দুটি পথ বন্ধ হওয়ায় আফগানিস্তানের ক্ষুধা সংকট আরও গভীর
আফগানিস্তানের সরবরাহ সংকট আটকে থাকা কনটেইনার থেকে গড়িয়েছে পুষ্টিকেন্দ্রগুলোতে খাবার ফুরিয়ে যাওয়ার পর্যায়ে। ২০২৬ সালের ৪ জুন বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক কার্ল স্কাউ বলেন, মূল্যবৃদ্ধি, সরবরাহে বিঘ্ন ও তহবিল কমে যাওয়ায় খাবারের নাগাল কমেছে এবং আফগানিস্তানে আরও ২৩ লাখ মানুষ তীব্র ক্ষুধার মুখে পড়েছে।
সূচিপত্র
- দুটি পথ বন্ধ হওয়ায় আফগানিস্তানের ক্ষুধা সংকট আরও গভীর
- পাকিস্তানের পথ বন্ধ হয়ে যেভাবে ইরানের ওপর নির্ভরতা তৈরি হলো
- সরবরাহ ভেঙে পড়ার পেছনের তারিখগুলো
- পুষ্টির চাহিদা রেকর্ড পর্যায়ে, ক্লিনিকগুলোতে খাবার নেই
- এক চালান বিস্কুটের একাধিক দেশ পেরিয়ে আসার যাত্রা
- ব্যবসায়ীদের পরিবহন ব্যয় কয়েক গুণ বেড়েছে
- মধ্য এশিয়ার পথে বাণিজ্য চলছে, তবে অসমভাবে
- তহবিল কমা ও পরিবারগুলোর ফিরে আসায় চাপ বাড়ছে
- যুদ্ধবিরতিতেও নির্ভরযোগ্য সরবরাহ ফিরেনি
- মূল বিষয়গুলো
স্থলবেষ্টিত দেশটি পরপর দুটি প্রধান বাণিজ্যপথে নির্ভরযোগ্য প্রবেশাধিকার হারিয়েছে। পাকিস্তানের সঙ্গে সীমান্তে লড়াইয়ের কারণে ২০২৫ সালের অক্টোবরে সীমান্ত পারাপারের পথগুলো বন্ধ হয়ে যায়। এতে আফগানিস্তানের জন্য পাঠানো হাজার হাজার কনটেইনার পাকিস্তানে আটকে পড়ে এবং করাচি বন্দরে প্রবেশাধিকার সীমিত হয়। ব্যবসায়ী ও ত্রাণ সংস্থাগুলো চালান ইরানের বন্দর আব্বাস বন্দরের দিকে সরিয়ে নেয়, কিন্তু যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালিতে বিধিনিষেধ সেই বিকল্প পথেও বিঘ্ন ঘটায়।
জাতিসংঘের ৪ জুনের ব্রিফিংয়ে চলমান অনিশ্চয়তার মধ্যে শত শত জাহাজ ও কয়েক হাজার নাবিক আটকে থাকার কথা বলা হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতিতে তাৎক্ষণিক সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধির আশঙ্কা কমেছে, তবে বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ ও পরিবহনব্যবস্থায় বিঘ্ন উপসাগরীয় অঞ্চল ছাড়িয়ে বহু দূর পর্যন্ত সরবরাহে প্রভাব ফেলছে।
আফগানিস্তানে এর প্রভাব বিশেষভাবে গুরুতর, কারণ এই বিঘ্ন এমন এক ত্রাণ কার্যক্রমে আঘাত হেনেছে, যেখানে আগে থেকেই অর্থের ঘাটতি রয়েছে। ডব্লিউএফপি বলছে, তারা বর্তমানে প্রতি মাসে ২০ লাখ মানুষকে সহায়তা করতে পারছে; গত শীতে এই সংখ্যা ছিল ৪০ লাখ। পরিবহন ব্যয় বাড়ায় একই বাজেটে কম সহায়তা দেওয়া যাচ্ছে, আর পণ্যবাহী চালান দেরি হওয়ায় ঝুঁকিতে থাকা মা ও শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবার পাচ্ছে না ক্লিনিকগুলো।
তাই এই সংকট শুধু জাহাজ পরিবহনের সক্ষমতার ঘাটতি নয়। বাণিজ্যিক পণ্য, খাদ্যসহায়তা এবং বিশেষ পুষ্টি উপকরণ—সবই একাধিক বাধার মুখে পড়েছে। একটি পথ খুলে গেলেও তাতে তহবিলের ঘাটতি মিটবে না; সর্বশেষ যুদ্ধ শুরুর আগেই এই ঘাটতি সহায়তা সীমিত করছিল।
পাকিস্তানের পথ বন্ধ হয়ে যেভাবে ইরানের ওপর নির্ভরতা তৈরি হলো
আগে ডব্লিউএফপির আফগানিস্তানমুখী চালানের বেশির ভাগই পাকিস্তান দিয়ে যেত। সমুদ্রপথে আসা পণ্য পাওয়ার সুযোগও দিত দেশটির বন্দরগুলো। ২০২৫ সালের অক্টোবরে লড়াইয়ের কারণে গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত পারাপারের পথ বন্ধ হলে, ত্রাণ সংস্থা ও ব্যবসায়ী—উভয়কেই প্রতিষ্ঠিত ওই পথের বিকল্প খুঁজতে হয়।
অক্টোবরের সীমান্ত বন্ধ তোরখাম ও চামানের পাশাপাশি খারলাচি, আঙ্গুর আদ্দা ও ঘুলাম খানের মতো ছোট সীমান্ত পারাপারের পথগুলোতেও প্রভাব ফেলে। সীমান্তে প্রাণঘাতী পাল্টাপাল্টি হামলার পর এ বিঘ্ন ঘটে। হতাহতের সংখ্যা ও দায় নিয়ে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী এবং তালেবান কর্তৃপক্ষ পরস্পরবিরোধী দাবি করে।
কাবুলে বিমান হামলার ঘটনায় সম্পর্কের আরও অবনতি ঘটে; ২০২৬ সালের ১ মার্চ প্রকাশিত প্রতিবেদনে হামলার কথা বলা হয়। পাকিস্তান কান্দাহার ও পাকতিয়াতেও লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়, আর তালেবান কর্তৃপক্ষ পাকিস্তানের ভেতরে পাল্টা ড্রোন হামলার দাবি করে। উত্তেজনা বৃদ্ধির ফলে বাণিজ্যপথ পুনরায় চালু করা পরিবহন সমস্যার পাশাপাশি রাজনৈতিক ও নিরাপত্তার বিষয়েও পরিণত হয়।
প্রথমে বিকল্প পথ হিসেবে ইরান কাজে আসে। চালান দুবাই ও বন্দর আব্বাস হয়ে আফগানিস্তানে যেতে পারত। কিন্তু বন্দর আব্বাস হরমুজ প্রণালির তীরে অবস্থিত হওয়ায় ২৮ ফেব্রুয়ারি তীব্র হওয়া আঞ্চলিক সংঘাতে বিকল্প পথটিও ঝুঁকির মুখে পড়ে।
এর ফলে যাত্রার বিভিন্ন পর্যায়ে পণ্য আটকে পড়ে: পাকিস্তান থেকে পার হওয়ার অপেক্ষায় থাকা কনটেইনার, হরমুজ পার হতে না পারা জাহাজের পণ্য এবং বারবার অন্য দেশের মধ্য দিয়ে ঘুরিয়ে পাঠানো ত্রাণসামগ্রী। মধ্য এশিয়া হয়ে উত্তর দিকের পথগুলো এখনো ব্যবহৃত হচ্ছে, তবে বিঘ্নিত পথগুলোর আগের গতি বা কম খরচ ফিরিয়ে আনতে পারেনি।
সরবরাহ ভেঙে পড়ার পেছনের তারিখগুলো
সাম্প্রতিক নৌপরিবহন সংকটের সঙ্গে ঘাটতি শুরু হয়নি। তহবিল কমে যাওয়ায় পুষ্টিসহায়তা আগেই সীমিত হয়েছিল; এরপর সীমান্ত ও সমুদ্রপথে বিঘ্ন সেই সক্ষমতা আরও কমিয়ে দেয়।
- মে ২০২৫: তহবিলের অভাবে অপুষ্টি প্রতিরোধে ব্যবহৃত বিশেষ খাবার বিতরণ পুরোপুরি বন্ধ করে দেয় ডব্লিউএফপি।
- অক্টোবর ২০২৫: পাকিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত বন্ধ হওয়ায় প্রতিষ্ঠিত বাণিজ্য ও মানবিক সহায়তার সরবরাহপথে বিঘ্ন ঘটে।
- ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬: আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়তে শুরু করে; এরপর হরমুজ প্রণালির আশপাশে গুরুতর বিঘ্ন দেখা দেয়।
- এপ্রিল ২০২৬-এর মাঝামাঝি: আফগানিস্তানে ডব্লিউএফপির কার্যক্রমের জন্য জরুরি পুষ্টি উপকরণ ফুরিয়ে যায়।
- ১৫ মে ২০২৬: ডব্লিউএফপির হিসাব, পরিবহনে দেরি ও ব্যয়বৃদ্ধির কারণে অপুষ্টির ঝুঁকিতে থাকা আরও প্রায় ১০ লাখ শিশুকে সহায়তা করা সম্ভব হয়নি।
- ৪ জুন ২০২৬: স্কাউ বলেন, আফগানিস্তানে আরও ২৩ লাখ মানুষ তীব্র ক্ষুধার মুখে পড়েছে।
এই পরিসংখ্যানগুলো ভিন্ন ভিন্ন সমস্যা মাপে। ডব্লিউএফপি যেসব শিশুর কাছে অন্যথায় পৌঁছাতে পারত, তারা সদ্য তীব্র ক্ষুধার মুখে পড়া মানুষের একই শ্রেণির নয়। মূল্যায়নের সময়কাল এবং গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে মিল আছে কি না, তা না জেনে কোনো সংখ্যাই আগের জাতীয় খাদ্য অনিরাপত্তার পূর্বাভাসের সঙ্গে যোগ করা উচিত নয়।
পুষ্টির চাহিদা রেকর্ড পর্যায়ে, ক্লিনিকগুলোতে খাবার নেই
ডব্লিউএফপির আফগানিস্তান জরুরি পরিস্থিতি মূল্যায়নে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ, অর্থাৎ ১ কোটি ৩৮ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য অনিরাপত্তার মুখে পড়বে। এর অর্থ, পর্যাপ্ত খাবার পাওয়ার সুযোগ এতটাই হুমকির মুখে যে জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন।
সংস্থাটি ধারণা করছে, ২০২৬ সালে ৪৯ লাখ নারী ও শিশুর অপুষ্টির চিকিৎসা প্রয়োজন হবে। এর মধ্যে রয়েছে ৩৭ লাখ শিশু এবং ১২ লাখ গর্ভবতী বা স্তন্যদানকারী নারী। ১২টি প্রদেশে শিশুদের তীব্র অপুষ্টি সংকটজনক পর্যায়ে রয়েছে, যা ডব্লিউএফপির নথিভুক্ত সর্বোচ্চ সংখ্যা।
ডব্লিউএফপি ইউনিসেফের সঙ্গে অংশীদারত্বে ক্লিনিকে পাঁচ বছরের কম বয়সী অপুষ্টিতে ভোগা শিশু এবং গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী মায়েদের চিকিৎসা দেয়। তাদের প্রতিরোধমূলক খাদ্য বিতরণের উদ্দেশ্য আলাদা: চিকিৎসার প্রয়োজন হওয়ার আগেই ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোকে অপুষ্টি ও শিশুর খর্বাকৃতি হয়ে যাওয়া এড়াতে সহায়তা করা। তাই ২০২৫ সালের মে মাসে প্রতিরোধমূলক খাদ্য বিতরণ বন্ধ হওয়ার ঘটনাকে ২০২৬ সালের এপ্রিলে জরুরি পুষ্টি উপকরণ ফুরিয়ে যাওয়ার খবর থেকে আলাদা করে দেখা উচিত।
আফগানিস্তানে ডব্লিউএফপির কান্ট্রি ডিরেক্টর জন আয়লিফ ক্লিনিকে আসা মানুষের কাছে এই ঘাটতির অর্থ কী, তা বর্ণনা করেন:
অপুষ্টি যখন প্রায় রেকর্ড পর্যায়ে, তখন দুর্বল ও দিশেহারা মা ও শিশুদের স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে, কারণ তাদের দেওয়ার মতো কোনো খাবার আমাদের নেই,
জালালাবাদের কাছের একটি গ্রামীণ ক্লিনিক পরিদর্শনের পর স্কাউ বলেন, পুষ্টি উপকরণ ফুরিয়ে যাওয়ায় শত শত মা দৃশ্যত অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের কোলে নিয়ে সেখান থেকে ফিরে যাচ্ছেন। ৪ জুনের ব্রিফিংয়ে ডব্লিউএফপির ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক হিসেবে তিনি বলেন:
এ রকম কিছু আমি কখনো দেখিনি। ওই ক্লিনিকের মানুষের অসহায়ত্ব ভাষায় বর্ণনা করা কঠিন।
ডব্লিউএফপি সতর্ক করেছে, হাজার হাজার মা ও শিশুকে চিকিৎসা ও পুষ্টিকেন্দ্র থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এর ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে সম্পদের ঘাটতি এবং প্রয়োজনীয় জায়গায় সরবরাহ পৌঁছাতে না পারা—উভয় কারণেই।
এক চালান বিস্কুটের একাধিক দেশ পেরিয়ে আসার যাত্রা
ফর্টিফায়েড বিস্কুটের একটি চালান দেখায়, বারবার পথ বদলালে একটি পণ্য পৌঁছাতে কয়েক মাস লেগে যেতে পারে। চালানটি ইন্দোনেশিয়া থেকে রওনা হয়ে প্রথমে পাকিস্তানে পৌঁছায়। সীমান্ত বন্ধ হওয়ার পর সেটিকে দুবাই হয়ে পাঠানো হয়; এরপর ইরান দিয়ে আফগানিস্তানে নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল।
পরে সংঘাতের কারণে আবার পথ বদলাতে হয়। চালানটির দীর্ঘ যাত্রাপথ ছিল সৌদি আরব, জর্ডান, সিরিয়া, তুরস্ক, জর্জিয়া ও আজারবাইজান হয়ে কাস্পিয়ান সাগর পেরিয়ে তুর্কমেনিস্তান পর্যন্ত। এ যাত্রায় তিন মাস লেগেছিল।
একই চালানের সংক্ষিপ্ত বিবরণে পরবর্তী সময়ে তুরস্ক ও কাস্পিয়ান সাগর পেরোনোর কথা বলা হয়েছে; বিস্তারিত বিবরণে এর ইন্দোনেশীয় উৎস ও আগে পাকিস্তানে পৌঁছানোর কথাও উল্লেখ রয়েছে। একত্রে এসব তথ্য দেখায়, বিলম্বের কারণ বন্দরে একবার আটকে থাকা নয়, বরং একের পর এক পথ বদল।
ডব্লিউএফপি জানিয়েছে, আফগানিস্তানগামী খাদ্যপণ্যের পরিবহন ব্যয় তিন গুণ পর্যন্ত বেড়েছে। আয়লিফ আরও বলেছেন, কিছু চালান পৌঁছাতে এখন অতিরিক্ত তিন সপ্তাহ পর্যন্ত লাগছে। কিছু চালানের এই বাড়তি সময় বিস্কুটের চালানটির মোট তিন মাসের যাত্রার থেকে আলাদা।
যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে স্কুলশিশুদের খাবারের প্যাকেটসহ হাজার হাজার টন খাদ্যসহায়তা কয়েক মাস পর্যন্ত বিলম্বের মুখে পড়েছে। পরিবহনে দেরি ও ব্যয়বৃদ্ধি না হলে ডব্লিউএফপি আরও প্রায় ১০ লাখ শিশুকে সহায়তা করতে পারত—স্কাউয়ের এই হিসাব কার্যক্রমের আওতা কতটা কমেছে, তা মাপে; শুধু আটকে থাকা পণ্যের পরিমাণ নয়।
ব্যবসায়ীদের পরিবহন ব্যয় কয়েক গুণ বেড়েছে
আফগান ব্যবসায়ীরা বাণিজ্যিক আমদানিতে সমান্তরাল সংকটের কথা বলছেন। কাবুলের আমদানিকারক লুৎফুল্লাহ আকবারি বলেন, চীন থেকে কেনা পণ্য হরমুজ প্রণালি পার হতে না পারা জাহাজে আটকে আছে। পরিবহন ব্যয় বাড়তে থাকলে তিনি চালানটি ছেড়ে দিতে পারেন বলেও জানান।
পণ্য পরিবহন প্রতিষ্ঠানের পরিচালক গুল মীর আমিনি বলেন, কনটেইনার ভাড়ার দাম আনুমানিক ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ৬০০ ডলার থেকে বেড়ে ৭ হাজার ডলারের বেশি হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে দাম ১১ হাজার ডলার ছাড়িয়েছে। আগের দামের সর্বোচ্চ অঙ্ক ধরে হিসাব করলে, ৭ হাজার ডলার ৩ হাজার ৬০০ ডলারের প্রায় দ্বিগুণ, আর ১১ হাজার ডলার তার তিন গুণেরও বেশি।
কাবুলের ইলেকট্রনিকস ব্যবসায়ী মোহাম্মদ মুর্তজা ইসহাকজাই ইরান হয়ে চীন থেকে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার খরচে আরও বড় বৃদ্ধির কথা বলেন: আগে যেখানে প্রায় ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ ডলার লাগত, এখন তা ১৫ হাজার ডলারের বেশি। নতুন অঙ্কটি তার আগের দামের সর্বোচ্চ সীমার দশ গুণেরও বেশি।
এই উদাহরণগুলো ভিন্ন ধরনের চার্জ ও চালানসংক্রান্ত। কনটেইনার ভাড়ার দামকে একজন ইলেকট্রনিকস আমদানিকারকের বলা পণ্য পৌঁছে দেওয়ার মোট খরচের সমতুল্য ধরা যায় না; একইভাবে, কয়েকটি ব্যক্তিগত বিল দিয়ে আফগান বাণিজ্যে গড় ব্যয়বৃদ্ধিও নির্ধারণ করা যায় না। তবে প্রতিষ্ঠিত পথ অচল হয়ে গেলে খরচ কত দ্রুত বাড়তে পারে, তা এগুলো দেখায়।
আমদানি-রপ্তানি ব্যবসা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ইসহাকজাই সীমান্ত বাণিজ্য আবার চালু করতে পাকিস্তানের সঙ্গে উত্তেজনা নিরসনের জন্য তালেবান কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান:
আমরা রপ্তানিও করতে পারছি না, আমদানিও করতে পারছি না,
তার আহ্বান বাস্তব পরিস্থিতির একটি সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে: বিকল্প পথ কিছু পণ্যের চলাচল বজায় রাখতে পারে, কিন্তু তার মানে এই নয় যে প্রত্যেক ব্যবসায়ীর পক্ষে সেই খরচ বহন করা সম্ভব বা অন্য কোথাও আটকে থাকা পণ্য উদ্ধার করা যাবে।
মধ্য এশিয়ার পথে বাণিজ্য চলছে, তবে অসমভাবে
ব্যবসায়ী নেতাদের ধারণা, আফগানিস্তানের বাণিজ্যের ৬০ শতাংশের বেশি এখন মধ্য এশিয়ার পথে হচ্ছে। তালেবান কর্মকর্তারা বলছেন, মধ্য এশিয়া, রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে বাণিজ্য অব্যাহত থাকায় মূল্যস্ফীতি প্রায় ৩ শতাংশে রয়েছে এবং এই যোগাযোগগুলো বৃহত্তর অর্থনৈতিক ধাক্কা সীমিত করতে সহায়তা করেছে।
তালেবান বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আবদুস সালাম জাওয়াদ বলেন, ইরান হয়ে যাওয়া পণ্যে বিধিনিষেধই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ। তার বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, উত্তরের বিকল্প পথগুলো বাণিজ্যকে কিছুটা সামাল দিচ্ছে, তবে ইরানি পথের সব কাজের বিকল্প হতে পারেনি।
মূল্যস্ফীতির হার ও পরিবহন ব্যয়ের বিল ভিন্ন বিষয় বর্ণনা করে। মূল্যস্ফীতি বৃহত্তর পণ্যসমষ্টির দামের পরিবর্তন মাপে, আর ব্যবসায়ীদের উদাহরণগুলো নির্দিষ্ট পরিবহন খরচ নিয়ে। তাই দেশে মূল্যস্ফীতির হার প্রায় ৩ শতাংশ বলা হলেও নির্দিষ্ট কিছু চালান পরিবহনের ব্যয় অনেক বেড়ে যেতে পারে।
মধ্য এশিয়ার পথে ৬০ শতাংশের বেশি বাণিজ্য হচ্ছে—এই হিসাব থেকেও বোঝা যায় না, ওই পথ দিয়ে কতটা মানবিক সহায়তা কত দামে বা কত সময়ে পৌঁছাতে পারবে। ডব্লিউএফপির বারবার পথ বদলের ঘটনা দেখায়, বিকল্প করিডর থাকা মানেই সাশ্রয়ী ও সময়মতো সরবরাহের বিকল্প পাওয়া নয়।
তহবিল কমা ও পরিবারগুলোর ফিরে আসায় চাপ বাড়ছে
ডব্লিউএফপি জানিয়েছে, বছরটির জন্য প্রয়োজনীয় তহবিলের মাত্র ৮ শতাংশ তারা পেয়েছে। পুষ্টির চাহিদা বাড়লেও বর্তমানে প্রতি মাসে ২০ লাখ মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারছে সংস্থাটি, যা গত শীতে সহায়তা পাওয়া ৪০ লাখ মানুষের অর্ধেক।
ডব্লিউএফপির জরুরি সহায়তা পৃষ্ঠায় ২০২৭ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত কার্যক্রম চালিয়ে যেতে ৫৪ কোটি ডলারের আবেদন জানানো হয়েছে। মে মাসে বর্ণিত পৃথক এক আবেদনে পরবর্তী ছয় মাসের জন্য ৩৫ কোটি ডলার চাওয়া হয়। এই আবেদনগুলোতে ভিন্ন সময়সীমা উল্লেখ আছে; এগুলো একসঙ্গে যোগ করা বা একই বাজেটের পরস্পরবিরোধী হিসাব হিসেবে দেখা উচিত নয়।
তহবিল কমে যাওয়ায় শুধু খাদ্য কেনাই প্রভাবিত হচ্ছে না। ডব্লিউএফপি বলছে, অর্থের ঘাটতিতে জাতিসংঘের মানবিক বিমান পরিষেবাকে আফগানিস্তানের নিয়মিত গন্তব্য কমাতে হয়েছে এবং দুটি উড়োজাহাজ ও দেশটিতে জাতিসংঘ পরিচালিত একমাত্র হেলিকপ্টারের চুক্তি বাতিল করতে হয়েছে। নিরাপত্তাহীনতা, দুর্গম ভূখণ্ড ও দুর্বল অবকাঠামোর কারণে সড়কপথে যাতায়াতও আগে থেকেই সীমিত।
প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষের ফিরে আসায় সহায়তার চাহিদাও বেড়েছে। মে মাসে প্রকাশিত হিসাবে, ২০২৫ সালে পাকিস্তান ও ইরান থেকে প্রায় ২৮ লাখ মানুষ ফিরেছেন; ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত ফিরেছেন আরও ৫ লাখ। জুনে জাতিসংঘের বিবরণে আগের এক বছরে প্রায় ২৮ লাখ মানুষকে বহিষ্কার বা প্রত্যাবাসনের কথা বলা হয়েছে, যা ভিন্ন সময়কাল ধরে করা হিসাব।
তারিখের হিসাব মিলিয়ে না দেখে এই প্রত্যাবর্তনের সংখ্যাগুলো যোগ করে নতুন মোট সংখ্যা বের করা উচিত নয়। তবু এগুলো এমন বিপুল জনগোষ্ঠীর আগমনের চিত্র তুলে ধরে, যেখানে অনেক পরিবারই এরই মধ্যে আশ্রয় ও দৈনন্দিন খাবারের জোগাড় করতে হিমশিম খাচ্ছে। সংঘাত ও সহায়তা কমে যাওয়ার পাশাপাশি জলবায়ুজনিত ঘটনা ও ভূমিকম্পও চাপ বাড়িয়েছে।
যুদ্ধবিরতিতেও নির্ভরযোগ্য সরবরাহ ফিরেনি
মানবিক সহায়তার বৃহত্তর পরিবহন নেটওয়ার্কও চাপে রয়েছে। ইউনিসেফ বলছে, উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে জাহাজ চলাচলে সমুদ্রযাত্রায় দুই থেকে চার সপ্তাহ বেশি লাগছে, আর জরুরি মানবিক পণ্যের চালান চার থেকে ছয় মাস পর্যন্ত বিলম্বের মুখে পড়তে পারে। এগুলো বৈশ্বিক হিসাব, বিশেষভাবে আফগানিস্তানে সরবরাহের পূর্বাভাস নয়।
ইউনিসেফ জানিয়েছে, ভারত থেকে ইথিওপিয়া, নাইজেরিয়া ও গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে কিছু টিকার চালান বিমানে পাঠানোর খরচ ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। সোমালিয়া, দক্ষিণ সুদান ও গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের জন্য পাঠানো চিকিৎসাগত বিশেষ খাদ্য ট্রাকে করে পরিবহনের ব্যয় এক-তৃতীয়াংশ বেড়েছে। এসব উদাহরণ দেখায়, ত্রাণ সংস্থার গন্তব্য হরমুজ থেকে অনেক দূরে হলেও পরিবহন ব্যয় বাড়লে তাদের ক্রয়ক্ষমতা কেন কমে যেতে পারে।
ইউনিসেফের বৈশ্বিক পরিবহন ও সরবরাহ বিভাগের প্রধান জঁ-সেড্রিক মেউস পরিবহন ব্যয়ের সঙ্গে সহায়তার সম্পর্ক ব্যাখ্যা করে বলেন:
পরিবহন ব্যয় বাড়লে শিশুদের জীবনরক্ষাকারী সরবরাহের জন্য হাতে থাকা অর্থ কমে যায়,
২৮ ফেব্রুয়ারির উত্তেজনা বৃদ্ধির আগে বিশ্বে জাহাজে পরিবাহিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যেত। ইউএনসিটিএডি ৭৫টি ঝুঁকিপূর্ণ অর্থনীতি পর্যালোচনা করেছে, যার মধ্যে ৬৫টি নিট তেল আমদানিকারক। সংস্থাটির হিসাব, পরিশোধিত তেলের দাম দীর্ঘ সময় ৫০ শতাংশ বাড়তি থাকলে এসব দেশের সম্মিলিত আমদানি ব্যয় বছরে ২ হাজার কোটি ডলারের বেশি বাড়বে। এটি শর্তসাপেক্ষ হিসাব, আফগানিস্তানের নথিভুক্ত ক্ষতি নয়।
ডব্লিউএফপি আরও সতর্ক করেছে, জুলাই পর্যন্ত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে থাকলে বিশ্বজুড়ে আরও ৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ ক্ষুধার মুখে পড়তে পারেন। এই সতর্কতায় জুলাইকে সময়সীমা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে; আফগানিস্তানে সরবরাহ পুনরায় চালুর সময়সীমা হিসেবে নয়।
এই বিবরণগুলোতে আফগানিস্তানের বিঘ্নিত বাণিজ্যপথ আবার খোলার কোনো নিশ্চিত তারিখ জানানো হয়নি। তাৎক্ষণিক প্রয়োজনগুলো স্পষ্ট: আটকে থাকা পণ্যের নির্ভরযোগ্য চলাচল, সাশ্রয়ী বিকল্প পথ, ক্লিনিকের জন্য পুষ্টি উপকরণ এবং ডব্লিউএফপির আবেদনে উল্লিখিত সময়কাল পর্যন্ত সহায়তা চালিয়ে যাওয়ার তহবিল।
মূল বিষয়গুলো
- ২০২৫ সালের অক্টোবরে পাকিস্তানের সীমান্ত বন্ধ হওয়ায় আফগানিস্তানের প্রতিষ্ঠিত সরবরাহপথে বিঘ্ন ঘটে; এরপর হরমুজ সংকটে ইরানের বিকল্প পথও বাধাগ্রস্ত হয়।
- ডব্লিউএফপির পূর্বাভাস, ২০২৬ সালে ১ কোটি ৩৮ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য অনিরাপত্তার মুখে পড়বে এবং ৪৯ লাখ নারী ও শিশুর অপুষ্টির চিকিৎসা প্রয়োজন হবে।
- ৪ জুন ডব্লিউএফপি জানায়, আরও ২৩ লাখ মানুষ তীব্র ক্ষুধার মুখে পড়েছেন।
- ডব্লিউএফপির মাসিক সহায়তার আওতা গত শীতের ৪০ লাখ থেকে কমে ২০ লাখে নেমেছে; খাদ্য পরিবহন ব্যয় বেড়েছে তিন গুণ পর্যন্ত।
- ব্যবসায়ী নেতাদের হিসাব, আফগানিস্তানের ৬০ শতাংশের বেশি বাণিজ্য এখন মধ্য এশিয়া হয়ে হচ্ছে; তবু ব্যবসায়ীরা উচ্চ ব্যয় ও আটকে থাকা পণ্যের কথা জানাচ্ছেন।
- ২০২৭ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত কার্যক্রম চালাতে ডব্লিউএফপি ৫৪ কোটি ডলার চাইছে; বিঘ্নিত পথগুলো আবার চালুর কোনো নির্দিষ্ট তারিখ জানানো হয়নি।






