মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় মিত্রদের মধ্যে টানাপোড়েন, আইসিসির প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত জাপানের

পড়তে 11 মিনিট
Japan Reaffirms ICC Support as U.S. Sanctions Put Allies at Odds

ওয়াশিংটন নিষেধাজ্ঞার পরিধি বাড়ালেও আদালতের পাশে টোকিও

যুক্তরাষ্ট্র ৯ অক্টোবর আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) ওপরই নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দেওয়ার পর আদালটিকে সমর্থন অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করেছে জাপান। এর আগে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল নির্দিষ্ট বিচারক ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। কিছু কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার জন্য ওয়াশিংটন ১৮০ দিনের সময়সীমা দিয়েছে। এতে কূটনীতির জন্য একটি সুযোগ তৈরি হলেও আদালতের আর্থিক সেবা ও প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার বন্ধের হুমকি রয়েছে।

সূচিপত্র
  1. ওয়াশিংটন নিষেধাজ্ঞার পরিধি বাড়ালেও আদালতের পাশে টোকিও
  2. নিষেধাজ্ঞায় কী সীমাবদ্ধতা আসতে পারে
  3. প্রত্যাহারের দাবি না জানিয়ে সমর্থনের অঙ্গীকার জাপানের
  4. কূটনৈতিক তৎপরতার ধারাবাহিকতা
  5. মিত্রদের নিরাপত্তার সঙ্গে নিজেদের দাবি যুক্ত করছে ওয়াশিংটন
  6. আদালতের ভাষ্য, মূল্য দিতে হবে ভুক্তভোগীদের
  7. ইউরোপীয় সুরক্ষার আলোচনা, তবে কার্যকর হয়নি
  8. নোবেল ঘোষণার পর নিষেধাজ্ঞার নিন্দা পিল্লাইয়ের
  9. সরকারের বাইরেও আকানের প্রতি সমর্থন
  10. মূল বিষয়

১১ অক্টোবর টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জাপানের চিফ ক্যাবিনেট সেক্রেটারি মিনোরু কিহারা দেশটির অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। এর আগে ৯ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ১০ অক্টোবর পররাষ্ট্রমন্ত্রী তোশিমিৎসু মোতেগি আইসিসি প্রেসিডেন্ট তোমোকো আকানে ও মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে আলাদা টেলিফোনে কথা বলেন।

আদালতের সবচেয়ে বড় আর্থিক সহায়তাদাতা জাপান, আর যুক্তরাষ্ট্র তার প্রধান নিরাপত্তা মিত্র। টোকিওতে প্রায় ৬০ হাজার মার্কিন সেনাসদস্য অবস্থান করছেন। ফলে এই বিরোধ জাপানের দুটি অগ্রাধিকারের মধ্যে সরাসরি টানাপোড়েন তৈরি করেছে: আন্তর্জাতিক আদালতকে সমর্থন এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে সহযোগিতা।

জাপান সরকারের শীর্ষ মুখপাত্র কিহারা বলেন, নিষেধাজ্ঞাগুলো আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের প্রতি দেশটির সমর্থনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

তিনি বলেন, “আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ে আইনের শাসন জোরদারে প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখাই আমাদের দেশের অবস্থান।”

হেগভিত্তিক আইসিসিতে যুদ্ধাপরাধসহ গুরুতর আন্তর্জাতিক অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিচার করা হয়। কিহারা আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের প্রতিও জাপানের সমর্থনের কথা উল্লেখ করেন। এটি আলাদা একটি প্রতিষ্ঠান, যা মূলত রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার আইনি বিরোধ নিষ্পত্তি করে। দুই আদালতের প্রসঙ্গ তুলে তিনি টোকিওর প্রতিক্রিয়াকে আকানেকে—একজন জাপানি নাগরিক—সমর্থনের চেয়ে আরও বিস্তৃত অঙ্গীকারের অংশ হিসেবে তুলে ধরেন।

বিজ্ঞাপন

নিষেধাজ্ঞায় কী সীমাবদ্ধতা আসতে পারে

ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্তে আইসিসি প্রতিষ্ঠান হিসেবে লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। এর আগে আগস্টে আকানে এবং সেনেগালের জ্যেষ্ঠ ট্রায়াল আইনজীবী আবদুলায়ে সেয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল। ওয়াশিংটন আদালতকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিশেষভাবে মনোনীত নাগরিকদের তালিকায় যুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছে। নিষেধাজ্ঞার এই তালিকায় থাকা সত্তাগুলোর সঙ্গে লেনদেন সীমিত করা হয়।

এই পদক্ষেপে আইসিসি মার্কিন আর্থিক সেবা, প্রযুক্তি কোম্পানি এবং ডলারে লেনদেন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে। ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আগের নিষেধাজ্ঞায় যুক্তরাষ্ট্রের আওতাধীন সম্পদ জব্দ করা হয়েছিল এবং সাধারণত মার্কিন নাগরিক ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে তাদের সঙ্গে লেনদেন করতে নিষেধ করা হয়েছিল।

বাস্তবে এসব বিধিনিষেধ যুক্তরাষ্ট্রের বাইরেও প্রভাব ফেলতে পারে। মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্ক থাকা আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলো নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা গ্রাহকদের এড়িয়ে চলতে পারে। এতে কোনো প্রতিষ্ঠানের অর্থ স্থানান্তর বা সেবার মূল্য পরিশোধের পথ কমে যায়। ফলে বিস্তৃত এই নিষেধাজ্ঞা আদালতের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি দৈনন্দিন কার্যক্রমেও প্রভাব ফেলতে পারে।

নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের আগে দেওয়া সময়সীমার ব্যাখ্যায় পরিধিগত পার্থক্য রয়েছে। কিছু বিবরণে বলা হয়েছে, নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার আগে বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর আদালতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য ছয় মাস সময় দেওয়া হয়েছে। অন্য বিবরণে বলা হয়েছে, ১৮০ দিনের অবকাশ নির্দিষ্ট কিছু পদক্ষেপের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য এবং প্রতিষ্ঠানটি সচল রাখতে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম চালানোর সুযোগ দেয়। এর অর্থ এই নয় যে সব নিষেধাজ্ঞাই স্থগিত থাকবে।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ নিরসনে কূটনৈতিক ও আইনি সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার জন্য সদস্যরাষ্ট্রগুলোকে সময় দিতেই এই সময়সীমা। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সুনির্দিষ্ট শর্ত চিহ্নিত করা হয়নি, আর আলোচনার মাধ্যমে কোনো সমঝোতার ঘোষণাও আসেনি।

প্রত্যাহারের দাবি না জানিয়ে সমর্থনের অঙ্গীকার জাপানের

৯ অক্টোবর রাতে জাপানি ও ইংরেজি ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানান তাকাইচি। তিনি বলেন, এই সিদ্ধান্ত জাপানের অবস্থানের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। আইসিসির প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, আদালতকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি জাপান ওয়াশিংটনের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখবে।

বিবৃতিতে সরকারের পরিকল্পিত প্রতিক্রিয়ার কথা ব্যাখ্যা করেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, “আদালত যাতে শুরুতে পরিকল্পিত ভূমিকা ও দায়িত্ব পালন করতে পারে, সে জন্য আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ চালিয়ে যাব এবং আইসিসিকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেব।”

অবিলম্বে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিতে অ্যাসেম্বলি অব স্টেটস পার্টিসের ব্যুরোর অবস্থানের তুলনায় টোকিওর ভাষা অনেক সংযত। জাপান উদ্বেগ ও মতভিন্নতা জানালেও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্য ওয়াশিংটনের প্রতি সরাসরি প্রকাশ্য আহ্বান জানানো থেকে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বিরত থেকেছে।

আদালতকে নিষেধাজ্ঞার প্রভাব থেকে সুরক্ষা দিতে নতুন কোনো অর্থায়ন প্যাকেজ বা আইনি ব্যবস্থার কথা সরকার জানায়নি। ফলে সহায়তা অব্যাহত রাখার অঙ্গীকারের সঙ্গে একটি বাস্তব প্রশ্নও রয়ে গেছে: ব্যাংক ও সেবাদাতারা সরে গেলে আইসিসির কাজ কীভাবে চালু থাকবে?

বিজ্ঞাপন

কূটনৈতিক তৎপরতার ধারাবাহিকতা

১০ অক্টোবর প্রথমে আকানের সঙ্গে কথা বলেন মোতেগি। আদালতের পরিস্থিতি ও এর প্রতিক্রিয়া নিয়ে আলোচনা শেষে তিনি রুবিওকে ফোন করেন। প্রতিটি কথোপকথন প্রায় ১৫ মিনিট স্থায়ী হয়। জাপান ও যুক্তরাষ্ট্র ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রাখতে সম্মত হলেও আলোচনার বিষয়ে তাদের বিবরণে মতভিন্নতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, প্রতিষ্ঠান হিসেবে আইসিসির ওপর নিষেধাজ্ঞা নিয়ে মোতেগি সরকারের অবস্থান তুলে ধরেছেন। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানায়, রুবিও নিষেধাজ্ঞার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন, কারণ ওয়াশিংটনের ভাষ্য অনুযায়ী আদালতের পদক্ষেপ মার্কিন সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি।

কয়েক সপ্তাহ ধরে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো এভাবে এগিয়েছে:

  • আগস্ট: আকানে ও সেয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ওয়াশিংটন; আইসিসির কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যক্তিপর্যায়ের পদক্ষেপ জোরদার হয়।
  • ২২ সেপ্টেম্বর: জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প আইসিসির সদস্যদের আদালত থেকে সরে যেতে আহ্বান জানান।
  • ১ অক্টোবর: জাপানের একটি সমর্থক গোষ্ঠী প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার স্বাক্ষরসংবলিত আবেদনপত্র উপপ্রধান ক্যাবিনেট সেক্রেটারির কাছে জমা দেয়।
  • ৯ অক্টোবর: ওয়াশিংটন আইসিসির ওপরই নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করে এবং তাকাইচি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
  • ১০ অক্টোবর: মোতেগি আকানে ও রুবিওকে ফোন করেন; একই দিনে আইসিসির তদারকি ব্যুরো নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানায়।
  • ১১ অক্টোবর: আন্তর্জাতিক আদালতগুলোর প্রতি জাপানের সমর্থন প্রকাশ্যে পুনর্ব্যক্ত করেন কিহারা।

রুবিওর সঙ্গে ফোনালাপে ওকিনাওয়ায় ডাকাতি ও হত্যার সন্দেহে এক মার্কিন মেরিনকে গ্রেপ্তারের বিষয়টিও আলোচিত হয়। ঘটনাটি নিয়ে দুঃখ প্রকাশসহ জাপানের অবস্থান জানান মোতেগি। এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনায়ও দুই মন্ত্রী একমত হন। আইসিসি বিরোধটি যে বৃহত্তর সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে সামলানো হচ্ছে, পাশাপাশি চলা এই আলোচনা তা তুলে ধরে।

মিত্রদের নিরাপত্তার সঙ্গে নিজেদের দাবি যুক্ত করছে ওয়াশিংটন

ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি, আইসিসি যুক্তরাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি। আদালত প্রতিষ্ঠার চুক্তি রোম সংবিধি যুক্তরাষ্ট্র অনুসমর্থন করেনি এবং দেশটি আইসিসির সদস্যও নয়। তবে এই অবস্থানেই আদালতের এখতিয়ারসংক্রান্ত সব প্রশ্নের মীমাংসা হয় না। কথিত অপরাধ কোথায় ঘটেছে এবং কোনো পরিস্থিতি কীভাবে আদালতে এসেছে, তার ওপরও এখতিয়ার নির্ভর করতে পারে।

চুক্তিতে স্বাক্ষরের তারিখ নিয়ে প্রতিবেদনগুলোতে ভিন্নতা রয়েছে: একটিতে ২০০২ সাল বলা হয়েছে, অন্যটিতে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের ২০০০ সালে স্বাক্ষরের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তিটি কখনো অনুসমর্থন করেনি—এ বিষয়ে প্রতিবেদনগুলো একমত। স্বাক্ষর ও অনুসমর্থন আলাদা পদক্ষেপ; অনুসমর্থনের মাধ্যমে কোনো রাষ্ট্র চুক্তির বাধ্যবাধকতা মেনে নেওয়ার সম্মতি দেয়।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও ৯ অক্টোবর প্রকাশিত এক ভিডিওতে সরাসরি হুমকি দেন।

তিনি বলেন, “আইসিসি হয় তার হুমকি বন্ধ করবে, নয়তো আমরা আইসিসিকে বন্ধ করে দেব।”

মিত্রদের যে সামরিক সুরক্ষা যুক্তরাষ্ট্র দেয়, তার সঙ্গেও ওয়াশিংটনের প্রত্যাশা যুক্ত করেন তিনি।

রুবিও বলেন, “আমরা আশা করি, আমাদের মিত্ররা—যাদের অনেকেই আইসিসির সদস্য এবং প্রতিরক্ষার জন্য মার্কিন সেনাসদস্যদের ওপর নির্ভরশীল—আদালতকে নিয়ন্ত্রণে রাখবে।”

আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাদের জড়িত করে তদন্তের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তির পর এই বিরোধ সামনে এসেছে। পরে আদালত ওই তদন্তকে অগ্রাধিকার না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। গাজায় কথিত যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আইসিসি ২০২৪ সালে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করে। নিষেধাজ্ঞার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে পরোয়ানার কথা বলা হয়েছে, তবে এটিই একমাত্র কারণ—এমনটা নিশ্চিত নয়।

মার্কিন সামরিক কর্মী, সীমান্ত টহল এজেন্ট এবং নির্বাচিত নেতাদের বিচারের দাবির কথাও উল্লেখ করেন রুবিও। এসব দাবি আদালতের পদক্ষেপ থেকে আলাদা: রুবিও যে বিচারের কথা বলেছেন, সেগুলোর দিকে আইসিসির কর্মকর্তারা কোনো পদক্ষেপ নেননি।

বিজ্ঞাপন

আদালতের ভাষ্য, মূল্য দিতে হবে ভুক্তভোগীদের

আইসিসি প্রতিষ্ঠানটির ওপর নিষেধাজ্ঞার নিন্দা জানিয়ে বলেছে, এগুলো আদালতের কাজ বাধাগ্রস্ত করা এবং কর্মী ও সহযোগিতাকারীদের ভয় দেখানোর চেষ্টা। কাজ চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে আদালত তার ১২৫টি সদস্যরাষ্ট্র ও অঞ্চলকে আহ্বান জানিয়েছে।

তারিখ ২০২৬ উল্লেখ করা ৯ অক্টোবরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আইসিসি জানায়, ১৩ জন স্বতন্ত্র বিচারক ও কৌঁসুলিকে নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রাখার পর প্রতিষ্ঠান হিসেবে আদালতের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। আদালতের কার্যক্রম ব্যাহত করা এবং এর কর্মী বা সহযোগীদের ভয় দেখানোই এই পদক্ষেপের লক্ষ্য বলে জানায় আইসিসি।

চাপ সত্ত্বেও আইসিসি বিচারিক স্বাধীনতা বজায় রাখবে বলে জানান আদালতের প্রেসিডেন্ট আকানে।

তিনি বলেন, “গুরুতর অপরাধের অসংখ্য ভুক্তভোগীর স্বার্থে আদালত স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে, কেবল আইন ও প্রমাণের ভিত্তিতে কাজ করে তার দায়িত্ব পুরোপুরি পালন করে যাবে।”

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, আদালতের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা ও তার স্থিতিস্থাপকতা নিশ্চিত করতে আইসিসি সদস্যরাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে কাজ করেছে। আদালতের কাজ চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় উপায় নিশ্চিত করাসহ সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে রাষ্ট্রগুলোর প্রতি আহ্বান জানানো হয়।

ভিডিওতে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় আকানে বলেন, জবাবদিহির আশায় বছরের পর বছর, কখনো কয়েক দশক অপেক্ষা করা ভুক্তভোগীদের ওপরই নিষেধাজ্ঞাগুলো আঘাত। তার বক্তব্যে প্রতিষ্ঠানটির সম্পদের ওপর বিধিনিষেধের সঙ্গে মামলা এগিয়ে নেওয়ার সক্ষমতার যোগসূত্র তুলে ধরা হয়েছে।

শেষ পর্যন্ত কারা এর পরিণতি ভোগ করবে বলে তিনি মনে করেন, তা ব্যাখ্যা করেন আকানে।

তিনি বলেন, “আদালতের বিরুদ্ধে নেওয়া প্রতিটি পদক্ষেপের প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভুক্তভোগীরাই অনুভব করেন।”

১০ অক্টোবর অ্যাসেম্বলি অব স্টেটস পার্টিসের ব্যুরো অবিলম্বে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আহ্বান জানায়। আদালতের ১২৫টি সদস্যরাষ্ট্রের মধ্য থেকে নির্বাচিত ২১ জন সদস্য নিয়ে ব্যুরো গঠিত; জাপানও এর সদস্য। আদালতের ব্যবস্থাপনা তদারকি ও আইন প্রণয়নকারী সংস্থা বৃহত্তর অ্যাসেম্বলিকে সহায়তা করে ব্যুরো। ২১ সদস্যের সংখ্যাটি ব্যুরোর, পুরো অ্যাসেম্বলির নয়।

ব্যুরো বলেছে, জবরদস্তিমূলক পদক্ষেপ স্বাধীন বিচারিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা এবং আদালতের প্রতি আন্তর্জাতিক সমর্থন চেয়েছে। এই দাবি জাপানের জাতীয় বক্তব্যের চেয়ে এগিয়ে, কারণ এতে স্পষ্টভাবে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার চাওয়া হয়েছে।

ইউরোপীয় সুরক্ষার আলোচনা, তবে কার্যকর হয়নি

আইসিসির অন্য সদস্যদের সঙ্গে একটি বিবৃতিতে যোগ দিয়ে নিষেধাজ্ঞার প্রতি তীব্র মতভিন্নতা জানিয়েছে জাপান। অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা নিয়ে প্রতিবেদনে ভিন্নতা রয়েছে। একটিতে জাপানসহ আরও আটটি রাষ্ট্রের কথা বলা হয়েছে; অন্যটিতে মোট আটটি দেশের নাম রয়েছে: কানাডা, ডেনমার্ক, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, জাপান, নেদারল্যান্ডস ও যুক্তরাজ্য।

আইসিসির আয়োজক দেশ নেদারল্যান্ডস ইউরোপীয় কমিশনের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ব্লকিং স্ট্যাটিউট ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেছে। এ ধরনের পদক্ষেপে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোকে নির্দিষ্ট বিদেশি নিষেধাজ্ঞা মেনে চলা থেকে বিরত রাখা যেতে পারে। এতে আদালত ও এর কর্মীরা যেসব সেবা ব্যবহার করেন, তার কিছু সুরক্ষিত থাকতে পারে।

নেদারল্যান্ডসের পররাষ্ট্রমন্ত্রী টম বেরেন্ডসেন এই বিকল্পকে “পারমাণবিক বিকল্প” বলে অভিহিত করেছেন। আলোচনা চলছে প্রস্তুতি নিয়ে; এর অর্থ এই নয় যে সুরক্ষামূলক কোনো পদক্ষেপ ইতিমধ্যে কার্যকর হয়েছে।

বিদেশি নিষেধাজ্ঞা আরোপকারী দেশের সীমানার বাইরে প্রয়োগ ঠেকাতে জাপানের সমতুল্য কোনো আইন বা ব্যবস্থা নেই। এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বাণিজ্যিক সেবাদাতারা মার্কিন শাস্তির আশঙ্কা করলে কূটনৈতিক সমর্থন ও আর্থিক অনুদান দিয়েই সৃষ্ট সমস্যা মিটবে না।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের জ্যেষ্ঠ পরিচালক এরিকা গুয়েভারা রোসাস সরকারগুলোকে শুধু বিরোধিতার বিবৃতি দেওয়ার বাইরে যেতে আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, “এই পদক্ষেপ আরোপের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে এবং আদালতকে সক্রিয়ভাবে সুরক্ষা দিতে রাষ্ট্রগুলোকে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে।”

বিজ্ঞাপন

নোবেল ঘোষণার পর নিষেধাজ্ঞার নিন্দা পিল্লাইয়ের

এ বছরের নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী হিসেবে সাবেক আইসিসি বিচারক নাভি পিল্লাইয়ের নাম ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা পর নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা আসে। ঘটনাগুলোর ধারাবাহিকতা এতে স্পষ্ট হলেও, পুরস্কারই ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তের কারণ—এমন প্রমাণ এতে মেলে না।

৮৫ বছর বয়সী দক্ষিণ আফ্রিকান আইনজীবী এবং জাতিসংঘের সাবেক মানবাধিকারপ্রধান পিল্লাই ১০ অক্টোবর অসলোতে নোবেল পিস সেন্টারের এক অনুষ্ঠানে নুরেমবার্গ থেকে ভিডিও সংযোগে বক্তব্য দেন। আন্তর্জাতিক আদালতগুলোর অস্তিত্ব টিকে থাকা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, আইসিসির শত শত কর্মী হুমকির মুখে আছেন বলে মনে করছেন।

বিচারিক সিদ্ধান্তের কারণে বিচারকদের লক্ষ্যবস্তু করার বিষয়টি বিশেষভাবে নিন্দা করেন পিল্লাই।

তিনি বলেন, “সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিচারকদের দেওয়া বিচারিক আদেশের কারণেই একটি দেশ তাদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে। এমন ঘটনা নজিরবিহীন, অগ্রহণযোগ্য।”

তার মন্তব্য বিরোধের কেন্দ্রের পার্থক্যটিই তুলে ধরে। ওয়াশিংটনের ভাষ্য, সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি হয়ে ওঠা একটি প্রতিষ্ঠান থেকে সুরক্ষার জন্য নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। আদালত ও এর সমর্থকদের ভাষ্য, বিচারকদের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং স্বাধীন ন্যায়বিচারের পথে বাধা দিতেই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

সরকারের বাইরেও আকানের প্রতি সমর্থন

জাপানে আকানের সাবেক শিক্ষার্থীরা জাপান ইন্টারন্যাশনাল রুল অব ল নেটওয়ার্ক—সংক্ষেপে জাইরল—এর মাধ্যমে সমর্থন সংগঠিত করেছেন। আগস্টে আকানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর গোষ্ঠীটি একটি আবেদন অভিযান শুরু করে এবং ১ অক্টোবর প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার স্বাক্ষর উপপ্রধান ক্যাবিনেট সেক্রেটারির কাছে জমা দেয়।

৭০ বছর বয়সী আকানে নাগোয়ার বাসিন্দা। কৌঁসুলি হিসেবে কাজ করার সময় ২০০৫ থেকে ২০০৭ অর্থবছর পর্যন্ত নাগোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন স্নাতকোত্তর বিভাগে পড়িয়েছেন তিনি। সাবেক শিক্ষার্থীরা জানান, বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়ার পরও তিনি তাদের পরামর্শ দিতেন। পেশা নির্বাচনের কথা ভাবছেন এমন শিক্ষার্থীদের জন্য কৌঁসুলির কার্যালয় পরিদর্শনের ব্যবস্থাও করেছিলেন।

৪৫ বছর বয়সী আইনজীবী ও আকানের সাবেক শিক্ষার্থী ইয়োসুকে শামোতো তার সমর্থনের পেছনের নীতিটি ব্যাখ্যা করেন।

তিনি বলেন, “জোর খাটিয়ে পরিবর্তন আনা মেনে নিলে শেষ পর্যন্ত এমন এক পৃথিবীতে গিয়ে পৌঁছাব, যেখানে শক্তিশালীরা যা খুশি করতে পারবে। আইনের শাসনের গুরুত্ব তরুণ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে চাই।”

গোষ্ঠীটির ৪৪ বছর বয়সী আইনজীবী মাইকো ইমাইযুমি বলেন, স্বাক্ষরের সংখ্যা দেখে আকানে খুশি হয়েছেন। জাইরল আইসিসি পরিচিতি নিয়ে একটি ছবির বই এবং উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের জন্য মক ট্রায়ালের পরিকল্পনা করেছে। তাৎক্ষণিক আবেদন অভিযান ছাড়িয়েও তাদের কাজ এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ এটি।

এরপর নির্ধারিত সময়সীমা হলো ওয়াশিংটনের ১৮০ দিনের রূপান্তরকাল। আলোচনার জন্য নির্দিষ্ট কোনো বৈঠক, সমঝোতা বা জাপানের বিস্তারিত সুরক্ষা প্যাকেজের ঘোষণা আসেনি। জাপান সহায়তা ও যোগাযোগ অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করেছে; আর ওয়াশিংটন পরিবর্তনের দাবি জানালেও সেগুলোর সুনির্দিষ্ট শর্ত প্রকাশ্যে চূড়ান্ত হয়নি।

মূল বিষয়

  • ৯ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্র আইসিসি প্রতিষ্ঠানটির ওপর নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করে, যা নির্দিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আগের পদক্ষেপের বিস্তৃতি ঘটায়।
  • তাকাইচি ও কিহারার বক্তব্য এবং মোতেগির কূটনৈতিক ফোনালাপের মাধ্যমে আদালতের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে জাপান।
  • নিষেধাজ্ঞায় আর্থিক সেবা ও প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার ঝুঁকির মুখে; কিছু কার্যক্রমের জন্য ১৮০ দিনের রূপান্তরকাল রয়েছে।
  • আইসিসির তদারকি ব্যুরো অবিলম্বে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে; জাপানের ভাষা তুলনামূলকভাবে সংযত।
  • সুরক্ষামূলক পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করছে ইউরোপের সরকারগুলো; জাপানের সমতুল্য ব্লকিং স্ট্যাটিউট নেই।
  • নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের শর্ত বা কোনো সমঝোতার ঘোষণা আসেনি।
এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন

আপনার পছন্দ হতে পারে