উত্তর হালমাহেরায় দুটি ভাসমান রিঅ্যাক্টর স্থাপনের পরিকল্পনা
রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক করপোরেশন রোসাটম এবং ইন্দোনেশিয়ার পিটি পেমবাংকিত লিস্ট্রিক নুক্লির উত্তর মালুকু প্রদেশের হালমাহেরা দ্বীপের উত্তরাঞ্চলে দুটি ভাসমান পারমাণবিক বিদ্যুৎ ইউনিট থেকে ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রকল্পে সমঝোতা হয়েছে। ২০২৬ সালের ১৬ অক্টোবর মস্কোতে রুশ জ্বালানি সপ্তাহ চলাকালে চুক্তিটি সই হয়। এর মধ্য দিয়ে পূর্ব ইন্দোনেশিয়ায় পারমাণবিক বিদ্যুৎ সরবরাহের বাণিজ্যিক পথ খুলল।
সূচিপত্র
- উত্তর হালমাহেরায় দুটি ভাসমান রিঅ্যাক্টর স্থাপনের পরিকল্পনা
- ২০০ মেগাওয়াটের প্রকল্পে কী সরবরাহ হবে
- দ্বীপাঞ্চলে ভাসমান বিদ্যুৎকেন্দ্রের আকর্ষণ
- রোসাটমের মালিকানায় ইউনিট, বিদ্যুৎ কিনবে ইন্দোনেশিয়া
- রিঅ্যাক্টর প্রযুক্তি ও পরিচালনার অভিজ্ঞতা
- চুক্তি কার্যকর হলে শুরু হবে পাঁচ বছরের হিসাব
- আগের সহযোগিতা থেকে মস্কোর চুক্তি
- জ্বালানি নিরাপত্তা ও ২০৬০ সালের জলবায়ু লক্ষ্য
- মূল বিষয়গুলো
পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিটি ইউনিট ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। ভাসমান স্থাপনাগুলোর মালিকানা রোসাটমের কাছেই থাকবে। চুক্তির আওতায় এগুলোর পরিকল্পিত ৬০ বছরের কার্যকালজুড়ে বিদ্যুৎ কেনা হবে। কোম্পানিগুলো বলছে, এটি বেসরকারি বিনিয়োগে অর্থায়িত একটি বাণিজ্যিক ব্যবস্থা; এতে ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রীয় বাজেট থেকে অর্থ নেওয়া হবে না।
সরবরাহ চুক্তির প্রধান শর্ত কার্যকর হওয়ার প্রায় পাঁচ বছর পর গ্রাহকদের কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছাতে পারে। ফলে চুক্তি সইয়ের মধ্য দিয়ে এমন একটি প্রক্রিয়া শুরু হলো, যার সময়সীমা নির্ভর করছে চুক্তি কার্যকর হওয়ার ওপর; নির্দিষ্ট কোনো উদ্বোধনের তারিখ এখনো ঠিক হয়নি।
রোসাটমের মহাপরিচালক আলেক্সেই লিখাচেভ চুক্তিটিকে ভাসমান পারমাণবিক বিদ্যুৎ ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহের বিশ্বের প্রথম রপ্তানি চুক্তি বলে বর্ণনা করেছেন। উত্তর মালুকুর জন্য এর বাস্তব লক্ষ্য হলো স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য আরও নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা, বিশেষত যেসব শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দরকার। রোসাটমের জন্য প্রকল্পটি রাশিয়ার বাইরে ভাসমান পারমাণবিক বিদ্যুতের ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি করবে। এই মডেলে উৎপাদন ইউনিটের মালিকানা হস্তান্তরের বদলে বিদ্যুৎ বিক্রি করা হবে।
২০০ মেগাওয়াটের প্রকল্পে কী সরবরাহ হবে
প্রস্তাবিত ভাসমান ইউনিট দুটির প্রতিটি প্রকল্পটির মোট সক্ষমতার অর্ধেক বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে। ইউনিটগুলোকে এফপিইউ-১০০ বা পিইবি-১০০ নামে বর্ণনা করা হয়েছে এবং এতে রোসাটমের আরআইটিএম পরিবারের রিঅ্যাক্টর ব্যবহার করা হবে। কারিগরি বিবরণ অনুযায়ী, প্রস্তাবিত রিঅ্যাক্টরের সংস্করণটি হলো আরআইটিএম-২০০এম, যা উষ্ণ জলবায়ুতে পরিচালনার উপযোগী করে তৈরি।
মেগাওয়াট দিয়ে নির্দিষ্ট মুহূর্তে কোনো জেনারেটর কতটা বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারে, তা মাপা হয়। ২০০ মেগাওয়াটের একটি স্থাপনা পূর্ণ সক্ষমতায় এক ঘণ্টা চললে ২০০ মেগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। বছরে কত বিদ্যুৎ সরবরাহ হবে, তা নির্ভর করবে পরিচালনার সময়, রক্ষণাবেক্ষণ ও অন্যান্য পরিস্থিতির ওপর।
বিদ্যুৎ যাবে হালমাহেরার উত্তরাঞ্চলে; পুরো ইন্দোনেশীয় দ্বীপপুঞ্জে নয়। উত্তর মালুকুর গ্রাহকদের বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং পূর্ব ইন্দোনেশিয়ার বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে সহায়তা করাই প্রকল্পটির উদ্দেশ্য। ভাসমান ইউনিট, উপকূলীয় অবকাঠামো এবং গ্রাহকদের কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার নেটওয়ার্কের সংযোগের ওপর এর স্থানীয় প্রভাব নির্ভর করবে।
দ্বীপাঞ্চলে ভাসমান বিদ্যুৎকেন্দ্রের আকর্ষণ
ইন্দোনেশিয়ার ভৌগোলিক অবস্থান এই প্রস্তাবের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। দেশটিতে ১৩ হাজারের বেশি দ্বীপ রয়েছে, আর কোনো একটি এলাকার জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কেন্দ্র স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমুদ্রপথে দূরের জনপদগুলোতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারে না। রোসাটমের ভাষ্য অনুযায়ী, যেসব প্রত্যন্ত উপকূলীয় এলাকায় বিদ্যুৎ অবকাঠামো নির্মাণ কঠিন, সেখানে ভাসমান পারমাণবিক ইউনিট একটি বিকল্প হতে পারে।
প্রস্তাবিত পদ্ধতিতে নির্মাণকাজের বড় অংশ হবে জাহাজ নির্মাণ কারখানায়। সেখানে ইউনিটগুলো সংযোজনের পর টেনে নির্ধারিত স্থানে নেওয়া হবে। এতে নির্মাণকাজের বড় একটি অংশ চূড়ান্ত স্থানের বাইরে করা সম্ভব হবে। তবে ভাসমান স্থাপনা থেকে স্থলভাগের গ্রাহকদের কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছাতে সংযোগের প্রয়োজন হবে।
নির্ভরযোগ্য বিদ্যুতের প্রতি আগ্রহের পেছনে উত্তর মালুকুর খনিজ প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প, বিশেষত নিকেল প্রক্রিয়াকরণ, অন্যতম কারণ। এসব স্থাপনায় দিনরাত বিদ্যুৎ প্রয়োজন হতে পারে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎসকে প্রায়ই বেসলোড বিদ্যুৎ বলা হয়। এটি কেবল অল্প সময়ের উচ্চ চাহিদার সময় কাজ না করে, বিদ্যুতের চাহিদার ধারাবাহিক অংশ জোগায়।
প্রকল্পের বিনিয়োগকারী হাজি রোমো নিতিউদো ওয়াচজো বলেন, ২০০ মেগাওয়াটের এই উন্নয়ন প্রকল্প উত্তর মালুকু ও পূর্ব ইন্দোনেশিয়ায় জ্বালানি স্বনির্ভরতা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়তা করবে বলে আশা করা হচ্ছে। হাজি রবার্ট নামেও পরিচিত ওয়াচজো ইন্দোতান গ্রুপের মালিক। তাঁর ঘোষিত পরিকল্পনায় বিদ্যুৎ প্রকল্পের সঙ্গে শিল্পের প্রবৃদ্ধিকে যুক্ত করা হয়েছে, পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর চাহিদার কথাও রয়েছে।
রোসাটমের মালিকানায় ইউনিট, বিদ্যুৎ কিনবে ইন্দোনেশিয়া
রোসাটমের মালিকানা বজায় থাকাই এই ব্যবস্থার একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য। রুশ কোম্পানির মালিকানাধীন স্থাপনা থেকে ইন্দোনেশিয়া বিদ্যুৎ পাবে। চুক্তি অনুযায়ী, ইউনিটগুলোর পরিকল্পিত ৬০ বছরের কার্যকালজুড়ে বিদ্যুৎ কেনা হবে। ফলে নির্মাণ ও সরবরাহের পরও দুই পক্ষের সম্পর্ক দীর্ঘদিন চলবে।
ইন্দোনেশীয় পারমাণবিক বিজ্ঞানী এবং পিটি পেমবাংকিত লিস্ট্রিক নুক্লির পরিচালক ইউদি উতোমো ইমারজোকো বলেন, প্রকল্পটি ব্যবসা-থেকে-ব্যবসা উদ্যোগ হিসেবে পরিকল্পনা করা হয়েছে। সহজভাবে বললে, কোম্পানিগুলো বেসরকারি পুঁজি ব্যবহার করে বাণিজ্যিকভাবে বিনিয়োগ ও বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা করতে চায়; ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় বাজেট, যা এপিবিএন নামে পরিচিত, থেকে বরাদ্দ নিয়ে নয়।
লিখাচেভ বলেন, প্রকল্পটির জন্য আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক বাণিজ্যিক চুক্তি হয়েছে, অগ্রিম অর্থের ব্যবস্থা চলছে এবং ২০২৬ সালে ইন্দোনেশিয়ার জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদন বহর নির্মাণ শুরু হবে। বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর আগে রোসাটম যেসব বাণিজ্যিক পদক্ষেপ নেবে বলে আশা করছে, তাঁর বক্তব্যে সেগুলোরই বর্ণনা রয়েছে।
বিনিয়োগের পরিমাণ, বিদ্যুতের দাম, বিস্তারিত অর্থায়নব্যবস্থা এবং কার্যক্রম শুরুর সুনির্দিষ্ট তারিখ প্রকাশ করা হয়নি। সব নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন ও বাস্তবায়নের শর্তগুলোর অবস্থাও জনসমক্ষে এখনো স্পষ্ট নয়। এসব তথ্য গ্রাহকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এগুলো থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ কখন শুরু হবে এবং এর দাম কত হবে, তা নির্ধারণে সহায়তা মিলবে।
রিঅ্যাক্টর প্রযুক্তি ও পরিচালনার অভিজ্ঞতা
রোসাটমের দাবি, রাশিয়ার পারমাণবিক আইসব্রেকারগুলোতে আরআইটিএম রিঅ্যাক্টর পরিবারের কার্যকর ব্যবহারের অভিজ্ঞতা রয়েছে। কোম্পানিটি বলছে, বহু বছরের পরিচালনায় এসব ব্যবস্থা দক্ষ, নির্ভরযোগ্য ও নিরাপদ প্রমাণিত হয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার প্রস্তাবে এই পরিবারের প্রযুক্তি গ্রীষ্মমণ্ডলীয় উপকূলীয় পরিবেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহারের কথা রয়েছে।
পারমাণবিক রিঅ্যাক্টরে পরমাণুকে নিয়ন্ত্রিতভাবে বিভাজন করে তাপ উৎপন্ন করা হয়। বিদ্যুৎকেন্দ্রে সেই তাপ ব্যবহার করে বাষ্প তৈরি এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী যন্ত্র চালানো হয়। ভাসমান বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন সরঞ্জাম একটি জাহাজ বা প্ল্যাটফর্মে থাকে, সেখান থেকে স্থলভাগের গ্রাহকদের বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়।
রাশিয়া ইতিমধ্যে আর্কটিক অঞ্চলের চুকোটকায় আকাদেমিক লোমোনোসভ ভাসমান পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনা করছে। ২০২০ সাল থেকে কেন্দ্রটি চালু রয়েছে এবং রোসাটমের তথ্য অনুযায়ী, এটি প্রায় ১.৪ বিলিয়ন কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে। এই পরিমাণটি সময়ের সঙ্গে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন বোঝায়। অন্যদিকে, ইন্দোনেশিয়া প্রকল্পের ২০০ মেগাওয়াটের পরিসংখ্যানটি বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা নির্দেশ করে।
আকাদেমিক লোমোনোসভে দুটি কেএলটি-৪০এস রিঅ্যাক্টর রয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার প্রস্তাবিত ইউনিটগুলোতে আরআইটিএম-২০০এম রিঅ্যাক্টর ব্যবহার করা হবে। রোসাটমের ভাষ্য অনুযায়ী, আগের সামুদ্রিক নকশাগুলোর তুলনায় এগুলো বেশি সংহত এবং উচ্চতর উৎপাদনক্ষমতাসম্পন্ন। রাশিয়ার শিল্পগ্রাহকদের জন্য ভাসমান ইউনিট এবং উজবেকিস্তানে আরআইটিএম-২০০এন রিঅ্যাক্টর ব্যবহার করে ছোট পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রও তৈরি করছে কোম্পানিটি।
চুক্তি কার্যকর হলে শুরু হবে পাঁচ বছরের হিসাব
চুক্তির প্রধান শর্তগুলো কার্যকর হওয়ার প্রায় পাঁচ বছর পর প্রথম দফায় বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রত্যাশা করা হচ্ছে। প্রকল্পের কিছু বিবরণে সবচেয়ে দ্রুত সম্ভাব্য সময় হিসেবে পাঁচ বছরের কথা বলা হয়েছে। পরিকল্পনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সময় গণনা শুরু হবে চুক্তি কার্যকর হওয়ার শর্ত পূরণ থেকে; মস্কোর চুক্তি সইয়ের অনুষ্ঠান থেকে নয়।
প্রকল্পটি পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলেও উত্তর হালমাহেরার গ্রাহকদের বিদ্যুতের জন্য উল্লেখযোগ্য সময় অপেক্ষা করতে হবে। ভাসমান নির্মাণ মডেলের উদ্দেশ্য হলো চূড়ান্ত স্থানে কাজ কমানো। তবে প্রকল্পের বৃহত্তর পরিসরে স্থান প্রস্তুত করা এবং বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য প্রয়োজনীয় সংযোগ স্থাপনের কাজও রয়েছে।
বিদেশে রোসাটমের অন্যান্য কাজ থেকে বোঝা যায়, পারমাণবিক প্রকল্পের বিভিন্ন ধাপের বিবরণ নির্ভুলভাবে দেওয়া কেন জরুরি। তুরস্কের ক্ষেত্রে লিখাচেভ বলেছেন, আক্কুয়ু বিদ্যুৎকেন্দ্রে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের দ্বিতীয়ার্ধে ভৌত স্টার্টআপ শুরু হওয়ার কথা। ভৌত স্টার্টআপের মধ্যে জ্বালানি লোড করা এবং ধারাবাহিক পারমাণবিক শৃঙ্খল বিক্রিয়ার দিকে অগ্রসর হওয়ার ধাপগুলো রয়েছে; বিদ্যুৎ গ্রিডে সংযোগ আসে পরে।
২০১০ সালে দ্বিপক্ষীয় চুক্তির পর ২০১৮ সালে আক্কুয়ুতে নির্মাণকাজ শুরু হয়। ২০২৩ সালে চালুর প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা একাধিকবার পিছিয়েছে। চারটি ভিভিইআর-১২০০ রিঅ্যাক্টর নিয়ে এটি অনেক বড় প্রকল্প, যার ব্যয় ২০ বিলিয়ন ডলারের বেশি। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সময়সূচি বুঝতে এর ইতিহাস প্রাসঙ্গিক। তবে ইন্দোনেশিয়ার ছোট ভাসমান প্রকল্পটির নকশা ও বাণিজ্যিক কাঠামো আলাদা।
আগের সহযোগিতা থেকে মস্কোর চুক্তি
সাম্প্রতিক চুক্তির বহু আগে থেকেই রাশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মধ্যে পারমাণবিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ২০১৫ সালে জেএসসি রোসাটম ওভারসিজ এবং ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় পারমাণবিক শক্তি সংস্থা একটি বড় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও ভাসমান পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে সমঝোতা স্মারকে সই করে। পারমাণবিক শক্তিতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও দুই পক্ষ এর আগে একটি বিস্তৃত সমঝোতা স্মারকে সই করেছিল।
পরে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে মস্কো সফরের সময় রোসাটমের সঙ্গে কাজ করার বিষয়ে ইন্দোনেশিয়ার আগ্রহের কথা তোলেন প্রবোও সুবিয়ান্তো। তখন তিনি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট-নির্বাচিত ছিলেন। পরবর্তী আলোচনায় অবকাঠামো, প্রশিক্ষণ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের বাইরেও পারমাণবিক প্রযুক্তির ব্যবহার অন্তর্ভুক্ত হয়।
- ২০১৫: রোসাটম ওভারসিজ ও ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় পারমাণবিক শক্তি সংস্থা বড় ও ভাসমান পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে সমঝোতা স্মারকে সই করে।
- জুলাই ২০২৪: মস্কোতে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে আলোচনায় রোসাটমের সঙ্গে সহযোগিতার আগ্রহের কথা জানান প্রবোও।
- ২০২৫: ইন্দোনেশিয়া তার জাতীয় জ্বালানি পরিকল্পনায় পারমাণবিক শক্তি অন্তর্ভুক্ত করে।
- মে ২০২৬: শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক সহযোগিতা, অবকাঠামো ও জনবল প্রশিক্ষণ নিয়ে আলোচনা করতে লিখাচেভের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রেসিডেন্ট প্রবোও।
- ১৬ অক্টোবর ২০২৬: মস্কোতে ভাসমান বিদ্যুৎ সরবরাহ চুক্তিতে সই করে রোসাটম ও পিটি পেমবাংকিত লিস্ট্রিক নুক্লির।
রোসাটমের প্রস্তাবিত উন্নয়ন পরিকল্পনায় প্রথমে ছোট ভাসমান ইউনিট এবং পরে স্থলভাগে বড় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কথা রয়েছে। উত্তর মালুকুর প্রকল্পটি পরিকল্পনার প্রথম অংশের সঙ্গে মেলে। এখানে বর্ণিত চুক্তির আওতা ভাসমান বিদ্যুৎ প্রকল্প পর্যন্ত সীমিত; আর বৃহত্তর আলোচনায় সম্ভাব্য বড় পারমাণবিক কর্মসূচিও রয়েছে।
জ্বালানি নিরাপত্তা ও ২০৬০ সালের জলবায়ু লক্ষ্য
ইন্দোনেশিয়া ২০৬০ সালের মধ্যে কার্বন নিরপেক্ষতা অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। কোম্পানিগুলো বলছে, বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি ভাসমান প্রকল্পটি ওই লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করবে। পরিচালনাকালে কয়লা বা ডিজেল না পুড়িয়েই পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। তাই জলবায়ু সুরক্ষায় এর অবদান কতটা হবে, তা নির্ভর করবে এই বিদ্যুৎ বিদ্যমান বা ভবিষ্যতের কোন উৎপাদনব্যবস্থার বিকল্প হচ্ছে তার ওপর।
পিটি পেমবাংকিত লিস্ট্রিক নুক্লির পরিচালক ইউদি উতোমো ইমারজোকো বলেন, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ কোম্পানিটির লক্ষ্য ও দায়িত্বের কেন্দ্রে রয়েছে:
"ইন্দোনেশিয়ার জ্বালানি রূপান্তরের নেতৃত্ব দেওয়াই জাতীয় বিনিয়োগকারী হিসেবে আমাদের প্রধান লক্ষ্য ও দায়িত্ব। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আমাদের জনগণকে পরিচ্ছন্ন, নির্ভরযোগ্য ও কার্বনমুক্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করা ইন্দোনেশিয়ার দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি ভবিষ্যৎ সুরক্ষার জন্য জরুরি," বলেন ইউদি।
দ্বীপজুড়ে ছড়িয়ে থাকা জনপদ এবং শিল্পের জ্বালানি চাহিদা, এই দুইয়ের সমন্বয়ে উত্তর মালুকুতে ওই পরিকল্পনার একটি নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে। আরও ধারাবাহিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কারখানা ও স্থানীয় পরিষেবায় সহায়তা করতে পারে। অন্যদিকে, প্রস্তাবিত বেসরকারি অর্থায়ন মডেলের লক্ষ্য হলো জাতীয় বাজেট থেকে সরাসরি অর্থ না নিয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা।
রোসাটমের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা নয়টি দেশে ২৭টি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে। ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে চুক্তিটি তাদের ব্যবসায় বিদেশে এক ভিন্ন ধরনের সম্পর্ক যুক্ত করবে: ভাসমান স্থাপনা থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে, তবে সেগুলোর মালিকানা রোসাটমের কাছেই থাকবে। ইন্দোনেশিয়ার জন্য এখন তাৎক্ষণিক কাজ হলো বাণিজ্যিক চুক্তিকে স্পষ্ট ব্যয়, অনুমোদন ও সরবরাহের ধাপসহ কার্যকর বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় রূপ দেওয়া।
মূল বিষয়গুলো
- ২০২৬ সালের ১৬ অক্টোবর মস্কোতে চুক্তিতে সই করে রোসাটম ও পিটি পেমবাংকিত লিস্ট্রিক নুক্লির।
- উত্তর মালুকুর উত্তর হালমাহেরায় প্রতিটি ১০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার দুটি ভাসমান ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
- ইউনিটগুলোর মালিকানা রোসাটমের কাছে থাকবে; পরিকল্পিত ৬০ বছরের কার্যকালজুড়ে বিদ্যুৎ কেনা হবে।
- কোম্পানিগুলো ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় বাজেটের অর্থায়ন ছাড়া বেসরকারি বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে।
- চুক্তির প্রধান শর্ত কার্যকর হওয়ার প্রায় পাঁচ বছর পর প্রথম বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
- প্রকল্পে প্রস্তাবিত আরআইটিএম-২০০এম রিঅ্যাক্টর ব্যবহার করা হবে এবং এটি রাশিয়া-ইন্দোনেশিয়ার বৃহত্তর পারমাণবিক সহযোগিতার অংশ।
- বিনিয়োগ ব্যয়, বিদ্যুতের দাম এবং কার্যক্রম শুরুর নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করা হয়নি।






