন কূটনৈতিক আলোচনায় প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা ও বাণিজ্য ভারসাম্যের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এর আড়ালে রয়েছে এমন এক আর্থিক দুর্বলতা, যা বৈশ্বিক অর্থনীতির চিত্র বদলে দিতে পারে বলে বিশ্লেষকেরা সতর্ক করছেন। ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের প্রধান এশিয়া অর্থনীতিবিদ মার্ক উইলিয়ামসের তথ্যমতে, আর্থিক খাত বাদ দিলে চীনের মোট ঋণ-জিডিপি অনুপাত ২০১০ সাল থেকে দ্বিগুণ হয়েছে এবং এখন ৩০০ শতাংশ ছাড়িয়েছে। উইলিয়ামসের ভাষায়, এ কারণে বেইজিং এমন এক শ্রেণিতে পড়েছে, যা অন্য দেশগুলোর সঙ্গে তুলনীয় নয়। মহামারিকালীন প্রণোদনা বিবেচনায় নেওয়ার পরও ২০১০ সালের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোজোন ও যুক্তরাজ্যে অর্থনৈতিক উৎপাদনের অনুপাতে সরকারি ও বেসরকারি ঋণের বিস্তৃত পরিমাপ কমেছে। বিপরীতে, চীনের ঋণ বৃদ্ধির ধারা আরও তীব্র হয়েছে। এর পেছনে রয়েছে রাষ্ট্রনির্দেশিত প্রবৃদ্ধির মডেল, যা গতি ধরে রাখতে ক্রমাগত বড় আকারের ঋণ সম্প্রসারণের ওপর নির্ভরশীল।
সূচিপত্র
উইলিয়ামস উল্লেখ করেন, চীনের ঋণ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে কেবল জাপানের ঋণের বোঝাই এর চেয়ে বেশি। তবে চীনের অবনতির গতি দেশটিকে আলাদা করে তুলেছে। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের মোট সরকারি ও বেসরকারি ঋণ ছিল জিডিপির প্রায় ২৬৫ শতাংশ, যা মহামারিকালীন সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে কম। অন্যদিকে, গত ১৫ বছরে চীনের ঋণ-জিডিপি অনুপাত ১২০ শতাংশ পয়েন্টেরও বেশি বেড়েছে। এই ব্যবধান ইঙ্গিত দেয়, ওয়াশিংটনের রাজস্বসংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ গুরুতর এবং তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হলেও বেইজিংয়ের ঋণ সঞ্চয় দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য আরও মৌলিক কাঠামোগত হুমকি হতে পারে। উদ্বেগের কারণ শুধু মোট ঋণের পরিমাণ নয়, বরং নতুন দায়বদ্ধতা যে গতিতে প্রকৃত অর্থনীতির চেয়ে দ্রুত বাড়ছে, সেটিও। ২০২০ সালের মহামারির অভিঘাত বাদ দিলে সংস্কার যুগের পর থেকে নামমাত্র জিডিপি প্রবৃদ্ধি এখন সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। ফলে ঋণের হিসাবের হর—অর্থনীতির আকার—সংকুচিত হচ্ছে, আর লব—ঋণের পরিমাণ—ফুলে উঠছে।
অনুপাতের আড়ালের চিত্র
চীনের ঋণের বোঝা কেন অর্থনীতিবিদদের উদ্বিগ্ন করছে, তা বুঝতে সরকারি ঋণের শিরোনামভিত্তিক পরিসংখ্যানের বাইরে গিয়ে কারা ঋণ নিচ্ছে এবং কেন নিচ্ছে, তার পূর্ণ চিত্র দেখা দরকার। ঋণ-জিডিপি অনুপাত দিয়ে বার্ষিক অর্থনীতির আকারের তুলনায় মোট ঋণ মাপা হয়। চাইনিজ একাডেমি অব সোশ্যাল সায়েন্সেসের অধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ইনস্টিটিউশন ফর ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের হিসাব অনুযায়ী, চীনের এই অনুপাত এখন ৩০২ শতাংশ ছাড়িয়েছে। এক বছরে তা ১১.৮ শতাংশ পয়েন্ট বেড়েছে, যা আগের বছরের বৃদ্ধির চেয়ে দ্রুত। এই শিরোনামভিত্তিক সংখ্যার আড়ালে রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন। দীর্ঘস্থায়ী আবাসন খাতের ধসের চাপে থাকা চীনা পরিবারগুলো ঋণ কমাচ্ছে। টানা ১১তম প্রান্তিকে বন্ধকি ঋণ কমেছে, আর পরিবারের বার্ষিক ঋণ বৃদ্ধির হার নেমে রেকর্ড সর্বনিম্ন মাত্র আধা শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ, পরিবারগুলো ঋণ শোধ করছে এবং নতুন ঋণ নেওয়া এড়িয়ে চলছে।
তবে সরকারি ও করপোরেট খাত চলছে বিপরীত দিকে। গত বছর সরকারি ঋণ ৭.৬ শতাংশ পয়েন্ট বেড়েছে, আর আর্থিক খাত-বহির্ভূত করপোরেট ঋণ বেড়েছে ৬.২ শতাংশ পয়েন্ট। স্থানীয় সরকার অর্থায়ন সংস্থাগুলোকে হিসাবের মধ্যে ধরলে, বকেয়া মোট ঋণের প্রায় ৪০ শতাংশই সরকারি খাতের দায়। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ চীনের সরকারি ঋণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯৬ ট্রিলিয়ন ইউয়ানে। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের ঋণ প্রায় ৪১ ট্রিলিয়ন ইউয়ান, আর বাকি অংশ স্থানীয় সরকারগুলোর। কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলেন, এই সরকারি ঋণ জিডিপির প্রায় ৬৮.৫ শতাংশ, যা জি২০-এর গড়ের চেয়ে অনেক কম। তবে এই পরিমাপে বিপুল করপোরেট দায় এবং সরকারি হিসাবের বাইরে জমে থাকা গোপন দায় অন্তর্ভুক্ত নয়। বিস্তৃত ৩০০ শতাংশের পরিমাপটি এসব করপোরেট ও পারিবারিক ঋণের বোঝাও ধরে, ফলে দেশের ঋণ পরিস্থিতির অনেক বেশি উদ্বেগজনক চিত্র উঠে আসে।
এই বৈপরীত্যের কারণ কী? বাড়ির দাম কমে যাওয়া ও আয় বৃদ্ধির দুর্বলতায় আস্থা নষ্ট হওয়ায় পরিবারগুলো ঋণের বোঝা কমাচ্ছে। তবে কোম্পানি ও স্থানীয় সরকার ভিন্ন প্রণোদনা কাঠামোর মুখোমুখি। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে স্থানীয় কর্মকর্তাদের ওপর এখনো প্রবল চাপ রয়েছে। এর ফলে প্রায়ই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বৈদ্যুতিক যানবাহন ও রোবোটিকসের মতো পছন্দের শিল্পে ভর্তুকিযুক্ত ঋণ দেওয়া হয়। স্থানীয় সরকারের ঋণ পুনর্গঠন এবং নতুন গোপন ঋণ ঠেকানোর অঙ্গীকার করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। কিন্তু কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ ধরে রাখার রাজনৈতিক তাগিদ এখনো আর্থিক সতর্কতাকে ছাপিয়ে যাচ্ছে।
জম্বি প্রতিষ্ঠান ও ঋণ নবায়নের চক্র
চীনের ঋণবৃদ্ধির সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিণতিগুলোর একটি হলো জম্বি প্রতিষ্ঠানের বিস্তার। এসব কোম্পানির ব্যবসা থেকে আয় এত কম যে সুদের কিস্তি মেটানো যায় না; তবু ব্যাংক বারবার ঋণের মেয়াদ বাড়িয়ে দেওয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলো টিকে থাকে। ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব ডালাসের গবেষণায় আজকের চীন এবং ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকের জাপানের মধ্যে স্পষ্ট মিল তুলে ধরা হয়েছে। দুই ক্ষেত্রেই দ্রুত ঋণ বৃদ্ধি পুরোপুরি অভ্যন্তরীণ সঞ্চয় থেকে অর্থায়ন করা হয়েছিল, বিদেশি ঋণ থেকে নয়। এতে তাৎক্ষণিক সংকটের ঝুঁকি কমলেও উৎপাদনশীলতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি হয়েছিল। সঞ্চয় যখন মূলত ব্যাংকিং ব্যবস্থার ভেতরেই আবদ্ধ থাকে, তখন রাষ্ট্রায়ত্ত ঋণদাতাদের তহবিলের ওপর চাপ কম থাকে। তারা নিজেদের হিসাবখাতায় লোকসান স্বীকার করা এড়াতে দেউলিয়া ঋণগ্রহীতাদের নতুন ঋণ দিতে পারে। এই প্রক্রিয়ার নাম ঋণ নবায়ন করে টিকিয়ে রাখা।
পরিসংখ্যান উদ্বেগজনক। চীনের সব আর্থিক খাত-বহির্ভূত খাতে জম্বি প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে থাকা সম্পদের অংশ ২০১৮ সালের ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৪ সালে ১৬ শতাংশে পৌঁছেছে। একসময় প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি আবাসন খাতে এই হার ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪০ শতাংশ হয়েছে, যা খাতটির গভীর অকার্যকারিতা তুলে ধরে। উৎপাদন খাতের অবস্থাও খারাপ হয়েছে: জম্বি সম্পদের অংশ ২০২০ সালের ৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৪ সালে ১১ শতাংশ হয়েছে। সেবা খাতে এই হার দাঁড়িয়েছে ১৭ শতাংশে। এসব ব্যবসা মূলধন, শ্রম ও কাঁচামাল আটকে রাখে, যা অন্যথায় আরও উৎপাদনশীল প্রতিযোগীদের কাছে যেতে পারত। ফলে কার্যত অর্থনীতির রক্তনালিতে বাধা তৈরি হয়। ডালাস ফেডের অর্থনীতিবিদেরা উল্লেখ করেছেন, এই প্রবণতা কয়েক দশক ধরে জাপানের উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দিয়েছিল, বিশেষ করে বিদেশি প্রতিযোগিতা থেকে সুরক্ষিত খাতগুলোতে।
চীনের শিল্প খাতে এই প্রবণতা ইতিমধ্যেই স্পষ্ট। ২০১৯ সালের পর থেকে ব্যবসায়িক ঋণ দ্বিগুণ হয়েছে, অথচ আয় বেড়েছে মাত্র ৩০ শতাংশ। চীনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কোম্পানি এখন লোকসানে চলছে, কিন্তু ব্যাপক খেলাপি ঠেকাতে ঋণদাতারা ঋণের মেয়াদ বাড়িয়ে চলেছে। এর ফলে অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা স্থায়ী হচ্ছে, মূল্যহ্রাসের চাপ বাড়ছে এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থা নতুন উদ্ভাবনে অর্থায়নের বদলে অনুৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠানগুলোকে কৃত্রিমভাবে টিকিয়ে রাখতেই ক্রমশ বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ছে।
মূল্যহ্রাস, অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা ও প্রবৃদ্ধির ধাঁধা
চীনের ঋণের বিস্ফোরণের সঙ্গে আরেকটি সমান উদ্বেগজনক ঘটনা ঘটেছে: টানা মূল্যহ্রাস। পুরো অর্থনীতিতে দামের গতিপ্রবণতা নির্দেশক একটি পরিমাপ দেখায়, চীনে টানা তিন বছর মূল্যহ্রাস হয়েছে। ১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে বাজার সংস্কার শুরুর পর এটিই দীর্ঘতম সময়। টানা ১১ প্রান্তিকে দাম কমায় নামমাত্র জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেমে মাত্র ৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ২০২০ সালের মহামারির অভিঘাত বাদ দিলে সংস্কার যুগের পর এটিই দুর্বলতম হার। পুরো অর্থনীতিতে দাম কমলে ঋণের প্রকৃত বোঝা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই বাড়ে, কারণ ঋণগ্রহীতাদের এমন আয় থেকে ঋণ শোধ করতে হয়, যা নামমাত্র হিসাবে সংকুচিত হচ্ছে।
এর মূল কারণ রাষ্ট্রনির্দেশিত এমন একটি মডেল, যা ভোগের চেয়ে উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দেয়। অভ্যন্তরীণ চাহিদা দুর্বল হওয়া সত্ত্বেও স্থানীয় সরকার ও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক বৈদ্যুতিক যানবাহন, সৌর প্যানেল, ইস্পাত ও রোবোটিকসের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে ঋণ দিয়েছে। এর ফলে তৈরি হয়েছে এমন এক পরিস্থিতি, যাকে দেশীয় নীতিনির্ধারকেরা ‘ইনভোলিউশন’ বলেন: বিশৃঙ্খল মূল্য-প্রতিযোগিতার এক চক্র, যেখানে অতিরিক্তসংখ্যক প্রতিষ্ঠান সীমিত চাহিদার জন্য লড়াই করে, দাম কমায় এবং মুনাফার মার্জিন নিশ্চিহ্ন করে। সুস্থ প্রবৃদ্ধি জাগানোর বদলে ঋণ বৃদ্ধির ঢেউ অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়েছে। চীনা কর্তৃপক্ষ উৎপাদন খাতের ১০টি প্রধান খাতকে লক্ষ্য করে ইনভোলিউশনবিরোধী অভিযান শুরু করেছে, তবে কাঠামোগত প্রণোদনাগুলো এখনো বহাল রয়েছে। অতিরিক্ত সরবরাহ সামলানোর প্রধান উপায় হিসেবে রপ্তানিনির্ভর প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভরতা রয়ে গেছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও উন্নয়নশীল বাজারগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য উত্তেজনা বাড়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
ধাঁধাটি হলো, প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়া ঠেকাতেই এই ঋণের বড় অংশ নেওয়া হয়েছিল। চাকরি হারানো ঠেকাতে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঋণ দেয়, আর স্থানীয় সরকার অবকাঠামো নির্মাণ ও শিল্পে ভর্তুকি দিতে ঋণ নেয়। কিন্তু উইলিয়ামসের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ১৮ বছর ধরে ঋণ সম্প্রসারণের ফল এমন এক ব্যবস্থা, যেখানে মূলধন অনুৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠানে আটকে আছে, লোকসান সর্বব্যাপী হয়েছে এবং মূল্যহ্রাস স্থায়ী রূপ নিয়েছে। প্রবৃদ্ধি টিকিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে দেওয়া ওষুধই হয়তো উল্টো প্রবৃদ্ধিকে বিষিয়ে তুলছে।
বেইজিংয়ের পদক্ষেপ ও রাজস্বের সংকট
চীনের নেতারা এসব বিপদ সম্পর্কে অজ্ঞ নন। স্থানীয় সরকারের ঋণঝুঁকি সামাল দিতে অর্থ মন্ত্রণালয় ধারাবাহিক কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে এমন একটি কর্মসূচি, যার আওতায় ২০২৫ সালে প্রায় ২.৮ ট্রিলিয়ন ইউয়ানের বিশেষ বন্ড ইস্যু করা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল স্থানীয় সরকারের গোপন দায়বদ্ধতা বদলে আরও স্বচ্ছ, দীর্ঘ মেয়াদের এবং কম সুদযুক্ত আর্থিক উপকরণ চালু করা। উপঅর্থমন্ত্রী লিয়াও মিন জোর দিয়ে বলেছেন, চীনের সরকারি ঋণ-জিডিপি অনুপাত জি২০-এর গড়ের নিচে রয়েছে। তাঁর যুক্তি, কেন্দ্রীয় সরকারের পর্যায়ে ঋণ নেওয়ার যথেষ্ট সুযোগ এখনো বেইজিংয়ের আছে। ২০২৬ সালের বাজেটে সক্রিয় রাজস্বনীতি অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। সরঞ্জাম আধুনিকীকরণ, ভোগ্যপণ্য প্রতিস্থাপন কর্মসূচি এবং কৌশলগত অবকাঠামোয় অর্থায়নের জন্য এতে ঘাটতির লক্ষ্যমাত্রা এবং অতি দীর্ঘমেয়াদি সরকারি বন্ড ইস্যুর পরিকল্পনা রাখা হয়েছে।
তবে সরকারি ভাষ্যে সরকারি ঋণের ওপরই সংকীর্ণভাবে জোর দেওয়া হয়। এই ঋণ জিডিপির প্রায় ৬৮.৫ শতাংশ, আর করপোরেট ও গোপন দায়ের কথা কম গুরুত্ব পায়—যেগুলো মোট ঋণকে অনেক বেশি পর্যায়ে ঠেলে দিয়েছে। স্বাধীন হিসাব অনুযায়ী, শুধু স্থানীয় সরকার অর্থায়ন সংস্থাগুলোর ঋণই জিডিপির ৪৫ শতাংশ হতে পারে, যা সরকারি হিসাবের ওপর অতিরিক্ত বোঝা হয়ে আছে। এদিকে চীনের রাজস্বভিত্তি দুর্বল হচ্ছে। ধীরগতির বাণিজ্য, আবাসন লেনদেন করের পতন এবং বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে এলাকাগুলোর মধ্যে অননুমোদিত করছাড় দেওয়ার প্রতিযোগিতায় জাতীয় কর-জিডিপি অনুপাত ২০১৯ সালের প্রায় ১৬ শতাংশ থেকে কমে ২০২৫ সালে ১২.৬ শতাংশে নেমেছে। একসময় স্থানীয় বাজেট সমৃদ্ধ করত যে জমি বিক্রি, আবাসন বাজারের পতনের সঙ্গে সেটিও ধসে পড়েছে। ফলে অবকাঠামো ব্যয়ের বড় অংশের অর্থায়নকারী ব্যবস্থাপিত তহবিল বাজেট চাপে পড়েছে।
কেন্দ্রীয় সরকার অননুমোদিত কর প্রণোদনার জন্য স্থানীয় কর্মকর্তাদের সমালোচনা করেছে এবং নতুন ঋণের ওপর নিয়ন্ত্রণ জোরদার করেছে। অর্থমন্ত্রী লান ফোআন স্থানীয় সরকারগুলোকে অবৈধ ঋণ না বাড়ানোর যে নীতিকে তিনি ‘লোহকঠিন শৃঙ্খলা’ বলেছেন, তা মেনে চলার সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তবু ২০২৫ সালে সমন্বিত রাজস্ব ঘাটতি জিডিপির ৭.২ শতাংশে পৌঁছেছে। রাজস্ব হিসেবে গণনা করা বিশেষ বন্ডের অর্থের মতো হিসাবি কৌশল বাদ দিলে এই ঘাটতি নির্ণয় করা হয়, যা সরকারি ৪ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার অনেক বেশি। এই ব্যবধান রাজস্বচাপের প্রকৃত মাত্রা প্রকাশ করে এবং ইঙ্গিত দেয়, মূল রাজস্ব আয় না বাড়লে আগ্রাসী ঋণ বিনিময় কর্মসূচিও হয়তো কেবল সময় কিনে দেবে।
বৈশ্বিক অভিঘাত ও ২০৩১-এর পথে
চীনের অভ্যন্তরীণ ঋণ সমস্যা আর শুধু দেশটির নিজস্ব উদ্বেগ নয়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্যমতে, ২০২৫ সালে বৈশ্বিক সরকারি ঋণ ১১১ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। এর অর্ধেকেরও বেশি ঋণ যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের। ওয়াশিংটনের সরকারি ঋণ ৩৮.৩ ট্রিলিয়ন ডলার, আর বেইজিংয়ের ১৮.৭ ট্রিলিয়ন ডলার। আইএমএফের পূর্বাভাস, ২০৩১ সালে বৈশ্বিক সরকারি ঋণ বিশ্বের জিডিপির ১০২ শতাংশে পৌঁছাবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এটিই হবে সর্বোচ্চ পর্যায়। সে সময় পুনর্গঠনের দ্রুত প্রবৃদ্ধি দেশগুলোকে ঋণের বোঝার চেয়ে দ্রুত বড় হতে সাহায্য করেছিল। এখন প্রবৃদ্ধি ধীর এবং ঋণের খরচ বেশি। তাই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি সম্ভব কি না, তা নিয়ে সংশয় বাড়ছে।
শুধু সুদ পরিশোধের ব্যয়ই এখনকার বৈশ্বিক জিডিপির প্রায় ৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০৩১ সালে প্রায় ৫ শতাংশ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে চক্রবৃদ্ধির মতো এক পরিস্থিতি তৈরি হবে, যেখানে নতুন ঋণ মূলত পুরোনো ঋণের সুদ মেটাতেই নেওয়া হবে। যুক্তরাষ্ট্রে জিডিপির ৭ থেকে ৮ শতাংশের দীর্ঘস্থায়ী ঘাটতি ছয় বছরের মধ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের ঋণকে জিডিপির ১৪২ শতাংশে ঠেলে দিতে পারে। চীনের ঋণের গঠন ভিন্ন হলেও, শুধু কেন্দ্রীয় সরকারের পর্যায়ে ঋণ-জিডিপি অনুপাত প্রায় ১২৭ শতাংশের দিকে যাচ্ছে। দুই অর্থনীতিই এত বড় যে তাদের রাজস্বগত গতিপথ বাণিজ্য, পুঁজি প্রবাহ ও পণ্যের বাজারের মধ্য দিয়ে বিশ্বজুড়ে প্রভাব ফেলে। চীনে দীর্ঘস্থায়ী মন্দা হলে কাঁচামাল ও শিল্পপণ্যের আমদানির চাহিদা কমবে; আর বিশৃঙ্খল ঋণহ্রাস এশিয়ার উদীয়মান বাজারগুলোতে আর্থিক সংক্রমণ ঘটাতে পারে।
এই দুই অর্থনৈতিক পরাশক্তির বৈপরীত্য থেকে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা মেলে। যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক পুঁজিবাজার থেকে ব্যাপক ঋণ নেয় এবং ক্রমবর্ধমান বিদেশি অর্থায়ন ব্যয়ের মুখোমুখি। চীন নির্ভর করে অভ্যন্তরীণ সঞ্চয় ও রাষ্ট্রনির্দেশিত ব্যাংকের ওপর। এতে হঠাৎ পুঁজি প্রত্যাহারের ঝুঁকি কমে, কিন্তু ঝুঁকি অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থায় কেন্দ্রীভূত হয় এবং ধীরে ধীরে উৎপাদনশীলতা ও পরিবারের সম্পদ ক্ষয় করে। কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া কোনো মডেলই টেকসই বলে মনে হয় না। তবু কোনো সরকারই অর্থনৈতিক নীতি উল্লেখযোগ্যভাবে কঠোর করার ইচ্ছা দেখায়নি।
জাপানের মতো হারানো দশক এড়াতে পারবে কি চীন?
উদ্বেগের এত কারণ থাকলেও অধিকাংশ অর্থনীতিবিদ চীনে লেম্যান ব্রাদার্সের মতো আর্থিক ধসের আশঙ্কা করছেন না। পুঁজি নিয়ন্ত্রণ, উচ্চ অভ্যন্তরীণ সঞ্চয় এবং ব্যাংকিং খাতে রাষ্ট্রের আধিপত্য এমন সুরক্ষা দেয়, যা বাজারনির্ভর বেসরকারি অর্থনীতিতে নেই। আবাসন বাজার ধসের সময় আর্থিক ব্যবস্থা ইতিমধ্যেই কঠিন পরীক্ষায় টিকে গেছে। আর রাষ্ট্রের সমর্থনপুষ্ট ঋণদাতারা তাৎক্ষণিকভাবে দেউলিয়া ঘোষণা না করে সময়ের সঙ্গে লোকসান সামাল দিতে পারে। এর মানে এই নয় যে ব্যবস্থা সুস্থ; বরং এর ব্যর্থতা হঠাৎ নয়, ধীরে ধীরে প্রকাশ পাবে। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউশন ফর ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের লিউ লেইয়ের যুক্তি, প্রকৃত পরীক্ষা ঋণের মোট পরিমাণ নয়, বরং ঋণ কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ঋণ সম্প্রসারণ যদি নামমাত্র প্রবৃদ্ধি আবার জাগিয়ে তুলতে পারে, তাহলে সংকট ছাড়াই ঋণ-জিডিপি অনুপাত স্থিতিশীল হতে পারে। দাম সামান্য বাড়লেও নামমাত্র জিডিপি বাড়বে এবং ঋণের বোঝা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেড়ে যাওয়ার চাপ কমবে।
তবে এটি বড় এক ‘যদি’। প্রায় দুই দশক ধরে চীন একই প্রণোদনামূলক নীতি অনুসরণ করেছে, আর এর সুফল স্পষ্টতই কমে আসছে। ব্যাংকিং ব্যবস্থা এখন অনুৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠানগুলোকে টিকিয়ে রাখছে, শিল্পজুড়ে ব্যাপক লোকসান স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে এবং দাম কমা ও মজুরি স্থবির থাকায় ভোক্তাদের মধ্যে ব্যয় না করার মানসিকতা গেঁথে যাচ্ছে। ফলে নতুন ঋণ নতুন প্রবৃদ্ধি তৈরির বদলে পুরোনো সমস্যাকে আরও বাড়াচ্ছে। উইলিয়ামস এই বিদ্রূপটি সংক্ষেপে তুলে ধরেছেন:
বিদ্রূপটি হলো, সরকারি ঋণ নেওয়া এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর শিথিল ঋণমান—দুটিরই একটি চালিকাশক্তি হলো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা ও চাকরি হারানো ঠেকানোর আকাঙ্ক্ষা। অথচ ১৮ বছর ধরে চলা ঋণ বৃদ্ধির ফল হলো এমন এক ব্যাংকিং ব্যবস্থা, যা অনুৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠানগুলোকে টিকিয়ে রাখছে; শিল্পজুড়ে ব্যাপক লোকসান এবং স্থায়ী অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি হয়েছে।
পরিবারের ভোগ, নামমাত্র আয় বৃদ্ধি এবং বাজারনির্ভর পুঁজি বরাদ্দের দিকে দৃঢ়ভাবে ভারসাম্য না ফেরালে আকস্মিক ধসের বদলে দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতার ঝুঁকিতে পড়বে চীন। ঋণের মেয়াদ বাড়তে থাকবে, জম্বি প্রতিষ্ঠানগুলো টিকে থাকবে এবং ঋণ-জিডিপি অনুপাত ক্রমে বাড়বে। একে স্থিতিশীলতা বলা হবে, নাকি কেবল সংকটের ধীরতর রূপ, তা নির্ভর করছে নিজের অর্থনৈতিক স্ববিরোধিতার সুদ মেটানোর সামর্থ্য বেইজিংয়ের আর কত দিন থাকে তার ওপর।
মূল বিষয়গুলো
- আর্থিক খাত বাদ দিলে চীনের মোট ঋণ-জিডিপি অনুপাত ৩০০ শতাংশ ছাড়িয়েছে। পরিবারগুলো ঋণ কমালেও করপোরেট ও সরকারি ঋণ বাড়ছে।
- রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো লোকসানি জম্বি প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ নবায়ন করছে। এসব প্রতিষ্ঠানের হাতে এখন আর্থিক খাত-বহির্ভূত সম্পদের প্রায় ১৬ শতাংশ রয়েছে, যা উৎপাদনশীল বিনিয়োগকে সরিয়ে দিচ্ছে।
- চীনে টানা তিন বছর পুরো অর্থনীতিতে মূল্যহ্রাস হয়েছে। এতে নামমাত্র প্রবৃদ্ধি কমেছে এবং ঋণের প্রকৃত বোঝা বেড়েছে।
- সরকারি ঋণ জিডিপির প্রায় ৬৮.৫ শতাংশ হলেও, স্থানীয় সরকার অর্থায়ন সংস্থার গোপন ঋণ ও করপোরেট দায় মোট ঋণকে অনেক বেশি পর্যায়ে ঠেলে দিয়েছে।
- বেইজিং প্রায় ২.৮ ট্রিলিয়ন ইউয়ানের ঋণ বিনিময় কর্মসূচি চালু করেছে এবং অবৈধ ঋণের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণের অঙ্গীকার করেছে। তবু স্থানীয় সরকারগুলোর কর রাজস্ব কমছে এবং জমি বিক্রি ধসে পড়েছে।
- আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের পূর্বাভাস, ২০৩১ সালে বৈশ্বিক সরকারি ঋণ বিশ্বের জিডিপির ১০২ শতাংশে পৌঁছাবে। ১১১ ট্রিলিয়ন ডলারের মোট ঋণের অর্ধেকেরও বেশি থাকবে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের হাতে।






