চিপের চাহিদা বাড়ায় তাইওয়ানের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দ্বিগুণেরও বেশি
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় (এআই) বিনিয়োগের কারণে কম্পিউটিং হার্ডওয়্যারের চাহিদা বাড়ায়, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ২০২৬ সালে তাইওয়ানের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস এপ্রিলে করা ৫.২% থেকে বাড়িয়ে ১০.৭% করেছে। এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অন্য সব অর্থনীতির চেয়ে এগিয়ে থাকবে দেশটি। পূর্বাভাসে ৫.৫ শতাংশীয় পয়েন্টের এই বৃদ্ধি আইএমএফের বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির ৩.১% পূর্বাভাসের চেয়ে অনেক বেশি।
সূচিপত্র
- চিপের চাহিদা বাড়ায় তাইওয়ানের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দ্বিগুণেরও বেশি
- এপ্রিল থেকে অক্টোবরে পূর্বাভাসের পরিবর্তন
- প্রতিবেশী অর্থনীতির তুলনায় তাইওয়ানের অবস্থান
- এআই খাতের ব্যয় কেন সরাসরি সুফল দিচ্ছে তাইওয়ানকে
- রপ্তানিতে জোরালো অবস্থানই দেশের পুরো চিত্র নয়
- এ বছর পেরিয়েও প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখছেন অর্থনীতিবিদেরা
- বৈশ্বিক বুমে সুফল ক্রমেই অসমভাবে বণ্টিত
- জ্বালানি ও এআই বিনিয়োগের মুনাফাই প্রধান ঝুঁকি
- চিপের বুমকে বিস্তৃত প্রবৃদ্ধিতে রূপ দেওয়া
- মূল বিষয়গুলো
‘চাপের মুখে স্থিতিস্থাপকতা, জরুরি সিদ্ধান্ত’ শিরোনামের অক্টোবরের বিশ্ব অর্থনৈতিক পূর্বাভাসে (ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক) তাইওয়ানের চলতি হিসাবের উদ্বৃত্ত মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২২.০% হবে বলে ধারণা করা হয়েছে। আইএমএফের হিসাব অনুযায়ী, এআই-সংশ্লিষ্ট কম্পিউটিং হার্ডওয়্যারের বৈশ্বিক নিট বাণিজ্যের ৬২% তাইওয়ান ও দক্ষিণ কোরিয়ার দখলে। বিনিয়োগের এই জোয়ারের পেছনের সরবরাহব্যবস্থা কতটা কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়েছে, তা এতে স্পষ্ট হয়।
এই পূর্বাভাস প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধির, অর্থাৎ মূল্য পরিবর্তনের প্রভাব সমন্বয়ের পর অর্থনৈতিক উৎপাদনের হিসাব। এটি পুরো বছরের পূর্বাভাস, নিশ্চিত প্রবৃদ্ধির ফল নয়। বড় ধরনের সংশোধনের পরও আইএমএফের হিসাব তাইওয়ানের বাজেট, হিসাব ও পরিসংখ্যান মহাপরিচালকের দপ্তরের (ডিজিবিএএস) আগস্টে দেওয়া ১১.০৫% পূর্বাভাসের চেয়ে ০.৩৫ শতাংশীয় পয়েন্ট কম।
১০%-এর বেশি প্রবৃদ্ধি হবে—এমন একমাত্র অর্থনীতি তাইওয়ান কি না, তা নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে ভিন্ন তথ্য রয়েছে। কিছু প্রতিবেদনে তাইওয়ানকে একমাত্র বলা হয়েছে, অন্যগুলোতে গায়ানার ২২.৩% ও দক্ষিণ সুদানের ১০.৫% প্রবৃদ্ধির কথাও রয়েছে। ওই হিসাব অনুযায়ী চিহ্নিত অর্থনীতিগুলোর মধ্যে তাইওয়ান দ্বিতীয়, গায়ানার পেছনে এবং দক্ষিণ সুদানের সামান্য ওপরে। তবে তাইওয়ানের আঞ্চলিক শীর্ষস্থান ও ব্যতিক্রমী দ্রুত প্রবৃদ্ধির বিষয়ে প্রতিবেদনগুলো একমত।
পূর্বাভাসে একটি সতর্কবার্তাও রয়েছে: ২০২৭ সালে তাইওয়ানের প্রবৃদ্ধি কমে ৪.৩% হতে পারে। এআই খাতে ব্যয়ের তাৎক্ষণিক সুফল উল্লেখযোগ্য হলেও এই গতিতে প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে কিংবা বিনিয়োগ থেকে শেষ পর্যন্ত প্রত্যাশিত মুনাফা মিলবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
এপ্রিল থেকে অক্টোবরে পূর্বাভাসের পরিবর্তন
সংশোধিত পূর্বাভাসে তাইওয়ানের প্রবৃদ্ধির গতি ছয় মাস আগের আইএমএফের ধারণার চেয়ে জোরালো হবে বলে দেখা যাচ্ছে। ২০২৬ সালের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস এখন এপ্রিলের হিসাবের দ্বিগুণের সামান্য বেশি এবং ২০২৫ সালে নথিভুক্ত ৮.৮% প্রবৃদ্ধির চেয়ে ১.৯ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি।
বছরের অগ্রগতির সঙ্গে পূর্বাভাসে কীভাবে পরিবর্তন এসেছে, তা ধারাবাহিক হিসাব থেকে বোঝা যায়:
- এপ্রিল ২০২৬: আইএমএফের পূর্বাভাসে তাইওয়ানের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ৫.২%, মূল্যস্ফীতি ১.৫% এবং চলতি হিসাবের উদ্বৃত্ত জিডিপির ১৮.১%।
- আগস্ট ২০২৬: তাইওয়ানের বাজেট, হিসাব ও পরিসংখ্যান মহাপরিচালকের দপ্তর বার্ষিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দেয় ১১.০৫%।
- ১২ অক্টোবর, ২০২৬: অক্টোবরের বিশ্ব অর্থনৈতিক পূর্বাভাসের প্রতিবেদনে আইএমএফের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ১০.৭%, মূল্যস্ফীতি ২.০% এবং চলতি হিসাবের উদ্বৃত্ত জিডিপির ২২.০% বলা হয়।
- ১৩ অক্টোবর, ২০২৬: ব্যাংককে বৈশ্বিক অর্থনীতির পূর্বাভাস নিয়ে আইএমএফের কর্মকর্তারা আলোচনা করেন। আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভার সময় অর্থনীতিবিদেরা তাইওয়ানের সম্ভাবনাও পর্যালোচনা করেন।
- ২০২৭: আইএমএফের পূর্বাভাসে তাইওয়ানের প্রবৃদ্ধি ৪.৩%, মূল্যস্ফীতি ১.৮% এবং চলতি হিসাবের উদ্বৃত্ত জিডিপির ২৩.১%।
প্রতিবেদনগুলোতে পূর্বাভাসটি প্রকাশের তারিখ ১২ অক্টোবর বলা হয়েছে। অন্যদিকে ব্যাংককে এর উপস্থাপনা ও আলোচনা নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে তারিখ ১৩ অক্টোবর। দুটি তারিখই একই অক্টোবর সংস্করণকে নির্দেশ করে।
আগামী বছর প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে বলে ধারণা করা হচ্ছে: ৪.৩% প্রবৃদ্ধি হবে ২০২৬ সালের পূর্বাভাসের চেয়ে ৬.৪ শতাংশীয় পয়েন্ট কম। তবু তা অর্থনীতির সংকোচন নয়, বরং সম্প্রসারণেরই ইঙ্গিত। তাইওয়ানের পরিসংখ্যান সংস্থার ২০২৭ সালের তুলনাযোগ্য কোনো পূর্বাভাস এখানে দেওয়া হয়নি। তাই ২০২৬ সালের জন্যই শুধু আগস্ট ও অক্টোবরের হিসাব সরাসরি তুলনা করা যায়।
প্রতিবেশী অর্থনীতির তুলনায় তাইওয়ানের অবস্থান
তাইওয়ানের সম্ভাব্য প্রবৃদ্ধি ভিয়েতনামের ৮.৪%, ভারতের ৭.০%, ইন্দোনেশিয়ার ৫.১% এবং সিঙ্গাপুরের ৫.০% প্রবৃদ্ধির চেয়ে বেশি। আইএমএফের পূর্বাভাসে চীনের প্রবৃদ্ধি ৪.৫%, হংকংয়ের ৩.৮%, দক্ষিণ কোরিয়ার ৩.৩% এবং জাপানের ০.৭%।
প্রযুক্তির চাহিদা থেকে সুফল পাওয়া অর্থনীতিগুলোর মধ্যেও ব্যবধান বড়। সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহব্যবস্থায় তাইওয়ান ও দক্ষিণ কোরিয়া—উভয়েরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকলেও তাইওয়ানের পূর্বাভাস দক্ষিণ কোরিয়ার চেয়ে ৭.৪ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি। ১০.৭% ও ৪.৫% হিসাব ধরলে দেশটির প্রবৃদ্ধি চীনের পূর্বাভাসের দ্বিগুণেরও বেশি।
তাইওয়ানে দ্রুত প্রবৃদ্ধি মানেই এশিয়ার সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির গতি বাড়ছে, তা নয়। আইএমএফের পূর্বাভাসে ২০২৬ সালে আঞ্চলিক প্রবৃদ্ধি ৪.৮%, যা ২০২৫ সালের ৫.০% থেকে কম; ২০২৭ সালে তা আরও কমে ৪.৪% হতে পারে। এশিয়ার উন্নত অর্থনীতিগুলোর জন্য ২০২৬ সালের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৩.২%।
২০২৭ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় ২.৮% প্রবৃদ্ধি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। চীনের প্রবৃদ্ধি কমে ৪.০% হতে পারে। চীনের চূড়ান্ত পূর্বাভাস নিয়ে প্রতিবেদনগুলো একমত হলেও সর্বশেষ সংশোধনের দিক নিয়ে তাদের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে: একটি প্রতিবেদনে পূর্বাভাস বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে, অন্যটিতে বলা হয়েছে, জুলাইয়ের হিসাব থেকে দুই বছরের পূর্বাভাসই ০.১ শতাংশীয় পয়েন্ট কমানো হয়েছে। তবে ২০২৬ সালের ৪.৫% ও ২০২৭ সালের ৪.০% হিসাব দুটিই অভিন্ন।
এআই খাতের ব্যয় কেন সরাসরি সুফল দিচ্ছে তাইওয়ানকে
এআই ব্যবস্থা প্রশিক্ষণ এবং চালু হওয়ার পর তা পরিচালনা—দুই কাজেই শক্তিশালী চিপ ও কম্পিউটিং অবকাঠামো দরকার। তথ্য থেকে মডেল তৈরি করাকে প্রশিক্ষণ বলে; আর প্রশিক্ষিত মডেল উত্তর তৈরি বা কোনো কাজ সম্পন্ন করার প্রক্রিয়াটি হলো ইনফারেন্স। এ দুই কাজেই বিনিয়োগ হওয়ায় তাইওয়ানের প্রযুক্তি খাতের সরবরাহ করা হার্ডওয়্যারের চাহিদা বাড়ছে।
আইএমএফের বর্ণনায়, শিল্পটি সরবরাহব্যবস্থার দুই প্রান্তে কেন্দ্রীভূত: একদিকে উন্নত কম্পিউটিং হার্ডওয়্যার, অন্যদিকে শীর্ষস্থানীয় এআই মডেলের উন্নয়ন ও পরিচালনা। হার্ডওয়্যার সরবরাহব্যবস্থায় তাইওয়ান ও দক্ষিণ কোরিয়ার অবস্থান কেন্দ্রীয়।
৬২% হিসাবটি বৈশ্বিক এআই কম্পিউটিং হার্ডওয়্যারের নিট বাণিজ্যে দুই দেশের সম্মিলিত অংশকে বোঝায়। কোনো কোনো প্রতিবেদনে এটিকে এআই হার্ডওয়্যার শিল্পের অংশ হিসেবে আরও বিস্তৃতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। তবে একে এআই-সংশ্লিষ্ট সব কর্মকাণ্ড, সফটওয়্যারের আয় বা চিপ উৎপাদনের পরিমাপ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। আমদানি সমন্বয়ের পর রপ্তানির হিসাবই নিট বাণিজ্য।
আইএমএফের চার্ট নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসারে, তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, মেক্সিকো ও নেদারল্যান্ডস মিলে সংশ্লিষ্ট হার্ডওয়্যার রপ্তানির প্রায় ৮০% করে। আমদানির প্রায় ৮০% করে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। এই বিন্যাসে বড় এআই বাজারগুলোর ব্যয়ের সঙ্গে একাধিক উৎপাদন অর্থনীতির সংযোগ রয়েছে।
তাইওয়ান ও দক্ষিণ কোরিয়ার কম্পিউটার, ইলেকট্রনিকস ও অপটিক্যাল পণ্যের রপ্তানি ৪০% বাড়লে সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া ও জাপান কীভাবে সুফল পেতে পারে, তার মডেলও তৈরি করেছে আইএমএফ। এটি একটি কাল্পনিক সরবরাহব্যবস্থা-সংক্রান্ত বিশ্লেষণ; তাইওয়ানের ইলেকট্রনিকস ও অপটিক্যাল সরঞ্জামের রপ্তানি প্রায় ৪০% বেড়েছে—এমন প্রতিবেদনের সঙ্গে এর পার্থক্য রয়েছে।
রপ্তানিতে জোরালো অবস্থানই দেশের পুরো চিত্র নয়
এপ্রিলের পূর্বাভাসে তাইওয়ানের চলতি হিসাবের উদ্বৃত্ত জিডিপির ১৮.১% ধরা হয়েছিল। তা বেড়ে ২২.০% হয়েছে, অর্থাৎ ৩.৯ শতাংশীয় পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়েছে। চলতি হিসাবে বিশ্বের বাকি অংশের সঙ্গে পণ্য ও সেবার বাণিজ্য, আয়ের প্রবাহ এবং স্থানান্তরের হিসাব থাকে। উদ্বৃত্তের অর্থ, এসব খাতে বিদেশ থেকে পাওয়া অর্থ বিদেশে দেওয়া অর্থের চেয়ে বেশি।
আইএমএফের হিসাবে ২০২৫ সালে এই উদ্বৃত্ত জিডিপির ২০.০% এবং ২০২৭ সালে তা বেড়ে ২৩.১% হবে। বার্ষিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমবে বলে পূর্বাভাস থাকলেও উদ্বৃত্তের বাড়তি অংশ বহির্বিশ্বের সঙ্গে অর্থনৈতিক লেনদেনে শক্তিশালী অবস্থান অব্যাহত থাকার ইঙ্গিত দেয়।
দেশের অভ্যন্তরীণ সূচকে পরিবর্তন তুলনামূলকভাবে কম। ২০২৬ সালে ভোক্তা মূল্যস্ফীতি ২.০% হবে বলে পূর্বাভাস, যা এপ্রিলে ছিল ১.৫%। ২০২৬ ও ২০২৭—দুই বছরেই বেকারত্ব ৩.৪% থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আগামী বছর মূল্যস্ফীতি কমে ১.৮% হতে পারে।
এই পরিসংখ্যান থেকে পরিবার ও শিল্প খাতের মধ্যে সুফল কীভাবে বণ্টিত হচ্ছে, তা বোঝা যায় না। জিডিপি প্রবৃদ্ধি মোট উৎপাদন পরিমাপ করে, মজুরি, ভোগ বা কর্মসংস্থানের উন্নতি সমানভাবে হচ্ছে কি না, তা নয়। বেকারত্বের পূর্বাভাস অপরিবর্তিত থাকাও দেখায়, উৎপাদনের হিসাব বড় করে সংশোধন হলেই শ্রমবাজারের প্রধান সূচকে একই মাত্রার পরিবর্তন আসে না।
রপ্তানি প্রবৃদ্ধির ধরনও গুরুত্বপূর্ণ। আইএমএফের বিশ্লেষণ নিয়ে একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এআই হার্ডওয়্যার বাণিজ্যের মূল্যবৃদ্ধির পেছনে পণ্যের দাম বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে; সরবরাহের পরিমাণ একই মাত্রায় বাড়েনি। তাই রপ্তানি আয় বাড়াকে রপ্তানি করা যন্ত্রের সংখ্যাও একই হারে বেড়েছে—এর প্রমাণ হিসেবে দেখা উচিত নয়।
এ বছর পেরিয়েও প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখছেন অর্থনীতিবিদেরা
ব্যাংককে বার্ষিক সভায় অংশ নেওয়া অর্থনীতিবিদেরা মোটামুটিভাবে মনে করেন, সেমিকন্ডাক্টরের জোরালো চাহিদা তাইওয়ানের পূর্বাভাসের একটি বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যা। ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ পল টেম্পারটন বলেন, এআই অবকাঠামোর জন্য চিপ সরবরাহে তাইওয়ানের ভূমিকা বিবেচনায় নিলে, রপ্তানিনির্ভর দেশটির প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসটি বোধগম্য।
টেম্পারটনের ধারণা, এ চাহিদা কয়েক বছর স্থায়ী হতে পারে এবং শিল্পটি ইতিমধ্যে বুদ্বুদের পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে তিনি মনে করেন না। তাঁর মতে, শুধু বিনিয়োগের ব্যয় নয়, আগামী কয়েক বছরে এআই কোম্পানিগুলো কতটা আয় করছে, সেটিই হবে যাচাইয়ের মাপকাঠি।
আন্তঃসরকারি গ্রুপ অব টোয়েন্টি-ফোরের (জি-২৪) পরিচালক ইয়াবো মাশাও মনে করেন, সেমিকন্ডাক্টর খাত আগামী দুই থেকে তিন বছর সম্প্রসারিত হতে থাকবে, যদিও খাতটি স্থিতিশীল হলে প্রবৃদ্ধির গতি কমতে পারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা ও উন্নয়নসংক্রান্ত বিষয়ে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অবস্থান সমন্বয় করে জি-২৪।
যুক্তরাষ্ট্রের সেমিকন্ডাক্টর শিল্প সমিতির এমা রাফেলফ এআই বাজারের সম্প্রসারণ নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাঁকে কখনো অর্থনীতিবিদ, কখনো সমিতির বৈশ্বিক নীতিবিষয়ক পরিচালক হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, সম্প্রসারণ অব্যাহত রাখতে যুক্তরাষ্ট্র, তাইওয়ান ও অন্য অর্থনীতিগুলোর মধ্যে সহযোগিতা প্রয়োজন; এ সহযোগিতায় সহায়তার জন্য নিয়মিত যোগাযোগও জরুরি।
এই মতামতগুলো আরও প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনার কথা বলে, তবে তাইওয়ানের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি আবার ১০.৭% হবে—এমন নিশ্চয়তা দেয় না। ২০২৭ সালের জন্য আইএমএফের নিজস্ব ৪.৩% পূর্বাভাসে প্রবৃদ্ধির গতি কমার কথা বলা হয়েছে, যদিও উৎপাদন বাড়তে থাকবে।
বৈশ্বিক বুমে সুফল ক্রমেই অসমভাবে বণ্টিত
আইএমএফের পূর্বাভাসে ২০২৬ সালে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ৩.১% এবং ২০২৭ সালে ৩.৪% হবে। এ বছরের হিসাব জুলাইয়ের ৩.০% পূর্বাভাসের চেয়ে সামান্য বেশি, তবে ২০২৫ সালের ৩.৫% প্রবৃদ্ধির চেয়ে কম। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জ্বালানিসংকটের ধাক্কা সামলাতে এআই বিনিয়োগ সহায়তা করেছে।
তবে এই সহায়তা সমানভাবে বণ্টিত নয়। আইএমএফ বলছে, এখন ৩২টি অর্থনীতি বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির ৯৫% জোগাচ্ছে, যেখানে এপ্রিলে এ সংখ্যা ছিল ৫৪। সংস্থাটি ৪৭% অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়েছে। এআই অবকাঠামো সরবরাহকারী দেশগুলো সুফল পেলেও, এ সরবরাহব্যবস্থার বাইরে থাকা অনেক জ্বালানি আমদানিকারক দেশ বাড়তি খরচ ও ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার মুখে পড়ছে।
২০২৬ ও ২০২৭—দুই বছরেই যুক্তরাষ্ট্রে ২.৩% প্রবৃদ্ধি হবে বলে পূর্বাভাস। ইউরো অঞ্চলে এ বছর প্রবৃদ্ধি ১.১% হতে পারে; অন্যদিকে ভারত দুই বছরেই ৭.০% সম্প্রসারিত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিপরীতে, ২০২৬ সালে সৌদি আরবে ৩.৩%, ইরাকে ১৬%, কুয়েতে ১৬.৭% এবং কাতারে ১৫.৬% অর্থনৈতিক সংকোচনের পূর্বাভাস দিয়েছে আইএমএফ।
আইএমএফের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ও গবেষণা বিভাগের পরিচালক সিলভানা তেনরেয়রো সতর্ক করে বলেছেন, বারবার ধাক্কা সামাল দেওয়ার সক্ষমতা কমছে:
বৈশ্বিক অর্থনীতি স্থিতিস্থাপকতা দেখিয়েছে, কিন্তু সেই সক্ষমতা এখন সীমায় পৌঁছাচ্ছে। তাই শুধু পরিস্থিতি সামাল দেওয়া থেকে সরে এসে পুনর্গঠনে মনোযোগ দিতে হবে।
আইএমএফের উপগবেষণা পরিচালক পেতিয়া কোয়েভা ব্রুকস বলেন, জ্বালানির মজুত কমানো, সরবরাহকারী বদলানো ও তেলের চাহিদা কমানোর মতো পদক্ষেপের কারণে এ বছর বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ২.৫%-এ নেমে যাওয়া ঠেকানো গেছে। সংঘাত চলতে থাকায় এসব পদক্ষেপের সুরক্ষামূলক প্রভাব কমে আসছে।
জ্বালানি ও এআই বিনিয়োগের মুনাফাই প্রধান ঝুঁকি
আইএমএফের মূল পূর্বাভাসে ধরা হয়েছে, হরমুজ প্রণালি ২০২৭ সালের মার্চে আবার খুলবে এবং ২০২৭ সালের অক্টোবরের মধ্যে জাহাজ চলাচলের পরিস্থিতি মোটামুটিভাবে যুদ্ধের আগের অবস্থায় ফিরবে। এতে ২০২৬ সালে প্রতি ব্যারেল তেলের গড় দাম ৯৬ ডলার এবং ২০২৭ সালে ৮৭ ডলার ধরা হয়েছে। এগুলো পূর্বাভাসের অনুমান, নিশ্চিত তারিখ বা দাম নয়।
বিশ্বের তেলের মজুত থেকে প্রতিদিন প্রায় ২৭ লাখ ব্যারেল তেল কমছে। যুদ্ধ আরও তীব্র হয়ে ২০২৭ সালের প্রথম প্রান্তিক পর্যন্ত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১৩০ ডলারে থাকলে—এমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে আইএমএফের হিসাব, ২০২৬ সালে প্রবৃদ্ধি ০.২ শতাংশীয় পয়েন্ট এবং ২০২৭ সালে ০.৫ শতাংশীয় পয়েন্ট কমবে। আগামী বছর বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৫.২% হতে পারে, যেখানে মূল পূর্বাভাস ৪.১%।
এআই খাতে আলাদা ঝুঁকিও রয়েছে। চিপ, ডেটা সেন্টার ও বিদ্যুৎ সক্ষমতায় ব্যয় হচ্ছে, অথচ উৎপাদনশীলতার ব্যাপক উন্নতি এখনো প্রমাণিত হয়নি। আয় ও দক্ষতা বৃদ্ধির ফল প্রত্যাশা পূরণ না করলে বিনিয়োগ এবং সম্পদের দাম একসঙ্গে কমে যেতে পারে।
এআই খাতে প্রত্যাশার চেয়ে কম সুফল এবং আর্থিক বাজারে চাপ—এই দুই বিষয় একসঙ্গে ধরে আইএমএফের একটি পরিস্থিতি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারের দাম ২০% কমবে এবং ২০২৮ সালের মধ্যে বৈশ্বিক উৎপাদন মূল পূর্বাভাসের চেয়ে ১.১% কম হবে। এশিয়ার উৎপাদন ১.৭% পর্যন্ত কমতে পারে। বিনিয়োগে তুলনামূলক সীমিত পশ্চাদপসরণের একটি পরিস্থিতিতে ২০২৯ সালের মধ্যে এশিয়ার জিডিপি মূল পূর্বাভাসের চেয়ে প্রায় ০.৫% কম হবে।
এই পরিস্থিতিগুলো ভিন্ন ভিন্ন অনুমানের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, তাই এগুলো যোগ করা উচিত নয়। এগুলো আইএমএফের মূল পূর্বাভাস থেকে সম্ভাব্য বিচ্যুতির চিত্র, ওই ক্ষতি যে ঘটবেই তার পূর্বাভাস নয়। বিপরীতে, এআই দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে এবং বিনিয়োগ বাড়লে ২০২৯ সালের মধ্যে বৈশ্বিক জিডিপি আরও ০.৬% বাড়তে পারে, যার সুফলের বড় অংশ পাবে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন।
চিপের বুমকে বিস্তৃত প্রবৃদ্ধিতে রূপ দেওয়া
মাশার আহ্বান, এই সম্প্রসারণ থেকে বাড়তি সরকারি রাজস্ব ও অন্যান্য সম্পদ ব্যবহার করে প্রযুক্তির বাইরেও শিল্প খাত গড়ে তুলুক তাইওয়ান। উন্নয়নশীল দেশগুলোর ঋণ মওকুফের পক্ষে কাজ করা অলাভজনক সংস্থা জুবিলি ইউএসএ নেটওয়ার্কের নির্বাহী পরিচালক এরিক লেকম্পও কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি নিয়ে একই ধরনের যুক্তি দিয়েছেন।
লেকম্পের মতে, শিল্প খাতে বৈচিত্র্য আনলে এআই নিয়ে অতিরিক্ত আশাবাদ থেকে নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে পারবে তাইওয়ান:
আমার মনে হয়, ঝুঁকি সামলাতে বা তা নিয়ে কম উদ্বিগ্ন থাকতে তাইওয়ান সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির উৎসে বৈচিত্র্য আনা এবং কর্মসংস্থানের খাতেও বৈচিত্র্য আনা।
তাইওয়ানের জাতীয় উন্নয়ন পরিষদ বলেছে, আইএমএফের সংশোধিত পূর্বাভাস দেশটির অর্থনৈতিক গতিশীলতার স্বীকৃতি। চিপ উৎপাদনের বাইরেও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বিস্তারের লক্ষ্য নিয়ে পরিষদটি ‘নতুন এআই অবকাঠামোর ১০টি প্রকল্প’ এবং ‘১৩টি মূল কৌশলগত শিল্প’ উদ্যোগ চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে। এ জন্য এআই গ্রহণ, অর্থায়ন, দক্ষ জনবল উন্নয়ন, নিয়ন্ত্রক পরিবর্তন ও আন্তর্জাতিক সম্প্রসারণে জোর দেওয়া হবে।
প্রতিবেদনগুলোতে ওই উদ্যোগগুলোর বাস্তবায়নের সময়সীমা, বাজেট বা পরিমাপযোগ্য ফল উল্লেখ করা হয়নি। পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ: সুফল ছড়িয়ে দেওয়ার সরকারি পরিকল্পনা মানেই এই নয় যে সম্প্রসারণের প্রভাব ইতিমধ্যে সব খাতে পৌঁছেছে।
তাইওয়ানের জন্য প্রধান নীতিগত চ্যালেঞ্জ হলো, রপ্তানির ব্যতিক্রমী চাহিদাকে আয় ও কর্মসংস্থানের আরও বৈচিত্র্যময় উৎসে রূপান্তর করা। পূর্বাভাসে বৈশ্বিক এআই সরবরাহব্যবস্থায় দেশটির তাৎক্ষণিক সুবিধা স্পষ্ট হয়েছে। একই সঙ্গে প্রবৃদ্ধির গতি কমার পূর্বাভাস ও ঝুঁকির পরিস্থিতিগুলো দেখিয়ে দেয়, শুধু এই সুবিধার ওপর নির্ভর করলে অর্থনীতি ঝুঁকির মুখে থাকবে।
মূল বিষয়গুলো
- আইএমএফ তাইওয়ানের ২০২৬ সালের প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৫.২% থেকে বাড়িয়ে ১০.৭% করেছে, যা এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সর্বোচ্চ পূর্বাভাসিত প্রবৃদ্ধি।
- তবু এই হিসাব তাইওয়ানের আগস্টে দেওয়া সরকারি ১১.০৫% পূর্বাভাসের চেয়ে কম।
- এআই কম্পিউটিং হার্ডওয়্যারের বৈশ্বিক নিট বাণিজ্যের ৬২% তাইওয়ান ও দক্ষিণ কোরিয়ার দখলে।
- ২০২৬ সালে তাইওয়ানের চলতি হিসাবের উদ্বৃত্ত জিডিপির ২২.০%, মূল্যস্ফীতি ২.০% এবং বেকারত্ব ৩.৪% হবে বলে পূর্বাভাস।
- ২০২৭ সালে তাইওয়ানের প্রবৃদ্ধি কমে ৪.৩% হবে বলে আইএমএফের ধারণা।
- গায়ানায় ২২.৩% ও দক্ষিণ সুদানে ১০.৫% প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসের কথা বলা প্রতিবেদনগুলোতে তাইওয়ানই ১০%-এর বেশি প্রবৃদ্ধির একমাত্র অর্থনীতি—এমন দাবির সঙ্গে অসঙ্গতি রয়েছে।
- জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ও এআই বিনিয়োগ থেকে প্রত্যাশিত সুফল না পাওয়ার ঝুঁকির মুখে অর্থনীতিবিদেরা শিল্পের বিস্তৃত উন্নয়নের পক্ষে মত দিয়েছেন।






