১২২০ কোটি ইউয়ানের বেশি অর্থ জড়িত মামলায় তিনজনের মৃত্যুদণ্ড
মিয়ানমারের কোকাং অঞ্চলে অপরাধী চক্রের তৎপরতা, ১২২০ কোটি ইউয়ানের বেশি অর্থের জুয়া ও প্রতারণা এবং চীনা নাগরিকদের মৃত্যুর ঘটনায় ওয়েই হুয়ারেন, চেন দাওয়েই ও লিয়াও জিংফাংকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে চীনের আদালত। ২০২৬ সালের ১৩ অক্টোবর ঘোষিত প্রথম দফার রায়ে আরও তিন আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ৫৫ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
সূচিপত্র
- ১২২০ কোটি ইউয়ানের বেশি অর্থ জড়িত মামলায় তিনজনের মৃত্যুদণ্ড
- কারা সাজা পেয়েছেন, কারা পৃথক মামলার মুখোমুখি
- কম্পাউন্ডগুলোতে সশস্ত্র সুরক্ষা যেভাবে কাজে লাগানো হয়েছিল
- মৃত্যুর ঘটনা সম্পর্কে আদালতের বক্তব্য
- মিয়ানমারে সংঘটিত অপরাধে চীন কেন বিচার করতে পারে
- আগের মামলার ব্যাপ্তি তুলে ধরে বাই পরিবারের রায়
- মিং পরিবারের মামলা ও রাজনৈতিক যোগসূত্র
- মামলাগুলোর অগ্রগতি
- বৃহত্তর অভিযানের পরিসংখ্যান থেকে কী বোঝা যায়
- মূল তথ্য
চীনের ফুজিয়ান প্রদেশের ছুয়ানঝৌয়ের মধ্যবর্তী গণআদালত এবং নানআন গণআদালত ওয়েই পরিবারের অপরাধী নেটওয়ার্কের সদস্যদের বিরুদ্ধে এ রায় দেন। মোট ৬১ জনকে সাজা দেওয়া হয়েছে। কারাদণ্ডের মেয়াদ তিন বছর তিন মাস থেকে ২৪ বছর পর্যন্ত। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে জরিমানা, সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত এবং বহিষ্কারের আদেশও দেওয়া হয়েছে।
আদালত দুটি অপরাধী গোষ্ঠীর বর্ণনা দিয়েছেন, যারা ওয়েই পরিবারের প্রভাব ও সশস্ত্র বাহিনী ব্যবহার করে চীনের সঙ্গে মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী কোকাংয়ের প্রধান শহর লাউক্কাইংয়ে একাধিক কম্পাউন্ড গড়ে তোলে এবং সেগুলোকে সুরক্ষা দেয়। তাদের তৎপরতা অনলাইন প্রতারণার বাইরেও অবৈধ ক্যাসিনো, চাঁদাবাজি, পতিতাবৃত্তি, মাদক পাচার এবং অবৈধভাবে সীমান্ত পারাপারের আয়োজন পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
কোকাংয়ের অপরাধী পরিবারগুলোর বিরুদ্ধে চীনের বৃহত্তর অভিযানের অংশ এসব রায়। এসব পরিবারের ব্যবসায় স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব, সশস্ত্র সুরক্ষা এবং বিদেশে থাকা লোকজনকে লক্ষ্য করে প্রতারণার কার্যক্রম একত্রিত হয়েছিল। এর আগে বাই ও মিং পরিবারের বিরুদ্ধে মামলা হয়; পরে কয়েকজন আসামির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে বলে খবর প্রকাশিত হয়।
সর্বশেষ রায়গুলো মৃত্যুদণ্ডের, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘোষণা নয়। এগুলো প্রথম দফার রায়। এসব রায়ের বিবরণে কোনো আপিলের ফল, মৃত্যুদণ্ডের চূড়ান্ত অনুমোদন বা তা কার্যকরের তারিখ উল্লেখ করা হয়নি।
কারা সাজা পেয়েছেন, কারা পৃথক মামলার মুখোমুখি
ওয়েই হুয়ারেনকে দুটি গোষ্ঠীর একটির নেতা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। চেন দাওয়েই ও লিয়াও জিংফাংও মৃত্যুদণ্ড পেয়েছেন, যদিও আদালতের সিদ্ধান্তের বিস্তারিত বিবরণে লিয়াওয়ের ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ড উল্লেখ করা হয়নি।
ওয়েই ছিংতাও, খাং মিন ও সিয়ং হেংসিংকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অন্য ৫৫ আসামির মধ্যে ছিলেন সু হংশিয়াং, দেং জিদা ও চেন লংজিয়াং। নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত সবার জন্য একই সাজা না দিয়ে, প্রত্যেকের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে আদালতের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ভিন্ন ভিন্ন সাজা দেওয়া হয়েছে।
প্রথম গোষ্ঠীর নেতৃত্বে ছিলেন ওয়েই হুয়ারেন ও ওয়েই ছিংসং। এর গুরুত্বপূর্ণ সদস্যদের মধ্যে ছিলেন চেন লংজিয়াং, যাঁকে ঘনিষ্ঠ অধস্তন হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, এবং সশস্ত্র বাহিনীর নেতা চা গুইছেং ও ইয়ান লংদি। ওয়েই ছিংসং, চা গুইছেং ও ইয়ান লংদির বিরুদ্ধে পৃথক মামলা চলছে।
‘হেনরি’ অপরাধী গোষ্ঠী নামে পরিচিত দ্বিতীয় সংগঠনটির নেতৃত্বে ছিলেন ওয়েই রং, ওয়েই ছিংহাই ও ওয়েই ছিংতাও। এর গুরুত্বপূর্ণ সদস্যদের মধ্যে ছিলেন পরিবারের সদস্য সু হংশিয়াং এবং ঘনিষ্ঠ অধস্তন দেং জিদা। ওয়েই রং ও ওয়েই ছিংহাইয়ের বিরুদ্ধে মামলাও পৃথকভাবে চলছে।
এই পার্থক্যগুলো গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ৬১ জনের সাজা ওয়েই পরিবারের সঙ্গে যুক্ত সব মামলার নিষ্পত্তি নয়। আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ওয়েই হুয়ারেন ও ওয়েই ছিংতাওসহ আসামিরা অপরাধী গোষ্ঠী সংগঠিত, নেতৃত্ব দেওয়া বা তাতে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি ইচ্ছাকৃত হত্যা ও প্রতারণাসহ সাত ধরনের অপরাধ করেছেন।
কম্পাউন্ডগুলোতে সশস্ত্র সুরক্ষা যেভাবে কাজে লাগানো হয়েছিল
রায়ের বিবরণে তুলে ধরা আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দুটি গোষ্ঠী ২০১৯ সাল থেকে কাজ করছিল। তারা কোকাংয়ে ওয়েই পরিবারের অবস্থান কাজে লাগিয়ে লাউক্কাইংয়ে একাধিক কম্পাউন্ড গড়ে তোলে এবং অপরাধী তৎপরতায় যুক্ত ব্যক্তিদের সেখানে আনে, যাদের সশস্ত্র সুরক্ষা দেওয়া হতো।
গোষ্ঠীগুলো নিজেরা কিংবা ওই অপরাধী কর্মকাণ্ডে যুক্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে মিলে অপরাধ করত। এই ব্যবস্থায় কম্পাউন্ডের মালিক ও সুরক্ষাদাতাদের সঙ্গে সেখানে প্রতারণা, জুয়া এবং অন্যান্য অবৈধ ব্যবসা পরিচালনাকারীদের যোগসূত্র তৈরি হয়। ফলে এটি শুধু ফোন বা কম্পিউটার ব্যবহার করা স্বতন্ত্র প্রতারকদের বিরুদ্ধে মামলা ছিল না।
একটি বিবরণে নেটওয়ার্কটির কার্যক্রম ১৪টি বড় কম্পাউন্ডে বিস্তৃত ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। রায়ের আরও বিস্তারিত বিবরণে একাধিক কম্পাউন্ডের কথা বলা হলেও সেগুলোর মোট সংখ্যা দেওয়া হয়নি। খবরে বলা হয়েছে, উচ্চ বেতনের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে চীনা নাগরিকদের মিয়ানমারে নিয়ে যাওয়া হতো।
এ ধরনের কম্পাউন্ডে কাজ করা ব্যক্তিদের পরিস্থিতি একেক রকম হতে পারে। কেউ স্বেচ্ছায় প্রতারণায় অংশ নেন, আবার কাউকে পাচার করে আটকে রেখে জোরপূর্বক এসব কাজ করানো হয়। আঞ্চলিক প্রতারণা শিল্পে দুই ধরনের পরিস্থিতিরই খবর রয়েছে, তবে ওয়েই পরিবারের কম্পাউন্ডে কতজন কোন শ্রেণির ছিলেন, তা এসব প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয়নি।
১২২০ কোটি ইউয়ানের অঙ্কটিও সতর্কতার সঙ্গে পড়া দরকার। আদালতের বিস্তারিত বিবরণে একে জুয়া ও প্রতারণার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অর্থ বলা হয়েছে; মুনাফা বা ভুক্তভোগীদের ক্ষতির আলাদা নিরীক্ষিত হিসাব নয়। প্রতিবেদনে একই অঙ্ককে প্রায় ১৭০ কোটি বা ১৮০ কোটি ডলার হিসেবেও দেখানো হয়েছে। ডলারের এই হিসাবগুলো আলাদা হলেও চীনা মুদ্রায় মূল অঙ্কটি একই।
মৃত্যুর ঘটনা সম্পর্কে আদালতের বক্তব্য
ওয়েই পরিবারের বিরুদ্ধে আদালতের সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বিস্তারিত বিবরণে অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর কারণে চারজন চীনা নাগরিকের মৃত্যুর কথা বলা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, গোষ্ঠীর সদস্যরা টেলিযোগাযোগভিত্তিক প্রতারণা চক্রের সঙ্গে যোগসাজশ করে প্রতারণায় জড়িত এমন ব্যক্তিদের হত্যা করেন, যারা তাদের নির্দেশ মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। এতে দুজনের মৃত্যু হয়।
বিবরণে আলাদাভাবে বলা হয়েছে, চেন দাওয়েই তাঁর নিয়ন্ত্রণাধীন সশস্ত্র বাহিনী ব্যবহার করে নির্বিচারে মানুষ হত্যা করেন। এতে আরও দুই চীনা নাগরিকের মৃত্যু হয়। এই বিবরণে নির্দেশ কার্যকর করতে এবং সশস্ত্র কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সহিংসতা চালানোর সঙ্গে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার যোগসূত্র দেখানো হয়েছে।
সংক্ষিপ্ত একটি বিবরণে বলা হয়েছে, চক্রটি অন্তত দুই চীনা নাগরিককে হত্যা করেছে। বিস্তারিত বিবরণে উল্লেখ করা চারটি মৃত্যুর তুলনায় এটি সীমিত বর্ণনা, যা অগত্যা পরস্পরবিরোধী সংখ্যা নয়। আদালত কেন সবচেয়ে কঠোর সাজা দিয়েছেন, তা বর্ণনা করার সময় এই পার্থক্যটি যেন হারিয়ে না যায়।
প্রতিবেদনগুলোতে আরও বলা হয়েছে, তদন্তকারীরা লোহার তারে বাঁধা ভুক্তভোগীদের দেহাবশেষ এবং গুলির আঘাত থাকা মাথার খুলি পেয়েছেন। এসব তথ্য নেটওয়ার্কের ভেতরে সহিংসতার বিবরণকে সমর্থন করে, তবে আদালতের সিদ্ধান্তে উল্লেখিত মৃত্যুর বাইরে অতিরিক্ত মৃত্যুর সংখ্যা নিশ্চিত করে না।
আদালত বলেছেন, প্রতিটি আসামির অপরাধের ঘটনা, ধরন ও পরিস্থিতি এবং সমাজের ওপর তার ক্ষতির বিষয়টি বিবেচনা করে সাজা দেওয়া হয়েছে। তবে প্রত্যেক আসামির ভূমিকা বা ব্যক্তিগত সাজা নির্ধারণের সুনির্দিষ্ট যুক্তি রায়ের বিবরণে ব্যাখ্যা করা হয়নি।
মিয়ানমারে সংঘটিত অপরাধে চীন কেন বিচার করতে পারে
কম্পাউন্ডগুলো চীনের বাইরে অবস্থিত হওয়ায় চীনে বিচার করা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাধাগ্রস্ত হয় না। চায়না ইউনিভার্সিটি অব পলিটিক্যাল সায়েন্স অ্যান্ড ল-এর অধ্যাপক হুও ঝেংসিন বলেছেন, এ মামলায় চীনের ফৌজদারি আইনের ৮ নম্বর ধারা প্রযোজ্য, যা সুরক্ষামূলক এখতিয়ারের বিধান দেয়।
সুরক্ষামূলক এখতিয়ার বলতে বোঝায়, নির্দিষ্ট শর্তে কোনো দেশ তার রাষ্ট্র বা নাগরিকদের ক্ষতিগ্রস্ত করে এমন বিদেশে সংঘটিত কর্মকাণ্ডের ওপর নিজ দেশের ফৌজদারি আইন প্রয়োগ করতে পারে। হুওর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, চীনের বাইরে চীন বা চীনা নাগরিকদের বিরুদ্ধে অপরাধ করা বিদেশি নাগরিকদের ক্ষেত্রে ৮ নম্বর ধারা প্রয়োগ করা যায়, যদি চীনা আইনে ওই অপরাধের সর্বনিম্ন সাজা অন্তত তিন বছরের কারাদণ্ড হয়। তবে যে স্থানে অপরাধটি সংঘটিত হয়েছে, সেখানকার আইনে তা শাস্তিযোগ্য না হলে এই বিধান প্রযোজ্য নয়।
হুও আইনি ভিত্তিটি এভাবে ব্যাখ্যা করেছেন:
হুও বলেন, “আন্তর্জাতিক আইনে এখতিয়ার প্রয়োগের স্বীকৃত ভিত্তিগুলোর একটি হলো সুরক্ষামূলক এখতিয়ার।”
এই ব্যাখ্যা জানায়, চীনের আদালত কেন এ ধরনের মামলা শুনতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে বিদেশে সংঘটিত প্রতিটি অপরাধ স্বয়ংক্রিয়ভাবে চীনের এখতিয়ারে পড়ে, কিংবা চীনা ভুক্তভোগী থাকলেই সব আইনি প্রশ্নের উত্তর মেলে।
হুও আরও ব্যাখ্যা করেছেন, বহিষ্কারের বিধান বিদেশি নাগরিক ও রাষ্ট্রহীন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, চীনা নাগরিকদের ক্ষেত্রে নয়; কূটনৈতিক দায়মুক্তির অধিকারী বিদেশিরাও এর আওতাভুক্ত নন। কারাদণ্ডের পাশাপাশি বহিষ্কারের আদেশ হলে সাধারণত মূল সাজা ভোগের পর বা প্যারোলে মুক্তির পর তা কার্যকর হয়। তাই এটি দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পরপরই দেশ থেকে সরিয়ে দেওয়ার মতো নয়।
আগের মামলার ব্যাপ্তি তুলে ধরে বাই পরিবারের রায়
এ বিষয়ে সবচেয়ে শক্তিশালী সরকারি তুলনাটি হলো শেনঝেন মধ্যবর্তী গণআদালতের বাই পরিবারের বিরুদ্ধে রায়, যা ২০২৫ সালের ৪ নভেম্বর ঘোষণা করা হয়। আদালত বাই সুয়োছেং, বাই ইংছাং, ইয়াং লিছিয়াং, হু সিয়াওজিয়াং ও চেন গুয়াংইকে মৃত্যুদণ্ড দেন। লি ফুশৌ ও লি ঝিদেকে দুই বছরের জন্য স্থগিত মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
পাঁচ আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং আরও নয়জনকে তিন থেকে ২০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একটি প্রতিবেদনে শেষোক্ত সাজাগুলোর মেয়াদ ২০ থেকে ৩০ বছর বলা হয়েছে, তবে তা আদালতের সরকারি বিবৃতির সঙ্গে মেলে না; সেখানে তিন থেকে ২০ বছরের কথা বলা হয়েছে।
আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বাই গোষ্ঠী পরিবারের প্রভাব ও সশস্ত্র বাহিনী ব্যবহার করে ৪১টি কম্পাউন্ড গড়ে তোলে। তাদের জুয়া, প্রতারণা ও সংশ্লিষ্ট তৎপরতার অর্থের পরিমাণ ২৯০০ কোটি ইউয়ানের বেশি ছিল। রায়ে ছয়জন চীনা নাগরিকের হত্যা, একজন চীনা নাগরিকের আত্মহত্যা এবং একাধিক ব্যক্তির আহত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বাই ইংছাং প্রায় ১১ টন মেথামফেটামিন পাচার ও উৎপাদনের সঙ্গেও জড়িত ছিলেন।
সরকারি রায়ে প্রতারণা, ইচ্ছাকৃত হত্যা, ইচ্ছাকৃত আঘাত, অপহরণ, চাঁদাবাজি, পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করা ও তা সংগঠিত করা এবং অবৈধ সীমান্ত পারাপারের আয়োজনসহ ১২টি অপরাধ অন্তর্ভুক্ত ছিল। ওয়েই পরিবারের মামলার বিস্তারিত বিবরণের মতোই, এখানে অর্থের অঙ্কটি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অর্থ বোঝায়; নিট মুনাফার হিসাব নয়।
বাই পরিবারের সদস্যদের মৃত্যুদণ্ড কোকাংয়ের নেটওয়ার্কগুলোর বিরুদ্ধে আগের একটি বড় পদক্ষেপ ছিল। প্রকাশিত অঙ্কের তুলনায় বাই পরিবারের মামলায় ২৯০০ কোটি ইউয়ানের বেশি এবং ওয়েই পরিবারের মামলাগুলোতে ১২২০ কোটি ইউয়ানের বেশি অর্থ জড়িত ছিল। এই দুই সীমার পার্থক্য ১৬৮০ কোটি ইউয়ান। উভয় অঙ্কই নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি বলে উল্লেখ থাকায় নেটওয়ার্ক দুটির মধ্যে সুনির্দিষ্ট অনুপাত হিসাব করা যায় না।
মিং পরিবারের মামলা ও রাজনৈতিক যোগসূত্র
ঝেজিয়াং প্রদেশের ওয়েনঝৌ গণমধ্যবর্তী আদালতে মিং পরিবারের নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে আলাদা মামলা হয়। সাজা সম্পর্কে প্রকাশিত বিবরণে ১১ জনের তাৎক্ষণিক মৃত্যুদণ্ড, পাঁচজনের স্থগিত মৃত্যুদণ্ড এবং অন্য ২৩ আসামির ২৪ বছর থেকে যাবজ্জীবন পর্যন্ত কারাদণ্ডের কথা বলা হয়েছে।
আদালতের সিদ্ধান্তে ওই অপরাধী চক্রকে অন্তত ১৬টি মৃত্যু এবং প্রায় ১৪০ কোটি ডলারের বেশি আর্থিক ক্ষতির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন মিং গুয়োপিং ও মিং ঝেনঝেন, যাঁরা মিং শুয়েচাংয়ের ছেলে ও নাতনি। মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ২০২৩ সালের নভেম্বরে গ্রেপ্তারের সময় মিং শুয়েচাং নিজেকে গুলি করেন এবং পরে হাসপাতালে মারা যান।
অ্যাডভোকেসি সংস্থা জাস্টিস ফর মিয়ানমারের মুখপাত্র ইয়াদানার মং স্থানীয় সামরিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পরিবারের যোগসূত্র সম্পর্কে বলেছেন:
ইয়াদানার মং বলেন, “মিং পরিবারের সদস্যরা কোকাংয়ের সাইবার প্রতারণা শিল্প এবং মিয়ানমারের স্থানীয় সামরিক প্রতিষ্ঠান, কোকাং বর্ডার গার্ড ফোর্স ও ক্ষমতাসীন ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি—সবখানেই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন।”
মং মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী এবং প্রতারণা শিল্পের পেছনে থাকা ব্যক্তি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যে কম্পাউন্ডগুলোকে সহায়তা দেওয়া সশস্ত্র ও রাজনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে মামলাগুলোর যোগসূত্র তুলে ধরা হয়েছে। অন্যদিকে চীনের মামলাগুলোতে অপরাধ প্রমাণ এবং নাম উল্লেখ করা আসামিদের দায় নির্ধারণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
বাই, ওয়েই, মিং ও লিউ পরিবারকে কোকাংয়ের চারটি প্রধান ক্ষমতাকেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতিবেদনে এসব মামলার যোগসূত্র দেখানো হয়েছে ‘অপারেশন ১০২৭’-এর পরের অস্থিরতার সঙ্গে। জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর একটি জোট পরিচালিত এই সামরিক অভিযানের ঘোষিত লক্ষ্যগুলোর মধ্যে প্রতারণা কার্যক্রম দমনও ছিল।
মামলাগুলোর অগ্রগতি
কম্পাউন্ডে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড, গ্রেপ্তার, হস্তান্তর ও বিচার—সব মিলিয়ে কয়েক বছর ধরে এসব মামলা চলেছে। তারিখসহ ঘটনাগুলো সর্বশেষ সাজাকে আগের রায় এবং পরে প্রকাশিত মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর থেকে আলাদা করে বুঝতে সাহায্য করে:
- ২০১৯: আদালতের সিদ্ধান্তে বর্ণিত দুই ওয়েই গোষ্ঠী অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড শুরু করে।
- নভেম্বর ২০২৩: মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তারের পর মিং শুয়েচাং মারা যান।
- ৩০ জানুয়ারি ২০২৪: প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ তারিখে বাই সুয়োছেং ও অন্য গুরুত্বপূর্ণ সন্দেহভাজনদের চীনের হেফাজতে হস্তান্তর করা হয়।
- ১১ জুলাই ২০২৫: প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাই পরিবারের মামলার বিচার শুরু হয়।
- ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫: মিং পরিবারের মামলায় ১১টি তাৎক্ষণিক ও পাঁচটি স্থগিত মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
- ৪ নভেম্বর ২০২৫: শেনঝেন মধ্যবর্তী গণআদালত বাই পরিবারের বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা করে।
- ১৩ অক্টোবর ২০২৬: ছুয়ানঝৌ ও নানআনের আদালত ওয়েই পরিবারের বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা করে।
পরবর্তী সময়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিবরণে অমিল রয়েছে। একটি বিবরণে বলা হয়েছে, জানুয়ারিতে মিং পরিবারের ১১ জন এবং ফেব্রুয়ারিতে বাই পরিবারের চারজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। অন্য একটি বিবরণে বলা হয়েছে, ফেব্রুয়ারিতে চীন মিয়ানমারের অপরাধী চক্রের ১৫ সদস্যের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে। মাসভিত্তিক হিসাব নিয়ে এই বিবরণগুলো একমত নয়, তাই এগুলোকে একই যাচাইকৃত কালানুক্রম হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।
তাৎক্ষণিক মৃত্যুদণ্ড ও স্থগিত মৃত্যুদণ্ডের পার্থক্যও গুরুত্বপূর্ণ। দুই বছরের জন্য স্থগিত সাজা আলাদা আইনি সিদ্ধান্ত; এর অর্থ দুই বছর পর নির্ধারিতভাবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবে, তা নয়। একইভাবে, প্রথম দফার মৃত্যুদণ্ডের রায়কে আপিলের নিষ্পত্তি এবং মৃত্যুদণ্ডের আবশ্যিক পর্যালোচনা শেষ হওয়ার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা যাবে না।
বৃহত্তর অভিযানের পরিসংখ্যান থেকে কী বোঝা যায়
চীনের সুপ্রিম পিপলস কোর্টের নামে দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ উত্তর মিয়ানমারের টেলিযোগাযোগভিত্তিক প্রতারণা কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ২৭ হাজারের বেশি মামলার প্রথম দফার বিচার সম্পন্ন করেছে চীনা আদালত। প্রত্যর্পণ করা ৪১ হাজারের বেশি সন্দেহভাজনকে সাজা দেওয়া হয়েছে।
অন্য একটি বিবরণে বলা হয়েছে, আগের এক বছরে টেলিযোগাযোগভিত্তিক প্রতারণায় সন্দেহভাজন ৭৬০০ জনের বেশি চীনা নাগরিককে মিয়ানমার থেকে প্রত্যর্পণ করা হয়। এই সংখ্যাটি নির্দিষ্ট সময়ে হস্তান্তর করা একদল ব্যক্তিকে বোঝায়, আর ৪১ হাজারের অঙ্কটি বৃহত্তর পরিসরের বিভিন্ন মামলায় সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের সংখ্যা। একই জনগোষ্ঠীর হিসাব হিসেবে এই দুটি সংখ্যার সরাসরি তুলনা করা যায় না।
চীনের অপরাধ তদন্ত ব্যুরোর বরাতেও বলা হয়েছে, ২০২৩ সাল থেকে মিয়ানমারের সঙ্গে যৌথ অভিযানে কোকাংয়ের চারটি বড় অপরাধী চক্র ভেঙে দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখিত আরেকটি পরিসংখ্যান হলো, ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত টানা ১১ মাস চীনে টেলিযোগাযোগভিত্তিক প্রতারণার মামলার সংখ্যা বছরওয়ারি কমেছে।
এসব পরিসংখ্যান অভিযানের ব্যাপ্তি তুলে ধরে, তবে মিয়ানমারজুড়ে প্রতারণার কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে, তা প্রমাণ করে না। ওয়েই পরিবারের মামলাগুলোতেই দেখা যাচ্ছে, নাম উল্লেখ করা কয়েকজন নেতা এখনও পৃথক মামলার মুখোমুখি। ওই মামলাগুলোর পরবর্তী শুনানির তারিখ, ৬১ আসামির আপিলের সময়সূচি বা মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কোনো সূচি উল্লেখ করা হয়নি।
মূল তথ্য
- ২০২৬ সালের ১৩ অক্টোবর ঘোষিত রায়ে ওয়েই হুয়ারেন, চেন দাওয়েই ও লিয়াও জিংফাংকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
- তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ৫৫ জনকে তিন বছর তিন মাস থেকে ২৪ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
- আদালত ওয়েই পরিবারের গোষ্ঠীগুলোকে জুয়া ও প্রতারণার ১২২০ কোটি ইউয়ানের বেশি অর্থ এবং চারজন চীনা নাগরিকের মৃত্যুর সঙ্গে যুক্ত করেছেন।
- মিয়ানমারের লাউক্কাইংয়ে ওয়েই পরিবারের নিয়ন্ত্রণাধীন সশস্ত্র বাহিনীর সুরক্ষায় কম্পাউন্ডগুলো পরিচালিত হতো।
- বাই পরিবারের বিরুদ্ধে সরকারি রায়ে ৪১টি কম্পাউন্ড এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ২৯০০ কোটি ইউয়ানের বেশি অর্থের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
- সর্বশেষ সাজাগুলো প্রথম দফার রায়; রায়ের বিবরণে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তারিখ বা আপিলের ফল ঘোষণা করা হয়নি।






