চারটি গ্যাসক্ষেত্র থেকে বিদ্যুৎ ও সার উৎপাদনে সরবরাহ
আফগানিস্তানের উত্তরাঞ্চলীয় জাওজান প্রদেশের চারটি প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্র থেকে দিনে প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার ঘনমিটার গ্যাস উৎপাদিত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন আফগান গ্যাস এন্টারপ্রাইজের প্রধান আখতার মোহাম্মদ মনসুর। দুই বড় গ্রাহক মিলে প্রায় ৬ লাখ ঘনমিটার গ্যাস পায়: রাষ্ট্রায়ত্ত মাজার-ই-শরিফ সার ও বিদ্যুৎ কোম্পানি সার উৎপাদনে ৪ লাখ ঘনমিটার নেয়, আর বায়াত পাওয়ার বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য পায় ২ লাখ ঘনমিটার।
সূচিপত্র
- চারটি গ্যাসক্ষেত্র থেকে বিদ্যুৎ ও সার উৎপাদনে সরবরাহ
- দৈনিক গ্যাস সরবরাহ কোথায় যায়
- পরিবেশগত ঝুঁকি কূপের বাইরেও বিস্তৃত
- সুরক্ষাব্যবস্থা আসলে কী প্রতিশ্রুতি দেয়
- সালফার শোধন একটি গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি বিষয়
- উৎপাদনের পরিসংখ্যানে তারিখ ও পরিধি জরুরি
- দশকের পর দশক ধরে অবকাঠামো, আর কিছু পরিকল্পনা অসমাপ্ত
- ঝুঁকির শ্রেণিবিভাগের চেয়ে পর্যবেক্ষণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ
- পানির চাপ, মজুরি ও স্থানীয় অভিজ্ঞতা
- মূল বিষয়গুলো
এই পরিসংখ্যান দেখায়, গ্যাস উত্তোলন কতটা ঘনিষ্ঠভাবে শিল্প কার্যক্রম ও বিদ্যুৎ সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত। একই সঙ্গে, ঘোষিত উৎপাদন ও ওই দুই গ্রাহকের কাছে সরবরাহের মধ্যে প্রায় ৫০ হাজার ঘনমিটারের ব্যবধান রয়েছে। এই অবশিষ্ট গ্যাস কীভাবে বরাদ্দ হয়, তা মনসুর জানাননি। পরিসংখ্যানগুলো আনুমানিক হওয়ায় এই ব্যবধানকে অপচয়, লিকেজ বা উদ্বৃত্ত সরবরাহের প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
মনসুরের ভাষ্য, খাজা গোগেরদাক, ইয়াতিমতাক, জারকদুক ও শাকারাক—এই চারটি ক্ষেত্র থেকে নিয়মিত গ্যাস উত্তোলন চলছে। পাইপলাইনে পরিবহনের আগে গ্যাস প্রক্রিয়াজাত করা হয়। ইয়াতিমতাকে সাতটি কূপ সক্রিয় রয়েছে, সেখানে প্রায় ৮৫০ জন প্রকৌশলী ও কর্মী কাজ করেন।
গ্যাস খনন বিশেষজ্ঞ মাইওয়ান্দ আরিয়া সতর্ক করে বলেছেন, অনুসন্ধান, খনন, উত্তোলন ও পরিবহনের প্রতিটি ধাপে পানি, মাটি, বায়ু এবং অন্যান্য পরিবেশগত ঝুঁকির দিকে ধারাবাহিক মনোযোগ না দিলে এর সুফল পাওয়া যাবে না। বিদ্যুৎ উৎপাদনের শেষ ধাপে প্রত্যাশিত সুরক্ষাব্যবস্থাগুলো সম্পর্কে সরকারি প্রকল্প নথিতে আরও বিস্তারিত তথ্য রয়েছে। এসব নথিতে ঝুঁকিগুলো নিয়ন্ত্রণযোগ্য বলে ধারণা করা হলেও, পর্যবেক্ষণ, বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ ও সংশোধনমূলক পদক্ষেপের কথাও বলা হয়েছে। তবে চারটি উত্তোলনক্ষেত্রই বর্তমানে সব পরিবেশগত শর্ত পূরণ করছে, এমন প্রমাণ নথিগুলো দেয় না।
দৈনিক গ্যাস সরবরাহ কোথায় যায়
সার কোম্পানিটি বায়াত পাওয়ারের দ্বিগুণ গ্যাস পায়। মনসুরের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দৈনিক ক্ষেত্র-উৎপাদনের প্রায় ৬১.৫ শতাংশ যায় সার কোম্পানির কাছে, আর প্রায় ৩০.৮ শতাংশ পায় বায়াত। দুই গ্রাহক মিলে প্রতিবেদনে উল্লেখিত ৬ লাখ ৫০ হাজার ঘনমিটারের প্রায় ৯২.৩ শতাংশ পায়।
এই হারগুলো গ্যাসের পরিমাণ বোঝায়, সার ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের আপেক্ষিক অর্থনৈতিক মূল্য নয়। সার কারখানায় সরবরাহ করা গ্যাস যে শিল্পপ্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত হয়, বিদ্যুৎ উৎপাদনে পোড়ানো গ্যাসের ব্যবহার তার থেকে ভিন্ন। প্রতিবেদন করা সরবরাহের পরিমাণ থেকে কোম্পানিগুলো বাস্তবে কত সার বা বিদ্যুৎ উৎপাদন করে, তা-ও জানা যায় না।
মনসুরের ভাষ্য, চুক্তির আওতায় বায়াত গ্যাস পায়। প্রকল্পের মূল্যায়নে জাতীয় বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা দা আফগানিস্তান ব্রেশনা শেরকাতের কাছে ২০ বছরের বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির আওতায় বিদ্যুৎ বিক্রির পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এই ব্যবস্থা জাওজানের উত্তোলন অবকাঠামোকে কূপের আশপাশের পরিবারের বাইরেও বৃহত্তর বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করে।
পরিবেশগত ঝুঁকি কূপের বাইরেও বিস্তৃত
আরিয়া পানি ও বায়ুদূষণ, শব্দ ও আলোকদূষণ, ভূমি অবনমন, জলবায়ু পরিবর্তন এবং জীববৈচিত্র্য হ্রাসের সম্ভাব্য ঝুঁকির কথা বলেছেন। ভূমি অবনমন বলতে মাটি বসে যাওয়া বা নিচে নেমে যাওয়াকে বোঝায়। তাঁর সতর্কবার্তা গ্যাস উৎপাদনের পুরো শৃঙ্খল নিয়ে, কেবল কূপ থেকে গ্যাস তোলার মুহূর্ত নিয়ে নয়।
দূষণ ও সম্পদ ব্যবহারের মধ্যেও তিনি পার্থক্য করেছেন। ভূগর্ভস্থ ও উপরিভাগের পানি দূষিত হতে পারে, আবার পানির ব্যবহার স্থানীয় সরবরাহের ওপর আলাদা চাপ তৈরি করতে পারে। সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডে মাটি দূষিত বা ক্ষয়প্রাপ্ত হতে পারে। এগুলো সম্ভাব্য প্রভাব, যেগুলোতে মনোযোগ দেওয়া দরকার বলে তিনি মনে করেন; জাওজানে এর প্রতিটি ইতিমধ্যে ঘটেছে—এমন সিদ্ধান্ত নয়।
বিশ্বব্যাংকের মাধ্যমে প্রকাশিত বায়াতের পরিবেশগত মূল্যায়নে প্রস্তাবিত বিদ্যুৎ প্রকল্পে দূষণের কয়েকটি নির্দিষ্ট পথ চিহ্নিত করা হয়েছে। নির্মাণকাজের সময় তরল বর্জ্যের মধ্যে দূষিত বৃষ্টির পানি, পয়োনিষ্কাশনের পানি, রাসায়নিক উপজাত এবং যন্ত্রপাতির তরল থাকতে পারে। সঠিকভাবে আটকে রাখা, পরিষ্কার করা ও অপসারণ না করলে এগুলো মাটি, উপরিভাগের পানি ও ভূগর্ভস্থ পানি দূষিত করতে পারে বলে এতে সতর্ক করা হয়েছে।
মূল্যায়নে যানবাহনের ধোঁয়া, নির্মাণযন্ত্র ও ধুলাবালিকে বায়ুর মানের জন্য উদ্বেগের বিষয় হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়েছে। আলো, যান চলাচল, উদ্ভিদ অপসারণ, শব্দ ও দুর্ঘটনাজনিত ছড়িয়ে পড়া পদার্থ আবাসস্থল ও প্রজাতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। এই ফলাফলগুলো বায়াত বিদ্যুৎ প্রকল্পের বিষয়ে; তাই এগুলোকে উৎপাদনরত চারটি গ্যাসক্ষেত্রের সম্পন্ন পরিবেশগত তদন্ত হিসেবে দেখা উচিত নয়।
সুরক্ষাব্যবস্থা আসলে কী প্রতিশ্রুতি দেয়
মনসুরের ভাষ্য, কারিগরি কর্মীরা উত্তোলন পর্যবেক্ষণ করেন এবং যন্ত্রপাতিতে সমস্যা হলে ব্যবস্থা নেন। তাঁর আরও দাবি, উত্তোলন শুরুর আগে মূল্যায়ন করা হয়েছিল এবং পরিবেশগত মানদণ্ড অনুযায়ী আবাসিক এলাকা থেকে দূরত্ব নির্ধারণ করা হয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, খাজা গোগেরদাক ও ইয়াতিমতাক আবাসিক এলাকা থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে, আর জারকদুক ও শাকারাক প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে।
বায়াতের মূল্যায়নে বিদ্যুৎ প্রকল্পটি শেবেরঘান থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার পূর্বে, ইয়াতিমতাক এলাকায় এবং ইয়াতিমতাক ও জারকুদুক গ্যাসক্ষেত্রের কাছে দেখানো হয়েছে। নথির এক জায়গায় বলা হয়েছে, নিকটতম আবাসিক বসতি ১৫ কিলোমিটারেরও বেশি দূরে। অন্য জায়গায় নিকটতম আবাসিক ও কৃষি এলাকাগুলো পশ্চিম ও উত্তরে ১২ কিলোমিটারেরও বেশি দূরে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে নথিতে দূরত্বের বর্ণনা ভিন্ন; কোনোটিকেই উত্তোলনস্থলগুলোর যাচাইকৃত বর্তমান মানচিত্রের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।
মূল্যায়নে বিদ্যুৎ প্রকল্পের পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাবকে নিম্ন বা মাঝারি মাত্রার বলে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। বর্জ্যপানি, কঠিন ও বিপজ্জনক বর্জ্য এবং পানিসম্পদের ওপর সামগ্রিক প্রভাব খুবই সামান্য হবে বলে ধারণা করা হয়েছিল। এগুলো প্রকল্প মূল্যায়নের সময় করা পূর্বাভাস, কার্যক্রম চলাকালে দূষণ নেই—এমন প্রমাণমূলক পরিমাপ নয়।
মূল্যায়নে দেওয়া সুপারিশ শুধু বসতি থেকে দূরত্ব বজায় রাখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কম ঝুঁকির বলে বিবেচিত প্রভাবসহ চিহ্নিত প্রতিটি সম্ভাব্য প্রভাবের জন্য প্রশমন ব্যবস্থা এবং অপ্রত্যাশিত সমস্যা শনাক্ত করতে পারে—এমন পর্যবেক্ষণের আহ্বান জানানো হয়েছে।
সালফার শোধন একটি গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি বিষয়
মনসুরের ভাষ্য, ভোক্তাদের কাছে পৌঁছানোর আগে গ্যাস থেকে ক্ষতিকর পদার্থ আলাদা করে পুড়িয়ে ফেলা হয়। তবে কোন পদার্থগুলো আলাদা করা হয়, কী ধরনের শোধনযন্ত্র ব্যবহার করা হয় বা পোড়ানোর প্রক্রিয়া থেকে নির্গমনের পরিমাণ কত—তা তিনি জানাননি।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের মাজার প্রকল্পবিষয়ক খাতভিত্তিক পর্যালোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি তথ্য রয়েছে: শেবেরঘান ক্ষেত্রের গ্যাসকে উচ্চ সালফারযুক্ত ‘সাওয়ার’ গ্যাস হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যা অ্যামাইন প্ল্যান্টে শোধন করা প্রয়োজন। সাওয়ার গ্যাসে সালফার যৌগ থাকে, যা নিরাপত্তা ও জ্বালানির মান পূরণের জন্য অপসারণ করতে হয়। অ্যামাইন প্ল্যান্টে রাসায়নিক দ্রবণ ব্যবহার করে ব্যবহারযোগ্য জ্বালানি থেকে অবাঞ্ছিত গ্যাস আলাদা করা হয়।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের নথিতে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অর্থায়নে ২০১৪ সালে নির্মিত একটি শোধনাগারের কথা বলা হয়েছে, যার দৈনিক সক্ষমতা ১০ লাখ ঘনমিটার। ওই মূল্যায়নের সময় এটি সক্ষমতার ২০ শতাংশে চলছিল এবং এর কার্যক্ষমতা সর্বোত্তম পর্যায়ে নিতে পদক্ষেপ প্রয়োজন ছিল। ২০২০ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে ক্যালিব্রেশনের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। অতীতের এই পরিসংখ্যান থেকে বর্তমানে এর প্রক্রিয়াজাতকরণের পরিমাণ বা শোধনক্ষমতা সম্পর্কে সিদ্ধান্তে আসা যায় না।
দূষক আলাদা করলে গ্যাস সরবরাহ সুরক্ষিত হয়, তবে আলাদা করা পদার্থ পোড়ানোর প্রক্রিয়াটিরও পরিবেশগত নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। ওই কার্যক্রম থেকে বর্তমানে কতটুকু বা কী ধরনের নির্গমন হয়, তা মনসুরের বক্তব্য বা প্রকল্পসংক্রান্ত তথ্য কোনোটিই প্রতিষ্ঠা করে না। এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ: সরবরাহের আগে গ্যাস শোধন এবং শোধনের সময় নির্গমন নিয়ন্ত্রণ—দুটি আলাদা দায়িত্ব।
উৎপাদনের পরিসংখ্যানে তারিখ ও পরিধি জরুরি
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের পর্যালোচনায় শেবেরঘান ক্ষেত্রগুলোর সম্ভাব্য দৈনিক সরবরাহ ৫ লাখ ঘনমিটার বলা হয়েছিল। মনসুরের জানানো ৬ লাখ ৫০ হাজার ঘনমিটার উৎপাদন আগের ওই পরিমাণের চেয়ে ১ লাখ ৫০ হাজার বেশি, অর্থাৎ আগের পরিসংখ্যানের তুলনায় ৩০ শতাংশ বেশি। এটি আগের সম্ভাব্যতার হিসাবের সঙ্গে পরবর্তী সময়ে জানানো উৎপাদনের তুলনা, উৎপাদন বৃদ্ধির যাচাইকৃত পরিমাপ নয়।
একই এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের নথিতে আফগান গ্যাস এন্টারপ্রাইজের উৎপাদন সক্ষমতা দৈনিক ১৬ লাখ ঘনমিটারের বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সক্ষমতা হলো নির্দিষ্ট শর্তে কোনো কার্যক্রমের সম্ভাব্য উৎপাদনের পরিমাণ; প্রকৃত উৎপাদন হলো বাস্তবে উৎপাদিত পরিমাণ। এন্টারপ্রাইজের এই পরিসংখ্যানকে জাওজানের নাম উল্লেখ করা চারটি ক্ষেত্রের দৈনিক উৎপাদনের সমতুল্য ধরা যায় না।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক আফগানিস্তানের শনাক্ত করা গ্যাসের মজুত ৭ হাজার ৫০০ কোটি ঘনমিটার এবং উত্তর আফগানিস্তানে অনাবিষ্কৃত, প্রযুক্তিগতভাবে উত্তোলনযোগ্য সম্পদের পরিমাণ ৪৪ হাজার ৪০০ কোটি ঘনমিটার বলে উল্লেখ করেছে। অনাবিষ্কৃত সম্পদের হিসাব হলো উপলভ্য প্রযুক্তি দিয়ে খুঁজে পাওয়া ও উত্তোলন করা যেতে পারে এমন গ্যাসের অনুমান; বিক্রির জন্য প্রস্তুত নিশ্চিত সরবরাহ নয়।
বায়াত প্রকল্পের আগের এক বিবরণে উত্তরাঞ্চলের আনুমানিক গ্যাসসম্পদ ১৫.৭ ট্রিলিয়ন ঘনফুট, অর্থাৎ প্রায় ৪৪ হাজার ৫০০ কোটি ঘনমিটার বলা হয়েছিল। পরিমাণের দিক থেকে এটি এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সম্পদ-অনুমানের কাছাকাছি, তবে নথি দুটিতে ঠিক একই ভৌগোলিক সীমানা বা সম্পদের সংজ্ঞা ব্যবহার করা হয়েছে—এমন প্রমাণ নয়।
দশকের পর দশক ধরে অবকাঠামো, আর কিছু পরিকল্পনা অসমাপ্ত
জাওজানের বর্তমান সরবরাহ কয়েক দশক ধরে গড়ে ওঠা অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, খাজা গোগেরদাকে প্রাকৃতিক গ্যাসের বাণিজ্যিক ব্যবহার শুরু হয় ১৯৬৭ সালে। এতে আরও বলা হয়েছে, ১৯৭৪ সালে নির্মিত ৮৯ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইনের মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলীয় সার ও বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং অন্যান্য গ্রাহকের কাছে গ্যাস সরবরাহ করা হয়।
নথিতে বলা হয়েছিল, প্রস্তাবিত মাজার বিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রয়োজনীয় গ্যাসচাপ সরবরাহে ওই পাইপলাইন সক্ষম নয়। শেবেরঘান থেকে মাজার পর্যন্ত ৯৪.৫ কিলোমিটার দীর্ঘ নতুন পাইপলাইন নির্মাণাধীন ছিল। এর ৪৫ কিলোমিটার নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছিল এবং ২০২০ সালের শেষ নাগাদ কাজ শেষ হওয়ার আশা করা হয়েছিল। এটি ছিল আগের পরিকল্পনার একটি সময়সীমা, পাইপলাইনটি সম্পন্ন হওয়ার নিশ্চয়তা নয়।
গ্যাস উত্তোলন, নিয়ন্ত্রণ ও বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ কীভাবে একসঙ্গে এগিয়েছে, তা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলকে দেখা যায়:
- ১৯৬৭: খাজা গোগেরদাকে প্রাকৃতিক গ্যাসের বাণিজ্যিক ব্যবহার শুরু হয়।
- ১৯৭৪: বিদ্যমান ৮৯ কিলোমিটার গ্যাস পাইপলাইন নির্মিত হয়।
- ২০০৯: আফগানিস্তান প্রথম হাইড্রোকার্বন আইন গ্রহণ করে।
- ২০১৩: এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ইয়াতিমতাকসহ শেবেরঘানের কূপ পুনর্বাসন এবং গ্যাস উন্নয়ন মহাপরিকল্পনা প্রণয়নে সহায়তা করে।
- অক্টোবর ২০১৬: বায়াত এনার্জি আফগান সরকারের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই করে।
- এপ্রিল ২০১৮: বায়াত প্রথম প্রকল্প পর্যায়ের অনুমোদন পায় এবং ৪০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি সই করে।
- সেপ্টেম্বর ২০১৮: হাইড্রোকার্বন আইনে সংশোধনী আনা হয়।
- মার্চ ২০১৯: সংশোধিত আইনের আওতায় একটি স্বাধীন তেল ও গ্যাস কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করে।
বায়াতের মূল উন্নয়ন পরিকল্পনায় তিনটি পর্যায়, আনুমানিক ২৫ কোটি ডলার বিনিয়োগ এবং শেষ পর্যন্ত ২০০ মেগাওয়াটের বেশি সক্ষমতার প্রস্তাব ছিল। প্রথম পর্যায় ২০১৯ সালে চালু হওয়ার কথা ছিল। প্রস্তাবিত টারবাইনের ৪১ মেগাওয়াট সক্ষমতা এবং চুক্তিবদ্ধ ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ক্রয়—দুটি ভিন্ন পরিমাপ। পরিকল্পনা থেকে তিনটি পর্যায়ই নির্মিত হয়েছে বা প্রস্তাবিত পূর্ণ সক্ষমতা বর্তমানে চালু রয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে আসা যায় না।
ঝুঁকির শ্রেণিবিভাগের চেয়ে পর্যবেক্ষণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ
বায়াতের মূল্যায়নে নিম্ন ও মাঝারি ঝুঁকির শ্রেণিবিভাগের পেছনে নির্দিষ্ট পরিদর্শনের পরিকল্পনা রয়েছে। নির্মাণকালে প্রতি তিন মাসে এবং কার্যক্রম চলাকালে বছরে একবার পরিবেশ, সামাজিক বিষয়, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিরীক্ষার কথা এতে রয়েছে। নির্মাণকালে সাপ্তাহিক এবং কার্যক্রম চলাকালে মাসিক বর্জ্যপানি পরিদর্শনের প্রস্তাব করা হয়েছিল; প্রয়োজন হলে মাটি ও পানির পরীক্ষা করার কথাও বলা হয়।
কার্যক্রম চলাকালে বায়ুতে নির্গমনের ক্ষেত্রে, কারখানার আশপাশে দূষক কীভাবে ছড়িয়ে পড়ে তা মডেল করার আহ্বান জানিয়েছে মূল্যায়নটি। এতে আশা করা হয়েছে, চিমনি থেকে নির্গমন নাইট্রোজেন অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড ও কণিকাযুক্ত পদার্থের জন্য আন্তর্জাতিক অর্থায়ন করপোরেশনের মান পূরণ করবে। এসব দূষক বায়ুর মানকে প্রভাবিত করতে পারে, তাই যন্ত্রপাতির নকশা অনুযায়ী প্রত্যাশার পাশাপাশি কার্যক্রম চলাকালের প্রকৃত পরিমাপও গুরুত্বপূর্ণ।
নথিতে কর্মীদের ঝুঁকির বিষয়টিও বিবেচনা করা হয়েছে। এতে নির্মাণকাজের শব্দ ১০ মিটার দূরত্বে ৮৩ থেকে ৮৭ ডেসিবেল হবে বলে অনুমান করে কাছাকাছি কর্মীদের জন্য শ্রবণ সুরক্ষা ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। আলাদাভাবে, আবাসিক এলাকার শব্দের নির্দেশক মান দিনে ৫৫ এবং রাতে ৪৫ ডেসিবেল উল্লেখ করা হয়েছে, যা এক ঘণ্টার গড় হিসেবে মাপা হয়। যন্ত্রপাতির কাছে নির্মাণকাজের শব্দের অনুমান কোনো গ্রামের শব্দমাত্রার পরিমাপের সমতুল্য নয়।
মূল্যায়নে অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থার কথাও বলা হয়েছে। ১৫ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে গ্রাম প্রতিনিধিদের নিয়ে স্থানীয় কমিটি গঠনের কথা ছিল; অমীমাংসিত অভিযোগ প্রাদেশিক কমিটিতে পাঠানোর ব্যবস্থাও ছিল। এসব বিবরণে বর্তমান কোনো নিরীক্ষার ফলাফল, নির্গমনের পরিমাপ বা অভিযোগের নিষ্পত্তি সম্পর্কে তথ্য নেই।
পানির চাপ, মজুরি ও স্থানীয় অভিজ্ঞতা
পরিবেশগত মূল্যায়নে প্রকল্প এলাকাটিকে বৃহত্তর পানিসংকটের মুখে থাকা একটি অঞ্চলে দেখানো হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ১৯৬০ সালের পর থেকে আফগানিস্তানের বার্ষিক গড় তাপমাত্রা ০.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে এবং ২০৬০ সাল নাগাদ আরও ১.৪ থেকে ৪ ডিগ্রি বৃদ্ধির পূর্বাভাস রয়েছে। উত্তর আফগানিস্তানে দীর্ঘ মেয়াদে গড় বৃষ্টিপাত কমার পাশাপাশি খরা ও বন্যার ঘনত্ব বাড়ার কথা এতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই পূর্বাভাস গ্যাস উত্তোলনের কারণে স্থানীয় পানিসংকট তৈরি হয়েছে—এমন প্রমাণ নয়। তবে দূষণের পাশাপাশি পানির ব্যবহার নিয়ে আরিয়ার উদ্বেগ কেন গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন, তা এগুলো ব্যাখ্যা করে। মূল্যায়নে প্রকল্প এলাকায় নুড়ি, বালি, পলি ও কাদার স্তর পর্যায়ক্রমে থাকার কথাও বলা হয়েছে। এতে বোঝা যায়, বাড়ি থেকে দূরত্বের ভিত্তিতে অনুমান না করে নির্দিষ্ট স্থানে মাটি ও পানি পরীক্ষা করা জরুরি।
শিল্পের আরেকটি দিক তুলে ধরেছেন কর্মীরা: আয় ও কর্মসংস্থান। ৪৫ বছর বয়সী মোহাম্মদ এক বছরের বেশি সময় ধরে গ্যাস খাতে কাজ করছেন। তাঁর ভাষ্য, প্রতিটি শিফটের আগে কর্মীরা যন্ত্রপাতি পরীক্ষা করেন এবং যন্ত্রপাতি, যানবাহন ও কূপ নিরবচ্ছিন্নভাবে চলার সময় তাঁদের সতর্ক থাকতে হয়। তিনি কূপগুলোকে পরিবারের জীবিকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বর্ণনা করেন:
আমাদের কাছে প্রতিটি কূপ শুধু একটি কূপ নয়; এটি একটি পরিবারের আশা।
৫০ বছর বয়সী আজিজ বলেন, খনন, পরিদর্শন, উত্তোলন, পরিবহন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজে অনেক কর্মী, কারিগরি বিশেষজ্ঞ ও প্রকৌশলী যুক্ত। তিনি আরও বিনিয়োগ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য বেশি কর্মসংস্থানের আহ্বান জানান। ইয়াতিমতাকে ৮৫০ কর্মী ও প্রকৌশলী কাজ করেন বলে যে তথ্য দেওয়া হয়েছে, তার সঙ্গে বায়াতের মূল্যায়নে নির্মাণকাজে প্রায় ৭০টি কর্মসংস্থানের অনুমান যোগ করা উচিত নয়। কারণ, এই সংখ্যাগুলো ভিন্ন সময়ের ভিন্ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত।
কাছাকাছি এলাকার বাসিন্দা কুরবান মুরাদ বলেন, গ্যাস দৈনন্দিন জ্বালানির চাহিদা মেটাতে সহায়তা করেছে এবং উত্তোলনের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো নির্দিষ্ট স্বাস্থ্য সমস্যা তিনি লক্ষ করেননি। ইয়াতিমতাকের বাসিন্দা রোজিও পরিবারের প্রয়োজন ও জীবিকার ক্ষেত্রে সুবিধার কথা বলেছেন। তাঁদের অভিজ্ঞতা প্রাসঙ্গিক, তবে ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ চিকিৎসাগত নজরদারি বা পরিবেশগত পরীক্ষার বিকল্প নয়।
তাৎক্ষণিক চিত্রটি তাই হলো—শিল্পে গ্যাস সরবরাহের তথ্য রয়েছে, কিন্তু সুরক্ষাব্যবস্থার বর্তমান ফলাফল প্রতিষ্ঠিত নয়। মনসুর নিয়মিত উৎপাদন ও কারিগরি তদারকির কথা জানিয়েছেন; আরিয়া এমন ঝুঁকি চিহ্নিত করেছেন, যেগুলোতে ধারাবাহিক মনোযোগ প্রয়োজন; আর বায়াতের মূল্যায়নে পর্যবেক্ষণ ও সংশোধনমূলক ব্যবস্থার বিস্তারিত রয়েছে। এসব বিবরণে নতুন কোনো শুনানি, পরিদর্শনের সময়সীমা বা বর্তমান পরিবেশগত ফলাফল প্রকাশের তারিখ ঘোষণা করা হয়নি।
মূল বিষয়গুলো
- জাওজানের চারটি গ্যাসক্ষেত্র থেকে দৈনিক প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার ঘনমিটার গ্যাস উৎপাদিত হয় বলে জানানো হয়েছে।
- মাজারের সার কোম্পানি দৈনিক প্রায় ৪ লাখ ঘনমিটার এবং বায়াত পাওয়ার প্রায় ২ লাখ ঘনমিটার গ্যাস পায়।
- আফগান গ্যাস এন্টারপ্রাইজের তথ্য অনুযায়ী, ইয়াতিমতাকে সাতটি সক্রিয় কূপ এবং প্রায় ৮৫০ জন প্রকৌশলী ও কর্মী রয়েছেন।
- সম্ভাব্য ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে পানি ও মাটিদূষণ, বায়ুতে নির্গমন, শব্দ, ভূমি অবনমন ও জীববৈচিত্র্য হ্রাস।
- বায়াতের মূল্যায়নে প্রকল্পের প্রভাব নিম্ন বা মাঝারি মাত্রার হবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে; তবে প্রশমন, পর্যবেক্ষণ ও নিরীক্ষার শর্ত রয়েছে।
- এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের আগের নথিতে সালফার শোধন ও পাইপলাইনের সক্ষমতাকে গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি সীমাবদ্ধতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
- কর্মী ও বাসিন্দারা অর্থনৈতিক সুফলের কথা বলেছেন, তবে বর্তমান পরিবেশগত পরিমাপ ও নিরীক্ষার ফলাফল প্রতিষ্ঠিত নয়।






