আইনি খসড়া এগোচ্ছে, তবে স্বাক্ষর নির্ভর করছে শুল্কের শর্তের ওপর
ভারত ২০২৬ সালের ১৫ অক্টোবর জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির প্রথম ধাপ চূড়ান্ত হয়েছে এবং এর আইনি খসড়া তৈরির কাজ চলছে। বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী পীযূষ গোয়াল বলেন, প্রতিদ্বন্দ্বী রপ্তানিকারকদের তুলনায় প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা নিশ্চিত হলে চুক্তিটি কার্যকর করা হবে। ফলে চুক্তির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের চূড়ান্ত শুল্ক কাঠামো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সূচিপত্র
- আইনি খসড়া এগোচ্ছে, তবে স্বাক্ষর নির্ভর করছে শুল্কের শর্তের ওপর
- প্রতিদ্বন্দ্বী রপ্তানিকারকদের তুলনায় কেন সুবিধা চায় ভারত
- পণ্যের বিস্তারিত বিষয় এখনো আলোচনায়
- কেন যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক কাঠামো নতুন করে সাজানো হচ্ছে
- রুশ জ্বালানি কেনাকাটা শুল্কের আরেকটি ঝুঁকি তৈরি করছে
- রপ্তানি বাড়ছে, বাড়ছে ব্যবসার ঝুঁকিও
- রুবিওর সফরে জ্বালানি ও বিনিয়োগ গুরুত্ব পাচ্ছে
- ইউরোপের জন্য আলাদা সময়সূচি ঘোষণা ভারতের
- পরবর্তী ধাপ নির্ধারণে যেসব তারিখ গুরুত্বপূর্ণ
- মূল তথ্য
এই আলোচনা এমন একটি বাজারকে ঘিরে, যেখানে এপ্রিল থেকে আগস্টের মধ্যে ভারতের পণ্য রপ্তানি হয়েছে ৪২.৭৯ বিলিয়ন ডলারের, আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ৪০.৩৯ বিলিয়ন ডলার। ওয়াশিংটন জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে শুল্ক আরোপের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর বাণিজ্যব্যবস্থা পুনর্বিবেচনা করছে। এ পরিস্থিতিতে ভারত অগ্রাধিকারমূলক বাজার-সুবিধা ও আরও পূর্বানুমানযোগ্য শুল্ক চাইছে।
বাণিজ্যসচিব রাজেশ আগরওয়াল বলেন, আলোচকেরা চুক্তির দিকে এগোচ্ছেন। ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর বলেন, বিস্তৃত কাঠামো ও প্রধান বিষয়গুলো নিষ্পত্তি হয়েছে। তাঁদের বক্তব্যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির কথা উঠে এসেছে; তবে আইনি কাজ ও নির্দিষ্ট পণ্য নিয়ে আলোচনা চলছে।
বাণিজ্য পরিসংখ্যান নিয়ে এক ব্রিফিংয়ে আগরওয়াল দ্রুত এগোনোর ভারতের প্রত্যাশার কথা বলেন:
আমরা যত দ্রুত সম্ভব বাণিজ্য চুক্তিটি চূড়ান্ত করে স্বাক্ষরের প্রত্যাশা করছি।
স্বাক্ষর ও বাস্তবায়ন আলাদা ধাপ। আলোচনায় সম্মত শর্তগুলোকে আইনি নথিতে সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকারে রূপ দিতে হবে। আর শুল্কব্যবস্থা নির্ধারণ করবে, সীমান্ত পেরিয়ে পণ্য গেলে ব্যবসাগুলোকে বাস্তবে কত অর্থ দিতে হবে। আগরওয়াল বলেন, সময়সূচি দুই পক্ষের সম্মতিতে ঠিক হবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক কাঠামো আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত হওয়া ও সেকশন ৩০১-এর আওতায় নেওয়া পদক্ষেপের ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে। সেকশন ৩০১ হলো যুক্তরাষ্ট্রের একটি বাণিজ্য আইনের ধারা, যা ওয়াশিংটনের বিবেচনায় অন্যায্য বাণিজ্যচর্চার জবাব দিতে ব্যবহৃত হয়।
প্রতিদ্বন্দ্বী রপ্তানিকারকদের তুলনায় কেন সুবিধা চায় ভারত
গোয়াল বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়াকে প্রতিদ্বন্দ্বী রপ্তানিকারক হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যাদের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ভারত অনুকূল আচরণ চায়। নয়াদিল্লি চায়, ভারতীয় ব্যবসার ওপর আরোপিত শুল্ক প্রতিযোগী দেশগুলোর শুল্কের চেয়ে বেশি না হোক; পাশাপাশি সম্ভব হলে বাড়তি সুবিধাও চায়।
কোনো পণ্য একটি দেশে প্রবেশের সময় সাধারণত আমদানিকারক ব্যবসাকে যে কর দিতে হয়, সেটিই শুল্ক। একই ধরনের পণ্যে শুল্কের হার আলাদা হলে কম শুল্কের পণ্যটি আমদানি করতে খরচ কম হতে পারে। ক্রেতারা যখন কাছাকাছি দামের পণ্য তুলনা করেন, তখন এই পার্থক্য কোন সরবরাহকারী ক্রয়াদেশ পাবে, তা প্রভাবিত করতে পারে।
চুক্তি কার্যকর করার শর্ত ব্যাখ্যা করে গোয়াল বলেন:
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তির প্রথম পর্যায় চূড়ান্ত হয়েছে এবং এটি চূড়ান্ত রূপ দেওয়ার, আইনি খসড়া তৈরির পর্যায়ে রয়েছে। আমরা আশা করি, শিগগিরই এটি চূড়ান্ত করতে পারব এবং প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর তুলনায় প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা নিশ্চিত হলে কার্যকর করতে পারব।
তাই ভারতের দাবি শুধু তার রপ্তানি পণ্যে প্রযোজ্য শুল্কের হার নিয়ে নয়, প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর পণ্যে প্রযোজ্য হারের বিষয়েও। ভারতের শুল্ক কমলে রপ্তানিকারকেরা লাভবান হতে পারেন, তবে এর বাণিজ্যিক মূল্য নির্ভর করবে অন্য দেশ থেকে তুলনীয় পণ্য আমদানি করতে মার্কিন ক্রেতার কত খরচ হবে, তার ওপরও।
পণ্যের বিস্তারিত বিষয় এখনো আলোচনায়
নয়াদিল্লিতে ব্লুমবার্গ নিউ ইকোনমি ফোরামে গোর বলেন, আলোচনা নির্দিষ্ট পণ্য ও শুল্কের হার নিয়ে দর-কষাকষির পর্যায়ে পৌঁছেছে। তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ের ও গোয়ালের সঙ্গে আলোচনার বৈঠকে তিনি অংশ নিয়েছেন।
আলোচনার অবস্থা সম্পর্কে রাষ্ট্রদূত বলেন:
বড় চিত্র, বড় কাঠামো এবং বড় বিষয়গুলো চূড়ান্ত হয়েছে।
গোর বলেন, ছোটখাটো বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছে। দুই অর্থনীতির আকার, ভারতের ১৪০ কোটি জনসংখ্যা এবং আলোচনায় থাকা বিপুলসংখ্যক পণ্য ও খাতের কারণে অঙ্গীকারগুলো মেলাতে সময় লাগছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। প্রায় দেড় বছর ধরে আলোচনা চলছে।
আগরওয়াল বলেন, জুনের শেষ নাগাদ আলোচকেরা মতপার্থক্যের জায়গাগুলো চিহ্নিত করেছিলেন এবং এরপর সেগুলো কমেছে। পণ্যভিত্তিক বাকি আলোচনাগুলো গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বিস্তৃত চুক্তিতে শেষ পর্যন্ত কোন পণ্য কী ধরনের সুবিধা পাবে, তা নির্দিষ্ট করতে হবে। এসব তথ্য ব্যবসার খরচ হিসাব করতে এবং নতুন বাণিজ্যব্যবস্থায় কোনো ক্রয়াদেশ বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক হবে কি না, তা নির্ধারণ করতে প্রয়োজন।
কেন যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক কাঠামো নতুন করে সাজানো হচ্ছে
ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটি কাঠামোতে সম্মত হয়, যার ফলে ভারতের বেশির ভাগ পণ্যের ওপর শুল্ক ৫০ শতাংশ থেকে কমে ১৮ শতাংশে নেমে আসে। এর আগে আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর ২০২৫ সালের আগস্টে বেশি শুল্কের হারটি আরোপ করা হয়েছিল।
ফেব্রুয়ারির পরিবর্তনে শুল্ক ৩২ শতাংশীয় পয়েন্ট কমেছিল। শুল্ক নির্ধারণের জন্য ১০০ ডলার মূল্য ধরা কোনো পণ্যের ক্ষেত্রে, অন্য প্রযোজ্য খরচ বাদে, এই দুই হারের পার্থক্যে শুল্ক বাবদ ৩২ ডলারের তফাত হতো। আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকদের জন্য চূড়ান্ত হারের আইনি ভিত্তি ও স্থায়িত্ব কেন গুরুত্বপূর্ণ, তা এ উদাহরণে বোঝা যায়।
এরপর যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট শুল্ক আরোপে প্রশাসনের জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহারের বিরুদ্ধে রায় দেয়। গোর বলেন, এর ফলে ওয়াশিংটনকে আগের বাণিজ্যব্যবস্থার কিছু অংশ নতুন করে সাজাতে হয়েছে।
আগরওয়াল স্বাক্ষরের বিষয়টিকে ওয়াশিংটনের এই কাজের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তার শুল্ক কাঠামো পুনর্গঠন করছে এবং সেকশন ৩০১-এর আওতায় নেওয়া পদক্ষেপের ফলাফল থেকে দুই পক্ষ কখন এগোতে পারবে, তা নির্ধারণে সহায়তা মিলবে। স্থিতিশীল শুল্কের পাশাপাশি অগ্রাধিকারমূলক হারও চাইছে ভারত। কারণ, কয়েক মাস ধরে পণ্য সরবরাহে সম্মত হওয়া কোনো ব্যবসার জন্য পুরো সময়জুড়ে তার ক্রেতাকে কী পরিমাণ শুল্ক দিতে হবে, তা অনুমান করতে পারা জরুরি।
রুশ জ্বালানি কেনাকাটা শুল্কের আরেকটি ঝুঁকি তৈরি করছে
যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি নীতিগত সিদ্ধান্ত আলোচনায় প্রভাব ফেলতে পারে: রুশ তেল ও গ্যাস কেনার সঙ্গে সম্পর্কিত শুল্ক আরোপ করবেন কি না, সে বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত। ভারত রাশিয়া থেকে তেল কেনা অব্যাহত রেখেছে এবং জনগণের চাহিদা মেটাতে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে জ্বালানি কেনার অধিকার থাকার পক্ষে যুক্তি দিয়েছে।
২০২৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর স্বাক্ষরিত ‘লিন্ডসে ও. গ্রাহাম স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট, ২০২৬’ রুশ জ্বালানির বড় ক্রেতাদের ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের অনুমোদন দেয়। গোর বলেন, সিনেটের ১০০ সদস্যের মধ্যে ৮৬ জন আইনটির পক্ষে ভোট দিয়েছেন। এতে তেল, গ্যাস ও নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যাওয়ার বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। শুল্ক আরোপের জন্য প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্ত প্রয়োজন এবং গোর জানান, আইনটির আওতায় এখনো কোনো দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়নি।
১৫ অক্টোবরের বক্তব্যের প্রায় ১০ দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত হবে বলে গোর আশা করেছিলেন। তবে ১৮ সেপ্টেম্বর স্বাক্ষরের পর ৩০ দিনের যে সময়সীমার কথা বলা হয়েছিল, তা হলে তারিখটি পড়ত ১৮ অক্টোবরের কাছাকাছি। সঠিক সিদ্ধান্তের তারিখ এবং ভারতের জন্য কোনো ছাড় দেওয়া হবে কি না, তা অনির্ধারিত ছিল। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তির চূড়ান্ত তারিখ, পণ্যসংক্রান্ত বাকি শর্ত এবং প্রকাশিত শুল্কতালিকাও তখনো চূড়ান্ত হয়নি।
ভারতের জন্য শুল্ক-ছাড়ের সিদ্ধান্ত ট্রাম্পের ওপর নির্ভর করছে বলে রাষ্ট্রদূত জানান। নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার ক্ষমতার প্রশাসন-ঘোষিত উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে গোর বলেন:
লক্ষ্য কাউকে শাস্তি দেওয়া নয়। লক্ষ্য এই যুদ্ধের অবসান ঘটানোর চেষ্টা করা।
গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের অজয় শ্রীবাস্তব সতর্ক করে বলেন, রুশ তেল কেনার কারণে শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়ে ওয়াশিংটন নয়াদিল্লিকে অসম চুক্তিতে রাজি করানোর চেষ্টা করতে পারে। রাশিয়ার ডিজেল কেনার বিষয়ে ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তের সঙ্গে তিনি এই সতর্কতার যোগসূত্র টানেন। তাঁর মতে, এতে ভারতের জন্য শুল্ক-ছাড়ের আশা তৈরি হয়েছে, তবে শুল্কের চাপের সম্ভাবনাও থেকে গেছে।
রপ্তানি বাড়ছে, বাড়ছে ব্যবসার ঝুঁকিও
এপ্রিল থেকে আগস্টের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের পণ্য রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২.৪০ বিলিয়ন ডলার বেড়েছে। প্রকাশিত ৪২.৭৯ বিলিয়ন ও ৪০.৩৯ বিলিয়ন ডলারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রবৃদ্ধি প্রায় ৫.৯ শতাংশ।
২০২৫/২৬ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য উদ্বৃত্তও ছিল প্রায় ৩৪ বিলিয়ন ডলার। কোনো দেশ কোনো বাণিজ্য অংশীদারের কাছ থেকে যত পণ্য কেনে, তার চেয়ে বেশি বিক্রি করলে তাকে বাণিজ্য উদ্বৃত্ত বলা হয়। এই পরিসংখ্যান দেখায়, মার্কিন ক্রেতাদের কাছে প্রবেশাধিকার ভারতের জন্য কত বড় বাণিজ্যিক বিষয়।
রপ্তানিকারকের জন্য অনুকূল শুল্ক প্রতিযোগিতামূলক দাম দিতে সহায়তা করতে পারে। অধিক পূর্বানুমানযোগ্যতা সরবরাহের সময়সূচি ঠিক করা, উপকরণ কেনা এবং উৎপাদন পরিকল্পনা করাও সহজ করে। আর যুক্তরাষ্ট্রের আমদানিকারকের জন্য স্থিতিশীল শুল্ক পণ্যের চূড়ান্ত খরচ অনুমান করা সহজ করে।
আগরওয়ালের উল্লেখ করা দুটি লক্ষ্য—অগ্রাধিকারমূলক বাজার-সুবিধা ও শুল্কের স্থিতিশীলতা—এই ভিন্ন চাহিদাগুলো পূরণ করে। অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা বলতে বিকল্প পণ্যের তুলনায় ভারতীয় পণ্য কী আচরণ পাবে, তা বোঝায়। আর স্থিতিশীলতা বলতে একবারের চালানের বাইরেও বিস্তৃত অঙ্গীকার করার সময় কোম্পানিগুলো ওই সুবিধার ওপর নির্ভর করতে পারবে কি না, তা বোঝায়।
রুবিওর সফরে জ্বালানি ও বিনিয়োগ গুরুত্ব পাচ্ছে
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর ১৭ থেকে ২২ অক্টোবর ভারত ও উজবেকিস্তান সফরের কথা ছিল। এ সফরে তিনি সরকারি ও ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে জ্বালানি সহযোগিতা, বাণিজ্যিক বিনিয়োগ এবং বৃহত্তর অর্থনৈতিক সম্পর্কসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করবেন। বাণিজ্য চুক্তির চূড়ান্ত কাজের পাশাপাশি এসব বিষয়ও আলোচনায় আসবে।
পণ্য বাণিজ্যের বাইরেও ব্যবসায়িক কার্যক্রমের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন গোর। তিনি রিলায়্যান্স ইন্ডাস্ট্রিজের যুক্তরাষ্ট্রে একটি তেল শোধনাগার স্থাপনের পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে বলেন, দেশটিতে ৫০ বছরে এ ধরনের এটিই প্রথম প্রকল্প। ভারতের ডেটা সেন্টার ও সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনে বিনিয়োগের প্রসঙ্গে তিনি গুগল, মাইক্রোসফট, অ্যাডোবি ও মাইক্রনের নামও উল্লেখ করেন। পাশাপাশি প্রতিরক্ষা উৎপাদনে সহযোগিতার কথাও বলেন।
এই বিনিয়োগগুলো দুই দেশের সম্পর্কের বাণিজ্যিক ভিত্তিকে আরও বিস্তৃত করছে। তেল শোধনাগারে অপরিশোধিত তেল থেকে জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্য তৈরি হয়; ডেটা সেন্টারে কম্পিউটিং ব্যবস্থা থাকে; আর সেমিকন্ডাক্টর কারখানায় ইলেকট্রনিক সরঞ্জামে ব্যবহৃত চিপ তৈরি হয়। এসব ক্ষেত্রেই কোথায় কারখানা গড়া হবে, কর্মী নিয়োগ হবে এবং সরবরাহ কেনা হবে, সে বিষয়ে বড় সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেও আলোচনা চলছে। ট্রাম্পের বারবার করা দাবি—তিনি ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতা করেছেন—এবং ওমান উপকূলে একটি জাহাজে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলায় তিন ভারতীয় নাবিক নিহত হওয়ার ঘটনা উত্তেজনার কারণ হয়েছে। এই কঠিন প্রেক্ষাপটেই বাণিজ্য আলোচনা এগিয়েছে।
ইউরোপের জন্য আলাদা সময়সূচি ঘোষণা ভারতের
গোয়াল আরও বলেন, ভারত-ইউরোপীয় ইউনিয়ন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে স্বাক্ষরিত হবে এবং ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি বা মার্চে কার্যকর হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তির তুলনায় ইউরোপের চুক্তির জন্য এতে আরও নির্দিষ্ট সময়সূচি দেওয়া হয়েছে।
আলোচনা শেষ করা, চুক্তিতে স্বাক্ষর করা এবং চুক্তি কার্যকর করার পার্থক্য এখানে গুরুত্বপূর্ণ। আলোচকেরা প্রথমে শর্তগুলো চূড়ান্ত করেন। স্বাক্ষরের মাধ্যমে পক্ষগুলোর মধ্যে চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত হয়। প্রয়োজনীয় আইনি ধাপ শেষে প্রতিশ্রুতিগুলো কার্যকর হতে শুরু করাকেই চুক্তি কার্যকর হওয়া বলা হয়।
ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় দেড় বছরের আলোচনার সঙ্গে ভারত-ইইউ প্রক্রিয়ার প্রায় দুই দশকের তুলনা করেন গোর। তাঁর এই তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার গতি নিয়ে আশাবাদ ফুটে ওঠে। আর গোয়ালের বক্তব্যে বাস্তবায়নের আগে ভারতের কাঙ্ক্ষিত বাণিজ্যিক শর্তের ওপর জোর দেওয়া হয়।
দুই বাজারেই পণ্য সরবরাহকারী ভারতীয় কোম্পানিগুলোর জন্য পরবর্তী বাস্তবধর্মী মাইলফলক হলো চূড়ান্ত শুল্কতালিকা এবং দুই চুক্তির প্রতিশ্রুতি কার্যকর হওয়ার তারিখ। এসব বিস্তারিত তথ্যের ভিত্তিতে ব্যবসাগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের ক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহের খরচ তুলনা করতে পারবে।
পরবর্তী ধাপ নির্ধারণে যেসব তারিখ গুরুত্বপূর্ণ
আলোচনার ধারাবাহিকতায় রয়েছে আগের শুল্ক বৃদ্ধি, কাঠামোগত চুক্তি এবং যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের ক্ষমতা। প্রধান মাইলফলকগুলো হলো:
- আগস্ট ২০২৫: আগের দফার আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর ভারতের বেশির ভাগ পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক ৫০ শতাংশে পৌঁছায়।
- ফেব্রুয়ারি ২০২৬: দ্বিপক্ষীয় কাঠামোর আওতায় ভারতের বেশির ভাগ পণ্যের শুল্ক কমে ১৮ শতাংশ হয়।
- জুন ২০২৬-এর শেষ: আগরওয়ালের ভাষ্য অনুযায়ী, আলোচকেরা মতপার্থক্যের বিষয়গুলো চিহ্নিত করেন।
- ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬: রুশ জ্বালানি কেনার সঙ্গে সম্পর্কিত শুল্ক আরোপের অনুমোদন দিয়ে ট্রাম্প আইনে স্বাক্ষর করেন।
- ১৫ অক্টোবর ২০২৬: ভারতীয় কর্মকর্তারা জানান, প্রথম ধাপের আইনি খসড়া তৈরি হচ্ছে। গোর বলেন, প্রধান বিষয়গুলো নিষ্পত্তি হয়েছে।
- ১৭ থেকে ২২ অক্টোবর ২০২৬: রুবিওর ভারত ও উজবেকিস্তান সফরের কথা ছিল।
- ডিসেম্বর ২০২৬: গোয়াল আশা করেন, ভারত-ইইউ চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে; ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি বা মার্চে তা কার্যকর হতে পারে।
ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের তাৎক্ষণিক কাজ হলো আইনি নথি চূড়ান্ত করা এবং ওয়াশিংটনের সংশোধিত শুল্ক কাঠামোর সঙ্গে চুক্তির সামঞ্জস্য নির্ধারণ করা। ভারতের শর্ত বাণিজ্যিক: চুক্তির চূড়ান্ত শর্তে প্রতিদ্বন্দ্বী সরবরাহকারীদের তুলনায় ভারতীয় রপ্তানিকারকেরা যেন প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান পান।
মূল তথ্য
- ভারত বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির প্রথম ধাপ চূড়ান্ত হয়েছে এবং এর আইনি খসড়া তৈরি হচ্ছে।
- ভারতীয় রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা নিশ্চিত হওয়ার সঙ্গে চুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়টি যুক্ত করেছেন গোয়াল।
- ফেব্রুয়ারির কাঠামোয় ভারতের বেশির ভাগ পণ্যের শুল্ক ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৮ শতাংশ করা হয়।
- স্বাক্ষরের বিষয়টি আংশিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সংশোধিত শুল্ক কাঠামো ও সেকশন ৩০১-এর আওতায় নেওয়া পদক্ষেপের ফলাফলের ওপর নির্ভর করছে।
- রুশ জ্বালানি কেনার সঙ্গে সম্পর্কিত সম্ভাব্য শুল্ক ভারতের জন্য এখনো বড় উদ্বেগের বিষয়।
- এপ্রিল-আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের পণ্য রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৫.৯ শতাংশ বেড়েছে।
- গোয়াল আশা করেন, ভারত-ইইউ চুক্তি ডিসেম্বরে স্বাক্ষরিত হবে এবং ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি বা মার্চে কার্যকর হতে পারে।






