তরুণীদের প্রায় ১০ জনে ৩ জনের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছর হওয়ার আগে
আফগানিস্তানে বাল্যবিবাহ বন্ধে ২০২৬ সালের ১১ অক্টোবর নতুন করে আহ্বান জানিয়েছে ইউনিসেফ। জাতীয় এক জরিপের বরাতে সংস্থাটি জানায়, ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের ২৮.৭ শতাংশের প্রথম বিয়ে হয়েছে ১৮তম জন্মদিনের আগে। ৯.৬ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে। ওই বয়সী নারীদের মধ্যে সবচেয়ে দরিদ্রদের ৪৩.৬ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছরের আগে; সবচেয়ে ধনীদের মধ্যে এই হার ১৭.৫ শতাংশ।
সূচিপত্র
- তরুণীদের প্রায় ১০ জনে ৩ জনের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছর হওয়ার আগে
- জরিপে কী মাপা হয়েছে
- দারিদ্র্য ও বসবাসের স্থান ভিন্ন করে ঝুঁকি
- স্কুল বন্ধ থাকায় মেয়েদের সুযোগ সংকুচিত
- বাল্যপ্রসব স্বাস্থ্যের ওপর পরিমাপযোগ্য চাপ সৃষ্টি করে
- সমাজের ভেতরের চাপের কথা তুলে ধরেছেন নারীরা
- পরিবারকে সহায়তা প্রতিরোধের অংশ
- সুরক্ষায় নতুন করে আহ্বানের চেয়েও বেশি কিছু প্রয়োজন
- শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হলে শিক্ষক ও স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যাও কমে
- মূল বিষয়গুলো
আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস উপলক্ষে জানানো এই আহ্বানে বাল্যবিবাহ থেকে সুরক্ষার সঙ্গে ষষ্ঠ শ্রেণির পর মেয়েদের জন্য স্কুল পুনরায় খুলে দেওয়া, অর্থনৈতিক সংকটে থাকা পরিবারগুলোকে সহায়তা এবং স্বাস্থ্য ও সুরক্ষাসেবা দেওয়ার বিষয়গুলো যুক্ত করা হয়েছে। মাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষায় চলমান বিধিনিষেধ আফগানিস্তানের মেয়ে ও নারীদের জন্য থাকা সুযোগগুলো আরও সীমিত করে চলেছে—এমন এক সময়ে এ আহ্বান জানানো হলো।
আফগানিস্তানে ইউনিসেফের প্রতিনিধি তাজুদ্দিন ওয়াওয়ালে এ আহ্বানে মেয়েদের শৈশবের অধিকারকে গুরুত্ব দিয়েছেন:
প্রতিটি মেয়েরই শৈশব পাওয়ার অধিকার আছে। তার শেখার, বড় হওয়ার, নিরাপদ থাকার, নিজের দক্ষতা বিকাশের এবং নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার সুযোগ পাওয়ার অধিকার আছে।
জাতীয় এই পরিসংখ্যানের অর্থ এই নয় যে আফগানিস্তানের সব মেয়ের অর্ধেকের বিয়ে ১৮ বছরের আগে হয়। কিছু এলাকায় এই হার প্রতি দুজনের একজন পর্যন্ত—ইউনিসেফের সতর্কবার্তাটি ভৌগোলিক পার্থক্য বোঝায়। জরিপে বিভিন্ন বয়সী গোষ্ঠীর তথ্যও মাপা হয়েছে। জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিসংখ্যান বোঝার জন্য এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জরিপে কী মাপা হয়েছে
এই পরিসংখ্যান ২০২২ থেকে ২০২৩ সালের আফগানিস্তান মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভের (এমআইসিএস) ফল। ইউনিসেফ জাতীয় পরিসংখ্যান ও তথ্য কর্তৃপক্ষের সঙ্গে জরিপটি পরিচালনা করে এবং আফগানিস্তান পুনর্গঠন ট্রাস্ট ফান্ড এর অর্থায়ন করে। ইউনিসেফের জরিপের প্রকাশনা পৃষ্ঠাতে প্রকাশের তারিখ জুন ২০২৩ দেওয়া হয়েছে, আর প্রতিবেদনটিতে তারিখ হিসেবে উল্লেখ আছে মে ২০২৩।
এমআইসিএস হলো গৃহস্থালি জরিপের একটি কর্মসূচি, যার লক্ষ্য শিশু ও নারীদের বিষয়ে আন্তর্জাতিকভাবে তুলনাযোগ্য তথ্য তৈরি করা। আফগানিস্তানের জরিপে বিয়ের পাশাপাশি শিক্ষা, শিশুশ্রম, মাতৃস্বাস্থ্য, লিঙ্গসমতা ও কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্যও অন্তর্ভুক্ত। বাল্যবিবাহের সূচকে নারীদের ১৫ ও ১৮ বছর বয়সের আগে প্রথম বিয়ে হয়েছিল কি না, তা নথিবদ্ধ করা হয়েছে।
সারসংক্ষেপ প্রতিবেদনে জাতীয় পর্যায়ের দুটি পরিমাপ দেওয়া হয়েছে: ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে ২৮.৭ শতাংশ এবং ২০ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে ৩৮.৯ শতাংশ। দ্বিতীয় পরিমাপে বিয়ের ইতিহাসের অনেক বিস্তৃত পরিসর অন্তর্ভুক্ত। দুই হারের পার্থক্য ১০.২ শতাংশ পয়েন্ট। তবে এটি দুই জরিপ-সময়ের মধ্যে মাপা পরিবর্তন নয় এবং শিক্ষায় বিধিনিষেধের পর বিয়ের হার কোন দিকে গেছে, তা প্রমাণ করে না।
দারিদ্র্য ও বসবাসের স্থান ভিন্ন করে ঝুঁকি
২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে জরিপে দেখা গেছে, গ্রামাঞ্চলে ৩১.৯ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছরের আগে; শহরাঞ্চলে এই হার ২০.২ শতাংশ। ১৫ বছর হওয়ার আগে বিয়ে হয়েছে গ্রামাঞ্চলের ১০.৮ শতাংশ এবং শহরাঞ্চলের ৬.৬ শতাংশ নারীর। পরিবারের সম্পদগত পার্থক্য বিবেচনায় নেওয়ার আগেই এই পরিসংখ্যান ঝুঁকির অসম বণ্টন দেখায়।
সম্পদগত ব্যবধান আরও বড়। একই বয়সী নারীদের মধ্যে সবচেয়ে দরিদ্রদের ১৮ বছরের আগে বিয়ের হার সবচেয়ে ধনীদের তুলনায় প্রায় ২.৫ গুণ। জরিপে এই হার যথাক্রমে ৪৩.৬ ও ১৭.৫ শতাংশ। ১৫ বছরের আগে বিয়ে হয়েছে সবচেয়ে দরিদ্র নারীদের ১৯.৫ শতাংশের; সবচেয়ে ধনীদের মধ্যে এই হার ৩.৫ শতাংশ।
প্রাদেশিক সারণিতে অপেক্ষাকৃত কম বয়সী গোষ্ঠীর বদলে ২০ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারীদের তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। এই বিস্তৃত বয়সী গোষ্ঠীর মধ্যে হেলমান্দ ও হেরাতে ৫২.২ শতাংশের প্রথম বিয়ে হয়েছে ১৮ বছরের আগে; ফারিয়াবে এই হার ৫০.৫ শতাংশ। পাকতিয়ায় হার ১৭ শতাংশ এবং লোগারে ১৯.২ শতাংশ। এই প্রাদেশিক ফলাফল প্রতি দুজনের একজনের বিয়ের বিষয়ে সতর্কবার্তাটিকে নির্দিষ্ট করে, তবে এগুলোকে বর্তমানে ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়েদের পরিমাপ হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়।
প্রতিবেদনে উচ্চশিক্ষিত নারীদের মধ্যে বিয়ের হার কম বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। এই সম্পর্ক কোনো একটি নির্দিষ্ট কারণ প্রমাণ করে না: পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেলে বিয়ের ঝুঁকি বাড়তে পারে, আবার বিয়ের কারণে পড়াশোনায় ছেদও পড়তে পারে। শুধু স্কুলে পড়াকে সম্পূর্ণ সমাধান না ধরে, ইউনিসেফের উদ্যোগে দুই ঝুঁকিই মোকাবিলা করা হয়েছে।
স্কুল বন্ধ থাকায় মেয়েদের সুযোগ সংকুচিত
ষষ্ঠ শ্রেণির পর কিশোরীদের আবার স্কুলে ফেরার সুযোগ দিতে আফগানিস্তানের কার্যত কর্তৃপক্ষের কাছে আহ্বান জানিয়েছে ইউনিসেফ। ২০২১ সালের আগস্টে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর মাধ্যমিক শিক্ষায় বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে নারীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া নিষিদ্ধ করা হয়। আফগানিস্তানকে একমাত্র দেশ হিসেবে বর্ণনা করা হয়, যেখানে মেয়ে ও নারীদের মাধ্যমিক এবং উচ্চশিক্ষা—দুটিই নিষিদ্ধ।
কতজন মেয়ে স্কুলে যাওয়ার সুযোগ হারিয়েছে, সে বিষয়ে প্রতিবেদনগুলোর হিসাবে পার্থক্য রয়েছে। এক হিসাবে সংখ্যাটি প্রায় ২৫ লাখ। ২০২৬ সালের আগস্টে ইউনিসেফের নামে দেওয়া আরেক হিসাবে নিষেধাজ্ঞা শুরুর পর থেকে মাধ্যমিক শিক্ষাবঞ্চিত মেয়ের সংখ্যা ২৬ লাখের বেশি। এই পার্থক্য সময়ের ব্যবধান, সংখ্যার রাউন্ডিং, নাকি গণনার ভিন্ন পদ্ধতির কারণে—প্রতিবেদনগুলোতে তা স্পষ্ট করা হয়নি।
বিধিনিষেধ ও ধারাবাহিক সতর্কবার্তার ঘটনাপঞ্জি কয়েক বছরজুড়ে বিস্তৃত:
- জুলাই ২০১৮: ইউনিসেফ ও আফগান সরকারের একটি মন্ত্রণালয় বাল্যবিবাহ সম্পর্কে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে গবেষণা প্রকাশ করে।
- আগস্ট ২০২১: তালেবান ক্ষমতায় ফেরে; এরপর মেয়েদের মাধ্যমিক শিক্ষায় বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।
- ১২ নভেম্বর ২০২১: দারিদ্র্য ও স্কুল বন্ধ থাকায় বাল্যবিবাহের ঝুঁকি বাড়ছে বলে সতর্ক করে ইউনিসেফ।
- ডিসেম্বর ২০২২: নারীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া নিষিদ্ধ করা হয়।
- ২০২২ থেকে ২০২৩: বর্তমান বিয়েসংক্রান্ত পরিসংখ্যানের ভিত্তি গৃহস্থালি তথ্য এমআইসিএস জরিপে সংগ্রহ করা হয়।
- ১১ অক্টোবর ২০২৬: বাল্যবিবাহ বন্ধ এবং ষষ্ঠ শ্রেণির পর স্কুল পুনরায় খোলার আহ্বান জানায় ইউনিসেফ।
স্কুলে যেতে না পারায় শেখার সুযোগ এবং সামাজিক যোগাযোগ বজায় রাখা ও সহায়তা পাওয়ার একটি পরিসর—দুটিই হারায় মেয়েরা। ইউনিসেফ বলেছে, মেয়েদের স্কুলে রাখা তাদের অধিকার সুরক্ষার সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলোর একটি। তবে সংস্থাটি জোর দিয়ে বলেছে, শুধু শিক্ষা দিয়ে বাল্যবিবাহ বন্ধ করা যাবে না।
বাল্যপ্রসব স্বাস্থ্যের ওপর পরিমাপযোগ্য চাপ সৃষ্টি করে
ইউনিসেফ সতর্ক করেছে, বাল্যবিবাহ সহিংসতা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার ঝুঁকি বাড়ায় এবং অল্প বয়সে গর্ভধারণ ও সন্তান জন্মদানের ঝুঁকিও বাড়িয়ে তোলে। সংস্থাটির ভাষ্য, ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী আফগান মেয়েদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ গর্ভাবস্থাসংশ্লিষ্ট মৃত্যু। এই বয়সী গোষ্ঠীর মৃত্যুর সংখ্যা বা মৃত্যুহার অবশ্য আহ্বানপত্রে দেওয়া হয়নি।
এমআইসিএস প্রতিবেদনে কিশোরীদের সন্তান জন্মদানের আলাদা একটি পরিমাপ দেওয়া হয়েছে: জাতীয়ভাবে ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী প্রতি ১,০০০ নারীর মধ্যে ৬২টি জন্ম; জরিপের আগের তিন বছরের হিসাব এটি। এটি জন্মহার, মা হয়ে যাওয়া মেয়েদের শতকরা হার নয়। আর বাল্যবিবাহের পর কতটি শিশুর জন্ম হয়েছে, সেটিও এই পরিমাপে বোঝা যায় না।
প্রদেশভেদে পার্থক্য উল্লেখযোগ্য। ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী প্রতি ১,০০০ নারীর মধ্যে নিমরোজে ১২৮টি জন্ম হয়েছে, যা পাকতিয়ার ১৬টির হারের আট গুণ। বাদগিসে এই হার ১২৫, হেলমান্দে ১১৫ এবং ফারাহে ১১৩। সবচেয়ে দরিদ্র নারীদের মধ্যে হার ৮৮, আর সবচেয়ে ধনীদের মধ্যে ৪২। শিক্ষার ভিত্তিতে কোনো শিক্ষা নেই এমন নারীদের মধ্যে হার ৮২ এবং উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা নেওয়া নারীদের মধ্যে ২০।
জরিপে আরও দেখা গেছে, ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী নারীদের ০.৮ শতাংশের ১৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই জীবিত সন্তান জন্ম দেওয়ার অভিজ্ঞতা হয়েছে। এই পরিমাপগুলো দেখায়, কেন ইউনিসেফের পরিকল্পনায় বিয়ের ঝুঁকিতে থাকা মেয়েদের পাশাপাশি কিশোরী মায়েদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ভবিষ্যতে বিয়ে ঠেকানোই যথেষ্ট নয়; যারা ইতিমধ্যে গর্ভাবস্থা, সন্তান লালন-পালন বা পড়াশোনায় ছেদ পড়ার মুখে, তাদের তাৎক্ষণিক প্রয়োজনও মেটাতে হবে।
সমাজের ভেতরের চাপের কথা তুলে ধরেছেন নারীরা
বিষ্ণাও-ওয়াওরার গবেষণায় পরিবার ও সমাজের চাপের এমন বিবরণ উঠে এসেছে, যা জাতীয় বিয়ের পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না। ২০২৩ সালের আগস্টে সংগঠনটি ২৩টি প্রদেশের ৩,৮৪০ নারীর সাক্ষাৎকার নেয়। তথ্য সংগ্রহে সরাসরি কথোপকথন, ভিডিও কল ও দলীয় আলোচনা ব্যবহার করা হয়। জোরপূর্বক বিয়ে নিয়ে প্রশ্নের উত্তর দেওয়া ৩,০০০-এর বেশি উত্তরদাতার ৭০ শতাংশ বলেছেন, ১৮ বছরের আগে জোর করে বিয়ে দেওয়া মেয়েদের কথা তারা জানেন।
এই ফলাফলে জোর করে বিয়ে দেওয়া আফগান মেয়েদের অনুপাত নয়, বরং এ ধরনের ঘটনা সম্পর্কে উত্তরদাতাদের জানাশোনার মাত্রা পরিমাপ করা হয়েছে। একাধিক উত্তরদাতা একই ব্যক্তিকে চিনতে পারেন; তাই এই গবেষণাকে জাতীয় পর্যায়ে বাল্যবিবাহের ব্যাপকতার হিসাব হিসেবে দেখা উচিত নয়। তবে এতে ১১ ও ১২ বছর বয়সী মেয়েদের বিয়ে এবং পরিবারের ওপর থাকা চাপের উদ্বেগ নথিবদ্ধ হয়েছে।
বিষ্ণাও-ওয়াওরার সদস্য সংগঠন অর্গানাইজেশন ফর পলিসি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের পরিচালক মারিয়াম সাফি শিক্ষা ও কাজে বিধিনিষেধের প্রভাব বর্ণনা করেছেন:
তালেবান অধিকাংশ খাতে তরুণীদের কাজ করা, পড়াশোনা করা এবং একা শহরে চলাফেরা নিষিদ্ধ করেছে। ফলে অনেক পরিবার আবারও দ্রুত মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার চাপ ও তাগিদ অনুভব করছে। এ কারণেই আমরা দেখছি, মেয়েদের ক্রমেই কম বয়সে, ১১ ও ১২ বছর বয়সেই বিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
গবেষণার ফলাফলে সামাজিক রীতি ও ব্যক্তিগত পছন্দের পার্থক্যও তুলে ধরা হয়েছে। উত্তরদাতাদের ১৫ শতাংশ বলেছেন, তাদের সমাজে কনের বয়স ১৫ বছরের কম। অন্যদিকে, ৭০ শতাংশের বেশি মনে করেন বিয়ের উপযুক্ত বয়স ১৮ থেকে ২৫ বছর। এই উত্তরগুলো থেকে বোঝা যায়, নীতিগতভাবে দেরিতে বিয়ে মেনে নিলেই বাস্তবে মেয়েরা চাপ থেকে সুরক্ষিত থাকে না।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আফগান আইনে নারীদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৬ বছর। এটি ইউনিসেফের পরিসংখ্যানগত সংজ্ঞা থেকে আলাদা, যেখানে ১৮ বছরের আগে বিয়েকে বাল্যবিবাহ হিসেবে গণ্য করা হয়। কার্যত কর্তৃপক্ষের অধীনে বিয়ের বয়সসংক্রান্ত নিয়ম কীভাবে প্রয়োগ বা কার্যকর করা হচ্ছে, বর্তমান আহ্বানে তা স্পষ্ট করা হয়নি।
বিষ্ণাও-ওয়াওরার ১৮টি প্রদেশে করা পৃথক এক জরিপে দেখা গেছে, ২,০০০-এর বেশি উত্তরদাতার ৬৭ শতাংশ এমন মেয়েদের চেনেন, যারা বিশেষ করে বিষণ্নতা ও উদ্বেগসহ মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছে। আরও ১৬৪ জন উত্তরদাতা বলেছেন, আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন এমন একজন নারীকে তারা চেনেন। এগুলো পরিচিত ঘটনার বিবরণ; ক্লিনিক্যাল মূল্যায়ন বা জাতীয় আত্মহত্যার হার নয়। আর এসব মানসিক কষ্টের কতটা বিশেষভাবে বিয়ের কারণে, তা-ও এতে প্রমাণ হয় না।
আফগানিস্তানের সাবেক সংসদ সদস্য ও নারী অধিকারকর্মী ফাওজিয়া কুফি শিক্ষাকে আশার শেষ ভরসাগুলোর একটি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, বিদেশ থেকে তিনি ১৪ থেকে ১৮ বছর বয়সী ২০০ মেয়ের জন্য একটি গোপন শিক্ষাকেন্দ্র পরিচালনা করেছেন। কেন্দ্রটির শিক্ষার্থীদের কোনো ডিপ্লোমা নেই এবং সম্পদেরও অভাব রয়েছে। এমন উদ্যোগ শেখার সুযোগ ধরে রাখার প্রচেষ্টা দেখায়, তবে আনুষ্ঠানিক শিক্ষা ও স্বীকৃত যোগ্যতার সুযোগের বিকল্প নয়।
পরিবারকে সহায়তা প্রতিরোধের অংশ
ইউনিসেফের আহ্বানে অর্থনৈতিক সংকটকে প্রতিরোধের কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে দেখা হয়েছে। দারিদ্র্য মোকাবিলার উপায় হিসেবে যেন পরিবারগুলো বাল্যবিবাহের আশ্রয় না নেয়, সে জন্য সহায়তা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। জরিপে সম্পদভেদে যে ব্যবধান দেখা গেছে, তা ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে লক্ষ্য করে সহায়তা দেওয়ার পক্ষে যায়; তবে এর অর্থ এই নয় যে প্রতিটি বাল্যবিবাহের পেছনে অর্থই কারণ।
ক্ষুধা ও বিয়ের চাপের যোগসূত্র ইউনিসেফের ২০২১ সালের নভেম্বরের বিবৃতিতেও স্পষ্টভাবে উঠে এসেছিল। তৎকালীন ইউনিসেফ নির্বাহী পরিচালক হেনরিয়েটা ফোর বলেন, অংশীদাররা ২০১৮ ও ২০১৯ সালে হেরাত ও বাঘদিসে ১৮৩টি বাল্যবিবাহ এবং শিশু বিক্রির ১০টি ঘটনা নথিবদ্ধ করেছিলেন। সংশ্লিষ্ট শিশুদের বয়স ছিল ছয় মাস থেকে ১৭ বছরের মধ্যে।
ফোর ভবিষ্যতে বিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থায় থাকা শিশুকন্যাদের বিষয়ে পাওয়া খবরের কথাও বলেন। এসব খবরে শিশুদের বড় হলে বিয়ের জন্য দেওয়ার কথা ছিল; এর অর্থ এই নয় যে শিশুরা তখনই বিবাহিত জীবন শুরু করেছিল। তিনি বলেন:
বিশ্বাসযোগ্য সূত্রে আমরা জানতে পেরেছি, যৌতুকের বিনিময়ে পরিবারগুলো ২০ দিন বয়সী শিশুকন্যাদেরও ভবিষ্যতে বিয়ে দেওয়ার জন্য প্রস্তাব দিচ্ছে।
সে সময় ইউনিসেফ জানায়, ক্ষুধা, শিশুশ্রম ও বাল্যবিবাহের ঝুঁকি কমাতে তারা নগদ সহায়তা শুরু করেছে। অল্পবয়সী মেয়েদের বিয়ের চুক্তিতে ধর্মীয় নেতাদের সম্পৃক্ততা ঠেকাতে তাদের সঙ্গে কাজেরও পরিকল্পনা ছিল। এসব ব্যবস্থায় প্রক্রিয়ার ভিন্ন ভিন্ন দিক মোকাবিলা করা হয়: পরিবারের আর্থিক চাপ এবং বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার ক্ষেত্রে সমাজের অংশগ্রহণ।
সুরক্ষায় নতুন করে আহ্বানের চেয়েও বেশি কিছু প্রয়োজন
২০২৬ সালের আহ্বান নতুন করে আবিষ্কৃত কোনো রীতির কথা নয়; বরং বহু বছরের উদ্বেগের ধারাবাহিকতা। ইউনিসেফ ও তৎকালীন শ্রম, সামাজিক বিষয়, শহীদ এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবিষয়ক মন্ত্রণালয় ২০১৮ সালের জুলাইয়ে ‘চেঞ্জিং দ্য ন্যারেটিভ’ প্রকাশ করে। বাল্যবিবাহ ঠেকানো বা এর ক্ষতি কমানোর কর্মসূচির নির্দেশনা দিতে প্রতিবেদনটিতে সমাজের জ্ঞান, দৃষ্টিভঙ্গি ও চর্চা পর্যালোচনা করা হয়।
২০২১ সালের নভেম্বরে নারীর প্রতি বৈষম্য বিলোপ কমিটিও উদ্বেগ জানায়। নারীর অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদ বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ করে এই কমিটি। এর চেয়ারপারসন গ্ল্যাডিস আকোস্তা ভার্গাস বলেন, কমিটি আফগানিস্তানের নারী ও মেয়েদের বিষয়ে একটি ব্যতিক্রমী প্রতিবেদন চেয়েছে এবং পরিবর্তিত রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির প্রভাব বিবেচনায় একটি অনানুষ্ঠানিক টাস্কফোর্স গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে।
এই বিভিন্ন সময়ের পরিসংখ্যান ব্যবহারে সতর্কতা প্রয়োজন। ২০২১ সালের বিবৃতিতে ইউনিসেফ অনুমান করেছিল, ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারীদের ২৮ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছরের আগে। পরবর্তী এমআইসিএস জরিপে ২৮.৭ শতাংশের হারটি ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের, আর ৩৮.৯ শতাংশের হারটি ২০ থেকে ৪৯ বছর বয়সীদের। বয়সী গোষ্ঠী ও পরিমাপের সময় আলাদা হওয়ায় এই সংখ্যা দিয়ে সরলভাবে বৃদ্ধির হিসাব করা যায় না।
শিক্ষায় নিষেধাজ্ঞার পর বাল্যবিবাহ বেড়েছে বলে যেসব প্রতিবেদন রয়েছে, সেগুলো গুরুতর। তবে শুধু এমআইসিএসের ফল দিয়ে সেই বৃদ্ধি পরিমাপ করা যায় না। সাম্প্রতিক প্রবণতা নির্ধারণে সময়ের ব্যবধানে তুলনাযোগ্য পরিমাপ প্রয়োজন। এই পার্থক্য নথিবদ্ধ সমস্যার গুরুত্ব কমায় না; বরং জরিপে যা মাপা হয়েছে, তা সমাজের অভিজ্ঞতার বিবরণ থেকে আলাদা করে।
ইউনিসেফ জানিয়েছে, কিশোরী মায়েদের পাশাপাশি তাদের সঙ্গে ও অংশীদারদের নিয়ে কাজ চালিয়ে যাবে, যাতে শিক্ষা, জীবনদক্ষতা, স্বাস্থ্যসেবা ও সুরক্ষাসেবা দেওয়া যায়। আহ্বানে কোনো কর্মসূচির বাজেট, কতজন মেয়েকে সহায়তা করা হবে—এমন সংখ্যা বা স্কুল খোলার সময়সীমা ঘোষণা করা হয়নি। পরিবার, ধর্মীয় নেতা, সেবাদাতা ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হলে শিক্ষক ও স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যাও কমে
বিধিনিষেধের কারণে জরুরি সেবায় কাজ করা নারীদের ভবিষ্যৎ সরবরাহও হুমকির মুখে পড়েছে। ২০২৬ সালের এপ্রিলে ইউনিসেফের নামে দেওয়া পূর্বাভাসে সতর্ক করা হয়, মেয়েদের শিক্ষা ও নারীদের কর্মসংস্থানে বিধিনিষেধ অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে আফগানিস্তানে সর্বোচ্চ ২০,০০০ নারী শিক্ষক এবং ৫,৪০০ নারী স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি হতে পারে। অর্থনৈতিক উৎপাদন বছরে আনুমানিক ৮৪ মিলিয়ন ডলার কমতে পারে।
কর্মীসংক্রান্ত এই পরিসংখ্যান পূর্বাভাস; আজকের নিশ্চিত শূন্যপদের হিসাব নয়। বাল্যবিবাহের সঙ্গে এর ব্যবহারিক যোগসূত্র রয়েছে: মেয়েদের শিক্ষা সীমিত হলে শিক্ষক ও স্বাস্থ্যকর্মী হওয়ার মতো নারীর সংখ্যা কমে, অথচ ইউনিসেফের প্রতিরোধ পরিকল্পনা একই সেবাগুলোতে প্রবেশাধিকারের ওপর নির্ভর করে। মেয়েদের এখনই সুরক্ষা প্রয়োজন, তবে সেবা বজায় রাখতে পেশাগত প্রশিক্ষণের পথও খোলা রাখতে হবে।
গত ২৫ বছরে শিক্ষা, আইনি সংস্কার ও সামাজিক সুরক্ষায় বিনিয়োগের ফলে বিশ্বজুড়ে আনুমানিক ৬৮ মিলিয়ন বাল্যবিবাহ ঠেকানো গেছে বলে উল্লেখ করেছে ইউনিসেফ। এই বৈশ্বিক হিসাব প্রতিরোধের পক্ষে সংস্থাটির যুক্তি তুলে ধরে; আফগানিস্তানে কোনো একটি পদক্ষেপে কতটা অগ্রগতি হবে, তার পূর্বাভাস এটি নয়।
শিক্ষায় বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার কোনো তারিখ বা ২০২৬ সালের অক্টোবরের আহ্বানে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ার কথা উল্লেখ নেই। প্রতিবেদনে পরবর্তী তারিখযুক্ত মানদণ্ডটি ২০৩০ সালের কর্মীসংক্রান্ত পূর্বাভাস, কোনো প্রতিশ্রুত নীতিগত পরিবর্তন নয়। বর্তমানে স্কুলে যেতে না পারা বা ইতিমধ্যে বিবাহিত মেয়েদের জন্য তাৎক্ষণিক প্রশ্ন হলো—শিক্ষা, আর্থিক সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা ও সুরক্ষা বাস্তবে সহজলভ্য হবে কি না।
মূল বিষয়গুলো
- ২০২৬ সালের ১১ অক্টোবর বাল্যবিবাহ বন্ধে নতুন করে আহ্বান জানায় ইউনিসেফ এবং ষষ্ঠ শ্রেণির পর স্কুল পুনরায় খোলার অনুরোধ করে।
- এমআইসিএসের হিসাবে, ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের ২৮.৭ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছরের আগে এবং ৯.৬ শতাংশের ১৫ বছরের আগে।
- ওই বয়সী গোষ্ঠীর মধ্যে সবচেয়ে দরিদ্র নারীদের ৪৩.৬ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছরের আগে; সবচেয়ে ধনীদের মধ্যে এই হার ১৭.৫ শতাংশ।
- প্রদেশে ৫০ শতাংশের বেশি বিয়ের যে পরিসংখ্যান, তা ২০ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারীদের; বর্তমানে ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়েদের নয়।
- ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী প্রতি ১,০০০ নারীর মধ্যে জন্মহার ছিল ৬২; পাকতিয়ায় ১৬ থেকে নিমরোজে ১২৮ পর্যন্ত এই হার ওঠানামা করেছে।
- শিক্ষা থেকে বঞ্চিত মেয়েদের সংখ্যা প্রায় ২৫ লাখ বা ২৬ লাখের বেশি বলে প্রতিবেদন রয়েছে; পার্থক্যের ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
- ঝুঁকিতে থাকা মেয়েদের ও কিশোরী মায়েদের জন্য পরিবারকে সহায়তা এবং সেবা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ইউনিসেফ; স্কুল খোলার কোনো সময়সীমা ঘোষণা করা হয়নি।






